আল কুরআন


সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 2)

সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 2)



হরকত ছাড়া:

كتاب أنزل إليك فلا يكن في صدرك حرج منه لتنذر به وذكرى للمؤمنين ﴿٢﴾




হরকত সহ:

کِتٰبٌ اُنْزِلَ اِلَیْکَ فَلَا یَکُنْ فِیْ صَدْرِکَ حَرَجٌ مِّنْهُ لِتُنْذِرَ بِهٖ وَ ذِکْرٰی لِلْمُؤْمِنِیْنَ ﴿۲﴾




উচ্চারণ: কিতা-বুন উনযিলা ইলাইকা ফালা-ইয়াকুনফীসাদরিকাহারাজুম মিনহু লিতুনযিরা বিহী ওয়া যিকরা-লিলমু’মিনীন।




আল বায়ান: এটি কিতাব, যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে। সুতরাং তার সম্পর্কে তোমার মনে যেন কোন সংকীর্ণতা না থাকে। যাতে তুমি তার মাধ্যমে সতর্ক করতে পার এবং তা মুমিনদের জন্য উপদেশ।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২. এ কিতাব(১) আপনার প্রতি নাযিল করা হয়েছে, সুতরাং আপনার মনে যেন এ সম্পর্কে কোন সন্দেহ(২) না থাকে। যাতে আপনি এর দ্বারা সতর্ক করতে পারেন।(৩) আর তা মুমিনদের জন্য উপদেশ।




তাইসীরুল ক্বুরআন: এটি একটি কিতাব যা তোমার উপর নাযিল করা হয়েছে, এ ব্যাপারে তোমার অন্তরে যেন কোন প্রকার কুণ্ঠাবোধ না হয়, (এটা নাযিল করা হয়েছে অমান্যকারীদেরকে) এর দ্বারা ভয় প্রদর্শনের জন্য এবং মু’মিনদেরকে উপদেশ প্রদানের জন্য।




আহসানুল বায়ান: (২) তোমার নিকট কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে; সুতরাং তোমার মনে যেন এর সম্পর্কে কোন প্রকার সংকীর্ণতা না থাকে।[1] যাতে তুমি এর দ্বারা সতর্ক কর এবং বিশ্বাসীদের জন্য এটি উপদেশ।



মুজিবুর রহমান: এ একটি কিতাব যা তোমার উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে, সুতরাং তোমার অন্তরে যেন মোটেই সংকীর্ণতা না আসে। আর মু’মিনদের জন্য এটা উপদেশ।



ফযলুর রহমান: এটি তোমার কাছে নাযিলকৃত একটি গ্রন্থ; অতএব, এর ব্যাপারে তোমার মনে যেন কোনরূপ সংকীর্ণতা না থাকে। (এটি নাযিল করা হয়েছে) যাতে এর দ্বারা তুমি (লোকদেরকে) সতর্ক কর। আর মুমিনদের জন্য এটি একটি স্মারক।



মুহিউদ্দিন খান: এটি একটি গ্রন্থ, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে করে আপনি এর মাধ্যমে ভীতি-প্রদর্শন করেন। অতএব, এটি পৌছে দিতে আপনার মনে কোনরূপ সংকীর্ণতা থাকা উচিত নয়। আর এটিই বিশ্বাসীদের জন্যে উপদেশ।



জহুরুল হক: তোমার কাছে অবতীর্ণ একটি গ্রন্থ, -- অতএব তোমার বক্ষে এর জন্য কোন সংকোচ না থাকুক -- যেন তুমি এর দ্বারা সতর্ক করতে পারো, এবং মুমিনদের জন্য একটি স্মারক।



Sahih International: [This is] a Book revealed to you, [O Muhammad] - so let there not be in your breast distress therefrom - that you may warn thereby and as a reminder to the believers.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২. এ কিতাব(১) আপনার প্রতি নাযিল করা হয়েছে, সুতরাং আপনার মনে যেন এ সম্পর্কে কোন সন্দেহ(২) না থাকে। যাতে আপনি এর দ্বারা সতর্ক করতে পারেন।(৩) আর তা মুমিনদের জন্য উপদেশ।


তাফসীর:

(১) কিতাব বলতে এখানে কি বোঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে সবচেয়ে স্বচ্ছমত হল- পবিত্র কুরআনকেই বুঝানো হয়েছে। [বাগভী] কারো কারো মতে এখানে শুধু এ সূরার প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। [আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর]


(২) হারাজ হবার মানে হচ্ছে এই যে, বিরোধিতা ও বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে নিজের পথ পরিষ্কার না দেখে মানুষের মন সামনে এগিয়ে চলতে পারে না; থেমে যায়। তাই মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এখানে ‘হারাজ’ বলে ‘সন্দেহ' বুঝানো হয়েছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ] কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়বস্তুকে ‘দাইকে সদর’ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন, সূরা আল-হিজরঃ ৯৭, সূরা আন-নাহলঃ ১২৭, সূরা আন-নামলঃ ৭০, সূরা হুদঃ ১২।


(৩) এ আয়াতে কাদেরকে সতর্ক করতে হবে তা বলা হয়নি। অন্য আয়াতে তা বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ বলেন, “এবং বিতণ্ডাপ্রিয় সম্প্রদায়কে তা দ্বারা সতর্ক করতে পারেন।” [মারইয়াম: ৯৭] আরও বলেন, “বস্তুত এটা আপনার রব-এর কাছ থেকে দয়াস্বরূপ, যাতে আপনি এমন এক কওমকে সতর্ক করতে পারেন, যাদের কাছে আপনার আগে কোন সতর্ককারী আসেনি, যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করে। [আল-কাসাস: ৪৬] আরও বলেন, “বরং তা আপনার রব হতে আগত সত্য, যাতে আপনি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারেন, যাদের কাছে আপনার আগে কোন সতর্ককারী আসেনি, হয়তো তারা হিদায়াত লাভ করবে। [সূরা আস-সাজদাহ: ৩] অনুরূপভাবে এ আয়াতে কিসের থেকে সতর্ক করতে হবে তাও বলা হয়নি। অন্যত্র তা বলে দেয়া হয়েছে, যেমন, “তার কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য।” [সূরা আল-কাহাফ: ২] “অতঃপর আমি তোমাদেরকে লেলিহান আগুন সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি [সূরা আল-লাইল: ১৪] এ আয়াতে ভীতিপ্রদর্শন এবং সুসংবাদ প্রদান একসাথে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে ভীতিপ্রদর্শন কাফেরদের জন্য আর সুসংবাদ মুমিনদের জন্য। [আদওয়াউল বায়ান]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২) তোমার নিকট কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে; সুতরাং তোমার মনে যেন এর সম্পর্কে কোন প্রকার সংকীর্ণতা না থাকে।[1] যাতে তুমি এর দ্বারা সতর্ক কর এবং বিশ্বাসীদের জন্য এটি উপদেশ।


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, এর প্রচারের ব্যাপারে তোমার অন্তরে এই মনে করে যেন সংকীর্ণতা সৃষ্টি না হয় যে, হয়তো কাফেররা আমাকে মিথ্যাবাদী ভাববে, আমাকে কষ্ট দেবে। কারণ, মহান আল্লাহই হলেন তোমার রক্ষাকর্তা ও সাহায্যকারী। অথবা حَرَج অর্থ, সন্দেহ। অর্থাৎ, এটা যে আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ করা হয়েছে -এ ব্যাপারে যেন তুমি তোমার অন্তরে সন্দেহ অনুভব না কর। এখানে নিষেধ-সূচক বাক্য দিয়ে নবীকে সম্বোধন করা হলেও প্রকৃতার্থে সম্বোধন করা হয়েছে উম্মতকে। অর্থাৎ, তারা যেন সন্দেহ না করে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ ও বিষয় সংক্ষেপ:



জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম আ‘রাফ। জান্নাতীগণ জান্নাতে আর জাহান্নামীগণ জাহান্নামে প্রবেশ করার পূর্বে এ আ‘রাফ নামক স্থানে জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মাঝে কথোপকথন হবে। এ সূরার ৪৬ ও ৪৮ নং আয়াতে আ‘রাফ শব্দটি উল্লেখ আছে বিধায় উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ, তবে আটটি আয়াত ব্যতীত। এ আটটি আয়াত হল-



(وَاسْأَلْهُمْ عَنِ الْقَرْيَةِ............ إِنَّا لَا نُضِيْعُ أَجْرَ الْمُصْلِحِيْنَ)



১৬৩ থেকে ১৭০ আয়াত।



ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সূরা আ‘রাফ মক্কায় অবতীর্ণ। (ফাতহুল কাদীর, ২/২৩৯)



রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মাগরিবের সালাতে দু’ ভাগে ভাগ করে এ সূরা তেলাওয়াত করতেন। (সহীহ নাসাঈ হা: ৯৪৫, আবূ দাঊদ হা: ৮১৬)



সূরাটির প্রতি লক্ষ করলে দেখা যায় যে, এ সূরার অধিকাংশ বিষয়বস্তু আখিরাত ও রিসালাতের সাথে সম্পৃক্ত। সূরার প্রথম দিকে নবুওয়াত ও পরকালের সত্যতা, তারপর আদম (আঃ)-কে শয়তানের বিপদগামীকরণ, অতঃপর অন্যান্য নাবী ও তাদের জাতির আলোচনা এবং যারা অবিশ্বাসী ছিল তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি, আবার পরকালের পুনঃ আলোচনাপূর্বক তাওহীদের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে সূরা শেষ করা হয়েছে।



১-৭ নং আয়াতের তাফসীরঃ



ال۬ـمـّٓـص۬ ‘আলিফ, লাম, মীম, সোয়াদ’ এগুলোকে “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর বলা হয়। এ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার শুরুতে আলোচনা রয়েছে, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।



حَرَجٌ শব্দটির দু’টি অর্থ পাওয়া যায়- ১. কাতাদাহ, মুজাহিদ ও সুদ্দী (রাঃ) বলেন:



حَرَجٌ أيْ شَكٌ



অর্থাৎ সন্দেহ। অর্থ হল: এ কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে তোমার মনে যেন কোন সন্দেহ না থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اَلْحَقُّ مِنْ رَّبِّكَ فَلَا تَكُوْنَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِيْنَ) ‏



“সত্য তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এসেছে; সুতরাং তুমি সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সূরা বাক্বারাহ ২:১৪৭)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَإِنْ كُنْتَ فِيْ شَكٍّ مِّمَّآ أَنْزَلْنَآ إِلَيْكَ فَسْأَلِ الَّذِيْنَ يَقْرَأُوْنَ الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكَ ج لَقَدْ جَا۬ءَكَ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّكَ فَلَا تَكُوْنَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِيْنَ)‏



“আমি তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি তুমি সন্দেহ করে থাক তবে তোমার পূর্বের কিতাব যারা পাঠ করে তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর‎; তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার নিকট সত্য অবশ্যই এসেছে। সুতরাং তুমি কখনও সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সূরা ইউনুস ১০:৯৪)



২. অধিকাংশ আলেম বলেন: حَرَجٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল: সংকীর্ণতা। অর্থাৎ এ কুরআনের তাবলীগ করতে তোমার মনে যেন কোন সংকীর্ণতা না আসে। হয়তো কাফিররা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলবে, তোমাকে কষ্ট দেবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَلَعَلَّکَ تَارِکٌۭ بَعْضَ مَا یُوْحٰٓی اِلَیْکَ وَضَا۬ئِقٌۭ بِھ۪ صَدْرُکَ اَنْ یَّقُوْلُوْا لَوْلَآ اُنْزِلَ عَلَیْھِ کَنْزٌ اَوْ جَا۬ئَ مَعَھ۫ مَلَکٌﺚ اِنَّمَآ اَنْتَ نَذِیْرٌﺚ وَاللہُ عَلٰی کُلِّ شَیْءٍ وَّکِیْلٌ)‏



“তবে কি তোমার প্রতি যা ওয়াহী করা হয়েছে তার কিছু তুমি বর্জন করবে এবং এতে তোমার মন সংকুচিত হবে এজন্য যে, তারা বলে, ‘তার নিকট ধন-ভাণ্ডার প্রেরিত হয় না কেন অথবা তার সাথে ফেরেশতা আসে না কেন?’ তুমি কেবল সতর্ককারী এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়ের কর্মবিধায়ক।” (সূরা হুদ ১১:১২)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّكَ يَضِيْقُ صَدْرُكَ بِمَا يَقُوْلُوْنَ )‏



“আমি অবশ্যই জানি, তারা যা বলে তাতে তোমার অন্ত‎র সংকুচিত হয়।” (সূরা হিজর ১৫:৯৭)



তবে দ্বিতীয় উক্তিটিই সঠিক। (আযউয়াউল বায়ান, ২/১৯০) অর্থাৎ এ কুরআন দ্বারা ভীতি প্রদর্শন করতে তোমার মনে যেন কোন সংকীর্ণতা না আসে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَّآ أُنْذِرَ اٰبَا۬ٓؤُهُمْ فَهُمْ غَافِلُوْنَ)‏



“যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পূর্বপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, ফলে তারা গাফিল রয়ে গেছে।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৬) কেননা কুরআনের ব্যাপারে নাবী (সাঃ) এর কোন সন্দেহ থাকতে পারে না।



তারপর আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম জাতিকে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন: “তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের নিকট যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ কর” আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে কুরআন ও সুন্নাহ। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَآ اٰتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ ج وَمَا نَهٰكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا)



“রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক।” (সূরা হাশর ৫৯:৭) সেই সাথে আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করছেন কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ ব্যতীত অন্য কোন বন্ধু বা ওলী তথা দল, মত, তরীকা ইত্যাদি যারা প্রবৃত্তির অনুকরণ করে চলে তাদের অনুসরণ করো না। কেননা তাদের অনুসরণ করলে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوْكَ عَنْ سَبِيْلِ اللّٰهِ ط إِنْ يَّتَّبِعُوْنَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُوْنَ)‏



“যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরণ করে; আর তারা শুধু অনুমানভিত্তিক কথা বলে।” (সূরা আনআম ৬:১১৬) সুতরাং সর্বদা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মেনে চললে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত থাকা সম্ভব, অন্যথায় পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হতে হবে।



(قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ)



‘তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ কর।’ অর্থাৎ সত্য বিষয় তোমরা খুব কমই অনুধাবন কর, যার কারণে তোমাদের অধিকাংশই কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ ছেড়ে দিয়ে এদিক সেদিক থেকে দীন গ্রহণ করতে দৌড়াচ্ছ।



(وَكَمْ مِّنْ قَرْيَةٍ)



‘কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি!’ অর্থাৎ ইতোপূর্বে আল্লাহ তা‘আলা যত জাতিকে ধ্বংস করেছেন সবাই রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ ও তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَقَدِ اسْتُهْزِئَ بِرُسُلٍ مِّنْ قَبْلِكَ فَحَاقَ بِالَّذِيْنَ سَخِرُوْا مِنْهُمْ مَّا كَانُوْا بِه۪ يَسْتَهْزِءُوْنَ)‏



“তোমার পূর্বেও অনেক রাসূলকেই ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করা হয়েছে। তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করছিল পরিণামে তা-ই বিদ্রƒপকারীদেরকে পরিবেষ্টন করেছে।” (সূরা আন‘আম ৬:১০)



(فَجَا۬ءَهَا بَأْسُنَا.....)



‘আমার শাস্তি তাদের ওপর পতিত হয়েছিল’ অর্থাৎ যাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার আযাব এসেছে তারা সে সময় হয় রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় অথবা দিনের বেলা বিশ্রামরত অবস্থায় ছিল। যেমন-



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اَفَاَمِنَ اَھْلُ الْقُرٰٓی اَنْ یَّاْتِیَھُمْ بَاْسُنَا بَیَاتًا وَّھُمْ نَا۬ئِمُوْنَ اَوَ اَمِنَ اَھْلُ الْقُرٰٓی اَنْ یَّاْتِیَھُمْ بَاْسُنَا ضُحًی وَّھُمْ یَلْعَبُوْنَ)‏



“জনপদবাসী কি নিরাপদ হয়ে গেছে যে, তাদের ওপর আমার শাস্তি আসবে রাতের বেলায় যখন তারা ঘুমিয়ে থাকবে? অথবা জনপদের অধিবাসীবৃন্দ কি ভয় রাখে না যে, আমার শাস্তি তাদের ওপর আসবে পূর্বাহ্নে যখন তারা থাকবে খেল তামাশায়?” (সূরা আ‘রাফ ৭: ৯৭-৯৮)



(فَمَا كَانَ دَعْوٰهُمْ)



‘তাদের কথা শুধু এটাই ছিল...’ অর্থাৎ যখনই তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি এসেছিল তখন তাদের একটাই কথা ছিল, হে আল্লাহ! আমরা জালিম। কিন্তু আযাব এসে যাওয়ার পর স্বীকারোক্তি কোন উপকারে আসেনি। সূরা আম্বিয়ার ১১-১৫ নং আয়াতে এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করেছেন।



অতএব নাবী-রাসূলদের অবাধ্য পূর্ববর্তী জাতির ওপর আপতিত শাস্তি থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। আমরাও যেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অবাধ্য না হই, তাঁর অনুসরণ বর্জন করে অন্য পথ না খুঁজি এবং তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন না করি। অন্যথায় আমাদের ওপরও তাদের মত শাস্তি আসতে পারে।



(فَلَنَسْئَلَنَّ الَّذِيْنَ أُرْسِلَ)



‘অতঃপর যাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করা হয়েছিল তাদেরকে আমি অবশ্যই জিজ্ঞাসা করব’ অর্থাৎ কিয়ামতের দিন প্রত্যেক উম্মাত ও রাসূলকেই জিজ্ঞাসা করা হবে। রাসূলরা কি যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের ডাকে উম্মত থেকে কি সাড়া পেয়েছেন? আর উম্মতেরা কি নাবীদের দাওয়াত গ্রহণ করেছে এবং তাঁদের ডাকে কি সাড়া দিয়েছে?



রাসূলদের জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(يَوْمَ يَجْمَعُ اللّٰهُ الرُّسُلَ فَيَقُوْلُ مَاذَآ أُجِبْتُمْ)



“স্মরণ কর, যেদিন আল্লাহ রাসূলগণকে একত্র করবেন এবং জিজ্ঞাসা করবেন, ‘তোমরা কী উত্তর পেয়েছিলে।”



(وَيَوْمَ يُنَادِيْهِمْ فَيَقُوْلُ مَاذَآ أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِيْنَ)‏



“আর সেদিন আল্লাহ এদেরকে ডেকে বলবেন, ‘তোমরা রাসূলগণকে কী জবাব দিয়েছিলে?” (সূরা কাসাস ২৮:৬৫)



কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সকল আমলের বর্ণনা জানিয়ে দেবেন, কারণ মানুষ যখন কোন আমল করে আল্লাহ তা‘আলা তা প্রত্যক্ষ করেন, তিনি দেখেন না এমন নয়।



সুতরাং দীনের পথে চলতে এবং তার দিকে দাওয়াত দিতে কোন সংকোচ বোধ করা যাবে না। পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। অতএব আমরা সর্বদা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মেনে চলব, তাহলে সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারব।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দাওয়াতের মূল সিলেবাস ছিল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ।

২. আল্লাহ তা‘আলা যা অবতীর্ণ করেছেন তথা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ এর অনুসরণেই ইসলাম মেনে চলা ওয়াজিব।

৩. ইসলাম বিদ্বেষী ও অস্বীকারকারী পূর্ববর্তী উম্মাতের ধ্বংসের কারণ অবগত হলাম।

৪. মৃত্যু প্রত্যক্ষ করা অথবা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে আযাব আসার পর তাওবাহ কবূল হবে না।

৫. প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:

(আরবী) এবং এগুলোর অর্থ ও এগুলো সম্পর্কে যেসব মতবিরোধ রয়েছে এ সবকিছু সূরায়ে বাকারায় আলোচিত হয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে আমি আল্লাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে থাকি। (হে নবী সঃ!) এই কিতাব (কুরআন) তোমার প্রতি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে। এখন এর প্রচার এবং এর দ্বারা মানুষকে ভয় প্রদর্শনের ব্যাপারে তোমার মনে যেন কোন সংকীর্ণতা না আসে এবং এমন ধৈর্য অবলম্বন কর যেমন দুঃসাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবীরা অবলম্বন করেছিল। এটা অবতরণের উদ্দেশ্য এই যে, তুমি এর মাধ্যমে কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করবে। আর মুমিনদের জন্যে তো এ কুরআন উপদেশবাণী। এই মুমিনরা তো কুরআনে অবতীর্ণ বিষয়ের অনুসরণ করেছে এবং উম্মী নবী (সঃ) যে কিতাব তাদের সামনে পেশ করেছেন তার তারা পদাংক অনুসরণ করেছে। এখন একে ছেড়ে অন্যের পিছনে পড়ো না এবং আল্লাহর হুকুমের সীমা ছাড়িয়ে অপরের হুকুমের উপর চলো না। কিন্তু উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণকারীর সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। হে নবী (সঃ)! তুমি যতই বাসনা, কামনা, লোভ ও চেষ্টা কর না কেন এদের সকলকে উপদেশ ও শিক্ষা লাভ করাতে পারবে না।

আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যদি সকলকেই সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা কর তবে এই লোকেরা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দেবে এবং তুমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। অধিকাংশ লোকই ঈমান আনয়ন করে না, বরং মুশরিকই থেকে যায়।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।