সূরা ইউনুস (আয়াত: 33)
হরকত ছাড়া:
كذلك حقت كلمة ربك على الذين فسقوا أنهم لا يؤمنون ﴿٣٣﴾
হরকত সহ:
کَذٰلِکَ حَقَّتْ کَلِمَتُ رَبِّکَ عَلَی الَّذِیْنَ فَسَقُوْۤا اَنَّهُمْ لَا یُؤْمِنُوْنَ ﴿۳۳﴾
উচ্চারণ: কাযা-লিকা হাক্কাত কালিমাতুরাব্বিকা ‘আলাল্লাযীনা ফাছাকূআন্নাহুম লা-ইউ’মিনূন।
আল বায়ান: এমনিভাবে তোমার রবের বাণী সত্য বলে সাব্যস্ত হয়েছে তাদের উপর, যারা অবাধ্য হয়েছে, যে তারা ঈমান আনবে না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৩. যারা অবাধ্য হয়েছে এভাবেই তাদের সম্পর্কে আপনার রবের বাণী সত্য প্রতিপন্ন হয়েছে যে, তারা ঈমান আনবে না।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: এভাবে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের ব্যাপারে তোমার প্রতিপালকের কথা সত্য সাব্যস্ত হয়েছে যে, তারা ঈমান আনবে না।
আহসানুল বায়ান: (৩৩) এইভাবে সত্যত্যাগীদের সম্পর্কে তোমার প্রতিপালকের এই কথা সত্য প্রতিপন্ন হয়ে গেল যে, তারা বিশ্বাস করবে না। [1]
মুজিবুর রহমান: এভাবে সমস্ত অবাধ্য লোকদের সম্পর্কে তোমার রবের এই কথা সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, তারা ঈমান আনবেনা।
ফযলুর রহমান: এভাবে ফাসেকদের সম্পর্কে তোমার প্রভুর কথাই সঠিক হল যে, তারা ঈমান আনবে না।
মুহিউদ্দিন খান: এমনিভাবে সপ্রমাণিত হয়ে গেছে তোমার পরওয়ারদেগারের বাণী সেসব নাফরমানের ব্যাপারে যে, এরা ঈমান আনবে না।
জহুরুল হক: এইভাবে তোমার প্রভুর বাণী সত্যপ্রতিপন্ন হয় তাদের বিরুদ্ধে যারা অবাধ্যাচরণ করে -- "নিঃসন্দেহ তারা ঈমান আনবে না"।
Sahih International: Thus the word of your Lord has come into effect upon those who defiantly disobeyed - that they will not believe.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৩. যারা অবাধ্য হয়েছে এভাবেই তাদের সম্পর্কে আপনার রবের বাণী সত্য প্রতিপন্ন হয়েছে যে, তারা ঈমান আনবে না।(১)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ এ মুশরিকরা যেহেতু কুফরী করেছে এবং কুফরি চালিয়েই যাচ্ছে, আর আল্লাহর সাথে অন্যের ইবাদাত করছে, অথচ তারা জানে ও স্বীকৃতি দিচ্ছে যে, তিনিই স্রষ্টা, তাঁর রাজত্বের সবকিছুর একমাত্র নিয়ন্ত্রক, সেহেতু তাদের উপর আল্লাহর বাণী সত্য হয়ে গেছে যে, তারা হতভাগা। জাহান্নামের অধিবাসী। [ইবন কাসীর] অন্যত্রও আল্লাহ তা'আলা তা বলেছেন, “তারা বলবে, অবশ্যই হ্যাঁ। কিন্তু শাস্তির বাণী কাফিরদের উপর বাস্তবায়িত হয়েছে। [সূরা আয-যুমার: ৭১]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৩) এইভাবে সত্যত্যাগীদের সম্পর্কে তোমার প্রতিপালকের এই কথা সত্য প্রতিপন্ন হয়ে গেল যে, তারা বিশ্বাস করবে না। [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, যেরূপ এই মুশরিকরা সবকিছু স্বীকার করার পরেও নিজেদের শিরকের উপর অটল আছে এবং তা বর্জন করতে প্রস্ত্ততই নয়, অনুরূপ তোমার প্রভুর এই কথাও সাব্যস্ত হয়ে গেছে যে, এরা ঈমান আনবে না। কারণ এরা ভ্রষ্টতার পথ ছেড়ে সঠিক পথ বেছে নেওয়ার জন্য প্রস্ত্ততই নয়, সুতরাং হিদায়াত ও ঈমান তাদের নসীবে জুটবে কিভাবে? এই কথা অন্য স্থানে এই ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, (وَلَكِنْ حَقَّتْ كَلِمَةُ الْعَذَابِ عَلَى الْكَافِرِينَ) ‘‘কিন্তু কাফেরদের প্রতি শাস্তির হুকুমই বাস্তবায়িত হয়েছে।’’ (সূরা যুমার ৭১ আয়াত)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন সে সকল মুশরিকদেরকে জিজ্ঞাসা করার জন্য যারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে অন্যদের ইবাদত করে, যে বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কোন দলীল-প্রমাণ দেননি, তোমরা বল, যারা আকাশ-জমিনে রয়েছে তাদের রিযিক কে দিয়ে থাকেন? তোমাদের শ্রবণশক্তি ও দর্শনশক্তির মালিক কে? কে জীবিতকে মৃত করেন এবং মৃতকে জীবিত করেন এবং কে সব কিছু পরিচালনা করেন? এসব প্রশ্নের উত্তর তারা একটিই দেবে তা হল সব কিছু আল্লাহ তা‘আলা করেন। যেমন সূরা যুখরুফের ৯ ও ৮৭ নং, সূরা মু’মিনূনের ৮৪-৮৯ নং, ইত্যাদি আয়াতে তাদের এ স্বীকারোক্তি উল্লেখ রয়েছে। তারা আল্লাহ তা‘আলার রুবুবিয়্যাহকে স্বীকার করেও আল্লাহ তা‘আলার উলুহিয়্যাহকে স্বীকার না করে বরং আল্লাহ তা‘আলার সাথে অন্যের ইবাদত করে। তাই আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, তাদেরকে বল: এরপরেও কি তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে শির্ক বর্জন করবে না?
(فَذٰلِكُمُ اللّٰهُ رَبُّكُمُ)
সুতরাং যাকে তোমরা সকল জিনিসের মালিক বলে স্বীকার কর তিনিই প্রকৃত পক্ষে ইবাদতের যোগ্য এবং তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত প্রভু আর তাকে ব্যতীত যে সমস্ত মা‘বূদদের তোমরা ইবাদত কর তারা সকলই ভ্রান্ত। তাই তাদের উপাসনা করা ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়।
(كَذٰلِكَ حَقَّتْ كَلِمَتُ)
অর্থাৎ যেরূপ এ মুশরিকরা সবকিছু স্বীকার করার পরেও নিজেদের শির্কের ওপর অটল আছে এবং তা বর্জন করতে প্রস্তুতই নয়, অনুরূপ তোমার প্রভুর এ কথাও সাব্যস্ত হয়ে গেছে যে, এরা ঈমান আনবে না। কারণ এরা ভ্রষ্টতার পথ ছেড়ে সঠিক পথ বেছে নেয়ার জন্য প্রস্তুতই নয়। সুতরাং হিদায়াত ও ঈমান তাদের নাসীবে জুটবে কিভাবে? এ কথা অন্য স্থানে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে
(وَلٰكِنْ حَقَّتْ كَلِمَةُ الْعَذَابِ عَلَي الْكٰفِرِيْنَ)
“প্রকৃতপক্ষে কাফিরদের প্রতি শাস্তির হুকুম বাস্তবায়িত হয়েছে।” (সূরা যুমার ৩৯:৭১) সুতরাং কেউ তাওহীদে রুবুবিয়্যাহ স্বীকার করলেই মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার সকল ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য সম্পাদন করে। কারণ মক্কার মুশরিকরাও আল্লাহ তা‘আলাকে সব কিছুর মালিক বলে স্বীকার করত, কিন্তু ইবাদতের সময় আল্লাহ তা‘আলার সাথে অন্যকে সংযুক্ত করে ইবাদত করত। ফলে তারা জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সমস্ত কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
২. আল্লাহ তা‘আলা জীবিত থেকে মৃত আর মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন।
৩. সমস্ত কার্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই পরিচালনা করেন।
৪. সকল ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য করতে হবে, কোন মাযহাব বা বাবা ও পীরের জন্য বৃথা যাবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের উপর হুজ্জত পেশ করছেন যে, তাদেরকে তাঁর প্রভুত্ব ও একত্ব স্বীকার করতেই হবে। অর্থাৎ (হে নবী সঃ)! মুশরিকদেরকে জিজ্ঞেস কর- আকাশ হতে যিনি বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন তিনি কে? যিনি নিজের ক্ষমতাবলে যমীনের মধ্য থেকে আঙ্গুর, নাশপাতি, যায়তুন, খেজুর, ঘন ঘন বাগান এবং গুচ্ছযুক্ত ফল সৃষ্টি করে থাকেন, তার সাথে অন্য কোন মাবুদ আছে। কি? উত্তরে তাদেরকে অবশ্যই বলতে হবে যে, এগুলো শুধুমাত্র আল্লাহরই কাজ। যদি তিনি তার রিযিক বন্ধ করে দেন, তবে কে এমন আছে যে তা খুলতে পারে? যিনি এই শ্রবণশক্তি ও দর্শনশক্তি দান করেছেন এবং ইচ্ছা করলে যিনি এগুলো ছিনিয়ে নিতে পারেন, তিনি কে? যিনি স্বীয় বিরাট ক্ষমতাবলে জীবন্তকে প্রাণহীন থেকে বের করেন এবং প্রাণহীনকে বের করেন জীবন্ত হতে, তিনি কে? এরূপ প্রশ্ন করলে তারা অবশ্যই জবাব দিতে বাধ্য হবে যে, এগুলো করার ক্ষমতা রয়েছে একমাত্র আল্লাহর। তিনিই এসব কাজ করে থাকেন। এই আয়াতের ব্যাপারে মতভেদ পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে এবং এটা সাধারণ ও সবকেই পরিবেষ্টনকারী। সারা বিশ্বের ব্যবস্থাপনা আল্লাহ পাকেরই দায়িত্বে রয়েছে। যা কিছু হচ্ছে সকলই তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী হচ্ছে। তিনিই সকলকে আশ্রয় দিচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে কেউ কাউকেও আশ্রয় দিতে পারে না। সবারই উপর তিনি হাকিম। তাঁর হুকুমের পর কারো হুকুমের কোনই মূল্য নেই। তিনি যাকে ইচ্ছা প্রশ্ন করেন, কিন্তু তাঁকে কেউই কোন প্রশ্ন করতে পারে না । আসমান ও যমীনের সমস্ত মাখলুক তাঁরই রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে। সব সময়েই তিনি একাই সব। আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত রাজত্ব তারই। ফিরিশতা, দানব ও মানব তাঁরই মুখাপেক্ষী এবং তাঁরই দাস। তাঁর কাছে সবারই জবাব এটাই যে, এ সমুদয় ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার মধ্যেই রয়েছে। কাফির ও মুশরিকরাও এটা জানে এবং স্বীকারও করে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! (তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করঃ) আচ্ছা! তাহলে তোমরা মহান আল্লাহকে ভয় করছো না কেন? কেন অজ্ঞতা প্রকাশ করতঃ তাঁকে ছেড়ে অন্যের উপাসনা করছো? প্রকৃত মা'বূদ তো সেই আল্লাহ যাকে তোমরাও স্বীকার করছো। অতএব, একমাত্র তিনিই তো ইবাদতের হকদার। সত্য ও সঠিক কথা বুঝে নেয়ার পরেও এরূপ ভ্রষ্টতার অর্থ কি? তিনি ছাড়া সমস্ত মাবুদই মিথ্যা ও বাতিল। প্রকৃত মাবুদের ইবাদত ছেড়ে কোন দিকে তোমরা বিভ্রান্ত হয়ে ফিরছো?
আল্লাহ পাকের উক্তিঃ “এইভাবে সমস্ত অবাধ্য লোকদের সম্পর্কে তোমার প্রতিপালকের এই কথা সাব্যস্ত হয়ে গেল।” অর্থাৎ যেমনভাবে এই মুশরিকরা কুফরী করেছে এবং কুফরীর উপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, তেমনিভাবে তারা এ কথা স্বীকারও করে নিয়েছে যে, আল্লাহই হচ্ছেন মহান ও পবিত্র প্রতিপালক, তিনিই হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতা, সারা বিশ্বের ব্যবস্থাপক তিনি একাই এবং তিনি রাসূলদেরকে তাওহীদসহ প্রেরণ করেছেন। সুতরাং এই অবাধ্য লোকদের সম্পর্কে মহান আল্লাহর কথা সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, তারা জাহান্নামী । যেমন আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “(রাসূলগণ তাদের কাছে এসেছিলেন কি-না, আল্লাহ তাআলার এই প্রশ্নের উত্তরে) তারা বলবেঃ হ্যা (এসেছিলেন), কিন্তু (আমরা অমান্য করেছিলাম, ফলে) কাফিরদের জন্যে আযাবের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়ে রইলো।” (৩৯:৭১)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।