আল কুরআন


সূরা আল-আসর (আয়াত: 2)

সূরা আল-আসর (আয়াত: 2)



হরকত ছাড়া:

إن الإنسان لفي خسر ﴿٢﴾




হরকত সহ:

اِنَّ الْاِنْسَانَ لَفِیْ خُسْرٍ ۙ﴿۲﴾




উচ্চারণ: ইন্নাল ইনছা-না লাফী খুছর।




আল বায়ান: নিশ্চয় সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ততায় নিপতিত।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২. নিশ্চয় মানুষ(১) ক্ষতির মাঝে নিপতিত(২),




তাইসীরুল ক্বুরআন: মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে (ডুবে) আছে,




আহসানুল বায়ান: ২। মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত। [1]



মুজিবুর রহমান: মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।



ফযলুর রহমান: মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।



মুহিউদ্দিন খান: নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত;



জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ মানুষ আলবৎ লোকসানে পড়েছে, --



Sahih International: Indeed, mankind is in loss,



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২. নিশ্চয় মানুষ(১) ক্ষতির মাঝে নিপতিত(২),


তাফসীর:

(১) মানুষ শব্দটি একবচন। এখানে মানুষ বলে সমস্ত মানুষই উদ্দেশ্য। কারণ, পরের বাক্যে চারটি গুণ সম্পন্ন লোকদেরকে তার থেকে আলাদা করে নেয়া হয়েছে। তাই এটা অবশ্যি মানতে হবে যে, এখানে মানুষ শব্দটিতে দুনিয়ার সমস্ত মানুষ সমানভাবে শামিল। কাজেই উপরোল্লিখিত চারটি গুণাবলী কোন ব্যক্তি, জাতি বা সারা দুনিয়ার সমস্ত মানুষ যার-ই মধ্যে থাকবে না। সেই ক্ষতিগ্ৰস্ত হবে, এই বিধানটি সর্বাবস্থায় সত্য প্রমাণিত হবে। [আদওয়াউল বায়ান, ফাতহুল কাদীর]

(২) আভিধানিক অর্থে ক্ষতি হচ্ছে লাভের বিপরীত শব্দ। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে এ শব্দটির ব্যবহার এমন সময় হয় যখন কোন একটি সওদায় লোকসান হয়, পুরো ব্যবসাটায়। যখন লোকসান হতে থাকে। আবার সমস্ত পুঁজি লোকসান দিয়ে যখন কোন ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে যায়। তখনো এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। [ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ২। মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত। [1]


তাফসীর:

[1] এটি হল কসমের জওয়াব। মানুষের ক্ষতি ও ধ্বংস সুস্পষ্ট। যেহেতু যতক্ষণ সে জীবিত থাকে ততক্ষণ তার দিনরাত মেহনত ও পরিশ্রমের সাথে অতিবাহিত হয়। অতঃপর সে যখন মৃত্যু বরণ করে তখনও তার আরাম ও শান্তি নসীব হয় না। বরং সে জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ ও গুরুত্ব:



العصر শব্দের অর্থ সময়, কাল, যুগ ইত্যাদি। সূূরার প্রথম আয়াতে উল্লিখিত العصر শব্দ থেকেই উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে।



আব্দুল্লাহ বিন হাফস (রাঃ) বলেন : দুজন সাহাবীর অভ্যাস ছিল যে, যখন তারা পরস্পর সাক্ষাৎ করত তখন একজন এ সূরাটি পড়তেন এবং অপরজন শুনতেন। তারপর সালাম বিনিময় করে বিদায় নিতেন। (বায়হাকী হা. ৯০৫৮, সনদ সহীহ)



ইমাম শাফেঈ (রহঃ) এ সূরার গুরুত্ব বুঝাতে বলেছেন :



لو ما انزل الله علي الخلق إلا هذه السورة لكقته



সৃষ্টি জীবের জন্য আল্লাহ তা‘আলা এ সূরা ছাড়া অন্য কিছু অবতীর্ণ না করলেও তা যথেষ্ট হত। (ইবনু কাসীর)



ঐতিহাসিকগণ বলেছেন :



আমর ইবনুল আস (রাঃ) মুসলিম হওয়ার পূর্বে একবার ভণ্ডনাবী মুসায়লামা কাযযাবের কাছে গিয়েছিলেন। তখন মুসায়লামা তাকে বলেন : তোমাদের নাবীর ওপর সম্প্রতি কী নাযিল হয়েছে? তিনি বললেন : তাঁর ওপরে অতি সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। মুসায়লামা কাযযাব বলল : সেটা কি? তখন আমর ইবনুল আস (রাঃ) তাকে সূরা আছর শুনিয়ে দিলেন। অতঃপর ভণ্ডনাবী মুসায়লামা কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল : আমার কাছেও এরূপ সূরা নাযিল হয়েছে। আমর ইবনুল আ‘স (রাঃ) বললেন : সেটা কী? তখন মুসায়লামা বলল : হে ওয়াবর (বিড়াল জাতীয় ছোট প্রাণী)! তোমার কাছে কেবল দু’টি বড় কান ও সীনা। আর তোমার বাকী সবই ফালতু। অতঃপর মুসায়লামা জিজ্ঞাসা করল : কেমন লাগল? জবাবে আমর ইবনুল আস (রাঃ) বললেন : আল্লাহ তা‘আলার শপথ! তুমি ভালভাবেই জানো যে, আমি জানি তুমি মিথ্যা বলছ। (ইবনু কাসীর)



তাফসীর:



الْعَصْرِ আছর দ্বারা উদ্দেশ্য কী এ নিয়ে মুফাসসিরদের মাঝে কয়েকটি মত পাওয়া যায়। তার মধ্যে অন্যতম হলো :



১. ইমাম বুখারী (রহঃ) বর্ণনা করেন, ইয়াহইয়া বলেন : আছর হলো যুগ আল্লাহ তা‘আলা যুগের শপথ করেছেন। (সহীহ বুখারী)



২. হাসান বাসরী ও কাতাদাহ (রহঃ) বলেন : আসর দ্বারা উদ্দেশ্য : সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়া ও অস্ত যাওয়ার মধ্যবর্তী সময় (অর্থাৎ আসরের সময়)।



৩. প্রসিদ্ধ তাবেয়ী মুকাতিল (রহঃ) বলেন : আসর দ্বারা উদ্দেশ্য আছরের সালাত। কেননা এটা এমন একটি সালাত যা সংরক্ষণের ব্যাপারে বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।



এ আসরের শপথ করে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন : সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। অর্থাৎ যতক্ষণ মানুষ জীবিত থাকে ততক্ষণ দুনিয়ার পেছনে পড়ে দীন ও আখিরাত সম্পর্কে গাফেল হয়ে নিজেকে জাহান্নামের দিকে ঢেলে দেয়। এ ক্ষতিগ্রস্তের বিভিন্ন স্তর রয়েছে : কেউ সর্বস্ব ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন যার ইহকাল ও আখিরাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার কেউ কোন দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, তাই আল্লাহ তা‘আলা সব মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত বলে সম্বোধন করেছেন, তবে যারা চারটি বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তারা ব্যতীত। (১) যারা প্রকৃত ঈমানদার,



(২) যারা সৎ আমলকারী,

(৩) যারা মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করে,

(৪) দীনের পথে যাবতীয় দুঃখ কষ্ট ও মসিবতে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়। সু

তরাং যারা এ চারটি বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তারা দুনিয়া ও আখিরাতের সকল ক্ষতিগ্রস্ততা থেকে মুক্ত। আমাদের উচিত এ চারটি বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে সকল প্রকার ক্ষতি থেকে মুক্ত হয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা অর্জন করা।



সূরা হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সূরাটির গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত হলাম।

২. চারটি বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মু’মিন ছাড়া প্রত্যেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।

৩. মানুষ আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কোন বস্তুর নামে শপথ করতে পারবে না।

৪. নিজে সৎ আমল করতে হবে, সেই সাথে অন্যদেরও সৎ আমলের দিকে আহ্বান করতে হবে। শুধু নিজে সৎ আমল করব, অন্যকে আহবান করব না তা যেমন অনুচিত তেমনি অন্যকে সৎ আমলের দিকে আহ্বান করব, কিন্তু নিজে করব না তা-ও অনুচিত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: বর্ণিত আছে যে, হযরত আমর ইবনে আস (রাঃ) মুসলমান হওয়ার পূর্বে একবার মুসাইলামা কাযযাবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ঐ সময় মুসাইলামা নবুওয়াতের মিথ্যা দাবী করেছিল। হযরত আমর (রাঃ)-কে সে জিজ্ঞাসা করলোঃ “এখন কি তোমাদের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কোন অহী অবতীর্ণ হয়েছে?” হযরত আমর (রাঃ) জবাবে বলেনঃ “একটি সংক্ষিপ্ত, অলংকার পূর্ণ সূরা নাযিল হয়েছে।মুসাইলামা জিজ্ঞেস করলোঃ “সেটি কি?” হযরত আমর (রাঃ) তখন (আরবি) সূরাটি পাঠ করে শুনালেন। মুসাইলামা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললোঃ “জেনে রেখো, আমার উপরও এরকম সূরা নাযিল হয়েছে। হযরত আমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “সেটি কি?” সে তখন বললোঃ (আরবি)

তারপর জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আমর (রাঃ)! বল, তোমার অভিমত কি?” তখন হযরত আমর (রাঃ) বললেনঃ “তুমি তো নিজেই জান যে, তোমার মিথ্যা ও ভণ্ডামী সম্পর্কে আমি অবহিত রয়েছি।” হলো বিড়ালের মত আকৃতি বিশিষ্ট একটা পশু। তার কান দুটি ও বুক কিছুটা প্রশস্ত ও বড়। দেহের অন্যান্য অংশ খুবই নিকৃষ্ট ও বাজে। ভণ্ড, দুবৃত্ত ও মিথ্যাবাদী মুসাইলামা এ রকম বাজে কথাকে আল্লাহ পাকের পবিত্র কালামের সাথে তুলনা করতে চেয়েছিল। তার এ ধরনের ঘৃণ্য ভণ্ডামী দেখে আরবের মূর্তি পূজকরাও তাকে মিথ্যাবাদী এবং ফালতু বলে সহজেই বুঝে নিয়েছিল।

দু’জন সাহাবীর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তাঁদের পরস্পর সাক্ষাৎ হতো তখন একজন এ সূরাটি পড়তেন এবং অপরজন শুনতেন। তারপর পরস্পর সালাম বিনিময় করে বিদায় নিতেন।

হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, মানুষ যদি এই একটি মাত্র সুরা চিন্তা ভাবনা ও মনোযোগের সাথে পাঠ করে এবং অনুধাবন করে তবে এই একটি সূরাই যথেষ্ট।


১-৩ নং আয়াতের তাফসীর

‘আসর এর অর্থ হলো কাল বা সময়, যেই কাল বা সময়ে মানুষ পাপ পূণ্যের কাজ করে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, আসর এর অর্থ হলো আসরের নামায বা আসরের নামাযের সময়। কিন্তু প্রথমোক্ত উক্তিটিই মাশহুর বা প্রসিদ্ধ। এই কসমের পর আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ নিশ্চয়ই মানুষ অত্যন্ত ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু যারা ঈমান আনে ও ভাল কাজ করে এবং একে অন্যকে সত্যের উপদেশ দেয় অর্থাৎ নিজে সৎকাজ করে ও অন্যকে সৎকাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে, আর বিপদে-আপদে নিজে ধৈর্য ধারণ করে ও অন্যকেও ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়, জনগণ কষ্ট দিলে ক্ষমার মাধ্যমে ধৈর্যের পরিচয় দেয় এবং ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে গিয়ে যে বাধাবিঘ্ন ও বিপদের সম্মুখীন হয় তাতেও ধৈর্য ধারণ করে, তারা এই সুস্পষ্ট ক্ষতি থেকে মুক্তি পাওয়ার সৌভাগ্যের অধিকারী।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।