আল কুরআন


সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 71)

সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 71)



হরকত ছাড়া:

وإن يريدوا خيانتك فقد خانوا الله من قبل فأمكن منهم والله عليم حكيم ﴿٧١﴾




হরকত সহ:

وَ اِنْ یُّرِیْدُوْا خِیَانَتَکَ فَقَدْ خَانُوا اللّٰهَ مِنْ قَبْلُ فَاَمْکَنَ مِنْهُمْ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیْمٌ حَکِیْمٌ ﴿۷۱﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইয়ঁইউরীদূখিয়া-নাতাকা ফাকাদ খা-নুল্লা-হা মিন কাবলুফাআমকানা মিনহুম ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুন হাকীম।




আল বায়ান: আর যদি তারা তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার ইচ্ছা করে, তাহলে তারা তো পূর্বে আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অতঃপর তিনি তাদের উপর (তোমাকে) শক্তিশালী করেছেন। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭১. আর তারা আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাইলে, তারা তো আগে আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে; অতঃপর তিনি তাদের উপর (আপনাকে) শক্তিশালী করেছেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর যদি তারা তোমার সাথে খিয়ানাত করার ইচ্ছে করে (তবে সেটা অসম্ভব কিছু নয়, কারণ এর থেকেও গুরুতর যে) তারা পূর্বে আল্লাহর সাথে খিয়ানাত করেছে, কাজেই আল্লাহ তাদেরকে তোমার অধীন করে দিয়েছেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে বিশেষভাবে অবগত, সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাবান।




আহসানুল বায়ান: (৭১) আর তারা তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাইলে (করতে পারে) তারা তো পূর্বে আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, পরিশেষে তিনি তাদেরকে (তোমার হাতে) গ্রেফতার করিয়েছেন। [1] আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।



মুজিবুর রহমান: আর তারা যদি তোমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার ইচ্ছা রাখে তাহলে এর পূর্বে আল্লাহর সাথেও তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। সুতরাং তিনি তাদের উপর তোমাকে শক্তিশালী করেছেন; আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।



ফযলুর রহমান: আর যদি তারা তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চায় তাহলে এর আগেও তো তারা আল্লাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সে জন্যই তিনি তাদের ওপর (তোমাদেরকে) ক্ষমতা দিয়েছেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।



মুহিউদ্দিন খান: আর যদি তারা তোমার সাথে প্রতারণা করতে চায়-বস্তুতঃ তারা আল্লাহর সাথেও ইতিপূর্বে প্রতারণা করেছে, অতঃপর তিনি তাদেরকে ধরিয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিজ্ঞাত, সুকৌশলী।



জহুরুল হক: কিন্তু যদি তারা চায় তোমার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে, তবে এর আগেও তারা অবশ্যই আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসভঙ্গ করেছে, সুতরাং তিনি কর্তৃত্ব দিলেন তাদের অনেকের উপরে। আর আল্লাহ্ সর্বজ্ঞাতা, পরমজ্ঞানী।



Sahih International: But if they intend to betray you - then they have already betrayed Allah before, and He empowered [you] over them. And Allah is Knowing and Wise.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৭১. আর তারা আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাইলে, তারা তো আগে আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে; অতঃপর তিনি তাদের উপর (আপনাকে) শক্তিশালী করেছেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৭১) আর তারা তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাইলে (করতে পারে) তারা তো পূর্বে আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, পরিশেষে তিনি তাদেরকে (তোমার হাতে) গ্রেফতার করিয়েছেন। [1] আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।


তাফসীর:

[1] ‘বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাইলে’ অর্থাৎ, মুখে ইসলাম প্রকাশ করলে এবং উদ্দেশ্য ধোঁকা দেওয়া হলে। তাহলে এর পূর্বে তারা কুফর ও শির্কে পতিত হয়ে কি লাভ করল? এটাই যে, মুসলিমদের হাতে তারা বন্দী হল। এই জন্য ভবিষ্যতেও যদি তারা শিরকের উপর অটল থাকে, তাহলে এ থেকেও অধিক অপমান ও লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের জন্য অন্য কিছু জুটবে না।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৬৭-৭১ নং আয়াতের তাফসীর:



يُثْخِنَ পরাভূত হওয়া, নির্মূল হওয়া।



৬৭ নং আয়াতের শানে নুযূল:



ইবুন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: বদরের দিন যখন বন্দীরা বন্দী হল সে সকল বন্দীদের মধ্যে আব্বাসও ছিলেন। তাকে বন্দী করেছিল একজন আনসারী। আনসারীর ধারণা ছিল তাকে হত্যা করা হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এ অবস্থা অবগত ছিলেন। তিনি (সাঃ) বললেন: আমার চাচা আব্বাসের কারণে গত রাতে ঘুমাতে পারিনি, আর আনসাররা ধারণা করেছে তারা তাকে হত্যা করবে। উমার (রাঃ) বললেন: আমি কি তাদের কাছে যাব? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উত্তরে বললেন: হ্যাঁ। উমার (রাঃ) আনসারীর নিকট আসলেন এবং বললেন: আব্বাসকে ছেড়ে দাও। আনসারীরা বলল: না। আল্লাহর শপথ! ছাড়ব না। উমার তাদের বললেন: এতে যদি রাসূলের সন্তুষ্টি থাকে? তারা বলল: এতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সন্তুষ্টি থাকলে নিন। উমার (রাঃ) তাকে নিলেন। যখন তার হাতে চলে এল তখন বললেন: হে আব্বাস ইসলাম গ্রহণ কর। তোমার ইসলাম গ্রহণ করা আমার পিতার ইসলাম গ্রহণ করার চেয়ে অধিক প্রিয়। কেননা তুমি ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) খুশি হবেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবূ বকরের সাথে পরামর্শ করলে তিনি বলেছেন: তিনি আপনার আত্মীয়। সুতরাং তাকে ছেড়ে দিন। তারপর উমার (রাঃ)-এর সাথে পরার্মশ করলেন। তিনি বললেন: সকলকেই হত্যা করুন। অবশেষে মুক্তিপণ নিয়ে সকলকে ছেড়ে দিলেন। তখন



(مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّي يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ)



আয়াতটি নাযিল হয়। (হাকিম: ২/৩২৯, সনদ সহীহ)



প্রকৃত পক্ষে এসব পরামর্শের কারণ হল বদর যুদ্ধ মুসলিমদের প্রথম যুদ্ধ, তখনও জিহাদ সংক্রান্ত সকল হুকুম-আহকাম বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে অবতীর্ণ হয়নি। যেমন গনীমতের মাল পেলে কী করতে হবে, বন্দীদের কী করতে হবে ইত্যাদি।



وَلَوْلَا كِتَابٌ مِنَ اللّٰهِ سَبَقَ



‘আল্লাহর পূর্ব বিধান না থাকলে....’ অর্থাৎ গনীমত হালাল হবার বিধান যদি পূর্ব থেকেই আল্লাহ তা‘আলার কিতাবে তথা লাওহে মাহফূযে লেখা না থাকত তাহলে বন্দীদের থেকে যা নিয়েছো তার জন্য কঠিন শাস্তি তোমাদেরকে পাকড়াও করত। আবূ হুরাইয়াহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী (সাঃ) বলেন: পূববর্তীদের জন্য গনীমতের মাল খাওয়া হারাম ছিল। আকাশ থেকে আগুন এসে তা পুড়িয়ে দিত। যখন বদরের দিন আসল হালাল হবার পূর্বেই লোকেরা গনীমতের মাল নিয়ে টানাটানী করতে লাগল- তখন এ আয়াত নাযিল হয়। (তিরমিযী হা: ৩০৮৫, সহীহ)



আনাস (রাঃ) বলেন: নাবী (সাঃ) বদরের বন্দীদের সম্পর্কে পরামর্শ চাইলেন। তিনি বললেন: আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তোমাদের হস্তগত করে দিয়েছেন। উমার (রাঃ) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাদের গর্দান উড়িয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এ মত গ্রহণ করলেন না। আবূ বকর (রাঃ) বললেন: আমি মনে করি তাদের ক্ষমা করে দিয়ে মুক্তিপণ গ্রহণ করি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ক্ষমা করে দিলেন এবং মুক্তিপণ গ্রহণ করলেন। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। (আহমাদ ৩/২৪৩)



(فَكُلُوْا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَالًا طَيِّبًا)



‘যুদ্ধে যা তোমরা লাভ করেছ তা বৈধ ও উত্তম বলে ভোগ কর‎’ অর্থাৎ গনীমত হালাল করে দেয়া হল যা পূর্ববর্তীদের জন্য হারাম ছিল। এখন তোমরা হালাল ও পবিত্র রিযিক হিসেবে খেতে পার। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন- আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা পূর্বে কোন নাবীকে দেয়া হয়নি। তার মধ্যে একটি হল- আমার জন্য গনীমত হালাল করে দেয়া হয়েছে যা আমার পূর্বে কারো জন্য হালাল ছিল না। (সহীহ বুখারী হা: ৩৩৫)



(قُلْ لِّمَنْ فِيْ أَيْدِيْكُمْ مِّنَ الْأَسْرٰي)



‘তোমাদের করায়ত্ত যুদ্ধবন্দীদেরকে বল:‎ ‘আল্লাহ যদি তোমাদের হৃদয়ে ভাল কিছু দেখেন..’ অর্থাৎ বদরের বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। যারা ইসলাম ও মুসলিমদের শত্রু। যারা তাদেরকে কষ্ট দিতে, মারতে এবং হত্যা করতে কখনই কোন ক্রটি করেনি; যখনই কোন রকম সুযোগ পেয়েছে তখনই নির্দয়ভাবে অত্যাচার-উৎপীড়ন করেছে, মুসলিমদের হাতে বন্দী হয়ে আসার পর এহেন শত্রুদেরকে প্রাণে বাঁচিয়ে দেয়াটা সাধারণ ব্যাপার ছিল না; এটা ছিল তাদের বিরাট প্রাপ্তি এবং অসাধারণ দয়া ও করুণা। পক্ষান্তরে মুক্তিপণ হিসেবে তাদের কাছ থেকে যে অর্থ গ্রহণ করা হয়েছিল তাও ছিল অতি সাধারণ। এটা আল্লাহ তা‘আলার একান্ত মেহেরবানী যে, এ সাধারণ অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে যে কষ্ট তাদের করতে হয়, তাও তিনি কি চমৎকারভাবে দূর করে দিয়েছেন। উল্লিখিত আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে- আল্লাহ তা‘আলা যদি তোমাদের মন-মানসিকতায় কোন রকম কল্যাণ দেখতে পান, তবে তোমাদের কাছ থেকে যা কিছু নেয়া হয়েছে তার চেয়ে উত্তম বস্তু দান করবেন। তদুপরি তোমাদের অতীত গুনাহ ক্ষমা করবেন। এখানে خير অর্থ ঈমান ও ইসলাম। অর্থাৎ মুক্তি লাভের পর সেসব বন্দীদের মধ্যে যারা পরিপূর্ণ নিষ্ঠার সাথে ঈমান ও ইসলাম গ্রহণ করবে, তারা যে মুক্তিপণ দিয়েছে, তার চেয়ে অধিক উত্তম বস্তু পেয়ে যাবে। তা হল তাদের অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং পরকালে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। বন্দীদেরকে মুক্তি করে দেয়া সাথে সাথে তাদেরকে এমনভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে যে, তারা যেন মুক্তি লাভের পর নিজেদের লাভ-ক্ষতির প্রতি মনোনিবেশ করে। সুতরাং বাস্তব ঘটনার দ্বারা প্রমাণিত যে, তাদের মধ্যে যারা মুসলিম হয়েছিল আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করে এবং জান্নাতের সুউচ্চ স্থান দান ছাড়াও পার্থিব জীবনে এত অধিক পরিমাণ ধন-সম্পদ দান করেছিলেন, যা তাদেরকে দেয়া মুক্তিপণ অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম ও অধিক ছিল।



আর যদি খিয়ানত করতে চায় অর্থাৎ মুখে ইসলাম প্রকাশ করে আর উদ্দেশ্য হয় ধোঁকা দেয়া তাহলে তাদেরকেও তাদের পূর্বে যারা এরূপ করেছিল তাদের মত পাকড়াও করবেন।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আব্বাস (সাঃ)-এর ফযীলত জানলাম, তার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।

২. সৎ কাজের নিয়ত করার ফযীলত জানলাম।

৩. যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য কিছু ছেড়ে দেবে আল্লাহ তা‘আলা তার বিনিময়ে উত্তম বস্তু দান করবেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৭০-৭১ নং আয়াতের তাফসীর:

ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরের দিন বলেছিলেনঃ “নিশ্চিতরূপে আমি অবগত আছি যে, কোন কোন বানু হাশিমকে জোরপূর্বক এই যুদ্ধে বের করে আনা হয়েছে। আমাদের সাথে যুদ্ধ করার তাদের মোটেই ইচ্ছা ছিল না। সুতরাং বানু হাশিমকে হত্যা করো না, আবুল বাখতারী ইবনে হিশামকেও মেরে ফেলো না এবং আব্বাস ইবনে মুত্তালিবকেও হত্যা করো না। লোকেরা তাদেরকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের সাথে টেনে এনেছে।” তখন আবূ হুযাইফা ইবনে উত্মা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা আমাদের বাপদাদাদেরকে, আমাদের সন্তানদেরকে, আমাদের ভাইদেরকে এবং আমাদের আত্মীয় স্বজনদেরকে হত্যা করবো, আর আব্বাস (রাঃ)-কে ছেড়ে দেবো? আল্লাহর কসম! যদি আমি তাকে পেয়ে যাই তবে তার গর্দান উড়িয়ে দেবো।” একথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে পৌছলে তিনি বলেন “হে আবু হাফস!” (উমার (রাঃ)-এর কুনিয়াত বা উপনাম) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচার মুখে কি তরবারীর আঘাত করা হবে?” উমার ফারূক (রাঃ) বলেনঃ “এটাই ছিল প্রথম দিন যেই দিন রাসূলুল্লাহ আমাকে আমার কুনিয়াত দ্বারা সম্বোধন করেন। তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অনুমতি হলে আমি আবূ হুযাইফা (রাঃ)-এর গর্দান উড়িয়ে দেবো। আল্লাহর কসম! সে মুনাফিক হয়ে গেছে।” আবু হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমার সেই দিনের কথার খটকা আজ পর্যন্তও রয়েছে। ঐ কথার জন্যে আমি আজও ভীত আছি। আমি তো ঐ দিনই শান্তি লাভ করবো যেই দিন আমার এই কথার কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। আর সেই কাফফারা হচ্ছে এই যে, আমি আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাবো।” অতঃপর তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হয়ে যান। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করুন!

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেই দিন বদরী বন্দীরা গ্রেফতার হয়ে আসে সেই রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর ঘুম হয়নি। সাহাবীগণ কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এই কয়েদীদের মধ্য থেকে আমার চাচা আব্বাস (রাঃ)-এর কান্নাকাটির শব্দ আমার কানে আসছে।” তখন সাহাবীরা তাঁর বন্ধন খুলে দেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘুম হয়। আব্বাস (রাঃ)-কে একজন আনসারী সাহাবী গ্রেফতার করেছিলেন। তিনি খুব ধনী ছিলেন। মুক্তিপণ হিসেবে তিনি একশ আওকিয়া (এক আওকিয়ার ওজন হচ্ছে এক তোলা সাত মাশা) সোনা প্রদান করেছিলেন। কোন কোন আনসারী নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “আমরা আপনার চাচা আব্বাস (রাঃ)-কে মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দিতে চাই।” কিন্তু সমতা কায়েমকারী নবী (সঃ) বলেনঃ “না, আল্লাহর কসম! তোমরা এক দিরহাম কম করো না। বরং পূর্ণ মুক্তিপণ আদায় করো।” কুরায়েশরা মুক্তিপণের অর্থ দিয়ে তাক পাঠিয়েছিল। প্রত্যেকই ধার্যকৃত অর্থ দিয়ে। নিজ নিজ কয়েদীকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন। আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো মুসলমানই ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আপনার ইসলাম গ্রহণের বিষয় আমি অবগত আছি। যদি আপনার কথা সত্য হয় তবে আল্লাহ আপনাকে এর বিনিময় প্রদান করবেন। কিন্তু আহকাম বাহ্যিকের উপর জারী হয়ে থাকে বলে আপনাকে আপনার মুক্তিপণ আদায় করতেই হবে। তাছাড়া আপনার দু'ভ্রাতুস্পুত্র নওফেল ইবনে হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব ও আকীল ইবনে আবি তালিব ইবনে আবদিল মুত্তালিবের মুক্তিপণ আপনাকে আদায় করতে হবে। আরো আদায় করতে হবে আপনার মিত্র উৎবা ইবনে আমরের মুক্তিপণ, যে বানু হারিস ইবনে ফাহরের গোত্রভুক্ত।” তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে তো এতো মাল নেই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেন, আপনার ঐ মাল কোথায় গেল যা আপনি ও উম্মুল ফযল যমীনে পুঁতে রেখেছেন আর বলেছেন, “আমি যদি এই সফরে সফলকাম হই তবে এই মাল হবে বানুল ফযল, আবদুল্লাহ এবং কাসামের।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একথা শুনে আব্বাস (রাঃ) স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি জানি যে, আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমার এই মাল পুঁতে রাখার ঘটনা আমি ও উম্মুল ফযল (তার স্ত্রী) ছাড়া আর কেউই জানে না! আচ্ছা, এ কাজ করুন যে, আমার নিকট থেকে আপনার সেনাবাহিনী বিশ আওকিয়া সোনা প্রাপ্ত হয়েছে, ওটাকেই আমার মুক্তিপণ হিসেবে গণ্য করা হাক।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কখনও নয়। ওটা তো আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে দান করেছেন। সুতরাং আব্বাস (রাঃ) নিজের, তাঁর দুই ভাতুস্পুত্রের এবং তাঁর মিত্রের মুক্তিপণ নিজের পক্ষ হতে আদায় করলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “তোমাদের অন্তরে কল্যাণকর কিছু রয়েছে তা যদি আল্লাহ অবগত হন তবে তোমাদের হতে (মুক্তিপণরূপে) যা কিছু নেয়া হয়েছে তা অপেক্ষা উত্তম কিছু দান করবেন।” আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার এই ঘোষণা কার্যকরী হয়েছে । আমার ইসলাম গ্রহণের কারণে আমার এই বিশ আওকিয়ার বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে এমন বিশটি গোলাম দান করেছেন যারা সবাই ব্যবসায়ী ও সম্পদশালী । সাথে সাথে আমি এ আশাও করছি যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।” তিনি বলেনঃ ‘‘আমার ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। আমি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে আমার ইসলাম গ্রহণের খবর দিলাম এবং বললাম, আমার বিশ আওকিয়ার বিনিময় আমাকে দেয়া হাক। তিনি তা অস্বীকার করলেন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যে, তিনি আমাকে আমার এই বিশ আওকিয়ার বিনিময়ে এমন বিশটি গোলাম দান করেন যারা সবাই ব্যবসায়ী।” তিনি এবং তাঁর সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “আমরা তো আপনার অহীর উপর ঈমান এনেছি, আপনার রিসালাতের আমরা সাক্ষ্য দান করছি এবং আমাদের কওমের মধ্যে আমরা আপনার মঙ্গল কামনা করেছি।” তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “সারা দুনিয়া লাভ করলেও আমি ততে খুশী হতাম না যতো খুশী হয়েছিলাম এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণে। আল্লাহর কসম! আমার নিকট থেকে মুক্তিপণ হিসেবে যা নেয়া হয়েছিল তার চেয়ে একশ গুণ বেশী আল্লাহ আমাকে প্রদান করেছেন এবং এটাও আশা করছি। যে, আমার পাপগুলোও মাফ করে দেয়া হবে।”

এ আয়াতের তাফসীরে কাতাদা (রঃ) বলেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করা। হয়েছে যে, বাহরাইন থেকে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আশি হাজার পরিমাণ মাল এসে পৌঁছে তখন তিনি যোহরের সালাতের জন্যে অযু করছিলেন। অতঃপর তিনি প্রত্যেক অভিযোগকারীকেই সেই দিন ঐ মাল থেকে প্রদান করেন। এবং কোন প্রার্থনাকারীকেই বঞ্চিত করেননি। সেইদিন তিনি (যোহরের) সালাতের পূর্বেই সমস্ত মাল আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেন। আব্বাস (রাঃ)-কে তিনি ঐ মাল থেকে গ্রহণ করার নির্দেশ দেন এবং বোঝা বেঁধে নিতে বলেন। আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমার থেকে যা নেয়া হয়েছিল তার থেকে এটা বহুগুণে উত্তম এবং আমি আশা করছি যে, আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া হবে।”

হামীদ ইবনে হিলাল (রাঃ) বলেন যে, এই মাল ইবনে হাযরামী বাহরাইন থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। এতো মাল নবী (সঃ)-এর নিকট এর পূর্বে এবং পরে কখনো আসেনি। এ মালের পরিমাণ ছিল আশি হাজার। এ মাল চাটাইর উপর ছড়িয়ে দেয়া হয়। অতঃপর নামাযের জন্যে আযান দেয়া হয়। রাসলুল্লাহ (সঃ) আগমন করেন এবং মালের কাছে দাঁড়িয়ে যান। মসজিদের নামাযীরাও এসে পড়েন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেককে দিতে শুরু করেন। সেইদিন কোন ওজনও ছিল না এবং গণনাও ছিল না। যে আসে সেই নিয়ে যায়। তারা সবাই ইচ্ছামত নিয়ে যায়। আব্বাস (রাঃ) এসে তো চাদরের বোঝা বাঁধেন। কিন্তু উঠাতে সক্ষম না হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! একটু উঠিয়ে দিন। এতে নবী (সঃ) হেসে উঠেন, এমন কি তাঁর দাঁতের ঔজ্জ্বল্য পরিলক্ষিত হয়। তিনি তাকে বলেনঃ “কিছু কম নিন। যা উঠাতে পারবেন তাই নিন।” সুতরাং তিনি কিছু কমিয়ে নিলেন এবং তা উঠিয়ে নিয়ে বলতে বলতে গেলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। তাঁর একটি কথা তো পূর্ণ হলো। তার দ্বিতীয় ওয়াদাও ইনশাআল্লাহ পূর্ণ হয়ে যাবে (অর্থাৎ তিনি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন)। আমার নিকট থেকে মুক্তিপণ হিসেবে যা। নেয়া হয়েছে, তার চেয়ে এটা বহুগুণে উত্তম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ মাল বন্টন করতেই থাকেন। শেষ পর্যন্ত ঐ মালের কিছুই অবশিষ্ট থাকলো না। তিনি ঐ মাল থেকে নিজের পরিবার-পরিজনকে একটি কানাকড়িও প্রদান করলেন না। অতঃপর তিনি নামাযের জন্যে সামনে এগিয়ে যান এবং নামায পড়িয়ে দেন।

এ ব্যাপারে অন্য একটি হাদীস আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বাহরাইন হতে মাল আসে। তিনি সাহাবীদেরকে বলেনঃ “এগুলো আমার মসজিদে ছড়িয়ে দাও।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অন্য সময় যে মাল এসেছিল, ওগুলোর চেয়ে এটাই ছিল অধিক মাল অর্থাৎ এর পূর্বে বা পরে এতো অধিক মাল তাঁর কাছে আসেনি। অতঃপর তিনি নামাযের জন্যে বেরিয়ে আসেন। কারো দিকে তিনি ফিরে তাকালেন না। নামায পড়িয়ে দিয়ে তিনি বসে পড়লেন। অতঃপর তিনি যাকেই দেখলেন তাকেই দিলেন। ইতিমধ্যে আব্বাস (রাঃ) এসে গেলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকেও প্রদান করুন। আমি আমার নিজের ও আকীলের মুক্তিপণ আদায় করেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “আপনি নিজের হাতেই নিয়ে নিন।` তিনি চাদরে পুটলি বাঁধলেন। কিন্তু ওটা ওজনে ভারী হয়ে যাওয়ার কারণে উঠাতে পারলেন না। সুতরাং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাউকে এটা আমার কাঁধে উঠিয়ে দিতে বলুন।” নবী (সঃ) বললেনঃ “কাউকে আমি এটা উঠিয়ে দিতে বলবো না।” তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে আপনিই উঠিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও অস্বীকৃতি জানালেন। কাজেই বাধ্য হয়ে তাকে কিছু কম করতেই হলো। অতঃপর তিনি ওটা কাঁধে উঠিয়ে চলতে শুরু করলেন। তাঁর এ লোভ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দিকে চেয়েই থাকলেন যে পর্যন্ত না তিনি তাঁর দৃষ্টির অন্তরাল হলেন। যখন সমস্ত মাল বন্টিত হয়ে গেল এবং একটা কড়িও বাকী থাকলো না তখন তিনি ওখান থেকে উঠলেন। ইমাম বুখারীও (রঃ) স্বীয় কিতাব সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটিকে কয়েক জায়গায় এনেছেন।

আল্লাহ পাক বলেনঃ এ লোকগুলো যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে এটা কোন নতুন কথা নয়। এর পূর্বে তারা আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সুতরাং তাদের দ্বারা এটাও সম্ভব যে, এখন মুখে তারা যা প্রকাশ করছে, অন্তরে হয়তো এর বিপরীত কিছু গোপন করছে। এতে ঘাবড়াবার কিছুই নেই। এখন যেমন আল্লাহ তা'আলা এদেরকে তোমার ক্ষমতাধীনে রেখেছেন, এরূপই তিনি সব সময়েই করতে সক্ষম। আল্লাহর কোন কাজই কোন জ্ঞান ও হিকমত থেকে শূন্য নয়। এদের সাথে এবং সমস্ত মাখলুকের সাথে তিনি যা কিছু করেন তা নিজের চিরন্তন পূর্ণ জ্ঞান ও পূর্ণ নিপুণতার সাথেই করে থাকেন।

কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি লেখক আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারাহ। এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়েছিল। আতা খুরাসানী (রঃ) বলেন যে, এটা আব্বাস (রাঃ) এবং তাঁর সাথীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তারা বলেছিলেনঃ “আমরা আপনার মঙ্গল কামনা করতে থাকবো।” সুদ্দী (রঃ) বলেন, এটা সাধারণ এবং সবগুলোই এর অন্তর্ভুক্ত। এটা সঠিকও বটে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।