আল কুরআন


সূরা আল-বায়্যিনাহ (আয়াত: 1)

সূরা আল-বায়্যিনাহ (আয়াত: 1)



হরকত ছাড়া:

لم يكن الذين كفروا من أهل الكتاب والمشركين منفكين حتى تأتيهم البينة ﴿١﴾




হরকত সহ:

لَمْ یَکُنِ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا مِنْ اَهْلِ الْکِتٰبِ وَ الْمُشْرِکِیْنَ مُنْفَکِّیْنَ حَتّٰی تَاْتِیَهُمُ الْبَیِّنَۃُ ۙ﴿۱﴾




উচ্চারণ: লাম ইয়াকুনিল্লাযীনা কাফারূমিন আহলিল কিতা-বি ওয়াল মুশরিকীনা মুনফাক্কীনা হাত্তাতা’তিয়াহুমুল বাইয়িনাহ।




আল বায়ান: কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করে তারা ও মুশরিকরা, তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ না আসা পর্যন্ত (নিজদের অবিশ্বাসে) অটল থাকবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে এবং মুশরিকরণ(১), তারা নিবৃত্ত হবে না যতক্ষন না তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ আসবে(২)—




তাইসীরুল ক্বুরআন: কিতাবধারীদের মধ্যে যারা কাফির ছিল তারা আর মুশরিকরা (তাদের ভ্রান্ত মত ও পথ হতে) সরে আসত না যতক্ষণ না তাদের কাছে আসত সুস্পষ্ট প্রমাণ।




আহসানুল বায়ান: ১। আহলে কিতাব[1] ও মুশরিকদের[2] মধ্যে যারা কুফরী করেছিল, তারা আপন মতে অবিচলিত ছিল, যতক্ষণ না এল তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ;



মুজিবুর রহমান: কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল এবং মুশরিকরা আপন মতে অবিচল ছিল তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমান না আসা পর্যন্ত।



ফযলুর রহমান: কিতাবধারী (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) এবং মুশরিকদের মধ্যে যারা (সত্যকে) অবিশ্বাস করে তারা স্পষ্ট প্রমাণ না আসা পর্যন্ত তাদের অবিশ্বাস ছাড়ত না;



মুহিউদ্দিন খান: আহলে-কিতাব ও মুশরেকদের মধ্যে যারা কাফের ছিল, তারা প্রত্যাবর্তন করত না যতক্ষণ না তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ আসত।



জহুরুল হক: গ্রন্থধারীদের মধ্যে থেকে যারা অবিশ্বাস পোষণ করে আর বহুখোদাবাদীরা তাদের ছাড়ানো যাচ্ছিল না যতক্ষণ না তাদের কাছে এসেছে সুস্পষ্ট প্রমাণ --



Sahih International: Those who disbelieved among the People of the Scripture and the polytheists were not to be parted [from misbelief] until there came to them clear evidence -



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১. আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে এবং মুশরিকরণ(১), তারা নিবৃত্ত হবে না যতক্ষন না তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ আসবে(২)—


তাফসীর:

(১) আহলে কিতাব ও মুশরিক উভয় দলই কুফরী কর্মকাণ্ডে জড়িত হলেও দু’দলকে দুটি পৃথক নাম দেয়া হয়েছে। যাদের কাছে আগের নবীদের আনা কোন আসমানী কিতাব ছিল, তা যত বিকৃত আকারেই থাক না কেন, তারা তা মেনে চলতো, তাদেরকে বলা হয় আহলি কিতাব; আর তারা হল ইয়াহুদী ও নাসারীগণ। আর যারা মূর্তি-পূজারী বা অগ্নি-পূজারী, তারা-ই মুশরিক। [ইবন কাসীর]


(২) অর্থাৎ তারা তাদের কুফরী থেকে নিবৃত্ত হবে না যতক্ষণ না একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ এসে তাদেরকে কুফরীর প্রতিটি গলদ ও সত্য বিরোধী বিষয় বুঝাবে এবং যুক্তিপ্রমাণের সাহায্যে সুস্পষ্ট পদ্ধতিতে সত্য সঠিক পথ তাদের সামনে পেশ করবে, এর মাধ্যমে তারা কুফরী থেকে বের হতে পারবে। এর মানে এ নয় যে, এই সুস্পষ্ট প্রমাণটি এসে যাবার পর তারা সাবাই কুফরী পরিত্যাগ করবে। তবে তার আসার পরও তাদের মধ্য থেকে যারা নিজেদের কুফরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তার দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়। এরপর তারা আল্লাহর কাছে অভিযোগ করতে পারবে না যে, আপনি আমাদের হেদায়াতের কোন ব্যবস্থা করেননি। আল্লাহ অন্যত্র বলেন, “অনেক রাসূল পাঠিয়েছি যাদের কথা আগে আমি আপনাকে বলেছি এবং অনেক রাসূল, যাদের কথা আপনাকে বলিনি এবং মূসার সাথে আল্লাহ সাক্ষাত কথা বলেছিলেন। এই রাসূলদেরকে সুসংবাদদানকারী ও সতর্ককারী করা হয়েছে যাতে রাসূলদের পর লোকদের জন্য আল্লাহর বিরুদ্ধে কোন যুক্তি না থাকে।” [সূরা আন-নিসা: ১৬৪–১৬৫]

আরও বলেন, “হে আহলে কিতাব! রাসূলদের সিলসিলা দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার পর প্রকৃত সত্যকে সুস্পষ্ট করার জন্য তোমাদের কাছে আমার রাসূল এসেছে। যাতে তোমরা বলতে না পারো আমাদের কাছে না কোন সুসংবাদদানকারী এসেছিল, না এসেছিল কোন সতর্ককারী। কাজেই নাও, এখন তোমাদের কাছে সুসংবাদদানকারী এসে গেছে এবং সতর্ককারীও।” [সূরা আল-মায়িদাহ: ১৯]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ১। আহলে কিতাব[1] ও মুশরিকদের[2] মধ্যে যারা কুফরী করেছিল, তারা আপন মতে অবিচলিত ছিল, যতক্ষণ না এল তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ;


তাফসীর:

[1] এ থেকে উদ্দেশ্য ইয়াহুদী ও নাসারা (খ্রিষ্টান)।

[2] ‘মুশরিক’ (অংশীবাদী) বলে আরব এবং অনারবের ঐ সমস্ত লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা অগ্নি ও মূর্তি পূজা করত। مُنفَكِّين মানে বিরত বা বিচলিত। البَيِّنة (দলীল বা সুস্পষ্ট প্রমাণ) বলে নবী (সাঃ)-কে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, ইয়াহুদী ও নাসারা, আরব এবং অনারবের মুশরিক বা অংশীবাদীরা নিজেদের কুফর ও শিরক থেকে ফিরে আসার নয়; যতক্ষণ পর্যন্ত না মুহাম্মাদ (সাঃ) তাদের নিকট পবিত্র কুরআনসহ এসে উপস্থিত হয়েছেন এবং তাদের অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতা ব্যক্ত করে তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান করেছেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ ও গুরুত্ব:



الْبَيِّنَةُ অর্থ সুস্পষ্ট প্রমাণ, দলীল ইত্যাদি। অত্র সূরার প্রথম আয়াতে উল্লিখিত শব্দ থেকেই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়াও এ সূরাকে সূরা “লাম ইয়াকুন” বলা হয়।



আনাস বিন মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উবাই বিন কাব (রাঃ)-কে বললেন : আল্লাহ তা‘আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন তোমাকে “লাম ইয়াকুনিল্লাযীনা কাফারু” পাঠ করে শুনাই। উবাই (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন : আল্লাহ তা‘আলা কি আপনার কাছে আমার নাম উল্লেখ করেছেন? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন : হ্যাঁ, উবাই খুুশিতে কেঁদে ফেললেন। (সহীহ বুখারী হা. ৪৯৫৯)



ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন : এর মধ্যে ছাত্রের প্রতি শিক্ষকের শিক্ষাদানের তাৎপর্যগত বিষয়টি ফুঠে উঠেছে। অন্য বিদ্বান বলেন : এর মধ্যে এ শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে যে, কেউ নিম্নস্তরের কাউকে শিক্ষাদানে যেন কুণ্ঠাবোধ না করে।



১-৫ নম্বর আয়াতের তাফসীর:



(أَهْلِ الْكِتٰبِ) আহলে কিতাব দ্বারা ইয়াহূদ ও খ্রিস্টানরা উদ্দেশ্য যারা আসমানী কিতাব পেয়েছিল।



الْمُشْرِكِيْنَ মুশরিক দ্বারা উদ্দেশ্য প্রত্যেক উম্মতের মুশরিক যারা মূর্তি ও অগ্নিপূজক।



مُنْفَكِّيْنَ অর্থ : تاركين অর্থাৎ ইয়াহূদী, খ্রিস্টান ও আরব-অনারব মুশরিকদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ আসা পর্যন্ত সর্বদা কুফর ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে লিপ্ত ছিল। এখানে সুস্পষ্ট প্রমাণ বলতে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে যেসব প্রমাণের ওয়াদা দেয়া হয়েছিল তা। যেমন পরের আয়াতেই আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করেছেন।



(رَسُوْلٌ مِّنَ اللّٰهِ) অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে।



(صُحُفًا مُّطَهَّرَةً) পবিত্র গ্রন্থ দ্বারা কুরআনকে বুঝানো হয়েছে যা লাওহে মাহফূজে লিপিবদ্ধ। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(صُحُفٍ مُّکَرَّمَةٍﭜمَّرْفُوْعَةٍ مُّطَھَّرَةٍۭﭝبِاَیْدِیْ سَفَرَةٍﭞ کِرَامٍۭ بَرَرَةٍ)



“তা সম্মানিত কিতাবে (লাওহ মাহফূজে) লিপিবদ্ধ যা উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ও পবিত্র। এমন লেখকদের হাতে থাকে যারা সম্মানিত ও সৎ।” (সূরা ‘আবাসা ৮০ : ১৩-১৬)



(فِيْهَا كُتُبٌ قَيِّمَةٌ)



অর্থাৎ এ সব পবিত্রগ্রন্থে রয়েছে সত্য সংবাদ ও ন্যায়সঙ্গত নির্দেশ যা সত্যের ও সঠিক পথের দিকে দিকনির্দেশনা প্রদান করে।



(وَمَا تَفَرَّقَ الَّذِيْنَ أُوْتُوا الْكِتٰبَ)



অর্থাৎ আহলে কিতাবগণ মুহাম্মাদ (সাঃ) যে সত্য নাবীÑএ ব্যাপারে তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পরেই মতানৈক্য করেছে। এর পূর্বে তারা নাবী (সাঃ)-এর নবুওয়াতের ব্যাপারে একমত ছিল। যখন নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) আগমন করলেন তখন তারা অস্বীকার করল। মূলত এর কারণ হলো নাবী (সাঃ) তাদের ঘৃণ্য আশানুপাতে হয়নি। এদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَا تَكُوْنُوْا كَالَّذِيْنَ تَفَرَّقُوْا وَاخْتَلَفُوْا مِنْم بَعْدِ مَا جَا۬ءَهُمُ الْبَيِّنٰتُ ط وَأُولٰ۬ئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيْمٌ)‏



“তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং তাদের কাছে প্রমাণ আসার পর মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি। (আল ইমরান ২: ১০৫)



(وَمَآ أُمِرُوْآ إِلَّا لِيَعْبُدُوا) এ কথাটি তেমন যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(وَمَآ اَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِکَ مِنْ رَّسُوْلٍ اِلَّا نُوْحِیْٓ اِلَیْھِ اَنَّھ۫ لَآ اِلٰھَ اِلَّآ اَنَا فَاعْبُدُوْنِ)



“আমি তোমার পূর্বে যখন কোন রাসূল প্রেরণ করেছি তার প্রতি এ ওয়াহী করেছি যে, ‘আমি ব্যতীত অন্য কোন সত্যিকার মা‘বূদ নেই; সুতরাং আমারই ‘ইবাদত কর‎।’ (আম্বিয়া ২১ : ২৫)





حنيف শব্দের অর্থ হলো : ঝুঁকে যাওয়া, কোন একটি কাজের প্রতি একনিষ্ঠ হওয়া। حُنَفَا۬ءَ শব্দটি তার বহুবচন। অর্থাৎ যারা শির্ক থেকে তাওহীদের প্রতি এবং সমস্ত দীন বর্জন করে কেবলমাত্র দীন ইসলামের প্রতি ঝুঁকে ও একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে।



(ذٰلِكَ دِيْنُ الْقَيِّمَة)



অর্থাৎ তাওহীদের সাথে একনিষ্ঠভাবে সকল ইবাদত সম্পাদন করার ধর্মই একমাত্র সঠিক ধর্ম, যা জান্নাতের পথে পৌঁছে দেয়।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. পূর্ববর্তী দীনগুলোতে হকের সাথে বাতিল সংমিশ্রণ করা হয়েছিল।

২. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আহলে কিতাবের বর্র্ণনানুপাতে আসার পরেও তারা অহংকারবশত তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

৩. সকল দীনের মূলমন্ত্র ছিল একই, তা হলো এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: মুসনাদে আহমাদে হযরত আমর ইবনু সাবিত আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ যখন (আরবি) সূরাটি শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ হয় তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে এ সূরাটি হযরত উবাই (রাঃ)-এর নিকট পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উবাই (রাঃ)-কে এ কথা জানানোর পর হযরত উবাই (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেখানে কি আমার কথা আলোচিত হয়েছে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হ্যা, হ্যাঁ।” হযরত উবাই (রাঃ) তখন কেঁদে ফেললেন।

মুসনাদেরই অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উবাই (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহ্র রাসূল (সঃ)! আল্লাহ্ তা'আলা কি আমার নাম উচ্চারণ করেছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে হ্যা’ বললেন। তখন হযরত উবাই (রাঃ) কেঁদে ফেললেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ)ও বর্ণনা করেছেন)

মুসনাদে আহমাদের অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, যে সময় হযরত উবাই (রাঃ) এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন সে সময় বর্ণনাকারী হযরত উবাই (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে আবু মুনযির (রাঃ)! তাহলে তো আপনি খুবই আনন্দিত হয়েছেন?” উত্তরে হযরত উবাই (রাঃ) বলেনঃ কেন আনন্দিত হবে না? আল্লাহ্ রাম্বুল আলামীন স্বয়ং বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তুমি বলে দাওঃ আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা লাভ করে যেন তারা আনন্দিত হয়। এটা তারা যা পুঞ্জীভূত করে তার চেয়ে বহুগুণে উত্তম।” (১০:৫৮)

অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উবাই (রাঃ)-এর সামনে এ সূরাটি পড়ার পর পাঠ করেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “আদম সন্তান যদি একটা উপত্যকা পূর্ণ মাল যাঞ্চা করে, অতঃপর তাকে তা দেয়া হয় তবে অবশ্যই সে দ্বিতীয়টির জন্যে প্রার্থনা করবে, সেটাও যদি তাকে প্রদান করা হয় তবে সে তৃতীয়টির জন্যে প্রার্থনা করবে। আদম সন্তানের পেট মাটি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ভরবে না। তবে যে তাওবা করবে আল্লাহ্ তার তাওবা কবুল করবেন। আল্লাহর কাছে ঐ ব্যক্তিই দ্বীনদার যে একাগ্রচিত্তে তাঁর ইবাদত করে। তবে সে মুশরিক, ইয়াহুদী এবং নাসারা হতে পারবে না। যে ব্যক্তি কোন পুণ্য কাজ করবে তার অমর্যাদা করা হবে না।” (জামে তিরমিযীতেও বর্ণনাটি রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)

হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আবুল মুনযির (রাঃ)! আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, আমি যেন তোমার সামনে কুরআন পাঠ করি।” হযরত উবাই (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি, আপনার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং আপনার কাছে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেছি।” নবী করীম (সঃ) ঐ কথারই পুনরাবৃত্তি করলেন। হযরত উবাই (রাঃ) তখন আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কথা কি সেখানে আলোচনা করা হয়েছে?` উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা, তোমার নাম ও নসব এ সবই মালায়ে আ’লায় আলোচিত হয়েছে।” হযরত উবাই (রাঃ) তখন বললেনঃ “তা হলে পাঠ করুন!” (এ হাদীসটি হাফিজ আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ পদ্ধতিতে এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। পূর্বে যেটা বর্ণনা করা হয়েছে সেটাই প্রমাণিত)

এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে হযরত উবাই (রাঃ)-এর মানসিক দৃঢ়তা এবং ঈমান বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর সামনে এ সূরাটি পাঠ করেছিলেন।

মুসনাদে আহমদ, সুনানে আবী দাউদ, সুনানে নাসাঈ এবং সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, একবার হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআত শুনে হযরত উবাই (রাঃ) অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন, কেননা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে তিনি যেমনভাবে এ সূরার কিরআত শুনেছিলেন, হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তেমনভাবে পড়েননি। রাগতভাবে হযরত উবাই হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উভয়ের কিরআত শুনে বলেনঃ “উভয়ের কিরআতই বিশুদ্ধ।” হযরত উবাই (রাঃ) বলেনঃ আমি এ কথা শুনে এমন সন্দেহের মধ্যে পড়ে গেলাম যে, যেন অজ্ঞতার যুগের সন্দেহ আমার সামনে এসে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ অবস্থা দেখে আমার বুকে হাত রাখলেন। আমার বুক ঘামে ভিজে গেল। আমার উপর এমন ভয় চাপলো যে, যেন আমি রাম্বুল আলামীন আল্লাহকে সামনে দেখতে পাচ্ছি। নবী করীম (সঃ) বললেনঃ “শোনো, হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার সামনে এসেছিলেন। তিনি বললেনঃ “উম্মতকে একই কিরআতে কুরআন শিক্ষা দেয়ার জন্যে আল্লাহ। তা'আলা নির্দেশ দিয়েছেন।' আমি বললামঃ আমি আল্লাহ্ তা'আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং মাগফিরাত কামনা করছি। অতঃপর আমাকে দু'প্রকারের কিরআতের অনুমতি প্রদান করা হলো। কিন্তু আমি আরো বাড়ানোর আবেদন জানালাম। অবশেষে সাত প্রকারের কিরআত পাঠের অনুমতি দেয়া হলো।” অতঃপর এ সূরা নাযিল হলো এবং এতে রয়েছেঃ (আরবি)

নবী করীম (সঃ) মানসিক দৃঢ়তার শিক্ষা দান এবং সতর্ককরণের উদ্দেশ্যে হযরত উবাই (রাঃ)-কে এ সূরাটি তিলাওয়াত করে শুনিয়ে দেন। কেউ যেন এটা মনে না করে যে, শিখবার ও মনে রাখবার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উবাই (রাঃ)-এর সামনে এ সূরাটি তিলাওয়াত করেছিলেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) একাধিক কিরআতের মাধ্যমে কুরআন কারীম পাঠ করায় হযরত উবাই (রাঃ)-এর মনে যে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল তা নিরসন কল্পেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এই সূরাটি হযরত উবাই (রাঃ)-কে পাঠ করে শোনান। হযরত উমর (রাঃ)-এর ঘটনাও একই ধরনের। তিনি হুদাইবিয়ার সন্ধির বছরে সন্ধির ব্যাপারে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। তার মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিলঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি বলেননি যে, আমরা কা'বা শরীফে যাবো এবং তাওয়াফ করবো?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, তা বলেছিলাম বটে, কিন্তু এটা তো বলিনি যে এ বছরই এটা হবে? নিঃসন্দেহে সে সময় আসছে যখন তুমি সেখানে পৌছবে ও তাওয়াফ করবে।” হুদাইবিয়া হতে ফিরবার পথে সূরা ফাতহ নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উমর (রাঃ)-কে ডেকে সূরাটি পড়ে শোনালেন। তাতে নিম্নের আয়াতটিও ছিলঃ (আরবি)

অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তার রাসূল (সঃ)-এর স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছেন, আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা অবশ্যই মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে।” (৪৮:২৭)

হাফিয আবু নাঈম (রাঃ) তাঁর (আরবি) নামক গ্রন্থে একটি হাদীস সংযোজন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা (আরবি) এ সূরাটির কিরআত শুনে বলেনঃ “হে আমার বান্দা! তুমি খুশী হয়ে যাও, আমার মর্যাদার শপথ! তোমাকে জান্নাতে এমন বাসস্থান দিবো যে, তুমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় নিতান্ত গারীব বা দুর্বল)

হযরত মাতার আলমুযানী অথবা মাদানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা (আরবি) এ সূরাটির কিরআত শুনে। বলেনঃ আমি তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে কোন অবস্থাতেই বিস্মৃত হবো না এবং তোমাকে জান্নাতে এমন বাসস্থান দান করবো যাতে তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।” (আবু মূসা আলমাদানী (রঃ) এবং ইবনুল আমীর (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)

১-৫ নং আয়াতের তাফসীর

আহলে কিতাব দ্বারা ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে বুঝানো হয়েছে। আর মুশরিকীন দ্বারা বুঝানো হয়েছে মূর্তি পূজক আরব এবং অগ্নিপূজক অনারবদেরকে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা প্রত্যাবর্তনকারী ছিল না যে পর্যন্ত তাদের সামনে সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত হয়।

আল্লাহর কোন একজন রাসূল যিনি পবিত্র গ্রন্থ পাঠ করে শুনিয়ে দেন, যাতে আছে সঠিক বিধান, এর দ্বারা কুরআন কারীমের কথা বুঝানো হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “ওটা আছে মহান লিপিসমূহে, যা উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন, পবিত্র, মহান, পূতঃচরিত্র লিপিকর হস্তে লিপিবদ্ধ।” (৮০:১৩-১৬)

সঠিক বিষয়সমূহ লিপিবদ্ধকরণের ক্ষেত্রে কোন প্রকার ভুল-ভ্রান্তি হয়নি।

হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, নবী করীম (সঃ) উত্তমভাবে কুরআনের ওয়ায করেন এবং কুরআনের সুন্দর ব্যাখ্যা দেন। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এ সব সহীফায় সত্য ন্যায়ের কথা সম্বলিত বিষয়সমূহ রয়েছে।

এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আর যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছিল তাদের নিকট এই স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত হওয়ার পরই তারা বিভক্ত হয়ে গেল। যেমন বিভিন্নভাবে বর্ণিত একটি হাদীসে রয়েছেঃ “ইয়াহুদীরা একাত্তর ফিরকা বা সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে গেল, আর নাসারারা বা খ্রিস্টানরা বিভক্ত হলো বাহাত্তর ফিরকায়। এই উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ) তিয়াত্তর ফিরকায় বিভক্ত। তার মধ্যে একটি মাত্র ফিরকা ছাড়া সবাই জাহান্নামে যাবে।` জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কারা?` উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমি এবং আমার সাহাবীগণ যে আদর্শের উপর রয়েছি (এই আদর্শের উপর যারা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।)।”

আল্লাহ তাআলা এরপর বলেনঃ অথচ তাদের প্রতি এই নির্দেশই ছিল যে, তারা আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ চিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে ইবাদত করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তোমার পূর্বে আমি যতো রাসূল পাঠিয়েছি সবারই কাছে এই অহী করেছি যে, আমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো।` (২১:২৫) এখানেও আল্লাহ পাক বলেনঃ একনিষ্ঠ হয়ে অর্থাৎ শিরক হতে দূরে থেকে এবং তাওহীদ বা একত্ববাদে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে ইবাদত করো। যেমন অন্যত্র বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি। (সেই কথা বলার জন্যে যে, তোমরা আল্লাহরই ইবাদত করো এবং তাগূত হতে দূরে থাকো।” (১৬:৩৬)

এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “তারা নামায কায়েম করবে ও যাকাত দিবে, এটাই সঠিক দ্বীন।' যাকাত দিবে এর অর্থ এই যে, ফকীর মিসকীন এবং অভাবগ্রস্তদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে। এই দ্বীন অর্থাৎ ইসলাম মযবূত, সরল, সহজ এবং কল্যাণধর্মী। বহু সংখ্যক ইমাম যেমন ইমাম যুহরী (রঃ), ইমাম শাফিয়ী (রঃ) প্রমুখ এ আয়াত থেকে প্রমাণ পেশ করেছেন যে, আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, এই আয়াতের সরলতা ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদত, নামায আদায় ও যাকাত প্রদানকেই দ্বীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।