সূরা হূদ (আয়াত: 11)
হরকত ছাড়া:
إلا الذين صبروا وعملوا الصالحات أولئك لهم مغفرة وأجر كبير ﴿١١﴾
হরকত সহ:
اِلَّا الَّذِیْنَ صَبَرُوْا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ ؕ اُولٰٓئِکَ لَهُمْ مَّغْفِرَۃٌ وَّ اَجْرٌ کَبِیْرٌ ﴿۱۱﴾
উচ্চারণ: ইল্লাল্লাযীনা সাবারূ ওয়া ‘আমিলুসসা-লিহা-তি উলাইকা লাহুম মাগফিরাতুওঁ ওয়া আজরুন কাবীর।
আল বায়ান: তবে যারা সবর করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্যই রয়েছে ক্ষমা ও মহা প্রতিদান।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১. কিন্তু যারা ধৈর্যশীল(১) ও সৎকর্মপরায়ণ তাদেরই জন্য আছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।
তাইসীরুল ক্বুরআন: কিন্তু যারা ধৈর্যশীল ও নেক ‘আমালকারী তারা ওরকম নয়। আর এরাই হল যাদের জন্য আছে ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান।
আহসানুল বায়ান: (১১) কিন্তু যারা ধৈর্য ধরে ও ভাল কাজ করে (তারা এরূপ হয় না); এমন লোকদের জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং মহা প্রতিদান। [1]
মুজিবুর রহমান: কিন্তু যারা ধৈর্য ধারণ করে ও ভাল কাজ করে এমন লোকদের জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং বিরাট প্রতিদান।
ফযলুর রহমান: তবে যারা ধৈর্যধারণ ও সৎকাজ করে তারা এর ব্যতিক্রম। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা আর বড়রকম পুরস্কার।
মুহিউদ্দিন খান: তবে যারা ধৈর্য্যধারণ করেছে এবং সৎকার্য করেছে তাদের জন্য ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান রয়েছে।
জহুরুল হক: তারা ছাড়া যারা ধৈর্যধারণ করে ও সৎকর্ম করে, এরাই -- এদের জন্য রয়েছে পরিত্রাণ ও মহাপুরস্কার।
Sahih International: Except for those who are patient and do righteous deeds; those will have forgiveness and great reward.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১১. কিন্তু যারা ধৈর্যশীল(১) ও সৎকর্মপরায়ণ তাদেরই জন্য আছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে সত্যিকার মানুষকে সাধারণ মানবীয় দুর্বলতা হতে পৃথক করে বলা হয়েছে যে, সে সব ব্যক্তি সাধারণ মানবীয় দুর্বলতার উর্ধ্বে যাদের মধ্যে দুটি বিশেষ গুণ রয়েছে। একটি হচ্ছে ধৈর্য ও সহনশীলতা, দ্বিতীয়টি সৎকর্মশীলতা। সবর শব্দটি আরবী ভাষায় অনেক ব্যাপকতর অর্থে ব্যবহৃত হয়। সবরের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বাধা দেয়া, বন্ধন করা। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় অন্যায় কার্য হতে প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করাকে সবর বলে। সুতরাং শরীআতের পরিপন্থী যাবতীয় পাপকার্য হতে প্রবৃত্তিকে দমন করা যেমন সবরের অন্তর্ভুক্ত তদ্রুপ ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত ও মুস্তাহাব ইত্যাদি নেক কাজের জন্য প্রবৃত্তিকে বাধ্য করাও সবরের শামিল। এর বাইরে বিপদাপদে নিজেকে সংযত রাখতে পারাও সবরের অন্তর্ভুক্ত। [ইবনুল কাইয়্যেম: মাদারেজুস সালেকীন] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যার হাতে আমার আত্মা তার শপথ করে বলছি, একজন মুমিনের উপর আপতিত যে কোন ধরনের চিন্তা, পেরেশানী, কষ্ট, ব্যথা, দুর্ভাবনা এমনকি একটি কাটা ফুটলেও এর মাধ্যমে আল্লাহ তার গুণাহের কাফফারা করে দেন”। [বুখারীঃ ৫৬৪১, ৫৬৪২, মুসলিমঃ ২৫৭৩]
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি, আল্লাহ মুমিনের জন্য যে ফয়সালাই করেছেন এটা তার জন্য ভাল হয়ে দেখা দেয়, যদি কোন ভাল কিছু তার জুটে যায় তখন সে শুকরিয়া আদায় করে সুতরাং তা তার জন্য কল্যাণ। আর যদি খারাপ কিছু তার ভাগ্যে জুটে যায় তখন সে ধৈর্য ধারণ করে তখন তার জন্য তা কল্যাণ হিসেবে পরিগণিত হয়। একমাত্র মুমিন ছাড়া কারো এ ধরনের সৌভাগ্য হয় না। [মুসলিমঃ ২৯৯৯]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১১) কিন্তু যারা ধৈর্য ধরে ও ভাল কাজ করে (তারা এরূপ হয় না); এমন লোকদের জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং মহা প্রতিদান। [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, মু’মিনগণ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকুক বা দুঃখ-কষ্টে থাকুক উভয় অবস্থাতেই তারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেন। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাঃ) শপথ করে বলেছেন, ‘‘সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ আছে! আল্লাহ তাআলা মু’মিনদের জন্য যে ফায়সালাই করেন, তাদের ভালোর জন্যই করেন। যদি সে সুখ লাভ করে, তাহলে তার উপর সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, যা তার জন্য মঙ্গলময় (অর্থাৎ, নেকীর কারণ হয়)। আর যদি কোন দুঃখ-কষ্ট পায়, তাহলে ধৈর্য ধারণ করে, আর এটাও তাঁর জন্য মঙ্গলময় (অর্থাৎ, নেকীর কারণ) হয়। এই বৈশিষ্ট্য একজন মু’মিন ব্যতীত অন্য কারো নয়।’’ (মুসলিম) অন্য আরো একটি হাদীসে বলেন যে, ‘‘একজন মু’মিন যখন কোন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয় এবং কষ্ট পায়, এমনকি তার পায়ে কাঁটা প্রবিষ্ট হয়, তখন আল্লাহ তাআলা তার কারণে তাঁর গুনাহ মাফ করে দেন।’’
(আহমাদ ৩/৪) সূরা মাআরিজের ১৯-২২নং আয়াতেও এই বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে।)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৯-১১ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়::
অত্র আয়াতে মানুষের মধ্যে সাধারণত যে মন্দ গুণ পাওয়া যায়, এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। সুখ-দুঃখ এ দু’টি মিলিয়ে মানুষের জীবন, কেউ আজীবন সুখে থাকবে না, আবার কেউ আজীবন দুঃখে থাকবে না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষকে যখন সুখের পর দুঃখ-দুর্দশা স্পর্শ করে তখন সে একেবারে নিরাশ হয়ে যায়। সে ভুলেই যায় যে, কিছুদিন পূর্বেও সে সুখী ছিল। এই সুখ যে তার আবার ফিরে আসতে পারে তা কল্পনাই করে না। মনে হয় যেন সে ইতোপূর্বে কোন আরাম-আয়েশ ভোগ করেনি। তাই সে নিরাশ হয়ে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِذَآ أَذَقْنَا النَّاسَ رَحْمَةً فَرِحُوْا بِهَا ط وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌۭ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيْهِمْ إِذَا هُمْ يَقْنَطُوْنَ)
“আর যখন মানুষকে রহমতের স্বাদ ভোগ করাই, তখন তারা তাতে আনন্দিত হয়, আর যদি তাদের কাজ-কর্মের দরুন তাদের ওপর কোন বিপদ আসে, তবে তখনই তারা নিরাশ হয়ে পড়ে।” (সূরা রূম ৩০:৩৬)
পক্ষান্তরে তাকে যখন দুঃখের পর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করি তখন সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়, সে অহংকারে ফেটে পড়ে, অতীতের দুঃখের কথা ভুলে যায়। মনে হয় যেন সেই দুঃখ তাকে আর কোন দিন স্পর্শ করতে পারবে না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِذْ قَالَ لَه۫ قَوْمُه۫ لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللّٰهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِيْنَ)
“স্মরণ কর! যখন তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, ‘অহঙ্কার কর না, নিশ্চয় আল্লাহ অহঙ্কারীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা কাসাস ২৮:৭৬)
তবে যারা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে তারা এই দু‘ প্রকার বদ অভ্যাস থেকে মুক্ত। তারা দুঃখের সময় নিরাশও হয় না এবং সুখের সময় আনন্দে আত্মহারাও হয় না তারা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করে এবং আল্লাহ তা‘আলার ওপর ধৈর্য ধারণ করে। তাদের জন্যই রয়েছে ক্ষমা ও মহা পুরস্কার।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: সে সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনের জন্য যে ফায়সালাই করেন তাদের জন্য ভালই করেন। যদি সে সুখ লাভ করে তাহলে তার ওপর সে আল্লাহ তা‘আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যা তার জন্য মঙ্গলময়। আর যদি কোন দুঃখ কষ্ট পায় তাহলে ধৈর্য ধারণ করে, এটাও তার জন্য মঙ্গলময়। (সহীহ মুসলিম হা: ২৯৯৯)
অন্য এক হাদীসে এসেছে: একজন মু’মিন যখন কোন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয় এবং কষ্ট পায় এমনকি তার পায়ে কাঁটা বিদ্ধ হয় তখন আল্লাহ তার কারণে সে মু’মিনের গুনাহ ক্ষমা করেন। (সহীহ বুখারী হা: ৫৬৪১)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কষ্টের সময় নিরাশ হওয়া যাবে না এবং সুখের সময় আনন্দে আত্মহারাও হওয়া যাবে না।
২. সর্বদা আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করতে হবে এবং তাঁর প্রশংসা করতে হবে।
৩. আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কবিরা গুনাহ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯-১১ নং আয়াতের তাফসীর
পূর্ণ ঈমানদারগণ ছাড়া সাধারণভাবে জনগণের মধ্যে যে সব খারাপ গুণ ও বদ অভ্যাস রয়েছে, আল্লাহ তাআ’লা এখানে তারই বর্ণনা দিচ্ছেন যে, মানুষ সুখের পর দুঃখ-কষ্টে পতিত হলে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ ও অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে এবং মহান আল্লাহর প্রতি বদ ধারণা পোষণ করতে শুরু করে দেয়, ইতিপূর্বে যেন সে কোন আরাম ও সুখ ভোগ করেই নাই। অথবা এই দুঃখ-কষ্টের পর পুনরায় যে তাদের উপর শান্তি নেমে আসতে পারে এ আশাও তারা করে না। পক্ষান্তরে, দুঃখ-কষ্টে পতিত হওয়ার পর যদি সুখ শান্তি তাদেরকে স্পর্শ করে তখন তারা বলতে শুরু করে যে, দুঃসময় তাদের উপর থেকে সরে গেছে। এ কথা বলে তারা খুশীতে আত্মহারা হয়ে যায় এবং অন্যদের উপর গর্ব করতে থাকে। এর পর আবার যে তাদের উপর দুঃখ বিপদ নেমে আসতে পারে সে সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণরূপে বেখেয়াল ও নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু যারা মু’মিন তারা এই বদ অভ্যাস থেকে মুক্ত। তারা দুঃখ-দুর্দশায় ধৈর্য ধারণ করে এবং সুখ ও আরামের সময় মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ও তার অনুগত হয়ে থাকে। এসব লোক এর বিনিময়ে ক্ষমা ও বড় পুরস্কার লাভ করে। যেমন হাদীসে এসেছে (রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন): “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! মু'মিনের উপর এমন কোন কষ্ট, বিপদ, দুঃখ ও চিন্তা পতিত হয় না যার কারণে আল্লাহ তাআ’লা তার গুণাহ মাফ না করেন, এমন কি একটা কাঁটা ফুটলেও।”
সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে। (যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন): “যাঁর হাতে আমার জীবন রয়েছে তাঁর শপথ! “মু'মিনের জন্যে আল্লাহর প্রত্যেকটা ফায়সালা কল্যাণকর হয়ে থাকে। সে সুখ শান্তির সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্যে কল্যাণকর হয় এবং দুঃখ-কষ্টের সময় ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তখনই সে কল্যাণ লাভ করে থাকে।” এ জন্যেই আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “আসরের সময়ের শপথ! নিশ্চয় মানুষ অত্যন্ত ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু যারা ঈমান আনে, ভাল কাজ করে, একে অপরকে সত্যের প্রতি উপদেশ দিতে থাকে এবং একে অন্যকে (আমলের) পাবন্দ থাকার উপদেশ দিতে থাকে। (তারাই ক্ষতি হতে রক্ষা পাবে)” মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় মানুষকে দুর্বল মনা করে সৃষ্টি করা হয়েছে। যখন তাকে দুঃখ স্পর্শ করে তখন সে হায়-হুতাশ করতে থাকে। আর যখন সে স্বচ্ছল হয় তখন কার্পণ্য করতে শুরু করে। (৭০:১৯)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।