সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 6)
হরকত ছাড়া:
يجادلونك في الحق بعدما تبين كأنما يساقون إلى الموت وهم ينظرون ﴿٦﴾
হরকত সহ:
یُجَادِلُوْنَکَ فِی الْحَقِّ بَعْدَ مَا تَبَیَّنَ کَاَنَّمَا یُسَاقُوْنَ اِلَی الْمَوْتِ وَ هُمْ یَنْظُرُوْنَ ؕ﴿۶﴾
উচ্চারণ: ইউজা-দিলূনাকা ফিল হাক্কি বা‘দা মা-তাবাইইয়ানা কাআন্নামা-ইউছা-কূনা ইলাল মাওতি ওয়া হুম ইয়ানজু রুন।
আল বায়ান: তারা তোমার সাথে সত্য সম্পর্কে বিতর্ক করছে তা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর। যেন তাদেরকে মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নেয়া হচ্ছে, আর তারা তা দেখছে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬. সত্য(১) স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরও তারা আপনার সাথে বিতর্ক করে। মনে হচ্ছিল তাদেরকে যেন মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আর তারা যেন তা অবলোকন করছে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও তারা তোমার সঙ্গে বাদানুবাদে লিপ্ত হয়েছিল, (তাদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল যে,) তারা যেন চেয়ে চেয়ে দেখছিল যে, তাদেরকে মৃত্যুর দিকে তাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে।
আহসানুল বায়ান: (৬) সত্য স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরও[1] তারা তোমার সাথে বিতর্ক করছিল, (মনে হচ্ছে) তারা যেন মৃত্যুর দিকে চালিত হচ্ছে এবং তারা যেন তা প্রত্যক্ষ করছে। [2]
মুজিবুর রহমান: সেই যথার্থ বিষয় প্রকাশ হওয়ার পরও ওতে তারা তোমার সাথে এরূপ বিবাদ করছিল যেন কেহ তাদেরকে মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর তারা তা প্রত্যক্ষ করছে।
ফযলুর রহমান: সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও তারা সত্যের ব্যাপারে তোমার সাথে বিতর্ক করছিল, যেন তাদেরকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আর তারা (সেদিকে) তাকিয়ে আছে।
মুহিউদ্দিন খান: তারা তোমার সাথে বিবাদ করছিল সত্য ও ন্যায় বিষয়ে, তা প্রকাশিত হবার পর; তারা যেন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে দেখতে দেখতে।
জহুরুল হক: তারা তোমার সঙ্গে সত্য সন্বন্ধে বিতর্ক করছিল তা সুস্পষ্ট হবার পরেও, যেন তারা মৃত্যুর দিকে তাড়িত হচ্ছিল, আর তারা তাকিয়ে রয়েছিল।
Sahih International: Arguing with you concerning the truth after it had become clear, as if they were being driven toward death while they were looking on.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬. সত্য(১) স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরও তারা আপনার সাথে বিতর্ক করে। মনে হচ্ছিল তাদেরকে যেন মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আর তারা যেন তা অবলোকন করছে।
তাফসীর:
(১) এখানে ‘হক’ বলে যুদ্ধও উদ্দেশ্য হতে পারে। [বাগভী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬) সত্য স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরও[1] তারা তোমার সাথে বিতর্ক করছিল, (মনে হচ্ছে) তারা যেন মৃত্যুর দিকে চালিত হচ্ছে এবং তারা যেন তা প্রত্যক্ষ করছে। [2]
তাফসীর:
[1] এ কথা প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল যে, বাণিজ্য কাফেলা নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম হয়ে প্রস্থান করেছে। আর এখন কুরাইশ সেনা সম্মুখে আছে, যাদের মুকাবিলা ছাড়া কোন গতি নেই।
[2] যোদ্ধা ও যুদ্ধাস্ত্রের স্বল্পতা হেতু মুসলিমদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে তাদের যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, এখানে তা প্রকাশ করা হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৫-১৪ নং আয়াতের তাফসীরঃ
(غَيْرَ ذَاتِ الشَّوْكَةِ)
‘নিরস্ত্র দলটি’ অর্থাৎ নিরস্ত্র বলতে এখানে আবূ সুফিয়ানের বাণিজ্যিক কাফেলাকে বুঝানো হয়েছে। النُّعَاسُ অর্থ, তন্দ্রা, شَا۬قُّوْا অর্থ, তারা বিরুদ্ধাচরণ করেছে।
এ আয়াতগুলোতে বদর যুদ্ধের প্রতি ঈঙ্গিত করা হয়েছে।
(وَإِنَّ فَرِيْقًا مِّنَ الْمُؤْمِنِيْنَ لَكَارِهُوْنَ)
‘অথচ মু’মিনদের এক দল এটা পছন্দ করেনি।’ মু’মিনদের এ অপছন্দনীয়তা শুধু কাফির সেনাদলের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত হবার বিষয়ে ছিল। কিছু সাহাবী এ অপছন্দনীয় বিষয়ের কথা প্রকাশও করেছিলেন। কারণ তাদের সাথে কোন অস্ত্র ছিল না। মদীনা থেকে তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনা থেকে বের হয়েছেন আবূ সুফিয়ানের কাফেলাকে ধরার জন্য যা শাম থেকে মদীনার পাশ দিয়ে মক্কায় ফিরছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: এটা হল কুরাইশদের কাফেলা। তাতে অনেক সম্পদ রয়েছে। অতএব তাদের দিকে বেরিয়ে পড়। আশা করা যায় আল্লাহ তা‘আলা আমাদের এ সম্পদগুলো দান করবেন। তাই তিনশ’র অধিক সাহাবী তেমন কোন অস্ত্র না নিয়ে সমুদ্রের উপকূলের দিকে বেরিয়ে পড়লেন। এ দিকে আবূ সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বের হবার কথা জানতে পেরে যমযম বিন আমর নামক ব্যক্তিকে মক্কায় প্রেরণ করল এ কথা জানানোর জন্য যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা কাফেলাকে আক্রমণ করার জন্য বের হয়েছে। এ খবর শুনে মক্কার এক হাজার সৈন্য অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেরিয়ে আসল, আর আবূ সুফিয়ান রাস্তা পরির্বতন করে অন্য রাস্তা দিয়ে চলে গেল। এদিকে মুসলিম বাহিনী ও কাফির বাহিনী বদর নামক জায়গায় মুখোমুখি হল। যার কারণে কিছু সাহাবীর মনে প্রশ্ন জাগে যে, বের হলাম কিসের জন্য আর হল কী?
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন ওয়াহী মারফত জানতে পারলেন, মক্কা থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে একদল কাফির বের হয়েছে, তখন আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাঃ)-কে দু’টি দলের (একটি হল আবূ সূফিয়ানের বাণিজ্যিক কাফেলা, অন্যটি হল কাফির সৈন্য বাহিনী) একটি আয়ত্ত করতে পারবে বলে প্রতিশ্র“তি দিলেন। হয় কাফির সেনাদলকে পরাজিত করবে অথবা কাফেলাকে দখল করতে পারবে। অধিকাংশ মুসলিমদের আশা ছিল যে কাফেলা দখলে আসুক; কেননা ঐ উদ্দেশ্যে তারা বের হয়েছেন। তাছাড়া কাফির সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করার মত তেমন কোন অস্ত্র তাদের নেই। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা তিনি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করবেন। আল্লাহ তা‘আলা এখানে সে কথাই বলছেন:
(وَإِذْ يَعِدُكُمُ اللّٰهُ إِحْدَي الطَّا۬ئِفَتَيْنِ أَنَّهَا لَكُمْ وَتَوَدُّوْنَ أَنَّ غَيْرَ ذَاتِ الشَّوْكَةِ تَكُوْنُ لَكُمْ وَيُرِيْدُ اللّٰهُ أَنْ يُّحِقَّ الْحَقَّ بِكَلِمٰتِه۪ وَيَقْطَعَ دَابِرَ الْكٰفِرِيْنَ)
“স্মরণ কর! যখন আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন যে, দু’ দলের একদল তোমাদের আয়ত্তাধীন হবে; অথচ তোমরা চাচ্ছিলে যে, নিরস্ত্র দলটি তোমাদের আয়ত্তাধীন হোক। আর আল্লাহ চাচ্ছিলেন যে, তিনি সত্যকে তাঁর বাণী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং কাফিরদেরকে নির্মূল করবেন;
(إِحْدَي الطَّا۬ئِفَتَيْنِ)
‘দু’ দলের একদল’ দু’দল বলতে একটি হল আবূ সুফিয়ানের কাফেলা অন্যটি হল মক্কার কাফির বাহিনী।
আব্দুল্লাহ বিন কা‘ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি কা‘ব বিন মালেক (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যেসব যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন তার মধ্যে তাবুকের যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোন যুদ্ধে আমি অনুপস্থিত ছিলাম না। তবে বদরের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারিনি । কিন্তু বদরের যুদ্ধে যারা যোগ দেয়নি তাদেরকে কোন তিরস্কার করা হয়নি। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কুরাইশ কাফেলার উদ্দেশ্যেই যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা ব্যতীতই আল্লাহ তা‘আলা তাদের (মুসলিমদের) সঙ্গে তাদের দুশমনদের মোকাবেলা করিয়ে দেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩৯৫১, সহীহ মুসলিম হা: ২৭৬৯)
(إِذْ تَسْتَغِيثُوْنَ رَبَّكُمْ)
শানে নুযূল:
উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: বদরের দিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একবার সাহাবীদের দিকে তাকিয়ে দেখেন তারা মাত্র তিনশত দশজনের কিছু বেশি। আবার কাফিরদের দিকে তাকিয়ে দেখেন, তারা এক হাজারেরও বেশি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কেবলামুখী হয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘হাত তুললেন, তাঁর গায়ে চাদর ছিল। তিনি বলতে লাগলেন: হে আল্লাহ! তুমি আমাকে যে ওয়াদা দিয়েছো তা পূর্ণ কর। হে আল্লাহ! তুমি যদি এ মুসলিম দলকে ধ্বংস করে দাও তাহলে পৃথিবীতে তোমার ইবাদত করার আর কেউ থাকবে না। এরূপ সর্বদা আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু’হাত তুলে চাইতে থাকলে একদা নাবী (সাঃ)-এর গায়ের চাদর পড়ে গেল। আবূ বাকর (রাঃ) নাবী (সাঃ)-এর কাছে এসে চাদর ধরে কাধের ওপর তুলে দিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে পিছন দিক থেকে ধরে বললেন: হে আল্লাহর নাবী! আল্লাহর কাছে আপনার প্রার্থনা যথেষ্ট হয়েছে। তিনি স্বীয় ওয়াদা পূর্ণ করবেন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (সহীহ মুসলিম হা: ১৭৬৩, তিরমযী হা: ৩৬৬১)
ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি মিকদাদ ইবনু আসওয়াদের এমন একটি বিষয় দেখেছি যা আমি করলে তা দুনিয়ার সব কিছুর তুলনায় আমার নিকট প্রিয় হত। তিনি নাবী (সাঃ)-এর কাছে আসলেন, তখন তিনি (সাঃ) মুশরিকদের বিরুদ্ধে দু’আ করছিলেন। এতে মিকদাদ ইবনু আসওয়াদ (সাঃ) বললেন: মূসা (আঃ)-এর জাতি যেমন বলেছিল যে, “তুমি আর তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ কর আমরা এখানে বসে রইলাম” (সূরা মায়িদাহ ৫:২৪) আমরা তেমন বলব না, বরং আমরা আপনার ডানে, বামে, সামনে, পেছনে সর্বদিক থেকে যুদ্ধ করব। ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন: আমি দেখলাম, নাবী (সাঃ)-এর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং তার কথা তাঁকে খুব আনন্দিত করল। (সহীহ বুখারী হা: ৩৯৫২)
(وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللّٰهِ)
‘এবং সাহায্য তো শুধু আল্লাহর নিকট হতেই আসে’ অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُوْمُ الْأَشْهَادُ) “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদের ও মু’মিনদেরকে সাহায্য করব পার্থিব জীবনে ও যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে।” (সূরা মু’মিনুন ৪০:৫১)
(إِذْ يُغَشِّيْكُمُ النُّعَاسُ أَمَنَةً)
‘স্মরণ কর, যখন তিনি তাঁর পক্ষ হতে স্বস্তির জন্য তোমাদেরকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করলেন’ আল্লাহ তা‘আলা বদর প্রান্তরে মুসলিমদেরকে তিনটি পুরস্কার প্রদান করেছেন। প্রথমত: ফেরেশতা দ্বারা সহযোগিতা করা। দ্বিতীয়ত: উহুদ যুদ্ধের মত বদর যুদ্ধে তন্দ্রা দ্বারা আচ্ছন্ন করা। মুসলিমদের মনে একটি অস্বস্তি ও শরীরে ক্লান্তি এসেছিল, তা দূর করার জন্য। তৃতীয়ত: তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করা। যার ফলে বালুময় মাটিতে চলাচল সহজ হল, ওযু ও গোসল করা সহজ হল এবং শয়তান মু’মিনের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিচ্ছিল যে, তোমরা আল্লাহ তা‘আলার নেক বান্দা হওয়া সত্ত্বেও পানি হতে দূরে অবস্থান করছ, অপবিত্র অবস্থায় যুদ্ধ করলে কিভাবে আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য পাবে আর তোমরা পিপাসিত, শত্রুরা পিপাসিত নয় ইত্যাদি দূর করার জন্য।
সর্বোপরি আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের কদমকে যুদ্ধের মাঠে মজবুত করার লক্ষে এসব নেয়ামত দ্বারা সহযোগিতা করলেন।
(أَنِّيْ مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا)
‘আমি তোমাদের সাথে আছি, সুতরাং মু’মিনগণকে অবিচলিত রাখ’। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদেরকে জানিয়ে দিলেন, আমি আমার সাহায্য সহযোগিতা দ্বারা তোমাদের সাথে রয়েছি অতএব তোমরা তাদেরকে সহযোগিতা করে ময়দানে অটল রাখ।
‘আল্লাহ সাথে রয়েছেন’ এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ তা‘আলা স্বস্বত্ত্বায় তাদের সাথে মিলে একত্রে যুদ্ধ করছেন। বরং আল্লাহ তা‘আলা সাহায্য-সহযোগিতা দ্বারা তাদের সাথে রয়েছেন। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِلَّا تَنْصُرُوْهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللّٰهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُوْلُ لِصَاحِبِه۪ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللّٰهَ مَعَنَا)
“যদি তোমরা তাঁকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফিরগণ তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দু’জনের একজন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল; সে তখন তার সঙ্গীকে বলেছিল, ‘চিন্তা কর না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা তাওবাহ ৯:৪০)
আল্লাহ তা‘আলা তাদের সাথে সে গর্তে প্রবেশ করেননি (নাউযুবিল্লাহ)। বরং তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের সাথে ছিলেন।
অতএব আল্লাহ তা‘আলা স্বস্বত্ত্বায় আরশের উপরে আছেন। আর তাঁর শক্তি, দৃষ্টি ও শ্রবণ সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে, কিছুই তাঁর জ্ঞানায়ত্তের বাইরে নয়।
(فَاضْرِبُوا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ..... كُلَّ بَنَانٍ)
‘সুতরাং তোমরা আঘাত কর তাদের স্কন্ধে ও আঘাত কর তাদের প্রত্যেক আঙ্গুলের অগ্রভাগে।’ এখানে আল্লাহ তা‘আলা যুদ্ধের কৌশল শিক্ষা দিলেন, শত্রুদের কোথায় প্রহার করলে সহজে কাবু করা যাবে। তিনি বলেন: শত্রুদের ঘারের ওপর এবং শরীরের প্রত্যেক জোড়ায় জোড়ায় প্রহার কর যাতে আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে না পারে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَإِذَا لَقِيْتُمُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا فَضَرْبَ الرِّقَابِ ط حَتّٰيٓ إِذَآ أَثْخَنْتُمُوْهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ)
“তাই যখন তোমরা কাফিরদের মুখোমুখি হবে তখন (তাদের) গর্দানে আঘাত করাই (প্রথম কাজ) যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণ পরাজিত করে ফেলবে তখন (বন্দীদেরকে) কষে বাঁধবে।’ (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৪)
আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য তাদের এ শাস্তি। তাছাড়া আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে প্রজ্জ্বলিত আগুনের শাস্তি।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সংক্ষিপ্তাকারে বদর যুদ্ধের পেক্ষাপট জানতে পারলাম।
২. বদর যুদ্ধে ফেরেশতা দ্বারা মুসলিম বাহিনীকে সহযোগিতা করা হয়েছিল।
৩. মু’মিনদের পুরস্কার ও আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামত প্রদানের কারণ জানলাম।
৪. আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের সাথে কিভাবে রয়েছেন এর অর্থ জানতে পারলাম।
৫. কাফিরদের জন্য দুনিয়াতে ও পরকালে অশুভ পরিণতি রয়েছে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫-৮ নং আয়াতের তাফসীর:
(আরবী) -এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি আনার কারণ কি এ ব্যাপারে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা পরহেজগারী ও রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের ব্যাপারে মুমিনদের পারস্পরিক সন্ধি স্থাপনের সাথে সাদৃশ্য প্রতিপাদন করা হয়েছে। সুতরাং কথার ধরন হচ্ছে- যেমন তোমরা গনীমতের। মালের ব্যাপারে মতভেদ করেছিলে এবং তোমাদের মধ্যে বিবাদের সূচনা হয়েছিল, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দিয়েছিলেন এবং ঐ মাল বন্টনের হক তোমাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে প্রদান করেছিলেন, আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদের মধ্যে ওটা ইনসাফ ও সমতার সাথে বন্টন করে দিয়েছিলেন, এ সবগুলোই ছিল তোমাদের পূর্ণ কল্যাণের নিমিত্ত। দ্রুপ এই স্থলে যখন তোমাদেরকে শত্রুদের সাথে মুকাবিলার জন্যে মদীনা থেকে বের হতে হয়েছিল তখন সেই শান শওকত বিশিষ্ট বিরাট সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়া তোমাদের জন্যে অপছন্দনীয় ছিল অর্থাৎ তাদের সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে তোমাদের মন চাচ্ছিল না। এই বিরাট সেনাবাহিনী ওরাই ছিল যারা তাদের স্বধর্মীয় কাফিরদের ব্যবসায়ের মাল হিফাযত করার জন্যে মক্কা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, যে কাফিররা ব্যবসা। উপলক্ষে সিরিয়া গমন করেছিল। এই যুদ্ধকে অপছন্দ করার ফল এই দাঁড়ালো যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে তোমাদেরকে বাধ্য করলেন এবং পরিণামে তিনি তোমাদেরকে হিদায়াত দান করলেন, আর তোমাদেরকে সাহায্য করতঃ তাদের উপর জয়যুক্ত করলেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হচ্ছে, আর এটা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। অথচ যা তোমরা অপছন্দ কর, খুব সম্ভব তাতেই তোমাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। পক্ষান্তরে তোমরা কোন কাজকে পছন্দ কর, অথচ হয়তো তাতেই তোমাদের অমঙ্গল নিহিত আছে। কোনটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর তা আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না। কেউ কেউ এই সাদৃশ্য প্রতিপাদনের অর্থ বলেছেনযেমনভাবে তোমাদের প্রভু সত্যরূপে তোমাদেরকে মদীনার বাইরে আসায় সফলকাম করেছেন, অথচ কোন কোন মুমিন এই বের হওয়াতে অসম্মত ছিল, কিন্তু তাদেরকে বের হতেই হয়, অনুরূপভাবে তারা যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে চায় এবং তোমাদের সাথে মতবিরোধ করে, অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মতের সত্যতা তাদের উপর প্রকাশিতই ছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেযেমনভাবে তোমরা বাধ্য হয়ে মদীনা হতে বের হয়েছে, তেমনিভাবে সত্যের বিষয়ে রাসূল (সঃ)-এর সাথে ঝগড়া করছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি বদরের যুদ্ধে বের হওয়ার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। (আরবী) সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- হে নবী (সঃ)! এই মুমিনরা তোমার সাথে ঝগড়া করার নিয়তে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করছে, যেমনভাবে বদর দিবসেও তারা তোমার সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছিল এবং বলেছিলঃ “আপনি তো আমাদেরকে যাত্রীদলের পথরোধ করার জন্যে বের করেছিলেন। আমাদের ধারণাও ছিল না যে, আমাদেরকে যুদ্ধ করতে হবে এবং আমরা যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেও বাড়ী থেকে বের হইনি।” আমি বলি যে, নবী (সঃ) আবু সুফিয়ানের যাত্রীদলের পথরোধ করার জন্যেই মদীনা থেকে বের হয়েছিলেন। কেননা, তার জানা ছিল যে, এই যাত্রীদল কুরায়েশের জন্যে প্রচুর মাল সম্ভার নিয়ে সিরিয়া থেকে মক্কার পথে ফিরে আসছিল। সুতরাং তিনি মুসলমানদেরকে উত্তেজিত করেন এবং তিনশ’ দশের কিছু অধিক লোক নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তিনি বদর কূপের পথে উপকূলের দিকে রওয়ানা হন। ঐ যাত্রীদলের নেতা আবু সুফিয়ান (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উদ্দেশ্যের সংবাদ পেয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যমযম ইবনে আমরকে মক্কা পাঠিয়ে মক্কাবাসীকে মদীনাবাসীদের উদ্দেশ্যের কথা জানিয়ে দেন। কাজেই মক্কাবাসীরা এক হাজার লোক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। আবু সুফিয়ান (রাঃ) যাত্রীদলকে নিয়ে সাইফুল বাহারের দিক দিয়ে আসছিলেন। সুতরাং সেই যাত্রীদল মুসলমানদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। এখন মক্কার ঐ এক হাজার সৈন্য সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তারা বদর কূপের নিকটে এসে শিবির স্থাপন করে। এখন পূর্বের কোন দিন তারিখ ঘোষণা ছাড়াই মুসলমান ও কাফির সৈন্যদল পরস্পর যুদ্ধের সম্মুখীন হয়। কেননা, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের প্রাধান্য বিস্তার করতে চেয়েছিলেন এবং হক ও বাতিলের মধ্যে ফায়সালাকারী যুদ্ধ ঘটিয়ে দেয়ার তার ইচ্ছা ছিল। যেমন এর বর্ণনা শীঘ্রই আসছে। মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন এ সংবাদ অবহিত হন যে, মক্কা থেকে এক বিরাট সেনাবাহিনী তাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে এগিয়ে আসছে তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর কাছে অহী পাঠালেনঃ “দুটোর মধ্যে একটা জিনিস তোমরা লাভ করবে। হয় তোমরা যাত্রীদলের মাল লুটে নিবে, না হয় ঐ সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করবে। দুটোই লাভ করতে পারবে না। সুতরাং যে কোন একটি গ্রহণ করে সফলকাম হয়ে যাও।” মুসলমানদের অধিকাংশের মত ছিল এই যে, তাঁরা যাত্রীদলকে আক্রমণ করবেন এবং বিনা যুদ্ধেই প্রচুর মাল তাঁদের হাতে এসে যাবে। যার বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেনঃ “স্মরণ কর সেই সময়ের কথা যখন আল্লাহ তোমাদের কাছে অঙ্গীকার করেন- দু'দলের এক দল তোমাদের আয়ত্তাধীন হবে। কিন্তু নিরস্ত্র দলটি তোমাদের আয়ত্তাধীন হওয়া তোমরা পছন্দ করছিলে, আর আল্লাহ চাচ্ছিলেন তাঁর বাণী দ্বারা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং কাফিরদের মূল শিকড়কে (মূলশক্তিকে) কেটে দিতে।”
হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) বলেনঃ আমরা মদীনায় ছিলাম এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- “আমি সংবাদ পেয়েছি যে, আবু সুফিয়ান (রাঃ) যাত্রীদল নিয়ে আসতে রয়েছে। তোমাদের মত কি? আমরা কি এই যাত্রীদলের পথরোধ করার জন্যে বেরিয়ে পড়বো? সম্ভবতঃ এতে তোমরা বহু কিছু মালধন লাভ করতে পারবে?” আমরা আরয করলাম, আমরা অবশ্যই বের হতে চাই। সুতরাং আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমরা দু'একদিন চলতে থাকলাম। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আচ্ছা বল তো, এসব কাফিরের সাথে যুদ্ধ করা সম্পর্কে তোমাদের মতামত কি? তারা সংবাদ পেয়ে গেছে যে, তোমরা যাত্রীদলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছো!” মুসলমানরা উত্তরে বললোঃ “আল্লাহর কসম! শত্রুদের এতো বড় সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। আমরা তো শুধু যাত্রীদলের মালধন লুটবার জন্যে বের হয়েছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বার এ প্রশ্নই করেন। আমরা এবারও এ উত্তরই দিলাম। তখন হযরত মিকদাদ ইবনে আমর (রাঃ) বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা এ স্থলে এমন কথা বলবো না যেমন কথা হযরত মূসা (আঃ)-কে তাঁর উম্মতরা বলেছিল। তারা তাকে বলেছিল, “হে মূসা (আঃ)! আপনি ও আপনার প্রভু যান এবং শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে থাকছি।” আমরা আনসার দল আশা পোষণ করলাম এবং বললামঃ হযরত মিকদাদ (রাঃ) যে কথা বললেন, আমরাও যদি ঐ কথাই বলতাম তবে এই যাত্রীদলের প্রচুর মাল লুট করা অপেক্ষা ওটাই আমাদের জন্যে অধিক পছন্দনীয় হতো! তখন (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।”
ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে নিয়ে বদর অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন এবং রাওহা নামক স্থানে পৌছে লোকদের সামনে ভাষণ দান করেন। তিনি বলেনঃ “তোমাদের মত কি?” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা সংবাদ পেয়েছি যে, কাফিররা এই এই স্থান পর্যন্ত পৌছে গেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় বলেনঃ “তোমাদের মত কি?” এবার হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর মতই জবাব দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তৃতীয়বার এই প্রশ্ন করেন। তখন হযরত সা'দ ইবনে মুআয (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে লক্ষ্য করেই বলছেন! তাহলে শুনুন! যিনি আপনাকে মর্যাদা দান করেছেন এবং আপনার উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তাঁর শপথ! আমরা না কখনও বারকুল গামাদ’ গিয়েছি, না ওর পথ আমাদের জানা আছে। কিন্তু তবুও যদি আপনি ইমায়ন থেকে হাবশের (আবিসিনিয়ার) বারকুল গামাদ পর্যন্তও গমন করেন তবে আমরাও আপনার সাথে গমন করবো এবং মূসা (আঃ)-এর উম্মতের মত বলবো নাঃ আপনি ও আপনার প্রভু যান ও যুদ্ধ করেন, আমরা এখানেই বসে থাকছি। হয়তো আপনি বের হবার সময় একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বের হচ্ছেন, অতঃপর আল্লাহ অন্য অবস্থার সৃষ্টি করছেন। তখন আপনি যেটা ইচ্ছা সেটাই গ্রহণ করুন। যে আপনার সাথে থাকতে চায় থাকবে, যে সরে পড়তে চায় সে সরে পড়বে। যে আপনার বিরোধিতা করতে চায় সে বিরোধিতা করুক এবং যে সন্ধি করতে চায় সে সন্ধি করুক। আমাদের যা কিছু মাল রয়েছে তা আপনি নিয়ে নিতে পারেন।” হযরত সা’দ (রাঃ)-এর এই কথার পরিপ্রেক্ষিতেই (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) মুহাম্মাদ ইবনে আমর ইবনে আলকামা ইবনে আবি অক্কালসি লাইসীর (রঃ) হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন। আবু লাইস (রঃ) তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নবী (সঃ) বদর যুদ্ধের ব্যাপারে পরামর্শ করেন, তারপর কুরায়েশের সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন, তখন এই যুদ্ধ মুসলমানদের কাছে অপছন্দনীয় মনে হয়েছিল। এ জন্যেই (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। অর্থাৎ “মুমিনদের একদল একে পছন্দ করতে পারেনি। তাদের কাছে এটা খুবই দুঃসহ ছিল। সত্য সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ হওয়ার পর তারা তোমার সাথে তর্ক করছিল। তাদেরকে দেখে মনে হচ্ছিল যে, তারা যেন মৃত্যুর দিকে চালিত হচ্ছে এবং তারা তা প্রত্যক্ষ করছে।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা (আরবী) বুঝানো হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করা অপছন্দীয় হওয়া। সুন্দী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে- তোমরা আল্লাহর হুকুম ব্যতিরেকে আর কোন কিছুকেই অগ্রাধিকার দেবে না এটা প্রকাশিত হয়ে যাবার পরেও আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর মতের বিরোধিতা করছো! ইবনে যায়েদ (রঃ) (আরবী)-এর সম্পর্কে বলেন যে, এর দ্বারা। মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এই মুশরিকরা সত্যের ব্যাপারে তর্ক করছে, যেন তাদেরকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হচ্ছে। কারণ এই যে, মুমিনরা এরূপ নিন্দনীয় বিশেষণে ভূষিত হতে পারে না। এই বিশেষণ একমাত্র কাফিরদেরই হতে পারে। ইবনে জারীর (রঃ)-এর এই কথার উপর আপত্তি রয়েছে। তাঁর মতে ইবনে যায়েদ (রঃ)-এর এই উক্তির কোন গুরুত্ব নেই। কেননা, (আরবী)-এই শব্দগুলোর পূর্বে ইবারতের ধারা মুমিনদের সম্পর্কেই রয়েছে। সুতরাং যে। শব্দগুলো এর পরে রয়েছে তার এরই হওয়া প্রকাশমান। সত্য ব্যাপার তো এই যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তিই সঠিক। তা এই যে, এর দ্বারা মুমিনদেরকেই বুঝানো হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এই উক্তিরই পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। এটাই সত্য এবং কালামের ধারা এরই পৃষ্ঠপোষকতা করছে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন সফলতার সাথে বদর যুদ্ধ হতে অবকাশ লাভ করেন তখন তাকে বলা হয়ঃ “এখন আপনি মালধন আনয়নকারী যাত্রীদলের উপরও আক্রমণ চালিয়ে দিন। এখন তো আর কোন বাধা নেই।” তখন যুদ্ধবন্দীদের একজন হযরত আব্বাস বলেনঃ “এটা কখনও উচিত হবে না। কেননা, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ পাক তো আপনার সাথে দুটোর যে কোন একটার ওয়াদা করেছেন। আর একটা তো আপনি লাভ করেছেন। সুতরাং দ্বিতীয়টি লাভ করার আর কোন অধিকার নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এর ইসনাদ উত্তম। সিহাহ সিত্তাহর কোনটিতেই এটা তাখরীজ করা হয়নি)
(আরবী) অর্থাৎ তোমাদের অভিপ্রায় এই ছিল যে, যেন নিরস্ত্র দলটি তোমাদের আয়ত্তে এসে পড়ে। তাহলে কেউ প্রতিরোধ করবে না এবং যুদ্ধ করারও প্রয়োজন হবে না। অর্থাৎ আবু সুফিয়ানের যাত্রীদলকে লুটে নেয়া। কিন্তু আল্লাহ চাচ্ছিলেন তোমাদেরকে এমন এক দলের সাথে ভিড়িয়ে দিতে যাৱা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, যেন তিনি স্বীয় নির্দেশাবলী দ্বারা সত্যকে সত্যরূপে প্রতিপন্ন করে দেন এবং সেই কাফিরদের মূলকে কর্তন করে ফেলেন। আল্লাহ ছাড়া কাজের পরিণাম সম্পর্কে কেউই অবহিত নয়। উত্তম তদবীরের তদবীরকারী একমাত্র তিনিই, যদিও মানুষ ঐ তদবীরের বিপরীত কামনা করে। যেমন তিনি বলেনঃ “তোমাদের উপর ফরয় করা হয়েছে আর ওটা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়, কিন্তু খুব সম্ভব তোমরা যা অপছন্দ কর ওতেই তোমাদের মঙ্গল নিহিত রয়েছে এবং তোমরা যা পছন্দ কর বা ভালবাস তাতেই তোমাদের অকল্যাণ নিহিত রয়েছে। নিম্নের হাদীসটিও বদর সম্পর্কীয় হাদীস যে, নবী (সঃ) যখন সিরিয়া হতে আবু সুফিয়ানের ফিরে আসার সংবাদ পেলেন তখন তিনি মুসলমানদেরকে ডেকে বললেনঃ “কুরায়েশের এই যাত্রীদলের সাথে প্রচুর মালপত্র রয়েছে। সুতরাং তোমরা তাদেরকে আক্রমণ কর। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের গনীমতের মাল তোমাদেরকে প্রদান করবেন।” তাঁর এ কথা শুনে সাহাবীগণ রওয়ানা হয়ে গেলেন। তাঁদের কেউ কেউ হালকা অস্ত্র নিলেন এবং কেউ কেউ ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিলেন। তাঁদের এ ধারণা ছিল না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধ করবেন। আবু সুফিয়ান যখন হিজাযের। নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি গুপ্তচর ছেড়ে ছিলেন এবং প্রত্যেক গমনাগমন কারীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সংবাদ জিজ্ঞেস করতে থাকলেন। অবশেষে তিনি জানতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাত্রীদলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেছেন। সুতরাং তিনি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ যমযম ইবনে আমর গিফারীকে মক্কা পাঠিয়ে দিলেন যে, সে যেন কুরায়েশদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদেরকে অবস্থা অবহিত করতঃ যাত্রীদলের হিফাযতের ব্যবস্থা করে আসে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাত্রীদলকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেছেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাথীদেরকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন এবং যাফরান’ উপত্যকা পর্যন্ত পৌঁছে সেখানে অবস্থান করেছেন। ইতিমধ্যে তিনি সংবাদ পেলেন যে, কুরায়েশরা যাত্রীদলের হিফাযত ও মুসলমানদের আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে যাত্রা শুরু করেছে। সুতরাং তিনি সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) দাঁড়ালেন এবং উত্তম কথা বললেন। অতঃপর হযরত উমারও (রাঃ) দাঁড়িয়ে ভাল কথা বললেন। তারপর হযরত মিকদাদ ইবনে আমর (রাঃ) বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ আপনাকে যে আদেশ করেছেন তা আপনি পালন করুন। আমরা আপনার সাথেই রয়েছি। আল্লাহর শপথ! বানী ইসরাঈল যে কথা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেছিল সে কথা আমরা আপনাকে বলবো না। তারা মূসা (আঃ)-কে বলেছিলঃ “হে মূসা (আঃ)! আপনি ও আপনার প্রভু গমন করুন এবং যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে থাকছি।” আপনি যদি আমাদেরকে হাবশ পর্যন্ত নিয়ে যেতে চান তবে যে পর্যন্ত আপনি সেখানে না পৌছবেন সেই পর্যন্ত আমরা আপনার সাথ ছাড়বো না। হযরত মিকদাদ (রাঃ)-এর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর কল্যাণের জন্যে দুআ করলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা আমাকে পরামর্শ দান কর।” এ কথা তিনি আনসারদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন। একটা কারণ তো এই যে, আনসারগণ সংখ্যায় বেশী ছিলেন। দ্বিতীয় কারণ ছিল এটাও যে, আকাবায় যখন আনসারগণ বায়আত গ্রহণ করেন তখন তারা নিম্নরূপ কথার উপর তা গ্রহণ করেছিলেনঃ “যখন আপনি মক্কা ছেড়ে মদীনায় পৌছবেন তখন সর্বাবস্থাতেই আমরা আপনার সাথে থাকবো। অর্থাৎ যদি শত্রুরা আপনার উপর আক্রমণ চালায় তবে আমরা তাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো।” যেহেতু তাঁদের বায়আত গ্রহণের সময় এ কথা ছিল না যে, মুসলমানদের অগ্রগতির সময়ও তারা তাদের সাথে থাকবেন, সেই হেতু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরও মত জানতে চাচ্ছিলেন, যেন তাঁদের নিকট থেকেও অঙ্গীকার নিয়ে তাঁদেরও সাহায্য সহানুভূতি লাভ করতে পারেন। হযরত সা'দ (রাঃ) বললেনঃ “সম্ভবতঃ আপনি আমাদের উদ্দেশ্যেই বলছেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমি তোমাদেরকে উদ্দেশ্য করেই বললাম।” তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আপনার উপর ঈমান এনেছি। আপনার আদেশ-নিষেধ মান্য করার বায়আত আমরা আপনার হাতে গ্রহণ করেছি। সুতরাং আমরা কোন অবস্থাতেই আপনার হাত ছাড়বো না। আল্লাহর শপথ! আপনি যদি সমুদ্র তীরে দাড়িয়ে তাতে ঘোড়াকে নামিয়ে দেন তাহলে আমরাও সমুদ্রে ঝাপিয়ে পড়বো। আমাদের মধ্যে কেউই এতে মোটেই দ্বিধাবোধ করবে না। যুদ্ধে আমরা বীরত্ব প্রদর্শনকারী এবং কঠিন বিপদ আপদে সাহায্যকারী । ইনশাআল্লাহ আপনি আমাদের উপর সন্তুষ্ট থাকবেন।” এই উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত খুশী হন। তৎক্ষণাৎ তিনি যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ আমার সাথে দুটোর মধ্যে একটার ওয়াদা করেছেন এবং এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, ঐ একটি এই যুদ্ধই বটে। আমি যেন মুশরিকদের বধ্যভূমি এখান থেকেই স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।