সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 45)
হরকত ছাড়া:
الذين يصدون عن سبيل الله ويبغونها عوجا وهم بالآخرة كافرون ﴿٤٥﴾
হরকত সহ:
الَّذِیْنَ یَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِیْلِ اللّٰهِ وَ یَبْغُوْنَهَا عِوَجًا ۚ وَ هُمْ بِالْاٰخِرَۃِ کٰفِرُوْنَ ﴿ۘ۴۵﴾
উচ্চারণ: আল্লাযীনা ইয়াসুদ্দূনা ‘আন ছাবীলিল্লা-হি ওয়া ইয়াবগূনাহা-‘ইওয়াজা- ওয়া হুম বিল আখিরাতি কা-ফিরূন।
আল বায়ান: ‘যারা আল্লাহর পথে বাধা প্রদান করত এবং তাতে বক্রতা সন্ধান করত এবং তারা ছিল আখিরাতকে অস্বীকারকারী’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৫. যারা আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত এবং সে পথে জটিলতা খুঁজে বেড়াত; এবং তারা আখেরাতকে অস্বীকারকারী ছিল।
তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে আর তাকে বাঁকা করতে চায়, আর তারা পরকাল অস্বীকারকারী।
আহসানুল বায়ান: (৪৫) যারা আল্লাহর পথে (মানুষকে) বাধা দিত এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করত, আর তারা ছিল পরকালে অবিশ্বাসী।’
মুজিবুর রহমান: যারা আল্লাহর পথে চলতে (মানুষকে) বাধা দিত এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করত তারা পরকালকেও অস্বীকার করত।
ফযলুর রহমান: যারা আল্লাহর পথে (লোকদেরকে) বাধা দিত এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করত।” তারা পরকালের প্রতিও অবিশ্বাসী ছিল।
মুহিউদ্দিন খান: যারা আল্লাহর পথে বাধা দিত এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করত। তারা পরকালের বিষয়েও অবিশ্বাসী ছিল।
জহুরুল হক: যারা আল্লাহ্র পথ থেকে সরিয়ে দেয় আর তাকে কুটিল করতে চেষ্টা করে, আর তারা আখেরাতের সন্বন্ধে অবিশ্বাসী।
Sahih International: Who averted [people] from the way of Allah and sought to make it [seem] deviant while they were, concerning the Hereafter, disbelievers.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৫. যারা আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত এবং সে পথে জটিলতা খুঁজে বেড়াত; এবং তারা আখেরাতকে অস্বীকারকারী ছিল।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪৫) যারা আল্লাহর পথে (মানুষকে) বাধা দিত এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করত, আর তারা ছিল পরকালে অবিশ্বাসী।’
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪৪-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা তিন শ্রেণির মানুষের কথা তুলে ধরেছেন। এক শ্রেণি জান্নাতবাসী, এক শ্রেণি জাহান্নামবাসী এবং এক শ্রেণি আ‘রাফবাসী। প্রথমেই জান্নাতবাসীদের কথা দিয়ে শুরু করেছেন যারা জাহান্নামীদের সম্বোধন করে বলবে, আমরা আমাদের প্রতিপালকের ওয়াদা যথাযথভাবে পেয়েছি, তোমরা কি পেয়েছ? উত্তরে জাহান্নামবাসীরা বলবে, হ্যাঁ। তখন এক ঘোষক ঘোষণা করে দিবে যে, আল্লাহ তা‘আলার লা‘নত জালিমদের ওপর। যালেম কারা তার পরিচয় দিতে গিয়ে পরের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(الَّذِيْنَ يَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِيْلِ اللّٰهِ وَيَبْغُوْنَهَا عِوَجًا ج وَهُمْ بِالْاٰخِرَةِ كٰفِرُوْنَ)
‘যারা ‘আল্লাহর পথে বাধা প্রদান করে এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করে মূলত তারাই আখিরাত সম্বন্ধে অবিশ্বাসী।’ (সূরা আ‘রাফ ৭:৪৫)
জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে একটি পর্দা থাকবে যার সম্পর্কে জাহান্নামীগণ জান্নাতে যেতে পারবে না।
ইবনু জারীর (আঃ) বলেন: এটা সেই প্রাচীর যার কথা আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُوْرٍ لَّه۫ بَابٌ ط بَاطِنُه۫ فِيْهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُه۫ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ )
“অতঃপর উভয়ের মাঝামাঝি স্থাপিত হবে একটি প্রাচীর সেখানে একটি দরজা থাকবে, যার অভ্যন্তরে রহমত এবং বহির্ভাগে আযাব।” (সূরা হাদীদ ৫৭:১৩)
তারপর আল্লাহ তা‘আলা আ‘রাফবাসীদের কথা উল্লেখ করেছেন। আ‘রাফ হল জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি জায়গার নাম। আ‘রাফবাসী কারা হবে এ নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য বিদ্যমান। অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে এরা হবে সেসব লোক যাদের পূণ্য ও পাপ সমান হবে। এদের পূণ্যরাজি জাহান্নামে যেতে বাধা দেবে। আবার পাপরাশি জান্নাতে যেতে বাধা দেবে এভাবে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবে। এ আ‘রাফবাসী জান্নাতী ও জাহান্নামী উভয় শ্রেণির লোকেদের চিনতে পারবে। এরা তারপর কী করবে এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
(مَآ أَغْنٰي عَنْكُمْ جَمْعُكُمْ)
‘তোমাদের দল ও তোমাদের অহঙ্কার কোন কাজে আসল না।’ জাহান্নামবাসীদেরকে আ‘রাফবাসীগণ তাদের নিদর্শন দেখেই চিনতে পারবে। তারা নিজেদের দলবল এবং অন্যান্য জিনিসের ওপর যে অহঙ্কার প্রদর্শন করত সে ব্যাপারেই তাদের লক্ষ করে বলবে যে, অহঙ্কার তোমাদের কোন উপকারে এলো না।
অতঃপর তৃতীয় শ্রেণি জাহান্নামীদের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা জান্নাতীদের আহ্বান করে জান্নাতের কিছু পানীয় ও খাদ্য সামগ্রী চাইবে কিন্তু জবাবে জান্নাতবাসীহণ বলবে: আল্লাহ তা‘আলা এসব কিছুকে কাফিরদের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যারা দীন ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা করবে, তাকে খেল-তামাশার বস্তু হিসেবে গ্রহণ করবে তারা দুনিয়ার প্রতারণায় নিমজ্জিত, তারা কাফির। এ ধরণের লোকেদের অন্তরে যেহেতু আল্লাহ তা‘আলার ভয় নেই, ধর্ম সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই তাই তারা দীনের ব্যাপারে অশালীন কথাবার্তা বলতে এবং তা খেল-তামাশার বস্তু হিসেবে গ্রহণ করতে কোন দ্বিধা সংকোচ করে না। হাদীসে এসেছে: কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা এ শ্রেণির লোকেদের বলবেন: আমি কি তোমাকে স্ত্রী ও সন্তানাদি দেইনি? তোমাকে মান-সম্মানে ধন্য করিনি? উট এবং ঘোড়া তোমার অধীনস্থ করে দেইনি? তুমি কি নেতৃত্ব দান করে মানুষের কাছ থেকে কর আদায় করতে না? সে বলবে: অবশ্যই করতাম। হে আল্লাহ! এ সবই সঠিক। মহান আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন: আমার সাথে সাক্ষাত করতে হবে এ কথা কি তুমি বিশ্বাস করতে? সে বলবে, না। তখন মহান আল্লাহ বলবেন: যেভাবে তুমি আমাকে ভুলে ছিলে আজ আমিও তোমাকে ভুলে যাচ্ছি। (সহীহ মুসলিম হা: ২৯৬৮)
(فَصَّلْنٰهُ عَلٰي عِلْمٍ هُدًي وَّرَحْمَةً)
‘অবশ্যই আমি তাদেরকে দিয়েছিলাম এমন এক কিতাব যা পূর্ণ জ্ঞান দ্বারা বিশদ ব্যাখ্যা করেছিলাম’ অর্থাৎ জাহান্নামীদেরকে লক্ষ করে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন: আমি তো আমার পূর্ণ জ্ঞানের আলোকে এমন কিতাব দিয়েছিলাম যাতে সৃষ্টি জীবের যা কিছু প্রয়োজন সবকিছুর বিশদ বর্ণনা ছিল, তার অনুসরণে হিদায়াত ছিল। কিন্তু তারা তা অনুসরণ করেনি, ফলে হিদায়াত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
(هَلْ يَنْظُرُوْنَ إِلَّا تَأْوِيْلَه)
‘তারা কি শুধু তার পরিণামের প্রতীক্ষা করছে’ অর্থাৎ কাফিরদেরকে যে জান্নাত-জাহান্নাম ও শাস্তির ওয়াদা দেয়া হয়েছে তারা কেবল তারই অপেক্ষা করে; কিয়ামতের দিন সে ওয়াদার বাস্তবায়ন অবশ্যই দেখতে পাবে।
(فَهَلْ لَّنَا مِنْ شُفَعَا۬ءَ)
‘আমাদের কি এমন কোন সুপারিশকারী আছে’ এর তাফসীর পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুতরাং আমরা প্রথম শ্রেণি তথা জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হবার চেষ্টা করব। আর সে জন্য দরকার সঠিক ঈমান ও সৎ আমল।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. জান্নাতীগণ জান্নাতে ও জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করার পরে কথোপকথন করবে।
২. আল্লাহ তা‘আলার পথে বাধা দেয়ার পরিণাম ভয়াবহ।
৩. আ‘রাফবাসীদের পরিচয় ও তাদের আকাক্সক্ষার কথা জানতে পারলাম।
৪. দুনিয়ার ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি সৎ পথে ব্যয়িত না হলে তা কোন উপকারে আসবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪৪-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর:
জাহান্নামবাসীকে জাহান্নামে যাওয়ার পর উপহাসমূলকভাবে সম্বোধন করা হচ্ছে যে, জান্নাতবাসী জাহান্নামবাসীকে সম্বোধন করে বলবেঃ “আমাদের প্রতিপালক আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা তিনি সত্যরূপে দেখিয়েছেন। তোমাদের সাথে আল্লাহ তা'আলা যে ওয়াদা করেছিলেন তা তোমরা সত্যরূপে পেয়েছো কি?” (আরবী) এখানে হরফটি উহ্য উক্তির তাফসীর করছে এবং (আরবী) শব্দটি নিশ্চয়তা বুঝাবার জন্যে এসেছে। সেই সময় কাফিররা উত্তরে বলবেঃ “হা (আমরা তা সত্যরূপে পেয়েছি)।” যেমন মহান আল্লাহ সূরায়ে সাফফাতে বলেছেন এবং তিনি ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে সংবাদ দিয়েছেন যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোন কাফিরের বন্ধু ছিল। ঐ মুমিন ব্যক্তি যখন তার কাফির বন্ধুকে জাহান্নামে উঁকি মেরে দেখবে তখন বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! তুমি তো আমাকেও ধ্বংস করারই উপক্রম করেছিলে, যদি না আমার প্রভুর অনুগ্রহ হতো তবে আমিও তোমার ন্যায় দণ্ডিতদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” এই কাফিররা বলতোঃ “এই যে, আমরা মরলাম তো মরলামই, আর আমরা উথিত হবে না এবং আমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে না।” ফেরেশতা এখন তাদের কান খুলে দেবে এবং বলবে- দেখ, এটাই হচ্ছে সেই জাহান্নাম যা তোমরা অস্বীকার করতে। এটা কি কোন যাদু, না তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ না? এসো, জাহান্নামে প্রবেশ কর। পেরে না পেরে তোমাদেরকে সহ্য করতেই হবে। তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের প্রতিদান পাচ্ছ।
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরের নিহতদেরকে সম্বোধন করে বলেছিলেন“হে আবু জেহেল ইবনে হিশাম, হে উৎবা ইবনে রাবীআ, হে শাইবা ইবনে রাবীআ এবং অন্যান্য মৃত কুরায়েশ নেতৃবর্গের নাম ধরে ধরে বলেছিলেন! আল্লাহ তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন তা সত্যে পরিণত হয়েছে কি? আমার প্রভু আমার সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন তা পূর্ণ হয়ে গেছে।” ঐ সময় হযরত উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি মৃতদেরকে সম্বোধন করছেন (অথচ তারা তো শুনতেই পায় না)?” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “আল্লাহর কসম! তারা তোমাদের চেয়ে কম শুনতে পাচ্ছে না, কিন্তু তারা উত্তর দিতে সক্ষম নয়।”
অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে- একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে- যালিমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। আল্লাহ পাক বলেনঃ এরা হচ্ছে ঐসব লোক যারা লোকদেরকে সরল সোজা পথে আসতে বাধা প্রদান করতো। তারা জনগণকে নবীদের শরীয়তের পথ থেকে ফিরিয়ে দিতো, যেন তারা বক্র পথে পরিচালিত হয় এবং নবীদের অনুসরণ না করে। তারা পরকালে আল্লাহর সামনে হাজির হওয়াকে অস্বীকার করতো। কেননা, তাদের হিসাবের দিনের কোন ভয়ই ছিল না। এরা ছিল বড়ই দুষ্ট প্রকৃতির লোক।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।