সূরা আল-কুরাইশ (আয়াত: 3)
হরকত ছাড়া:
فليعبدوا رب هذا البيت ﴿٣﴾
হরকত সহ:
فَلْیَعْبُدُوْا رَبَّ هٰذَا الْبَیْتِ ۙ﴿۳﴾
উচ্চারণ: ফালইয়া‘বুদূরাব্বা হা-যাল বাঈত।
আল বায়ান: অতএব তারা যেন এ গৃহের রবের ‘ইবাদাত করে,
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. অতএব, তারা ইবাদাত করুক এ ঘরের রবের(১),
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের কর্তব্য হল এই (কা‘বা) ঘরের রবের ‘ইবাদাত করা,
আহসানুল বায়ান: ৩। অতএব তারা ইবাদত করুক এই গৃহের প্রতিপালকের।
মুজিবুর রহমান: অতএব তারা ইবাদাত করুক এই গৃহের রবের,
ফযলুর রহমান: অতএব, তারা যেন এই (কাবা) ঘরের প্রভুর ইবাদত করে,
মুহিউদ্দিন খান: অতএব তারা যেন এবাদত করে এই ঘরের পালনকর্তার
জহুরুল হক: অতএব তারা এই গৃহের প্রভুর উপাসনা করুক;
Sahih International: Let them worship the Lord of this House,
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩. অতএব, তারা ইবাদাত করুক এ ঘরের রবের(১),
তাফসীর:
(১) ‘এ ঘর’ অর্থ কা'বা শরীফ বলা হয়েছে, এ ঘরের রব-এর ইবাদত কর। এখানে ঘরটিকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কযুক্ত করার মাধ্যমে ঘরকে সম্মানিত করাই উদ্দেশ্য। [সা'দী] আর এই গৃহই যেহেতু তাদের সব শ্রেষ্ঠত্ব ও কল্যাণের উৎস ছিল, তাই বিশেষভাবে এই গৃহের মৌলিক গুণটি উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, এটি মহান রবের ঘর। অর্থাৎ এ ঘরের বদৌলতেই কুরাইশরা এই নিয়ামতের অধিকারী হয়েছে। একমাত্র আল্লাহই যার রব। তিনিই আসহাবে ফীলের আক্রমণ থেকে তাদেরকে বাঁচিয়েছেন। আবরাহার সেনাবাহিনীর মোকাবিলায় সাহায্য করার জন্য তাঁর কাছেই তারা আবেদন জানিয়েছিল। তাঁর ঘরের আশ্রয় লাভ করার আগে যখন তারা আরবের চারদিকে ছড়িয়ে ছিল তখন তাদের কোন মর্যাদাই ছিল না।
আরবের অন্যান্য গোত্রের ন্যায় তারাও একটি বংশধারার বিক্ষিপ্ত দল ছিল মাত্র। কিন্তু মক্কায় এই ঘরের চারদিকে একত্র হবার এবং এর সেবকের দায়িত্ব পালন করতে থাকার পর সমগ্র আরবে তারা মর্যাদাশালী হয়ে উঠেছে। সবদিকে তাদের বাণিজ্য কাফেলা নিৰ্ভয়ে যাওয়া আসা করছে। তারা যা কিছুই লাভ করেছে এ ঘরের রবের বদৌলতেই লাভ করেছে। কাজেই তাদের একমাত্র সেই রবেরই ইবাদত করা উচিত। [দেখুন: মুয়াস্সার, কুরতুবী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৩। অতএব তারা ইবাদত করুক এই গৃহের প্রতিপালকের।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ ও গুরুত্ব:
কুরাইশ আরবের একটি সম্ভ্রান্ত বংশ। এ বংশেই নাবী (সাঃ)-এর জন্ম। সূরার প্রথম আয়াতে উল্লিখিত কুরাইশ শব্দ থেকেই উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এ সূরাকে “সূরা ইলাফ”ও বলা হয়। অনেকে মনে করেন পূর্বের সূরার সাথে এ সূরার সম্পর্ক রয়েছে।
উম্মু হানী বিনতু আবূ তালেব (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : আল্লাহ তা‘আলা কুরাইশদের সাতটি বিষয়ে মর্যাদা দান করেছেন:
(১) আমি তাদের মধ্য হতে।
(২) নবুওয়াত তাদের মধ্য হতে এসেছে।
(৩) কাবাগৃহের তত্ত্বাবধান।
(৪) হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব পালন।
(৫) আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে হস্তীবাহিনী বিরুদ্ধে সাহায্য করেছেন।
(৬) উক্ত ঘটনার পর কুরাইশরা দশবছর যাবৎ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কারো ইবাদত করেনি।
(৭) আল্লাহ তা‘আলা তাদের বিষয়ে কুরআনে পৃথক একটি সূরা নাযিল করেছেন যাতে তাদের ব্যতীত আর কারো আলোচনা করা হয়নি। অতঃপর তিনি ‘বিসমিল্লাহ’সহ অত্র সূরাটি তেলাওয়াত করেন। (সিলসিলা সহীহাহ হা. ১৯৪৪, সহীহুল জামে হা. ৪২০৯)
لِإِيْلٰفِ- শব্দের অর্থ : স্বাভাবিক ও অভ্যস্ত হওয়া। অর্থাৎ কোন কষ্ট ও বিরাগ অনুভব না করা। মুজাহিদ (রহঃ) বলেন : তারা ব্যবসায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। ফলে শীত ও গ্রীষ্মকালে ব্যবসায় করা তাদের জন্য কষ্টকর হত না। (সহীহ বুখারী)
কুরাইশদের প্রধান জীবনোপকরণ ছিল ব্যবসায়। প্রতি বছর তাদের বাণিজ্যিক কাফেলা দুবার অন্য দেশে সফর করত। তারা সেখান থেকে পণ্য নিয়ে আসত। শীতকালে গরম এলাকা ইয়ামান, আর গ্রীষ্মকালে ঠাণ্ডা এলাকা শাম সফর করত। কাবাঘরের খাদেম বলে আরবরা তাদের সম্মান করত। এজন্যই তাদের বাণিজ্যিক কাফেলা বিনা বাধায় সফর করত। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এ ঘরের একমাত্র মালিক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন যে ঘরের কারণে তারা বিনা বাধায় ব্যবসায় করতে পারে ও প্রভূত সম্মানের পাত্র হয়েছে।
(أَطْعَمَهُمْ مِّنْ جُوْعٍ)
অর্থাৎ উক্ত ব্যবসায়-বাণিজ্যের মাধ্যমে তাদেরকে খাদ্য দেন।
اٰمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٍ))
অর্থাৎ সকল লুণ্ঠন ও হত্যাযজ্ঞ হতে তাদেরকে নিরাপদে রেখেছেন। কারণ তারা হারামের অধিবাসী ও হারামের খাদেম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَضَرَبَ اللہُ مَثَلًا قَرْیَةً کَانَتْ اٰمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً یَّاْتِیْھَا رِزْقُھَا رَغَدًا مِّنْ کُلِّ مَکَانٍ فَکَفَرَتْ بِاَنْعُمِ اللہِ فَاَذَاقَھَا اللہُ لِبَاسَ الْجُوْعِ وَالْخَوْفِ بِمَا کَانُوْا یَصْنَعُوْنَ)
“আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসত সর্বদিক হতে তার প্রচুর জীবনোপকরণ। অতঃপর তার অধিবাসীরা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল, ফলে তারা যা করত তজ্জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির।” (সূরা নাহল ১৬: ১১২)
তাই যে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষুধার সময় খাদ্য দান করেন, ভয় থেকে নিরাপত্তা দান করেন তার শুকরিয়া জ্ঞাপনার্থে কাবা ঘরের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা উচিত।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কুরাইশদের মর্যাদা সম্পর্কে জানলাম।
২. বাইতুল্লাহর কারণে তারা যে সম্মানের পাত্র ও নিরাপত্তা পেয়েছিল তা অবগত হলাম।
৩. কুরাইশদের জীবনচিত্র সম্পর্কে জানলাম।
৪. ক্ষুধার সময় খাদ্য পাওয়া ও ভয়ের সময় নিরাপত্তা পাওয়া অনেক বড় নেয়ামত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: এ সূরার ফযীলত সম্পর্কে ইমাম বায়হাকী (রঃ) তাঁর কিতাবুল খিলাফিয়্যাত' এ একটি গারীব হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত উম্মিহানী বিনতে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা কুরায়েশদেরকে সাতটি ফযীলত প্রদান করেছেন। (এক) আমি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। (দুই) নবুওয়াত তাদের মধ্যে রয়েছে। (তিন) তারা আল্লাহর ঘরের তত্ত্বাবধায়ক। (চার) তারা যমযম কূপের পানি পরিবেশনকারী। (পাঁচ) আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে হস্তী অধিপতিদের উপর বিজয় দান করেছেন। (ছয়) দশবছর পর্যন্ত তারা আল্লাহর ইবাদত করেছে যখন অন্য কেউ ইবাদত করতো না। (সাত) তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন কারীমের একটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) পাঠ করেনঃ (আরবি)
১-৪ নং আয়াতের তাফসীর
কুরআনের বর্তমান উসমানী (রাঃ) সংস্করণের বিন্যাসে এ সূরাটিকে সূরা ফীল হতে পৃথকভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে। উভয় সূরার মধ্যে (আরবি) দ্বারা পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এ সূরাটিও সূরা ফীল এরই অনুরূপ। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ), আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) প্রমুখ গুরুজন যে ব্যাখ্যা করেছেন তাতে বলা হয়েছেঃ আমি মক্কা হতে হাতীদের ফিরিয়ে রেখেছি এবং হাতী ওয়ালাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছি। কুরায়েশদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে এবং শান্তিপূর্ণভাবে মক্কায় অবস্থানের জন্যেও এ সূরার বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে এরূপ ব্যাখ্যাও করা হয়েছে। আবার এই অর্থও লিখিত হয়েছে যে, শীত-গ্রীষ্ম যে কোন ঋতুতে কুরায়েশরা দূর দূরান্তে শান্তিপূর্ণভাবে সফর করতো। কেননা, মক্কার মত সম্মানিত শহরে বসবাস করার কারণে সবাই তাদের সম্মান করতো। তাদের সঙ্গে যারা থাকতো তারাও শান্তিপূর্ণভাবে সফর করতে সক্ষম হতো। একইভাবে নিজ দেশেও তারা। সর্বপ্রকার নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা লাভ করতো। যেমন কুরআনের অন্য এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তারা কি দেখে না যে, আমি হরমকে শান্তিমূলক স্থান হিসেবে মনোনীত করেছি, অথচ লোকদেরকে তাদের চতুর্দিক হতে ছিনতাই করা হয়?” (২৯:৬৭) কিন্তু সেখানে যারা অবস্থান করে তারা সম্পূর্ণ নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত থাকে।
ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর মধ্যে প্রথম যে (আরবি) টি রয়েছে ওটা বিস্ময় প্রকাশক (আরবি) এবং উভয় সূরা অর্থাৎ সূরা ফীল এবং সূরা লিঈলাফি কুরাইশ সম্পূর্ণ পৃথক। এ ব্যাপারে মুসলমানদের ইজমা রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা কুরায়েশদের প্রতি তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেনঃ এই গৃহের মালিকের ইবাদত করা তাদের উচিত, যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি হতে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছেন। যেমন আল্লাহ্ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আমাকে শুধু এ আদেশই দেয়া হয়েছে যে, আমি এই শহরের প্রভুর ইবাদত করবো যিনি ওকে হরম বানিয়েছেন, যিনি সকল জিনিষের মালিক। আমাকে আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (২৭:৯১) সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা বলছেনঃ যিনি ক্ষুধায় আহার্য দিয়েছেন এবং ভয়ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন তাঁর ইবাদত কর এবং ছোট বড় কোন কিছুকে তার অংশীদার করো না। আল্লাহ্ তা'আলার এ আদেশ যে পালন করবে আল্লাহ্ তাকে দুনিয়ায় ও আখেরাতে সুখে-শান্তিতে কালাতিপাত করাবেন। পক্ষান্তরে তার অবাধ্যাচরণ যে করবে তার ইহকালের শান্তিকেও অশান্তিতে পরিণত করা হবে এবং আখেরাতেও সে শান্তির পরিবর্তে ভয়ভীতি ও হতাশার সম্মুখীন হবে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসতো সর্বদিক হতে ওর প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর ওটা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করলো; ফলে, তারা যা করতো তজ্জন্যে আল্লাহ্ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের। তাদের নিকট তো এসেছিল এক রাসূল তাদেরই মধ্য হতে, কিন্তু তারা তাকে অস্বীকার করেছিল; ফলে, সীমা লংঘন করা অবস্থায় শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করলো।” (১৬:১১২-১১৩)
একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “হে কুরায়েশগণ! আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের জন্যে আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করেছেন, ঘরে বসিয়ে তোমাদেরকে পানাহার করিয়েছেন, চতুর্দিকে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও তোমাদেরকে তিনি শান্তি ও নিরাপত্তা দান করেছেন। এরপরও তোমাদের কি হলো যে, তোমরা এই বিশ্ব প্রতিপালকের ইবাদত করবে না এবং তাঁর তাওহীদ বা একত্ববাদকে অবিশ্বাস করবে? তোমাদের উপর কি এমন বিপদ আপতিত হলো, যে কারণে তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদের সামনে মাথানত করবে?”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।