আল কুরআন


সূরা ইউনুস (আয়াত: 38)

সূরা ইউনুস (আয়াত: 38)



হরকত ছাড়া:

أم يقولون افتراه قل فأتوا بسورة مثله وادعوا من استطعتم من دون الله إن كنتم صادقين ﴿٣٨﴾




হরকত সহ:

اَمْ یَقُوْلُوْنَ افْتَرٰىهُ ؕ قُلْ فَاْتُوْا بِسُوْرَۃٍ مِّثْلِهٖ وَ ادْعُوْا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ اِنْ کُنْتُمْ صٰدِقِیْنَ ﴿۳۸﴾




উচ্চারণ: আম ইয়াকূলূনাফ তারা-হু কুল ফা’তূবিছূরাতিম মিছলিহী ওয়াদ‘ঊ মানিছতাতা‘আতুম মিন দূ নিল্লা-হি ইন কুনতুম সা-দিকীন।




আল বায়ান: নাকি তারা বলে, ‘সে তা বানিয়েছে’? বল, ‘তবে তোমরা তার মত একটি সূরা (বানিয়ে) নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৮. নাকি তারা বলে, তিনি এটা রচনা করেছেন? বলুন, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে আস(১) এবং আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য যাকে পার ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা কি এ কথা বলে যে, সে [অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সা.)] এটা রচনা করেছে? বল, তাহলে তোমরাও এর মত একটা সূরাহ (রচনা করে) নিয়ে এসো আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাকে পার তাকে ডেকে নাও যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক [যে মুহাম্মাদ (সাঃ)-ই তা রচনা করেছেন]।




আহসানুল বায়ান: (৩৮) তারা কি বলে যে, ‘এটা তার (নবীর) স্বরচিত?’ তুমি বল, ‘তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা আনয়ন কর এবং (এ ব্যাপারে সহযোগিতার জন্য) আল্লাহ ব্যতীত যাকে ডাকতে পার ডেকে নাও; যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’[1]



মুজিবুর রহমান: তারা কি এরূপ বলে যে, এটা তার (নাবীর) স্বরচিত? তুমি বলে দাওঃ তাহলে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা রচনা কর এবং গাইরুল্লাহ হতে যাকে ইচ্ছা ডেকে নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।



ফযলুর রহমান: নাকি তারা বলে যে, সে (মুহাম্মদ) এটা বানিয়েছে। তুমি বল, “তাই যদি হয় তাহলে তোমরাও এর মত একটি সূরা বানিয়ে আন, এবং (এ কাজে) আল্লাহ ব্যতীত যাকে পার ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।



মুহিউদ্দিন খান: মানুষ কি বলে যে, এটি বানিয়ে এনেছ? বলে দাও, তোমরা নিয়ে এসো একটিই সূরা, আর ডেকে নাও, যাদেরকে নিতে সক্ষম হও আল্লাহ ব্যতীত, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।



জহুরুল হক: অথবা তারা কি বলে -- "তিনি এটি রচনা করেছেন"? তুমি বলো -- "তাহলে নিয়ে এস এর মতো একটি সূরা, আর আল্লাহ্‌কে ছেড়ে দিয়ে যাদের পারো ডাকো, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।"



Sahih International: Or do they say [about the Prophet], "He invented it?" Say, "Then bring forth a surah like it and call upon [for assistance] whomever you can besides Allah, if you should be truthful."



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৮. নাকি তারা বলে, তিনি এটা রচনা করেছেন? বলুন, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে আস(১) এবং আল্লাহ্– ছাড়া অন্য যাকে পার ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।


তাফসীর:

(১) এটা আল-কুরআনের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে তৃতীয় চ্যালেঞ্জ। [ইবন কাসীর] তারা যদি কুরআন সম্পর্কে সন্দিহান হয় তবে তারা যেন এর মত একটি সূরা নিয়ে আসে। এর পূর্বে কাফেরদেরকে কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া হয়েছিল। [দেখুন, সূরা আল-ইসরাঃ ৮৮] তারপর তাদেরকে বলা হয়েছিল যে, কুরআনের মত কুরআন না আনতে সক্ষম হলে কুরআনের দশটি সূরা যেন নিয়ে আসে। [দেখুন, সূরা হুদঃ ১৩] কিন্তু তারা তাতেও অপারগ হয়। তখন তাদেরকে এ আয়াতে কুরআনের সূরাসমূহের একটি সূরা নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ করা হয় কিন্তু কাফের-মুশরিকগণ তাও আনতে সক্ষম হয়নি। আর তারা সেটা আনতে পারবেও না। [ইবন কাসীর] আল্লাহ বলেন, “অতএব যদি তোমরা তা করতে না পার আর কখনই তা করতে পারবে না” [সূরা আল-বাকারাহ: ২৪]

এ চ্যালেঞ্জ কুরআনের শুধু ভাষাশৈলীর উপর করা হয়নি। সাধারণভাবে লোকেরা এ চ্যালেঞ্জটিকে নিছক কুরআনের ভাষাশৈলী অলংকার ও সাহিত্য সুষমার দিক দিয়ে ছিল বলে মনে করে। কুরআন তার অনন্য ও অতুলনীয় হবার দাবীর ভিত্তি নিছক নিজের শাব্দিক সৌন্দর্য সুষমার ওপর প্রতিষ্ঠিত করেনি। নিঃসন্দেহে ভাষাশৈলীর দিক দিয়েও কুরআন নজিরবিহীন। কিন্তু মূলত যে জিনিসটির ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে, কোন মানবিক মেধা ও প্রতিভা এহেন কিতাব রচনা করতে পারে না, সেটি হচ্ছে তার বিষয়বস্তু, অলংকারিত ও শিক্ষা। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৮) তারা কি বলে যে, ‘এটা তার (নবীর) স্বরচিত?’ তুমি বল, ‘তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা আনয়ন কর এবং (এ ব্যাপারে সহযোগিতার জন্য) আল্লাহ ব্যতীত যাকে ডাকতে পার ডেকে নাও; যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’[1]


তাফসীর:

[1] এই সকল তথ্য ও প্রমাণাদির পরেও যদি তোমাদের দাবী এই হয় যে, এই কুরআন মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রচিত গ্রন্থ,তবে তিনিও তোমাদের মত একজন মানুষ, তোমাদের ভাষাও তাঁর মতই আরবী, তিনি তো একা, তোমরা যদি নিজেদের দাবীতে সত্যবাদী হও, তাহলে পৃথিবীর সকল সাহিত্যিক, ভাষাবিদ এবং শিক্ষিত জ্ঞানীদেরকে একত্রিত কর এবং এই কুরআনের সব থেকে ছোট সূরার মত একটি সূরা রচনা করে উপস্থাপন কর। কুরআন কারীমের এই চ্যালেঞ্জ আজও বিদ্যমান। এর উত্তর পাওয়া যায়নি। যাতে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, এই কুরআন কোন মানুষের মেহনতের ফল নয়; বরং প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই বাণী, যা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি তিনি অবতীর্ণ করেছেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৭-৪১ নং আয়াতের তাফসীর:



এখানে কুরআনুল কারীমের অলৌকিকত্ব তুলে ধরা হয়েছে। তা হল কুরআন আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো রচিত কিতাব নয় এবং তা কারো পক্ষে সম্ভবও নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا تَنَزَّلَتْ بِهِ الشَّيٰطِيْنُ ﰡ ﺆ وَمَا يَنْۭـبَغِيْ لَهُمْ وَمَا يَسْتَطِيْعُوْنَ)



“শয়তানরা (এ কুরআন) তাসহ অবতীর্ণ হয়নি। তারা এ কাজের যোগ্য নয় এবং তারা এটার সামর্থ্যও রাখে না।” (সূরা শুআরা ২৬:২১০-২১১)



সারা পৃথিবীর মানুষ একত্র হলেও এ কুরআনের ন্যায় কুরআন বানিয়ে আনতে পারবে না। এমনকি একটি সূরা বা আয়াতও আনতে সক্ষম নয়। যেমন



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(وَإِنْ كُنْتُمْ فِيْ رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلٰي عَبْدِنَا فَأْتُوْا بِسُوْرَةٍ مِّنْ مِّثْلِه۪)



“এবং আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমরা যদি সন্দিহান হও, তবে তার সমতুল্য একটি ‘সূরা’ তৈরি করে নিয়ে এসো।” (সূরা বাক্বারাহ ২:২৩)



এ সমস্ত দলিলগুলো প্রমাণ করছে যে, এ কুরআন মিথ্যা রচিত নয়; বরং সেই সত্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, যিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করেছেন। এ কিতাবে হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধ ইত্যাদির বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এই কিতাবের শিক্ষাতে বর্ণিত ইতিহাস ও কাহিনীতে এবং ভবিষ্যতে ঘটিতব্য ঘটনাবলীতে প্রমাণিত হয় যে, এই কিতাব আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(تَنْزِيْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعٰلَمِيْنَ)‏



“এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ।” (সূরা ওয়াকিয়াহ ৫৬:৮০)



এ সকল তথ্য ও প্রমাণাদির পরেও যদি মনে হয় যে, এই কিতাব মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রচিত গ্রন্থ, তবে তিনিও তোমাদের মত একজন মানুষ, তোমাদের ভাষাও তার মতই আরবী, তিনি একা। তোমরা যদি নিজেদের দাবীতে সত্যবাদী হও, তাহলে পৃথিবীর সকল সাহিত্যিক, ভাষাবিদ এবং শিক্ষিত জ্ঞানীদেরকে একত্রিত কর এবং অনুরূপ কিছু তৈরী করে নিয়ে এস। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(قُلْ لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلٰٓي أَنْ يَّأْتُوْا بِمِثْلِ هٰذَا الْقُرْاٰنِ لَا يَأْتُوْنَ بِمِثْلِه۪ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيْرًا)‏



“বল: ‘যদি কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জিন সমবেত হয় এবং যদি তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এটার অনুরূপ আনয়ন করতে পারবে না।” (সূরা ইসরা ১৭:৮৮)



এই চ্যালেঞ্জ আজও বিদ্যমান যার উত্তর পাওয়া যায়নি। এতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, এ কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে প্রেরিত।



(بَلْ كَذَّبُوا بِمَا لَمْ)



কাফির ও মুশরিকদের মধ্যে কিছু লোক তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা না করেই তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে শুরু করেছে। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে কোনই দলিল নিয়ে আসতে পারেনি। এটা ছিল পূর্ববর্তী লোকদেরও অভ্যাস। তারা তার ব্যাখ্যা জানত না। যেমন



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(هَلْ يَنْظُرُوْنَ إِلَّا تَأْوِيْلَه۫ ط يَوْمَ يَأْتِيْ تَأْوِيْلُه۫ يَقُوْلُ الَّذِيْنَ نَسُوْهُ مِنْ قَبْلُ قَدْ جَا۬ءَتْ رُسُلُ رَبِّنَا بِالْحَقِّ ج فَهَلْ لَّنَا مِنْ شُفَعَا۬ءَ فَيَشْفَعُوْا لَنَا)



“তারা কি শুধু তার পরিণামের প্রতীক্ষা করছে যেদিন তার পরিণাম প্রকাশ পাবে সেদিন যারা পূর্বে তার কথা ভুলে গিয়েছিল তারা বলবে, ‘আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ তো সত্যবাণীই নিয়ে এসেছিল; আমাদের কি এমন কোন সুপারিশকারী আছে, যে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে?” (সূরা আ‘রাফ ৭:৫৩)



সুতরাং তারা যদি এ কথাতেও বিশ্বাস না করে এবং তোমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তাহলে তাদেরকে বলে দাও: তোমরা তোমাদের আমল কর আর আমি আমার আমল করি।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(قُلْ یٰٓاَیُّھَا الْکٰفِرُوْنَﭐﺫ لَآ اَعْبُدُ مَا تَعْبُدُوْنَﭑﺫ وَلَآ اَنْتُمْ عٰبِدُوْنَ مَآ اَعْبُدُﭒﺆ وَلَآ اَنَا عَابِدٌ مَّا عَبَدْتُّمْﭓﺫوَلَآ اَنْتُمْ عٰبِدُوْنَ مَآ اَعْبُدُﭔﺚ لَکُمْ دِیْنُکُمْ وَلِیَ دِیْنِﭕﺟ)



“বল: হে কাফিরগণ! আমি তার ইবাদত করি না তোমরা যার ইবাদত কর। আর তোমরা তার ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি। এবং আমি ইবাদতকারী নই তার যার ইবাদত তোমরা কর। আর তোমরা (তার) ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি। তোমাদের দীন তোমাদের জন্য আর আমার দীন আমার জন্য।” (সূরা কাফিরুন ১০৯:১-৬)



আর আমি তোমাদের এ সমস্ত আমল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(إِنَّا بُرَاٰ۬ءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ)



“তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত কর তার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।” (সূরা মুমতাহিনা ৬০:৪)



সুতরাং এ কথা বলার কোন সুযোগ নেই যে, কুরআন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রচনা করেছেন, বরং কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কিতাব। মক্কার মুশরিকরাও অনেক চেষ্টা করেছিল এ কুরআনের আয়াতের মত একটি আয়াত রচনা করতে কিন্তু তারা তা সক্ষম হয়নি।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কিতাব।

২. এই কুরআনে যা কিছু রয়েছে সবকিছুই সত্য। এতে কোন মিথ্যা কাহিনী বর্ণনা করা হয়নি।

৩. এতে হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধ সকল জিনিস বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

৪. যারা একে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে তাদের কঠিন শাস্তি হবে।

৫. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কারো আমলের জন্য জিম্মাদারী হবেন না।

৬. মানুষের পক্ষে এরূপ কুরআন নিয়ে আসা অর্থাৎ রচনা করা সম্ভব নয়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৭-৪০ নং আয়াতের তাফসীর:

এখানে কুরআন কারীমের অলৌকিকতার উপর আলোকপাত করা হয়েছে যে, এই কুরআনের মত কিতাব পেশ করে এমন যোগ্যতা কোন মানুষেরই নেই। শুধু তাই নয়, বরং এর উপরও সক্ষম নয় যে, এর সূরার ন্যায় একটি সূরা আনয়ন করে। এটা পবিত্র কুরআনের ভাষার অলংকার ও বাকপটুতার দাবীর ভিত্তিতে বলা হয়েছে। কুরআন কারীমের ভাষা সংক্ষিপ্ত, অথচ ভাবার্থ খুবই ব্যাপক এবং শ্রুতিমধুর । এটা দুনিয়া ও আখিরাতের জন্যে বড়ই উপকারী। অন্য কোন পুস্তক এসব গুণের অধিকারী হতে পারে না। কেননা, এটা হচ্ছে মহান। আল্লাহর পক্ষ হতে আগত গ্রন্থ। ঐ আল্লাহর যিনি স্বীয় সত্তা, গুণাবলী এবং কাজে ও কথায় সম্পূর্ণ একক, মাখলুকের কালাম তাঁর কালামের সাথে কিরূপে সাদৃশ্যযুক্ত হতে পারে? এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ এই কুরআন কল্পনাপ্রসূত নয় যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে। এর সাথে মানুষের কথার একটুও মিল থাকতে পারে না। আবার এই কুরআন ঐ কথাই বলে যে কথা এর পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলো বলেছে। তবে পূর্ববর্তী এই ইলহামী কিতাবগুলোর মধ্যে যে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটেছে তা লোপ করে দেয়া হয়েছে এবং হালাল ও হারামের বিধানগুলো পূর্ণভাবে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর পক্ষ হতে এটা অবতারিত হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ থাকতে পারে না। এতে অতীত যুগের সংবাদও রয়েছে এবং আগামী যুগের ভবিষ্যদ্বাণীও এতে বিদ্যমান। অতীত ও ভবিষ্যৎ সব কথার উপরই এতে আলোকপাত করা হয়েছে এবং লোকদেরকে ঐ পথে চালিত করা হয়েছে যা সম্পূর্ণ সঠিক ও আল্লাহ তা'আলার নিকট পছন্দনীয়।

আল্লাহ পাক বলেনঃ এই কিতাব আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে অবতারিত হওয়ার ব্যাপারে যদি তোমাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয় এবং তোমাদের মনে যদি এ ধারণা জন্মে তাকে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) এটা নিজেই রচনা করেছেন, তবে তিনিও তো তোমাদের মতই মানুষ। তিনি যদি এরূপ কুরআন রচনা করতে পারেন তবে তোমাদের মধ্যকার কোন সুযোগ্য ব্যক্তি এরূপ কিতাব রচনা করতে পারে ন কেন? অতএব, তোমরা তোমাদের দাবীর সত্যতা প্রমাণ করার জন্যে এই কুরআনের সূরার মত একটি সূরাই আনয়ন কর; যার ভাষা হবে অলংকারপূর্ণ, সংক্ষিপ্ত এবং ব্যাপক অর্থবোধক। মুহাম্মাদ (সঃ) তো একা। এখন তোমরা দুনিয়ার সমস্ত মানব ও দানব একত্রিত হয়ে চেষ্টা করে দেখো তো। এভাবে মহান আল্লাহ তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করলেন যে, যদি তারা তাদের এই দাবীতে সত্যবাদী হয় যে, এটা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর রচিত, তাহলে তারা এই চ্যালেঞ্জ কবুল করুক। শুধু তারা নয়, বরং হাজার হাজার ও কোটি কোটি লোক মিলিত হয়েই করুক। এর পরেও আল্লাহ্ তা'আলা বিরাট দাবী করে বললেনঃ জেনে রেখো যে, তোমরা কখনই এ কাজ করতে সক্ষম হবে না।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ “(হে নবী সঃ)! তুমি বলে দাও- যদি মানব ও দানব এজন্যে একত্রিত হয় যে, তারা এই কুরআনের মত কিতাব আনয়ন করবে, তবে তারা এর মত কিতাব আনতে পারবে না, যদি তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়ে যায়। এর পরেও তিনি আরো নীচে নামিয়ে দিয়ে বলেন যে, সম্পূর্ণ কুরআন নয় বরং এর মত দশটি সূরাই আনয়ন করুক। যেমন মহান আল্লাহ সূরা হুদে বলেনঃ “ তবে কি তারা এইরূপ বলে যে, সে (নবী সঃ) নিজেই এটা রচনা করেছে? তুমি বলে দাও তাহলে তোমরাও তার অনুরূপ রচিত করা দশটি সূরা আনয়ন কর এবং (নিজেদের সাহায্যার্থে) যেই গায়রুল্লাহকে ডাকতে পার ডেকে আন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” আর এই সূরায় আরো নীচে নামিয়ে দিয়ে বলেনঃ “যদি মুহাম্মাদ (সঃ) এটা নিজেই রচনা করে থাকে তবে বেশী নয়, বরং অনুরূপ একটি সূরাই আনয়ন কর।” মদীনায় অবতারিত সূরায়ে বাকারায়ও একটি সূরা আনয়নের চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে এবং খবর দেয়া হয়েছে যে, তারা কখনো তা আনতে সক্ষম হবে না। সেখানে বলা হয়েছে- “অনন্তর যদি তোমরা তা করতে না পার এবং তোমরা তা করতে পারবে না; তবে আত্মরক্ষা করো জাহান্নাম হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, (ওটা) প্রস্তুত রাখা হয়েছে কাফিরদের জন্যে।” অথচ বাক্যালংকার ও বাকপটুতা ছিল আরবদের প্রকৃতিগত গুণ । তাদের যেসব কবিতা কাবা ঘরের দরযায় লটকিয়ে দেয়া হতো তা তাদের পূর্ণ বাক্যালংকার ও বাকপটুতারই পরিচায়ক। কিন্তু মহান আল্লাহ যে কুরআন পেশ করলেন, কোন বাক্যালংকার ও বাকপটুতা ওর কাছেই যেতে পারলো না। কুরআন কারীমের বাক্যালংকার, শ্রুতিমধুরতা, সংক্ষেপণ, গভীরতা ও পূর্ণতা দেখে যারা ঈমান আনবার তারা ঈমান আনলো। কেননা আরবে সে সময় এমন বাগ্মী ব্যক্তিও বিদ্যমান ছিলেন যারা কুরআন কারীমের ভাষার অলংকার, সংক্ষেপণ ও ভাবের গভীরতা উপলব্ধি করে ওর সামনে নিজেদের মস্তক অবনত করেছিলেন। তাঁরা নিঃসংকোচে স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, এটা আল্লাহ ছাড়া আর কারো কালাম হতে পারে না। যেমন মূসা (আঃ)-এর যুগের যাদুকররা, যারা ছিল সেই যুগের সেরা যাদুকর, তারা মূসা (আঃ)-এর ক্রিয়াকলাপ দেখে সমস্বরে বলে উঠেছিল যে, মূসা (আঃ)-এর লাঠির সাথে যাদুর কোনই সম্পর্ক নেই। এটা একমাত্র আল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমেই সম্ভব। সুতরাং মূসা (আঃ) যে আল্লাহর নবী তাতে কোন সন্দেহ নেই। যে ব্যক্তি যে বিষয়ে পারদর্শী সেই ঐ বিষয়ের পরিপূর্ণতা উপলব্ধি করতে পারে । অনুরূপভাবে ঈসা (আঃ) এমন যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যে যুগে চিকিৎসা বিদ্যা উন্নতির উচ্চতম শিখরে আরোহণ করেছিল। ঐ যুগের অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা রোগীদের চিকিৎসায় পূর্ণ পারদর্শিতা প্রদর্শন করছিল। এইরূপ সময়ে ঈসা (আঃ)-এর জন্মান্ধ ও শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে ভাল করে দেয়া, এমন কি আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশক্রমে মৃতকেও জীবিত করে তোলা এমনই এক চিকিত্সা ছিল, যার সামনে অন্যান্য চিকিৎসা ও ওষুধ ছিল মূল্যহীন। সুতরাং বুদ্ধিমানরা বুঝে নিলেন যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তাই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “প্রত্যেক নবীকেই কোন না কোন মুজিযা দেয়া হয়েছিল যা দেখে মানুষ ঈমান আনতো। আর আমাকে যা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে অহী (কুরআন), যে অহী আল্লাহ আমার নিকট পাঠিয়েছেন। সুতরাং আমি আশা করি যে, এর মাধ্যমে আমার অনুসারী তাঁদের অপেক্ষা বেশী হবে।”

আল্লাহপাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ বরং তাদের মধ্যে কতকগুলো লোক, যারা কুরআন কারীম সম্পর্কে কোন জ্ঞানই রাখে না, ওকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে শুরু করে দেয় । কিন্তু তারা কোন দলীল আনতে পারেনি। এটা হচ্ছে তাদের মূর্খতা ও বোকামির কারণ। পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতেরাও এইরূপভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল । অতএব হে নবী (সঃ)! তুমি দেখো, সেই অত্যাচারীদের পরিণাম কি হলো! তারা শুধুমাত্র বিরুদ্ধাচরণের মনোভাব নিয়ে এবং একগুয়েমীর বশবর্তী হয়েই মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। সুতরাং হে অস্বীকারকারী কুরায়েশরা! তোমরা এখন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের পরিণাম চিন্তা করে শিক্ষা গ্রহণ কর। সেই যুগেও কিছু লোক ঈমান আনয়ন করেছিল এবং কুরআন কারীম দ্বারা উপকৃত হয়েছিল। পক্ষান্তরে, কতক লোক ঈমান আনেনি এবং তারা কুফরীর মৃত্যুবরণ করেছিল। আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! কে হিদায়াত লাভের যোগ্য এবং কে পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য তা তোমার প্রতিপালক ভালরূপেই অবগত আছেন। সুতরাং যে হিদায়াত লাভের যোগ্য তাকে তিনি হিদায়াত দান করবেন, আর যে পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য তাকে তিনি পথভ্রষ্ট করবেন। এই কাজে তিনি অতি ন্যায়পরায়ণ। তিনি মোটেই অত্যাচারী নন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।