আল কুরআন


সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 37)

সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 37)



হরকত ছাড়া:

ليميز الله الخبيث من الطيب ويجعل الخبيث بعضه على بعض فيركمه جميعا فيجعله في جهنم أولئك هم الخاسرون ﴿٣٧﴾




হরকত সহ:

لِیَمِیْزَ اللّٰهُ الْخَبِیْثَ مِنَ الطَّیِّبِ وَ یَجْعَلَ الْخَبِیْثَ بَعْضَهٗ عَلٰی بَعْضٍ فَیَرْکُمَهٗ جَمِیْعًا فَیَجْعَلَهٗ فِیْ جَهَنَّمَ ؕ اُولٰٓئِکَ هُمُ الْخٰسِرُوْنَ ﴿۳۷﴾




উচ্চারণ: লিয়ামীযাল্লা-হুল খাবীছা মিনাততাইয়িবি ওয়া ইয়াজ‘আলাল খাবীছা বা‘দাহূ‘আলাবা‘দিন ফাইয়ারকুমাহূজামী‘আন ফাইয়াজ‘আলাহূফী জাহান্নামা উলাইকা হুমুল খাছিরূন।




আল বায়ান: যাতে আল্লাহ পৃথক করেন মন্দকে ভাল হতে আর মন্দের কতককে কতকের উপর রাখবেন এবং সেগুলোকে একসাথে স্তূপ করবেন। এরপর তা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৭. যাতে আল্লাহ অপবিত্রদেরকে পবিত্রদের থেকে আলাদা করেন।(১) তিনি অপবিত্রদের একটাকে আরেকটার উপর রাখবেন এবং সেগুলোকে একসাথে স্তুপ করবেন, তারপর তা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।




তাইসীরুল ক্বুরআন: যাতে আল্লাহ পবিত্র থেকে অপবিত্রকে আলাদা করে দেন, অতঃপর অপবিত্রদের এককে অন্যের উপর রাখবেন, সকলকে স্তুপীকৃত করবেন; অতঃপর এই সমষ্টিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। এরাই হল সর্বস্বান্ত।




আহসানুল বায়ান: (৩৭) এ জন্যই যে, আল্লাহ কুজনকে সুজন হতে পৃথক করবেন[1] এবং কুজনের এককে অপরের উপর রাখবেন, অতঃপর সকলকে স্তূপীকৃত করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন, এরাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।



মুজিবুর রহমান: এটা এ কারণে যে, আল্লাহ ভাল থেকে মন্দকে পৃথক করবেন, আর কু-জনদের সকলকে একজনের উপর অপর জনকে স্তপীকৃত করবেন এবং অতঃপর জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। এরাই চরম ক্ষতিগ্রস্ত লোক।



ফযলুর রহমান: যাতে আল্লাহ ভাল লোকদের থেকে খারাপ লোকদেরকে পৃথক করতে পারেন এবং খারাপ লোকদের একজনকে আরেকজনের ওপর রেখে সকলকে স্তুপাকার করে (একবারে) জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে পারেন। ঐ লোকগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত।



মুহিউদ্দিন খান: যাতে পৃথক করে দেন আল্লাহ অপবিত্র ও না-পাককে পবিত্র ও পাক থেকে। আর যাতে একটির পর একটিকে স্থাপন করে সমবেত স্তুপে পরিণত করেন এবং পরে দোযখে নিক্ষেপ করেন। এরাই হল ক্ষতিগ্রস্ত।



জহুরুল হক: যেন আল্লাহ্ পৃথক করতে পারেন মন্দকে ভালো থেকে, আর মন্দকে তিনি স্থাপন করবেন তাদের একটিকে অন্যটির উপরে, তারপর সবটাকে তিনি একত্রে স্তূপীকৃত করবেন এবং তাকে ফেলবেন জাহান্নামে। তারা নিজেরাই হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত।



Sahih International: [This is] so that Allah may distinguish the wicked from the good and place the wicked some of them upon others and heap them all together and put them into Hell. It is those who are the losers.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৭. যাতে আল্লাহ অপবিত্রদেরকে পবিত্রদের থেকে আলাদা করেন।(১) তিনি অপবিত্রদের একটাকে আরেকটার উপর রাখবেন এবং সেগুলোকে একসাথে স্তুপ করবেন, তারপর তা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ কাফেররা যেসব সম্পদ ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে এবং পরে যার জন্য দুঃখ ও অনুতাপ করেছে আর অপমানিত-অপদস্থ হয়েছে, তাতে ফায়দা হয়েছে এই যে, আল্লাহ তা'আলা যাতে অপবিত্র পঙ্কিল এবং পবিত্র বস্তুতে পার্থক্য প্রকাশ করে দেন। طيب ও خبيث দু'টি বিপরীতাৰ্থক শব্দ। এখানে خبيث ও طيب বলতে কি বোঝানো হয়েছে তাতে দুটি মত রয়েছে।

(এক) অধিকাংশ মুফাসসির خبيث ও طيب এর সাধারণ অর্থ যথাক্রমে অপবিত্র ও পবিত্র বলেই সাব্যস্ত করেছেন এবং পবিত্র বলতে মুমিন এবং অপবিত্র বলতে কাফের বুঝিয়েছেন। [তাবারী] এ অর্থে উল্লেখিত অবস্থার মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র ও অপবিত্র অর্থাৎ মুমিন ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য করতে চান; সমস্ত মুমিন জান্নাতে আর সমস্ত কাফের জাহান্নামে সমবেত হোক, এটাই তার ইচ্ছা।

(দুই) خبيث শব্দটি অপবিত্র, পঙ্কিল ও হারাম বস্তুকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আর طيب তার বিপরীত পবিত্র, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও হালাল বস্তুকে বোঝাতে বলা হয়। এখানে এ দু'টি শব্দের দ্বারা যথাক্রমে কাফেরদের অপবিত্র ধনসম্পদ এবং মুসলিমদের পবিত্র সম্পদ ও অর্থ বোঝা যেতে পারে। [ফাতহুল কাদীর] এমতাবস্থায় এর অর্থ হবে এই যে, কাফেররা যে বিপুল অর্থ-সম্পদ ব্যয় করেছে তা ছিল অপবিত্র ও হারাম সম্পদ। ফলে তার অশুভ পরিণতিতে মালও গেছে এবং জানও গেছে। পক্ষান্তরে মুসলিমরা অতি অল্প পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করেছে, কিন্তু সে সম্পদ ছিল পবিত্র ও হালাল। ফলে তা ব্যয়কারীরা বিজয় অর্জন করেছেন এবং সাথে সাথে গনীমতের মালামাল অর্জনেও সমর্থ হয়েছেন। এ অর্থে জাহান্নামে জমা করার অর্থ, এ সম্পদের দ্বারা তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “যেদিন জাহান্নামের আগুনে সেগুলোকে উত্তপ্ত করা হবে এবং সে সব দিয়ে তাদের কপাল, পাজর আর পিঠে দাগ দেয়া হবে। [সূরা আত-তাওবাহ: ৩৫]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৭) এ জন্যই যে, আল্লাহ কুজনকে সুজন হতে পৃথক করবেন[1] এবং কুজনের এককে অপরের উপর রাখবেন, অতঃপর সকলকে স্তূপীকৃত করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন, এরাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।


তাফসীর:

[1] এই পৃথকীকরণ হয়তো বা পরকালে হবে। সৎলোকদেরকে অসৎ লোক হতে আলাদা করে নেওয়া হবে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, {وَامْتَازُوا الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ} ‘‘হে অপরাধীরা! আজ তোমরা আলাদা হয়ে যাও।’’ (সূরা ইয়াসীন ৫৯ আয়াত) অর্থাৎ, সৎলোকদের হতে আলাদা হয়ে যাও। আর অপরাধীরা অর্থাৎ, কাফের-মুশরিক ও অবাধ্য লোকেরা। এদেরকে একত্রিত করে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অথবা এই পৃথকীকরণ পৃথিবীতেই ঘটবে। আর ‘লাম’ হরফটি কারণ দর্শানোর জন্য হবে। অর্থাৎ, কাফেররা অন্যদেরকে আল্লাহর রাস্তায় বাধা দেওয়ার জন্য সম্পদ খরচ করবে। আমি তাদেরকে এ রকম করার সুযোগ দেব, যাতে এভাবে ভালকে মন্দ হতে, কাফেরকে মু’মিন হতে, মুনাফিককে প্রকৃত মুসলিম হতে আলাদা করে দিই। এইভাবে এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় যে, আমি কাফেরদের দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা নেব; তারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়বে। আর আমি তাদের লড়াইয়ে অর্থব্যয় করার শক্তি যোগাব, যাতে সুজন হতে কুজন আলাদা হয়ে যায়। অতঃপর তিনি সকল কুজনদের একত্রিত করবেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীরঃ



৩৬ নং আয়াতের শানে নুযূল:



বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের পরাজয় বরণ এবং আবূ সুফিয়ান ও তার কাফেলা মক্কায় প্রত্যার্বতন করার পর আবদুল্লাহ বিন আবূ রাবিআহ, ইকরিমা বিন আবূ জাহল, সাফওয়ান বিন উমাইয়া এবং কুরাইশদের আরো কয়েকজন লোক যাদের পিতা-পুত্র ও ভাই যুদ্ধে মারা গিয়েছিল তারা আবূ সুফিয়ানকে এবং ঐ লোকেদেরকে বলল যাদের কাফেলাতে সম্পদ ছিল, হে কুরাইশদের দল! মুহাম্মাদ তোমাদেরকে নীচে ফেলে দিয়েছে এবং তোমাদের সম্ভ্রান্ত লোকেদের হত্যা করেছে। তার সাথে পুনরায় যুদ্ধ করার জন্য তোমাদের এই কাফেলার সমস্ত মাল দিয়ে দাও, যেন আমরা এর মাধ্যমে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারি। তখন তারা তাই করল। তাদের ব্যাপারে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। এরূপ ইবনু আব্বাস (রাঃ) উল্লেখ করেছেন। (তাফসীর তাবারী. ১৩/৫৩২, ইবনে হিশাম সীরাহ নবুবিয়াহ ২ /২৭৪,মুরসাল সহীহ)



(الْخَبِيْثَ مِنَ الطَّيِّبِ)



‘কুজনকে সুজন হতে’ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সৌভাগ্যশীলদেরকে দুর্ভাগ্যবানদের থেকে আলাদা করার জন্য। সুদ্দী (রহঃ) বলেন: মু’মিনদেরকে কাফিরদের হতে আলাদা করার জন্য।



তবে সম্ভবনা রয়েছে এ আলাদা আখিরাতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَيَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيْعًا ثُمَّ نَقُوْلُ لِلَّذِيْنَ أَشْرَكُوْا مَكَانَكُمْ أَنْتُمْ وَشُرَكَا۬ٓؤُكُمْ ج فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْ)



“এবং সেদিন আমি তাদের সকলকে একত্র করে যারা মুশরিক তাদেরকে বলব, ‘তোমরা এবং তোমরা যাদেরকে শরীক করেছিলে তারা স্ব স্ব স্থানে অবস্থান কর‎’; আমি তাদেরকে পরস্পর হতে পৃথক করে দেব।” (সূরা ইউনূস ১০:২৮)



আবার সম্ভবনা রয়েছে এ আলাদা দুনিয়াতেও হতে পারে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(مَا كَانَ اللّٰهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِيْنَ عَلٰي مَآ أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتّٰي يَمِيْزَ الْخَبِيْثَ مِنَ الطَّيِّبِ)



“আল্লাহ এরূপ নন যে, তিনি অপবিত্র হতে পবিত্রকে পৃথক না করা পর্যন্ত মু’মিনরা যে অবস্থায় আছে সে অবস্থার উপরেই ছেড়ে দিবেন?” (সূরা আলি-ইমরান ৩:১৭৯)



فَيَرْكُمَهُ অর্থাৎ সবাইকে একত্রিত করবেন। সকল পাপাচারী লোকেদেরকে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামে একত্রিত করবেন।



(إِنْ يَّنْتَهُوْا يُغْفَرْ لَهُمْ مَا قَدْ سَلَفَ)



‘যদি তারা বিরত হয় তবে যা অতীত হয়েছে তা ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ অর্থাৎ এখানে ইসলাম গ্রহণ করার ফযীলত বর্ণনা করা হচ্ছে। কোন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করলে তার পূর্বের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি ভালভাবে ইসলাম মেনে নেয় জাহিলী যুগের (ইসলাম গ্রহণের পূর্বের) আমালের জন্য তাকে পাকড়াও করা হবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৬৯২১)



অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: ইসলাম তার পূর্বের সকল অপরাধ মোচন করে দেয়। (সহীহ মুসলিম হা: ৩৩৬)



পক্ষান্তরে যদি কুফরীর ওপর অটল থাকে তাহলে পূর্ববর্তীদেরকে তাদের অপরাধের জন্য যেমন পাকড়াও করা হয়েছিল তাদের মত তাদেরকেও পাকড়াও করা হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: ইসলাম আগমনের পরেও যে ব্যক্তি কুফরীর ওপর বহাল থাকবে তাকে আগে ও পরের সকল গুনাহর জন্য পাকড়াও করা হবে। (সহীহ বুখারী হা: ৬৯২১)



(وَقَاتِلُوْهُمْ حَتّٰي لَا تَكُوْنَ فِتْنَةٌ)



‘এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেতনা (শির্ক) দূরীভূত হয়’ এখানে ফেতনা অর্থ হল- শির্ক অর্থাৎ যতদিন পৃথিবীর বুকে শির্ক থাকবে এবং সকলে আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদের পতাকা তলে না আসবে ততদিন পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাও।



ইমাম বুখারী এ আয়াতের তাফসীরে ইবনু উমার (রাঃ) থেকে একটি বর্ণনা নিয়ে এসেছেন। ইবনু উমার (রাঃ)-এর নিকট জনৈক ব্যক্তি আগমন করল এবং বলল: হে আবূ আবদুর রহমান! আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে কী বলেছেন তা শুনেননি?



(وَإِنْ طَا۬ئِفَتٰنِ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ اقْتَتَلُوْا فَأَصْلِحُوْا بَيْنَهُمَا ج فَإِنْۭ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَي الْأُخْرٰي فَقَاتِلُوا الَّتِيْ تَبْغِيْ حَتّٰي تَفِيْ۬ءَ إِلٰٓي أَمْرِ اللّٰهِ)



“যদি ঈমানদারদের দু’দল একে অপরের সাথে লড়াই করে তাহলে তাদের মধ্যে আপোষ করে দাও। এরপর যদি একদল অপর দলের সাথে বাড়াবাড়ি করে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই কর; যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে।” (সূরা হুজুরাত ৪৯:৯)।



আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে যখন এরূপ উল্লেখ করেছেন তাহলে কিসে আপনাকে সংগ্রাম করতে বাধা দিল? তিনি বললেন: হে ভ্রাতুষ্পুত্র! কোন মু’মিনকে ইচ্ছাপূবর্ক হত্যা করা অপেক্ষা যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ভর্ৎসনা সহ্য করা আমার পক্ষে অধিক সহজ। যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:



(وَمَنْ يَّقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَا۬ؤُه۫ جَهَنَّمُ خٰلِدًا فِيْهَا وَغَضِبَ اللّٰهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَه۫ وَأَعَدَّ لَه۫ عَذَابًا عَظِيْمًا)‏



“আর কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মু’মিনকে হত্যা করলে, তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং তার ওপর আল্লাহর ক্রোধ এবং অভিসম্পাত এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন।” (সূরা নিসা ৪:৯৩)।



ইবনু উমার (রাঃ) বললেন: রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগে আমাদের অবস্থা এরূপই ছিল। ইসলামে লোকেদের সংখ্যা খুবই কম ছিল। দীনের ব্যাপারে লোকেরা পরীক্ষার মধ্যে পড়েছিল। হয় তাদেরকে হত্যা করা হত অথবা বন্দী করে রাখা হত এমনকি যখন ইসলামের অনুসারী অনেক হয়ে গেল তখন আর ফেতনা বাকি থাকল না।



মোটকথা, ঐ আপত্তিকারী লোকটির মতের সাথে যখন ইবনু উমার (রাঃ) এর মতের মিল হল না তখন সে কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে বলল: আলী (রাঃ), উসমান (রাঃ) সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? ইবনু উমার (রাঃ) বললেন: আলী ও উসমান (রাঃ) এদের ব্যাপারে আমার আবার কী কথা? উসমান (রাঃ) তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে কিন্তু তোমরা এ ক্ষমা করে দেয়াকে অপছন্দ কর। আর আলী তো রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জামাতা ও চাচাতো ভাই। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৫০)



অন্য বর্ণনায় রয়েছে তাবেয়ী নাফি (রহঃ) বলেন: আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ)-এর ঘটনার সময় দু’জন লোক ইবনু ওমার (রাঃ)-এর কাছে এসে বললেন: কী ব্যাপার, মানুষেরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আর আপনার মত নাবী (সাঃ)-এর সাহাবী বসে আছেন; বের হচ্ছেন না, আপনাকে কিসে বাধা দিচ্ছে? তিনি বললেন যে, আল্লাহ তা‘আলা আমার জন্য মুসলিম ভাই এর রক্ত হারাম করে দিয়েছেন। এটাই আমাকে বাধা দিচ্ছে। তারা বললেন: কী বলেন! আল্লাহ তা‘আলা কি বলেননি:



(وَقٰتِلُوْھُمْ حَتّٰی لَا تَکُوْنَ فِتْنَةٌ وَّیَکُوْنَ الدِّیْنُ لِلہِ)



“আর ফেত্না-ফাসাদ দূরীভূত হয়ে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর।” তিনি বললেন: আমরা যুদ্ধ করেছি, ফিতনা নির্মূল হয়েছে এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্যই দীন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর তোমরা চাও যুদ্ধ করবে যেন ফিতনা সৃষ্টি হয় এবং দীন অন্যের জন্য হয়ে যায়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৫১৩)



সাঈদ বিন যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমাদের কাছে ইবনু উমার (রাঃ) বের হয়ে আসলেন। একজন লোক বলল: ফেতনার সময় যুদ্ধের ব্যাপারে আপনার মতামত কী? ইবনু উমার বললেন: তুমি জান ফেতনা কী? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন। তখন তাদের মধ্যে ফেতনা ছিল (অর্থাৎ শির্ক ছিল) আমাদের মত রাজার বিরুদ্ধে রাজত্ব হাসিলের জন্য যুদ্ধ করতেন না। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৫১)



(وَيَكُوْنَ الدِّيْنُ كُلُّه۫ لِلّٰهِ)



‘আল্লাহর দীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়’ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন:



يَخْلُصُ التَّوْحِيْدَ لِلّٰهِ



অর্থাৎ সকলেই আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদের অনুসারী হয়ে যাবে।



মুহাম্মাদ বিন ইসহাক বলেন: একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ প্রতিষ্ঠা হবে, কোন শির্ক থাকবে না এবং অন্যান্য সকল মা‘বূদ থেকে মুক্ত থাকবে। (ইবনু কাসীর, ৪র্থ খ. পৃঃ ৬১)



فَإِنِ انْتَهَوْا ‘যদি তারা বিরত হয়’ অর্থাৎ তাদের সাথে যুদ্ধ করার পর যদি তারা কুফরী থেকে ফিরে আসে তাহলে তাদেরকে ক্ষমা করে দাও, কারণ এখন তারা তোমাদের দীনি ভাই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِيْنَ حَيْثُ وَجَدْتُّمُوْهُمْ وَخُذُوْهُمْ وَاحْصُرُوْهُمْ وَاقْعُدُوْا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ ج فَإِنْ تَابُوْا وَأَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَاٰتَوُا الزَّكٰوةَ فَخَلُّوْا سَبِيْلَهُمْ ط إِنَّ اللّٰهَ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ)‏



“অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদেরকে যেখানে পাবে হত্যা কর, তাদেরকে বন্দী কর, অবরোধ কর এবং প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের জন্য ওঁৎ পেতে বসে থাক । কিন্তু যদি তারা তওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও; নিশ্চয়ই আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”(সূরা তাওবাহ ৯:৫)



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. ইসলাম গ্রহণ করলে পূর্বের সকল অপরাধ ক্ষমা হয়ে যায়।

২. শির্ক থাকা অবধি শরীয়তসম্মতভাবে জিহাদ চলতে থাকবে।

৩. কাফির-মুশরিকরা ইসলাম গ্রহণ করলে মুসলিমদের দীনি ভাই বলে গণ্য হবে।

৪. কাফিরদের সম্পদ ব্যয় করার উদ্দেশ্য জানতে পারলাম।

৫. ভাল মন্দ পার্থক্য করার পর জান্নাত অথবা জাহান্নামে দেয়া হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৬-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর:

বদরের যুদ্ধে কুরায়েশদের উপর যখন বিপদ পৌঁছে এবং তারা মক্কা প্রত্যাবর্তন করে, আর আবূ সুফিয়ানও কাফেলাসহ মক্কা ফিরে যান তখন আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবিআহ, ইকরামা ইবনে আবি জেহেল, সাফওয়ান। ইবনে উমাইয়া এবং কুরায়েশদের আরো কয়েকজন লোক, যাদের পিতা, পুত্র এবং ভাই যুদ্ধে নিহত হয়েছিল তারা আবু সুফিয়ানকে বললো এবং ঐ লোকদেরকেও বললো যাদের ব্যবসায়ের মাল ঐ কাফেলায় ছিলঃ “হে কুরায়েশের দল! মুহাম্মাদ (সঃ) তোমাদেরকে নীচে ফেলে দিয়েছে এবং তোমাদের সম্ভ্রান্ত লোকদেরকে হত্যা করেছে। তার সাথে পুনরায় যুদ্ধ করার জন্যে তোমরা এই কাফেলার সমস্ত মাল দিয়ে দাও, যেন আমরা এর মাধ্যমে তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারি।” সুতরাং তারা তাদের সমস্ত মাল দিয়ে দিলো। এ ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা ... (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ কাফিররা আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত্ত করার উদ্দেশ্যে তাদের মাল-ধন ব্যয় করে। তারা তাদের মাল-ধন ব্যয় করতেই থাকবে, অতঃপর ওটাই তাদের জন্যে দুঃখ ও আফসোসের কারণ হবে এবং তারা পুনরায় পরাজিত হবে এবং তাদেরকে জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে । যাহহাক (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি আবু সুফিয়ান এবং কুরায়েশদের মাল-ধন খরচ করার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়নি, বরং আহলে বদরের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল। মোটকথা, যে ব্যাপারেই অবতীর্ণ হাক না কেন আয়াতটি সাধারণ, যদিও এর শানে নুযূল বিশিষ্ট হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, সত্যের পথ অনুসরণকারীদেরকে বাধা দেয়ার উদ্দেশ্যে কাফিররা তাদের ধন-দৌলত ব্যয় করে থাকে। কিন্তু তাদের এই সমুদয় মাল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং পরিণামে তাদেরকে আফসোস করতে হবে। তারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ চান তার নূরকে পূর্ণ করতে-যদিও এটা কাফিরদের কাছে অপছন্দনীয় হয়। আল্লাহ স্বীয় দ্বীনের সাহায্যকারী ও স্বীয় কালেমাকে জয়যুক্তকারী থাকবেন। কাফিরদের জন্যে দুনিয়ায় রয়েছে অপমান ও লাঞ্ছনা এবং আখিরাতে রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। যারা যুদ্ধের ময়দান থেকে জীবিত ফিরেছে তারা তাদের লজ্জাজনক পরিণাম স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। আর যারা নিহত হয়েছে তারা তো চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের অধিবাসী হয়ে গেছে।

(আরবী) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- যেন আল্লাহ ভাগ্যবানদের থেকে হতভাগাদেরকে পৃথক করে দেন। অর্থাৎ যেন মুমিনরা কাফিরদের থেকে পৃথক হয়ে যায়। আবার এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, এই পৃথককরণ দ্বারা আখিরাতের পৃথককরণ বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি মুশরিকদেরকে বলবো- তোমরা ও তোমাদের শরীকরা তোমাদের স্থানে অবস্থান কর, আমি তাদের মাঝে স্বাতন্ত্র্য আনয়ন করবো।” অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেনঃ ' “সেই দিন তারা পৃথক পৃথক হয়ে যাবে।” আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে অপরাধীরা! আজ তোমরা (মুমিনদের হতে) পৃথক হয়ে যাও।” অথবা এর দ্বারা দুনিয়াতেই পৃথক হওয়া উদ্দেশ্য। তা এভাবে যে, মুমিনদের আমল আলাদা এবং কাফিরদের আমল আলাদা। আর (আরবী)-এর (আরবী) টি বা কারণ সম্পৰ্কীয় হতে পারে। অর্থাৎ পাপ কার্যের উপর মাল খরচ করার কারণে আল্লাহ তা'আলা ভাল হতে মন্দকে পৃথক করে দিয়েছেন। অর্থাৎ এই স্বাতন্ত্র্য আনয়নের জন্যে যে, কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করার ব্যাপারে কে আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করছে এবং কে এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে পাপী হয়ে যাচ্ছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ দুটো সেনাবাহিনী মুখোমুখী হওয়ার সময় তোমাদের উপর যা কিছু পৌঁছেছিল তা আল্লাহর হুকুমেই ছিল, যেন তিনি মুমিনদেরকেও দেখে নেন। আর ঐ লোকদেরকেও দেখে নেন যারা কপটতাপূর্ণ কাজ করেছে। তাদেরকে বলা হয়েছিল- এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা শত্রুদের প্রতিরোধকারী হয়ে যাও। তারা বললো- “যদি আমরা কোন নিয়মিত যুদ্ধ দেখতাম তবে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গী হয়ে যেতাম।” আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “তোমরা কি ধারণা কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ এখন পর্যন্ত আল্লাহ তাদেরকে তো দেখেই নেননি যারা তোমাদের মধ্যে জিহাদ করেছে এবং তাদেরকেও দেখেননি যারা জিহাদে দৃঢ়পদ থাকে।” মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ আল্লাহ মুমিনদের এ অবস্থায় রাখতে চান না যে অবস্থায় তোমরা এখন রয়েছে, যে পর্যন্ত না তিনি অপবিত্রকে পবিত্র হতে পৃথক করেন এবং আল্লাহ এরূপ অদৃশ্য বিষয় তোমাদেরকে অবহিত করেন না।” এর দৃষ্টান্ত সূরায়ে বারাআতেও রয়েছে। সুতরাং এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে- আমি তোমাদেরকে কাফিরদের সাথে ভিড়িয়ে দিয়ে পরীক্ষা করবো। তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করবে এবং তোমাদের বিরুদ্ধে তাদের ধন-মাল খরচ করবে। এটা শুধু এই পৃথককরণের জন্যে যে, অপবিত্র কারা এবং পবিত্র কারা (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে একটা জিনিসের উপর একটা জিনিসকে একত্রিত করা। যেমন মেঘ সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর ঐ মেঘকে তিনি স্তরে স্তরে সাজিয়ে দেন।” (২৪:৪৩) (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর তিনি তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন, ঐসব লোকই হচ্ছে চরম ক্ষতিগ্রস্ত লোক।`





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।