আল কুরআন


সূরা ইউনুস (আয়াত: 23)

সূরা ইউনুস (আয়াত: 23)



হরকত ছাড়া:

فلما أنجاهم إذا هم يبغون في الأرض بغير الحق ياأيها الناس إنما بغيكم على أنفسكم متاع الحياة الدنيا ثم إلينا مرجعكم فننبئكم بما كنتم تعملون ﴿٢٣﴾




হরকত সহ:

فَلَمَّاۤ اَنْجٰهُمْ اِذَا هُمْ یَبْغُوْنَ فِی الْاَرْضِ بِغَیْرِ الْحَقِّ ؕ یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اِنَّمَا بَغْیُکُمْ عَلٰۤی اَنْفُسِکُمْ ۙ مَّتَاعَ الْحَیٰوۃِ الدُّنْیَا ۫ ثُمَّ اِلَیْنَا مَرْجِعُکُمْ فَنُنَبِّئُکُمْ بِمَا کُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ ﴿۲۳﴾




উচ্চারণ: ফালাম্মাআনজা-হুম ইযা-হুম ইয়াবগুনা ফিল আরদিবিগাইরিল হাক্কি ইয়াআইয়ুহান্নাছুইন্নামা-বাগইউকুম ‘আলাআনফুছিকুম মাতা-‘আল হায়া-তিদদুনইয়া-ছু ম্মা ইলাইনামারজি‘উকুম ফানুনাব্বিউকুম বিমা-কুনতুম তা‘মালূন।




আল বায়ান: অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে নাজাত দেন, তখন তারা অন্যায়ভাবে যমীনে সীমালঙ্ঘন করে। হে মানুষ, তোমাদের সীমালঙ্ঘন তোমাদের বিরুদ্ধেই, এ সব কিছু দুনিয়ার ভোগ। অতঃপর আমার নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। সুতরাং তখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানাব।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৩. অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে বিপদমুক্ত করেন তখন তারা যমীনে অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন করতে থাকে(১)। হে মানুষ! তোমাদের সীমালঙ্ঘন কেবলমাত্র তোমাদের নিজেদের প্রতিই হয়ে থাকে(২); দুনিয়ার জীবনের সুখ ভোগ করে নাও(৩), পরে আমাদেরই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমরা তোমাদেরকে জানিয়ে দেব তোমরা যা করতে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর যেমনই তিনি তাদেরকে বাঁচিয়ে দেন, তখন তারা অন্যায়ভাবে যমীনে বিদ্রোহী আচরণ শুরু করে দেয়। ওহে মানুষ! তোমাদের এ বিদ্রোহ তো (প্রকৃতপক্ষে) তোমাদের নিজেদেরই বিপক্ষে, অস্থায়ী দুনিয়ার আনন্দ সামগ্রী মাত্র। অতঃপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে, তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব তোমরা যা কিছু করছিলে।




আহসানুল বায়ান: (২৩) অতঃপর যখনই আল্লাহ তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখনই তারা ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করতে থাকে।[1] হে লোক সকল! (শুনে রাখ) তোমাদের বিদ্রোহাচরণ তোমাদেরই (জন্য ক্ষতিকর) হবে,[2] (এ হল) পার্থিব জীবনের উপভোগ্য, তারপর আমারই দিকে তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের যাবতীয় কৃতকর্ম জানিয়ে দেব।



মুজিবুর রহমান: অতঃপর যখনই মা‘বূদ তাদেরকে উদ্ধার করেন তখনই তারা ভূপৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করতে থাকে। হে লোক সকল! (শুনে রেখ), তোমাদের বিদ্রোহাচরণ তোমাদেরই (প্রাণের) জন্য বিপদ হবে, পার্থিব জীবনে (এটা দ্বারা কিছু ফল) ভোগ করে নাও, অতঃপর আমারই কাছে তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে, অতঃপর আমি তোমাদের যাবতীয় কৃতকর্ম তোমাদেরকে জানিয়ে দিব।



ফযলুর রহমান: কিন্তু তিনি যখন তাদেরকে (বিপদ থেকে) রক্ষা করেন, অমনি তারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি (শুরু) করে। হে মানুষ! তোমাদের বাড়াবাড়ি কেবল তোমাদের নিজেদেরই ক্ষতি করবে। পার্থিব জীবনের (ক্ষণস্থায়ী) ভোগ (করতে পার)! তারপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন (অবধারিত)। তখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্মসমূহ অবহিত করব।



মুহিউদ্দিন খান: তারপর যখন তাদেরকে আল্লাহ বাঁচিয়ে দিলেন, তখনই তারা পৃথিবীতে অনাচার করতে লাগল অন্যায় ভাবে। হে মানুষ! শোন, তোমাদের অনাচার তোমাদেরই উপর পড়বে। পার্থিব জীবনের সুফল ভোগ করে নাও-অতঃপর আমার নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন আমি বাতলে দেব, যা কিছু তোমরা করতে।



জহুরুল হক: তারপর তিনি যখন তাদের উদ্ধার করেন, দেখো! তারা পৃথিবীতে দৌরা‌ত্ম্য শুরু করে অন্যায়ভাবে। ওহে মানবগোষ্ঠি! তোমাদের দৌরা‌ত্ম্য বস্তুতঃ তোমাদেরই বিরুদ্ধে, দুনিয়ার জীবনের সামান্য উপভোগ, তারপর আমাদেরই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন, তখন আমরা তোমাদের জানিয়ে দেবো যা তোমরা করে চলেছিলে।



Sahih International: But when He saves them, at once they commit injustice upon the earth without right. O mankind, your injustice is only against yourselves, [being merely] the enjoyment of worldly life. Then to Us is your return, and We will inform you of what you used to do.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৩. অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে বিপদমুক্ত করেন তখন তারা যমীনে অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন করতে থাকে(১)। হে মানুষ! তোমাদের সীমালঙ্ঘন কেবলমাত্র তোমাদের নিজেদের প্রতিই হয়ে থাকে(২); দুনিয়ার জীবনের সুখ ভোগ করে নাও(৩), পরে আমাদেরই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমরা তোমাদেরকে জানিয়ে দেব তোমরা যা করতে।


তাফসীর:

(১) এর সমার্থে আরো আয়াত দেখুন, সূরা আল-ইসরাঃ ৬৭।


(২) অর্থাৎ তোমাদের অন্যায়-অনাচারের বিপদ তোমাদেরই উপর পড়ছে। এতে বুঝা যাচ্ছে, যুলুমের কারণে বিপদ অবশ্যম্ভাবী এবং দুনিয়াতেও তা ভোগ করতে হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ অন্যায়-অনাচার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তি আখেরাতের পূর্বে দুনিয়াতেই আল্লাহর পক্ষ থেকেই প্রাপ্ত হওয়া উপযুক্ত। তদুপরি আখেরাতে তার শাস্তি তো রয়েছেই। [আবু দাউদঃ ৪৯০২, তিরমিযীঃ ২৫১১, ইবনে মাজাহঃ ৪২১১] অন্য এক হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ দুটি গোনাহর শাস্তি তাড়াতাড়ি দেয়া হয়, দেরী করা হয় না। অন্যায়-অনাচার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা। [মুসনাদে আহমাদঃ ৫/৩৬, বুখারী আদাবুল মুফরাদঃ ৮৯৫, হাকেম মুস্তাদরাকঃ ৪/১৭৭]

তাছাড়া হাদীসে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “সীমালঙ্ঘন বা যুলুম করো না, আল্লাহ যুলুমকারীকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের যুলুম তো তোমাদের নিজের নফস বা আত্মার উপরই।” [মুস্তাদরাকে হাকেমঃ ২/৩৩৮]


(৩) এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে। এক. তোমাদের সীমালঙ্ঘন তো দুনিয়ার ভোগ অর্জনের জন্যই। দুই. সীমালঙ্ঘন করে তোমরা দুনিয়ার ভোগ অর্জন করতে পারবে। তিন. তোমাদের সীমালঙ্ঘনের মাধ্যমে কেবল দুনিয়ার জীবনের সময়টুকুতেই উপকৃত হতে পারবে। চার. তোমরা যে সীমালঙ্ঘন করছ তার উদাহরণ হচ্ছে দুনিয়ার জীবনে ভোগ অর্জনের মত। [ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৩) অতঃপর যখনই আল্লাহ তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখনই তারা ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করতে থাকে।[1] হে লোক সকল! (শুনে রাখ) তোমাদের বিদ্রোহাচরণ তোমাদেরই (জন্য ক্ষতিকর) হবে,[2] (এ হল) পার্থিব জীবনের উপভোগ্য, তারপর আমারই দিকে তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের যাবতীয় কৃতকর্ম জানিয়ে দেব।


তাফসীর:

[1] এটা মানুষের সেই অকৃতজ্ঞ (নিমকহারাম) স্বভাবের বর্ণনা, যা ১২নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। তাছাড়া কুরআনের আরো বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা এর বর্ণনা দিয়েছেন।

[2] আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা অকৃতজ্ঞতা ও বিদ্রোহাচরণ করে নাও। তোমরা ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর জীবন উপভোগ করে পরিশেষে তোমাদেরকে আমার নিকটেই ফিরে আসতে হবে, তখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্মের দস্ত্তরমত শাস্তি দেব।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২২-২৩ নং আয়াতের তাফসীর:



মানুষের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি তাদেরকে জল ও স্থলের ভ্রমণ করা সহজ করে দিয়েছেন। স্থলভাগে অর্থাৎ তিনি মানুষকে পা দিয়েছেন যার দ্বারা চলাফেরা করে, যানবাহনে চড়ে ভ্রমণ করে সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমনাগমন করতে পারে। জলভাগে অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা মানুষদেরকে নৌকা ও জলযান তৈরি করার জ্ঞান দান করেছেন। যা তৈরি করে মানুষ নদীতে বা সমুদ্রে ভ্রমণ করে, হাজার হাজার টন মালামাল বহন করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায় অথচ সে পানিতে একটি লোহার বালাও ভাসমান থাকে না। জল পথে ভ্রমণকালে যখন رِيْحٌ طَيِّبَةٌ তথা এমন বাতাস বয়ে যায় যা নৌযানের অনুকূলে এবং নিম্নগতিসম্পন্ন্ তখন মানুষ খুব খুশী হয়। পক্ষান্তরে যখনই তাদের ওপর হঠাৎ এক প্রচণ্ড প্রতিকূল বায়ু এসে পড়ে এবং চতুর্দিক থেকে ঢেউ আসতে থাকে তখন তারা মনে করে যে, বিপদ তাদেরকে পাকড়াও করে নিয়েছে, এমতাবস্থায় তারা খাঁটি বিশ্বাসের সাথে কাকুতি মিনতি করে আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকে এবং বলে আল্লাহ তা‘আলা এ বিপদ থেকে মুক্তি দিলে আর কোন দিন অন্যায় করব না, অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করব। তখন তারা কোন মূর্তিকেও ডাকে না এবং কোন বাতিল মা‘বূদকেও ডাকে না। কারণ তারাও জানে এ বিপদ থেকে তাদের বাতিল মা‘বূদেরা মুক্তি দিতে পারে না। তখন ঐ সকল শয়তানী চিন্তা-চেতনা দূর হয়ে যায়। এতে প্রথমত এ কথা বুঝা যায় মানুষের প্রকৃতিতে এক আল্লাহ তা‘আলার দিকে ফিরে যাবার প্রবণতা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। মানুষ পরিবেশে প্রভাবিত হয়ে সে প্রবণতা বা প্রকৃতিকে চাপা দিয়ে ফেলে, কিন্তু মসীবতের সময় উক্ত প্রবণতা মানব মনে স্বতঃবিকাশ লাভ করে। আরো বুঝা গেল যে তাওহীদ মানুষের প্রকৃতিগত মৌলিক বস্তু, যা থেকে মানুষের বিচ্যুত হওয়া উচিত নয়। কারণ তাওহীদ থেকে বিচ্যুত থাকা, সহজাত প্রকৃতি থেকে বিচ্যুত থাকার নামান্তর, যা সরাসরি ভ্রষ্টতা। দ্বিতীয়ত এ কথা বুঝা যায় যে মুশরিকরা যখন এরূপ বিপদে পড়ত তখন তারা তাদের তৈরি করা মা‘বূদদেরকে বাদ দিয়ে এক আল্লাহ তা‘আলার কাছে আহ্বান করত।



ইকরিমা বিন আবূ জাহল সম্পর্কে পাওয়া যায় মক্কা বিজয়ের পর তিনি মক্কা থেকে পালিয়ে যান। তিনি হাবশাহ যাবার জন্য এক নৌকায় বসেন। নৌকা সামুদ্রিক ঝড়ের মুখে পড়লে নৌকার মাঝি যাত্রীগণকে বলল যে, এখন এক আল্লাহ তা‘আলার নিকট দু’আ কর, কারণ তোমাদেরকে তিনি ছাড়া কেউ এ তুফান থেকে পরিত্রাণ দিতে পারেন না। ইকরিমা বলেন: আমি মনে মনে ভাবলাম যদি সমুদ্রের মাঝে পরিত্রাণ দাতা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা হন তাহলে অবশ্যই স্থলভাগে পরিত্রাণদাতা একমাত্র তিনিই হবেন। আর মুহাম্মাদ তো সে কথাই বলে। সুতরাং তিনি স্থির করলেন যে, যদি এখান থেকে বেঁচে যাই তাহলে মুহাম্মাদের কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করব। তিনি পরে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়ে যান। (আবূ দাঊদ হা: ২৬৮৩, সিলসিলা সহীহাহ হা: ১৭২৩)



কিন্তু পরিতাপের বিষয়! উম্মাতে মুহাম্মাদীর কিছু মানুষ রয়েছে যারা শির্কে এমনভাবে ফেঁসে গেছে যে, বালা-মসিবত ও কষ্টের সময়ও তারা আল্লাহ তা‘আলার দিকে ফিরে যাওয়া বাদ দিয়ে মৃত বুযুর্গ ব্যক্তিদেরকেই ত্রাণকর্তা মনে করে এবং তাদের কাছেই সাহায্যের জন্য আহ্বান করে। সুতরাং সতর্ক হওয়া উচিত, যেখানে মক্কার মুশরিকরা বিপদে পড়লে এক আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকত আর আমাদের কিছু মানুষ আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে মাযার, বাবা, পীর ও দরগাহ শরীফে যায়। অতঃপর যখন তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা মুক্তি দেন তখনই তারা কুফরী করে বসে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فِي الْبَحْرِ ضَلَّ مَنْ تَدْعُوْنَ إِلَّآ إِيَّاهُ ج فَلَمَّا نَجَّاكُمْ إِلَي الْبَرِّ أَعْرَضْتُمْ ط وَكَانَ الْإٍنْسَانُ كَفُوْرًا)‏



“সমুদ্রে যখন তোমাদেরকে বিপদ স্পর্শ করে তখন কেবল তিনি ব্যতীত অপর যাদেরকে তোমরা আহ্বান করে থাক তারা অন্তর্হিত হয়ে যায়; অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে আনেন তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ অতিশয় অকৃতজ্ঞ।” (সূরা ইসরা ১৭:৬৭)



তারা অন্যায় অত্যাচারে লিপ্ত হয়, জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে এবং আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে চলে না। তবে সকলের জেনে রাখা উচিত তাদের অন্যায় আচরণ, তাদের বিদ্রোহ তাদের ব্যতীত অন্য কারো কোন ক্ষতি করতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আল্লাহ তা‘আলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, এ দু‘টো এমন পাপ যে, এ কারণে আখিরাতে শাস্তি হবেই, এমনকি দুনিয়াতেও এর জন্য শাস্তি দেয়া হবে। তাদের এসমস্ত কৃতকর্মের পরও তাদের সকলকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট ফিরে যেতে হবে আর তিনি তাদেরকে তাদের আমল সম্পর্কে বলে দেবেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সকল কিছুকে ছেড়ে দিয়ে একমাত্র উপাস্য হিসেবে আল্লাহ তা‘আলাকেই আহ্বান করতে হবে, অন্য কারো উপাসনা করা যাবে না।

২. মানুষদেরকে আখিরাতে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবগত করা হবে।

৩. বিপদে-আপদে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকেই ডাকতে হবে, অন্য কারো কাছে চাইলে পাওয়া যাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২১-২৩ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন-বিপদ আপদের স্বাদ গ্রহণ করার পর মানুষ যখন আমার রহমত প্রাপ্ত হয়, যেমন দারিদ্রের পরে স্বচ্ছলতা, দুর্ভিক্ষের পরে উত্তম উৎপাদন, মুষলধারে বৃষ্টি ইত্যাদি, তখন সে হাসি-তামাশা করতে শুরু করে এবং আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। আর যখন মানুষকে বিপদ আপদে ঘিরে ফেলে তখন সে উঠতে, বসতে, শুইতে, জাগতে সর্বাবস্থাতেই প্রার্থনায় লেগে পড়ে।

সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ফজরের সালাত পড়ান। বর্ষার রাত্রি ছিল। তিনি বললেনঃ “আজকে রাত্রে আল্লাহ তা'আলা কি বলেছেন তা তোমরা জান কি?` সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) খুব ভাল জানেন।” তখন তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আজ আমার মুমিন বান্দাও সকাল করেছে এবং কাফির বান্দাও সকাল করেছে (অর্থাৎ সবাই সকালে উঠেছে)। কিন্তু যে বান্দা বলেছে যে, এই বৃষ্টির কারণ হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার অনুগ্রহ ও করুণা, সে আমার উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং তারকার প্রভাবকে অস্বীকারকারী। পক্ষান্তরে যে বান্দা এই বিশ্বাস রাখে যে, এই বৃষ্টির কারণ হচ্ছে নক্ষত্রের প্রভাব, সে আমাকে অস্বীকারকারী এবং নক্ষত্রের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী।”

আল্লাহপাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ হে রাসূল (সঃ)! তুমি এই। কাফিরদেরকে বলে দাও আমার প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলার কর্মকৌশল বড়ই কার্যকরী হয়ে থাকে। হে পাপীদের দল! তোমরা কি ধারণা করছো যে, তোমাদেরকে তোমাদের কুফরীর কারণে কোন শাস্তি দেয়া হবে না? প্রকৃতপক্ষে তোমাদেরকে ঢিল দিয়ে রাখা হয়েছে। অতঃপর যখন তোমাদের উদাসীনতা শেষ সীমায় পৌছে যাবে তখন আকস্মিকভাবে তোমাদেরকে পাকড়াও করা হবে।

আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার ফেরেশতারা তাদের কাজ কর্ম লিখতে থাকে। অতঃপর তারা তা আলেমুল গায়েব আল্লাহর নিকট পেশ করে তাকে। তারপর তিনি প্রত্যেক বড় ও ছোট পাপের শাস্তি প্রদান করেন।

এরপর মহান আল্লাহ বলেন, আল্লাহ তোমাদের জন্যে স্থলভাগ ও জলভাগের ভ্রমণ সহজ করে দিয়েছেন এবং পানির মধ্যেও তিনি তোমাদেরকে তার আশ্রয় ও হিফাজতে নিয়ে নিয়েছেন। যখন তোমরা নৌকায় আরোহণ কর এবং বাতাস নৌকা চালাতে শুরু করে, তখন তোমরা বাতাসের নিম্নগতি ও দ্রুত চালিত হওয়ার কারণে খুবই খুশী হয়ে থাকো। হঠাৎ তোমাদের উপর এক প্রচণ্ড ও প্রতিকূল বাতাস এসে পড়ে এবং প্রত্যেক দিক থেকে তোমাদের উপর তরঙ্গমালা ধেয়ে আসে। ঐ সময় তোমাদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় তোমরা খাটি বিশ্বাসের সাথে একমাত্র আল্লাহকেই ডাকতে থাকো। ঐ সময় না তোমাদের কোন প্রতিমার কথা স্মরণ হয়, না স্মরণ হয় লাত, হুবল ইত্যাদি কোন মূর্তির কথা। বরং তখন শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাকেই সম্বোধন করে থাকো। অতঃপর মহান আল্লাহ যখন তোমাদেরকে নিরাপদে সমুদ্রের তীরে পৌছিয়ে দেন তখন পুনরায় তোমরা তার থেকে বিমুখ হয়ে যাও। সত্যি, মানুষ কতই না অকৃতজ্ঞ!

এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বড়ই আন্তরিকতার সাথে আল্লাহ তা'আলাকে ডেকে বলে- হে আল্লাহ! যদি আপনি আমাদেরকে এই বিপদ হতে রক্ষা করেন তবে অবশ্যই আমরা কৃতজ্ঞ হয়ে যাবো। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন তখন তারা দেশে অন্যায় ও অবিচার করতে শুরু করে দেয়। দেখে মনে হয় যেন তারা কখনও বিপদে পড়েইনি।

ইরশাদ হচ্ছে ..... (আরবী) অর্থাৎ “হে লোক। সকল! জেনে রেখো যে, তোমাদের বিদ্রোহাচরণ তোমাদেরই প্রাণের জন্যে বিপদের কারণ হবে, এতে অন্য কারো ক্ষতি হবে না। যেমন হাদীসে এসেছেঃ “(আল্লাহর বিরুদ্ধে) বিদ্রোহ ঘোষণা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকরণ, এ দুটো এমনই পাপ যে, এ কারণে পরকালে শাস্তি হবেই, এমনকি দুনিয়াতেও সত্বর এর শাস্তি হয়ে যাবে।”

আল্লাহ পাকের উক্তিঃ ... (আরবী) অর্থাৎ “এই পার্থিব জগতে তোমরা কিছুকাল সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করবে বটে, কিন্তু এর পরেই তোমাদেরকে আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে। (আরবী) অর্থাৎ “যখন তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে তখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের সমস্ত আমল সম্পর্কে অবহিত করবো এবং ওগুলোর পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে দেয়া হবে।” যে ভাল প্রতিদান পাবে সে তত মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। আর যে শাস্তি পাবে সে নিজের নফসের উপর ভৎসনা করবে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।