সূরা আল-মুতাফফিফীন (আয়াত: 6)
হরকত ছাড়া:
يوم يقوم الناس لرب العالمين ﴿٦﴾
হরকত সহ:
یَّوْمَ یَقُوْمُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعٰلَمِیْنَ ؕ﴿۶﴾
উচ্চারণ: ইয়াওমা ইয়াকূমুন্না-ছূলিরাব্বিল ‘আ-লামীন।
আল বায়ান: যেদিন মানুষ সৃষ্টিকুলের রবের জন্য দাঁড়াবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬. যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ সৃষ্টিকুলের রবের সামনে!(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যেদিন মানুষ বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে।
আহসানুল বায়ান: ৬। যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালকের সম্মুখে।[1]
মুজিবুর রহমান: যে দিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ জগতসমূহের রবের সম্মুখে!
ফযলুর রহমান: যেদিন মানুষ বিশ্বজগতের প্রভুর সামনে দাঁড়াবে?
মুহিউদ্দিন খান: যেদিন মানুষ দাঁড়াবে বিশ্ব পালনকর্তার সামনে।
জহুরুল হক: যেদিন মানুষরা দাঁড়াবে বিশ্বজগতের প্রভুর সামনে?
Sahih International: The Day when mankind will stand before the Lord of the worlds?
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬. যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ সৃষ্টিকুলের রবের সামনে!(১)
তাফসীর:
(১) ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ যেদিন সমস্ত মানুষ জগতসমূহের রবের সামনে দাঁড়াবে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের কানের মধ্যভাগ পর্যন্ত ঘামে ডুবে থাকবে। [বুখারী: ৬৫৩১, মুসলিম: ২৮৬২] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টির এত নিকটে আনা হবে যে, তাদের মধ্যে দুরত্ব হবে এক ‘মাইল’৷ বৰ্ণনাকারী বলেনঃ আমি জানি না এখানে মাইল বলে পরিচিত এক মাইল না সুরমাদানি (যা আরবিতে মাইল বলা হয় তা) বুঝানো হয়েছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “মানুষ তাদের স্বীয় আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে নিমজ্জিত থাকবে। কারও ঘাম হবে গোড়ালি পর্যন্ত, কারও হবে হাঁটু পর্যন্ত। আবার কারও ঘাম হবে কোমর পর্যন্ত; কারও ঘাম মুখের লাগামের মত হবে। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মুখের দিকে ইশারা করেন। [মুসলিম: ২৮৬৪]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৬। যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালকের সম্মুখে।[1]
তাফসীর:
[1] যারা দাঁড়ি মারে তারা কি ভয় করে না যে, একদিন ভয়ঙ্কর দিন আপতিত হবে। যেদিন সমস্ত মানুষ সারা জাহানের প্রতিপালকের সামনে দন্ডায়মান হবে; যিনি সমস্ত গোপন কথা সম্পর্কে অবগত আছেন? অর্থ এই দাঁড়াল যে, এ কর্ম সেই লোকেরাই করে থাকে, যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ও কিয়ামতের শঙ্কা নেই। একাধিক হাদীসে এসেছে যে, যখন মানুষ প্রতিপালকের সামনে দন্ডায়মান হবে, তখন তাদের ঘাম অর্ধেক কান পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (সহীহ বুখারী মুত্বাফফিফীনের তাফসীর পরিচ্ছেদ) এক অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, কিয়ামতের দিন সূর্য সৃষ্টির এত নিকটবর্তী হবে যে, মাত্র এক মীল দূরত্বে থাকবে। হাদীসের বর্ণনাকারী সুলাইম বিন আমের (রাঃ) বলেন, ‘আমি জানি না যে, নবী (সাঃ) ‘মীল’ বলে রাস্তার পরিমাপ বুঝিয়েছেন, নাকি সুর্মাকাঠি, যার দ্বারা চোখে সুরমা লাগানো হয় তা বুঝিয়েছেন।’ মোট কথা, মানুষ নিজ আমল অনুযায়ী ঘামে ডুবে থাকবে। এই ঘাম কারো পায়ের গাঁট পর্যন্ত, কারো হাঁটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত পৌঁছবে। আবার কারো জন্য তা লাগাম হবে; অর্থাৎ, তার মুখমন্ডল পর্যন্ত ঘাম পৌঁছে যাবে। (সহীহ মুসলিম কিয়ামত ও জান্নাতের বিবরণ অধ্যায় কিয়ামতের বিবরণ পরিচ্ছেদ)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ ও শানে নুযূল:
المطففين শব্দটি مطفف এর বহুবচন। অর্থ হলো: মাপে কম দানকারীগণ। প্রথম আয়াতেই এ শব্দটি উল্লেখ রয়েছে। এখান থেকেই সূরার নামকরণ করা হয়েছে।
সূরাতে দুটি বিষয় আলোচিত হয়েছে। এক, মাপে ও ওজনে কমবেশি করার পরিণতি এবং দুই, ইল্লিয়ীন ও সিজ্জীনে নেককার ও বদকারদের আমলনামা সংরক্ষিত হওয়া।
১-৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর:
وَيْلٌ অর্থ দুর্ভোগ বা ধবংস। তবে এখানে وَيْلٌ এর সাথে يَّوْمَئِذٍ যোগ হওয়ায় অর্থ হবে জাহান্নাম। কেননা কিয়ামতের দিন দুর্ভোগের চূড়ান্ত পর্যায় হল জাহান্নাম।
(إِذَا اكْتَالُوْا) অর্থাৎ তারা যখন মানুষের কাছ থেকে মেপে নেয় তখন পরিপূর্ণভাবে মেপে নেয়। পক্ষান্তরে যখন মানুষকে মেপে দেয় তখন কম করে দেয়। এ চরিত্র ছিল শুয়াইব (আঃ)-এর জাতির। যারা এরূপ করে তাদের ধ্বংস অবধারিত, যেমন শুয়াইব (আঃ)-এর জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল। তাই আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে পরিপূর্ণভাবে মেপে দেয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন।
(وَأَوْفُوا الْكَيْلَ إِذَا كِلْتُمْ وَزِنُوْا بِالْقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِيْمِ ط ذٰلِكَ خَيْرٌ وَّأَحْسَنُ تَأْوِيْلًا)
“মাপ দেয়ার সময় পূর্ণ মাপে দেবে এবং ওজন করবে সঠিক দাঁড়িপাল্লায়, এটাই উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্ট।” (সূরা ইসরা ১৭: ৩৫)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন :
(وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيْزَانَ بِالْقِسْطِ ج لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا)
“এবং পরিমাণ ও ওজন ন্যায্যভাবে পুরোপুরি দেবে। আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না।” (সূরা আন‘আম ৬: ১৫২)
একটি হাদীসে বর্ণিত আছে : যে জাতিই মাপ ও ওজনে কম দেবে সে জাতিই দুর্ভিক্ষ, খাদ্য সংকট ও শাসক গোষ্ঠির অত্যাচারের শিকার হবে। (ইবনু মাযাহ হা. ৫০১৯, সিলসিলা সহীহাহ হা. ১০৬)
অতএব আমাদের এ সকল অপরাধ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধমক দিচ্ছেন যারা ওজনে মানুষকে কম দেয়Ñ তারা কি ভয় করে না পুনরুত্থান ও আল্লাহ তা‘আলার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে যিনি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবকিছু জ্ঞাত। কিয়ামত দিবসে মানুষ নগ্ন পায়ে উলঙ্গ ও খাতনাবিহীন অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার সামনে হাজির হবে। সেদিন মানুষ নিজের ঘামের মধ্যে নিমজ্জিত হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : কিয়ামতের দিন সূর্য মানুষের এতো নিকটে থাকবে যে, তার দূরত্ব হবে এক মাইল বা দু মাইল। ঐ সময় সূর্যের প্রচন্ড তাপ হবে। প্রত্যেক লোক নিজ নিজ আমল অনুপাতে ঘামের মধ্যে ডুবে যাবে। কারো পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত ঘাম পৌঁছবে, আবার কারো ঘাম লাগামের মত হয়ে যাবে। (সহীহ মুসলিম হা. ২১৯৬)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলূল্লাহ (সাঃ) বলেন : পাঁচটি বস্তু পাঁচটি বস্তুর কারণে হয়ে থাকে।
(১) কোন জাতি চুক্তিভঙ্গ করলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপরে তাদের শক্রকে বিজয়ী করেন।
(২) কেউ আল্লাহ তা‘আলার নাযিলকৃত বিধান ছাড়া অন্য বিধান দ্বারা দেশের শাসন করলে তাদের মধ্যে দারিদ্র ছড়িয়ে পড়ে।
(৩) কোন জাতির মধ্যে অশ্লীল কাজ বিস্তার লাভ করলে তাদের মধ্যে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে।
(৪) কেউ মাপে বা ওজনে কম দিলে তাদের জন্য খাদ্য-শস্যের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয় এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
(৫) কেউ যাকাত দেয়া বন্ধ করে দিলে তাদের থেকে বৃষ্টি তুলে নেয়া হয়।
(সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব হা. ৭৬৫, সহীহুল জামে হা. ৩২৪০)
সূরার শুরু থেকে এ পর্যন্ত এসে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ)-এর কিরাত বন্ধ হয়ে যেত এবং ক্রন্দন করতেন (কুরতুবী)। অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, কিয়ামতের দিন ঘামে কারো কারো কানের অর্ধেক পর্যন্ত ডুবে যাবে। (সহীহ বুখারী হা. ৪৯৩৮, সহীহ মুসলিম হা. ২৮৬২)
মিকদাদ বিন আসওয়াদ আল কিন্দী (রাঃ) বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি : কিয়ামতের দিন সূর্য এক মাইল বা দু মাইল ওপরে চলে আসবে। অতঃপর সূর্যতাপে তাদের দেহ গলে যাবে। তাদের পাপের পরিমাণ অনুযায়ী কারো হাটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত, কারো পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত, কারো বুক পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে। (সহীহ মুসলিম হা. ২৮৬৪)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মানুষকে ওজনে কম দেওয়া হারাম।
২. যারা মানুষের কাছ থেকে নেয়ার সময় ঠিকমত মেপে নেয় কিন্তু দেয়ার সময় কম দেয় তাদের ওপর দুর্ভোগ।
৩. শুয়াইব (আঃ)-এর জাতি এ অপরাধে লিপ্ত ছিল। নিষেধাজ্ঞার পরেও বিরত না থাকার কারণে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।
৪. কিয়ামতের দিন মানুষ নিজ ঘামের সাগরে নিমজ্জিত হয়ে যাবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর
সুনানে নাসাঈ ও সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ নবী করীম (সঃ) যে সময় মদীনায় আগমন করেন সে সময় মদীনাবাসীর মাপ জেকের ব্যাপারে খুবই নিকৃষ্ট ধরনের আচরণ করতো। এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলে তারা মাপ জোক ঠিক করে নেয়।
হযরত হিলাল ইবনে তালাক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-কে বললামঃ মক্কা ও মদীনার অধিবাসীরা খুবই ভাল মাপ জোক করে থাকে। আমার এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ তা করবে না কেন? তুমি কি শুননি যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মন্দ পরিণাম তাদের জন্যে যারা মাপে কম দেয়। (এটা ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
(আরবি)-এর অর্থ হলো মাপে কম দেয়া। অর্থাৎ অন্যদের নিকট হতে নেয়ার সময় বেশী নেয়া, আর অন্যদেরকে দেয়ার সময় কম দেয়া। এ জন্যেই তাদেরকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, তারা ক্ষঘিস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত। তারা নিজেদের প্রাপ্য নেয়ার সময় পুরোপুরি নেয়, এমনকি বেশীও নেয়। অথচ অন্যদের প্রাপ্য দেয়ার সময় কম করে দেয়।
সঠিক কথা এটাই যে, (আরবি) এবং (আরবি) এই ক্ৰিয়াদ্বয়কে (আরবি) মেনে নেয়া হবে, আর (আরবি) সর্বনামকে (আরবি) ধরা হবে, যদিও কেউ কেউ এটাকে (আরবি)মেনেছেন, যা (আরবি)-এর মধ্যে লুক্কায়িত সর্বনামের -এর জন্যে। আর (আরবি) কে উহ্য মেনেছেন, যার উপর (আরবি)-এর বিদ্যমান রয়েছে। দুই ভাবেই ভাবার্থ প্রায় একই হবে।
মাপ ও ওজনকে ঠিক করার হুকুম কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতগুলোতেও রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “মেপে দিবার সময় পূর্ণ মাপে দিবে এবং ওজন করবে সঠিক দাঁড়িপাল্লায়, এটাই উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্ট।” (১৭:৩৫) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “ন্যায্য মানের সাথে মাপ ও ওজনকে পূর্ণ করো, কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্ট দেয়া হয় না।” (৬:১৫২) আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “ওজনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওজনে কম দিয়ো না।”(৫৫:৯)
হযরত শুআইব (আঃ)-এর কওমকে আল্লাহ্ তা'আলা এই মাপের কারণেই নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন। এখানেও আল্লাহ্ তা'আলা ভয় প্রদর্শন করেছেন যে, জনগণের প্রাপ্য যারা নষ্ট করছে তারা কি কিয়ামতের দিনকে ভয় করে না, যেদিন সেই মহান সত্তার সামনে তাদের দাঁড়াতে হবে? যেই সত্তার কাছে প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য কিছুই গোপন নেই? সেই দিন খুবই বিভীষিকাময়, আশংকাপূর্ণ, ভয়াবহ এবং উদ্বেগজনক দিন হবে। সেই দিন এসব ক্ষতিসাধনকারী লোক জাহান্নামের দাউ দাউ করে জ্বলা গণগণে আগুনে প্রবেশ করবে। সেই দিন সমস্ত মানুষ নগ্নপায়ে, নগ্নদেহে খান্না-বিহীন অবস্থায় আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে। তারা যেখানে দাঁড়াবে সে জায়গা হবে সংকীর্ণ, অন্ধকারাচ্ছন্ন, নানা বিপদ-বিভীষিকাময় আপদে পরিপূর্ণ। সেখানে এমন সব বালা-মুসীবত নাযিল হবে যে, মন অতিশয় বিচলিত ও ভয়কাতর হয়ে পড়বে। হুশ-জ্ঞান সব লোপ পেয়ে যাবে।
হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সাঃ) বলেছেনঃ “যেদিন সমস্ত মানুষ জগৎসমূহের প্রতিপালকের নিকট দাঁড়াবে সেই দিন তাদের কেউ কেউ তার ঘামে তার কর্ণদ্বয়ের অর্ধেক পর্যন্ত ডুবে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ কিন্দী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “কিয়ামতের দিন সূর্য বান্দাদের এতো নিকটে থাকবে যে, ওর দূরত্ব হবে এক মাইল বা দুই মাইল। ঐ সময় সূর্যের প্রচণ্ড তাপ হবে। প্রত্যেক লোক নিজ নিজ আমল অনুপাতে ঘামের মধ্যে ডুবে যাবে। কারো পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত কারো হাঁটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত ঘাম পৌছবে, আবার কারো কারো ঘাম তার লাগামের মত হয়ে যাবে (অর্থাৎ ঘাম তার নাক পর্যন্ত পৌছে যাবে)।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন সূর্য এতো নিকটে আসবে যে, ওটা মাত্র এক মাইল উপরে থাকবে। ওর তাপ এতো তীব্র ও প্রচণ্ড হবে যে, ওর তাপে মাথার মগয টগবগ করে ফুটতে থাকবে যেমন চুল্লীর উপর রাখা হাঁড়ির পানি ফুটতে থাকে। মানুষকে তাদের ঘাম তাদের পাপ অনুপাতে ঢেকে ফেলবে। ঘাম কারো পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত পৌছবে, কারো পৌছবে পায়ের গিরা পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত। আবার কারো ঘাম তার লাগাম হয়ে যাবে। (অর্থাৎ তার একেবারে নাক পর্যন্ত পৌছে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, নবী করীম (সঃ) নিজের মুখে আঙ্গুল রেখে বলেনঃ এভাবে ঘাম লাগামের মত ঘিরে থাকবে। তারপর তিনি হাত দ্বারা ঈশারা করে বলেনঃ “কেউ কেউ ঘামের মধ্যে সম্পূর্ণ ডুবে যাবে।”
একটি হাদীসে আছে যে, তারা সত্তর বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে, তারা এর মধ্যে কোন কথা বলবে না।’ এ কথাও বলা হয়েছে যে, তারা তিন শ বছর দাঁড়িয়ে থাকবে। আবার এও বলা হয়েছে যে, তারা চল্লিশ হাজার বছর দাড়িয়ে থাকবে এবং দশ হাজার বছরে বিচার করা হবে।
সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে মারফুরূপে বর্ণিত আছে যে, এমন এক দিনে যা পার্থিব পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত বাশীর গিফারী (রাঃ) কে বলেনঃ “ সে দিন তুমি কি করবে যখন জগতসমূহের প্রতিপালকের সামনে তিনশ বছর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে? আসমান থেকেও কোন খবর আসবে না এবং কোন হুকুমও করা হবে না?` একথা শুনে হযরত বাশীর (রাঃ) বলেনঃ আমি আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।` তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাহলে শিখে নাও! যখন তুমি তোমার বিছানায় শয়ন করতে যাবে তখন কিয়ামতের দিনের দুঃখ কষ্ট এবং হিসাব নিকাশের ভয়াবহতা হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করবে।”(এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সুনানে আবী দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিয়ামত দিবসের দাঁড়ানোর জায়গায় সংকীর্ণতা হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।
হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, চল্লিশ বছর পর্যন্ত মানুষ আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকবে। কেউ কোন কথা বলবে না। পাপী পূণ্যবান সবাইকে ঘামের লাগাম ঘিরে রাখবে।
হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, তারা একশ বছর দাঁড়িয়ে থাকবে।
সুনানে আবী দাউদে, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজায় হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন রাত্রে উঠে তাহাজ্জুদের নামায শুরু করতেন তখন দশবার আল্লাহু আকবার, দশবার আলহামদুলিল্লাহ, দশবার সুবহানাল্লাহ এবং দশবার আসতাগফিরুল্লাহ বলতেন। তারপর বলতেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, আমাকে হিদায়াত দান করুন, আমাকে রিযিক দিন এবং আমাকে নিরাপদে রাখুন।` অতঃপর তিনি কিয়ামত দিবসের দাঁড়ানোর জায়গার সংকীর্ণতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।