আল কুরআন


সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 1)

সূরা আত-তাওবা (আয়াত: 1)



হরকত ছাড়া:

براءة من الله ورسوله إلى الذين عاهدتم من المشركين ﴿١﴾




হরকত সহ:

بَرَآءَۃٌ مِّنَ اللّٰهِ وَ رَسُوْلِهٖۤ اِلَی الَّذِیْنَ عٰهَدْتُّمْ مِّنَ الْمُشْرِکِیْنَ ؕ﴿۱﴾




উচ্চারণ: বারাআতুম মিনাল্লা-হি ওয়া রাছূলিহীইলাল্লাযীনা ‘আ-হাত্তুম মিনাল মুশরিকীন।




আল বায়ান: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা সে সব লোকের প্রতি মুশরিকদের মধ্য থেকে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. এটা সম্পর্কচ্ছেদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে, সে সব মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা পারস্পারিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলে।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: মুশরিকদের মধ্যেকার যাদের সঙ্গে তোমরা সন্ধিচুক্তি করেছিলে তাদের সাথে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ হতে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেয়া হল।




আহসানুল বায়ান: (১) তোমরা যে অংশীবাদীদের সাথে সন্ধি স্থাপন করেছিলে, আল্লাহ ও রসূলের পক্ষ হতে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হল। [1]



মুজিবুর রহমান: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে অব্যাহতি (ঘোষণা করা) হচ্ছে ঐ মুশরিকদের প্রতি যাদের সাথে তোমরা সন্ধি করেছিলে।*



ফযলুর রহমান: তোমরা যে মুশরিকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে তাদের প্রতি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে দায়মুক্তি (ঘোষণা করা হল)।



মুহিউদ্দিন খান: সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।



জহুরুল হক: এক অব্যাহতি আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের তরফ থেকে সেইসব বহুখোদাবাদীদের প্রতি যাদের সঙ্গে তোমরা সন্ধি করেছিলে।



Sahih International: [This is a declaration of] disassociation, from Allah and His Messenger, to those with whom you had made a treaty among the polytheists.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১. এটা সম্পর্কচ্ছেদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে, সে সব মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা পারস্পারিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলে।(১)


তাফসীর:

(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবম হিজরীতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হজের আমীর করে পাঠানোর পরে এ আয়াতসমূহ নিয়ে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে পাঠালেন। তিনি কুরবানীর দিন এগুলোকে মানুষের মধ্যে ঘোষণা করলেন। এর সাথে আরও ঘোষণা ছিল যে, এরপর আর কোন লোক উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করবে না। কোন মুশরিক হজ করবে না। মুমিন ছাড়া কেউ জান্নাতে যাবে না। এভাবে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু সেটা বলতেন, যখন অপারগ হতেন, তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১) তোমরা যে অংশীবাদীদের সাথে সন্ধি স্থাপন করেছিলে, আল্লাহ ও রসূলের পক্ষ হতে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হল। [1]


তাফসীর:

[1] মক্কা বিজয়ের পর ৯ হিজরীতে রসূল (সাঃ) আবু বাকর, আলী এবং অন্যান্য সাহাবা (রাঃ)গণকে কুরআনের এই আয়াতসমূহ ও বিধান দিয়ে মক্কা পাঠালেন, যাতে তাঁরা তা প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা করে দেন। তাঁরা নবীর আদেশ মোতাবেক ঘোষণা করলেন যে, কোন ব্যক্তি উলঙ্গ হয়ে কা’বা ঘরের তাওয়াফ করবে না। বরং আগামী বছর থেকে কোন মুশরিককে বাইতুল্লাহর হজ্জের জন্য অনুমতি দেওয়া হবে না। (বুখারীঃ নামায ও হজ্জ অধ্যায়, মুসলিমঃ হজ্জ অধ্যায়)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা:



মুফাসসিরগণ এ সূরাটির একাধিক নাম বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে দু’টি নাম প্রসিদ্ধ:

১. তাওবাহ: এ সূরাতে কয়েকজন সাহাবীর তাওবাহ কবূলের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, তাই একে তাওবাহ বলা হয়।

২. বারাআহ: একে বারাআহ বলা হয় এজন্য যে, এতে মুশরিকদের সাথে মুসলিমদের সাধারণভাবে বারাআহ বা সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলা হয়েছে এবং সূরার প্রথম শব্দটিও বারাআহ।



এটা কুরআন মাজীদের একমাত্র সূরা যার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ নেই। এ ব্যাপারে ইমাম কুরতুবী (রাঃ) পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তন্মেধ্যে:



ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি উসমান (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কী কারণে সূরা আনফালকে সূরা বারাআহর সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন? (অথচ সূরা আনফাল مثاني তথা একশত এর কম আয়াতবিশিষ্ট সূরা আর বারাআহ একশত এর বেশি আয়াতবিশিষ্ট সূরা) এবং উভয়ের মাঝে বিসমিল্লাহ লেখেননি, অনুরূপ এটাকে সাতটি দীর্ঘ সূরার মধ্যে শামিল করেছেন। উসমান (রাঃ) বলেন: কোন কোন সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ওপর অনেক আয়াতবিশিষ্ট কয়েকটি সূরা অবতীর্ণ হত। যখন আয়াত অবতীর্ণ হত তখন তিনি লেখকদের কাউকে ডেকে বলতেন: এ আয়াতটি উমুক সূরার মধ্যে রেখে দাও যার মধ্যে এরূপ এরূপ বর্ণনা রয়েছে। সূরা আনফাল মদীনায় অবতীর্ণ সূরাগুলোর মধ্যে প্রথম দিকের অন্যতম একটি, আর সূরা বারাআহ সর্বশেষ অবতীর্ণ সূরাসমূহের অন্তর্ভুক্ত। উভয় সূরার ঘটনা সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই আমি মনে করেছি সূরা বারাআহ আনফালের অন্তর্ভুক্ত। আর এ অবস্থাতেই নাবী (সাঃ) মারা গেলেন কিন্তু এ সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করে যাননি। এ কারণে আমি দুটি সূরাকে মিলিয়ে দিয়েছি; মাঝে বিসমিল্লাহ লেখিনি। আর এটাকে সাতটি দীর্ঘ সূরার মধ্যে শামিল করে দিয়েছি। (তিরমিযী হা: ৩০৮৬, আবূ দাঊদ হা: ৭৮৬, হাকিম: ২/৩৩০, ইমাম হাকিম বলেন: সনদ সহীহ)



ইমাম ইবনু কাসীর (রাঃ) বলেন: এ সূরার প্রথম অংশ ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন নাবী (সাঃ) তাবূকের যুদ্ধ হতে ফিরে আসছিলেন। তখন হাজ্জের মওসুম ছিল। মুশরিকরা নিজেদের অভ্যাস মত হাজ্জ করতে এসে উলঙ্গ অবস্থায় বায়তুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের সাথে মিলিত হতে অপছন্দ করতেন, তাই আবূ বাকর (রাঃ)-কে ঐ বছর হাজ্জের ইমাম বানিয়ে মক্কা অভিমুখে প্রেরণ করেন। মানুষকে হাজ্জের নিয়ম-কানুন শিক্ষা দেয়ার এবং মুশরিকদের মাঝে এ ঘোষণা দেয়ার জন্য যে, এ বছরের পর থেকে কোন মুশরিক হাজ্জ করতে পারবে না। তখন তিনি জনগণের মাঝে সূরা বারাআহ তেলাওয়াত করে শুনালেন। (ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



সাহাবী বারা বিন আযেব (রাঃ) বলেন:



أَخِرُ سُوْرَةٍ نَزَلَتْ بَرَاءَةٌ



সূরা বারাআহ সর্বশেষ অবতীর্ণ হওয়া সূরা। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৫৪) যখন সূরা তাওবাহ নাযিল হল তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আলী (রাঃ)-কে চারটি নির্দেশ দিয়ে মক্কায় প্রেরণ করলেন।



১. কেউ উলঙ্গ অবস্থায় কাবা তাওয়াফ করতে পারবে না।

২. এ বছরের পর কোন মুশরিক বাইতুল্লাহর নিকটে আসতে পারবে না।

৩. কোন ব্যক্তি ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মাঝে যদি কোন অঙ্গীকার থাকে তাহলে তা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে।

৪. মু’মিন ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।



১-৬ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পক্ষ থেকে এটা সেই সকল মুশরিকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা যাদের সাথে স্থায়ী অথবা চার মাসের কম অথবা চার মাসের বেশি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চুক্তি ছিল। এখন মুশরিকদের থেকে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সম্পূর্ণ মুক্ত। অতএব হে মুশরিকরা! তোমরা চার মাস (শাওয়াল, যুলকাদা, যুলহাজ্জ ও মুহাররাম) যেথায় ইচ্ছা ঘুরে বেড়াও তাতে মুসলিমদের থেকে পূর্ণ নিরাপদ থাকবে। চার মাস পর কোন অঙ্গীকার থাকবে না, কোন প্রতিশ্র“তিও থাকবে না।



(يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ)



‘মহান হাজ্জের দিবসে’ মহান হাজ্জের দিন বলতে দশই যিলহাজ্জকে বুঝানো হয়েছে। এ দিনে মিনাতে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা শুনানো হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৫৫, সহীহ মুসলিম হা: ৯৮২, তিরমিযী হা: ৯৫৭)



দশই যিলহাজ্জকে বড় হাজ্জের দিন বলার কারণ হল, এ দিনে হাজ্জের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী সম্পন্ন করা হয়। মানুষের মাঝে প্রচলন আছে যে, জুমুআর দিন আরাফা হলে ঐ হাজ্জকে বড় হাজ্জ বা হাজ্জে আকবার বলা হয়, এরূপ কথা ভিত্তিহীন। মূলত বড় হাজ্জ দ্বারা হাজ্জকে বুঝানো হয়েছে, যেহেতু উমরাকে ছোট হাজ্জ বলা হয়।



(إِلا الَّذِينَ عَاهَدْتُمْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ)



‘তবে মুশরিকদের মধ্যে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিতে আবদ্ধ’ অর্থাৎ পূর্বের বিধান থেকে ঐ সকল মুশরিকরা আলাদা যারা নির্দিষ্ট মেয়াদে চুক্তিবদ্ধ আর তোমাদের সাথে খিয়ানত করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে শত্রুদের সহযোগিতাও করেনি। তাহলে তাদের সাথে মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি পূর্ণ কর।



(فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ)



‘অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে’এখানে হারাম মাস বলতে কোন্ মাসকে বুঝানো হয়েছে তা নিয়ে একাধিক মত পাওয়া যায়।



আল্লামা সা‘দী (রহঃ) বলেন: যে মাসগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম। তাহল যুলক্বা‘দাহ, যুলহাজ্জ, মুহাররাম ও রজব। প্রবীণ মুফাসসিরদের মধ্যে ইমাম ইবনু কাসীর (রাঃ)ও এ মত পোষণ করেছেন।



(فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِيْنَ حَيْثُ وَجَدْتُّمُوهُمْ)



‘মুশরিকদেরকে যেখানে পাবে হত্যা কর’অনেকে এ আয়াতকে ব্যাপক বলেছেন। অর্থাৎ যেখানে পাও সেখানেই মুশরিকদেরকে হত্যা কর। কিন্তু মাসজিদে হারামের সীমানায় হত্যা করা নিষেধ এটাই প্রসিদ্ধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَاقْتُلُوْهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوْهُمْ وَأَخْرِجُوْهُمْ مِّنْ حَيْثُ أَخْرَجُوْكُمْ وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ ج وَلَا تُقٰتِلُوْهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتّٰي يُقَاتِلُوْكُمْ فِيْهِ ج فَإِنْ قٰتَلُوْكُمْ فَاقْتُلُوْهُمْ ط كَذٰلِكَ جَزَآءُ الْكٰفِرِيْنَ)‏



“তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তারা তোমাদেরকে যেখান থেকে বহিষ্কৃত করেছে তোমরাও তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দাও, আর হত্যা অপেক্ষা ফেত্না-ফাসাদ (কুফর ও শির্ক) গুরুতর অপরাধ এবং তোমরা তাদের সাথে মাসজিদুল হারামের নিকট যুদ্ধ কর না যে পর্যন্ত না তারা তোমাদের সাথে সেখানে যুদ্ধ করে; কিন্তু যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তবে তোমরাও তাদের সাথে যুদ্ধ কর। কাফিরদের প্রতিফল এরূপই।” (সূরা বাকারাহ ২:১৯১, ইবনে কাসীর, ৪/১২০)



مَرْصَدٍ শত্রুরা যেখানে থাকে তাকে মারসাদ বা ঘাঁটি বলা হয়। অর্থাৎ শত্রুদের প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওৎ পেতে বসে থাক, সুযোগ পেলেই হামলা করবে।



(فَإِنْ تَابُوْا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ)



‘অতঃপর তারা যদি তাওবাহ করে, সালাত কায়েম করে..’ অর্থাৎ যদি তারা শির্ক বর্জন করে তাওবাহ করতঃ ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। কেননা তখন তারা তোমাদের দীনী ভাই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَإِنْ تَابُوْا وَأَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَاٰتَوُا الزَّكٰوةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّيْنِ ط وَنُفَصِّلُ الْاٰيٰتِ لِقَوْمٍ يَّعْلَمُوْنَ)



“অতঃপর তারা যদি তাওবাহ করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তবে তারা তোমাদের দীনী ভাই; জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আমি নিদর্শন স্পষ্টরূপে বর্ণনা করি।”(সূরা তাওবাহ ৯:১১)



রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর রাসূল- এ সাক্ষ্য দিয়ে সালাত কায়িম করবে, যাকাত দেবে; নচেৎ আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। (সহীহ বুখারী হা: ২৫)



(وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِيْنَ اسْتَجَارَكَ)



‘মুশরিকদের মধ্যে যদি কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে’অর্থাৎ যে সকল মুশরিকদেরকে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাদের মধ্য হতে কেউ যদি নিরাপত্তা চায় তাহলে তাকে এমনভাবে নিরাপত্তা দাও যেন কুরআন শ্রবণ করতে পারে। আশা করা যায়, সে ঈমান আনবে। যদি কোন পরিবর্তন না হয় তাহলে তাদের বাসস্থানে নিরাপদে পৌঁছে দাও।



সুতরাং যেখানে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল কাফির-মুশরিকদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিয়েছেন সেখানে কোন মু’মিনের সম্পর্ক রাখা ঈমানের পরিচায়ক হতে পারে না। এটা সর্বদা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, তারা কখনো আমাদের জন্য কল্যাণ চায় না, যদিও বাহ্যিক হিতাকাক্সিক্ষতা প্রকাশ করে। তবে তারা যদি তাওবাহ করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তাহলে তারা তোমাদের দীনী ভাই, তাদের সাথে সম্পর্ক করতে পারবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সাধারণভাবে অমুসলিমদের সাথে কোন মুসলিমের কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে ইসলামের স্বার্থে মুসলিম ও মুশরিকদের মাঝে চুক্তি করা বৈধ।

২. নির্দিষ্ট মেয়াদে সম্পাদিত চুক্তিগুলো যথাযথভাবে পূর্ণ করা আবশ্যক।

৩. দশই যিলহাজ্জকে হাজ্জে আকবার বলা হয়।

৪. কোন ব্যক্তি তাওবাহ করতঃ সালাত কায়েম করলে, যাকাত প্রদান করলে সে মুসলিম ভাই বলে গণ্য হবে।

৫. কোন মুশরিক নিরাপত্তা চাইলে নিরাপত্তা দেয়া যাবে। তবে এমনভাবে নিরাপত্তা দেয়া উচিত যাতে সে ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়, আশা করা যায় এতে সে ইসলাম গ্রহণ করবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১-২ নং আয়াতের তাফসীর:

এই সম্মানিত সূরাটি হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর নাযিলকৃত সর্বশেষ সূরা । সহীহ বুখারীতে বারা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সর্বশেষ আয়াত হচ্ছে- (আরবী) (৪:১৭৬) এই আয়াতটি এবং সর্বশেষ সূরা হচ্ছে সূরায়ে বারাআত। (ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন) এই সূরার প্রথমে বিসমিল্লাহ লিখিত না থাকার কারণ এই যে, সাহাবীগণ আমীরুল মুমিনীন উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)-কে অনুকরণ করে কুরআনে এই সূরার পূর্বে বিসমিল্লাহ লিখেননি। সুনানে তিরমিযীতে রয়েছে যে, ইবনে আব্বাস (রাঃ) উসমান (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত সূরায়ে আনফালকে (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত সূরায়ে বারাআতের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন এবং এ দু’টির মাঝে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লিখেননি, আর এটাকে সাতটি দীর্ঘ সূরার মধ্যে রেখেছেন, এর কারণ কি?” উসমান (রাঃ) উত্তরে বলেন, কোন কোন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর একই সাথে কয়েকটি সূরা অবতীর্ণ হতো। যখন কোন আয়াত অবতীর্ণ হতো তখন তিনি লেখকদের কাউকে ডেকে বলতেনঃ “এই আয়াতটিকে অমুক সূরার মধ্যে রেখে দাও যার মধ্যে এর বর্ণনা রয়েছে।” মদীনায় সর্বপ্রথম সূরায়ে আনফাল অবতীর্ণ হয়েছিল এবং সর্বশেষে অবতীর্ণ হয়েছিল সূরায়ে বারাআত। বর্ণনায় এ দুটো সূরার মধ্যে মিল ছিল। তাই আমি ভয় পেলাম যে, না জানি এটা হয়তো সূরায়ে আনফালেরই অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইনতিকাল হয়ে গেল এবং এ সূরাটি সূরায়ে আনফালের অন্তর্ভুক্ত কি-না তা তিনি বলে গেলেন না। এ জন্যেই আমি দু’টি সূরাকে মিলিতভাবে লিখেছি এবং মধ্যখানে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” লিখিনি। আর এটাকে সাতটি দীর্ঘ সূরার মধ্যে রেখেছি। এই সূরার প্রথম অংশ ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন নবী (সঃ) তাবূকের যুদ্ধ হতে ফিরে আসছিলেন। ওটা হজ্বের মওসুম ছিল। মুশরিকরা নিজেদের অভ্যাস মত হজ্ব করতে এসে উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ শরীফের চারদিকে তাওয়াফ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সাথে মিলিত হতে অপছন্দ করে আবু বকর (রাঃ)-কে ঐ বছর হজ্বের ইমাম বানিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা করান, যেন তিনি মুসলিমদেরকে হজ্বের আহকাম শিক্ষা দেন এবং মুশরিকদের মধ্যে ঘোষণা করে দেন যে, তারা যেন আগামী বছর হজ্ব করতে না আসে। আর জনসাধারণের মধ্যে তিনি যেন সূরা বারাআতেরও ঘোষণা শুনিয়ে দেন। তাঁর পিছনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আলী (রাঃ)-কেও পাঠিয়ে দেন যে, তার নিকটতম আত্মীয় হিসেবে তিনিও যেন তাঁর পয়গাম পৌঁছিয়ে দেন। এর বিস্তারিত বর্ণনা ইনশাআল্লাহ আসছে।

ঘোষণা হচ্ছে- “এটা হচ্ছে সম্পর্ক ছিন্নতা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পক্ষ হতে। কেউ কেউ বলেন যে, এই ঘোষণা ঐ চুক্তি ও অঙ্গীকার সম্পর্কে, যার জন্যে কোন সময় নির্দিষ্ট ছিল না বা যাদের সাথে চার মাসের কম সময়ের জন্যে চুক্তি ছিল। কিন্তু যাদের সাথে চুক্তির মেয়াদ দীর্ঘ ছিল ওটা যথা নিয়মে বাকী থেকে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তাদের অঙ্গীকার বা চুক্তি তাদের মেয়াদ পর্যন্ত পূর্ণ কর।” (৯:৪) হাদীস শরীফেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের সাথে যাদের সন্ধি বা চুক্তি রয়েছে, আমরা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ঐ চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবো।” এই ব্যাপারে আরো উক্তি রয়েছে। কিন্তু এই উক্তিটিই সবচেয়ে বেশী উত্তম ও দৃঢ়। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাদের সাথে চুক্তি হয়েছিল, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে চার মাসের সীমা নির্ধারণ করে দেন। আর যাদের সাথে চুক্তি ছিল না তাদের জন্যে হারাম মাসগুলো অতিক্রান্ত হওয়াকে সীমা নির্ধারণ করেন। অর্থাৎ ১০ই যিলহজ্ব হতে মুহররম মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত পঞ্চাশ দিন। এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাদের সাথে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয় যে পর্যন্ত না তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর যাদের সাথে চুক্তি রয়েছে তারা ১০ই যিলহজ্ব ঘোষণার দিন থেকে নিয়ে ২০শে রবিউল আখির পর্যন্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। অতঃপর ইচ্ছা করলে মুকাবিলা করবে। এটা হচ্ছে নবম হিজরীর ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবূ বকর (রাঃ)-কে হজ্বের আমীর নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন এবং আলী (রাঃ)-কে কুরআনের এই সূরাটির ত্রিশটি অথবা চল্লিশটি আয়াতসহ পাঠিয়ে দেন যে, তিনি যেন চার মাসের মেয়াদের ঘোষণা করেন। তিনি তাদের তাঁবুতে, ঘরে এবং মনজিলে গিয়ে গিয়ে এ আয়াতগুলো তাদেরকে শুনিয়ে দেন। সাথে সাথে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ নির্দেশও শুনিয়ে দেন যে, এ বছরের পর কোন মুশরিক যেন হজ্ব করতে না আসে এবং কোন উলঙ্গ ব্যক্তি যেন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ না করে। খুযাআ' গোত্র, মুদলিজ কবিলা এবং অন্যান্য সকল গোত্রের জন্যেও এই ঘোষণাই বলবৎ ছিল। তাবুক থেকে প্রত্যাবর্তন করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হজ্ব করার ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু সেখানে মুশরিকদের আগমন ও উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফকরণ তার নিকট অপছন্দনীয় ছিল। এই জন্যে তিনি হজ্ব করলেন না এবং ঐ বছর আবু বকর (রাঃ) ও আলী (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। তাঁরা যিল মাজাযের বাজারসমূহে প্রত্যেক অলিতে-গলিতে, প্রত্যেক তাঁবুতে এবং মাঠে ময়দানে ঘোষণা করে দেন যে, চার মাস পর্যন্ত মুশরিকদেরকে অবকাশ দেয়া হলো, এর পরেই মুসলিমদের তরবারী তাদের উপর আঘাত হানবে। ঐ চার মাস হচ্ছে যিলহজ্ব মাসের বিশ দিন, মুহররম, সফর ও রবিউল আওয়াল এই তিন মাস পুরো এবং রবিউল আখির মাসের ১০ দিন। যুহরী (রঃ) বলেন যে, শাওয়াল থেকে মুহররম মাস পর্যন্ত অবকাশ ছিল। কিন্তু এই উক্তিটি গারীব বা দুর্বল এবং এটা মনেও ধরে না যে, হুকুম পৌছার পূর্বেই মেয়াদের গণনা কিভাবে হতে পারে?





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।