আল কুরআন


সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 34)

সূরা আল-আনফাল (আয়াত: 34)



হরকত ছাড়া:

وما لهم ألا يعذبهم الله وهم يصدون عن المسجد الحرام وما كانوا أولياءه إن أولياؤه إلا المتقون ولكن أكثرهم لا يعلمون ﴿٣٤﴾




হরকত সহ:

وَ مَا لَهُمْ اَلَّا یُعَذِّبَهُمُ اللّٰهُ وَ هُمْ یَصُدُّوْنَ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَ مَا کَانُوْۤا اَوْلِیَآءَهٗ ؕ اِنْ اَوْلِیَآؤُهٗۤ اِلَّا الْمُتَّقُوْنَ وَ لٰکِنَّ اَکْثَرَهُمْ لَا یَعْلَمُوْنَ ﴿۳۴﴾




উচ্চারণ: ওয়ামা-লাহুম আল্লা-ইউ‘আযযিবাহুমুল্লা-হু ওয়া হুম ইয়াসুদ্দূনা ‘আনিল মাছজিদিল হারা-মি ওয়ামা-কা-নূআওলিয়াআউহূ ইন আওলিয়াউহূইল্লাল মুত্তাকূনা ওয়ালা-কিন্না আকছারাহুম লা-ইয়া‘লামূন।




আল বায়ান: আর তাদের কী আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে আযাব দেবেন না? অথচ তারা মসজিদুল হারাম থেকে বাধা প্রদান করে, আর তারা এর অভিভাবকও নয়। তার অভিভাবক তো শুধু মুত্তাকীগণ; কিন্তু তাদের অধিকাংশ জানে না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৪. আর তাদের কী ওজর আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন না?(১) যখন তারা লোকদেরকে মসজিদুল হারাম থেকে নিবৃত্ত করে? অথচ তারা সে মসজিদের অভিভাবক নয়, এর অভিভাবক তো কেবল মুত্তাকীগণই; কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ যে তাদেরকে শাস্তি দিবেন না এ ব্যাপারে ওজর পেশ করার জন্য তাদের কাছে কী আছে যখন তারা (মানুষদেরকে) মাসজিদুল হারাম-এর পথে বাধা দিচ্ছে? তারা তো ওর (প্রকৃত) মুতাওয়াল্লী নয়, মুত্তাকীরা ছাড়া কেউ তার মুতাওয়াল্লী হতে পারে না, কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোক এ সম্পর্কে অবগত নয়।




আহসানুল বায়ান: (৩৪) তাদের মধ্যে কি (এমন গুণ) আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন না; যখন তারা লোকদেরকে মাসজিদুল-হারাম (পবিত্র কা’বা) হতে নিবৃত্ত করে? অথচ তারা ওর তত্ত্বাবধায়ক নয়, ওর তত্ত্বাবধায়ক তো কেবল (পরহেযগার) সাবধানী লোকেরাই। কিন্তু তাদের অধিকাংশ তা অবগত নয়।[1]



মুজিবুর রহমান: কিন্তু তাদের কি বলার আছে যে জন্য আল্লাহ তাদের শাস্তি দিবেননা, যখন তারা মাসজিদুল হারামের পথ রোধ করছে, অথচ তারা মাসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধায়ক নয়? আল্লাহভীরু লোকেরাই উহার তত্ত্বাবধায়ক, কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোক এটা অবগত নয়।



ফযলুর রহমান: আর তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন না কেন, যখন তারা মসজিদে হারাম থেকে লোকদেরকে বিরত রাখে? অথচ তারা তার অভিভাবক নয়। তার অভিভাবক তো মোত্তাকীরাই। তবে তাদের অধিকাংশ তা জানে না।



মুহিউদ্দিন খান: আর তাদের মধ্যে এমন কি বিষয় রয়েছে, যার ফলে আল্লাহ তাদের উপর আযাব দান করবেন না। অথচ তারা মসজিদে-হারামে যেতে বাধাদান করে, অথচ তাদের সে অধিকার নেই। এর অধিকার তো তাদেরই রয়েছে যারা পরহেযগার। কিন্তু তাদের অধিকাংশই সে বিষয়ে অবহিত নয়।



জহুরুল হক: আর কি তাদের থাকতে পারে যে আল্লাহ্ তাদের শাস্তি দেবেন না যখন তারা পবিত্র মসজিদ থেকে বাধা দেয়, অথচ তারা এর তত্ত্বাবধায়ক হতে পারে না। এর তত্ত্বাবধায়ক হচ্ছে শুধু মুত্তকীরা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।



Sahih International: But why should Allah not punish them while they obstruct [people] from al-Masjid al- Haram and they were not [fit to be] its guardians? Its [true] guardians are not but the righteous, but most of them do not know.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৪. আর তাদের কী ওজর আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন না?(১) যখন তারা লোকদেরকে মসজিদুল হারাম থেকে নিবৃত্ত করে? অথচ তারা সে মসজিদের অভিভাবক নয়, এর অভিভাবক তো কেবল মুত্তাকীগণই; কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি তাদের মধ্যে থাকতে তাদেরকে আমি কিভাবে শাস্তি দেব? আপনি যখন তাদের মধ্যে থাকবেন না, যখন আপনাকে বের করে আনব তখনই কেবল তাদের উপর শাস্তি আসতে পারে। কারণ, নবী-রাসূলরা যে জনপদে থাকবেন সেখানে আমি শাস্তি নাযিল করি না। তাছাড়া তারা তাদের গোনাহও কুফর থেকে যদি তাওবাহ করে তবুও আমি তাদের উপর শাস্তি নাযিল করব না। কিন্তু তারা তো ক্ষমা প্রার্থনা করছে না বরং তাদের গোনাহর উপর স্থির রয়েছে সুতরাং তাদেরকে আমি কেন শাস্তি দেব না? তদুপরি তাদের শাস্তির আরও একটি কারণ অবধারিত হয়ে গেছে, তা হচ্ছে তারা মসজিদুল হারাম থেকে মানুষদেরকে বাঁধা দেয়, অথচ তারা মাসজিদুল হারামের কেউ নয়। [তাবারী] আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা ক্ষমা প্রার্থনার কারণে যদি দুনিয়াতে তাদের আযাব রহিত হয়েও গিয়ে থাকে, আখেরাতে তাদের আযাব তো অবশ্যম্ভাবী। [তাবারী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৪) তাদের মধ্যে কি (এমন গুণ) আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন না; যখন তারা লোকদেরকে মাসজিদুল-হারাম (পবিত্র কা’বা) হতে নিবৃত্ত করে? অথচ তারা ওর তত্ত্বাবধায়ক নয়, ওর তত্ত্বাবধায়ক তো কেবল (পরহেযগার) সাবধানী লোকেরাই। কিন্তু তাদের অধিকাংশ তা অবগত নয়।[1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, মুশরিকরা নিজেদেরকে মাসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধায়ক মনে করত। আর এই কারণেই তারা যাকে ইচ্ছা তাওয়াফের অনুমতি দিত, আবার যাকে ইচ্ছা তাওয়াফে বাধা দিত। অনুরূপ মুসলিমদেরকেও মসজিদে আসতে বাধা দিত। অথচ আসলে তারা মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক ছিল না। শক্তির জোরে এ রকম মনে করত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তার তত্ত্বাবধায়ক একমাত্র (মু’মিন) মুত্তাক্বীরাই হতে পারে, মুশরিকরা নয়।’ এ ছাড়া এই আয়াতে যে শাস্তির কথা বলা হয়েছে, তার অর্থ মক্কা বিজয়। যা ছিল মক্কাবাসীদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক আযাব সমতুল্য। পূর্বের আয়াতে নবী (সাঃ)-এর বর্তমানে আযাব না আসার যে কথা বলা হয়েছে, সে আযাব হল ধ্বংসের আযাব। তবে শিক্ষা ও সতর্ক করার জন্য ছোটখাট আযাব আসা তার বিরোধী নয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩১-৩৫ নং আয়াতের তাফসীরঃ



এখানে আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের অবাধ্যতা ও গোঁড়ামির বর্ণনা দিচ্ছেন। তারা বলে আমরা ইচ্ছা করলে কুরআনের মত এরূপ কথা বানিয়ে বলতে পারি। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قُلْ لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلٰٓي أَنْ يَّأْتُوْا بِمِثْلِ هٰذَا الْقُرْاٰنِ لَا يَأْتُوْنَ بِمِثْلِه۪ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيْرًا ‏)‏



“বল :‎ ‘যদি কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জিন্ন সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এটার অনুরূপ কুরআন আনয়ন করতে পারবে না।’(সূরা বানী ইসরাইল ১৭: ৮৮)



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَإِنْ لَّمْ تَفْعَلُوْا وَلَنْ تَفْعَلُوْا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِيْ وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ ﺸ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِيْنَ)



“অনন্তর যদি তোমরা তা করতে না পার এবং তোমরা তা কখনও করতে পারবে না, তা হলে তোমরা সেই জাহান্নামকে ভয় কর যার ইন্ধন হচ্ছে মানুষ ও পাথর যা তৈরি করে রাখা হয়েছে কাফিরদের জন্য।”(সূরা বাক্বারাহ ২:২৪)



(أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ)



‘সেকালের লোকেদের উপকথা ছাড়া কিছুই না।’ অর্থাৎ পূর্ববর্তীদের উপকথা, অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَقَالُوْآ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ اكْتَتَبَهَا فَهِيَ تُمْلٰي عَلَيْهِ بُكْرَةً وَّأَصِيْلًا , ‏ قُلْ أَنْزَلَهُ الَّذِيْ يَعْلَمُ السِّرَّ فِي السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ ط إِنَّه۫ كَانَ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا)



“তারা বলে: ‘এগুলো তো সে কালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার নিকট পাঠ করা হয়।’ বল:‎ ‘এটা তিনিই অবতীর্ণ করেছেন যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমুদয় অদৃশ্যের রহস্য অবগত আছেন; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’(সূরা ফুরকান ২৫:৫-৬)



وَإِذْ قَالُوا اللّٰهُمَّ إِنْ كَانَ هٰذَا.........



‘স্মরণ কর, যখন তারা বলছিল, ‘হে আল্লাহ! এটা যদি তোমার পক্ষ হতে সত্য হয়’ অর্থাৎ তারা দ্রুত শাস্তি কামনা করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَقَالُوْا رَبَّنَا عَجِّلْ لَّنَا قِطَّنَا قَبْلَ يَوْمِ الْحِسَابِ)‏



“তারা বলে: হে আমাদের প্রতিপালক! বিচারের দিনের পূর্র্বেই আমাদের প্রাপ্য অংশ আমাদেরকে শীঘ্রই দিয়ে দিন।”(সূরা সোয়াদ ৩৮:১৬)



৩৩ নং আয়াতের শানে নুযূল:



(وَمَا كَانَ اللّٰهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيْهِمْ)



আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আবূ জাহল বলল: হে আল্লাহ! এ কুরআন যদি তোমার পক্ষ থেকে সত্য হয় তাহলে আমাদের ওপর পাথর বর্ষণ কর অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দাও। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৪৯, সহীহ মুসলিম হা: ২৭৯৬)



তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তাদেরকে তিনি কেন শাস্তি দেবেন না! কারণ তারা মাসজিদে হারাম থেকে মানুষকে বাধা দেয়। তারা তো এ মাসজিদের তত্ত্বাবধায়ক নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‏ “তারাই ঐ সকল লোক, যারা কুফরী করেছে ও তোমাদেরকে মাসজিদুল হারাম থেকে ফিরিয়ে রেখেছে এবং কুরবানীর উটগুলোকে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছতে দেয়নি। যদি (মক্কায়) এমন মু’মিন নর ও নারী না থাকত যাদের কথা তোমরা জান না আর অজ্ঞতাবশত তোমরা তাদেরকে পদদলিত করে ফেলবে এবং এতে তোমরাও তাদের পক্ষ থেকে কষ্ট পাবে (এ আশঙ্কা না থাকলে যুদ্ধ বন্ধ করা হতো না)। (যুদ্ধ এ জন্য বন্ধ করা হয়েছে) যাতে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে তাঁর রহমতে শামিল করে নেন। ঐ মু’মিনরা যদি (কাফিরদের থেকে) আলাদা অবস্থায় থাকত তাহলে (মক্কায়) যারা কাফির ছিল তাদেরকে আমি অবশ্যই কঠিন শাস্তি দিতাম।”(সূরা ফাতহ ৪৮:২৫)



মাসজিদের তত্ত্বাবধায়ক হবে একমাত্র ঈমানদারগণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “মুশরিকরা যখন নিজেরাই নিজেদের কুফরী স্বীকার করে তখন তারা আল্লাহর মাসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে- এমনটি হতে পারে না। তারা এমন যাদের সমস্ত কর্ম ব্যর্থ হয়ে গেছে এবং তারা অগ্নিতেই স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। তারাই তো আল্লাহর মাসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে যারা ঈমান আনে আল্লাহ ও আখিরাতে এবং সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করে না। অতএব আশা করা যায়, তারা হবে সৎ পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।”(সূরা তাওবাহ ৯:১৭-১৮)



(إِلَّا مُكَا۬ءً وَتَصْدِيَةً)



‘কা‘বা ঘরের নিকট শুধু শিস ও হাততালি দেয়াই ছিল তাদের সালাত’ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: কুরাইশরা উলঙ্গ অবস্থায় কাবা তাওয়াফ করত ও মুখে আঙ্গুল দিয়ে শিস দিত এবং দু’হাত দ্বারা তালি বাজাত। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



এরূপ করাকে তারা ইবাদত ও পুণ্যের কাজ মনে করত। যেমন আজকাল কিছু সুফীরা তাদের আস্তানায় ঢোল-তবলা বাজায় এবং বলে, এটাই আমাদের ইবাদত ও সালাত।



সুতরাং নিজের কাছে যা ভাল মনে হবে তা-ই ইবাদত, আর যা ভাল মনে হবে না তা ইবাদতের বাইরে- এমন কথা ইবাদতের মাপকাঠি নয় বরং ইবাদতের মাপকাঠি হল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ। কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ যাকে ইবাদত বলে আখ্যায়িত করবে তাই ইবাদত বলে গণ্য হবে তা- নিজের মনোপুত হোক আর না-ই হোক।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কিয়ামত পর্যন্ত কুরআনের চ্যালেঞ্জ বহাল থাকবে; এর মত কেউ কিছু তৈরি করতে পারবে না।

২. কোন নাবীর বর্তমানে তিনি না চাইলে তাঁর জাতিকে আল্লাহ তা‘আলা আযাব দেন না।

৩. মাসজিদে কেবল ঈমানদাররাই ইবাদত করবে, দেখা শোনা করবে এবং তদারকি করবে।

৪. মাসজিদে শিস দেয়া, হাতে তালি দেয়া নিষেধ। তবে সালাতে ভুল হলে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য মহিলাদের হাতে তালি দিয়ে সংকেত দেয়া বৈধ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৪-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, মক্কাবাসী মুশরিকরা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য তো অবশ্যই ছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বরকতে শাস্তি থেকে বেঁচে যায় । এজন্যে যখন তিনি মক্কা ছেড়ে চলে যান তখন বদরের দিন তাদের উপর শাস্তি নেমে আসে। তাদের নেতারা নিহত এবং বড় বড় লোক বন্দী হয়। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ক্ষমা প্রার্থনা করার কথা বলে দেন, কিন্তু ওর সাথে তারা শিরক ও ফাসাদকেও মিলিয়ে দেয়। কাতাদা (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই নিহত কুরায়েশরা ক্ষমা প্রার্থনা করতো না। যদি তারা তা করে থাকতো তবে আল্লাহ তাআলা বদরের যুদ্ধে তাদেরকে লাঞ্ছনার মৃত্যু দিতেন না। আর যদি এই দুর্বল মুসলমানরা মক্কায় অবস্থান করে ক্ষমা প্রার্থনা না করতেন তবে মক্কাবাসীর উপর এমন বিপদ এসে পড়তে যা কোনক্রমেই দূর করা যেতো না। ক্ষমা প্রার্থনার বরকতেই মক্কায় শাস্তি নাযিল হওয়া থেকে কুরায়েশরা রক্ষা পেয়েছে এবং মক্কার মুসলমানদের মাধ্যমেই তারা কিছুকাল পর্যন্ত আযাব থেকে মাহফুয থেকেছে। হুদায়বিয়ার দিন আল্লাহ পাক আয়াত নাযিল করেছিলেন- (আরবী) অর্থাৎ “এরা ঐ লোক যারা কুফরী করেছে এবং তোমাদেরকে মসজিদে হারাম হতে প্রতিরোধ করেছে এবং প্রতিরুদ্ধ কুরবানীর জন্তুগুলো ওদের নির্দিষ্ট স্থানে হাযির করা হতে বাধাদান করেছে, আর যদি বহু মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী না থাকতো যাদের সম্বন্ধে তোমরা কিছুই জানতে না, অর্থাৎ তাদের নিষ্পেষিত হওয়ার আশংকা না থাকতো, যদ্দরুন তাদের কারণে অজ্ঞাতসারে তোমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে, তবে সমস্ত ব্যাপারই চুকিয়ে দেয়া হতো, কিন্তু তা এ জন্যে করা হয়নি, যেন আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নিজ রহমতে দাখিল করেন, যদি তারা (ঐ মুসলমানরা মক্কা হতে) সরে পড়তো তবে আমি তাদের মধ্যকার কাফিরদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করতাম।” (৪৮:২৫) নবী (সঃ)-এর অবস্থানের সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেছিলেনঃ “তোমার অবস্থানকালীন সময়ে আমি তাদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করবো না।” অতঃপর যখন নবী (সঃ) মদীনায় চলে যান তখন আল্লাহ পাক তাঁকে বলেনঃ “তোমার স্থলবর্তীরা এখনও মক্কায় রয়েছে, সুতরাং এখনও আমি আযাব নাযিল করবো না।” তারপর যখন মুসলমানরাও মক্কা থেকে বেরিয়ে আসে তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ “এখন তাদেরকে কেন শাস্তি দেয়া হবে না? তারা তো তোমাদেরকে বায়তুল্লাহতে আসতে বাধা দিয়েছে, অথচ তারা তো আল্লাহর বন্ধু ছিল না?” অতএব আল্লাহ তাদের উপর মক্কা বিজয়ের শাস্তি অবতীর্ণ করেন। এ আয়াতটি-(আরবী)-এই আয়াতটিকে রহিতকারী। ইকরামা (রাঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, সূরায়ে আনফালের ... (আরবী) আয়াতটিকে ওর পরবর্তী ... (আরবী)-এই আয়াতটি মানসূখ বা রহিতকারী। তাই তিনি .... (আরবী) বলেছেন। সুতরাং দেখা যায় যে, মক্কাবাসীদের সাথে যুদ্ধ হয় এবং তারা ক্ষুধা ও ক্ষয়ক্ষতির শাস্তিতে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদেরকে শাস্তি প্রাপক হিসেবে বেছে নিয়েছেন এবং বলেছেনঃ “এখন তাদের কি বলবার আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিবেন না, যখন তারা মসজিদুল হারামের পথরোধ করেছে?” অথচ তারা মসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধায়ক নয়, মুত্তাকী লোকেরাই হলো ওর তত্ত্বাবধায়ক, কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোক এটা অবগত নয়। অথচ যাদেরকে কাবা ঘরে যেতে দিতে বাধা দেয়া হচ্ছে তারাই এর বেশী হকদার যে, তারা ওর মধ্যে নামায পড়বে এবং ওর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করবে। আর এই কাফিরদেরই মসজিদুল হারামে যাওয়ার অধিকার নেই। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “মুশরিকদের এই অধিকার নেই যে, তারা আল্লাহর মসজিদ সমূহকে আবাদ করে, যে অবস্থায় তারা নিজেদের কুফরীর স্বীকারোক্তি করেছে, তাদের সমস্ত (সৎ) কাজ বিফল হয়ে গেল, আর তারা জাহান্নামে অনন্তকাল থাকবে। হ্যা, আল্লাহর মসজিদগুলো আবাদ করা তাদেরই কাজ যারা আল্লাহর প্রতি এবং কিয়ামতের দিবসের প্রতি ঈমান আনয়ন করে, নামায কায়েম রাখে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় করে না, বস্তৃতঃ এই সকল লোক সম্বন্ধে আশা যে, তারা নিজেদের লক্ষ্যস্থলে পৌছে যাবে।” আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর পথ থেকে বাধা প্রদান করা, তাঁর সাথে কুফরী করা, মসজিদুল হারাম হতে বাধা দেয়া ও মক্কার অধিবাসীকে মক্কা থেকে বের করে দেয়া আল্লাহর নিকট বড় রকমের পাপ বলে গণ্য।” (২:২১৭) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “আপনার বন্ধু কারা?` উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “প্রত্যেক মুত্তাকী ব্যক্তি (আমার বন্ধু)।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। ইমাম হাকিম (রঃ) স্বীয় মুসতাদরিক” গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরায়েশদেরকে একত্রিত করেন। অতঃপর তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে তোমাদের (কুরায়েশ) ছাড়া আর কেউ আছে কি?” তারা উত্তরে বলেঃ “(আমরা ছাড়া) আমাদের মধ্যে রয়েছে আমাদের ভাগিনেয়, আমাদের মিত্র এবং আমাদের গোলাম।” তখন তিনি বললেনঃ “মিত্র, ভাগিনেয় এবং গোলাম একই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হয়ে থাকে। তোমাদের মধ্যে যারা মুত্তাকী তারাই আমার বন্ধু।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা জিহাদকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে, তারা যারাই হন বা যেখানেই থাকুন না কেন। অতঃপর এই আলোচনা করা হয়েছে যে, ঐ লোকগুলো মসজিদুল হারামে কি কাজ করতো? আল্লাহ পাক ঘোষণা করছেন- “কা'বা ঘরের কাছে তাদের নামায হলো শিস ও করতালি প্রদান।” তারা উলঙ্গ অবস্থায় বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতো, মুখে অঙ্গুলি ভরে দিয়ে বাশির মত শব্দ বের করতো, মুখ কুঁকাতো এবং তালি বাজাতো। আর এটাকেই তারা ইবাদত মনে করতো। বাম দিক থেকে তারা তাওয়াফ করতো। এর দ্বারা মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়াই হতো তাদের উদ্দেশ্য। এইভাবে তারা মুসলমানদেরকে ঠাট্টা ও উপহাস করতো। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বাঁশি বাজানো। (এটা হচ্ছে ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ)-এর উক্তি) আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা প্রদান করা।

(আরবী) সুতরাং এখন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর। এই শাস্তি এই যে, বদরের যুদ্ধে তারা নিহতও হয়েছিল এবং বন্দীও হয়েছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, স্বীকারোক্তিকারীদের শাস্তি তরবারী দ্বারা হয়ে থাকে এবং মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের শাস্তি বিকট চীৎকার ও ভূমিকম্পের মাধ্যমে হয়ে থাকে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।