সূরা আল-আ‘রাফ (আয়াত: 102)
হরকত ছাড়া:
وما وجدنا لأكثرهم من عهد وإن وجدنا أكثرهم لفاسقين ﴿١٠٢﴾
হরকত সহ:
وَ مَا وَجَدْنَا لِاَکْثَرِهِمْ مِّنْ عَهْدٍ ۚ وَ اِنْ وَّجَدْنَاۤ اَکْثَرَهُمْ لَفٰسِقِیْنَ ﴿۱۰۲﴾
উচ্চারণ: ওয়া মা-ওয়াজাদনা-লিআকছারিহিম মিন ‘আহদিওঁ ওয়া ইওঁ ওয়াজাদনা আকছারাহুম লাফা-ছিকীন।
আল বায়ান: আর তাদের অধিকাংশ লোককে আমি অঙ্গীকার রক্ষাকারী পাইনি। বরং তাদের অধিকাংশকে আমি ফাসিক-ই পেয়েছি।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০২. আর আমরা তাদের অধিকাংশকে প্রতিশ্রুতি পালনকারী পাইনি; বরং আমরা তাদের অধিকাংশকে তো ফাসেকই পেয়েছি।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের অধিকাংশকেই আমি প্রতিশ্রুতি পালনকারী পাইনি, বরং অধিকাংশকে ফাসিকই পেয়েছি।
আহসানুল বায়ান: (১০২) আমি তাদের অধিকাংশকে প্রতিশ্রুতি পালনকারীরূপে পাইনি,[1] বরং তাদের অধিকাংশকে সত্যত্যাগী রূপেই পেয়েছি।
মুজিবুর রহমান: আমি তাদের অধিকাংশকে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারীরূপে পাইনি, তবে তাদের অধিকাংশকে পাপাচারী রূপে পেয়েছি।
ফযলুর রহমান: আমি তাদের অধিকাংশকে প্রতিজ্ঞা পালনকারী পাইনি; বরং তাদের অধিকাংশকে অবাধ্য পেয়েছি।
মুহিউদ্দিন খান: আর তাদের অধিকাংশ লোককেই আমি প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়নকারীরূপে পাইনি; বরং তাদের অধিকাংশকে পেয়েছি হুকুম অমান্যকারী।
জহুরুল হক: আর তাদের বেশিরভাগের মধ্যে আমরা প্রতিশ্রুতি পালনের কিছুই পাই নি, বরং তাদের অধিকাংশকে অবশ্যই পেয়েছি ডাহা অসৎকর্মা।
Sahih International: And We did not find for most of them any covenant; but indeed, We found most of them defiantly disobedient.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১০২. আর আমরা তাদের অধিকাংশকে প্রতিশ্রুতি পালনকারী পাইনি; বরং আমরা তাদের অধিকাংশকে তো ফাসেকই পেয়েছি।(১)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ কোন ধরনের অঙ্গীকার পালনের পরোয়াই তাদের নেই। আল্লাহর পালিত বান্দা হবার কারণে জন্মগতভাবে প্রত্যেকটি মানুষ আল্লাহর সাথে যে অংগীকারে আবদ্ধ, তা প্রতিপালনের কোন পরোয়াই তাদের নেই। তারা সামাজিক অঙ্গীকার পালনেরও কোন পরোয়া করে না, মানব সমাজের একজন সদস্য হিসেবে প্রত্যেক ব্যক্তি যার সাথে একটি সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ অন্যদিকে নিজের বিপদ-আপদ ও দুঃখ কষ্টের মুহুর্তগুলোতে অথবা কোন সদিচ্ছা ও মহৎ বাসনা পোষণের মুহুর্তে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর সাথে যে অংগীকারে আবদ্ধ হয়, তাও তারা পালন করে না। এ ধরনের অঙ্গীকার ভঙ্গ করাকে এখানে ফাসেকী বলা হয়েছে। [সা'দী] কোন কোন মুফাসসিরের মতে, এখানে অঙ্গীকার বলে সে অঙ্গীকারই উদ্দেশ্য যা আল্লাহ্ তাআলা আদমের পিঠে মানুষ থেকে নিয়েছিলেন। [আত-তাফসীরুস সহীহ]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১০২) আমি তাদের অধিকাংশকে প্রতিশ্রুতি পালনকারীরূপে পাইনি,[1] বরং তাদের অধিকাংশকে সত্যত্যাগী রূপেই পেয়েছি।
তাফসীর:
[1] এখান থেকে কেউ কেউ ‘রূহ’ বা আত্মা-জগতে যে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল, তা বুঝিয়েছেন। আবার কেউ বলেন, আযাব বা শাস্তি দূর করার জন্য নবীদের সঙ্গে তারা যে অঙ্গীকার করত, তা বুঝানো হয়েছে। আবার কেউ সাধারণ অঙ্গীকার অর্থ নিয়েছেন; যা তারা এক অপরের সঙ্গে করত। এই অঙ্গীকার ভঙ্গ যে ধরণের হোক, তা ফিসক (পাপাচার) বলে গণ্য।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০১-১০২ নং আয়াতের তাফসীরঃ
আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাঃ)-এর কাছে নূহ, হূদ, সালেহ, লূত এবং শু‘য়াইব (আঃ) ও তাদের সম্প্রদায়ের ঘটনা বর্ণনা করলেন এ উম্মাতকে শিক্ষা দেয়ার জন্য। তাদের কাছে রাসূলগণ হিদায়াতের বাণী নিয়ে এসেছিলেন কিন্তু তারা ঈমান না আনার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। অতএব যারা তাদের পথ অবলম্বন করবে তাদের পরিণতিও তা-ই হবে। আর নাবী (সাঃ)-এর অন্তরকে মজবুত করার জন্য, যাতে জাতির কাছে দাওয়াত দিতে কষ্টের সম্মুখীন হয়ে মনোবল হারিয়ে না ফেলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَکُلًّا نَّقُصُّ عَلَیْکَ مِنْ اَنْۭبَا۬ئِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِھ۪ فُؤَادَکَﺆ وَجَا۬ءَکَ فِیْ ھٰذِھِ الْحَقُّ وَمَوْعِظَةٌ وَّذِکْرٰی لِلْمُؤْمِنِیْنَ )
“রাসূলদের যে সকল বৃত্তান্ত আমি তোমার নিকট বর্ণনা করছি, যা দ্বারা আমি তোমার হৃদয়কে দৃঢ় করি, এর মাধ্যমে তোমার নিকট এসেছে সত্য এবং মু’মিনদের জন্য এসেছে উপদেশ ও সাবধান বাণী।” (সূরা হূদ ১১:১২০)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. পূর্ববর্তী জাতির ঘটনা বর্ণনা করায় শরীয়তের মূলনীতি জানা যায়।
২. নাবী (সাঃ)-এর সত্যতার প্রমাণ এবং তিনি গায়েবও জানতেন না তারও প্রমাণ পেলাম, তিনি পূর্ববর্তী জাতির সকল সংবাদ জেনেছেন ওয়াহীর মাধ্যমে।
৩. পূর্ববর্তী নাবীদের সাথে তাদের জাতিরা কী আচরণ করেছিল তা জানা গেল।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১০১-১০২ নং আয়াতের তাফসীর:
নূহ (আঃ), হূদ (আঃ), সালিহ্ (আঃ), লূত (আঃ) ও শশাআ’ইব (আঃ)-এর কওমের ধ্বংস সাধন, মুমিনদেরকে রক্ষাকরণ, রাসূলদের মাধ্যমে মু'জিযা ও দলীল প্রমাণাদি পেশ করতঃ হুজ্জত পূর্ণকরণ ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনা দেয়ার পর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! ঐ বস্তিগুলোর অবস্থার কথা আমি তোমাকে শুনিয়ে দিচ্ছি। তাদের কাছে নবী রাসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী নিয়ে আগমন করেছিল। আমি তো রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে হুজ্জত পূর্ণ করা ছাড়া কখনও কাউকে শাস্তি প্রদান করি না। এটা হচ্ছে ঐ বস্তিগুলোর ঘটনা যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো এখনও বিদ্যমান রয়েছে এবং কতকগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি এটা করে তাদের উপর অত্যাচার করিনি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের উপর অত্যাচার করেছিল। এজন্যে তারা নিজেরাই দায়ী।
(আরবী) অর্থাৎ পূর্বে তারা যা প্রত্যাখ্যান করেছিল তার প্রতি তারা ঈমান আনবার ছিল না। (আরবী) -এর (আরবী) অক্ষরটি হচ্ছে কারণ প্রকাশক। অর্থাৎ অহীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কারণে তারা ঈমান আনয়ন করার হকদারই থাকলো না। যেমন অন্যত্র তিনি বলেনঃ “তোমরা তো জানই যে, মু'জিযা পেশ করলেও এরা ঈমান আনবে না।” এ জন্যেই এখানে তিনি বলেনঃ “এভাবেই আল্লাহ অবিশ্বাসীদের অন্তঃকরণের উপর মোহর লাগিয়ে দেন।
আমি তাদের অধিকাংশকে অর্থাৎ পূর্ববর্তী উম্মতের অধিকাংশকে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারীরূপে পাইনি, বরং অধিকাংশকে পাপাচারীরূপে পেয়েছি। তারা ছিল আনুগত্য স্বীকার ও হুকুম মেনে চলার বহির্ভূত। এটা ছিল ঐ অঙ্গীকার যা রোযে আযলে আল্লাহ তা'আলা তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন। ওরই উপর তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে এবং ঐ কথাটিই তাদের প্রকৃতি ও স্বভাবের মধ্যেও রাখা হয়েছে। সেই অঙ্গীকার ছিল এই-আল্লাহই হচ্ছেন তাদের প্রতিপালক ও মালিক। তিনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। এটা তারা স্বীকার করেও নিয়েছিল এবং সাক্ষ্য প্রদানও করেছিল। কিন্তু পরে তারা এর বিরুদ্ধাচরণ করতঃ ঐ অঙ্গীকারকে পৃষ্ঠ-পিছনে নিক্ষেপ করে এবং আল্লাহর সাথে অন্যদেরকেও শরীক করতে শুরু করে, যার না আছে কোন দলীল, না আছে। কোন ইজ্জত। এটা জ্ঞান ও শরীয়ত উভয়েরই পরিপন্থী । নিষ্কলুষ প্রতি তো এই প্রতিমা পূজাকে সমর্থন করে না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত নবী ও রাসূল এই প্রতিমা পূজা থেকে মানুষকে বিরত রেখেছেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে। যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বান্দাদেরকে মূর্তিপূজা থেকে পৃথক করে সৃষ্টি করেছিলাম। অতঃপর শয়তান এসে তাদেরকে সত্য দ্বীন থেকে সরিয়ে দেয় এবং আমি যা কিছু হালাল করেছিলাম তা তারা হারাম করে নেয়।` সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক সন্তান স্বীয় ইসলামী প্রকৃতির উপর সৃষ্ট হয় । কিন্তু তার (ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টান) পিতামাতাই তাকে ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টান অথবা মাজুসী বানিয়ে দেয়।” আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সম্মানিত গ্রন্থে বলেনঃ “আমি তোমাদের পূর্বে যতজন নবী পাঠিয়েছি তারা সবাই (আরবী)-এর তলকীন করতে থেকেছে।” ইরশাদ হচ্ছে- হে মুহাম্মাদ (সঃ!)। তোমার পূর্বে আমি যে রাসূলদেরকে পাঠিয়েছিলাম তাদেরকে আমি জিজ্ঞেস করবো- আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও কি উপাসনার যোগ্য বলা হয়েছিল? আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “প্রত্যেক কওমের কাছে রাসূল পাঠিয়ে আমি বলেছিলাম- তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং তাগুত ও শয়তান থেকে দূরে থাকবে।”
এই ধরনের বহু আয়াত রয়েছে। (আরবী) -এই আয়াত সম্পর্কে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, অঙ্গীকার গ্রহণের দিন বান্দাগণ আল্লাহর একত্ববাদকে যে স্বীকার করে নিয়েছিল তা আল্লাহর গোচরে রয়েছে। এজন্যে আল্লাহর ইলমের ভিত্তিতেই তারা ঈমান আনছে না এবং এটাই হতে রয়েছে যে, দলীল প্রমাণাদি সামনে থাকা সত্ত্বেও তারা ঈমান আনছে না, যদিও তারা অঙ্গীকার গ্রহণের দিন ঈমান কবুল করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা জানতেন যে, ওটা তাদের আন্তরিকতার সাথে ছিল না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি তাদেরকে দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয় তবে পুনরায় তারা মূর্তিপূজা, শিরক ও পাপকার্য করতে থাকবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।