আল কুরআন


সূরা ইউনুস (আয়াত: 24)

সূরা ইউনুস (আয়াত: 24)



হরকত ছাড়া:

إنما مثل الحياة الدنيا كماء أنزلناه من السماء فاختلط به نبات الأرض مما يأكل الناس والأنعام حتى إذا أخذت الأرض زخرفها وازينت وظن أهلها أنهم قادرون عليها أتاها أمرنا ليلا أو نهارا فجعلناها حصيدا كأن لم تغن بالأمس كذلك نفصل الآيات لقوم يتفكرون ﴿٢٤﴾




হরকত সহ:

اِنَّمَا مَثَلُ الْحَیٰوۃِ الدُّنْیَا کَمَآءٍ اَنْزَلْنٰهُ مِنَ السَّمَآءِ فَاخْتَلَطَ بِهٖ نَبَاتُ الْاَرْضِ مِمَّا یَاْکُلُ النَّاسُ وَ الْاَنْعَامُ ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ اَخَذَتِ الْاَرْضُ زُخْرُفَهَا وَ ازَّیَّنَتْ وَ ظَنَّ اَهْلُهَاۤ اَنَّهُمْ قٰدِرُوْنَ عَلَیْهَاۤ ۙ اَتٰهَاۤ اَمْرُنَا لَیْلًا اَوْ نَهَارًا فَجَعَلْنٰهَا حَصِیْدًا کَاَنْ لَّمْ تَغْنَ بِالْاَمْسِ ؕ کَذٰلِکَ نُفَصِّلُ الْاٰیٰتِ لِقَوْمٍ یَّتَفَکَّرُوْنَ ﴿۲۴﴾




উচ্চারণ: ইন্নামা-মাছালুল হায়া-তিদ দুনইয়া-কামাইন আনযালনা-হু মিনাছছামাই ফাখতালাতা বিহী নাবা-তুল আরদিমিম্মা-ইয়া’কুলুন্না-ছুওয়াল আন‘আ-মু হাত্তাইযাআখাযাতিল আরদুযুখরুফাহা-ওয়াযযাইয়ানাত ওয়াজান্না আহলুহা-আন্নাহুম কাদিরূনা ‘আলাইহা আতা-হাআমরুনা-লাইলান আও নাহা-রান ফাজা‘আলনা-হাহাসীদান কাআল্লাম তাগনা বিলআমছি কাযা-লিকা নুফাসসিলুল আ-য়া-তি লিকাওমিইঁ ইয়াতাফাক্কারূন।




আল বায়ান: নিশ্চয় দুনিয়ার জীবনের তুলনা তো পানির ন্যায় যা আমি আকাশ থেকে নাযিল করি, অতঃপর তার সাথে যমীনের উদ্ভিদের মিশ্রণ ঘটে, যা মানুষ ও চতুষ্পদ জন্তু ভোগ করে। অবশেষে যখন যমীন শোভিত ও সজ্জিত হয় এবং তার অধিবাসীরা মনে করে যমীনে উৎপন্ন ফসল করায়ত্ব করতে তারা সক্ষম, তখন তাতে রাতে কিংবা দিনে আমার আদেশ চলে আসে। অতঃপর আমি সেগুলোকে বানিয়ে দেই কর্তিত ফসল, মনে হয় গতকালও এখানে কিছু ছিল না। এভাবে আমি চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪. দুনিয়ার জীবনের দৃষ্টান্ত তো এরূপঃ যেমন আমরা আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি যা দ্বারা ভূমিজ উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদগত হয়, যা থেকে মানুষ ও জীব-জন্তু খেয়ে থাকে। তারপর যখন ভূমি তার শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয় এবং তার অধিকারিগণ মনে করে সেটা তাদের আয়ত্তাধীন, তখন দিনে বা রাতে আমাদের নির্দেশ এসে পড়ে তারপর আমরা তা এমনভাবে নির্মুল করে দেই, যেন গতকালও সেটার অস্তিত্ব ছিল না।(১) এভাবে আমরা আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করি এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: দুনিয়ার জীবনের দৃষ্টান্ত হচ্ছে যেমন আকাশ থেকে আমি পানি বর্ষণ করি যার সংস্পর্শে ঘন সন্নিবিষ্ট ভূমি জাত উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়। যাত্থেকে ভক্ষণ করে মানুষ আর জীবজন্তু। অবশেষে যমীন যখন সোনালীরূপ ধারণ করে আর শোভামন্ডিত হয়, আর তার মালিকগণ ভাবতে থাকে যে, ওগুলো তাদের হাতের মুঠোয় তখন রাত্রিকালে কিংবা দিনের বেলা আমার নির্দেশ এসে পড়ে আর আমি ওগুলো এমনভাবে ধ্বংস করে দেই মনে হয় যেন গতকাল সেখানে কোন কিছুই ছিল না। এভাবে আমি আমার নিদর্শনগুলোকে বিশদভাবে বর্ণনা করি ঐ সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তাভাবনা করে বুঝতে চেষ্টা করে।




আহসানুল বায়ান: (২৪) বস্তুতঃ পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত তো বৃষ্টির মত, যা আমি আসমান হতে বর্ষণ করি। অতঃপর তার দ্বারা উৎপন্ন হয় ভূপৃষ্ঠের উদ্ভিদগুলো অতিশয় ঘন হয়ে, যা হতে মানুষ ও পশুরা ভক্ষণ করে। অতঃপর যখন ভূমি তার শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে এবং তার মালিকরা মনে করে যে, তারা এখন তার পূর্ণ অধিকারী, তখন দিনে অথবা রাতে তার উপর আমার (আযাবের) আদেশ এসে পড়ে, সুতরাং আমি তা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিই,[1] যেন গতকাল তার অস্তিত্বই ছিল না। এরূপেই আয়াতগুলোকে আমি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বিশদরূপে বর্ণনা করে থাকি।



মুজিবুর রহমান: বস্তুতঃ পার্থিব জীবনের অবস্থাতো এরূপ, যেমন আমি আসমান হতে পানি বর্ষণ করলাম, অতঃপর তা দ্বারা উৎপন্ন হয় যমীনের উদ্ভিদগুলি অতিশয় ঘন হয়ে, যা মানুষ ও পশুরা আহার করে; এমন কি, যখন সেই যমীন নিজের সুদৃশ্যতার পূর্ণ রূপ ধারণ করল এবং তা শোভনীয় হয়ে উঠল, আর ওর মালিকরা মনে করল যে, তারা এখন ওর পূর্ণ অধিকারী হয়েছে, তখন দিনে অথবা রাতে ওর উপর আমার পক্ষ হতে কোন আপদ এসে পড়ল। সুতরাং আমি ওকে এমন নিশ্চিহ্ন করে দিলাম, যেন গতকাল ওর অস্তিত্বই ছিলনা। এরূপেই আয়াতগুলিতে আমি বিশদ রূপে বর্ণনা করি এমন লোকদের জন্য যারা চিন্তা ভাবনা করে।



ফযলুর রহমান: আসলে (এই) পার্থিব জীবনের উদাহরণ এরকম: যেমন আমি আসমান থেকে পানি (বৃষ্টি) বর্ষণ করলাম, যার ফলে ভূমিতে ঘন হয়ে গাছপালা জন্মাল যা থেকে মানুষ ও পশু আহার করে থাকে। অবশেষে ভূমি যখন তার সাজ ধারণ করল ও সুসজ্জিত হল আর তার অধিবাসীরা মনে করল যে, তারাই এর হর্তাকর্তা, তখন রাতে কিংবা দিনে সেখানে আমার নির্দেশ পৌঁছে গেল এবং আমি তাকে ফসল কেটে-নেওয়া জমির মত করে দিলাম, যেন গতকালও তা (ফসলে) সমৃদ্ধ ছিল না। চিন্তাশীল লোকদের জন্য এভাবেই আমি (আমার) নিদর্শনসমূহ সবিস্তারে বর্ণনা করি।



মুহিউদ্দিন খান: পার্থিব জীবনের উদাহরণ তেমনি, যেমনি আমি আসমান থেকে পানি বর্ষন করলাম, পরে তা মিলিত সংমিশ্রিত হয়ে তা থেকে যমীনের শ্যামল উদ্ভিদ বেরিয়ে এল যা মানুষ ও জীব-জন্তুরা খেয়ে থাকে। এমনকি যমীন যখন সৌন্দর্য সুষমায় ভরে উঠলো আর যমীনের অধিকর্তারা ভাবতে লাগল, এগুলো আমাদের হাতে আসবে, হঠাৎ করে তার উপর আমার নির্দেশ এল রাত্রে কিংবা দিনে, তখন সেগুলোকে কেটে স্তুপাকার করে দিল যেন কাল ও এখানে কোন আবাদ ছিল না। এমনিভাবে আমি খোলাখুলি বর্ণনা করে থাকি নিদর্শণসমূহ সে সমস্ত লোকদের জন্য যারা লক্ষ্য করে।



জহুরুল হক: এই দুনিয়ার জীবনের তুলনা হচ্ছে বৃষ্টির ন্যায় যা আমরা আকাশ থেকে বর্ষণ করি, তখন তার দ্বারা পৃথিবীর গাছপালা ভুইঁফোঁড়ে বাড়ে যা থেকে মানুষ ও জীবজন্তু আহার করে থাকে, তারপর যখন পৃথিবী তার সোনালী শোভা ধারণ করে ও সাজসজ্জা পরে, আর এর মালিকেরা ভাবে যে তারা আলবৎ এর উপরে আয়ত্তাধীন, তখন আমাদের আদেশ এর উপরে এসে পড়ে রাতে অথবা দিনে, ফলে আমরা একে বানাই কাটা শস্যের মতন যেন গতকালও তার প্রাচুর্য ছিল না। এইভাবে আমরা নির্দেশাবলী বিশদ ব্যাখ্যা করি সেইসব সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে।



Sahih International: The example of [this] worldly life is but like rain which We have sent down from the sky that the plants of the earth absorb - [those] from which men and livestock eat - until, when the earth has taken on its adornment and is beautified and its people suppose that they have capability over it, there comes to it Our command by night or by day, and We make it as a harvest, as if it had not flourished yesterday. Thus do We explain in detail the signs for a people who give thought.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৪. দুনিয়ার জীবনের দৃষ্টান্ত তো এরূপঃ যেমন আমরা আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি যা দ্বারা ভূমিজ উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদগত হয়, যা থেকে মানুষ ও জীব-জন্তু খেয়ে থাকে। তারপর যখন ভূমি তার শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয় এবং তার অধিকারিগণ মনে করে সেটা তাদের আয়ত্তাধীন, তখন দিনে বা রাতে আমাদের নির্দেশ এসে পড়ে তারপর আমরা তা এমনভাবে নির্মুল করে দেই, যেন গতকালও সেটার অস্তিত্ব ছিল না।(১) এভাবে আমরা আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করি এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে।(২)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ দুনিয়ার যাবতীয় বস্তু এতই ক্ষনস্থায়ী যে, সেটা হস্তচ্যুত হয়ে গেলে এমন মনে হয় যেন তা কোনদিনই তার ছিল না। পক্ষান্তরে আখেরাতের নেয়ামত এমন হবে যে, তার তুলনায় দুনিয়ার সব দুঃখ কষ্ট মানুষ বেমালুম ভুলে যাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে বলেনঃ “দুনিয়ার সবচেয়ে বেশী নেয়ামতের অধিকারীকে কিয়ামতের দ্বীন নিয়ে আসা হবে তারপর তাকে জাহান্নামের আগুনে একবার ঢুকিয়ে আনার পর জিজ্ঞাসা করা হবে তুমি কি তোমার দুনিয়ার জীবনে কোন ভাল বা কল্যাণ কিছু পেয়েছিলে? তুমি কি কোন নেয়ামত পেয়েছিলে? সে বলবেঃ না। অপরপক্ষে, দুনিয়াতে সবচেয়ে কঠিন কষ্টের মধ্যে ছিল এমন লোককে নিয়ে আসা হবে তারপর তাকে জান্নাতে ঢুকিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে, তুমি কি কখনো দুঃখ কষ্ট দেখেছিলে? সে বলবেঃ না।” [মুসলিমঃ ২৮০৭]


(২) কারণ চিন্তাশীল মাত্রই বুঝতে পারে যে, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। শুধু তাই নয় ধোঁকাবাজও। দুনিয়ার চরিত্রই হলো এমন যে, যারা এর পিছনে ছুটে সে তাদের থেকে দূরে ছুটে যায় আর যারা তার থেকে দূরে থাকতে চায় সে তাদের পিছু নেয়। দুনিয়ার উদাহরণ হিসেবে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে যমীনের মধ্যে উৎপন্ন উদ্ভিদ বলে উল্লেখ করেছেন। [ইবন কাসীর] যেমন, “তাদের কাছে পেশ কর উপমা দুনিয়ার জীবনের: এটা পানির ন্যায় যা আমরা বর্ষণ করি আকাশ থেকে, যা দ্বারা ভূমিজ উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদগত হয়, তারপর তা বিশুষ্ক হয়ে এমন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যে, বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ্ সব কিছুর উপর শক্তিমান” [সূরা আল-কাহফ: ৪৫] অনুরূপ আয়াত আরও এসেছে সূরা আয-যুমার ও সূরা আল-হাদীদে। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৪) বস্তুতঃ পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত তো বৃষ্টির মত, যা আমি আসমান হতে বর্ষণ করি। অতঃপর তার দ্বারা উৎপন্ন হয় ভূপৃষ্ঠের উদ্ভিদগুলো অতিশয় ঘন হয়ে, যা হতে মানুষ ও পশুরা ভক্ষণ করে। অতঃপর যখন ভূমি তার শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে এবং তার মালিকরা মনে করে যে, তারা এখন তার পূর্ণ অধিকারী, তখন দিনে অথবা রাতে তার উপর আমার (আযাবের) আদেশ এসে পড়ে, সুতরাং আমি তা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিই,[1] যেন গতকাল তার অস্তিত্বই ছিল না। এরূপেই আয়াতগুলোকে আমি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বিশদরূপে বর্ণনা করে থাকি।


তাফসীর:

[1] حَصِيدًا - فعيل - مفعول অর্থে। أي محصودًا অর্থাৎ এমন ফসল যা কেটে এক জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয় এবং ক্ষেত পরিষ্কার হয়ে যায়। পার্থিব্য জীবনকে এইরূপ ক্ষেতের সাথে তুলনা করে তা যে ক্ষণস্থায়ী; চিরস্থায়ী নয়, তা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। ফসলও বৃষ্টির পানি দ্বারা বড় এবং সবুজ ও সতেজ হয়, কিন্তু পরে তা কেটে-শুকিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৪ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে দুনিয়ার জীবনের একটি উপমা পেশ করছেন। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষন করে ভূ-পৃষ্ঠে বিভিন্ন উদ্ভিদ, তরুলতা ও ঘন ঘন ঘাস ইত্যাদি জন্মান। এসব উদ্ভিদ থেকে কিছু রয়েছে যা মানুষ খায় এবং কিছু রয়েছে যা পশুপাখি খায়। অতঃপর যখন তা পরিপক্ক হয়, জমিন সবুজ শ্যামলে সুশোভিত হয়ে যায় ও নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে এবং আর মালিকের কাছে পূর্ণ অধিকারে চলে আসে বলে মনে করে তখন দিনে বা রাতে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এমন এক আযাব আসে যা কাটা ফসলের ন্যায় স্তুপে পরিণত করে ক্ষেত পরিষ্কার হয়ে যায়, যেন গতকালও এখানে কিছুই ছিল না। অনুরূপ এই পার্থিব জীবন, মানুষ তা সুন্দর করে সাজিয়ে তোলে, কত আশা, কত স্বপ্ন দেখে। এভাবে স্বপ্নভরা পৃথিবীটা সাজিয়ে নেয়ার পর এমন একটি দিন আসে যখন তাকে এ ধরা থেকে বিদায় নিতে হয়। তেমনি একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে এ পৃথিবীটাও, এরও কোন অস্তিত্ব থাকবে না। যেমন



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَاضْرِبْ لَهُمْ مَّثَلَ الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا كَمَا۬ءٍ أَنْزَلْنٰهُ مِنَ السَّمَا۬ءِ فَاخْتَلَطَ بِه۪ نَبَاتُ الْأَرْضِ فَأَصْبَحَ هَشِيْمًا تَذْرُوْهُ الرِّيَاحُ ط وَكَانَ اللّٰهُ عَلٰي كُلِّ شَيْءٍ مُّقْتَدِرًا)



“তাদের নিকট উপমা বর্ণনা কর পার্থিব জীবনের: তা হল পানির ন্যায় যা আমি বর্ষণ করি আকাশ হতে, যার সংমিশ্রণে মাটির গাছপালা সবুজ শ্যামল হয়ে উৎপন্ন হয়। অতঃপর সেটা বিশুষ্ক হয়ে এমন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যে, বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।” (সূরা কাহাফ ১৮:৪৫)



এরূপ উপমা বর্ণনা করে আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُه۫ ثُمَّ يَهِيْجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُوْنُ حُطَامًا ط وَفِي الْاٰخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيْدٌ لا وَّمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللّٰهِ وَرِضْوَانٌ ط وَمَا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَآ إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُوْرِ)‏



“এর উপমা বৃষ্টি, যার দ্বারা উৎপন্ন শস্য-সম্ভার কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অতঃপর ওটা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি ওটা হলুদ বর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা খড় কুটায় পরিণত হয়।” (সূরা হাদীদ ৫৭:২০)



আর আল্লাহ তা‘আলা এ সমস্ত দৃষ্টান্ত অনর্থক বর্ণনা করেননি, এ সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন উপদেশ গ্রহণ করার জন্য, দুনিয়ার ওপর আখিরাতকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য ও আখিরাতের প্রতি ঈমান আনার জন্য। আর উপদেশ কেবল তারাই গ্রহণ করে যারা জ্ঞানী অর্থাৎ যাদের দীনের বিষয়ে সার্বিক জ্ঞান রয়েছে। যেমন



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(ثُمَّ يُخْرِجُ بِه۪ زَرْعًا مُّخْتَلِفًا أَلْوَانُه۫ ثُمَّ يَهِيْجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَجْعَلُه۫ حُطَامًا ط إِنَّ فِيْ ذٰلِكَ لَذِكْرٰي لِأُولِي الْأَلْبَابِ)



“তারপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, অবশেষে তিনি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে খড়-কুটায় পরিণত করেন? অবশ্য এতে রয়েছে উপদেশ জ্ঞানীদের জন্য।” (সূরা যুমার ৩৯:২১)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়, একদিন তা শেষ হয়ে যাবে।

২. দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দেয়া যাবে না।

৩. দুনিয়াতে কেউ স্থায়ী হবে না, যতই সুন্দর করে দুনিয়াকে সাজাই সব সাজ ত্যাগ করে চলে যেতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার বাহ্যিক সৌন্দর্য, সজীবতা এবং এরপর ওর সত্বরই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন ঐ লতাপাতা ও উদ্ভিদের সাথে যাকে তিনি আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে যমীন থেকে বের করে থাকেন। এগুলো মানুষ খেয়ে থাকে। যেমন খাদ্যশস্য এবং বিভিন্ন প্রকারের ফলমূল। এগুলো শুধু মানুষেরই খাদ্য নয়, বরং চতুষ্পদ জন্তুগুলোও এর নাড়া খেয়ে থাকে। যখন যমীনের এই ধ্বংসশীল সৌন্দর্য বসন্তকালে দেখা দেয় এবং বিভিন্ন রূপের ও বর্ণের সবজিগুলো পূর্ণ সজীবতায় এসে পড়ে, তখন কৃষক ধারণা করে যে, ফসল কেটে নেবে এবং ফল পেড়ে নেবে। এমতাবস্থায় অকস্মাৎ ওর উপর বিদ্যুৎ অথবা ঘূর্ণিঝড় এসে গেল। ফলে গাছের সমস্ত পাতা শুকিয়ে জ্বলে গেল এবং ফুল-ফল যত কিছু ছিল সমস্তই ধ্বংস হয়ে গেল। আর ওর সজীবতা ও শ্যামলতার পরে ওটা শুষ্ক কাঠের ঢেরিতে পরিণত হলো। মনে হলো যেন ওটা কখনো সজীব ও সবুজ শ্যামল ছিলই না এবং কৃষককে এরূপ নিয়ামত কখনো দেয়াই হয়নি। এ জন্যেই হাদীসে এসেছে- দুনিয়াবাসীকে নিয়ামত দান করা হয়ে থাকে । অতঃপর তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয় এবং জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “তুমি কখনো শান্তি লাভ করেছিলে কি?” সে উত্তরে বলেঃ “না, কখনই না।” অন্য একটি লোক এমন হয় যে, সে দুনিয়ায় বড়ই শাস্তি ও কষ্ট ভোগ করেছে। অতঃপর তাকে জান্নাতে পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “তুমি কখনো কোন কষ্ট ভোগ করেছিলে কি?” সে জবাবে বলেঃ “না, কখনই না। আল্লাহ পাক ঐ ধ্বংসপ্রাপ্ত লোকদের সম্পর্কে বলেনঃ “তারা তাদের বাসভূমিতে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে যে, তারা যেন সেখানে কখনো বাসই করেনি।”

ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ এই ভাবেই আমি আয়াতগুলোকে বিশদরূপে বর্ণনা করি এমন লোকদের জন্যে যারা চিন্তা ভাবনা করে থাকে। মানুষ যেন এই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে যে, দুনিয়া খুবই তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যাবে। দুনিয়ার উপর ক্ষমতা প্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও দুনিয়া তার সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছে। যে ব্যক্তি দুনিয়ার দিকে অগ্রসর হয়, দুনিয়া তার থেকে পলায়ন করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দুনিয়ার দিক থেকে পলায়ন করে, দুনিয়া তার পায়ের উপর এসে পতিত হয়। আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়ার দৃষ্টান্ত উদ্ভিদের সাথে কুরআন কারীমের অন্য জায়গাতেও দিয়েছেন। সূরায়ে কাহাফে তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তাদের কাছে পার্থিব জীবনের অবস্থা বর্ণনা কর যে, তা এরূপযেমন, আমি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করি তৎপর তার সাহায্যে যমীনের উদ্ভিদসমূহ ঘন সন্নিবেশিত হয়ে যায়, অতঃপর তা (শুকিয়ে) চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় যে, বায়ু তা উড়িয়ে নিয়ে ফিরে (দুনিয়ার অবস্থাও দ্রুপ)। আর আল্লাহ্ প্রত্যেক বস্তুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।” (১৮:৪৫) অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা সূরায়ে যুমারে ও সূরায়ে হাদীদে পার্থিব দুনিয়ার দৃষ্টান্ত ওরই সাথে প্রদান করেছেন।

হারিস ইবনে হিশাম (রঃ) বর্ণনা করেছেন, আমি মারওয়ান ইবনে হাকাম (রাঃ)-কে মিম্বরের উপর পড়তে শুনেছিঃ (আরবী) অর্থাৎ “তা (যমীন) শোভনীয় হয়ে উঠলো, আর এর মালিকরা মনে করলো যে, তারা এখন এর উপর পূর্ণ অধিকার লাভ করেছে, (এমন সময় সারা ক্ষেত ধ্বংস হয়ে গেল) শুধু এর মালিকদের পাপের কারণেই তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমি যা পাঠ করলাম তা কিন্তু মাসহাফে নেই। তখন আব্বাস ইবনে আব্দিল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন যে, ঐ রূপই। ইবনে আব্বাস (রাঃ) পাঠ করে থাকেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট লোক। পাঠিয়ে তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) আমাকে এরূপই পড়িয়েছেন।” এ কিরআতটি গারীবই বটে। মনে হয়। এটা যেন তাফসীরে বেশী করে দেয়া হয়েছে। (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

(আরবী) আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার নশ্বরতা ও জান্নাতের প্রতি উৎসাহ প্রদানের বর্ণনার পর এখন জান্নাতের দিকে আহ্বান করছেন এবং ওটাকে ‘দারুস সালাম' বলে আখ্যায়িত করছেন। অর্থাৎ জান্নাত হচ্ছে সমস্ত বিপদ-আপদ ও ক্ষয়-ক্ষতি থেকে আশ্রয় লাভের স্থান।

আবূ কালাবা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে বলা হয়- আপনার চক্ষু যেন ঘুমিয়ে থাকে, অন্তর যেন (জেগে জেগে) বুঝতে থাকে এবং কর্ণ যেন শ্রবণ করতে থাকে। সুতরাং আমার চক্ষু ঘুমিয়ে গেল, আমার অন্তর বুঝতে থাকলো এবং আমার কর্ণ শুনতে থাকলো। অতঃপর আমাকে বলা হলোঃ (আপনার দৃষ্টান্ত এইরূপ) যেমন একজন নেতা একটা ঘর নির্মাণ করলো ও ওর মধ্যে ভোজের ব্যবস্থা করলো। তারপর (লোকদেরকে দাওয়াত করার জন্যে) একজন দাওয়াতকারীকে পাঠালো। অতএব, যে ব্যক্তি তার দাওয়াত কবুল করলো সে ঘরে প্রবেশ করে খাদ্য গ্রহণ করলো এবং নেতা তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি দাওয়াত কবুল করলো না সে ঘরেও প্রবেশ করলো না ও খাবারও খেলো না এবং নেতা তার উপর সন্তুষ্টও হলো না। নেতা হলেন আল্লাহ, ঘর হলো ইসলাম, খাদ্য হলো জান্নাত এবং দাওয়াতকারী হলেন মুহাম্মাদ (সঃ)।” এ হাদীসটি মুরসাল। (হাদীসের বর্ণনাকারী কোন তাবেয়ী যদি সাহাবীকে বাদ দিয়ে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তবে ঐ হাদীসকে মুরসাল বলে)

জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট বেরিয়ে আসলেন এবং বললেনঃ “আমি স্বপ্নে দেখি যে, জিবরাঈল (আঃ) আমার মাথার কাছে রয়েছেন এবং মীকাঈল (আঃ) রয়েছেন আমার পায়ের কাছে। তাদের একজন স্বীয় সাথীকে বলছেন- এই (ঘুমন্ত ব্যক্তির একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করুন।' তখন তিনি বললেন- “(হে ঘুমন্ত ব্যক্তি!) আপনি শ্রবণ করুন! আপনার কান শুনছে, আপনার অন্তর (জেগে জেগে) অনুধাবন করছে। আপনার দৃষ্টান্ত ও আপনার উম্মতের দৃষ্টান্ত হচ্ছে একজন বাদশাহ্র দৃষ্টান্তের মত, যিনি একটি ঘর বানিয়েছেন এবং তাতে একটি বড় কক্ষ তৈরী করেছেন। আর তাতে বিছিয়ে দিয়েছেন (খাদ্যের) দস্তরখানা। তারপর তার খাদ্য খাওয়াবার জন্যে একজন দূতকে পাঠিয়ে দিয়েছেন লোকজনকে ডেকে আনতে। সুতরাং কেউ কেউ ঐ দূতের আহ্বানে সাড়া দিলো এবং কেউ কেউ সাড়া দিলো না, বরং তা প্রত্যাখ্যান করলো। বাদশাহ হচ্ছেন আল্লাহ, ঘর হচ্ছে ইসলাম, কক্ষ হচ্ছে জান্নাত এবং হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনি হচ্ছেন দূত। অতএব, যে ব্যক্তি আপনার আহ্বানে সাড়া দিলো সে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করলো। আর যে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করলো সে জান্নাতে প্রবেশ করলো এবং যে জান্নাতে প্রবেশ করলো সে ওর থেকে (খাদ্য) ভক্ষণ করলো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আবু দারদা (রাঃ) হতে মারফু' রূপে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন সূর্য উদিত হয় তখনই ওর দু’দিকে দু’জন ফিরিশতা থাকেন এবং তারা উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়ে থাকেন, যে ডাক দানব ও মানব ছাড়া সবাই শুনতে পায়। তারা ডাক দিয়ে বলেন- হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দিকে ধাবিত হও। যদি কম পাওয়া যায় এবং তা যথেষ্ট মনে করা হয় তবে ঐ কম ঐ বেশী অপেক্ষা উত্তম যা (আল্লাহর স্মরণ থেকে) ভুলিয়ে রাখে।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।