সূরা আল-কাউসার (আয়াত: 3)
হরকত ছাড়া:
إن شانئك هو الأبتر ﴿٣﴾
হরকত সহ:
اِنَّ شَانِئَکَ هُوَ الْاَبْتَرُ ﴿۳﴾
উচ্চারণ: ইন্না শা-নিআকা হুওয়াল আবতার।
আল বায়ান: নিশ্চয় তোমার প্রতি শত্রুতা পোষণকারীই নির্বংশ।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. নিশ্চয় আপনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই তো নির্বংশ।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: (তোমার নাম-চিহ্ন কোন দিন মুছবে না, বরং) তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই নাম চিহ্নহীন- নির্মূল।
আহসানুল বায়ান: ৩। নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই হল নির্বংশ। [1]
মুজিবুর রহমান: নিশ্চয়ই তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীইতো নিবংর্শ।
ফযলুর রহমান: আসলে তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই লেজকাটা (নির্বংশ)।
মুহিউদ্দিন খান: যে আপনার শত্রু, সেই তো লেজকাটা, নির্বংশ।
জহুরুল হক: তোমার বিদ্বেষকারীই তো স্বয়ং বঞ্চিত।
Sahih International: Indeed, your enemy is the one cut off.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩. নিশ্চয় আপনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই তো নির্বংশ।(১)
তাফসীর:
(১) সাধারণতঃ যে ব্যক্তির পুত্ৰ সন্তান মারা যায়, আরবে তাকে أَبْتَر বা নির্বংশ বলা হত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুত্র কাসেম অথবা ইবরাহীম যখন শৈশবেই মারা গেলেন, তখন কাফেররা তাকে নির্বংশ বলে উপহাস করত। একবার কাব ইবনে আশরাফ ইয়াহুদী সর্দার মক্কায় আগমন করল। কুরাইশের নেতারা তাকে বলল, আপনি কি মদীনাবাসীদের উত্তম ব্যক্তি ও নেতা? সে বলল, হ্যাঁ, তখন তারা বলল, আপনি কি দেখেন না এই লোকটি যে তার জাতির মধ্যে নির্বংশ সে মনে করে সে আমাদের থেকে উত্তম? অথচ আমরা, হজ ও কাবাঘরের সেবায়েত। তখন কাব ইবনে আশরাফ বলল, তোমরা তার থেকে উত্তম। তখন এ আয়াত নাযিল হয়, এতে বলা হয়, “নিশ্চয় আপনার শত্রুরাই তো নির্বংশ” আরও নাযিল হয়, আপনি কি দেখেননা তাদেরকে যাদের কিতাবের কিছু অংশ দেয়া হয়েছিল, তারা মূর্তি ও তাগুতের উপর ঈমান রাখে...”। [সূরা আন-নিসা: ৫১, ৫২, হাদীসটি বর্ণনা করেন, নাসায়ী, কিতাবুত-তাফসীর, ২/৫৬০, নং: ৭২৭, ইবনে হিব্বান ৬৫৭২]
এ আয়াতের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি নির্বংশ বলে যে দোষারোপ করা হতো তার জওয়াব দেয়া হয়েছে। শুধু পুত্রসন্তান না থাকার কারণে যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্বংশ বলে বা তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করে, তারা তার প্রকৃত মর্যাদা সম্পর্কে বেখবর। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশগত সন্তান-সন্ততিও কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যদিও তা কন্যা-সন্তানের তরফ থেকে হয়। তাছাড়া নবীর আধ্যাতিক সন্তান অর্থাৎ উম্মত তো এত অধিকসংখ্যক হবে যে, পূর্ববর্তী সকল নবীর উম্মতের সমষ্টি অপেক্ষাও বেশী হবে। এছাড়া এ সূরায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রিয় ও সম্মানিত তাও বিবৃত হয়েছে। [আদওয়াউল বায়ান]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৩। নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই হল নির্বংশ। [1]
তাফসীর:
[1] أَبتَر এমন ব্যক্তিকে বলা হয়, যে নির্বংশ; যার বংশধর কেউ নেই অথবা যার নাম নেওয়ার কেউ নেই। যখন নবী (সাঃ)-এর কোন ছেলে-সন্তান জীবিত থাকল না, তখন কিছু কাফের তাঁকে নির্বংশ বলতে লাগল। এই কথার উপরে আললাহ তাআলা মহানবী (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, নির্বংশ তুমি নও; বরং তোমার দুশমনরাই নির্বংশ হবে। সুতরাং মহান আল্লাহ তাঁর বংশকে তাঁর কন্যার পরম্পরা দ্বারা বাকী রেখেছেন। এ ছাড়া তাঁর উম্মতও তাঁর আধ্যাত্মিক সন্তানেরই পর্যায়ভুক্ত। যাদের আধিক্য নিয়ে তিনি কিয়ামতে অন্যান্য উম্মতের উপর গর্ব করবেন। এ ছাড়াও নবী (সাঃ)-এর নাম সারা বিশ্বে বড় শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে তাঁর শত্রুদের নাম শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতাতেই লেখা পড়ে আছে। কারো অন্তরে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নেই এবং কারো মুখে প্রশংসার সাথে তাদের নাম উল্লেখ হয় না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ:
সূরার প্রথম আয়াতে উল্লিখিত الكوثر কাউসার শব্দ থেকেই কাউসার নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া এ সূরাকে সূরা নাহারও বলা হয়। কাউসার দ্বারা উদ্দেশ্য হল হাউজে কাউসার, যা কিয়ামতের মাঠে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে প্রদান করা হবে।
শানে নুযূল:
আনাস বিন মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : একদা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কিছুক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। হঠাৎ মাথা তুলে হাসিমুখে বললেন অথবা তাঁর হাসির কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: এইমাত্র আমার ওপর একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর তিনি বিসমিল্লাহ বলে সূরা কাউসার পাঠ করলেন। অতঃপর তিনি বললেন: কাউসার কী তোমরা জান? জবাবে সাহাবাগণ বললেন: আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন: কাউসার হলো : জান্নাতে একটি নহর আল্লাহ তা‘আলা আমাকে দান করেছেন, তাতে বহু কল্যাণ নিহিত রয়েছে। (আহমাদ ৩/১০২, সনদ সহীহ) আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাঃ)-কে কাউসার দান করেছেন। এ কাউসার দ্বারা উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে আলেম সমাজে মতামত রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম দু’টি হলো:
১. কাউসার দ্বারা জান্নাতের নহর উদ্দেশ্য। আয়িশাহ (রাঃ) কে
(إِنَّآ أَعْطَيْنٰكَ الْكَوْثَرَ)
আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি জবাবে বলেন : কাউসার হলো জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত একটি নহর যা তোমাদের নাবী (সাঃ)-কে প্রদান করা হয়েছে। (সহীহ বুখারী হা. ৪৯৬৫)
এ ছাড়াও নাবী (সাঃ) থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট হাদীস রয়েছে।
২. কাউসার দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতের অনেক কল্যাণকে বুঝানো হয়েছে। আর এ কল্যাণের মাঝে জান্নাতের কাউসার নামক নহরও শামিল। অধিকাংশ আলেম এ কথা বলেছেন। (ইবনু কাসীর, তাফসীর সা‘দী, তাফসীর মুয়াসসার।) আর এটাই সঠিক, কেননা এতে ব্যাপকতা রয়েছে।
জান্নাতের হাউজে কাউসারের বিবরণ:
জান্নাতের হাউজে কাউসার এখনও বিদ্যমান। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন :
وإني والله لأنظر إلي حوض الان
আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আমি এখন আমার হাউজ প্রত্যক্ষ করছি। (সহীহ বুখারী হা. ২৪৬১, ৬১৩৭, সহীহ মুসলিম হা. ১৭২৭)
অন্যত্র তিনি বলেন :
ومنبري علي حوضي আমার মিম্বার আমার হাউজে কাউসারের ওপর। (সহীহ বুখারী হা. ১১৮৮, ১১৯৬, সহীহ মুসলিম হা. ১৩৯১)
আল্লামা ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) তাঁর আক্বীদাহ ওয়াসিতিয়া গ্রন্থে হাউজের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: হাউজের পানি দুধের চেয়ে সাদা, মধুর চেয়ে মিষ্টি, তার পেয়ালা আকাশের তারকার সংখ্যাতুল্য, যে ব্যক্তি একবার পান করবে পরবর্তীতে কখনও পিপাসার্ত হবে না, এর দৈর্ঘ্য এক মাসের দূরত্বের সমান এবং প্রস্থ এক মাসের দূরত্বের সমান। (আক্বীদাহ ওয়াসিতিয়াহ)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : কাউসার হলো একটি নহর যার ওয়াদা আল্লাহ তা‘আলা আমাকে দিয়েছেন। তাতে অনেক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার উম্মত এ হাউজের নিকটে সমবেত হবে, যার পেয়ালা হবে তারকা সমতুল্য। কিছু লোককে হাউজ থেকে সরিয়ে দেয়া হবে, তখন আমি বলব : হে আমার প্রতিপালক! এরা আমার উম্মত। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন : তুমি জান না, তোমার পর তারা কত রকম বিদআত তৈরি করেছে। (সহীহ মুসলিম হা. ২২৯৯, আবূ দাঊদ হা. ৪৭৪৭)
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : মি‘রাজের রাতে আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম। হঠাৎ দেখি যে, আমি একটি নহরের পাশে দণ্ডায়মান যার দুপার্শ্বে মুক্তার তৈরি তাঁবু রয়েছে। তাতে পানি প্রবাহিত হয় তাতে হাত দিয়ে দেখলাম : তা মিশকের মত সুঘ্রাণযুক্ত। জিবরীল (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম : এটা কী? জবাবে তিনি বললেন : এটা কাউসার যা আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে দিয়েছেন। (আহমাদ ৩/২৪৭, সনদ সহীহ।)
(فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ)
অর্থাৎ যেমন আমি তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে অনেক কল্যাণ দান করেছিÑতার মধ্যে কাউসার অন্যতম একটি তেমন তোমার খালেসভাবে রবের জন্য সালাত ও কুরবানী স¤পন্ন কর, আর তাতে কাউকে অংশী স্থাপন কর না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলছেন:
(قُلْ اِنَّ صَلَاتِیْ وَنُسُکِیْ وَمَحْیَایَ وَمَمَاتِیْ لِلہِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَﯱلَا شَرِیْکَ لَھ۫ﺆ وَبِذٰلِکَ اُمِرْتُ وَاَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِیْنَ)
“বল : ‘আমার সলাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ শুধুমাত্র জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে।’ ‘তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি এরই জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।” (সূরা আনআম ৬ : ১৬৩-১৬৪)
وَانْحَرْ -- نحر শব্দের প্রকৃত অর্থ উটের কণ্ঠনালীতে বর্শা অথবা ছুরি দিয়ে আঘাত করে জবেহ (নহর) করা ও অন্যান্য পশুকে মাটির ওপর শুইয়ে তার গলায় ছুরি চালানোকে জবেহ বলা হয়। এখানে نحر দ্বারা উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে বিভিন্ন বিদ্বান বিভিন্ন বক্তব্য পেশ করেছেন : কেউ বলেছেন সালাতে নহরের নীচে ডান হাতকে বাম হাতের ওপর রাখা। আর কেউ বলেছেনÑতাকবীরে তাহরীমার সময় দুই হাত উত্তোলন করা। আবার কেউ বলেছেনÑকেবলামুখী করে কুরবানী বা নহর করা। (ইবনু জারীর)
সঠিক কথা হলো : نحر দ্বারা উদ্দেশ্য কুরবানীর পশু যদি উট হয় নহর করা আর অন্য পশু হলে জবেহ করা। (ইবনু কাসীর)
এজন্য নাবী (সাঃ) ঈদের সালাত আদায় করে কুরবানীর পশু নহর বা জবেহ করতেন। আর এটাই হলো সুন্নাত। নাবী (সাঃ) বলেন : যারা আমাদের মত সালাত আদায় করল এবং কুরবানী করল তারা সঠিকভাবেই কুরবানী করল। আর যারা সালাতের পূর্বে কুরবানী করেছে তাদের কুরবানী হয়নি (সাধারণ যবেহ করা হলো)। (সহীহ বুখারী হা. ৯৮৩)
আয়াতে যদিও নাবী (সাঃ)-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, তবে শুধু তার জন্য সীমাবদ্ধ নয় বরং সকলের জন্য এ বিধান প্রযোজ্য। অনেকে এ আয়াত দ্বারা বুঝাতে চান যে, কুরবানী করা ওয়াজিব। আসলে বিষয়টি এমন নয়, বরং কুরবানী অবস্থাভেদে তার হুকুম ভিন্ন হয়ে থাকে, তবে সাধারণ বিধান হল সুন্নাত। এ আয়াত কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে না।
(إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : একদা কা‘ব বিন আশরাফ মক্কায় আগমন করে, তখন কুরাইশরা বলে : আপনি তো তাদের সর্দার, আপনি কি ঐ ছোকরাকে (মুহাম্মাদ) দেখতে পান না? সে তার জাতি থেকে ছিন্ন হয়ে গেছে, আবার নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করছে? অথচ আমরা হাজীদের বংশধর, কাবা ঘরের তত্ত্বাবধান এবং যমযম কূপের দেখাশোনা করি। কাব বিন আশরাফ বলেন: তোমরাই শ্রেষ্ঠ। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (ইমাম ইবনু কাসীর বলেন : সনদ সহীহ।)
অন্যান্য বর্ণনায় তা আবূ জাহলের এমনকি আবূ লাহাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। (ইবনু কাসীর)
যে বর্ণনায় বলা হয়েছে, যখন নাবী (সাঃ)-এর পুত্রগণ পরপর মারা যেতে লাগল এবং সর্বশেষ পুত্র ইবরাহীম মারা গেল তখন আস বিন ওয়ায়িল বলল : বাদ দাও মুহাম্মাদের কথা, সে এমন লোক যার কোন বংশধর বাকী নেই, সে লেজকাটা নির্বংশ। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এ বর্ণনাটি সহীহ নয়। (ইবনু হিশাম ১/৩২২, সূরা কাউসারের আলোচনা।)
الْأَبْتَرُ এমন ব্যক্তিকে বলা হয় যে নির্বংশ, যার পুত্র সন্তান জীবিত থাকে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কাউসারের সঠিক তাফসীর জানলাম।
২. বিদ‘আতীরা কাউসারের পানি পান করার সৌভাগ্য লাভ করবে না।
৩. সালাতের মত কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই তা করতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্যই।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর
মুসনাদে আহমদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিছুক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলেন। হঠাৎ মাথা তুলে হাসিমুখে তিনি বললেন অথবা তার হাসির কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ “এই মাত্র আমার উপর একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর তিনি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে সূরা কাওসার পাঠ করলেন। তারপর তিনি সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কাওসার কি তা কি তোমরা জান?” উত্তরে তারা বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কাওসার হলো একটা জান্নাতী নহর। তাতে বহু কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে এটা দান করেছেন। কিয়ামতের দিন আমার উম্মত সেই কাওসারের ধারে সমবেত হবে। আসমানে যতো নক্ষত্র রয়েছে সেই কাওসারের পিয়ালার সংখ্যাও ততো। কিছু লোককে কাওসার থেকে সরিয়ে দেয়া হবে তখন আমি বলবো: হে আমার প্রতিপালক! এরা আমার উম্মত!” তখন তিনি আমাকে বলবেনঃ “তুমি জান না, তোমার (ইন্তেকালের) পর তারা কত রকম বিদআত আবিষ্কার করেছে!”
হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সেই কাওসারের দুটি ধারা আকাশ থেকে অবতরণ করবে।
সুনানে নাসাঈতে রয়েছে যে, এ ঘটনা মসজিদে নববীতে (সঃ) ঘটেছে। এজন্যেই অধিকাংশ কারী বলেন যে, এ সূরা মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। অধিকাংশ ফিকাহবিদ এ হাদীস থেকেই ব্যাখ্যা করেছেন যে, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ প্রত্যেক সূরার সাথেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটা প্রত্যেক সূরার পৃথক আয়াত।
মুসনাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমাকে কাওসার দান করা হয়েছে। কাওসার একটি প্রবাহিত ঝর্ণা বা নহর, কিন্তু গর্ত নয়। ওর দুপাশে মুক্তার তৈরি তবু রয়েছে। ওর মাটি খাটি মিশকের ওর পাথরও খাঁটি মুক্তাদ্বারা নির্মিত।
অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, মিরাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসমানে জান্নাতে এ নহর দেখেছিলেন। এবং হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “এটা কোন নহর?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বলেছিলেনঃ “এর নাম কাওসার, যে কাওসার আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আপনাকে দান করেছেন। এ ধরনের বহু হাদীস রয়েছে।
অন্য এক হাদীসে আছে যে, কাওসারের পানি দুধের চেয়েও বেশী সাদা, মধুর চেয়েও বেশী মিষ্ট। সেই কাওসারের তীরে লম্বাগ্রীবা বিশিষ্ট পাখিরা বসে রয়েছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সে সব পাখি তো খুব সুন্দর!” নবী করীম (সঃ) বললেনঃ ‘সেগুলো খেতেও খুব সুস্বাদু।” অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কাওসার কি?” উত্তরে তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করলে হযরত উমার (রাঃ) পাখিগুলো সম্পর্কে উপরোক্ত কথা বলেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন এ নহরটি জান্নাতের মধ্যস্থলে অবস্থিত। (এ হাদীসটি মুনকার বা অস্বীকৃত)। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি কাওসারের পানি ঝরার শব্দ শুনতে পছন্দ করে সে যেন তার অঙ্গুলিদ্বয় তার কর্ণদ্বয়ে রাখে। (সনদের দিক দিয়ে এ হাদীসটি মুনকাতা বা ছেদ কাটা) প্রথমতঃ এ হাদীসের সনদ সমার্থ নয়, দ্বিতীয়তঃ অর্থ হলো কানে আঙ্গুল দিয়ে কাওসারের পানি ঝরার মত শব্দ শোনা যাবে, অবিকল সেই আওয়াজই যে শোনা যাবে এমন নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কাওসারের মধ্যে ঐ কল্যাণ নিহিত রয়েছে যা আল্লাহ তা'আলা খাস করে তার নবী (সঃ)-কে দান করেছেন। আবু বাশার (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) কে বলেনঃ লোকদের তো ধারণা এই যে, কাওসার হলো জান্নাতের একটি নহর। তখন হযরত সাঈদ (রঃ) বললেনঃ জান্নাতে যে নহরটি রয়েছে সেটা ঐ কল্যাণের অন্তর্ভুক্ত যা আল্লাহ খাস করে তার নবী (সঃ)-কে প্রদান করেছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে যে, কাওসার হলো বহু কল্যান। বহু সংখ্যক তাফসীরকার এরকমই লিপিবদ্ধ করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কাওসার দ্বারা দুনিয়ার ও আখেরাতের বহু প্রকারের কল্যাণের কথা বুঝানো হয়েছে। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, কাওসার দ্বারা নবুওয়াত, কুরআন ও পরকালের পুণ্যকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) কাওসারের তাফসীরে নহরে কাওসারও বলেছেন।
তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কাওসার হলো জান্নাতের একটি নহর যার উভয় তীর স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত। ইয়াকূত ও মণি-মুক্তার উপর ওর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ঐ কাওসারের পানি বরফের চেয়েও অধিক সাদা এবং মধুর চেয়েও অধিক মিষ্টি। (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইববে মাজাহ (রঃ) এ হাদীসটি মারফু রূপেও বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)
তাফসীরে ইবনে জারীরে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হামযার (রাঃ) বাড়িতে আগমন করেন। হযরত হামযা (রাঃ) ঐ সময় বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী বানূ নাজ্জার গোত্রীয়া মহিলা বাড়ীতে অবস্থান করছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “আমার স্বামী এই মাত্র আপনার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। সম্ভবতঃ তিনি বানু নাজ্জারের ওখানে। আটকা পড়ে গেছেন। আপনি এসে বসুন।` অতঃপর হযরত হামযার (রাঃ) স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে মালীদা (এক প্রকার খাদ্য) পেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তা আহার করলেন। হযরত হামযা’র (রাঃ) স্ত্রী আনন্দের সুরে বললেনঃ “আপনি নিজেই আমাদের গরীব খানায় তাশরীফ এনেছেন এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। আমি তো ভেবেছিলাম যে আপনার দরবারে হাজির হয়ে আপনাকে হাউযে কাওসার প্রাপ্তি উপলক্ষে মুবারকবাদ জানাবো। এই মাত্র হযরত আবূ আম্মারাহ (রাঃ) আমার কাছে এই সুসংবাদ পৌঁছিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “হ্যা, সেই হাউযে কাওসারের মাটি হলো ইয়াকূত, পদ্মরাগ, পান্না এবং মণি মুক্তা।` খারামা ইবনে উসমান নামক এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী দুর্বল। তবে এটাকে হাসান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বহু সংখ্যক সাহাবী এবং তাবিয়ীর বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, কাওসার একটি নহরের নাম।
আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে কাওসার দান করেছি। অতএব তুমি স্বীয় প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায পড় এবং করবানী কর। নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই তো নির্বংশ। অর্থাৎ হে নবী। (সঃ) তুমি নফল নামায ও কুরবানীর মাধ্যমে লা-শারীক আল্লাহর ইবাদত কর। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “বলঃ আমার নামায, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্রই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পনকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম।” (৬ ? ১৬২-১৬৩)।
কুরবানী দ্বারা এখানে উট বা অন্য পশু কুরবানীর কথা বলা হয়েছে। মুশরিকরা সিজদা’ এবং কুরবানী আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদের নামে করতো। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করো। যেমন আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ যে পশু কুরবানীতে আল্লাহর নাম নেয়া হয় না তা তোমরা খেয়োনা, কেননা, এটা ফিসক বা অন্যায়াচরণ।” (৬:১২১) এটাও বলা হয়েছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো নামাযের সময়ে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকে বাধা। এটা হযরত আলী (রাঃ) হতে গায়ের সহীহ সনদের সাথে বর্ণিত হয়েছে। হযরত শাবী (রঃ) এ শব্দের তাফসীর এটাই করেছেন।
হযরত আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো নামায শুরু করার সময় হাত উঠানো। একথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হলোঃ বুক কিবলার দিক রেখে কিবলা মুখী হওয়া। (এই তিনটি উক্তিই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ জায়গায় একটি নিতান্ত মুনকার হাদীস বর্ণিত আছে। তাতে আছে যে, এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! এর অর্থ কি?” উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “(আরবি) এর অর্থ কুরবানী নয়, বরং আপনার প্রতিপালক আপনাকে নামাযে তাকবীরে তাহরীমার সময়, রুকুর সময়, রুকু হতে মাথা উঠানোর সময় এবং সিজদাহ করার সময় দু’হাত তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। এটাই আমাদের এবং যে সব ফেরেশতা সপ্তম আকাশে রয়েছেন তাদের নামায। প্রত্যেক জিনিষের সৌন্দর্য রয়েছে, নামাযের সৌন্দর্য হলো প্রত্যেক তাকবীরের সময় হাত উঠাননা।”
হযরত আতা খুরাসানী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো নিজের পিঠ রুকু হতে উঠানোর সময় সমতল করে বুক প্রকাশ করে অর্থাৎ স্বস্তি অর্জন করো। এগুলো সবই গারীব বা দুর্বল উক্তি।
(আরবি) এর অর্থ কুরবানীর পশু জবাহ করা এ উক্তিটিই হলো সঠিক উক্তি। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঈদের নামায শেষ করার পরপরই নিজের কুরবানীর পশু যবাহ করতেন এবং বলতেনঃ “যে আমাদের নামাযের মত নামায পড়েছে এবং আমাদের কুরবানীর মত কুরবানী করেছে সে শরীয়ত সম্মতভাবে কুরবানী করেছে। আর যে ব্যক্তি (ঈদের) নামাযের পূর্বেই কুরবানী করেছে তার কুরবানী আদায় হয়নি। একথা শুনে হযরত আবু বারদাহ ইবনে দীনার (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আজকের দিনে গোশতের চাহিদা বেশী হবে ভেবেই কি আপনি নামাযের পূর্বেই কুরবানী করে ফেলেছেন?` উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তা হলে তো খাওয়ার গোশতই হয়ে গেল অর্থাৎ কুরবানী হলো না।” সাহাবীগণ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বর্তমানে আমার কাছে একটি বকরীর শাবক রয়েছে, কিন্তু ওটা দুটি বকরীর চেয়েও আমার কাছে অধিক প্রিয়। এ বকরীর শাবকটি কি আমার জন্যে যথেষ্ট হবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তোমার জন্যে যথেষ্ট হবে বটে, কিন্তু তোমার পরে ছয় মাসের বকরী শাবক অন্য কেউ কুরবানী করতে পারবে না।”
ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ তার কথাই যথার্থ যে বলে যে, এর অর্থ হলোঃ নিজের সকল নামায শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে আদায় করো, তিনি ছাড়া অন্য কারো জন্যে আদায় করো না। তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর যিনি তোমাকে এরকম বুযুগী ও নিয়ামত দান করেছেন যে রকম বুযুগী ও নিয়ামত অন্য কাউকেও দান করেননি। এটা একমাত্র তোমার জন্যেই নির্ধারিত করেছেন। এই উক্তিটি খুবই উত্তম।
মুহাম্মদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) এবং আতা (রঃ) একই কথা বলেছেন। আল্লাহ তাআলা সুরার শেষ আয়াতে বলেছেনঃ নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষনকারীই তো নির্বংশ। অর্থাৎ যারা তোমার (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর) শত্রুতা করে, তারাই অপমানিত, লাঞ্ছিত, তাদেরই লেজকাটা।
এই আয়াত আস ইবনে ওয়ায়েল সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। এই দুবৃত্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আলোচনা শুনলেই বলতোঃ “ওর কথা রাখো, ওর কথা রাখো, ওর কোন পুত্র সন্তান নেই। মৃত্যুর পরই সে বেনাম-নিশান হয়ে যাবে। (নাউযুবিল্লাহ)। আল্লাহ তাআলা তখন এ সূরা অবতীর্ণ করেন।
শামর ইবনে আতিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, উকবা ইবনে আবী মুঈত সম্পর্কে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কা'ব ইবনে আশরাফ এবং কুরায়েশদের একটি দল সম্পর্কে এ সূরা অবতীর্ণ হয়।
মুসনাদে বাযযারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফ যখন মক্কায় আসে তখন কুরায়েশরা তাকে বলেঃ “আপনি তো তাদের সর্দার, আপনি কি ঐ ছোকরাকে (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে দেখতে পান সে সমগ্র জাতি থেকে পৃথক হয়ে আছে, এতদসত্ত্বেও নিজেকে সবচেয়ে ভাল ও শ্রেষ্ঠ মনে করছে। অথচ আমরা হাজীদের বংশধর, কাবাগৃহের তত্ত্বাবধায়ক এবং যমযম কূপের দেখাশোনাকারী।” দুবৃত্ত কা'ব তখন বললোঃ “নিঃসন্দেহে তোমরা তার চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তা'আলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এ হাদীসের সনদ সহীহ বা বিশুদ্ধ।
হযরত আতা' (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত আবূ লাহাব সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সন্তানের ইন্তেকালের পর এ দুর্ভাগা দুবৃত্ত মুশরিকদেরকে বলতে লাগলো “আজ রাত্রে মুহাম্মদ (সঃ)-এর বংশধারা বিলোপ করা হয়েছে।” আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ উক্তি বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাও বলেছেন যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত শত্রুকেই বুঝানো হয়েছে। যাদের নাম নেয়া হয়েছে এবং যাদের নাম নেয়া হয়নি তাদের সকলকেই বুঝানো হয়েছে।
শব্দের অর্থ হলো একাকী। আরবে এ প্রচলন রয়েছে যে, যখন কারো একমাত্র সন্তান মারা যায় তখন তাকে আবার বলা হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্তানদের ইন্তেকালের পর শত্রুতার কারণে তারা তাকে আবতার বলছিল। আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আবতার’ এর অর্থ দাঁড়ালোঃ যার মৃত্যুর পর তার সম্পর্কিত আলোচনা, নাম নিশানা মুছে যায়। মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্পর্কেও ধারণা করেছিল যে, সন্তান বেঁচে থাকলে তার আলোচনা জাগরুক থাকতো। এখন আর সেটা সম্ভব নয়। অথচ তারা জানে না যে, পৃথিবী টিকে থাকা অবধি আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় নবী (সঃ)-এর নাম টিকিয়ে রাখবেন। নবী করীম (সঃ)-এর শরীয়ত চিরকাল বাকি থাকবে। তার আনুগত্য সকল শ্রেণীর মানুষের জন্যে অত্যাবশ্যক ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর প্রিয় ও পবিত্র নাম সকল মুসলমানের মনে ও মুখে রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত তার নাম আকাশতলে উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান থাকবে। জলে স্থলে সর্বদা তাঁর নাম আলোকিত হতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এবং তার আল ও আসহাবের প্রতি দরূদ ও সালাম সর্বাধিক পরিমাণে প্রেরণ করুন। আমীন!
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।