সূরা হূদ (আয়াত: 3)
হরকত ছাড়া:
وأن استغفروا ربكم ثم توبوا إليه يمتعكم متاعا حسنا إلى أجل مسمى ويؤت كل ذي فضل فضله وإن تولوا فإني أخاف عليكم عذاب يوم كبير ﴿٣﴾
হরকত সহ:
وَّ اَنِ اسْتَغْفِرُوْا رَبَّکُمْ ثُمَّ تُوْبُوْۤا اِلَیْهِ یُمَتِّعْکُمْ مَّتَاعًا حَسَنًا اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی وَّ یُؤْتِ کُلَّ ذِیْ فَضْلٍ فَضْلَهٗ ؕ وَ اِنْ تَوَلَّوْا فَاِنِّیْۤ اَخَافُ عَلَیْکُمْ عَذَابَ یَوْمٍ کَبِیْرٍ ﴿۳﴾
উচ্চারণ: ওয়া আনিছতাগফিরূ রাব্বাকুম ছুম্মা তূবূইলাইহি ইউমাত্তি‘কুম মাতা-‘আন হাছানান ইলা আজালিম মুছাম্মাওঁ ওয়াইউ’তি কুল্লা যী ফাদলিন ফাদলাহূ ওয়া ইন তাওয়াল্লাও ফাইন্নী আখা-ফু‘আলাইকুম ‘আযা-বা ইয়াওমিন কাবীর।
আল বায়ান: আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। তারপর তার কাছে ফিরে যাও, (তাহলে) তিনি তোমাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উত্তম ভোগ-উপকরণ দেবেন এবং প্রর্তেক আনুগত্যশীলকে তাঁর আনুগত্য মুতাবিক দান করবেন। আর যদি তারা ফিরে যায়, তবে আমি নিশ্চয় তোমাদের উপর বড় এক দিনের আযাবের ভয় করছি।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. আরো যে, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তারপর তার দিকে ফিরে আস(১), তিনি তোমাদেরকে এক নির্দিষ্ট কালের এক উত্তম জীবন উপভোগ করতে দেবেন(২) এবং তিনি প্রত্যেক গুণীজনকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দান করবেন।(৩) আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর মহাদিনের শাস্তির আশংকা করি।
তাইসীরুল ক্বুরআন: (এটা শিক্ষা দেয়) যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা চাও, আর অনুশোচনাভরে তাঁর দিকেই ফিরে এসো, তাহলে তিনি একটা নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদেরকে উত্তম জীবন সামগ্রী ভোগ করতে দিবেন, আর অনুগ্রহ লাভের যোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে তিনি তাঁর অনুগ্রহ দানে ধন্য করবেন। আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে আমি তোমাদের উপর বড় এক কঠিন দিনের ‘আযাবের আশঙ্কা করছি।
আহসানুল বায়ান: (৩) আরও এই যে, তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের নিকট (পাপের জন্য) ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, তিনি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদেরকে সুখ-সম্ভোগ দান করবেন[1] এবং প্রত্যেক মর্যাদাবান ব্যক্তিকে তার যথাযথ মর্যাদা দান করবেন।[2] আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের[3] শাস্তির আশঙ্কা করি।
মুজিবুর রহমান: আর (এ উদ্দেশে) যে, তোমরা নিজেদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁর প্রতি নিবিষ্ট থাক। তিনি তোমাদেরকে সুখ-সম্ভোগ দান করবেন নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত এবং প্রত্যেক অধিক ‘আমলকারীকে অধিক সাওয়াব দিবেন; আর যদি তোমরা মুখ ফিরাতেই থাক তাহলে আমি ভীষণ দিনের শাস্তির আশংকা করি।
ফযলুর রহমান: আর তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে ক্ষমা চাও ও তাঁর দিকে ফিরে এসো। তাহলে তিনি তোমাদেরকে এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুন্দরভাবে (জীবনের সুখ) ভোগ করতে দেবেন এবং প্রত্যেক মর্যাদাবানকে তার (যথার্থ) মর্যাদা দেবেন। আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য এক ভয়ানক দিনের শাস্তির আশঙ্কা করি।
মুহিউদ্দিন খান: আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অনন্তর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর। তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশী করে দেবেন আর যদি তোমরা বিমুখ হতে থাক, তবে আমি তোমাদের উপর এক মহা দিবসের আযাবের আশঙ্কা করছি।
জহুরুল হক: "আর যেন তোমাদের প্রভুর কাছে পরিত্রাণ খোঁজো, তারপর তাঁর দিকে ফেরো, -- তিনি তোমাদের সুন্দর জীবনোপকরণ উপভোগ করতে দেবেন এক নির্দিষ্ট কালের জন্য, আর তিনি প্রত্যেক প্রাচুর্যের অধিকারীকে তাঁর প্রাচুর্য প্রদান করেন। আর যদি তোমরা ফিরে যাও তবে নিঃসন্দেহ আমি তোমাদের জন্য আশংকা করি এক মহাদিনের শাস্তির।
Sahih International: And [saying], "Seek forgiveness of your Lord and repent to Him, [and] He will let you enjoy a good provision for a specified term and give every doer of favor his favor. But if you turn away, then indeed, I fear for you the punishment of a great Day.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩. আরো যে, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তারপর তার দিকে ফিরে আস(১), তিনি তোমাদেরকে এক নির্দিষ্ট কালের এক উত্তম জীবন উপভোগ করতে দেবেন(২) এবং তিনি প্রত্যেক গুণীজনকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দান করবেন।(৩) আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর মহাদিনের শাস্তির আশংকা করি।
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে পূর্ববর্তী যাবতীয় গুণাহ হতে ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার আহবান জানাই। এবং ভবিষ্যতে একমাত্র আল্লাহর সান্নিধ্যে থাকার প্রচেষ্টা চালাতে বলি। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো, কারণ আমি দিনে একশত বার তার কাছে তাওবা করি। [মুসলিম: ২৭০২]
(২) অর্থাৎ দুনিয়ায় তোমাদের অবস্থান করার জন্য যে সময় নির্ধারিত রয়েছে সেই সময় পর্যন্ত তিনি তোমাদের খারাপভাবে নয় বরং ভালোভাবেই রাখবেন। তাঁর নিয়ামতসমূহ তোমাদের ওপর বর্ষিত হবে। তাঁর বরকত ও প্রাচুর্য লাভে তোমরা ধন্য হবে। তোমরা সচ্ছল ও সুখী-সমৃদ্ধ থাকবে। তোমাদের জীবন শান্তিময় ও নিরাপদ হবে। তোমরা লাঞ্ছনা, হীনতা ও দীনতার সাথে নয় বরং সম্মান ও মর্যাদার সাথে জীবন যাপন করবে। এ বক্তব্যটিই সূরা নাহলের ৯৭নং আয়াতে এভাবে বলা হয়েছেঃ “যে ব্যক্তিই ঈমান সহকারে সৎকাজ করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করবো।” অনুরূপভাবে এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যাই খরচ করবে তাতেই আল্লাহর কাছ থেকে এর জন্য সওয়াব পাবে। এমনকি যা তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও তাতেও”। [বুখারীঃ ৫৬, মুসলিমঃ ১৬২৮]
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ যদি কেউ গুণাহর কাজ করে তখন তার জন্য একটি গুণাহ লিখা হয়। পক্ষান্তরে যদি সওয়াবের কাজ করে তবে তার জন্য দশটি সওয়াব লিখা হয়। তারপর যদি দুনিয়াতে তার গুণাহের শাস্তি পেয়ে যায় তবে তার জন্য আখেরাতে দশটি সওয়াবই বাকী থাকে, কিন্তু যদি দুনিয়াতে শাস্তি না পায় তবে আখেরাতে একটি গুণাহের বিনিময়ে একটি সওয়াব চলে গেলেও তার আরও নয়টি সওয়াব অবশিষ্ট থাকে। সুতরাং যার একক দশকের উপর প্রাধান্য পায় তার তো ধ্বংসই অনিবার্য। [তাবারী] এরপর আয়াতে বলা হয়েছে, তাদেরকে আল্লাহ উত্তম জীবন সামগ্রী প্রদান করবেন। এ হচ্ছে ইস্তেগফার ও তাওবার ফল। [কুরতুবী]
আল্লামা শানকীতী বলেন, আয়াতে ‘উত্তম জীবন সামগ্রী’ বলে প্রশস্ত রিযক, জীবিকার উন্নত অবস্থা, দুনিয়াতে সার্বিক নিরাপত্তা বোঝানো হয়েছে। আর ‘নির্দিষ্ট সময়’ বলে মৃত্যুকে বোঝানো হয়েছে। অন্য আয়াতেও সেটা বলা হয়েছে, যেমন হুদ আলাইহিস সালাম তার কাওমকে বলেছিলেন, “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তারপর তার দিকেই ফিরে আস। তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষাবেন। আর তিনি তোমাদেরকে আরো শক্তি দিয়ে তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিও না” [সূরা হুদঃ ৫২]
অনুরূপ নূহ আলাইহিস সালামের সাথে তার কাওমের কথোপকথন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “অতঃপর বলেছি, তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন, এবং তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদীনালা। [সূরা নূহঃ ১০–১২] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো, কারণ আমি দিনে একশত বার তার কাছে তাওবা করি। [মুসলিম: ২৭০২]
(৩) মুজাহিদ বলেন, এর অর্থ, তার যে সমস্ত কাজ সে সওয়াবের আশায় করেছে। চাই তা সম্পদ ব্যয়ের মাধ্যমে হোক অথবা হাত বা পা দ্বারা কোন ভাল আমল করেছে, অথবা কোন ভাল কথা বলেছে, অথবা তার যে সমস্ত ভাল কাজ অতিরিক্ত করেছে সে সবই তাকে প্রদান করা হবে। [তাবারী] কাতাদা বলেন, তা আখেরাতে প্রদান করা হবে [তাবারী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩) আরও এই যে, তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের নিকট (পাপের জন্য) ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, তিনি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদেরকে সুখ-সম্ভোগ দান করবেন[1] এবং প্রত্যেক মর্যাদাবান ব্যক্তিকে তার যথাযথ মর্যাদা দান করবেন।[2] আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের[3] শাস্তির আশঙ্কা করি।
তাফসীর:
[1] যে পার্থিব সুখ-সরঞ্জামকে কুরআন ‘ধোঁকার সরঞ্জাম’ বলেছে, সেই পার্থিব সুখ-সরঞ্জামকেই এখানে ‘উৎকৃষ্ট সরঞ্জাম’ বলে অভিহিত করেছে। এর মর্মার্থ হল এই যে, যে ব্যক্তি আখেরাত থেকে অমনোযোগী হয়ে পার্থিব সরঞ্জাম দ্বারা উপকৃত হবে, তার জন্য তা ‘ধোঁকার সরঞ্জাম’ রূপে গণ্য হবে, কারণ এর পরে তাকে নিকৃষ্ট পরিণামের সম্মুখীন হতে হবে। আর যে আখেরাতের জন্য প্রস্ত্ততি নেওয়ার সাথে সাথে তার দ্বারা উপকৃত হবে, তার জন্য এই কিছু দিনের সরঞ্জাম ‘উৎকৃষ্ট সরঞ্জাম’। কারণ সে তা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবহার করে।
[2] (অথবা প্রত্যেক অধিক আমলকারীকে অধিক সওয়াব দান করবেন। অথবা যে পাপ করবে তাকে একটি পাপেরই শাস্তি দেবেন; কিন্তু যে পুণ্য করবে, তাকে ঐ একটির বিনিময়ে ১০টি পুণ্য দান করবেন। আর সে মর্যাদা ও পুণ্য হল, ইহকালে সম্মান এবং পরকালে জান্নাত। -সম্পাদক)
[3] মহাদিন বলতে কিয়ামতের দিন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ ও গুরুত্ব:
সূরার ৫০ থেকে ৬০ নং আয়াত পর্যন্ত আদ জাতি ও তাদের কাছে প্রেরিত নাবী হূদ (عليه السلام) সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সেখান থেকেই উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই সূরাতেও সে সকল জাতির কথা আলোচনা করা হয়েছে; যারা আল্লাহ তা‘আলার আয়াত ও পয়গম্বরদেরকে মিথ্যা মনে করে আল্লাহ তা‘আলার আযাবের সম্মুখীন হয়েছিল। ইতিহাসের পাতা থেকে হয় ভুল অক্ষরের মত মিটিয়ে দেয়া হয়েছে অথবা ইতিহাসের পাতায় শিক্ষাস্বরূপ লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। এ কারণেই হাদীসে এসেছে: একদা আবূ বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার আপনাকে বৃদ্ধ মনে হচ্ছে কেন? নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরে বললেন: সূরা হূদ, ওয়াকিয়া, আম্মা ইয়াতাসাআলুন (সূরা নাবা) এবং ইযাশশামছু কুওবিরাত (সূরা তাকভীর) ইত্যাদি সূরাগুলো আমাকে বৃদ্ধ করে দিয়েছে। (তিরমিযী হা: ৩২৯৭, সহীহ)
১-৪ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়::
الٓرٰ (আলিফ-লাম-রা) এ গুলো হচ্ছে “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ। এসব অক্ষর সূরার শুরুতে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য কী তা আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন। যদিও এ ব্যাপারে বিদ্বানগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। ইমাম শানক্বিতী (রহঃ) বলেন: বিদ্বানদের সেসব মতামতের মধ্যে গ্রহণযোগ্য মত হলযে সকল সূরার শুরুতে “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” উল্লেখ করা হয়েছে তা কুরআনের মু‘জিযাহ বা অলৌকিকত্ব বুঝানোর জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। কুরআনের এ বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো একত্রিতভাবে উল্লেখ থাকলেও তার উদ্দেশ্য নিয়ে আসতে সৃষ্টিকুল অক্ষম। এ অক্ষরগুলো যে মু‘জিযাহ স্বরূপ তার প্রমাণ হল যে সকল সূরার শুরুতে এসকল অক্ষর নিয়ে আসা হয়েছে তার পরে পরেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন এ সূরার শুরুতে এ অক্ষরগুলো উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে: ‘এটা এমন গ্রন্থ যার আয়াতগুলো সুদৃঢ়, অতঃপর বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞের পক্ষ থেকে।’
সুতরাং কুরআনের মাঝে দুর্বলতা ধরতে পারলে ধরে নিয়ে আসো। কিন্তু কেউ আজ পর্যন্ত এ চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে আসেনি, অথচ তৎকালীন আরবরা ছিল ভাষা ও সাহিত্যের শীর্ষচূড়ায়। এ সম্পর্কে সূরা বাকারার প্রথম আয়াতেও আলোচনা করা হয়েছে।
أُحْكِمَتْ শব্দের শাব্দিক অর্থ-দৃঢ় করা, মজবুত করা। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন: কোন কিতাব তা রহিত করতে পারবে না। যেমন তাওরাত ও ইনজিলকে রহিত করে দিয়েছে। কাতাদাহ বলেন: কুরআনের সকল আয়াতগুলো মুহকাম, তাতে কোন ভ্রান্তি নেই এবং কোন বাতিল কিছু নেই। মোট কথা কুরআনের আয়াতগুলো বিধি-বিধানের দিক থেকে মজবুত, সংবাদের দিক থেকে সত্যবাদী এবং শব্দ বিন্যাস ও অর্থের দিক থেকে কোন প্রকার ত্র“টি নেই।
অতঃপর তাতে আহকাম ও শরঈ বিধি-বিধান, নসীহত ও কাহিনী, আক্বায়েদ ও ঈমান সংক্রান্ত বিষয় এবং চরিত্র ও ব্যবহারনীতি-নৈতিকতার বিষয়গুলোকে পরিষ্কার ও বিস্তারিতভাবে মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করে দিয়েছেন, পূর্ব কিতাবসমূহে এর দৃষ্টান্ত মেলে না। সুতরাং মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা‘আলা যিনি অগ্র-পশ্চাত সব জানেন তিনি এ কুরআনকে সকল প্রেক্ষাপট ও সময়ের জন্য উপযোগী করে নাযিল করেছেন। কারো বলার সুযোগ নেই, বর্তমান আধুনিক যুগে কুরআন উপযোগী নয়। এ শুধু আধুনিক নয় বরং এর চেয়ে যত বেশি আধুনিক ও অত্যাধুনিক আসুক না কেন তাতেও কুরআন উপযোগী।
অতএব আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বাণী জ্ঞান ও হিকমত থেকে খালি নয়। আল্লাহ তা‘আলার হিকমত-এর মধ্য থেকে এটাও একটি হিকমত যে, তিনি সকল নাবী-রাসূলকে একই বিধান দিয়ে প্রেরণ করেছেন। আর তাদের সকলের দা‘ওয়াত এটাই ছিল যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই ইবাদত কর অন্য কারো ইবাদত করো না এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। সুতরাং তাঁর কথা অনুপাতে আমল করলেই তোমরা উভয় জগতের অনিষ্ট থেকে বাঁচতে পারবে। অন্যথায় তোমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে।
আর যদি তোমাদের দ্বারা পাপ হয়ে যায় তাহলে তার জন্য আল্লাহ তা‘আলার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তাঁর নিকট তাওবাহ কর তাহলে তিনি তোমাদেরকে উত্তম ভোগের বস্তু দান করবেন। এখানে উত্তম ভোগ্য সামগ্রী বলতে দুনিয়ার ভোগ্য সামগ্রীকেই বুঝানো হয়েছে। কারণ যে ব্যক্তি দুনিয়ার বস্তু উপার্জনের মাধ্যমে আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে তার জন্য এই দুনিয়ার সরঞ্জামাদিই উৎকৃষ্ট সরঞ্জামাদিতে পরিণত হবে। কারণ সে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ অনুসারে তা করেছে।
(وَيُؤْتِ كُلَّ ذِيْ فَضْلٍ فَضْلَه۫)
এই উক্তির ব্যাখ্যায় ইবনু জারীর (রহঃ) ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেন যে, যদি কোন ব্যক্তি খারাপ কাজ করে তবে তার জন্য একটি পাপ লিখে দেয়া হয়। আর যে ব্যক্তি একটি ভাল কাজ করে তার জন্য দশটি নেকী লিখে দেয়া হয়। মূলত এখানে অনুগ্রহ বলতে এটাই বুঝানো হয়েছে।
আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার কর তবে অবশ্যই তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। আর সর্বাবস্থায়ই তোমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট ফিরে যেতে হবে। সুতরাং অস্বীকার করলে কঠিন দিবসের শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. এই কিতাবের আয়াতগুলো মানুষের উপকারার্থে সুন্দরভাবে বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে।
২. মানুষকে দুনিয়াতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পাঠানো হয়েছে, সময় শেষ হয়ে গেলে চলে যেতে হবে।
৩. আল্লাহ তা‘আলা বান্দার ওপর স্নেহপরায়ণ।
৪. মানুষকে সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার নিকটই ফিরে যেতে হবে।
৫. কুরআন সকল যুগের উপযোগী একটি আসমানী কিতাব।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: হযরত ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেছেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করলাম- কোন্ জিনিষে আপনাকে বুড়ো করেছে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমাকে সূরায়ে হুদ, সূরায়ে ওয়াকিয়া, আম্মা-ইয়াতাসাআলুন এবং ওয়া ইযাশ্শামসু কুভ্ভিরাত বুড়ো করে দিয়েছে। (এ হাদীসটি এই সনদে হাফিজ আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আবু বকর (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিসে আপনাকে বৃদ্ধ করে দিলো? “উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমাকে সূরায়ে হুদ, ওয়াকিয়া, আল-মুরসালাত, আম্মা-ইয়াতাসাআলুন এবং ওয়া ইযাশ্শামসু কুভ্ভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে। (এ হাদীসটি এই সনদে বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু ঈসা তিরমিযী (রঃ)) অন্য বর্ণনায় আছেঃ “সূরায়ে হুদ এবং ওর সঙ্গীয় সূরাগুলি আমাকে বৃদ্ধ করেছে” কোন কোন বর্ণনায় সূরায়ে আল-হাক্কাহ এর কথাও রয়েছে।
১-৪ নং আয়াতের তাফসীর
সূরায়ে বাকারায় হুরূফে হিজার উপর আলোচনা হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে তার পুনরাবৃত্তির কোনই প্রয়োজন নেই। তাই (আরবি) এর উপর আলোকপাত করা হচ্ছে না। আল্লাহর আয়াতগুলি দৃঢ় ও মজবুত। (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে- আকার ও অর্থের দিক দিয়ে এই আয়াতগুলি পূর্ণ। এটা প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞাতা আল্লাহর পক্ষ হতে অবতারিত। তিনি কথায় প্রজ্ঞাময় এবং কাজের পরিণাম সম্পর্কে মহাজ্ঞাতা। নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না। মহান আল্লাহ বলেন এর পূর্বেও যে কোন রাসূলের কাছে আমি যে ওয়াহী পাঠিয়েছিলাম তা ছিল এটাই- আমি আল্লাহ এক। সুতরাং তোমরা একমাত্র আমারই ইবাদত করো। আমি প্রত্যেক কওমের মধ্যে নবী পাঠিয়ে এই নির্দেশই দিয়েছিলাম- তোমরা শুধু আল্লাহরই ইবাদত করো এবং প্রতিমা-পূজা থেকে দূরে থাকো। আমি (নবী সঃ) আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদেরকে জাহান্নাম থেকে ভয় প্রদর্শন করছি, আবার জান্নাতের সুসংবাদও দিচ্ছি।
সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পাহাড়ের উপর চড়ে কুরায়েশের গোত্রগুলিকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে কুরায়েশের দল! আমি যদি তোমাদেরকে সংবাদ দেই যে, সকালে তোমাদের উপর শত্রুরা আক্রমণ চালাবে, তবে তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে কি?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলো: “আপনি যে কোন দিন মিথ্যা কথা বলেছেন তা তো আমাদের জানা নেই।” তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কঠিন শাস্তি থেকে ভয় প্রদর্শন করছি।” এ শাস্তি অবশ্যই হবে। সুতরাং এখনও তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তাওবা করে নাও। এরূপ করলে আল্লাহ পাক তোমাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করবেন এবং যে ব্যক্তি অনুগ্রহ লাভের যোগ্য তার প্রতি তিনি অনুগ্রহ করবেন। তিনি দুনিয়াতেও তোমাদের সাথে ভাল ব্যবহার করবেন এবং আখিরাতেও করবেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ “যে কেউই পুরুষ হোক বা নারী হোক, ঈমান আনয়ন করবে, মৃত্যুর পর আমি তাকে পবিত্র জীবনের সাথে উঠাবো।
সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সা’দকে (রাঃ) বলেনঃ “তুমি যদি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কারো উপর কিছু খরচ কর, তবে অবশ্যই তুমি তার প্রতিদান পাবে, এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর উপর যা খরচ করবে তারও প্রতিদান তুমি প্রাপ্ত হবে।”
(আরবি) মহান আল্লাহর এই উক্তির ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন- যে ব্যক্তি খরাপ কাজ করে তার জন্যে একটি পাপ লিখে দেয়া হয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ভাল কাজ করে’ তার উপর দশটি পুণ্য লিপিবদ্ধ হয়। দুনিয়ায় যদি একটি খারাপ আমলের শাস্তি প্রদান করা হয়, তবে তার পক্ষে দশটি পুণ্য থেকে যায়। আর যদি দুনিয়ায় তাকে শাস্তি দেয়া না হয় তবে দশটি পুণ্যের মধ্যে মাত্র একটি পুণ্য খোয়া যায় বা নষ্ট হয়, ন’টি পুণ্য তার পক্ষে থেকেই যায়। এরপর বলেন যে, ঐ ব্যক্তি বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত যার একটি (পাপ) দশটি (পুণ্যে)-র উপর জয়যুক্ত হয়।
মহান আল্লাহ বলেনঃ আর যদি তোমরা মুখ ফিরাতেই থাকো, তবে তোমাদের জন্যে ভীষণ দিনের শাস্তির আশঙ্কা করি। এটা ঐ ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ তাআ’লার নির্দেশাবলী হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। তাকে অবশ্যই কিয়ামতের দিন শাস্তি ভোগ করতেই হবে।
আল্লাহ পাকের উক্তিঃ আল্লাহরই নিকট তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। তিনি স্বীয় বন্ধুদের প্রতি ইহসান করতে এবং শত্রুদেরকে শাস্তি দিতে সক্ষম। পুনরায় সৃষ্টি করার উপরও তিনি ক্ষমতাবান। এটা হচ্ছে ভীষণ সতর্কবাণী, যেমন এর পূর্বের বাণী ছিল উৎসাহব্যঞ্জক।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।