সূরা ইউনুস (আয়াত: 69)
হরকত ছাড়া:
قل إن الذين يفترون على الله الكذب لا يفلحون ﴿٦٩﴾
হরকত সহ:
قُلْ اِنَّ الَّذِیْنَ یَفْتَرُوْنَ عَلَی اللّٰهِ الْکَذِبَ لَا یُفْلِحُوْنَ ﴿ؕ۶۹﴾
উচ্চারণ: কুল ইন্নাল্লাযীনা ইয়াফতারূনা ‘আলাল্লা-হিল কাযিবা লা-ইউফলিহূন।
আল বায়ান: বল, ‘নিশ্চয় যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৯. বলুন, যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করবে তারা সফলকাম হবে না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: বল ‘‘যারা আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যে রচনা করে, তারা কক্ষনো কল্যাণ পাবে না।
আহসানুল বায়ান: (৬৯) তুমি বলে দাও, ‘যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রচনা করে[1] তারা সফলকাম হবে না।’ [2]
মুজিবুর রহমান: যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রচনা করে নিশ্চয়ই তারা সফলকাম হবেনা।
ফযলুর রহমান: বল, “যারা আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা বানিয়ে বলে তারা কখনও সফল হবে না।”
মুহিউদ্দিন খান: বলে দাও, যারা এরূপ করে তারা অব্যাহতি পায় না।
জহুরুল হক: বলো -- "নিঃসন্দেহ যারা আল্লাহ্র বিরুদ্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে তারা সফলকাম হবে না।"
Sahih International: Say, "Indeed, those who invent falsehood about Allah will not succeed."
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬৯. বলুন, যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করবে তারা সফলকাম হবে না।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬৯) তুমি বলে দাও, ‘যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রচনা করে[1] তারা সফলকাম হবে না।’ [2]
তাফসীর:
[1] افتراء এর অর্থ হল মিথ্যারোপ করা। এর পরেও বাড়তি كذب ‘মিথ্যা’ শব্দটি তাকীদের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
[2] এখানে সফলকাম বা কৃতকার্য বলতে পরকালের কৃতকার্যতাকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর ক্রোধ ও তাঁর শাস্তি থেকে নিষ্কৃতিলাভ। যেহেতু শুধু পার্থিব ক্ষণস্থায়ী সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ কৃতকার্যতা নয়। যেমন অনেকে কাফেরদের ক্ষণস্থায়ী সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেখে ভুল ধারণা এবং সন্দেহ ও সংশয়ের শিকার হয়। এই জন্যই পরবর্তী আয়াতে বলেছেন যে, ‘‘দুনিয়ায় কিছু সুখ-সম্ভোগ; তারপর আমারই দিকে তাদেরকে ফিরে আসতে হবে।’’ অর্থাৎ, পৃথিবীর আরাম-আয়েশ আখেরাতের তুলনায় একেবারে নগণ্য, যার কোন গণনাই হয় না। তার পর তাদেরকে কঠিন শাস্তি আস্বাদন করতে হবে। অতএব ভালভাবে জেনে রাখা দরকার যে, কাফের, মুশরিক এবং আল্লাহর অবাধ্যজনদের পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও অর্থনৈতিক উন্নতি এই কথার প্রমাণ নয় যে, এই জাতি সফলকাম ও কৃতকার্য এবং আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। তাদের এই জাগতিক উন্নতি তাদের নিরলস প্রচেষ্টার ফল, যা বাহ্যিক উপায়-উপকরণ অনুযায়ী প্রত্যেক সেই জাতি অর্জন করতে পারে, যে উপায়-উপকরণ সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে তা অর্জনের জন্য তাদের মত চেষ্টা-চরিত্র করবে; তাতে সে জাতি মু’মিন হোক বা কাফের। তাছাড়া এই ক্ষণস্থায়ী সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অবকাশ ও ঢিল দেওয়ার ফলও হতে পারে। যার আলোচনা এর পূর্বে বিভিন্ন স্থানে করা হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬৮-৭০ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা এখানে ঐ সমস্ত মুশরিকদের কথা খণ্ডন করছেন যারা বলে যে, আল্লাহ তা‘আলার সন্তান রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের কথার জবাবে প্রথমেই নিজের পবিত্রতা বর্ণনা করে বলছেন, তারা যে কথা বলে তা থেকে তিনি পবিত্র। তারপর তিনি বলছেন, তিনি অমুখাপেক্ষী, কারো সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন হয় না। যদি তিনি অমুখাপেক্ষী হন তাহলে তার সন্তানের কী প্রয়োজন? তারপর তিনি বলছেন, তোমরা যে আল্লাহ তা‘আলার জন্য সন্তান সাব্যস্ত করছ; আকাশ ও জমিনে যারা আছে সবাই তো আল্লাহ তা‘আলার কৃর্তত্ব, নেতৃত্ব ও পরিচালনাধীন। সবাই আল্লাহ তা‘আলার মাখলুক ও দাস। কিয়ামতের দিন সবই দাস হয়ে আল্লাহ তা‘আলার সামনে উপস্থিত হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنْ كُلُّ مَنْ فِي السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ إِلَّآ اٰتِي الرَّحْمٰنِ عَبْدًا)
“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট বান্দারূপে উপস্থিত হবে না।” (সূরা মারইয়াম ১৯:৯৩)
তাহলে কেউ আল্লাহ তা‘আলার সন্তান হবে বা থাকবে এ সুযোগটা কোথায়? কারণ সন্তান হল পিতার জাতের অংশ, সে মাখলুক হবে না এবং দাসও হবে না। সুতরাং কেউ আল্লাহ তা‘আলার সন্তান হতে পারে না।
এরপরেও আল্লাহ তা‘আলা বললেন: তোমরা যে বললে আল্লাহ তা‘আলার সন্তান রয়েছে এ ব্যাপারে কি কোন প্রমাণ আছে? যদি প্রমাণ থাকে তাহলে নিয়ে আসো? কিন্তু কোন প্রমাণ দেখাতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যা কিছু বলছ তার সবই আল্লাহ তা‘আলার ওপর মিথ্যারোপ ছাড়া কিছুই নয়। তোমাদের এসব মিথ্যার কারণে আকাশ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(تَكَادُ السَّمٰوٰتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنْشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا - أَنْ دَعَوْا لِلرَّحْمٰنِ وَلَدًا)
“যাতে আকাশমণ্ডলী বিদীর্ণ হবে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে ও পর্বতগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পতিত হবে, যেহেতু তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে।” (সূরা মারইয়াম ১৯:৯০-৯১)
সুতরাং হে নাবী! আপনি বলে দিন এসব মিথ্যুকরা যারা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি অপবাদ দিয়ে থাকে তারা কোন দিন সফলকাম হবে না। এখানে সফলকাম দ্বারা আখিরাতের সফলকামকে বুঝানো হয়েছে। যদিও কিছু কিছু মানুষ ভ্রান্ত আক্বীদা পোষণ করে থাকে যে, যারা অস্বীকারকারী, তারা দুনিয়াতে মুসলিমদের তুলনায় বেশি সুখ-সম্ভোগে বসবাস করছে। কিন্তু এখানে দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে বুঝানো হয়নি; বরং আখিরাতের সফলতাকে বুঝানো হয়েছে যে, তারা আখিরাতে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। যা আল্লাহ তা‘আলা পরবর্তী আয়াতে বলেন যে, দুনিয়ার সুখ আখিরাতের তুলনায় খুবই নগণ্য যা গণনা করার নয়। তারা মৃত্যুর পর আমার নিকট ফিরে আসবে, আমি তাদেরকে তাদের অপরাধের কারণে কঠিন শাস্তি আস্বাদন করাব।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার কোন সন্তান নেই।
২. যারা আল্লাহ তা‘আলার সন্তান দাবী করবে তারা র্শিক করবে।
৩. সন্তান বা অন্য কোন সহযোগী প্রয়োজন হয় তার যিনি অন্যের মুখাপেক্ষী, আল্লাহ তা‘আলা তো কারো মুখাপেক্ষী নন।
৪. অস্বীকারকারীরা আখিরাতে সফলকাম হবে না।
৫. পার্থিব জীবন আখিরাতের তুলনায় খুবই নগণ্য।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬৮-৭০ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের কথা খণ্ডন করছেন যারা বলে যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। তিনি এসব থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। সন্তান কি, বরং তিনি সমস্ত জিনিস থেকেই অমুখাপেক্ষী। দুনিয়ায় যত কিছু বিদ্যমান রয়েছে, সবকিছুই তার অনুগ্রহ ও দয়ার কাঙ্গাল ও একমাত্র তাঁরই মুখাপেক্ষী। যমীন, আসমান ও এ দুয়ের মধ্যে যা কিছু রয়েছে সবই তার অধিকারভুক্ত। তাহলে তিনি নিজেরই বান্দা বা দাসকে কিরূপে সন্তান বানাতে পারেন? হে মুমিনগণ! তোমাদের কাছে তো এর দলীল রয়েছে, কিন্তু এই কাফির ও মুশরিকদের কাছে এই মিথ্যা ও অপবাদমূলক কথার কোনই প্রমাণ নেই। তারা জানে না কিছুই অথচ অনেক কিছু দাবী করছে। এটা মুশরিকদের জন্যে কঠিন সতর্কতামূলক উক্তি।
এই কাফিরগণ বলে যে, আল্লাহরও একটি পুত্র রয়েছে (নাউযুবিল্লাহ)। এটা এমনই এক কঠিন অপবাদমূলক কথা যে, তা শুনে যদি আকাশ ফেটে পড়ে, যমীন ধ্বসে যায় এবং পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে, তবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। আল্লাহ তা'আলার সন্তান হওয়া কিরূপে শোভা পাবে? যমীন ও আসমানের সমুদয় জিনিস তো তারই অনুগৃহীত এবং তাঁরই দাস! সবই তাঁর গণনার মধ্যে রয়েছে। এগুলোর সংখ্যা তার জানা আছে। কিয়ামতের দিন সবাই এককভাবে তার কাছে হাযির হবে। এরপর মহান আল্লাহ এই অপবাদ প্রদানকারী কাফিরদেরকে ধমকের সুরে বলছেন যে, তারা দ্বীন ও দুনিয়া কোথায়ও মুক্তি পাবে না। কিন্তু দুনিয়াতে যে তাদেরকে কিছু ভোগ্য বস্তু প্রদান করা হচ্ছে তা এই জন্যে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ঢিল দিয়ে রেখেছেন, যেন তারা দুনিয়ার নগণ্য ভোগ্য বস্তু দ্বারা কিছুটা উপকার লাভ করে। অতঃপর তাদেরকে ভীষণ শাস্তির শিকারে পরিণত করা হবে। এই দুনিয়াটা তো তাদের জন্যে অল্প কয়েক দিনের সুখের জায়গা। এরপর তাদেরকে আল্লাহ পাকের কাছেই ফিরে যেতে হবে। সেখানে তাদেরকে গ্রহণ করতে হবে কঠিন শাস্তির স্বাদ। এটা হবে তাদের মিথ্যা অপবাদ এবং কুফরীর কারণে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।