আল কুরআন


সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 179)

সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 179)



হরকত ছাড়া:

ولقد ذرأنا لجهنم كثيرا من الجن والإنس لهم قلوب لا يفقهون بها ولهم أعين لا يبصرون بها ولهم آذان لا يسمعون بها أولئك كالأنعام بل هم أضل أولئك هم الغافلون ﴿١٧٩﴾




হরকত সহ:

وَ لَقَدْ ذَرَاْنَا لِجَهَنَّمَ کَثِیْرًا مِّنَ الْجِنِّ وَ الْاِنْسِ ۫ۖ لَهُمْ قُلُوْبٌ لَّا یَفْقَهُوْنَ بِهَا ۫ وَ لَهُمْ اَعْیُنٌ لَّا یُبْصِرُوْنَ بِهَا ۫ وَ لَهُمْ اٰذَانٌ لَّا یَسْمَعُوْنَ بِهَا ؕ اُولٰٓئِکَ کَالْاَنْعَامِ بَلْ هُمْ اَضَلُّ ؕ اُولٰٓئِکَ هُمُ الْغٰفِلُوْنَ ﴿۱۷۹﴾




উচ্চারণ: ওয়া লাকাদ যারা’না-লিজাহান্নামা কাছীরাম মিনাল জিন্নি ওয়ালইনছি লাহুম কুলূবুল্লাইয়াফকাহূনা বিহা- ওয়া লাহুম আ‘ইউনুল্লা-ইউবসিরূনা বিহা- ওয়া লাহুম আ-যানুল্লা-ইয়াছমা‘উনা বিহা- উলাইকা কালআন‘আ-মি বাল হুম আদাল্লু উলাইকা হুমুল গা-ফিলূন।




আল বায়ান: আর অবশ্যই আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য বহু জিন ও মানুষকে। তাদের রয়েছে অন্তর, তা দ্বারা তারা বুঝে না; তাদের রয়েছে চোখ, তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের রয়েছে কান, তা দ্বারা তারা শুনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। তারাই হচ্ছে গাফেল।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭৯. আর আমরা তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি(১); তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে তা দ্বারা তারা শুনে না; তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার চেয়েও বেশী বিভ্রান্ত। তারাই হচ্ছে গাফেল।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি বহু সংখ্যক জ্বীন আর মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি, তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে দেখে না, তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে শোনে না, তারা জন্তু-জানোয়ারের মত, বরং তার চেয়েও পথভ্রষ্ট, তারা একেবারে বে-খবর।




আহসানুল বায়ান: (১৭৯) আর আমি তো বহু জ্বিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি;[1] তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দর্শন করে না এবং তাদের কর্ণ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শ্রবণ করে না। এরা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং তা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত![2] তারাই হল উদাসীন।



মুজিবুর রহমান: আমি বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় রয়েছে, কিন্তু তারা তদ্বারা উপলব্ধি করেনা; তাদের চক্ষু রয়েছে, কিন্তু তারা তদ্বারা দেখেনা। তাদের কর্ণ রয়েছে, কিন্তু তদ্বারা তারা শোনেনা। তারাই হল পশুর ন্যায়, বরং তা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত। তারাই হল গাফিল বা উদাসীন।



ফযলুর রহমান: আমি জাহান্নামের জন্য অনেক জ্বিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় আছে যা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না; তাদের চোখ আছে যা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে যা দ্বারা তারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার চেয়েও অধিক বিভ্রান্ত; তারাই প্রকৃত অমনোযোগী।



মুহিউদ্দিন খান: আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ।



জহুরুল হক: আর আমরা জাহান্নামের জন্য নিশ্চয়ই ছড়িয়ে দিয়েছি জিন ও মানুষের মধ্যের অনেককে, -- তাদের হৃদয় আছে তা দিয়ে তারা বুঝে না, আর তাদের চোখ আছে তা দিয়ে তারা দেখে না, আর তাদের কান আছে তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা গবাদি-পশুর ন্যায়, বরং তারা আরো পথভ্রষ্ট। তারা নিজেরাই হচ্ছে উদাসীন।



Sahih International: And We have certainly created for Hell many of the jinn and mankind. They have hearts with which they do not understand, they have eyes with which they do not see, and they have ears with which they do not hear. Those are like livestock; rather, they are more astray. It is they who are the heedless.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৭৯. আর আমরা তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি(১); তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে তা দ্বারা তারা শুনে না; তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার চেয়েও বেশী বিভ্রান্ত। তারাই হচ্ছে গাফেল।(২)


তাফসীর:

(১) এর অর্থ এটা নয় যে, আমি বিনা কারণে তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্যই সৃষ্টি করেছিলাম এবং তাদেরকে সৃষ্টি করার সময় এ সংকল্প করেছিলাম যে, তাদেরকে জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত করবো। বরং এর সঠিক অর্থ হচ্ছে, আমি তো তাদেরকে হৃদয়, মস্তিষ্ক, কান, চোখ সবকিছুসহ সৃষ্টি করেছিলাম। কিন্তু এ বেকুফরা এগুলোকে যথাযথভাবে ব্যবহার করেনি এবং নিজেদের অসৎ কাজের বদৌলতে শেষ পর্যন্ত তারা জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হয়েছে। সুতরাং তাদের আমলই তাদেরকে জাহান্নামের উপযুক্ত করেছে। তাদের জাহান্নাম দেয়া আল্লাহর ইনসাফের চাহিদা। সে হিসেবে তিনি যেহেতু আগে থেকেই জানেন যে, তারা জাহান্নামে যাবে, সুতরাং তাদেরকে যেন তিনি জাহান্নামের আগুনে শাস্তি দেয়ার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। [ফাতহুল কাদীর]


(২) আয়াতে বলা হয়েছেঃ এরা কিছুই বোঝে না, কোন কিছু দেখেও না এবং শুনেও না। অথচ বাস্তবে এরা পাগল বা উম্মাদ নয় যে, কিছুই বুঝতে পারে না। অন্ধও নয় যে, কোন কিছু দেখবে না, কিংবা বধিরও নয় যে, কোন কিছু শুনবে না। বরং প্রকৃতপক্ষে এরা পার্থিব বিষয়ে অধিকাংশ লোকের তুলনায় অধিক সতর্ক ও চতুর। উদ্দেশ্য এই যে, তাদের যা বুঝা বা উপলব্ধি করা উচিত ছিল তারা তা করেনি, যা দেখা উচিত ছিল তা তারা দেখেনি, যা কিছু তাদের শুনা উচিত ছিল তা তারা শুনেনি। আর যা কিছু বুঝেছে, দেখেছে এবং শুনেছে, তা সবই ছিল সাধারণ জীবজন্তুর পর্যায়ের বুঝা, দেখা ও শুনা, যাতে গাধা-ঘোড়া, গরু-ছাগল সবই সমান।

এ জন্যই উল্লেখিত আয়াতের শেষাংশে এসব লোক সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “এরা চতুস্পদ জীব-জানোয়ারের মত।” শুধুমাত্র শরীরের বর্তমান কাঠামোর সেবায় নিয়োজিত। খাদ্য আর পেটই হলো তাদের চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর। অতঃপর বলা হয়েছেঃ “এরা চতুস্পদ জীব-জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট” তার কারণ চতুস্পদ জীব-জানোয়ার শরীআতের বিধি-নিষেধের আওতাভুক্ত নয়- তাদের জন্য কোন সাজা-শাস্তি কিংবা দান-প্রতিদান নেই। তাদের লক্ষ্য যদি শুধুমাত্র জীবন ও শরীর-কাঠামোতে সীমিত থাকে তবেই যথেষ্ট। কিন্তু মানুষকে যে স্বীয় কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে। সেজন্য তাদের সুফল কিংবা শাস্তি ভোগ করতে হবে। কাজেই এসব বিষয়কেই নিজেদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বলে সাব্যস্ত করে বসা জীবজন্তুর চেয়েও অধিক নির্বুদ্ধিতা। তাছাড়া জীব-জানোয়ার নিজের প্রভূ ও মালিকের সেবা যথার্থই সম্পাদন করে। পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞ না-ফরমান মানুষ স্বীয় মালিক, পালনকর্তার আনুগত্যে ক্রটি করতে থাকে। সে কারণে তারা চতুস্পদ জানোয়ার অপেক্ষা বেশী নির্বোধ ও গাফেল। কাজেই বলা হয়েছে “এরাই হলো প্রকৃত গাফেল।” [দেখুন, তাবারী; ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৭৯) আর আমি তো বহু জ্বিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি;[1] তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দর্শন করে না এবং তাদের কর্ণ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শ্রবণ করে না। এরা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং তা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত![2] তারাই হল উদাসীন।


তাফসীর:

[1] এর সম্পর্ক তকদীরের সাথে। অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষ ও জ্বিনের ব্যাপারে আল্লাহর জানা ছিল যে, পৃথিবীতে গিয়ে তারা ভাল করবে না মন্দ করবে, সেই মত তিনি লিখে দিয়েছেন। এখানে ঐ সকল দোযখবাসীদের কথা উল্লিখিত হয়েছে, যারা আল্লাহর পূর্বজ্ঞান অনুযায়ী দোযখবাসী হওয়ারই কাজ করবে। পরবর্তীতে তাদের আরো কিছু গুণের কথা বলা হয়েছে যে, যাদের মধ্যে এ সকল জিনিস এভাবে পাওয়া যাবে, যার বর্ণনা এখানে দেওয়া হয়েছে, জানতে হবে তাদের পরিণাম হবে মন্দ।

[2] অর্থাৎ, অন্তর, চোখ, কান এগুলি মহান আল্লাহ এই জন্য দান করেছেন, যাতে মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হয়ে নিজ প্রভুকে চিনতে পারে, তার নিদর্শনসমূহ লক্ষ্য করে এবং সত্যের বাণী মন দিয়ে শোনে। কিন্তু যে ব্যক্তি ঐ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা উপকার নেয় না, যেন উপকার না নেওয়ার কারণে সে পশুর মত; বরং তার থেকেও অধম। কারণ পশুরা নিজের লাভ- নোকসান কিছুটা বুঝে। উপকারী জিনিস হতে উপকার নেয় এবং ক্ষতিকারক জিনিস হতে দূরে থাকে। কিন্তু আল্লাহর হিদায়াত হতে বিমুখতা প্রকাশকারী ব্যক্তির মধ্যে এই পার্থক্য করার শক্তিই শেষ হয়ে যায় যে, কোনটি তার জন্য লাভদায়ক, আর কোনটি ক্ষতিকারক। আর সেই কারণেই পরবর্তী বাক্যে তাদেরকে গাফিল বা উদাসীন বলা হয়েছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৭৮-১৭৯ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা যাকে হিদায়াত দান করেন সে-ই হিদায়াত প্রাপ্ত আর যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার কোন হিদায়াতকারী নেই। পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্ত। অতএব আল্লাহ তা‘আলা যদি হিদায়াত না দেন তাহলে কোন পীর ওলী আওলীয়া, মুরশিদ, গাউস, কুতুব, বাবা ইত্যাদি হিদায়াত দিতে পারে না। স্বয়ং রাসূলই পারেন না আর কোথায় এসব ব্যক্তিরা! আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّكَ لَا تَهْدِيْ مَنْ أَحْبَبْتَ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ يَهْدِيْ مَنْ يَّشَا۬ءُ ج وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِيْنَ)‏



“তুমি যাকে ভালবাস, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎ পথে আনতে পারবে না। তবে আল্লাহ তা‘আলাই যাকে ইচ্ছা সৎ পথে আনয়ন করেন এবং তিনিই ভাল জানেন সৎ পথ অনুসারীদের সম্পর্কে।” (সূরা কাসাস ২৮:৫৬)



আল্লাহ তা‘আলা অনেক জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জাহান্নামের জন্য। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি বাধ্য করে তাদেরকে জাহান্নামে দেবেন।



তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা যখন সৃষ্টি করেন তখনই তিনি জানেন এরা দুনিয়াতে জাহান্নামের আমল করবে। এটাই আল্লাহ তা‘আলা পঞ্চাশ হাজার পূর্বে তাকদীরের খাতায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।



রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলা আকাশমণ্ডলী ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সৃষ্টি জীবের তাকদীর নির্ধারণ করে রেখেছেন। তখন তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল। (অর্থাৎ সাত আকাশের ওপর যে সাগর রয়েছে তার ওপর আল্লাহ তা‘আলার আরশ)। (আবূ দাঊদ হা: ২১১৮, নাসাঈ হা: ১৪০২, ইবনু মাযাহ হা: ১৮৮২, সহীহ)



(لَهُمْ قُلُوْبٌ لَّا يَفْقَهُوْنَ بِهَا)



‘তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা উপলব্ধি করে না’ অর্থাৎ এসব অঙ্গ-প্রতঙ্গ থাকা সত্ত্বেও তারা তার দ্বারা উপকৃত হতে পারে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَقَدْ مَکَّنّٰھُمْ فِیْمَآ اِنْ مَّکَّنّٰکُمْ فِیْھِ وَجَعَلْنَا لَھُمْ سَمْعًا وَّاَبْصَارًا وَّاَفْئِدَةًﺘ فَمَآ اَغْنٰی عَنْھُمْ سَمْعُھُمْ وَلَآ اَبْصَارُھُمْ وَلَآ اَفْئِدَتُھُمْ مِّنْ شَیْءٍ اِذْ کَانُوْا یَجْحَدُوْنَﺫ بِاٰیٰتِ اللہِ وَحَاقَ بِھِمْ مَّا کَانُوْا بِھ۪ یَسْتَھْزِءُوْنَﭩﺟ)‏



“আমি তাদেরকে এমন সব কিছু দিয়েছিলাম, যা তোমাদেরকে দিইনি। আমি তাদেরকে কান, চোখ ও হৃদয় দিয়েছিলাম; কিন্তু তাদের কান, চোখ ও হৃদয় তাদের কোনো কাজে আসল না। কারণ, তারা আল্লাহ তা‘আলার আয়াতগুলোকে অস্বীকার করেছিল। যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করত তা-ই তাদেরকে ঘিরে ফেলল।” (সূরা আহকাফ ৪৬:২৬)



তারা কেবল হিদায়াতের ক্ষেত্রে বধির, অন্ধ ও বোবা। তারা দেখে না বা শুনে না তা। নয় যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(أَفَلَمْ يَسِيْرُوْا فِي الْأَرْضِ فَتَكُوْنَ لَهُمْ قُلُوْبٌ يَّعْقِلُوْنَ بِهَآ أَوْ اٰذَانٌ يَّسْمَعُوْنَ بِهَا ج فَإِنَّهَا لَا تَعْمَي الْأَبْصَارُ وَلٰكِنْ تَعْمَي الْقُلُوْبُ الَّتِيْ فِي الصُّدُوْرِ)‏



“তারা কি দেশ ভ্রমণ করেনি? তাহলে তারা জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন হৃদয় ও শ্র“তিশক্তিসম্পন্ন শ্রবণের অধিকারী হতে পারত। বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে বক্ষস্থিত হৃদয়।” (সূরা হজ্জ ২২:৪৬)



(أُولٰ۬ئِكَ كَالْأَنْعَامِ)



‘তারাই পশুর ন্যায়’ অর্থাৎ এসকল পথভ্রষ্ট কাফিররা চতুষ্পদ জন্তু বরং তার চেয়ে বেশি পথভ্রষ্ট। কেননা চতুষ্পদ জন্তু তার জন্য কোনটা কল্যাণ আর কোন্টা ক্ষতিকর সব দেখতে পায় এবং রাখালের অনুসরণ করে চলে আর এসব কাফিররা এ সকল চতুষ্পদ জন্তুর বিপরীত। ভাল-মন্দ কিছুই বুঝার চেষ্টা করে না এবং কুরআনের গাইড লাইন অনুসরণ করে না।



তাই সকল মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত নয়। কেবল মু’মিন মুসলিমরাই আশরাফুল মাখলুকাত। কারণ যারা কাফির তাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা চতুষ্পদ জন্তু বলছেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. হিদায়াতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।

২. জাহান্নামের হকদাররাই জাহান্নামে যাবে।

৩. তাকদীরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা আবশ্যক।

৪. কাফিররা চতুষ্পদ জন্তুর মত কাণ্ডজ্ঞানহীন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন এক আনসারীর ছেলের জানাযায় হাযির হওয়ার সুযোগ ঘটে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ ছেলেটি তো জান্নাতের একটি পাখী! সে কোন খারাপ কাজও করেনি এবং জাহান্নাম তার ঠিকানাও নয়।” তিনি তখন বলেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! তা হলে শুননা। আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাত সৃষ্টি করেছেন এবং যারা জান্নাতবাসী হবে তাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন। আর এই জান্নাতবাসীদের জান্নাতের অধিকারী হওয়ার ফায়সালা ঐ দিনই করা হয়েছে যেই দিন তারা আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠে ছিল। আবার তিনি জাহান্নাম ও জাহান্নামবাসীকে সৃষ্টি করেছেন যখন তারা আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠেই ছিল।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা মায়ের গর্ভাশয়ে একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন যিনি ঐ গর্ভাশয়ের সন্তান সম্পর্কে চারটি বিষয় লিপিবদ্ধ করে নেন। (১) জীবিকা, (২) বয়স, (৩) ভাল আমল এবং (৪) মন্দ আমল। আর এ কথা তো পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে আল্লাহ তা'আলা যখন তাঁর সন্তানদেরকে বের করেন। তখন তাদেরকে ডানদিক বিশিষ্ট এবং বামদিক বিশিষ্ট এই দু’টি দলে বিভক্ত করেন। একদল জান্নাতবাসী এবং অন্য দল জাহান্নামবাসী। তিনি বলেনঃ আমি কোনই পরওয়া করি না যে, কে নিজেকে জান্নাতবাসী রূপে গড়ে তুলছে এবং আমি এরও কোন পরওয়া করি না যে, কে নিজেকে জাহান্নামবাসী রূপে গড়ে তুলছে। এ ব্যাপারে বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আর তাকদীরের মাসআলাটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা। এখানে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়ার তেমন কোন সুযোগ নেই।

ইরশাদ হচ্ছে- তাদের অন্তর তো রয়েছে কিন্তু তারা অনুধাবন করে না । চক্ষু রয়েছে কিন্তু দেখে না। কান রয়েছে কিন্তু শ্রবণ করে না। এ জিনিসগুলোকে হিদায়াত লাভ করার জন্যে কারণ বানানো হয়েছিল। কিন্তু ওগুলো দ্বারা তারা মোটেই উপকৃত হয়নি। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “তাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও অস্তকরণ দেয়া হয়েছে, কিন্তু ওগুলো দ্বারা তাদের কোনই উপকার করেনি। কেননা, তারা ওগুলো দ্বারা কাজ নেয়নি এবং আল্লাহর আয়াতগুলোকে অস্বীকার করে বসে। মুনাফিকদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তারা বধির, মূক এবং অন্ধ। সুতরাং তারা ফিরবে না।” আর কাফিরদের ব্যাপারে বলা হয়েছেঃ “তারা বধির, মূক ও অন্ধ। সুতরাং তারা বুঝবে না।”

আল্লাহ পাক ঘোষণা করছেনঃ “যদি আল্লাহ মন্দ লোকদের মধ্যে কোন মঙ্গল জানতেন তবে অবশ্যই তাদেরকে শুনবার যোগ্য বানাতেন। তখন তারা নিশ্চিতরূপে হিদায়াত লাভ করতো।” অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “চক্ষুগুলো অন্ধ নয়, বরং বক্ষের মধ্যস্থিত অন্তকরণগুলোই অন্ধ।” আরও বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি রহমানের (আল্লাহর) যি হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়, শয়তান তার উপর আধিপত্য বিস্তার করে থাকে এবং সব সময় তার সঙ্গী হয়ে থাকে। এই লোকগুলো লোকদেরকে আল্লাহর পথ হতে সরিয়ে রাখে এবং ধারণা করে যে, তারা ঠিক পথেই রয়েছে।”

এখন এখানে ইরশাদ হচ্ছে—তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত। তারা সত্য কথা শুনেও না এবং সত্যের পথে সাহায্যও করে না। তারা হিদায়াতও লাভ করে না। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা তারা কোন উপকার লাভ করে না। শুধুমাত্র পার্থিব জীবনে এর দ্বারা উপকার লভি করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “কাফিরদের দৃষ্টান্ত ঐ জন্তুর মত যে রাখালের ডাক ও শব্দ শুনে থাকে মাত্র, কিন্তু কিছুই বুঝে না।” তদ্রুপ এই লোকগুলোকেও ঈমানের দিকে ডাকা হলে তারা এর উপকারিতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, শুধু শব্দই শুনে থাকে। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “এই লোকগুলো জন্তুর চাইতেও অধিক পথভ্রষ্ট। কেননা, জন্তু রাখালের কথা না বুঝলেও কমপক্ষে তার দিকে মুখ তো করে। তাছাড়া ঐ জন্তুগুলো দ্বারা অনুধাবন করতে না পারার যে কাজ প্রকাশ পায় তা হচ্ছে তাদের প্রকৃতিগত ও সৃষ্টিগত ব্যাপার। পক্ষান্তরে কাফিরদেরকে তো কোন অংশী স্থাপন করা ছাড়াই আল্লাহর ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা কুফরী ও শির্ক করে বসেছে। আর এ জন্যেই তো যারা আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করেছে তারা কিয়ামতের দিন ফেতোদের চাইতেও শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হবে। কিন্তু যারা কুফরী করেছে তারা পশুর মত তার চেয়েও নিকৃষ্ট বলে গণ্য হবে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।