সূরা ইউনুস (আয়াত: 17)
হরকত ছাড়া:
فمن أظلم ممن افترى على الله كذبا أو كذب بآياته إنه لا يفلح المجرمون ﴿١٧﴾
হরকত সহ:
فَمَنْ اَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرٰی عَلَی اللّٰهِ کَذِبًا اَوْ کَذَّبَ بِاٰیٰتِهٖ ؕ اِنَّهٗ لَا یُفْلِحُ الْمُجْرِمُوْنَ ﴿۱۷﴾
উচ্চারণ: ফামান আজলামুমিম্মানিফতারা-‘আলাল্লা-হি কাযিবান আও কাযযাবা বিআ-য়া-তিহী ইন্নাহূলা-ইউফলিহুল মুজরিমূন।
আল বায়ান: অতএব যে আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে, তার চেয়ে বড় যালিম কে ? নিশ্চয় অপরাধীরা সফল হবে না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭. অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা বা আল্লাহর আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করে তার চেয়ে বড় যালিম আর কে?(১) নিশ্চয় অপরাধীরা সফলকাম হবে না।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে যে মিথ্যা রচনা ক’রে আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয় অথবা আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করে; নিশ্চিতই অপরাধীরা সাফল্য লাভ করতে পারে না।
আহসানুল বায়ান: (১৭) অতএব সে ব্যক্তির চেয়ে অধিক অত্যাচারী কে হবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করে? নিঃসন্দেহে এমন অপরাধিগণ সফলকাম হবে না।
মুজিবুর রহমান: অতএব সেই ব্যক্তির চেয়ে অধিক অত্যাচারী (যালিম) কে যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে? নিঃসন্দেহে এমন পাপাচারীদের কিছুতেই মঙ্গল হবেনা।
ফযলুর রহমান: অতএব, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে কিংবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে? পাপীরা কখনও সফল হয় না।
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর তার চেয়ে বড় জালেম, কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করেছে কিংবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে অভিহিত করছে? কস্মিনকালেও পাপীদের কোন কল্যাণ হয় না।
জহুরুল হক: কে তবে বেশি অন্যায়কারী তার চাইতে যে আল্লাহ্ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে অথবা তাঁর নির্দেশসমূহ প্রত্যাখ্যান করে? নিঃসন্দেহ অপরাধীরা সফলকাম হবে না।
Sahih International: So who is more unjust than he who invents a lie about Allah or denies His signs? Indeed, the criminals will not succeed
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৭. অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা বা আল্লাহর আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করে তার চেয়ে বড় যালিম আর কে?(১) নিশ্চয় অপরাধীরা সফলকাম হবে না।(২)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ তার চাইতে বড় যালেম আর কেউ নেই যে আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করে এবং তাঁর বাণী পরিবর্তন করে। আর তিনি যা নাযিল করেছেন তার সাথে কোন কিছু যোগ করে দেয়। অনুরূপভাবে তোমাদের থেকে বড় যালেমও আর কেউ হবে না যদি তোমরা কুরআনকে অস্বীকার কর এবং আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দাও এবং বল যে, এটা আল্লাহর কালাম নয়। এটাই আল্লাহ তা'আলা তার রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তিনি তাদেরকে এটা জানিয়ে দেন। [কুরতুবী]
(২) অর্থাৎ যারা আল্লাহর উপর মিথ্যাচার করে তারা কখনো সফলকাম হবে না। তাদের কর্মকাণ্ড মানুষের কাছে মিথ্যা হিসেবে বিবেচিত হবেই। মূলত: নবী সত্য বা মিথ্যা এটা জানার বিভিন্ন পদ্ধতি বিদ্যমান। তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, দু'জনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, কথাবার্তা, চাল-চলন ইত্যাদি তুলনা করা। বিবেকবান মাত্রই এ কাজটি সহজে করতে পারে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মুসাইলামা কাযযাবের কোন তুলনা কি চলে? আমর ইবনে আস একবার মুসাইলামার কাছে গেল। মুসাইলামা তার পুরাতন বন্ধু ছিল। আমর তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। তখন মুসাইলামা তাকে জিজ্ঞাসা করলঃ হে আমর! তোমাদের লোকের (অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর) উপর এ সময়ে কি নাযিল হয়েছে? আমর ইবনে আস জবাবে বললঃ আমি তার সাথীদের একটি সূরা পড়তে শুনেছি।
মুসাইলামা বললঃ সেটা কি? আমর বললঃ (وَالْعَصْرِ ٭ إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ ٭ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ) সূরাটি শুনে মুসাইলামা কিছুক্ষণ চিন্তা করতে থাকলো, তারপর বললোঃ আমার উপরও অনুরূপ নাযিল করা হয়েছে। আমর বললোঃ সেটা কি? সে বললঃ يَاوَبَرَ إنَّهَا أنْتَ أُذْنَانِ وَصَدَرُ وَسَائِرُكَ حَقْرٌ نَقْرٌ তারপর মুসাইলামা বাহাদুরী নেয়ার আশায় আমরের দিকে তাকিয়ে বললোঃ আমর! কেমন লাগলো? তখন আমর বললোঃ আল্লাহর শপথ করে বলছি, তুমি অবশ্যই এটা জানো যে, আমি জানি, তুমি মিথ্যা বলছ। [ইবন কাসীর; ইবন রাজাব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম: ১১২] এটাই যদি একজন কাফেরের বিশ্লেষণ তাহলে মুমিন কত সহজেই সত্য নবী ও মিথ্যা নবীর মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে তা বলাই বাহুল্য।
অপরদিকে আমরা সত্য নবীর ব্যাপারেও তার সততার সাক্ষ্য খুব সহজভাবেই দেখতে পাই। আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম বলেনঃ “যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমণ করলেন তখন লোকেরা চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসলো। আমিও তাদের সাথে আসার পর যখন আমি তাকে দেখলাম তখনি বুঝতে পারলাম যে, তার চেহারা কোন মিথ্যুক লোকের চেহারা নয়। তখন আমি প্রথম যে কথা কয়টি শুনেছিলাম তা হলোঃ হে মানব সম্প্রদায়! সালামের প্রসার কর, খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখো এবং রাতে মানুষেরা যখন ঘুমন্ত থাকে তখন সালাত আদায় কর, ফলে তোমরা প্রশান্তির সাথে বা সালামের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে”। [মুস্তাদরাকে হাকেমঃ ৪২৮৩]।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৭) অতএব সে ব্যক্তির চেয়ে অধিক অত্যাচারী কে হবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করে? নিঃসন্দেহে এমন অপরাধিগণ সফলকাম হবে না।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৫-১৮ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা আখেরাতের প্রতি অবিশ্বাসকারীদের একটি ভ্রান্ত ধারণা ও অন্যায় আবদারের জবাব দিয়েছেন। এসব লোকেরা না জানত আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে, না ওয়াহী ও রিসালাত সম্পর্কে। তারা নাবী-রাসূলগণের আনীত কিতাবকে সাধারণ কিতাবের মত মনে করত। রাসূলগণ যখনই কোন আয়াত তেলাওয়াত করতেন তখন তা তাদের মনোঃপুত না হলে সে বিষয় তারা মানত না। তারা রাসূলগণকে বলত, এ কুরআন যেহেতু তুমি নিয়ে এসেছ সেহেতু তুমি এটি পরিবর্তন করে অন্য কুরআন নিয়ে আস অথবা এই কুরআনে যা হালাল রয়েছে তা হারাম কর আর যা হারাম রয়েছে তা হালাল কর। অন্যথায় আমরা তা মানব না। অথচ তারা এ কথাও জানত যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোন কিছু লিখতে, পড়তে জানতেন না। আর তাঁর দ্বারা এটা পরিবর্তনও সম্ভব নয়।
কারণ প্রথমত, তিনি হচ্ছেন একজন উম্মী নাবী, দ্বিতীয় এতে যদি কোন কিছু পরিবর্তন করা হয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাকেও আখিরাতে কঠিন শাস্তি দেবেন। সুতরাং এ সমস্ত কথা জেনে শুনেও তারা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি, রাসূলদের প্রতি মিথ্যা আরোপ করত, তারা আখিরাতে আল্লাহ তা‘আলার সাক্ষাতকে অস্বীকার করত, পুনরুত্থান দিবসকে অস্বীকার করত। আর তারা জেনে শুনে আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে বিভিন্ন বাতিল মা‘বূদদের উপাসনা করত। তারা রাসূলের তাওহীদের দাওয়াতকে মানত না। অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুওয়াত লাভের পূর্বে তাদের মধ্যে প্রায় দীর্ঘ ৪০ বছর অতিবাহিত করেছেন। তারা তার সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা সম্পর্কেও অবগত ছিল। যেমন
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(أَمْ لَمْ يَعْرِفُوْا رَسُوْلَهُمْ فَهُمْ لَه۫ مُنْكِرُوْنَ)
“অথবা তারা কি তাদের রাসূলকে চিনে না যার ফলে তাকে অস্বীকার করে?” (সূরা মূ‘মিনুন ২৩:৬৯)
হিরাকল আবূ সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করেছিল: তোমাদের কাছে তিনি মিথ্যা বলেছেন, এরূপ কোন প্রমাণ আছে? আবূ সুফিয়ান উত্তরে বললেন, না। আবূ সুফিয়ান তখন কাফিরদের নেতা ও সরদার, তারপরেও নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সত্যবাদিতার কথা স্বীকার করতেই হল। হিরাকল মন্তব্য করে বলেছিল: মানুুষের ব্যাপারে যিনি কখনো মিথ্যা বলেননি, আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে তিনি কিভাবে মিথ্যা বলতে পারেন? (সহীহ বুখারী হা: ৭)
তারা এ সমস্ত কথা জানা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এই কুরআন পরিবর্তন করতে বলত, অথচ তা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَإِذَا بَدَّلْنَآ اٰيَةً مَّكَانَ اٰيَةٍ لا وَّاللّٰهُ أَعْلَمُ بِمَا يُنَزِّلُ)
“আমি যখন এক আয়াতের পরিবর্তে অন্য এক আয়াত উপস্থিত করি আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন তা তিনিই ভাল জানেন।” (সূরা নাহল ১৬:১০১)
সুতরাং যারা সত্য জানার পরেও আল্লাহ তা‘আলার ওপর মিথ্যারোপ করবে অথবা আল্লাহ তা‘আলার কোন আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে তাদের চেয়ে অধিক জালিম আর কেউ হতে পারে না।
আর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী মুশরিকরা এমন জিনিসের উপাসনা করে যা তাদের কোন উপকার করতে পারে না এবং অপকারও করতে পারে না। তারা এমন উপাস্য যে, যারা তাদের নিজেদেরই কোন কিছু রদবদল করতে পারে না, অথচ তাদের ধারণা যে, আমরা যদি তাদের ইবাদত করি তাহলে তারা আমাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার দরবারে শাফা‘আত করবে। অথচ আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ব্যতীত কেউ তাঁর সামনে সেদিন কথাই বলতে পারবে না। এ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার ২৫৫ নং আয়াতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং তারা যে বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যান্য বাতিল মা‘বূদের ইবাদত করে সে বিশ্বাস ও কর্ম কোন উপকারে আসবে না। বরং তারা ও তাদের মা‘বূদেরা সবাই জাহান্নামে যাবে।
আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়:
১. নাবী, রাসূল ও রিসালাত সম্পর্কে সঠিক আক্বীদা পোষণ করতে হবে।
২. আখিরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করা যাবে না।
৩. যে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে সে সবচেয়ে বড় অত্যাচারী।
৪. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কারো ইবাদত করা যাবে না।
৫. আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ব্যতীত কেউ শাফা‘য়াত করতে পারবে না।
৬. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কেউ ক্ষতি ও উপকার করার মালিক নেই।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা বড় অত্যাচারী ও অবাধ্য আর কে হতে পারে যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে, তার ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলে এবং ঝুটমুট এই দাবী করে বসে যে, সে আল্লাহ হতে প্রেরিত? এই ব্যক্তি অপেক্ষা বড় অপরাধী ও গুনাহগার আর কেউ হতে পারে কি? এ কথা তো কোন স্থূলবুদ্ধি সম্পন্ন ও বোকা লোকের কাছেও গোপনীয় নয়। তাহলে বুদ্ধিমান ও নবীদের কাছে কিভাবে এটা গোপন থাকতে পারে। যে ব্যক্তি নবুওয়াতের দাবী করে সে সত্যবাদী হাক বা মিথ্যাবাদী হাক, আল্লাহ তার সুকর্ম ও কুকর্মের উপর দলীল কায়েম করে থাকেন যা সূর্যের চেয়েও অধিক প্রকাশমান। সুতরাং যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ (সঃ) ও মুসাইলামা কাযযাবকে দেখেছে সে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য ঠিক এভাবেই করতে পারবে যেভাবে দিনের আলো ও রাত্রির অন্ধকারের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। এখন দু’জনের স্বভাব-চরিত্র, কার্যাবলী এবং কথাবার্তার মধ্যে তুলনা করলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে যে, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কথা ও কাজের মধ্যে কি পরিমাণ সততা ও সত্যবাদিতা ছিল, আর মুসাইলামা কাযযাব সাজাহ এবং আসওয়াদ আনসারীর মধ্যে কি পরিমাণ মিথ্যা ও বেঈমানী ছিল।
আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদীনায় আগমন করেন তখন জনগণ তার আগমনে খুবই খুশী ছিল। তার আগমনে যারা খুশী হয়েছিল আমিও ছিলাম তাদের মধ্যে একজন। আমি যখন প্রথমবার তাঁকে দেখি তখনই আমার অন্তর এই সাক্ষ্য দেয় যে, কোন মিথ্যাবাদী লোকের চেহারা এমন নূরানী (আলোকময়) কখনই হতে পারে না। আমি সর্বপ্রথম তার মুখে যে কথা শুনি তা ছিল নিম্নরূপঃ
“হে লোক সকল! তোমরা পরস্পর একে অপরকে সালাম করবে, তার সফলতার জন্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে, গরীব ও ক্ষুধার্তদেরকে পেট পুরে খাওয়াবে, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবে এবং রাত্রে উঠে সালাত আদায় করবে যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে তোমরা নিঃসন্দেহে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
যমান ইবনে সা'লাবা (রাঃ) তাঁর গোত্র বানু সাদ ইবনে বকরের পক্ষ হতে প্রতিনিধি হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাকে বলেনঃ “আচ্ছা বলুন তো, এই আকাশকে কে এমন উঁচু করে সৃষ্টি করেছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ।” এরপর লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “ কে এই পাহাড়কে এমনভাবে যমীনে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন?” উত্তরে নবী (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ।” লোকটি আবার প্রশ্ন করেনঃ “এই যমীনকে কে বিছিয়ে রেখেছেন?” নবী (সঃ) জবাবে বলেনঃ “আল্লাহ।” লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করেনঃ “আপনাকে ঐ সত্তার কসম দিয়ে বলছি যিনি ঐ উঁচু আকাশ বানিয়েছেন, এই বড় বড় পাহাড়গুলো যমীনে গেড়ে দিয়েছেন এবং এতো বড় ও প্রশস্ত যমীন ছড়িয়ে দিয়েছেন, তিনিই কি আপনাকে সমস্ত মানুষের জন্যে রাসূল করে পাঠিয়েছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, ঐ আল্লাহরই কসম যে, তিনিই আমাকে পাঠিয়েছেন।” অতঃপর লোকটি নবী (সঃ)-কে আল্লাহর কসম দিয়ে সালাত, যাকাত, হজ্ব এবং সাওমের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং নবীও (সঃ) আল্লাহর কসম খেয়ে খেয়ে উত্তর দিতে থাকেন। তখন লোকটি নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “আপনি সত্য বলেছেন। যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন সেই সত্তার কসম করে বলছি যে, আমি এর উপর বেশীও করবো না কমও করবো না। বরং সঠিকভাবে এর উপরই আমল করবো।” সুতরাং এই পরিমাণ আমলই তার জন্যে যথেষ্ট হয়ে যায় এবং তিনি নবী (সঃ)-এর সত্যতার উপর ঈমান আনয়ন করেন। কেননা, তিনি দলীল প্রমাণাদি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। হাসসান ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘যদি তাঁর কাছে সুস্পষ্ট দলীল প্রমাণাদি নাও থাকতো তথাপি তার চেহারার পবিত্রতা, সরলতা এবং অকপটতা স্বয়ং তাঁর সততা ও সত্যবাদিতার দলীল ছিল।”
কিন্তু মুসাইলামা কাযাবকে চক্ষুষ্মনদের যে কেউ দেখেছেন, তিনিই তার অশ্লীল কথন, দুষ্কার্য এবং তার নবুওয়াতের দাবীর ভন্ডামি দেখে যা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে, এই ফলাফল পেয়ে গেছেন যে, সে কিরূপ নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার ছিল! আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ (এইরূপ যে) তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য নেই; তিনি চিরঞ্জীব, সংরক্ষণকারী । না তন্দ্রা তাঁকে আচ্ছন্ন করতে পারে, আর না নিদ্রা।” (২:২৫৫) আর মুসাইলামার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে ব্যাঙসমূহের সন্তান ব্যাঙ! তুমি আর কত ঘেনর ঘেনর করবে? তুমি এর দ্বারা পানিও ঘোলা করতে পারবে না এবং পানি পানকারীও পান করা থেকে বিরত থাকবে না।” ঐ যালিমের আর একটা অহী হচ্ছে, (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তাআলা গর্ভবতী নারীর উপর বড় রকমের ইহসান করেছেন যে, অন্ত্রের মধ্য হতে একটি জীবন্ত আত্মা বের করেছেন। তার আরো উক্তি হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ “হাতী, হাতী কি? তুমি কি জান হাতী কি? ওর রয়েছে ছোট লেজ ও লম্বা শুড়। আরো বলেছে- (আরবী) অর্থাৎ “আটা খমীরকারিণীদের শপথ! রুটী তৈরীকারিণীদের শপথ! তরকারী ও ঘিয়ে খাবারের গ্রাস ডুবিয়ে ভক্ষণকারিণীদের শপথ! কুরায়েশরা খুবই সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। এখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র অহী এবং ঐ মিথ্যাবাদীর বাজে ও অশ্লীল কথার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, শিশুরাও তার কথা শুনে বিদ্রুপ করবে। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা তাকে লাঞ্ছিত করেছেন এবং হাদীকার দিন তাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। তার সঙ্গী সাথীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং তার উপর লা'নত বর্ষিত হয়। তার লোকেরা তাওবা করে সিদ্দীকে আকবর (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে এবং ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে শুরু করে। ঐ সময় তিনি তাদেরকে বলেনঃ “মুসাইলামার কোন কুরআন শুনাও তো দেখি।” তখন তারা তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু তিনি নাছোড় হয়ে যান এবং তাদেরকে বলেনঃ “অবশ্যই তোমাদেরকে শোনাতে হবে, যাতে অন্যেরাও শুনে নেয় এবং তারা এই কথাগুলো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অহীর সাথে তুলনা করে অহীর শ্রেষ্ঠত্ব ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে।” তখন তারা মুসাইলামার ঐ কথাগুলো শুনিয়ে দেয় যা আমরা উপরে নকল করেছি। তখন আবু বকর (রাঃ) তাদেরকে বলেনঃ “ওরে হতভাগ্যের দল! তোমাদের জ্ঞান ও বিবেক কোন দিকে গিয়েছিল? আল্লাহর শপথ! এরূপ কথা তো কোন নির্বোধের মুখ দিয়েও বের হবে না।”
কথিত আছে যে, অজ্ঞতার যুগে আমর ইবনুল আস (রাঃ) মুসাইলামার নিকট গমন করেন। সে তার বন্ধু ছিল। তখন পর্যন্ত আমর ইবনুল আস (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেননি। মুসাইলামা তাঁকে জিজ্ঞেস করেঃ “হে আমর! আপনাদের লোকের উপর (অর্থাৎ মুহাম্মাদ সঃ-এর উপর) এখন কি অহী অবতীর্ণ হয়েছে?” উত্তরে ইবনুল আস (রাঃ) বলেনঃ “আমি তাঁর সঙ্গীদেরকে এক ব্যাপক অথচ সংক্ষিপ্ত সূরা পাঠ করতে শুনেছি।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ সেটা কি?” আমর (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ (আরবী) (শেষ পর্যন্ত)! মুসাইলামা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললোঃ “আমার উপরও এমনি এক অহী অবতীর্ণ হয়েছে।” আমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘সেটা কি? সে জবাবে বললোঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে অবর, হে অবর (এক প্রকার জন্তু) তোমার দু'টি কান ও একটি বক্ষ প্রতীয়মান হচ্ছে, এ ছাড়া তোমার সারা দেহই বাজে।` অতঃপর সে আমার (রাঃ)-কে বললোঃ “হে আমর (রাঃ)! আমার অহী কেমন মনে হলো?` আমর ইবনুল আস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আপনিতো নিজেও জানছেন যে, আপনার অহী যে মিথ্যা এতে আমার কোনই সন্দেহ নেই।` যখন একজন মুশরিকেরও এই অবস্থা যে, নবী (সঃ)-এর সত্যবাদী হওয়া ও মুসাইলামার মিথ্যাবাদী হওয়া তার কাছেও গোপনীয় নয়, তখন চক্ষুষ্মনদের কাছে এটা কিরূপে গোপন থাকতে পারে? তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা বড় অত্যাচারী আর কে হতে পারে যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে অথবা বলে- আমার উপর অহী করা হয়েছে, অথচ তার উপর কিছুই অহী করা হয়নি, আর বলে- আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন অনুরূপ আমিও অবতীর্ণ করতে পারি?` (৬:৯৩) আর এই আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুতরাং ঐ ব্যক্তির চেয়ে অধিক অত্যাচারী কে হবে যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে, অথবা তার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে? নিশ্চয়ই এমন পাপাচারীদের কিছুতেই মঙ্গল হবে না। অনুরূপভাবে ঐ ব্যক্তিও বড় অত্যাচারী যে ব্যক্তি ঐ সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, যে সত্য রাসূলগণ আনয়ন করেছেন এবং ওর উপর দলীল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন হাদীসে এসেছেঃ “আল্লাহর নিকট ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বড় যালিম ও দুর্ভাগা যে ব্যক্তি কোন নবীকে হত্যা করেছে অথবা কোন নবী তাকে হত্যা করেছেন।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।