সূরা ইউনুস (আয়াত: 85)
হরকত ছাড়া:
فقالوا على الله توكلنا ربنا لا تجعلنا فتنة للقوم الظالمين ﴿٨٥﴾
হরকত সহ:
فَقَالُوْا عَلَی اللّٰهِ تَوَکَّلْنَا ۚ رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَۃً لِّلْقَوْمِ الظّٰلِمِیْنَ ﴿ۙ۸۵﴾
উচ্চারণ: ফাকা-লূ‘আলাল্লা-হি তাওয়াক্কালনা- রাব্বানা-লা-তাজ‘আলনা-ফিতনাতাল লিলকাওমিজ্জা-লিমীন।
আল বায়ান: তখন তারা বলল, ‘আমরা আল্লাহর উপরই তাওয়াক্কুল করলাম। হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে যালিম কওমের ফিতনার পাত্র বানাবেন না’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৫. অতঃপর তারা বলল, আমরা আল্লাহর উপর নির্ভর করলাম। হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে যালিম সম্প্রদায়ের উৎপীড়নের পাত্র করবেন না।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তখন তারা বলল, ‘‘আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে যালিম জাতির অত্যাচারের পাত্র করো না,
আহসানুল বায়ান: (৮৫) তারা বলল, ‘আমরা আল্লাহরই উপর ভরসা করলাম। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে যালেম সম্প্রদায়ের উৎপীড়নের পাত্র করো না।
মুজিবুর রহমান: তারা বললঃ আমরা আল্লাহরই উপর ভরসা করলাম। হে আমাদের রাব্ব! আমাদেরকে এই যালিমদের লক্ষ্যস্থল বানাবেননা ।
ফযলুর রহমান: তখন তারা বলল, “আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে জালেমদের নির্যাতনের শিকার বানিয়ো না।
মুহিউদ্দিন খান: তখন তারা বলল, আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করেছি। হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের উপর এ জালেম কওমের শক্তি পরীক্ষা করিও না।
জহুরুল হক: সুতরাং তারা বললে -- "আল্লাহ্র উপরেই আমরা নির্ভর করছি। আমাদের প্রভু! অত্যাচারিগোষ্ঠীর উৎপীড়নের পাত্র আমাদের বানিও না,
Sahih International: So they said, "Upon Allah do we rely. Our Lord, make us not [objects of] trial for the wrongdoing people
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮৫. অতঃপর তারা বলল, আমরা আল্লাহর উপর নির্ভর করলাম। হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে যালিম সম্প্রদায়ের উৎপীড়নের পাত্র করবেন না।(১)
তাফসীর:
(১) “আমাদেরকে জালেম লোকদের ফিতনার শিকারে পরিণত করবেন না”। অর্থাৎ তাদেরকে আমাদের উপর বিজয় দিবেন না। কারণ এটা আমাদের দ্বীন সম্পর্কে আমাদেরকে বিভ্রান্তিতে নিপতিত করবে। [কুরতুবী] অথবা তাদের হাতে আমাদের শাস্তি দিয়ে আমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলবেন না। মুজাহিদ বলেন, এর অর্থ আমাদের শক্ৰদের হাতে আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। আর আমাদেরকে এমন কোন শাস্তিও দিবেন না যা দেখে আমাদের শক্ররা বলে যে, যদি এরা সৎপন্থী হতো তবে আমরা তাদের উপর করায়ত্ব করতে পারতাম না। এতে তারাও বিভ্রান্ত হবে, আমরাও। আবু মিজলায বলেন, এর অর্থ, তাদেরকে আমাদের উপর বিজয় দিবেন না, ফলে তারা মনে করবে যে, তারা আমাদের চেয়ে উত্তম, তারপর তারা আমাদের উপর সীমালঙ্ঘনের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে [কুরতুবী; ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৮৫) তারা বলল, ‘আমরা আল্লাহরই উপর ভরসা করলাম। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে যালেম সম্প্রদায়ের উৎপীড়নের পাত্র করো না।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮২-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর:
এই আয়াতগুলোতে মূসা (عليه السلام) ও তাঁর সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণী দ্বারা সত্যকে সত্য হিসেবে প্রমাণিত করেছেন। আর এগুলো হল ঐ সকল প্রমাণ ও স্পষ্ট দলীল, যা আল্লাহ তা‘আলা নিজ কিতাবে অবতীর্ণ করেছেন এবং যা তিনি নাবীগণকে প্রদান করেছেন। অথবা ঐ সকল মু‘জিযা যা আল্লাহ তা‘আলার আদেশে নাবীদের হাতে প্রকাশ হত।
৮৩ নং আয়াতে বলা হচ্ছে যে, ফির‘আউনের সম্প্রদায়ের কিছু লোক মূসা (عليه السلام)-এর নিদর্শন দেখার পর তারা মূসা (عليه السلام)-এর প্রতি ঈমান আনল। বাকিরা ঈমান আনেনি এই ভয়ে যে, ফির‘আউন তাদেরকে শাস্তি দেবে। কারণ ফির‘আউন ছিল সীমালঙ্ঘনকারী।
পরবর্তীতে মূসা (عليه السلام) তাদেরকে ভয় মুক্ত হবার জন্য আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করতে বললেন। যদি তোমরা আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা কর তবে আল্লাহ তা‘আলার শত্র“ ও তোমাদের শত্র“ ফির‘আউন তোমাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। এবং আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য প্রার্থনা কর। তখন তারা একথা শুনে আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করল এবং তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করল এবং ফির‘আউনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। তারা আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করার সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে দু‘আও করেছিল।
আর আল্লাহ তা‘আলা তাদের দু‘আ কবূল করলেন।
৮৭ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মূসা ও তার ভাইয়ের প্রতি ওয়াহী করলেন যে, তারা যেহেতু ঈমান এনেছে অতএব তারা ইবাদত করার জন্য যেন যার যার ঘরে একটি করে ইবাদতখানা তৈরী করে নেয়। যাতে করে ইবাদত করার জন্য তোমাদের বাইরে যেতে না হয়। কারণ বাইরে ফির‘আউন ও তার দলবলের অত্যাচারের আশঙ্কা রয়েছে। তখন তারা ইবাদতখানা তৈরী করে নিল।
৮৮ নং আয়াতে বলা হচ্ছে যে, মূসা (عليه السلام) বললেন, যখন তিনি দেখলেন যে, তাঁর ওয়াজ, নসীহত কোন উপকারে আসছে না তখন আল্লাহ তা‘আলার কাছে বদদু‘আ করলেন যে, তিনি যেন ফেরাউনের ধন-সম্পদ ধ্বংস করে দেন এবং ফির‘আউন যেন কঠিন শাস্তি না দেখা পর্যন্ত ঈমান না আনে। অর্থাৎ সে যদিও ঈমান আনে তবে যেন শাস্তি দেখার পর আনে যে ঈমান তার কোন কাজে আসবে না। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের দু‘আ কবূল করলেন এবং তাদেরকে তাদের বদদু‘আর ওপর অটল থাকার নির্দেশ দিলেন। আর যারা সত্যের অনুসরণ করে না তাদের মত যেন না হয়ে যায় সে ব্যাপারে সতর্ক করলেন এবং তাদেরকে ধৈর্য ধারণ করতে বললেন এবং তারা যেন তার ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা হিকমত ও কৌশল অনুযায়ী অবিলম্বে তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেন।
৯০ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন যে, আমি বাণী ইসরাইলকে সমুদ্র পার করিয়ে দিলাম। অর্থাৎ সমুদ্র চিরে তাতে শুষ্ক রাস্তা তৈরী করে দিলাম। যেমন
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَأَوْحَيْنَآ إِلٰي مُوْسٰٓي أَنِ اضْرِبْ بِّعَصَاكَ الْبَحْرَ ط فَانْفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيْمِ)
“অতঃপর মূসার প্রতি ওয়াহী করলাম, ‘তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত কর।’ ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ বিশাল পবর্তসদৃশ হয়ে গেল।” (সূরা শুআরা ২৬:৬৩)
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিলেন যে, তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত কর। যার ফলে ডান দিকের পানি ডান দিকে এবং বাম দিকের পানি বাম দিকে সরে গিয়ে স্থির হয়ে গেল আর মাঝখান দিয়ে রাস্তা তৈরী হয়ে গেল। যা দিয়ে মূসা (عليه السلام) ও তার সৈন্যদল সমুদ্র পার হয়ে চলে গেল। আর ফির‘আউন সম্প্রদায় যখন সমুদ্রের মাঝখানে পৌঁছল এমন সময় আল্লাহ তা‘আলা দু‘দিকের পানিকে একত্র করে দিলেন ফলে ফির‘আউন ও তার দলবল পানিতে ডুবে মরল।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَاَنْجَیْنَا مُوْسٰی وَمَنْ مَّعَھ۫ٓ اَجْمَعِیْنَﮐﺆ ثُمَّ اَغْرَقْنَا الْاٰخَرِیْنَﮑﺚ)
“এবং আমি মূসা ও তার সঙ্গী সকলকে রক্ষা করলাম। অতঃপর নিমজ্জিত করলাম অপর দলটিকে।” (সূরা শুআরা ২৬:৬৫-৬৬)
আর ঐ ডুবে মরার সময় ফির‘আউন আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান এনেছিল কিন্তু তার ঈমান কোন কাজে আসেনি। পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা উত্তর দিচ্ছেন যে, এখন ঈমান এনেছ অথচ এর পূর্বে নাফরমানী করেছ। অতএব এখন ঈমান আনাতে আর কোন লাভ হবে না, কারণ ঈমান আনার সময় চলে গেছে। সে সময় তুমি অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্য ও ফাসাদ সৃষ্টিতে রত ছিলে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তার শরীরকে নষ্ট করেননি বরং সযতেত্ন রেখে দিলেন যাতে করে পৃথিবীর সকল অবাধ্য ব্যক্তিরা তার এ শরীর দেখে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং তারা যেন অবাধ্য না হয়। যদি অবাধ্য হয় তাহলে ফেরাউনের মতই অবস্থা হবে। পরবর্তীতে আল্লাহ তা‘আলা বানী-ইসরাইলকে বসবাস করার জন্য একটি সুন্দর জায়গা দিলেন এবং তাদেরকে উত্তম রিযিক দান করলেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَأَوْرَثْنَا الْقَوْمَ الَّذِيْنَ كَانُوْا يُسْتَضْعَفُوْنَ مَشَارِقَ الْأَرْضِ وَمَغَارِبَهَا الَّتِيْ بٰرَكْنَا فِيْهَا ط)
“যে সম্প্রদায়কে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে আমি আমার কল্যাণপ্রাপ্ত (সিরিয়া) রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করেছি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৩৭) কিন্তু তারা তৎপরবর্তীতে শত্র“তা ও অহঙ্কারবশত বিবাদ করেছিল। যার ফলে তারা প্রাপ্ত নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ফির‘আউনের মত মানুষের ওপর অত্যাচার করা যাবে না।
২. মু’মিন ও মুসলিমদের উচিত আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করা ও তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা।
৩. সালাত পরিত্যাগ করা যাবে না।
৪. ভয়ের সময় বাড়িতে মাসজিদ হিসেবে সালাত পড়া জায়েয।
৫. প্রাণ কণ্ঠাগত হবার পূর্বেই ঈমান আনতে হবে অর্থাৎ মৃত্যুবরণ করার পূর্বেই।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৮৪-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে বললেনযদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেই থাকো, তবে একমাত্র তাঁরই উপর ভরসা কর। আল্লাহ তা'আলা ভরসাকারীদের যিম্মাদার হয়ে যান।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আল্লাহ তা'আলা ইবাদৃত ও তাওয়াক্কুলকে এক জায়গায় মিলিয়ে বলেছেন। যেমন বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তাঁর ইবাদত কর এবং তার উপর ভরসা কর।” (১১:১২৩) অন্যত্র বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তুমি বল-তিনি রহমান, আমরা তাঁর উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁর উপর ভরসা করেছি।” (৬৭:২৯) আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন প্রতিটি সালাতে কয়েকবার বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করি।” বানী ইসরাঈল মূসা (আঃ)-এর কথা মেনে নেয় এবং বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমরা আল্লাহরই উপর ভরসা করলাম, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এই যালিমদের লক্ষ্যস্থল বানাবেন না।” অর্থাৎ আমাদের উপর তাদেরকে সফলতা দান করবেন না। তা না হলে তারা ধারণা করবে যে, তারাই সঠিক পথে রয়েছে এবং বানী ইসরাঈল বাতিল পথে রয়েছে। ফলে তারা আমাদের উপর আরো বেশী যুলুম করবে। হে আমাদের প্রতিপালক! ফিরআউনের লোকদের হাতে আমাদের শাস্তি দিবেন না এবং নিজের শাস্তিতেও আমাদেরকে জড়িত করবেন না। নতুবা ফিরআউনের কওম বলবে যে, যদি লোকগুলো সত্যের উপরই থাকতো তবে কখনো আযাবে জড়িত হতো না এবং আমরা (ফিরাউনের কওম) তাদের উপর জয়যুক্ত হতাম না। হে আল্লাহ! আপনার রহমত ও ইহসানের মাধ্যমে আমাদেরকে এই কাফির কওম হতে মুক্তিদান করুন। এরা হলো কাফির, আর আমরা হলাম মুমিন। আমরা আপনারই উপর ভরসা রাখি।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।