সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 12)
হরকত ছাড়া:
قال ما منعك ألا تسجد إذ أمرتك قال أنا خير منه خلقتني من نار وخلقته من طين ﴿١٢﴾
হরকত সহ:
قَالَ مَا مَنَعَکَ اَلَّا تَسْجُدَ اِذْ اَمَرْتُکَ ؕ قَالَ اَنَا خَیْرٌ مِّنْهُ ۚ خَلَقْتَنِیْ مِنْ نَّارٍ وَّ خَلَقْتَهٗ مِنْ طِیْنٍ ﴿۱۲﴾
উচ্চারণ: কা-লা মা-মানা‘আকা আল্লা-তাছজু দা ইয আমারতুকা কা-লা আনা খাইরুম মিনহু খালাকতানী মিন না-রিওঁ ওয়া খালাকতাহূমিন তীন।
আল বায়ান: তিনি বললেন, ‘কিসে তোমাকে বাধা দিয়েছে যে, সিজদা করছ না, যখন আমি তোমাকে নির্দেশ দিয়েছি’? সে বলল, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১২. তিনি বললেন, আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম তখন কি তোমাকে নিবৃত্ত করল যে, তুমি সিজদা করলে না? সে বলল, আমি তার চেয়ে শ্ৰেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কাদামাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: (আল্লাহ) বললেন, ‘আমি নির্দেশ দেয়ার পরেও কিসে তোকে সাজদাহ থেকে নিবৃত্ত রাখল?’ সে বলল, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম, আমাকে সৃষ্টি করেছ আগুন থেকে আর তাকে সৃষ্টি করেছ কাদা থেকে।’
আহসানুল বায়ান: (১২) তিনি বললেন, ‘আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম, তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করল যে, তুমি সিজদাহ করলে না?’[1] সে বলল, ‘আমি ওর (আদম) চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তুমি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছ এবং ওকে সৃষ্টি করেছ কাদামাটি দ্বারা।’ [2]
মুজিবুর রহমান: তিনি (আল্লাহ) তাকে (ইবলীসকে) জিজ্ঞেস করলেনঃ আমি যখন তোকে সাজদাহ (আদমকে) করতে আদেশ করলাম তখন কোন বস্তু তোকে নত শির হতে নিবৃত্ত করল? সে উত্তরে বললঃ আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি দ্বারা।
ফযলুর রহমান: তিনি বললেন, “আমি যখন তোমাকে আদেশ দিয়েছি তখন কিসে তোমাকে নিষেধ করল যে তুমি সেজদা করছ না?” সে বলল, “আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ; (কারণ) আমাকে তুমি আগুন থেকে সৃষ্টি করেছো, আর তাকে সৃষ্টি করেছো মাটি থেকে।”
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ বললেনঃ আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি, তখন তোকে কিসে সেজদা করতে বারণ করল? সে বললঃ আমি তার চাইতে শ্রেষ্ট। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা।
জহুরুল হক: তিনি বললেন -- "কি তোমাকে বাধা দিয়েছিল যেজন্য তুমি সিজদা করলে না যখন আমি তোমাকে আদেশ করেছিলাম?" সে বললে -- "আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ, আমাকে তুমি আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছ, আর তাকে তুমি সৃষ্টি করেছ কাদা দিয়ে।"
Sahih International: [Allah] said, "What prevented you from prostrating when I commanded you?" [Satan] said, "I am better than him. You created me from fire and created him from clay."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১২. তিনি বললেন, আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম তখন কি তোমাকে নিবৃত্ত করল যে, তুমি সিজদা করলে না? সে বলল, আমি তার চেয়ে শ্ৰেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কাদামাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।(১)
তাফসীর:
(১) এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, ইবলীসকে আল্লাহ্ তা'আলা আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর যদি ইবলীসকে সমস্ত জিন জাতির পিতা বলা হয়, তখন তো এ ব্যাপারে আর কোন কথাই থাকে না। কারণ অন্যান্য আয়াতেও জিন জাতিকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “আর এর আগে আমরা সৃষ্টি করেছি জিনদেরকে অতি উষ্ণ নিধুম আগুন থেকে।” [সূরা আল-হিজর: ২৭] তাছাড়া অন্যত্র আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, জিন জাতিকে ‘মারেজ’ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর ‘মারেজ’ হচ্ছে, নিধুম অগ্নিশিখা। আল্লাহ বলেন, “এবং জিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধুম আগুনের শিখা হতে।” [সূরা আর-রহমানঃ ১৫] [আদওয়াউল বায়ান]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১২) তিনি বললেন, ‘আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম, তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করল যে, তুমি সিজদাহ করলে না?’[1] সে বলল, ‘আমি ওর (আদম) চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তুমি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছ এবং ওকে সৃষ্টি করেছ কাদামাটি দ্বারা।’ [2]
তাফসীর:
[1] أَلاَّ تَسْجُدَ তে لا অতিরিক্ত। অর্থাৎ, أَنْ تَسْجُدَ (সিজদা করতে তোমাকে বাধা কে দিল?) অথবা কিছু শব্দ ঊহ্য আছে। অর্থাৎ, ‘‘কোন্ জিনিস তোমাকে বাধ্য করল সিজদা না করতে?’’ (ইবনে কাসীর, ফাতহুল ক্বাদীর) শয়তান ফিরিশতাদের জাতিভুক্ত ছিল না। বরং স্বয়ং কুরআনের বিবৃতি অনুযায়ী সে ছিল জ্বিন জাতির একজন। (সূরা কাহা্ফ ৫০) তবে আসমানে ফিরিশতাদের সাথে থাকার কারণে সেও আল্লাহর সিজদা করতে বলার সেই আদেশের আওতাভুক্ত ছিল, যা তিনি ফিরিশতাদেরকে করেছিলেন। আর এই কারণেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তিরস্কারও করা হয়েছে। যদি সে এই আদেশে শামিল না থাকত, তাহলে না তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হত, আর না সে (আল্লাহর দরবার থেকে) বিতাড়িত হত।
[2] শয়তানের এই ওজর আরো অপরাধমূলক। যেমন, বলা হয় যে, পাপের জন্য ওজর পেশ করা আরো বড় পাপ। প্রথমতঃ তার এই ধারণাই ভুল যে, অধিক শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারীকে তার থেকে কম শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ব্যক্তির সম্মান প্রদান করার নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে না। কারণ, প্রকৃত জিনিস হল আল্লাহর নির্দেশ পালন। তাঁর নির্দেশের সামনে কে শ্রেষ্ঠ আর কে শ্রেষ্ঠ নয় এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করাই হল তাঁর অবাধ্যতা। দ্বিতীয়তঃ সে উত্তম হওয়ার দলীল এটাই দিল যে, আমি আগুন থেকে সৃষ্ট, আর সে মাটি থেকে। কিন্তু সে এই মর্যাদা ও সম্মানের প্রতি ভ্রূক্ষেপও করল না যে, তাঁকে আল্লাহ তাঁর নিজ হাত দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং নিজের পক্ষ থেকে তাঁর মধ্যে আত্মা দান করেছেন। দুনিয়ার কোন জিনিস কি এই সম্মানের মোকাবেলা করতে পারে? তৃতীয়তঃ স্পষ্ট উক্তির মোকাবেলায় সে কিয়াস (অনুমিতি) করল, যা কোন আল্লাহভীরু বান্দার কাজ হতে পারে না। এ ছাড়াও তার কিয়াস (অনুমিতি)ও বাতিল। আগুন মাটি থেকে কিভাবে উত্তম? আগুনের মধ্যে তেজি, উত্তাপ এবং দহন ক্ষমতা ছাড়া আর কি আছে? পক্ষান্তরে মাটির মধ্যে আছে স্থিরতা, দৃঢ়তা। এর মধ্যে আছে উদ্ভিদ-বৃদ্ধি, উৎপাদন এবং বস্তু পরিশুদ্ধ করণের যোগ্যতা। আর এ গুণগুলো আগুনের চেয়ে অবশ্যই উত্তম এবং বেশী উপকারীও। এই আয়াত থেকে জানা গেল যে, শয়তান সৃষ্টি হয়েছে আগুন থেকে। যেমন, হাদীসেও এসেছে যে, ‘‘ফেরেশতাকুল নূর থেকে, ইবলীস অগ্নিশিখা থেকে এবং আদম (আঃ)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।’’ (সহীহ মুসলিম, যুহ্দ অধ্যায়)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১-২৫ নং আয়াতের তাফসীরঃ
(فَبِمَآ أَغْوَيْتَنِيْ)
অর্থাৎ আমাকে পথভ্রষ্ট করার কারণে।
(مَذْءُوْمًا مَّدْحُوْرًا)
অর্থাৎ নিন্দনীয়, বিতাড়িত ও ক্রোধভাজন।
(فَدَلّٰهُمَا بِغُرُوْرٍ)
অর্থাৎ ধোঁকা দিয়ে ধীরে ধীরে তাদের দু’জনকে গাছের নিকটবর্তী করল, অবশেষে তারা গাছের ফল খেল।
এ আয়াতগুলো আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি, ফেরেশতা কর্তৃক তাকে সিজদাহ করানো, জান্নাতে বসবাস, শয়তানের কুমন্ত্রণায় নিষেধকৃত বিষয়ে লিপ্ত হওয়া, জান্নাত থেকে বহিস্কার, আল্লাহ তা‘আলার কাছে তাওবাহ করা এবং আল্লাহ তা‘আলার সাথে শয়তানের প্রতিশ্র“তি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ সবের অধিকাংশ বিষয় সূরা বাক্বারার শুরুতে (৩৪-৩৯ নং আয়াতে) আলোচনা করা হয়েছে।
(وَلَقَدْ خَلَقْنٰكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنٰكُمْ)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَا۬ئِكَةِ إِنِّيْ خَالِقٌۭ بَشَرًا مِّنْ صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَّسْنُوْنٍ - فَإِذَا سَوَّيْتُه۫ وَنَفَخْتُ فِيْهِ مِنْ رُّوْحِيْ فَقَعُوْا لَه۫ سٰجِدِيْنَ)
“স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বললেন: ‘আমি গন্ধযুক্ত কর্দমের শুষ্ক ঠন্ঠনা মৃত্তিকা হতে মানুষ সৃষ্টি করেছি; ‘যখন আমি তাকে পূর্ণমাত্রায় বানিয়ে দেব এবং তাতে আমার পক্ষ হতে রূহ সঞ্চার করব তখন তোমরা তার প্রতি সিজ্দাবনত হও’।” (সূরা হিজর ১৫:২৮-২৯)
(مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ)
‘আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম তখন কিসে তোমাকে সিজদাহ দিতে বারণ করল?’ অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বললেন, আদমকে নিজের উভয় হাতে সৃষ্টি করেছেন, তারপর ফেরেশতাদেরকে সিজদাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قَالَ يٰٓإِبْلِيْسُ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ ط أَسْتَكْبَرْتَ أَمْ كُنْتَ مِنَ الْعَالِيْنَ)
“তিনি (আল্লাহ) বললেন: হে ইবলীস! আমি যাকে নিজের দু’হাতে সৃষ্টি করেছি, তাকে সিজদাহ করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি অহঙ্কার করলে, না তুমি শ্রেষ্ঠ মর্যাদাশীলদের একজন?” (সূরা সোয়াদ ৩৮:৭৫)
(أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ)
‘আমি তার অপেক্ষা উত্তম’ অর্থাৎ শয়তান আদম (আঃ)-কে সিজদাহ না করার কারণ পেশ করল: আমি তার থেকে শ্রেষ্ঠ। আমি আগুন দ্বারা সৃষ্ট আর সে মাটি দ্বারা সৃষ্ট। আগুন মাটি থেকে উপরে থাকে। এটা ছিল শয়তানের হিংসা ও অহঙ্কারের বহিঃপ্রকাশ।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: সে ছিল অহঙ্কারী। অহঙ্কার হল সকল ধ্বংসের মূল। ইবলীস প্রথমে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যশীল বান্দা হওয়া সত্ত্বেও পরে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হল।
(أَنْظِرْنِيْ إِلٰي يَوْمِ يُبْعَثُوْنَ)
‘পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও।’ শয়তান বিতাড়িত হবার পর আল্লাহ তা‘আলার কাছে কিয়ামত অবধি আয়ু চাইলে আল্লাহ তা‘আলা তা মেনে নিলেন।
(ثُمَّ لَاٰتِيَنَّهُمْ مِّنْۭ بَيْنِ)
‘অতঃপর আমি তাদের নিকট আসব তাদের সম্মুখ...’ অর্থাৎ শয়তান মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য সামনে, পেছনে, ডান ও বাম দিক দিয়ে আসবে। কিন্তু ওপর দিক থেকে আসতে পারবে না। আর মানুষের কাছে খারাপ অশ্লীল বেহায়াপনাপূর্ণ কাজগুলো চাকচিক্য করে তুলে ধরবে।
আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, জীবিকা নির্বাহের সব উপকরণ দিয়েছেন। এসত্ত্বেও মানুষ আল্লাহ তা‘আলার বিধানমত চলে কিনা তা পরীক্ষার জন্য ইবলীসকে সুযোগ দিয়েছেন। যারা আল্লাহ তা‘আলার কৃতজ্ঞ বান্দা তারা আল্লাহ তা‘আলার পথে অটল থাকবে, তারা মুক্তি পাবে। আর যারা ইবলীসের অনুসরণ করবে আল্লাহ তা‘আলা ইবলীসসহ তাদেরকে জাহান্নামে দিবেন।
(وَقَاسَمَهُمَا)
‘সে তাদের উভয়ের নিকট শপথ করে বলল’ অর্থাৎ শয়তান আদম (আঃ)-এর কাছে আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করে বলল: নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কল্যাণকামী। ঐ গাছের কাছে যেতে আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করেছেন এ কারণে, যাতে তোমরা ফেরেশতা না হয়ে যাও অথবা চিরস্থায়ী না হতে পার। কত বড় মিথ্যুক শয়তান। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে নিষিদ্ধ কাজে জড়িত হবার পর নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম) উভয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল।
(فِيْهَا تَحْيَوْنَ وَفِيْهَا... )
‘সেখানেই তোমরা জীবন যাপন করবে’ যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বললেন:
(مِنْهَا خَلَقْنٰكُمْ وَفِيْهَا نُعِيْدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرٰي)
“আমি মৃত্তিকা হতে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিব এবং তা হতে পুনরায় তোমাদেরকে বের করব।” (সূরা ত্বহা ২০:৫৫) যে শয়তান আদম (আঃ)-এর সুখ সহ্য করতে পারেনি, বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে তাঁকে জান্নাত থেকে বের করেছে সে শয়তান আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ। আমরা যেন কিছুতেই তার কথা শুনে সঠিক পথ না হারাই। এ সম্পর্কে আরো আলোচনা সূরা হিজর-এ আসবে ইনশা-আল্লাহ ।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. শয়তানের অহঙ্কারের কথা অবগত হলাম, অহংকারই ধ্বংসের মূল, এ অহংকারের কারণে মানুষ হক হতে বিচ্যুত ও বঞ্চিত হয়।
২. শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু, তার প্রতিশ্র“তি মিথ্যা, সে ধোঁকা দিয়ে মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে চায়, তাই তার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।
৩. শয়তানের চক্রান্তে পড়ে অন্যায় করলে সঙ্গে সঙ্গে তাওবাহ করা উচিত, এটাই আদম (আঃ)-এর বৈশিষ্ট্য। আর তাওবাহ না করে অপরাধে অটল থাকা শয়তানের কাজ।
৪. মৃত্যুর পর আবার পুনরুত্থান হবে, সেখানে মানুষের ভাল-মন্দ কর্মের প্রতিদান ও প্রতিফল দেয়া হবে তার প্রমাণ পেলাম।
৫. নগ্নতা শয়তানের প্রথম কাজ, সে নগ্নতার মাধ্যমে সমাজে বেহায়াপনা ছড়িয়ে দিতে চায়।
৬. সমাজে অশ্লীল-বেহায়াপনা ও ঝগড়া-বিবাদ ছড়িয়ে দেয়ার জন্য শয়তান নারীদেরকে বড় ধরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: কোন কোন আরবী ব্যাকরণবিদের উক্তি অনুসারে (আরবী)-এই স্থানে (আরবী) শব্দটি অতিরিক্ত এবং একে ইনকার বা অস্বীকৃতির প্রতি গুরুত্ব আরোপের জন্যে আনা হয়েছে। যেমন কোন কবি বলেছেন
(আরবী) এখানে (আরবী) -শব্দটি (আরবী)-এর জন্যে এসেছে এবং একে (আরবী)-এর উপর গুরুত্ব বুঝাবার জন্যে আনা হয়েছে। এখানে যেন (আরবী) শব্দটি অতিরিক্ত। (আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তিটি এর পূর্বেই এসেছে। ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এই যে, (আরবী) অন্য একটি (আরবী) -এর অন্তর্ভুক্ত। যার অর্থ হবে“কোন জিনিসটি তোমাকে বাধ্য করেছিল যে, তুমি সিজদা করবে না, অথচ আমার নির্দেশ বিদ্যমান ছিল?” এ উক্তিটি সবল ও উত্তম। আল্লাহ তাআলাই এসব বিষয়ে সবচেয়ে ভাল জানেন।
ইবলীস উত্তরে বলেছিল-“আমি আদম (আঃ)-এর চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। আর যে শ্রেষ্ঠ সে এমন কাউকে সিজদা করতে পারে না যার উপর তার শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। সুতরাং আমার প্রতি আদম (আঃ)-এর সিজদা করার হুকুম হল কেন?” সে দলীল পেশ করেছিল যে, তাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আগুন হচ্ছে মাটি হতে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন যা দ্বারা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। সে লক্ষ্য করেছে উপাদানের প্রতি, কিন্তু ঐ শরীফ আদম (আঃ)-এর প্রতি লক্ষ্য করেনি যাকে মহান আল্লাহ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার মধ্যে স্বীয় রূহ ভরে দিয়েছেন! সে একটা বিকৃত অনুমান কায়েম করেছে যা মহান আল্লাহর প্রকাশ্য হুকুমের বিরোধী।
মোটকথা, সমস্ত ফেরেস্তা সিজদায় পড়ে গেলেন। ইবলীস সিজদা না করার কারণে ফেরেশতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো এবং আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ে গেল। এই নৈরাশ্য প্রকৃতপক্ষে হচ্ছে তার নিজের ভুলেরই প্রতিফল এবং সে কিয়াস বা অনুমানেও ভুল করেছিল। তার দাবী ছিল এই যে, আগুন মাটি হতে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু মাটির শান হচ্ছে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, নম্রতা এবং কাজে স্থিরতা। তা ছাড়া মাটি হচ্ছে উদ্ভিদ ও লতাপাতা জন্মিবার স্থান। আগুনের শান হচ্ছে পুড়িয়ে দেয়া, ইন্দ্রিয়াবেগ এবং দ্রুততা। ইবলীসের উপাদান তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আর আদম (আঃ)-এর উপাদান রুজু, অপারগতা এবং আনুগত্য স্বীকার করে তার উপকার সাধন করেছিল । হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে, ইবলীসকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অগ্নিশিখা দ্বারা, আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি দ্বারা এবং হ্রদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে যাফরান দ্বারা।” ইবলীস কিয়াস বা অনুমান কায়েমকারী। আর সূর্য ও চন্দ্রের ইবাদতও কিয়াসের উপর ভিত্তি করেই শুরু হয়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।