আল কুরআন


সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 87)

সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 87)



হরকত ছাড়া:

وإن كان طائفة منكم آمنوا بالذي أرسلت به وطائفة لم يؤمنوا فاصبروا حتى يحكم الله بيننا وهو خير الحاكمين ﴿٨٧﴾




হরকত সহ:

وَ اِنْ کَانَ طَآئِفَۃٌ مِّنْکُمْ اٰمَنُوْا بِالَّذِیْۤ اُرْسِلْتُ بِهٖ وَ طَآئِفَۃٌ لَّمْ یُؤْمِنُوْا فَاصْبِرُوْا حَتّٰی یَحْکُمَ اللّٰهُ بَیْنَنَا ۚ وَ هُوَ خَیْرُ الْحٰکِمِیْنَ ﴿۸۷﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইন কা-না তাইফাতুম মিনকুম আ-মানূবিল্লাযীউরছিলতুবিহী ওয়া তাইফাতুল লাম ইউ’মিনূফাসবিরূহাত্তা-ইয়াহকুমাল্লা-হু বাইনানা- ওয়া হুওয়া খাইরুল হাকিমীন।




আল বায়ান: আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি, তার প্রতি যদি তোমাদের একটি দল ঈমান আনে আর অন্য দল ঈমান না আনে, তাহলে ধৈর্যধারণ কর, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মধ্যে ফয়সালা করেন। আর তিনি উত্তম ফয়সালাকারী।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৭. আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তাতে যদি তোমাদের কোন দল ঈমান আনে এবং কোন দল ঈমান না আনে, তবে ধৈর্য ধর, যতক্ষন না আল্লাহ আমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেন, আর তিনিই শ্ৰেষ্ঠ ফয়সালাকারী।




তাইসীরুল ক্বুরআন: ‘আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তাতে যদি তোমাদের একদল ঈমান আনে আর একদল ঈমান না আনে, তাহলে ধৈর্য ধারণ কর যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমাদের আর তোমাদের মাঝে মীমাংসা করে দেন, তিনি হলেন সর্বোত্তম মীমাংসাকারী।’




আহসানুল বায়ান: (৮৭) আমি যা দিয়ে (আল্লাহর পক্ষ হতে) প্রেরিত হয়েছি, তাতে যদি তোমাদের একটি দল বিশ্বাস করে এবং একটি দল বিশ্বাস না করে, তাহলে তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেন, আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী। [1]



মুজিবুর রহমান: আমার নিকট যা (আল্লাহর পক্ষ হতে) প্রেরিত হয়েছে তা যদি তোমাদের কোন দল বিশ্বাস করে এবং কোন দল অবিশ্বাস করে তাহলে ধৈর্য ধারণ কর যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মধ্যে চুড়ান্ত ফাইসালা করে দেন। তিনিই হলেন উত্তম ফাইসালাকারী।



ফযলুর রহমান: “যদি তোমাদের একদল আমাকে যা নিয়ে পাঠানো হয়েছে তা বিশ্বাস করে এবং আরেকদল বিশ্বাস না করে তাহলে তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেন। তিনিই তো শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী।”



মুহিউদ্দিন খান: আর যদি তোমাদের একদল ঐ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে যা নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি এবং একদল বিশ্বাস স্থাপন করে যা নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি এবং একদল বিশ্বাস স্থাপন না করে, তবে ছবর কর যে পর্যন্ত আল্লাহ আমাদের মধ্যে মীমাংসা না করে দেন। তিনিই শ্রেষ্ট মীমাংসাকারী।



জহুরুল হক: আর যদি তোমাদের একদলও বিশ্বাস করে আমাকে যা দিয়ে পাঠানো হয়েছে তাতে, আর একদল বিশ্বাস করে না, তখন ধৈর্য ধরো যে পর্যন্ত না আল্লাহ্ আমাদের উভয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দেন, আর তিনিই বিচারকর্তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।



Sahih International: And if there should be a group among you who has believed in that with which I have been sent and a group that has not believed, then be patient until Allah judges between us. And He is the best of judges."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮৭. আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তাতে যদি তোমাদের কোন দল ঈমান আনে এবং কোন দল ঈমান না আনে, তবে ধৈর্য ধর, যতক্ষন না আল্লাহ আমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেন, আর তিনিই শ্ৰেষ্ঠ ফয়সালাকারী।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮৭) আমি যা দিয়ে (আল্লাহর পক্ষ হতে) প্রেরিত হয়েছি, তাতে যদি তোমাদের একটি দল বিশ্বাস করে এবং একটি দল বিশ্বাস না করে, তাহলে তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেন, আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী। [1]


তাফসীর:

[1] এটা কুফরীর উপর ধৈর্য ধরার নির্দেশ নয়, বরং তার জন্য ধমক ও কঠিন হুমকি। কারণ, হকপন্থীদেরকে বাতিলপন্থীদের উপর বিজয়ী করাই হয় আল্লাহ তা’য়ালার শেষ ফায়সালা। এটা ঠিক এই ধরনের যেমন অন্যত্র বলেছেন, {فَتَرَبَّصُوا إِنَّا مَعَكُمْ مُتَرَبِّصُونَ} "সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর, আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ।" (সূরা তাওবাহ ৫২ আয়াত)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮৫-৯৩ নং আয়াতের তাফসীরঃ



আলোচ্য আয়াতগুলোতে প্রসিদ্ধ নাবী শু‘আইব (আঃ) সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের ১০টি সূরায় ৫৩টি আয়াতে তাঁর সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। লূত (আঃ)-এর অবাধ্য জাতিকে ধ্বংসের অনতিকাল পরে তাঁকে নবুওয়াত দিয়ে মাদইয়ানবাসীদের হিদায়াতের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। মাদইয়ান হল লূত সাগরের নিকটবর্তী সিরিয়া ও হিজাযের সীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। যা অদ্যাবধি পূর্ব জর্ডানের সামুদ্রিক বন্দর ‘মো‘আন’ (معان ) এর অদূরে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রধান ছয়টি প্রাচীন জাতির মধ্যে ৫ম জাতি হল ‘আহলে মাদইয়ান’। আহলে মাদইয়ান-কে পবিত্র কুরআনের সূরা হিজর, শুআরা, সোয়াদ ও ক্বাফে ‘আসহাবুল আইকাহ’



(اصحاب الايكة)



বলা হয়েছে। যার অর্থ জঙ্গলের অধিবাসী। এটা বলার কারণ এই যে, এ অবাধ্য জাতি প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ট হয়ে নিজেদের বসতি ছেড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সেখানেই ধ্বংস করে দেন। এটাও বলা হয় যে, উক্ত জঙ্গলে ‘আইকা’ বলে একটা গাছকে তারা পূজা করত। যার আশপাশ জঙ্গল বেষ্টিত ছিল। খুব সুন্দর ও উত্তমভাবে কথা বলার কারণে শু‘আইব (আঃ)



(خطيب الانبياء)



‘খতীবুল আম্বিয়া’ বা নাবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বক্তা বলা হয়।



শু‘আইব (আঃ)-এর দাওয়াত:



বিগত ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর মাঝে যেমন বড় বড় অন্যায় ও কুকর্ম ছিল তেমনি শু‘আইব (আঃ)-এর জাাতির মাঝে অনেক অন্যায়, অবিচার ও জুলুম অত্যাচার ছিল। তারা আল্লাহ তা‘আলা ও মানুষ উভয়ের হক নষ্ট করত। তাই শু‘আইব (আঃ) প্রথমেই অন্যান্য নাবীদের মত জাতিকে এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার হক সম্পর্কে সচেতন করতঃ বাতিল মা‘বূদ বর্জন করতে গিয়ে বললেন,



(اعْبُدُوا اللہَ مَا لَکُمْ مِّنْ اِلٰھٍ غَیْرُھ۫)



‘তোমরা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন সত্য মা‘বূদ নেই’ আল্লাহ তা‘আলার এককত্বের এরূপ নির্দেশের বাণী সূরা হূদের ৮৪ নং আয়াতেও উল্লেখ রয়েছে। তাদের এ বহুত্ববাদী ধর্মদর্শন থেকে আল্লাহ তা‘আলার এককত্বের দিকে ফিরিয়ে আসতেই মূলত নাবী শু‘আইবকে প্রেরণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও তাদের অনেক সামাজিক অপরাধ ছিল সেগুলো থেকেও তিনি তাদেরকে বিরত থাকার দাওয়াত দেন, যেমন;-



(১) তারা মাপ ও ওজনে কম দিয়ে বান্দার হক নষ্ট করত। সেদিকে ইঙ্গিত করে শু‘আইব (আঃ) বলেন:



(فَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيْزَانَ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَا۬ءَهُمْ)



‘তোমরা ওজন ও পরিমাপ পূর্ণ মাত্রায় দেবে, মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না’ আয়াতের প্রথমাংশে বিশেষভাবে মাপ ও ওজনে পূর্ণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং শেষাংশে সর্বপ্রকার হকে ত্র“টি করতে নিষেধ করা হয়েছে। সে হক মানুষের ধন-সম্পদ, ইযযত-আবরূ বা যেকোন বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট হোক না কেন। বস্তুত মাপ ও ওজনে কম দেয়া যেমন অপরাধ কারো সম্মান হানি করাও তেমন অপরাধ।



অতঃপর তিনি বললেন:



(وَلَا تُفْسِدُوْا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا)



‘শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপনের পর তোমরা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করো না’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যের ইবাদত করা, মাপে কম দেয়া, মানুষকে ভীতি প্রদর্শন করা ইত্যাদি ফাসাদ সৃষ্টি করা। আর যারা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে তাদের অপরাধ অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তির কথা সূরা মায়িদার ৩৩ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।



(২) তাদের আরেকটি অন্যতম অপরাধ ছিল তারা মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার পথে বাধা ও ভয় প্রদান করত। মানুষকে ঈমান আনতে বাধা দিত; কেউ ঈমান আনলে তাকে হত্যা করার হুমকি দিত। সূরা হূদের ৮৭ নং আয়াতের তাফসীরে ইমাম কুরতুবী (রহঃ) তাদের আরেকটি দুষ্কর্ম তুলে ধরে বলেন: তারা প্রচলিত স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার পার্শ্ব হতে সোনা ও রূপার কিছু অংশ কেটে রেখে সেগুলো বাজারে চালিত দিত। শু‘আইব (আঃ) তাদেরকে এসব কাজ থেকে বারণ করতেন।



(৩) তাদের অকৃতজ্ঞতার বিষয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলা হয়েছে যে, ‘আর ঐ অবস্থাটির কথা স্মরণ কর, যখন তোমরা সংখ্যায় স্বল্প ছিলে, অতঃপর তিনি (আল্লাহ তা‘আলা) তোমাদের সংখ্যা বেশি করে দিলেন’ তোমরা ধন-সম্পদে হীন ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের প্রাচুর্য দান করেছেন। অথচ তোমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে নানাবিধ শির্ক ও কুফরীতে লিপ্ত হয়েছ। অতএব তোমরা সাবধান হও এবং তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি নূহ, আদ, সামূদ ও লূত এর ধ্বংসলীলার কথা স্বরণ কর। তাদের মর্মান্তিক পরিণাম ও অকল্পনীয় গযবের কথা মনে রেখে হিসাব-নিকাশ করে পা বাড়াও।



শু‘আইব (আঃ) তাদেরকে এ কথাও বললেন: আমি এ দাওয়াতের জন্য তোমাদের কাছে কোন অর্থ কড়ি চাই না। যেমন অন্যত্র আল্লাহ বলেন:



(وَمَآ اَسْئَلُکُمْ عَلَیْھِ مِنْ اَجْرٍﺆ اِنْ اَجْرِیَ اِلَّا عَلٰی رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ)



“আমি তোমাদের নিকট এটার জন্য কোন প্রতিদান চাই না। আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকটই আছে।” (সূরা শু‘আরা ২৬:১৭৬) তাঁর এসব দাওয়াতের বাণী সূরা হূদের ৮৪-৯৫, শু‘আরার ১৭৬-১৯১ নং আয়াতের উল্লেখ রয়েছে।



দাওয়াতের ফলশ্র“তি:



শু‘আইব (আঃ)-এর নিঃস্বার্থ ও আন্তরিকতাপূর্ণ দাওয়াত তাঁর উদ্ধত জাতির নেতাদের হৃদয়ে রেখাপাত করল না। তারা বরং আরও উদ্ধত হয়ে তাঁর দরদ ভরা সুললিত বয়ান ও অপূর্ব চিত্তহারী বাগ্মীতার জবাবে পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির পাপিষ্ঠ নেতাদের ন্যায় নাবীকে প্রত্যাখ্যান করল এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ ও তাচ্ছিল্য করে বলল: ‘হে শু‘আয়ব! তোমার সালাত কি তোমাকে নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা যার ‘ইবাদত করত আমরা তা বর্জন করি অথবা আমরা আমাদের ধন-সম্পদ সম্পর্কে যা করি তাও? তুমি তো অবশ্যই সহিষ্ণু, ভাল মানুষ।’ (সূরা হূদ ১১:৮৭)



অর্থাৎ তুমি একজন জ্ঞানী ও দূরদর্শী হয়ে কিভাবে এ কথা বলতে পারলে যে, আমরা আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা দেব-বেদীর পূজা ও শির্কী প্রথা বর্জন করি। তাদের আপত্তি ছিল কেবল এখানে যে, সব কিছু ছেড়ে কেবল আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতে হবে এবং দুনিয়াবী ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত বিধি-বিধান মেনে চলতে হবে। তারা ধর্মকে কতিপয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমিত মনে করত এবং ব্যবহারিক জীবনে তার কোন দখল দিতে প্রস্তুত ছিল না।



অবাধ্য জাতির এরূপ বিদ্রুপাত্মক ও রূঢ় মন্তব্যসমূহে বিচলিত না হয়ে অতীব ধৈর্য ও দরদের সাথে তিনি তাদের সম্বোধন করে বললেন: ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি এবং তিনি যদি তাঁর নিকট হতে আমাকে উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করে থাকেন তবে কি করে আমি আমার কর্তব্য হতে বিরত থাকব? আমি তোমাদেরকে যা নিষেধ করি আমি নিজে তা করতে ইচ্ছা করি না। আমি আমার সাধ্যমত সংস্কার করতে চাই। আমার কার্যসাধন আল্লাহ তা‘আলারই সাহায্যে; আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী। ‘হে আমার সম্প্রদায়। আমার সাথে বিরোধ যেন কিছুতেই তোমাদেরকে এমন অপরাধ না করায় যাতে তোমাদের ওপর তার অনুরূপ বিপদ পতিত হয় যা পতিত হয়েছিল নূহের সম্প্রদায়ের ওপর অথবা হূদের সম্প্রদায়ের ওপর কিংবা সালিহের সম্প্রদায়ের ওপর; আর লূতের সম্প্রদায় তোমাদের হতে দূরে নয়। ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর‎ ও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন কর‎; আমার প্রতিপালক পরম দয়ালু, ভালবাসা পোষণকারী।’ (সূরা হূদ ১১:৮৮-৯৩)

জবাবে তাদের দাম্ভিক নেতারা চূড়ান্তভাবে বলে দিল: ‘হে শু‘আইব! আমরা তোমাকে ও তোমার সাথে যারা ঈমান এনেছে অবশ্যই তাদেরকে আমাদের জনপদ হতে বহিষ্কার করব অথবা অবশ্যই তোমাদেরকে আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে আসতে হবে।’



তারা আরোও বলল: ‘তুমি তো জাদুগ্রস্ত‎দের অন্ত‎র্ভুক্ত; তুমি আমাদের মতোই একজন মানুষ, আমরা মনে করি, তুমি মিথ্যাবাদীদের অন্যতম। তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে আকাশের এক খণ্ড আমাদের ওপর ফেলে দাও।



তারা স্বজাতির উদ্দেশ্যে শু‘আইব (আঃ) সম্পর্কে সতর্ক করে বলল: ‘যদি তোমরা শু‘আইবকে অনুসরণ কর তবে তো তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’



শু‘আইব (আঃ) তখন সত্য চির অম্লানের কথা জানিয়ে দিয়ে বললেন: ‘তোমাদের ধর্মাদর্শ হতে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে উদ্ধার করার পর যদি আমরা তাতে ফিরে যাই তাহলে তো আমরা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি মিথ্যারোপ করব। আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা না করলে আর তাতে ফিরে যাওয়া আমাদের জন্য সমীচীন নয়।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করে বললেন: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায্যভাবে মীমাংসা করে দাও এবং তুমিই শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী।’



অবশেষে দাওয়াতের মাধ্যমে কোন কাজ না করতে পেরে শু‘আইব (আঃ) তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং সে কথা বলেছেন যে কথা সালেহ বলেছিলেন।



(فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ)



‘তাদেরকে একটি প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প এসে গ্রাস করে নিলো’ অর্থাৎ শু‘আইব (আঃ)-এর বদদু‘আর ফলে এবং তাদের কৃতকর্মের কারণে ধ্বংস তাদেরকে পাকড়াও করল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَمَّا جَا۬ءَ أَمْرُنَا نَجَّيْنَا شُعَيْبًا وَّالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مَعَه۫ بِرَحْمَةٍ مِّنَّا ج وَأَخَذَتِ الَّذِيْنَ ظَلَمُوا الصَّيْحَةُ فَأَصْبَحُوْا فِيْ دِيَارِهِمْ جٰثِمِيْنَ - كَأَنْ لَّمْ يَغْنَوْا فِيْهَا ط أَلَا بُعْدًا لِّمَدْيَنَ كَمَا بَعِدَتْ ثَمُوْدُ)



“যখন আমার নির্দেশ আসল তখন আমি শু‘আয়ব ও তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে আমার অনুগ্রহে রক্ষা করেছিলাম। অতঃপর যারা সীমালঙ্ঘন করেছিল তাদেরকে এক বিকট গর্জন আঘাত করল, ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় পড়ে রইল, যেন তারা সেথায় কখনও বসবাস করেনি। জেনে রেখ!‎ ধ্বংসই ছিল মাদ্ইয়ানবাসীদের পরিণাম, যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল সামূদ সম্প্রদায়।” (সূরা হূদ ১১:৯৪-৯৫)



অতএব নাবী-রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, মানুষের অধিকার নষ্ট করতঃ ওজনে কম দেয়া, খাদ্যে ভেজাল দেয়া ও ঈমান আনতে অন্যদেরকে বাধা এবং ভীতি প্রদান করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এগুলো থেকে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. পূর্ববর্তী এসব নাবীদের অবাধ্য জাতির বর্ণনা তুলে ধরার প্রধান কারণ তাদের থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেরা সতর্ক হওয়া।

২. যুগে যুগে মানুষকে এক আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদের দিকে দাওয়াত দেয়া হলে একশ্রেণির মানুষ বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে সত্য বিমুখ হয়েছে।

৩. ওজনে ও মাপে কম দেয়া, মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার পথে চলতে বাধা দেয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

৪. প্রত্যেক জাতির অধিকাংশ প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা ঈমান আনার সৌভাগ্য পায়নি, বরং দুর্বলরাই ঈমান আনেছে এবং ক্ষমতাসীনরা দুর্বলদেরকে বিভিন্নভাবে কষ্ট দিয়েছে, ঈমানের পথে বাধা দিয়েছে।

৫. শির্ক-বিদ‘আত ও জুলুম অধ্যুষিত সমাজে তাওহীদের দাওয়াতের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াকে দুনিয়াদার সমাজনেতারা ‘ফাসাদ’ ও ‘ক্ষতিকর’ মনে করলেও মূলতঃ সেটাই হল সমাজ সংস্কারের কাজ।

৬. বাতিলের সাথে আপোষ করে কোন দিন আল্লাহ তা‘আলার দীন কায়েম সম্ভব নয়, বাতিলকে বাতিল হিসেবেই গ্রহণ করতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮৬-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর:

হযরত শুআইব (আঃ) জনগণকে ইন্দ্রিয়গতভাবে এবং মৌলিকভাবে ডাকাতি করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ তিনি তাদেরকে বলেছেন-তোমরা পথের উপর বসে জনগণকে ভীতিপ্রদর্শন করতঃ কিছু কেড়ে ও লুটপাট করে নিয়ো না এবং তাদের মাল তোমাদেরকে দিতে অস্বীকার করলে তোমরা তাদেরকে হত্যা করে ফেলার হুমকি দিয়ো না। এটা লুণ্ঠনকারীরা শুল্ক আদায়ের নাম দিয়ে লুণ্ঠন করতো আর যারা হিদায়াত লাভের উদ্দেশ্যে হযরত শুআইব (আঃ)-এর কাছে আসতো তাদেরকে বাধা প্রদান করতো এবং আসতে দিতো না। এই দ্বিতীয়টি হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি । প্রথম উক্তিটিই হচ্ছে বেশী স্পষ্ট এবং রচনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা, সিরাতের অর্থ পথ। আর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) যা বুঝেছেন তা তো মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে স্বয়ং বলেছেনঃ “যারা ঈমান এনেছে, তোমরা তাদের পথে বসে যাচ্ছ এবং সৎলোকদেরকে আমার পথে আসতে বাধা প্রদান করতঃ ভুল পথে ফিরিয়ে দিচ্ছ।” (হযরত শুআইব আঃ স্বীয় কওমের লোকদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ) হে আমার কওমের লোকেরা! তোমরা সংখ্যায় কম ছিলে, এবং দুর্বল ছিলে অতঃপর আল্লাহ তোমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতঃ তোমাদের শক্তিশালী করেছেন, এ জন্যে তোমাদের তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। কেননা, এটা তোমাদের প্রতি মহান আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহ বটে। পূর্বযুগে পাপীদেরকে পাপের কারণে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। তারা বেপরোয়াভাবে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করতো। এ কারণে তাদের পরিণাম এইরূপ হয়েছিল। এর থেকে তোমাদেরকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যে, তোমরা এইরূপ কাজ করলে তোমাদের পরিণতিও ঐরূপই হবে। আমার প্রচারের মাধ্যমে যদি তোমাদের একটি দল ঈমান আনয়ন করে এবং অন্য দল ঈমান না আনে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর এবং ধৈর্যের সাথে কাজ কর যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেন। তিনিই হচ্ছেন সর্বোত্তম ফায়সালাকারী। মুত্তাকীদেরই পরিণাম হবে ভাল এবং কাফিরদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।