আল কুরআন


সূরা আল-হুমাযা (আয়াত: 9)

সূরা আল-হুমাযা (আয়াত: 9)



হরকত ছাড়া:

في عمد ممددة ﴿٩﴾




হরকত সহ:

فِیْ عَمَدٍ مُّمَدَّدَۃٍ ﴿۹﴾




উচ্চারণ: ফী ‘আমাদিম মুমাদ্দাদাহ ।




আল বায়ান: প্রলম্বিত স্তম্ভসমূহে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯. দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: (লেলিহান অগ্নিশিখার) উঁচু উঁচু স্তম্ভে।




আহসানুল বায়ান: ৯। দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে। [1]



মুজিবুর রহমান: দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে।



ফযলুর রহমান: প্রলম্বিত খুঁটিতে। (অর্থাৎ অগ্নিভরা লম্বা লম্বা খুঁটির সাথে বেঁধে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে।)



মুহিউদ্দিন খান: লম্বা লম্বা খুঁটিতে।



জহুরুল হক: সারিসারি খুটিরঁ ভেতরে।



Sahih International: In extended columns.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৯. দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে।(১)


তাফসীর:

(১) ‘ফি আমাদিম মুমাদ্দাদাহ’ এর একাধিক অর্থ হতে পারে। যেমন এর একটি অর্থ হচ্ছে, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়ে তার ওপর উঁচু উঁচু থাম গেড়ে দেয়া হবে। এর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, এই অপরাধীরা উঁচু উঁচু থামের গায়ে বাধা থাকবে। এর তৃতীয় অর্থ হল এরূপ স্তম্ভসমূহ বা থাম দিয়ে জাহান্নামীদের শাস্তি প্ৰদান করা হবে। এ-শাস্তি সম্পর্কে বিস্তারিত কোন কথা আল্লাহ জানাননি। এ মতটি ইমাম তাবারী গ্রহণ করেছেন। [তাবারী, ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ৯। দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে। [1]


তাফসীর:

[1] مُؤصَدَة অর্থ হল বন্ধ বা পরিবেষ্টিত। অর্থাৎ, জাহান্নামের সকল দরজা ও পথ বন্ধ করে দেওয়া হবে; যাতে সেখান হতে কেউ বের হতে না পারে। তাদেরকে লোহার পেরেকের সাথে বেঁধে দেওয়া হবে; যা লম্বা লম্বা স্তম্ভের মত হবে। কোন কোন উলামার মতে, عَمَد অর্থ হলঃ বেড়ি বা লৌহবেষ্টনী এবং কারো মতে এর অর্থ হল স্তম্ভ বা থাম। যাতে বেঁধে জাহান্নামীদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে। (ফাতহুল ক্বাদীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ:



هُمَزَةٍ বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে যে মানুষের দোষ-ত্রুটি বলে বেড়ায় এবং কাজ ও ইশারায় অন্যের ওপর অপবাদ দেয়। আবার বলা হয় هُمَزَةٍ ঐ ব্যক্তি যে মুখোমুখি মানুষের নিন্দা করে। প্রথম আয়াতে উল্লিখিত هُمَزَةٍ শব্দ থেকেই উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছ। সূরায় পরনিন্দাকারী ও অর্থলিপ্সুদের দুর্ভোগ ও আখিরাতের শাস্তির বর্ণনা এসেছে।



هُمَزَةٍ এর শাব্দিক আলোচনা ওপরে করা হয়েছে। আর لمزة বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে যে পশ্চাতে পরনিন্দা করে। এ-সব পশ্চাতে ও সম্মুখে নিন্দাকারী ব্যক্তিরাই সম্পদ জমা করে ও গণনা করে। অর্থাৎ সম্পদ থেকে সাধারণ দান সাদকাহ তো দূরের কথা ফরয যাকাতও আদায় করে না। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা তাদের এত বড় দুর্ভোগের কথা বলেছেন। নচেৎ সাধারণভাবে সম্পদ সঞ্চয় করা কোন নিন্দনীয় বিষয় নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা সম্পদ জমাকারীকে তিরস্কার করে বলেন :



(وَجَمَعَ فَأَوْعٰي)‏



“সে সম্পদ জমা করেছে এবং সংরক্ষিত করে রেখেছে।” (সূরা মাআরিজ ৭০ : ১৮)



(أَنَّ مَالَه۫ أَخْلَدَه۫)



অর্থাৎ তার বিশ্বাস তার জমাকৃত সম্পদ তাকে মরতে দেবে না, সর্বদা জীবিত রাখবে। সুতরাং অত্র আয়াতে পুঁজিবাদ ও পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাসীদের তীব্র প্রতিবাদ করা হয়েছে। অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ছিনিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার পরিণাম ভাল নয়। তাই যারা দুনিয়াবী স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কেবল সম্পদ জমা করবে কিন্তু তার হক আদায় করবে না তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَالَّذِيْنَ يَكْنِزُوْنَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُوْنَهَا فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ لا فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيْمٍ)



“আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং সেটা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।” (সূরা তাওবা ৯: ৩৪)



كَلَّا অর্থাৎ সে যেমন বিশ্বাস করছে মূলত বিষয়টি তেমন নয়। সম্পদ তাকে মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারবে না। বরং যত সম্পদের অধিকারী হোক না কেন অবশ্যই তাকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে।





الْـحُطَمَةِ জাহান্নামের অন্যতম একটি নাম। হুতামাহ অর্থ ভেঙ্গে চূরমার করা। হুতামার পরিচয় উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(نَارُ اللّٰهِ الْمُوْقَدَة)



“এটা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত অগ্নি”।



(تَطَّلِعُ عَلَي الْأَفْئِدَةِ)



মুহাম্মাদ বিন কাব (রহঃ) বলেন: আগুন সারা শরীর খেয়ে ফেলবে এমনকি যখন তা অন্তরসহ কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যাবে তখন পুনরায় আবার শরীরের দিকে ফিরে আসবে। তারা এ আগুনে বন্দি হয়ে থাকবে, সেখান থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে যাবে।



مُوْقَدَةُ অর্থ مغلقة বা বন্ধ, পরিবেষ্টিত। অর্থাৎ জাহান্নামের সকল দরজা ও পথ বন্ধ করে দেয়া হবে এবং তাদেরকে লোহার পেরেকের সাথে বেঁধে দেয়া হবে যা লম্বা লম্বা স্তম্ভের মত। যার ফলে জাহান্নাম থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে যাবে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(وَأَمَّا الَّذِيْنَ فَسَقُوْا فَمَأْوٰهُمُ النَّارُ ط كُلَّمَآ أَرَادُوْآ أَنْ يَّخْرُجُوْا مِنْهَآ أُعِيْدُوْا فِيْهَا وَقِيْلَ لَهُمْ ذُوْقُوْا عَذَابَ النَّارِ الَّذِيْ كُنْتُمْ بِه۪ تُكَذِّبُوْنَ ‏)



“আর যারা পাপ কাজ করেছে তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম। যখনই তারা সেখান থেকে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে সেথায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং তাদেরকে বলা হবে, আগুনের স্বাদ গ্রহণ (শাস্তি ভোগ) কর যা তোমরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে।” (সূরা সাজদাহ ৩২: ২০)





অর্থাৎ জাহান্নামে লম্বা লম্বা খুঁটি থাকবে যাতে বেধে জাহান্নামীদের শাস্তি দেয়া হবে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে। তারপর খুঁটির সাথে বাঁধা হবে এবং গলায় বেড়ী পরানো হবে। অতঃপর জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। (ইবনু কাসীর) সুতরাং পরনিন্দা ও অর্থলিপ্সু হওয়া থেকে সাবধান।



সূরা হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দা করে তাদের পরিণতি ভয়াবহ।

২. সম্পদের যাকাত আদায় না করে সঞ্চয় করতঃ হিসাব কষা ভয়াবহ অপরাধ।

৩. জাহান্নামের আগুনের প্রখরতা সম্পর্কে জানলাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১-৯ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ চরম দুর্ভোগ রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যে অগোচরে অন্যের নিন্দে করে এবং সাক্ষাতে ধিক্কার দেয়। এর বর্ণনা (আরবি) (পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়) (৬৮:১১) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো খোটাদানকারী এবং গীবতকারী। রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বলেন যে, সামনে মন্দ বলাকে (আরবি) বলা হয় এবং অসাক্ষাতে নিন্দে করাকে (আরবি) বলে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো মুখের ভাষায় এবং চোখের ইশারায় আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো হাত এবং (আরবি) চোখ দ্বারা কষ্ট দেয়া এবং এর অর্থ মুখ বা জিহ্বা দ্বারা কষ্ট দেয়া। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আখফাস ইবনে শুরায়েককে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়নি।

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে। যেমন অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “যে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করে রেখেছিল।” হযরত কাব (রঃ) বলেনঃ সারাদিন সে অর্থ সম্পদ উপার্জনের জন্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলো এবং রাত্রে পচা গলা লাশের মত পড়ে রইলো।

আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ সে মনে করে যে, তার ধন সম্পদ তার কাছে চিরকাল থাকবে। কখনো না। অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুমায়। হে নবী (সঃ)! তুমি কি জান হুতামাহ কি? তা তুমি জান না। তা হলো আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। জ্বালিয়ে তাদেরকে ভষ্ম করে দিবে, কিন্তু তারা মৃত্যুবরণ করবে না। হযরত সাবিত বানানী (রঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করে যখন এর অর্থ বর্ণনা করতেন তখন কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহর আযাব তাদেরকে ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেনঃ প্রজ্জ্বলিত আগুন কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর ফিরে আসে, আবার পৌঁছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ আগুন তাদের উপর আবদ্ধ করে দেয়া হবে সুদীর্ঘ স্তম্ভসমূহের মধ্যে। সূরা বালাদ’ এর তাফসীরেও এ ধরণের বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এ রকম বর্ণনা রয়েছে। আগুনের স্তম্ভের মধ্যে লম্বা লম্বা দরজা রয়েছে।

হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) কিরআত (আরবি) রয়েছে। ঐ সব জাহান্নামীদের স্কন্ধে শিকল বাধা থাকবে। লম্বা লম্বা স্তম্ভের মধ্যে আবদ্ধ করে তাদের উপর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। সেই আগুনের স্তম্ভের মধ্যে তাদেরকে নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের জন্যে ভারী বেড়ী এবং শিকল থাকবে। তাতে তাদেরকে বন্দী করে দেয়া হবে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।