আল কুরআন


সূরা আল-মুতাফফিফীন (আয়াত: 32)

সূরা আল-মুতাফফিফীন (আয়াত: 32)



হরকত ছাড়া:

وإذا رأوهم قالوا إن هؤلاء لضالون ﴿٣٢﴾




হরকত সহ:

وَ اِذَا رَاَوْهُمْ قَالُوْۤا اِنَّ هٰۤؤُلَآءِ لَضَآلُّوْنَ ﴿ۙ۳۲﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইযা-রাআওহুম কা-লূইন্না হাউলাই লাদাললূন।




আল বায়ান: আর যখন তারা মুমিনদেরকে দেখত তখন বলত, ‘নিশ্চয় এরা পথভ্রষ্ট’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩২. আর যখন মুমিনদেরকে দেখত তখন বলত, নিশ্চয় এরা পথভ্ৰষ্ট।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর তারা যখন মু’মিনদেরকে দেখত তখন বলত, ‘এরা তো অবশ্যই গুমরাহ্।’




আহসানুল বায়ান: ৩২। এবং যখন তাদেরকে দেখত, তখন বলত, এরাই তো পথভ্রষ্ট। [1]



মুজিবুর রহমান: এবং যখন তাদেরকে দেখত তখন বলতঃ এরাইতো পথভ্রষ্ট।



ফযলুর রহমান: তারা যখন মুমিনদেরকে দেখত, তখন বলত, “এই লোকগুলো আসলেই বিভ্রান্ত।”



মুহিউদ্দিন খান: আর যখন তারা বিশ্বাসীদেরকে দেখত, তখন বলত, নিশ্চয় এরা বিভ্রান্ত।



জহুরুল হক: আর যখন তারা তাদের দেখত তখন বলতো -- "নিশ্চয় এরাই তো পথভ্রষ্ট।"



Sahih International: And when they saw them, they would say, "Indeed, those are truly lost."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩২. আর যখন মুমিনদেরকে দেখত তখন বলত, নিশ্চয় এরা পথভ্ৰষ্ট।(১)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ এরা বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে গেছে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের চক্করে ফেলে দিয়েছেন। ফলে এরা নিজেরা নিজেদেরকে দুনিয়ার লাভ, স্বাৰ্থ ও ভোগ-বিলাসিতা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে এবং সব রকমের আশংকা ও বিপদ আপদের মুখোমুখি হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] যা কিছু এদের সামনে উপস্থিত আছে তা কেবল এ অনিশ্চিত আশায় ত্যাগ করছে যে, এদের সাথে মৃত্যুর পরে কি এক জান্নাত দেবার ওয়াদা করা হয়েছে, আর পরবর্তী জগতে নাকি কোন জাহান্নাম হবে, এদেরকে তার আযাবের ভয় দেখানো হয়েছে এবং তার ফলেই এরা আজ এ দুনিয়ায় সবকিছু কষ্ট বরদাশত করে যাচ্ছে। এভাবে যুগে যুগে মুমিনদেরকে অপমানজনক কথা সহ্য করতে হয়েছে। বর্তমানেও কেউ দ্বীনদার হলে তার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করতে শোনা যায়। [উসাইমীন, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ৩২। এবং যখন তাদেরকে দেখত, তখন বলত, এরাই তো পথভ্রষ্ট। [1]


তাফসীর:

[1] তওহীদবাদীরা মুশরিকদের দৃষ্টিতে এবং ঈমানদাররা কাফেরদের দৃষ্টিতে ভ্রষ্ট বলে পরিচিত। এই অবস্থা আজও বিদ্যমান রয়েছে। ভ্রষ্ট বাতিলপন্থীরা নিজেদেরকে হকপন্থী ভাবে এবং আসল হকপন্থীদেরকে ভ্রষ্ট মনে করে। এমনকি পরিপূর্ণরূপে বাতিল ফির্কাও নিজেদের ছাড়া কাউকে মু’মিন বলে না এবং ভাবেও না। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে হিদায়াত করুন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৯-৩৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর:



মু’মিন ও পাপাচারীদের প্রতিদানের কথা আলোচনার পর পাপাচারীরা দুনিয়াতে মু’মিনদের সাথে যে আচরণ করত এবং আখিরাতে মুমিনরা তাদের সাথে বদলাস্বরূপ যে আচরণ করবেন সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।



يَضْحَكُوْنَ অর্থাৎ মু’মিনদেরকে তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্ন করে পাপাচারীরা ঠাট্টা করত, চোখ টিপে ইশারা করে বলত, এরাই পথভ্রষ্ট। সত্যি দেখা যায় যে, মু’মিনরা যখন কোন সৎ আমল করে তখন কাফির তো দূরের কথা একশ্রেণির নামধারী মুসলিমরাও মু’মিনদের নিয়ে ঠাট্টা করে। যা হোক কিয়ামতের দিন মু’মিনরা বদলাস্বরূপ কাফিরদের নিয়ে ঠাট্টা করবে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : এ আয়াতগুলো মক্কার মুশরিকদের নেতা ওয়ালিদ বিন মুগীরাহ, ওকবা বিন আবূ মুআইত, আস বিন ওয়ায়েল প্রমুখ ব্যক্তিদের ব্যাপারে নাযিল হয়। (কুরতুবী)



الغمز অর্থ চোখ, পলক ও ভ্রু দিয়ে ইঙ্গিত করা। অর্থাৎ কাফিররা মু’মিনদেরকে দেখলে চোখ টিপে হাসতো ও কটাক্ষ করত।



(وَاِذَا انْقَلَبُوْٓا اِلٰٓی اَھْلِھِمُ.....)



অর্থাৎ তাদের হাসি-তামাশা ও ঠাট্টা শুধু বাইরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা যখন তাদের পরিবার বা নিজেদের মত কাফিরদের কাছে ফিরে যেত বা একত্রিত হত তখন গরীব ও দুর্বল মু’মিনদের নিয়ে হাসি-তামাশা করত। তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলত : এ সব লোকেরা ইসলামের মধ্যে কী পেয়েছে, যার জন্য তারা বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করছে? শত নির্যাতন সহ্য করছে কিন্তু ইসলাম বর্জন করছেনা।



(إِنَّ هٰٓؤُلَا۬ءِ لَضَآلُّوْنَ)



অর্থাৎ কাফিররা মু’মিনদেরকে দেখলে বলতÑ এরা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানেও একশ্রেণির মানুষ রয়েছে যারা সঠিক পথের অনুসারীদেরকে এরূপ কাফির, ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের দালাল ইত্যাদি বলে থাকে। সুতরাং সকল যুগেই সত্যিকার মু’মিনদের মাঝে মুর্খ ও শিক্ষিত দুশ্রেণির শত্রু ছিল। মুর্খরা না জেনে শত্রুতা করত আর শিক্ষিত শয়তানরা জেনে শুনে পার্থিব স্বার্থের জন্য ইসলাম ও মুসলিমদের বিরোধিতা করত। তাই একজন সত্যিকার মু’মিন শয়তানদের কোন প্রকার উস্কানী, ঠাট্টা ও মশকরাতে কান না দিয়ে সঠিক পথের ওপর বহাল থাকবে এটাই তার ঈমানী দায়িত্ব।





(فَالْيَوْمَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا.....)



অর্থাৎ দুনিয়াতে যে সকল কাফিররা মু’মিনদের নিয়ে বিদ্রƒপ ও ব্যঙ্গ করত তারা আখিরাতে জাহান্নামে যাবে। তাদের দূরবস্থা দেখে মু’মিনরা হাসবে।



يَنْظُرُوْنَ অর্থাৎ মু’মিনরা আল্লাহ তা‘আলার দিকে তাকাবে কাফিরদের এ ধারণাকে বাতিল করার জন্য যে, তারা পথভ্রষ্ট না। বরং তারাই আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা। আল্লাহ তা‘আলা এমন বান্দাদের মধ্যে আমাদের শামিল করে নিন। আমীন!



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. দুনিয়াতে মু’মিনদের নিয়ে ঠাট্টা করার পরিণতি ভাল নয়।

২. দুনিয়াতে মু’মিনদের সাথে ঠাট্টা করে যে আচরণ করা হবে আখিরাতে তার বদলা মু’মিনরা নিয়ে নেবে।

৩. মু’মিনরা আখিরাতে আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২৯-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তা'আলা পাপীদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, পৃথিবীতে তো তারা খুব বাহাদুরী দেখায়, মুমিনদেরকে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে, চলাফেরার সময় তিরস্কার ভৎসনা করে, ব্যাঙ্গাত্মক উক্তি করে এবং আরও নানা প্রকার অবমাননাকর উক্তি করে নিজেদের দলের লোকদের কাছে গিয়ে তারা আপত্তিজনক নানা কথা বানিয়ে বলে, যা খুশী তাই করে বেড়ায় কুফরীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলমানদেরকে নানা রকম কষ্ট দেয়। মুসলমানরা তাদের কথায় কান না দেওয়ায় তারা মুসলমানদেরকে ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তাদেরকে মুমিনদের জন্য দারোগা করে পাঠানো হয়নি। কাজেই কাফিরদের এসব বলার কোনই প্রয়োজন নেই। কাফিরদের কি হয়েছে যে, তারা মুমিনদের পিছনে লেগে থাকে এবং ব্যাঙ্গাত্মক কথাবার্তা বলে বেড়ায়? যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তোরা হীন অবস্থায় এখানেই থাক এবং আমার সাথে কোন কথা বলিস না। আমার বান্দাদের মধ্যে একদল ছিল যারা বলতোঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও আমাদের প্রতি দয়া করুন, আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। কিন্তু তাদেরকে নিয়ে তোমরা এতো ঠাট্টা বিদ্রুপ করতে যে, ওটা তোমাদেরকে আমার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। তোমরা তো তাদেরকে নিয়ে হাসি ঠাট্টাই করতে। আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই হলো সফলকাম।” (২৩:১০৮-১১১) এ জন্যেই এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আজ কিয়ামতের দিন মুমিনগণ কাফিরদেরকে উপহাস করছে ও সুসজ্জিত আসন হতে তাদেরকে অবলোকন করছে।

এটা স্পষ্টভাবে একথাই প্রমাণ করে যে, এ মুমিনরাই ছিল সুপথ প্রাপ্ত, এরা পথভ্রষ্ট ছিল না, বরং তোমরা নিজেরাই ছিলে পথভ্রষ্ট। অথচ তোমরা এদেরকে পথভ্রষ্ট বলতে। প্রকৃত পক্ষে এ মুমিনগণ ছিল আল্লাহর বন্ধু এবং তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত। এ জন্যেই আজ আল্লাহর দীদার এদের চোখের সামনে রয়েছে, এরা আজ আল্লাহর মেহমান এবং তার দেয়া মর্যাদাসিক্ত উচ্চাসনে সমাসীন।

এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এসব কাফির দুনিয়ার এই মুসলমানদের সাথে যে সব দুর্ব্যবহার করেছে, আজ কি তারা তাদের সেই সব ব্যবহারের পুরোপুরি প্রতিফল পেয়েছে? অবশ্যই পেয়েছে। তাদের পরিহাসের পরিবর্তে আজ তারা পরিহাস লাভ করেছে। এ কাফিররা যে সব মুসলমানকে মর্যাদাহীন বলতো, আল্লাহ আজ তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। মোটকথা সমস্ত মানুষই আজ কিয়ামতের দিন নিজেদের কৃতকর্মের পুরোপুরি প্রতিফল প্রাপ্ত হয়েছে। তাদের কাজের বিনিময় তারা পেয়ে গেছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।