সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 134)
হরকত ছাড়া:
ولما وقع عليهم الرجز قالوا ياموسى ادع لنا ربك بما عهد عندك لئن كشفت عنا الرجز لنؤمنن لك ولنرسلن معك بني إسرائيل ﴿١٣٤﴾
হরকত সহ:
وَ لَمَّا وَقَعَ عَلَیْهِمُ الرِّجْزُ قَالُوْا یٰمُوْسَی ادْعُ لَنَا رَبَّکَ بِمَا عَهِدَ عِنْدَکَ ۚ لَئِنْ کَشَفْتَ عَنَّا الرِّجْزَ لَنُؤْمِنَنَّ لَکَ وَ لَنُرْسِلَنَّ مَعَکَ بَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ ﴿۱۳۴﴾ۚ
উচ্চারণ: ওয়া লাম্মা-ওয়া কা‘আ ‘আলাইহিমুর রিজযুকা-লূইয়া-মূছাদ‘উলানা-রাব্বাকা বিমা‘আহিদা ‘ইনদাকা লাইন কাশাফতা ‘আন্নার রিজযা লানু’মিনান্না লাকা ওয়ালানুরছিলান্না মা‘আকা বানীইছরাঈল।
আল বায়ান: আর যখন তাদের উপর আযাব পতিত হল তখন তারা বলল, ‘হে মূসা আমাদের জন্য তুমি তোমার রবের কাছে দুআ কর তিনি যে ওয়াদা তোমার সাথে করেছেন সে অনুযায়ী। যদি তুমি আমাদের উপর থেকে আযাব সরিয়ে দাও তাহলে অবশ্যই আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনব এবং অবশ্যই তোমার সাথে বনী ইসরাঈলকে পাঠিয়ে দেব।’
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৩৪. আর যখন তাদের উপর শাস্তি আসত তারা বলত, হে মূসা! তুমি তোমার রবের কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা কর তোমার সাথে তিনি যে অঙ্গীকার করেছেন সে অনুযায়ী; যদি তুমি আমাদের থেকে শাস্তি দূর করে দিতে পার তবে আমরা তো তোমার উপর ঈমান আনবই এবং বনী ইসরাঈলকেও তোমার সাথে অবশ্যই যেতে দেব।
তাইসীরুল ক্বুরআন: যখন তাদের উপর কোন বালা-মুসিবত আসত তখন তারা বলত, ‘হে মূসা! তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা জানাও যে মতে তিনি তোমার সাথে অঙ্গীকার করেছেন, যদি আমাদের থেকে বিপদ দূর করে দাও তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাতে ঈমান আনব আর বানী ইসরাঈলকে অবশ্যই তোমার সাথে পাঠিয়ে দেব।’
আহসানুল বায়ান: (১৩৪) যখন তাদের উপর শাস্তি আসত, তখন তারা বলত, ‘হে মূসা! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা কর, তোমার সঙ্গে তার যে অঙ্গীকার রয়েছে সেই অনুযায়ী যদি তুমি আমাদের হতে শাস্তি অপসারিত কর, তবে আমরা অবশ্যই তোমাকে বিশ্বাস করব এবং ইস্রাঈল বংশধরগণকেও তোমার সাথে যেতে দেব।’
মুজিবুর রহমান: তাদের উপর কোন বালা মুসীবত ও বিপদ-আপদ আপতিত হলে তারা বলতঃ হে মূসা! আমাদের পক্ষ থেকে তোমার রবের নিকট দু‘আ কর। তার সাথে তোমার যে অঙ্গীকার রয়েছে তদনুযায়ী যদি আমাদের উপর থেকে প্লেগ দূর করে দিতে পার তাহলে আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনবো এবং তোমার সাথে বানী ইসরাঈলদেরকে পাঠিয়ে দিব।
ফযলুর রহমান: যখন তাদের ওপর শাস্তি নেমে আসত তখন তারা বলত, “হে মূসা! তোমার প্রভু তোমার কাছে যে ওয়াদা করেছেন সে অনুসারে তুমি তাঁর কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা কর। তুমি যদি আমাদের থেকে শাস্তি সরিয়ে দাও তাহলে অবশ্যই আমরা তোমার কথায় বিশ্বাস করব এবং তোমার সাথে বনী ইসরাঈলকে যেতে দেব।”
মুহিউদ্দিন খান: আর তাদের উপর যখন কোন আযাব পড়ে তখন বলে, হে মূসা আমাদের জন্য তোমার পরওয়ারদেগারের নিকট সে বিষয়ে দোয়া কর যা তিনি তোমার সাথে ওয়াদা করে রেখেছেন। যদি তুমি আমাদের উপর থেকে এ আযাব সরিয়ে দাও, তবে অবশ্যই আমরা ঈমান আনব তোমার উপর এবং তোমার সাথে বনী-ইসরাঈলদেরকে যেতে দেব।
জহুরুল হক: আর যখন তাদের উপরে মড়কের আবির্ভাব হলো তারা বললে -- "হে মূসা! তোমার প্রভুর কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা করো যেমন তিনি তোমার কাছে ওয়াদা করেছেন, তুমি যদি আমাদের কাছ থেকে মহামারী অপসারিত করে দাও তবে আমরা নিশ্চয়ই তোমাতে ঈমান আনবো আর তোমার সঙ্গে অবশ্যই ইসরাইলবংশীয়দের পাঠিয়ে দেবো।
Sahih International: And when the punishment descended upon them, they said, "O Moses, invoke for us your Lord by what He has promised you. If you [can] remove the punishment from us, we will surely believe you, and we will send with you the Children of Israel."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৩৪. আর যখন তাদের উপর শাস্তি আসত তারা বলত, হে মূসা! তুমি তোমার রবের কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা কর তোমার সাথে তিনি যে অঙ্গীকার করেছেন সে অনুযায়ী; যদি তুমি আমাদের থেকে শাস্তি দূর করে দিতে পার তবে আমরা তো তোমার উপর ঈমান আনবই এবং বনী ইসরাঈলকেও তোমার সাথে অবশ্যই যেতে দেব।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৩৪) যখন তাদের উপর শাস্তি আসত, তখন তারা বলত, ‘হে মূসা! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা কর, তোমার সঙ্গে তার যে অঙ্গীকার রয়েছে সেই অনুযায়ী যদি তুমি আমাদের হতে শাস্তি অপসারিত কর, তবে আমরা অবশ্যই তোমাকে বিশ্বাস করব এবং ইস্রাঈল বংশধরগণকেও তোমার সাথে যেতে দেব।’
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০৩-১৬২ নং আয়াতের তাফসীর:
আলোচ্য আয়াতগুলোতে মূসা ও হারূন (আঃ) এবং তাদের চিরশত্রু ফির‘আউনের আলোচনা করা হয়েছে। মূসা (আঃ) একজন উলূল আযম রাসূল, আর ফির‘আউন হল দুনিয়াতে বড় রব দাবীদার একজন তাগুত। উভয়ের পরিচয় সূরা বাকারার ৪৯-৫৭ নং আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে। মূসা (আঃ)-এর মুখে তোতলামী থাকার কারণে তাঁর দু‘আর কারণে দাওয়াতী কাজে সহযোগী হিসেবে বড় ভাই হারূন (আঃ)-কে নাবী হিসেবে প্রেরণ করা হয়।
আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে ফির‘আউনের কাছে রবের দাওয়াত দিয়ে পাঠালেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(ثُمَّ بَعَثْنَا مِنْۭ بَعْدِھِمْ مُّوْسٰی بِاٰیٰتِنَآ اِلٰی فِرْعَوْنَ وَمَلَائِھ۪)
“তাদের পর মূসাকে আমার নিদর্শনসহ ফির‘আউন ও তার পরিষদবর্গের নিকট পাঠিয়েছি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১০৩)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اِذْهَبَآ إِلٰي فِرْعَوْنَ إِنَّه۫ طَغٰي)
‘তোমরা উভয়ে ফির‘আউনের নিকট যাও, সে সীমালঙ্ঘন করেছে। (সূরা ত্বা-হা- ২০:৪৩)
মূসা ফির‘আউনের কাছে গিয়ে বললেন:
(إِنَّا رَسُوْلُ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ)
‘আমরা জগতসমূহের প্রতিপালকের প্রেরিত রাসূল। (সূরা শুআরা ২৬:১৬)
তারপর রবের দাওয়াত শুনে ফির‘আউন বলে:
(فَمَنْ رَّبُّكُمَا يٰمُوْسٰي)
‘‘হে মূসা! কে তোমাদের প্রতিপালক?’ (সূরা ত্বা-হা- ২০:৪৯) কারণ ফির‘আউন জানত আমিই সবচেয়ে বড় রব। মিসর আমার কর্তৃত্বাধীন, আমার আদেশে সব কিছু হচ্ছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(وَنَادٰی فِرْعَوْنُ فِیْ قَوْمِھ۪ قَالَ یٰقَوْمِ اَلَیْسَ لِیْ مُلْکُ مِصْرَ وَھٰذِھِ الْاَنْھٰرُ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِیْﺆ اَفَلَا تُبْصِرُوْنَ)
“ফিরআ‘উন তার সম্প্রদায়ের মধ্যে এ বলে ঘোষণা করল: হে আমার সম্প্রদায়! মিসরের বাদশাহী কি আমার নয়? এই নদীগুলো আমার পাদদেশে প্রবাহিত, তোমরা কি দেখ না?” (সূরা যুখরুফ ৪৩:৫১) তাছাড়া মূসা (আঃ)-কে ছোটবেলা থেকে আমিই লালন-পালন করে আসছি। সুতরাং আমিই হলাম রব। তাই সে মূসা (আঃ)-কে এরূপ প্রশ্ন করল।
মূসা (আঃ) জবাবে বললেন:
(رَبُّنَا الَّذِيْ أَعْطٰي كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَه۫ ثُمَّ هَدٰي)
“আমাদের প্রতিপালক তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথনির্দেশ করেছেন।” (সূরা ত্বা-হা- ২০:৫০)
(فَظَلَمُوْا بِهَا)
অর্থাৎ রবের দাওয়াত পাওয়ার পর সে অস্বীকার করল এবং কুফরী করল। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَجَحَدُوْا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَآ أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَّعُلُوًّا ط فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِيْنَ)
“তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করেছিল। দেখ, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল।” (সূরা নামল ২৭:১৪)
(فَأَرْسِلْ مَعِيَ بَنِيْ إِسْرَا۬ئِيْلَ)
‘আমার সাথে বানী ইসরাঈলকে দিয়ে দাও’ বানী ইসরাঈলের আসল বাসস্থান ছিল শাম এলাকা। ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে তারা মিসরে চলে আসে এবং এখানেই বসবাস শুরু করে। ফির‘আউন তাদেরকে দাস বানিয়েছিল এবং তাদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন করে। তাই মূসা (আঃ) বললেন: বানী ইসরাঈলকে আমার সাথে দিয়ে দিন- আমি তাদের নিয়ে চলে যাব।
(فَأَلْقٰي عَصَاهُ)
‘সে তার লাঠি নিক্ষেপ করল’ এখানে মূসা (আঃ)-এর মু‘জিযাহ সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে। মূসা (আঃ) যখন ফির‘আউনকে বলেছেন- আমি নিদর্শন নিয়ে এসেছি। ফির‘আউন বলল, নিদর্শন দেখাও। মূসা (আঃ) তখন লাঠি মাটিতে ছেড়ে দিলে তা বড় অজগর সাপে পরিণত হল। এ অবস্থা দেখে ফির‘আউন পরিষদবর্গকে বলল: সে একজন বিজ্ঞ জাদুকর। এর পরবর্তী ঘটনা আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
(سَحَرُوْآ أَعْيُنَ النَّاسِ)
‘তখন তারা লোকের চোখে জাদু করল’। ফির‘আউন শহরের বিজ্ঞ জাদুকরদের নিয়ে আসলো। জাদুকররা মূসা (আঃ)-কে জাদু প্রদর্শনের কথা বললে মূসা (আঃ) বললেন: ‘বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর।’ তারা তাদের লাঠি মাটিতে নিক্ষেপ করলে এমন বড় বড় সাপে পরিণত হয় যে, তাদের জাদুর প্রভাবে মূসা (আঃ)-এর মনে হল তাদের দড়ি ও লাঠিগুলো ছুটোছুটি করছে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَاَوْجَسَ فِیْ نَفْسِھ۪ خِیْفَةً مُّوْسٰی , قُلْنَا لَا تَخَفْ اِنَّکَ اَنْتَ الْاَعْلٰی , وَاَلْقِ مَا فِیْ یَمِیْنِکَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوْاﺚ اِنَّمَا صَنَعُوْا کَیْدُ سٰحِرٍﺚ وَلَا یُفْلِحُ السَّاحِرُ حَیْثُ اَتٰی , فَاُلْقِیَ السَّحَرَةُ سُجَّدًا قَالُوْٓا اٰمَنَّا بِرَبِّ ھٰرُوْنَ وَمُوْسٰی)
“মূসা তার অন্তরে কিছু ভীতি অনুভব করল। আমি বললাম, ‘ভয় কর না, তুমিই বিজয়ী। ‘তোমার ডান হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ কর, এটা তারা যা করছে তা গ্রাস করে ফেলবে। তারা যা করেছে তা কেবল জাদুকরের কৌশল। জাদুকর যেরূপ নিয়ে আসুক, সফল হবে না।’ (সূরা ত্বা-হা- ২০:৬৬-৬৯)
(اٰمَنَّا بِرَبِّ الْعٰلَمِيْنَ)
‘আমরা বিশ্ব প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছি’ অর্থাৎ যখন জাদুকররা বুঝতে পারল, মূসা যা প্রদর্শন করছে তা জাদু নয় তখন তারা সিজদাবনত হল এবং ঈমান আনল।
অবশেষে ফির‘আউন তাদেরকে শূলবিদ্ধ করে হত্যা করে।
(فَإِذَا جَا۬ءَتْهُمُ الْحَسَنَةُ)
অর্থাৎ যখন তাদের ফল-ফসল ভাল হয়, দেশে কোন দুর্ভিক্ষ থাকে না তখন তারা বলে এসব আমাদের অর্জন, আমাদের কারণে হয়েছে।
আর যদি অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তখন তারা মূসা (আঃ) ও তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে অশুভ কারণ মনে করে। অর্থাৎ মূসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা এসব অকল্যাণের কারণ বলে অপবাদ দিত।
(فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الطُّوْفَانَ)
‘অতঃপর তাদের উপর তুফান প্রেরণ করেছি’ এখানে মূসা (আঃ)-এর অবাধ্য জাতি ফির‘আউনের সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য পরপর যে আযাব এসেছিল তার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে।
الطُّوْفَانَ বা তুফান। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: এমন বৃষ্টি যা ডুবিয়ে দেয় এবং শস্যসমূহকে মূলোৎপাটন করে দেয়। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন: এমন তুফান দেয়া হয়েছিল যাতে অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছিল। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
وَالْجَرَادَ বা পঙ্গপাল। একদিন হঠাৎ হাজার হাজার পঙ্গপাল এসে ফির‘আউনের সকল ফসল খেয়ে ফেলে।
আর পাশাপশি বানী ইসরাঈলের ঘরবাড়ি, শস্যভূমি ও বাগবাগিচা সবই সুরক্ষিত ছিল। ফির‘আউনের সম্প্রদায় ছুটে গেল মূসা (আঃ)-এর কাছে। তারা এ আযাব চলে যাওয়ার জন্য কাতর কণ্ঠে নিবেদন জানাল এবং ওয়াদা করল যে, এই আযাব চলে গেলে তারা ঈমান আনবে। এরূপ কথা সকল আযাবের সময়ই বলেছিল।
وَالضَّفَادِعَ
বা ব্যাঙ। পুনরায় যখন তারা অবাধ্য হল তখন ব্যাঙ দিয়ে তাদের ঘর-বাড়ি, হাড়ি-বাতিল, জামা-কাপড় ইত্যাদি ভরে দিলেন। কোন স্থানে বসলে সাথে সাথে শত শত ব্যাঙের নীচে তলিয়ে যেত।
وَالْقُمَّلَ
উকুন। উকুন সাধারণত মানুষের মাথায় থাকে। এখানে ব্যাপক অর্থে ঘুন পোকা ও কেড়ি পোকাকেও গণ্য করা হয়েছে যা ফির‘আউনের সকল প্রকার কাঠের খুঁটি, দরজা-জানালা, খাট-পালঙ্ক ও আসবাবপত্র এবং খাদ্য-শস্যে লেগেছিল। এছাড়া দেহের সর্বত্র সর্বদা উকুনের কামড়ে তারা অতিষ্ঠ হয়েছিল।
وَالدَّمَ বা রক্ত। তাদের শাস্তিস্বরূপ এবার আল্লাহ তা‘আলা রক্ত দিলেন। খাদ্যে ও পান পাত্রে রক্ত, কুয়া ও পুকুরে রক্ত, তরি-তরকারীতে রক্ত, কলসি-বালতিতে রক্ত। খেতে বসলে সাথে সাথে থালা বাটিতে রক্ত ভরে যেত। পানি মুখে নেয়ামাত্র গ্লাস ভর্তি রক্ত হয়ে যেত। এসব আযাব দেয়ার পরেও তারা ঈমান আনেনি।
এদের এই হঠকারিতা ও কপট আচরণের কথা আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেন এভাবে:
(فَاسْتَكْبَرُوْا وَكَانُوْا قَوْمًا مُّجْرِمِيْنَ)
“অতঃপর তারা অহঙ্কার করল আর তারা তো ছিল অপরাধী সম্প্রদায়।”
এছাড়াও আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে অনেক শাস্তি দিয়েছিলেন। সবশেষে তাদেরকে সদলবলে সাগরে ডুবিয়ে মারেন।
(وَأَوْرَثْنَا الْقَوْمَ الَّذِيْنَ كَانُوْا يُسْتَضْعَفُوْنَ)
অর্থাৎ যাদেরকে ফির‘আউন দাস বানিয়ে রেখেছিল এবং যাদের ওপর নানাভাবে জুলুম করত, এদেরকে বরকতময় রাজ্য- শাম দেশের উত্তরাধিকারী বানাতে চান। সেখানে মহান আল্লাহ তা‘আলা আমালিকাদের পর বানী ইসরাঈলকে বিজয়ী করেন। মূসা ও হারূন (আঃ)-এর ইনতিকালের পর বানী ইসরাঈলরা শাম দেশে তখন গেলেন যখন ইউশা বিন নূম আমালেকাদেরকে পরাজিত করে বানী ইসরাঈলদের জন্য রাস্তা সহজ করে দিলেন।
(قَالُوْا يَا مُوسٰي اجْعَلْ لَّنَا إِلٰهًا)
অর্থাৎ যখন মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে সমুদ্র পার হয়ে গেলেন আর ফির‘আউন ও তার দলবল সমুদ্রে ডুবে গেল, ওপারে পার হয়ে বানী ইসরাঈল দেখল সেখানকার মানুষ প্রতিমা পূজা করছে।
ইবনু জুরাইজ (আঃ) বলেন: তারা গরুর মূর্তি বানিয়ে পূজা করত যার কারণে গো-বৎসের পূজা করতে বানী ইসরাঈলদের ইচ্ছা জাগে। তাই তারা মূসা (আঃ)-কে বলল: হে মূসা তাদের যেমন ইলাহ আছে তেমনি আমাদের ইলাহ বানিয়ে দাও।
আবূ ওকিদী আল লাইসি বলেন: সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে মক্কা থেকে হুনাইনে গমন করেন। বর্ণনাকারী বলেছেন: কাফিরদের একটি বরই গাছ ছিল যার নিচে তারা অবস্থান করত এবং অস্ত্র-সস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত।
তাকে ذات أنواط ‘যাতে আনওয়াত’ বলা হত। তিনি বলেছেন: আমরা সে সবুজ গাছটির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা বললাম: হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল! তাদের যেমন “যাতে আনওয়াত” আছে আমাদের তেমন কিছু বানিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললাম: সে সত্ত্বার শপথ! তোমরা তেমন কথা বলেছ যেমন কথা মূসা (আঃ)-এর সম্প্রদায় মূসাকে বলেছিল
(اجْعَلْ لَّنَا إِلٰهًا كَمَا لَهُمْ اٰلِهَةٌ قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُوْنَ)
তাদের মত আমাদের জন্য মা‘বূদ বানিয়ে দিন। (ইবনু জারীর, ১৩/ ৮১- ৮২)
(وَوَاعَدْنَا مُوسٰي ثَلَاثِيْنَ لَيْلَةً)
অর্থাৎ ফির‘আউন ও তার দলবল ধ্বংস করার পর বানী ইসরাঈলদেরকে হিদায়াতের জন্য ধর্মগ্রন্থ দেবেন- এ জন্য মূসা (আঃ)-কে ত্রিশ রাত্রির জন্য তূর পাহাড়ে আহ্বান জানালেন। পরে আরো দশদিন যোগ করে চল্লিশ রাত্রি পূর্ণ করলেন।
পরের দশদিনের ব্যাপারে মুফাসসিরগণ মতানৈক্য করেছেন। অধিকাংশ মুফাসসির বলেন:
ত্রিশরাত বলতে যুলকাদা মাসের ত্রিশরাত আর দশ রাত বলতে যুলহজ্জের দশরাত।
ইবনু আব্বাস, মুজাহিদসহ প্রমুখ মুফাসসির বলেন: এ হিসেবে মূসা (আঃ)-এর নির্দিষ্ট সময় কুরবানীর দিন পূর্ণ হয়। এ দিনেই মূসা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা বলেন আর এ দিনেই আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (আঃ)-এর ওপর দীন ইসলামকে পূর্ণ করে দেন। যেমন বলেন:
(الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِيْنًا)
মূসা (আঃ) তূর পাহাড়ে যাবার সময় হারূন (আঃ)-কে বানী ইসরাঈলদের দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যান। পরের আয়াতেই এর আলোচনা রয়েছে।
(لَنْ تَرَانِيْ)
মূসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে চাইলে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে বললেন: তুমি কখনো আমাকে দেখতে পাবে না। অর্থাৎ দুনিয়াতে চর্মচোখ দ্বারা আমাকে কখনো দেখা সম্ভব না। আখিরাতে মু’মিনগণ আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাবে- এর প্রমাণাদি পূর্বের সূরায় আলোচনা করা হয়েছে।
(بِرِسٰلٰتِيْ وَبِكَلَامِيْ)
অর্থাৎ মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা‘আলা নবুওয়াত দান করলেন এবং সরাসরি তার সাথে কথা বললেন। আর তাদের যা প্রয়োজন ফলকে সবকিছু লিখে দিয়ে দিলেন-
মূসা (আঃ) চল্লিশ দিন পূর্ণ হবার পর লিখিত ফলকসহ ফিরে এসে যখন দেখলেন, তার উম্মাত গো-বৎস পূজায় লিপ্ত হয়ে গেছে তখন রাগে ফলক ফেলে দিলেন এবং হারূনের মাথা ধরে শাসাতে লাগলেন। পরে অবশ্য ফলক তুলে নিয়েছিলেন।
(وَاتَّخَذَ قَوْمُ مُوسٰي مِنْۭ بَعْدِه۪)
অর্থাৎ মূসা (আঃ) যখন চল্লিশ রাত্রির জন্য তূর পাহাড়ে গেলেন, তখন সামেরী নামক জনৈক ব্যক্তি সম্প্রদায়ের সোনার অলঙ্কার জমা করে তা থেকে একটি বাছুর তৈরি করল। যার মধ্যে জিবরীল (আঃ)-এর ঘোড়ার পায়ের নীচের কিছু মাটি মিশিয়ে দিল যা তার কাছে রাখা ছিল এবং যার মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা প্রাণ প্রতিষ্ঠার শক্তি রেখে দিলেন। যার কারণে বাছুরটি গরুর মত শব্দ করত। এ সম্পর্কে সূরা ত্বহার ৮৮-৮৯ নং আয়াতে বর্ণিত আছে।
(وَاخْتَارَ مُوسٰي قَوْمَه۫ سَبْعِيْنَ)
মূসা (আঃ) নিজ জাতির সত্তরজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করলেন তূর পাহাড়ে নিয়ে যাবার জন্য। এ সত্তরজন ব্যক্তি কারা ছিল তা নিয়ে অনেক মতামত রয়েছে।
একটি মত হল: যখন মূসা (আঃ) তাদেরকে তাওরাতের আহকাম শোনালেন, তারা বলল- আমরা কেমন করে বিশ্বাস করব যে, এ কিতাব সত্যিই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। যতক্ষণ আমরা আল্লাহ তা‘আলাকে স্বয়ং কথা বলতে না শুনব ততক্ষণ এটাকে মানব না। সুতরাং তিনি সত্তর জন ব্যক্তিকে বেছে নিলেন এবং তাদেরকে তূর পাহাড়ে নিয়ে গেলেন। সেখানে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বললেন যা তারাও শুনল। কিন্তু তারা নতুন দাবী করে বসল যতক্ষণ আল্লাহ তা‘আলাকে আমরা নিজ চোখে না দেখব ততক্ষণ ঈমান আনব না।
দ্বিতীয় মত হল: এ সত্তর জন ব্যক্তি হল তারা যাদেরকে পুরো জাতির তরফ হতে বাছুর পূজার মহাপাপ থেকে তাওবাহ করার জন্য তূর পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তৃতীয় মত হল: এ সত্তর জন ব্যক্তি বানী ইসরাঈলকে বাছুর পূজা করতে দেখেছিলেন। কিন্তু তারা নিষেধ করেনি। অধিকাংশ মুফাসসিরগণ দ্বিতীয় মত গ্রহণ করেছেন।
(إِنَّا هُدْنَآ إِلَيْكَ)
‘আমরা তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন করেছি’ এ আয়াত থেকেই অনেকে বলেন, মূসা (আঃ)-এর অনুসারীদেরকে এ জন্য ইয়াহূদী বলা হয়।
(وَرَحْمَتِيْ وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ)
এটি আল্লাহ তা‘আলার করুণার পরিব্যাপ্তি বটে যে, পৃথিবীতে সৎ অসৎ সবাই আল্লাহ তা‘আলার করুণা হতে উপকৃত হচ্ছে।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলার রহমতের একশত অংশ আছে। তার মধ্যে একটি অংশ দুনিয়াতে দিয়েছেন। যার কারণে সকল সৃষ্টি একে অপরের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে থাকে। এমনকি পশুরাও নিজ নিজ বাচ্চার ওপর মায়া করে নিজের পা তুলে নেয়। আর তিনি রহমতের নিরানব্বই ভাগ অংশ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। কিয়ামতের দিন মু’মিনদের ওপর আল্লাহ তা‘আলা এ দয়া প্রদর্শন করবেন। (সহীহ মুসলিম হা: ২১০৮, ইবনু মাযাহ হা. ৪২৯৩)
(الرَّسُوْلَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ)
উম্মি নাবী অর্থ হল, নিরক্ষর নাবী। যিনি লেখাপড়া জানেন না। এখানে উদ্দেশ্য হল, মুহাম্মাদ (সাঃ)। কারণ তিনি লেখাপড়া জানতেন না।
(إِنِّيْ رَسُوْلُ اللّٰهِ إِلَيْكُمْ جَمِيْعَا)
এ আয়াতও মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাত সার্বজনীন রিসালাত প্রমাণিত হবার জন্য স্পষ্ট দলীল, এতে আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাঃ)-কে আদেশ করছেন যেন তিনি ঘোষণা করে দেন, হে বিশ্বের মানুষ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি। তিনি বিশ্বের সকল মানব জাতির জন্য ত্রাণকর্তা ও রাসূল। তাই পরিত্রাণ ও সুপথ খৃস্ট ধর্মে নেই, ইয়াহূদী ধর্মে নেই এবং অন্য কোন ধর্মেও নেই। পরিত্রাণ ও সুফল যদি থাকে তাহলে কেবল ইসলাম ধর্মেই রয়েছে।
(يُؤْمِنُ بِاللّٰهِ وَكَلِمٰتِهِ)
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর কালেমার প্রতি ঈমান আনে, এখানে কালিমার কথা বলা হল। কালিমার পরিমাণ অন্যত্র উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ لَّوْ كَانَ الْبَحْرُ مِدَادًا لِّكَلِمٰتِ رَبِّيْ لَنَفِدَ الْبَحْرُ قَبْلَ أَنْ تَنْفَدَ كَلِمَاتُ رَبِّيْ وَلَوْ جِئْنَا بِمِثْلِه ۪ مَدَدًا)
“বল: ‘আমার প্রতিপালকের কালিমা লিপিবদ্ধ করার জন্য সমুদ্র যদি কালি হয়, তবে আমার প্রতিপালকের কথা শেষ হবার পূর্বেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে- আমরা এটার সাহায্যের জন্য অনুরূপ আরও সমুদ্র আনলেও।’ (সূরা কাহ্ফ ১৮:১০৯)
অন্যত্র বলেন:
(وَلَوْ أَنَّ مَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَجَرَةٍ أَقْلَامٌ وَّالْبَحْرُ يَمُدُّه۫ مِنْۭ بَعْدِه۪ ۪ ۪ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ مَّا نَفِدَتْ كَلِمٰتُ اللّٰهِ ط إِنَّ اللّٰهَ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ)
“আর সমগ্র পৃথিবীতে যত গাছ আছে তা সবই যদি কলম হয় এবং যে সমুদ্র রয়েছে তার সাথে যদি আরও সাতটি সমুদ্র শামিল হয়ে কালি হয় তবুও আল্লাহ তা‘আলার কালিমা লেখা শেষ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা প্রতাপশালী, মহা প্রজ্ঞাময়।” (সূরা লুকমান ৩১:২৭)
আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা আবূ বাকর (রাঃ) ও উমার (রাঃ) এর মাঝে বিতর্ক হল, আবূ বকর (রাঃ) উমার (রাঃ) কে রাগিয়ে দিয়েছিলেন, এরপর রাগান্বিত অবস্থায় উমার সেখান থেকে চলে গেলেন, আবূ বকর (রাঃ) তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে তাঁর পিছু নিলেন, কিন্তু উমার (রাঃ) ক্ষমা করলেন না, বরং তাঁর সম্মুখের দরজা বন্ধ করে দিলেন। এরপর আবূ বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দরবারে আসলেন। আবূ দারদা (রাঃ) বলেন: আমরা তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে ছিলাম, ঘটনা শোনার পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: তোমাদের এ সঙ্গী আবূ বকর (রাঃ) আগে কল্যাণ লাভ করেছে। তিনি বলেন: এতে উমার (রাঃ) লজ্জিত হলেন এবং সালাম করে নাবী (সাঃ) এর পাশে বসে পড়লেন ও সব কথা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে বর্ণনা করলেন। আবূ দারদা (রাঃ) বলেন: এতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অসন্তুষ্ট হলেন। আবূ বকর (রাঃ) বারবার বলছিলেন, হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাঃ)! আমি অধিক দোষী ছিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: তোমরা আমার খাতিরে আমার সাথীর ক্রটি উপেক্ষা করবে কি? তোমরা আমার খাতিরে আমার সঙ্গীর ক্রটি উপেক্ষা করবে কি? এমন একদিন ছিল যখন আমি বলেছিলাম: হে মানুষেরা! আমি তোমাদের সকলের জন্য রাসূল, তখন তোমরা বলেছিলে, “তুমি মিথ্যা বলেছ” আর আবূ বকর (রাঃ) বলেছিল, আপনি সত্য বলেছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৪০)
– أسْبَاطُ - (وَقَطَّعْنَاهُمُ اثْنَتَيْ عَشْرَةَ أَسْبَاطًا)
শব্দটি سَبْطٌ এর বহুবচন, অর্থ পৌত্র। এখানে গোত্রের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ইয়াকুব (আঃ)-এর বারটি সন্তান থেকে বারটি গোত্র আবির্ভূত হল। প্রত্যেক গোত্রের জন্য এক একটি দলপতি নিযুক্ত করেছিল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَبَعَثْنَا مِنْهُمُ اثْنَيْ عَشَرَ نَقِيْبًا)
“তাদের মধ্য হতে বার জন নেতা নিযুক্ত করেছিলাম” (সূরা মায়িদাহ ৫:১২)
পরের আয়াতগুলো সম্পর্কে সূরা বাক্বারায় আলোচনা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. দীনের দাওয়াত রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের কাছেও পৌঁছে দিতে হবে। যেমন মূসা (আঃ) ফির‘আউনের কাছে দিয়েছেন।
২. জাদু কুফরী কাজ, এর প্রভাব রয়েছে।
৩. দুনিয়ার সম্পদ মু’মিনদের উত্তরাধিকার করে দেয়া হয়েছে, কাফের-মুশরিকাদের কোন অংশ নেই। তবে মু’মিনদের ঈমান দুর্বল ও দীন থেকে সরে পড়ার কারণে কাফেররা এসকল সম্পদ দখল করে আছে।
৪. সত্যের নিদর্শন দেখে জাদুকররা ঈমান আনয়ন করেছে, শত বাধা ও হুমকি ঈমান থেকে তাদেরকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
৫. বানী ইসরাঈলদের ওপর পরপর কয়েকটি আযাব প্রদান করে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল।
৬. মূসা (আঃ) সরাসরি আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা বলেছেন।
৭. চর্ম চোখে আল্লাহ তা‘আলাকে দুনিয়াতে দেখা অসম্ভব।
৮. আল্লাহ তা‘আলা কথা বলেন এবং তাঁর কথার আওয়াজ রয়েছে।
৯. নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) সারা জাহানের নাবী। তাঁর খবর যার কাছেই পৌঁছবে অতঃপর ঈমান আনবে না, সে কাফির।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৩২-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে মহা মহিমান্বিত আল্লাহ ফিরাউন সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ ও বিরোধিতার সংবাদ দিচ্ছেন যে, কিভাবে তারা হক থেকে সরে গিয়ে একগুয়েমী ভাব দেখিয়েছিল এবং বাতিলের উপর থেকে হঠকারিতা করেছিল। তারা এ কথাও বলেছিল, “যদি মূসা (আঃ) এমন নিদর্শনও প্রদর্শন করেন যার মাধ্যমে তিনি আমাদের উপর যাদু করে দেন তবুও আমরা ঈমান আনবো না । না আমরা তাঁর কোন দলীল কবুল করবো, না তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করবো, না তাঁর মু'জিযার উপর ঈমান আনবো।”
তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাদের উপর তুফান পাঠালাম।' (আরবী)-এর অর্থের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে অধিক বৃষ্টিপাত যা ডুবিয়ে দেয় বা ক্ষেত ও বাগানের ক্ষতি সাধন করে। (এটা যহহাক ইবনে মাযাহিমও (রঃ) বলেছেন। এটাই বেশী প্রকাশমান) তিনি এর দ্বারা সাধারণ মহামারীও বুঝিয়েছেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তুফান হচ্ছে প্লাবন ও প্লেগ। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তুফান অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, ওটা হচ্ছে। আল্লাহর আকস্মিক ও আসমানী শাস্তি! যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওদের নিদ্রিত অবস্থায় সে উদ্যানে তোমার প্রভুর বিপর্যয় হানা দিলো।” (৬৮:১৯) (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে ফড়িং, যা একটা প্রসিদ্ধ পাখি, যা খাওয়া হালাল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাতটি যুদ্ধে শরীক ছিলাম। প্রত্যেক যুদ্ধেই আমরা ফড়িং খাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।” ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রাঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের জন্যে দু’টো মৃত ও দু’টো রক্ত হালাল করা হয়েছে। (মৃত দু’টো হচ্ছে) মাছ ও ফড়িং, আর (রক্ত দু'টো হচ্ছে) কলিজা ও প্লীহা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অধিকাংশ প্রাণী যেগুলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সেনাবাহিনী, সেগুলোকে আমি নিজে খাই না বটে, কিন্তু অন্যদের জন্যে হারাম বলি না, বরং ওগুলো হালাল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর না খাওয়ার কারণ ছিল এই যে, ওতে তাঁর রুচি হতো না। যেমন গোসাপ। ওটা খেতে তার নিজের রুচি হতো না। কিন্তু অন্যদেরকে তিনি ওটা খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) ফড়িং, গোসাপ এবং কোন প্রাণীর মূত্রস্থলী খেতেন না। কিন্তু ওগুলোকে হারামও বলতেন না। তাঁর ফড়িং খাওয়া থেকে বিরত থাকার কারণ ছিল এই যে, এটা আল্লাহর একটি আযাব । ফড়িং যে ফসলের জমির উপর দিয়ে গমন করে সেই জমির ফসল সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। মূত্রস্থলী থেকে বিরত থাকার কারণ এই যে, ওটা প্রস্রাবের নিকটবর্তী অংশ। আর গোসাপ না খাওয়ার কারণ এই যে, ওটা হচ্ছে এমন একটি জাতি যা সুন্দর আকৃতি থেকে কদাকৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এই বর্ণনাটিও দুর্বল বটে, তবে গোসাপ খাওয়া থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরত থাকার কারণের প্রতি আলোকপাতের উদ্দেশ্যেই আমি এটা নকল করেছি।” আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) অত্যন্ত আগ্রহের সাথে ফড়িং খেতেন। তাঁকে ফড়িং খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি দু'একটি ফড়িং পেলে অত্যন্ত মজা করে খেয়ে থাকি।” হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্নীগণ থালা ভর্তি ফড়িং তাঁর কাছে উপঢৌকন স্বরূপ প্রেরণ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমাকে এমন মাংস খেতে দিন যাতে রক্ত নেই।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ফড়িং খেতে দেন। তখন মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! লালন পালন ছাড়াই তাকে জীবন দান করুন এবং শব্দ ও শোরগোল ছাড়াই ওদের এককে অপরের পিছনে রেখে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“ফড়িংকে মেরো না। এগুলো হচ্ছে আল্লাহ তাআলার এক বিরাট সেনাবাহিনী।” এ হাদীসটি খুবই গারীব ।
(আরবী) যুক্ত আয়াত সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই শাস্তি এই কারণে যে, অতীত যুগে এগুলো দরজার কীলকে খেয়ে ফেলতে এবং কাঠকে অবশিষ্ট রাখতো। আওযায়ী (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা জঙ্গলের দিকে রওয়ানা হলাম। হঠাৎ দেখি যে, এক ঝাক ফড়িং যমীন ও আসমানকে ছেয়ে আছে। আর একটি লোক ঐ ঝাঁকের মধ্যে বর্ম পরিহিত অবস্থায় রয়েছে। যেই দিকে সে ইশারা করছে সেই দিকে ঐ ফড়িংগুলো সরে যাচ্ছে। ঐ লোকটি বার বার বলতে রয়েছে- দুনিয়া ও ওর মধ্যস্থিত সবকিছুই বাতিল ও মিথ্যা।”
কাযী শুরাইহ (রঃ)-কে ফড়িং সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ওকে ধ্বংস করুন! তার মধ্যে সাতটি শক্তিশালীর মাহাত্ম রয়েছে। ওর মাথা হচ্ছে ঘোড়ার, গর্দান হচ্ছে বলদের, বক্ষ সিংহের, বাহু গৃধিনীর, পা উটের, লেজ সাপের এবং পেট হচ্ছে বৃশ্চিকের।”
(আরবী) (৫:৯৬) এই আয়াতটি সম্পর্কে আলোচনার সময় নিম্নের হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হজ্ব বা উমরার জন্যে যাচ্ছিলাম। এক দল ফড়িং-এর আমরা সম্মুখীন হই। আমরা খড়ি দিয়ে ওগুলোকে মারছিলাম, অথচ ঐ সময় আমরা ইহরামের অবস্থায় ছিলাম। আমরা এ কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “ইহরামের অবস্থায় সামুদ্রিক শিকারে কোন বাধা নেই।” হযরত আনাস (রাঃ) ও হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফড়িং-এর উপর বদদু'আ করে বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি ছোট বড় সমস্ত ফড়িংকে ধ্বংস করে দিন, ওদের ডিমগুলো বরবাদ করে দিন, ওদের বংশ-স র্কি ছিন্ন করুন এবং আমাদের থেকে কেড়ে নেয়া আহার্য ওদের মুখ থেকে ছিনিয়ে নিন! নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।” তখন হযরত জাবির (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এগুলো তো আল্লাহর সেনাবাহিনী। অথচ আপনি ওগুলোর বংশ সম্পর্ক কেটে দেয়ার প্রার্থনা করছেন!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলো সমুদ্রের মাছ থেকে সৃষ্ট হয়ে থাকে।” (এটা ইমাম ইবনে মাজাহ (রাঃ) তাঁর সুনানে তাখরীজ করেছেন) যিয়াদ সংবাদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি ফড়িংকে মাছ থেকে সৃষ্ট হতে দেখেছে সে বর্ণনা করেছে, মাছ যখন সমুদ্রের তীরবর্তী স্থানে ডিম ছাড়ে এবং তীরের পানি শুকিয়ে যায় ও তথায় সূর্যের আলো পতিত হয়, তখন ঐ ডিমগুলো হতে এই ফড়িং বেরিয়ে পড়ে উড়তে শুরু করে।” (আরবী) -এর আলোচনায় আমরা নিমের হাদীসটি বর্ণনা করেছিঃ
“আল্লাহ তা'আলা হাজার প্রকারের মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। ছয়শ' প্রকার হচ্ছে জলচর এবং চারশ’ হচ্ছে স্থলচর। আর তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যাবে এরূপ মাখলুক হচ্ছে ফড়িং।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যুদ্ধে ধ্বংস প্রাপ্তদের সামনে প্লেগও কিছুই নয়। আর ফড়িং এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাঠেরও কোন হাকীকত নেই।” এই হাদীসটি গারীব।
(আরবী) সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা হচ্ছে গমের ভিতরের পোকা অথবা ওটা হচ্ছে ছোট ছোট ফড়িং যার পালক থাকে না এবং উড়ে না। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে কালো বর্ণের ক্ষুদ্র কীট বা মশা অথবা ওটা হচ্ছে এমন পোকা যা উটের গায়ে লেগে থাকা পোকা সদৃশ।
বর্ণিত আছে যে, যখন মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ “হে ফিরাউন! বানী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও”। সেই সময় আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ঝড় তুফান শুরু হয়েছিল এবং মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছিল। ফিরাউন ও তার লোকেরা বুঝে নিয়েছিল যে, এটা আল্লাহর শাস্তি। তাই তারা বলেছিল“হে মূসা! আল্লাহর নিকট দু'আ করে এই ঝড়-তুফান বন্ধ করে দাও। আমরা তোমার উপর ঈমান আনবো এবং বানী ইসরাঈলকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দেবো।” মূসা (আঃ) তখন দু'আ করলেন। কিন্তু না তারা ঈমান আনলো, না বানী ইসরাঈলকে তার সাথে পাঠালো। ঐ বছর বৃষ্টিপাতের ফলে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হলো। তারা তখন বলতে লাগলো- “বাঃ বাঃ! আমাদের আকাক্ষা তো এটাই ছিল। কিন্তু ঈমান না আনার কারণে ফড়িংকে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো। ওরা সমস্ত ক্ষেত খেয়ে ফেললো এবং শাক সবুজী নষ্ট করে দিলো। তারা বুঝে নিলো যে, এখন আর কোন ফসল অবশিষ্ট থাকবে না। সুতরাং তারা মূসা (আঃ)-এর শরণাপন্ন হয়ে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! এই শাস্তিকে সরিয়ে দাও। আমরা ঈমান আনবো।” মূসা (আঃ)-এর দু'আয় ফড়িং দূর হয়ে গেল। কিন্তু তথাপি তারা ঈমান আনলো না। বরং তারা ফসল ঘরে জমা করে রাখলো এবং বলতে শুরু করলো-“কি ভয়? শস্যের ঢেরি বাড়ীতে বিদ্যমান রয়েছে।” হঠাৎ গমের পোকার শাস্তি তাদের উপর পতিত হলো। এমন অবস্থা হলো যে, কেউ দশ সের গম পেষণের জন্যে নিয়ে গেলে তিন সেরও বাকী থাকতো না। আবার তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে আযাব রানোর দরখাস্ত করলো এবং ঈমান আনয়নের অঙ্গীকার করলো। কিন্তু সেই (আরবী)-এর শাস্তি দূর হওয়ার পরেও তারা বিরোধিতা করতেই থাকলো। কোন এক সময় হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনের সাথে মিলিত হয়েছিলেন এমন সময় ভেকের ডাক শোনা গেল। তিনি ফিরাউনকে বললেনঃ “তোমার উপর ও তোমার কওমের উপর একী শাস্তি!” সে বললোঃ “এতে তো ভয়ের কোনই কারণ নেই। ন্ধ্যা হতে না হতেই জনগণের সারা দেহে ভেক লাফালাফি শুরু করে দিলো। কেউ কথা বলার জন্যে মুখ খুললে ভেক তার মুখে প্রবেশ করতো। পুনরায় তারা ঐ শাস্তি অপসারণের জন্যে মূসা (আঃ)-এর নিকট আবেদন জানালো। কিন্তু সেই শাস্তি দূর হওয়ার পরেও তারা ঈমান আনলো না। এরপর নাযিল হলো রক্ত আযাব! তারা নদী থেকে বা কূপ থেকে পানি এনে রাখলে তা রক্তে পরিণত হয়ে যেতো। কোন পাত্রে রাখলেও সেই একই অবস্থা। ফিরাউনের কাছে লোকেরা এ অভিযোগ করলে সে তাদেরকে বললোঃ “তোমাদের উপর যাদু করা হয়েছে। তারা বললোঃ “আমাদের উপর কে যাদু করলো? আমাদের পাত্রে শুধু আমরা রক্তই পাচ্ছি!” অতএব, আবার তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আসলো এবং ঐ আযাব দূর হলে ঈমান আনবে ও বানী ইসরাঈলকে তার সাথে পাঠিয়ে দেবে এই ওয়াদা করলো। হযরত মূসা (আঃ)-এর দু'আয় তখন ঐ শাস্তি দূর হয়ে গেল। কিন্তু তবুও তারা ঈমান আনলো না এবং বানী ইসরাঈলকে তাঁর সাথে পাঠালোও না। (হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং পূর্ববর্তী আলেমদের আরো কয়েকজন হতে অনুরূপ বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন যাদুকরগণ ঈমান আনলো এবং ফিরাউন পরাজিত হলো ও বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে গেল, তখনও সে অবাধ্যতা ও কুফরী থেকে ফিরলো না। ফলে তাদের উপর পর্যায়ক্রমে কয়েকটি নিদর্শন প্রকাশিত হলো। দুর্ভিক্ষ, বৃষ্টিযুক্ত ঝড়-তুফান, ফড়িং, গমের পোকা, ব্যাঙ এবং রক্ত। এসব শাস্তি পর্যায়ক্রমে তাদের উপর নাযিল হতে থাকলো। ঝড়-তুফানের ফলে সমস্ত ভূমি দলদলে হয়ে গেল। না তারা তাতে লাঙ্গল চালাতে পারলো, না কোন ফসলের বীজ বপন করতে সক্ষম হলো। ক্ষুধার তাড়নায় তাদের প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আযাব সরানোর দরখাস্ত করলো এবং ঈমান আনয়নের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলো। মূসা (আঃ) আযাব সরানোর জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট আবেদন জানালেন। আযাব সরে গেল বটে, কিন্তু তারা ঈমান আনয়নের অঙ্গীকার পুরো করলো না। তারপরে আসলো ফড়িং-এর শাস্তি, যা সমস্ত ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেললো এবং তাদের ঘরের দরজাগুলোর পেরেক চাটতে থাকলো। ফলে তাদের ঘরগুলো পড়ে গেল। এরপরে আসলো কীটের শাস্তি। হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “এই টিলার দিকে এসো।” তারপর হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ। তা'আলার নির্দেশক্রমে একটি পাথরের উপর লাঠি মারলেন। তখন ওর মধ্য থেকে অসংখ্য কীট বেরিয়ে পড়লো। ওগুলো ঘরের সর্বস্থানে ছড়িয়ে পড়লো । খাদ্যদ্রব্যের গায়ে ওগুলো লেগে থাকলো। লোকগুলো না ঘুমোতে পারছিল, না একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছিল। তারপর তাদের উপর ব্যাঙ-এর শাস্তি নেমে আসলো। খাদ্যদ্রব্যে ব্যাঙ, ভাতের থালায় ব্যাঙ, কাপড়ে ব্যাঙ। এরপরে আসলো রক্তের শাস্তি। পানির প্রতিটি পাত্রে পানির পরিবর্তে রক্তই দেখা যায়। মোটকথা, তারা বিভিন্ন প্রকার শাস্তির শিকারে পরিণত হলো।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা বাঙকে মেরো না। কেননা, ফিরাউনের কওমের উপর যখন ব্যাঙ-এর শাস্তি প্রেরণ করা হয় তখন একটি ব্যাঙ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আগুনের এক চুল্লীর মধ্যে পড়ে যায়। তাই আল্লাহ তা'আলা ঠাণ্ডা জায়গা অর্থাৎ পানির স্থানকে ব্যাঙ-এর বাসস্থান বানিয়েছেন এবং তাদের ডাককে তসবীহ হিসেবে গণ্য করেছেন। যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) (আরবী)-এর শাস্তি দ্বারা নাকসীর (গরমের প্রকোপে নাক দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়) এর শাস্তি ভাব নিয়েছেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।