সূরা আল-মুরসালাত (আয়াত: 41)
হরকত ছাড়া:
إن المتقين في ظلال وعيون ﴿٤١﴾
হরকত সহ:
اِنَّ الْمُتَّقِیْنَ فِیْ ظِلٰلٍ وَّ عُیُوْنٍ ﴿ۙ۴۱﴾
উচ্চারণ: ইন্নাল মুত্তাকীনা ফী জিলালিওঁ ওয়া‘উয়ূন।
আল বায়ান: নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে ছায়া ও ঝর্ণাবহুল স্থানে,
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪১. নিশ্চয় মুত্তাকীরা(১) থাকবে ছায়ায় ও প্রস্রবণ বহুল স্থানে,
তাইসীরুল ক্বুরআন: মুত্তাকীরা থাকবে ছায়া আর ঝর্ণাধারার মাঝে,
আহসানুল বায়ান: (৪১) আল্লাহ-ভীরুরা থাকবে ছায়া[1] ও ঝরনাসমূহে।
মুজিবুর রহমান: মুত্তাকীরা থাকবে ছায়ায় ও প্রস্রবণ বহুল স্থানে।
ফযলুর রহমান: মোত্তাকীরা থাকবে ছায়া ও ঝরনার মধ্যে
মুহিউদ্দিন খান: নিশ্চয় খোদাভীরুরা থাকবে ছায়ায় এবং প্রস্রবণসমূহে-
জহুরুল হক: নিশ্চয় ধর্মভীরুরা থাকবে স্নিগ্ধছায়ায় ও ফোয়ারাগুলোতে,
Sahih International: Indeed, the righteous will be among shades and springs
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪১. নিশ্চয় মুত্তাকীরা(১) থাকবে ছায়ায় ও প্রস্রবণ বহুল স্থানে,
তাফসীর:
(১) মুত্তাকী শব্দ বলে এখানে সেসব লোকদের বুঝানো হয়েছে যারা আখেরাতকে মিথ্যা বলে অস্বীকার করা থেকে বিরত থেকেছে এবং আখেরাতকে মেনে নিয়ে এ বিশ্বাসে জীবন যাপন করেছে যে, আখেরাতে আমাদেরকে নিজেদের কথাবার্তা, কাজ-কর্ম এবং স্বভাব চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। তাই কথাবার্তা, কাজকর্মে সত্যবাদিতার প্রমাণ রেখেছে এবং তারা ফরয ও ওয়াজিব সঠিক মত আদায় করেছে। [দেখুন: সা’দী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪১) আল্লাহ-ভীরুরা থাকবে ছায়া[1] ও ঝরনাসমূহে।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, বৃক্ষাদি এবং অট্টালিকার ছায়া। মুশরিকদের ন্যায় আগুনের ধোঁয়ার ছায়া হবে না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪১-৫০ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলার প্রিয় বান্দা মুত্তাকীদের জন্য আখিরাতে প্রস্তুত রাখা নেয়ামত সম্ভারের সুসংবাদ প্রদান করছেন। তারপর তাঁর শত্র“দের ধমক দিয়ে ক্ষণিকের জন্য দুনিয়ার ভোগ করার অবকাশ দিয়ে বলছেন- এরপর তোমরা কোন্ কিতাবের প্রতি ঈমান আনবে?
(فِيْ ظِلٰلٍ وَّعُيُوْنٍ)
অর্থাৎ জান্নাতীরা বৃক্ষাদি ও অট্টালিকার সুশীতল ছায়ার ও ঝরণাবিশিষ্ট জান্নাতে থাকবে। জাহান্নামীরা যে ধোঁয়ার ছায়ায় থাকবে তার বিপরীত। এভাবে যারা আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের প্রতি যতœবান ও তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়ার্দ্র তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা প্রতিদান দিয়ে থাকেন।
(كُلُوْا وَتَمَتَّعُوْا قَلِيْلًا إِنَّكُمْ مُّجْرِمُوْنَ)
যারা আখিরাতকে অস্বীকার করে তাদেরকে ধমকসহকারে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন : তোমরা স্বল্পদিনের দুনিয়ায় খেয়ে-দেয়ে আনন্দ ভোগ করে নাও, কিন্তু আখিরাতে তোমাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জাহান্নাম। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(نُمَتِّعُهُمْ قَلِيْلًا ثُمَّ نَضْطَرُّهُمْ إِلٰي عَذَابٍ غَلِيْظٍ)
“আমি অল্প সময়ের জন্য তাদেরকে সুখ-সম্ভোগ দেব, পুনরায় তাদেরকে বাধ্য করব কঠিন শাস্তি ভোগ করতে।” (সূরা লুকমান ৩১ : ২৪)
(وَإِذَا قِيْلَ لَهُمُ ارْكَعُوْا)
অর্থাৎ দুনিয়াতে যখন এসকল কাফিরদেরকে জামাতে সালাত আদায় করার কথা বলা হত তখন তারা কর্ণপাত করত না বরং অহংকারবশত তা ত্যাগ করত। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
( وَيْلٌ يَّوْمَئِذٍ لِّلْمُكَذِّبِيْنَ) ‘সেদিন ধ্বংস মিথ্যা আরোপকারীদের জন্য।”
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(فَبِاَیِّ حَدِیْثٍۭ بَعْدَھ۫ یُؤْمِنُوْنَ)
অর্থাৎ যদি এ কুরআনের প্রতি ঈমান না আনে তাহলে আর কোন্ কিতাব আছে যার প্রতি ঈমান আনবে? এখানে হাদীস দ্বারা কুরআনকে বুঝানো হয়েছে।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন :
(تِلْکَ اٰیٰتُ اللہِ نَتْلُوْھَا عَلَیْکَ بِالْحَقِّﺆ فَبِاَیِّ حَدِیْثٍۭ بَعْدَ اللہِ وَاٰیٰتِھ۪ یُؤْمِنُوْنَ)
“এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি তোমার নিকট তেলাওয়াত করছি যথাযথভাবে; সুতরাং আল্লাহ এবং তাঁর আয়াতের পরে তারা আর কোন্ বাণীতে বিশ্বাস করে।” (সূরা জাসিয়া ৪৫ : ৬)
(فَبِاَیِّ حَدِیْثٍۭ بَعْدَھ۫ یُؤْمِنُوْنَ)
‘সুতরাং তারা এর পরিবর্তে আর কোন্ কথায় বিশ্বাস করবে?’ অর্থাৎ তারা বিশ্বাস করবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. পুনরুত্থান, আমলের প্রতিদান ইত্যাদির স্বীকৃতি পেলাম।
২. মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত রাখা নেয়ামতের কথা জানতে পারলাম।
৩. আখিরাত অস্বীকারকারীদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম।
৪. যদি কোন ব্যক্তি মাসজিদে প্রবেশ করে এমতাবস্থায় মাসজিদে সালাত আদায় হচ্ছে তাহলে সে ব্যক্তিও সালাতে শরীক হবে যদিও সে উক্ত সালাত পূর্বে আদায় করেছে।
৫. কুরআনকে আল্লাহ তা‘আলা অত্র সূরার শেষ আয়াতে হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪১-৫০ নং আয়াতের তাফসীর
উপরে অসৎ লোকদের শাস্তির বর্ণনা দেয়া হয়েছে, এখন এখানে সৎকর্মশীলদের পুরস্কারের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যারা মুত্তাকী ও পরহেযগার ছিল, আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে সদা লিপ্ত থাকতো, ফারায়েয ও ওয়াজেবাতের পাবন্দ থাকতো, আল্লাহর নাফরমানী ও হারাম কার্যাবলী হতে বেঁচে থাকতো, তারা কিয়ামতের দিন জান্নাতে থাকবে। এখানে নানা প্রকারের নহর জারী রয়েছে। পাপী ও অপরাধীরা কালো ও দুর্গন্ধময় ধূম্রের মধ্যে পরিবেষ্টিত থাকবে। আর পুণ্যবানরা জান্নাতের ঘন, ঠাণ্ডা ও পরিপূর্ণ ছায়ায় আরামে শুয়ে থাকবে। তাদের সামনে দিয়ে নির্মল প্রস্রবণ প্রবাহিত হবে। বিভিন্ন প্রকারের ফল-ফলাদি ও তরি-তরকারী বিদ্যমান থাকবে যেটা খাবার মন চাইবে খেতে পারবে। কোন বাধা প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। না কমে যাবার ভয় থাকবে, না ধ্বংস, না শেষ হয়ে যাবার আশংকা থাকবে। তারপর উৎসাহ বাড়াবার জন্যে ও মনের খুশী বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বার বার বলবেনঃ হে আমার প্রিয় বান্দারা! হে জান্নাত বাসীরা! তোমরা মনের আনন্দে তৃপ্তির সাথে পানাহার করতে থাকো। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। হ্যাঁ, তবে মিথ্যা আরোপকারীদের জন্যে আজ বড়ই দুর্ভোগ!
এরপর অবিশ্বাসকারীদেরকে ধমকের সুরে বলা হচ্ছেঃ তোমরা পানাহার কর ও ভোগ করে নাও অল্প কিছু দিন, তোমরা তো অপরাধী। সুতরাং সত্বরই এসব নিয়ামত শেষ ও ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তোমাদেরকে মৃত্যুর ঘাটে অবতরণ করতে হবে। অতঃপর পরিণামে তোমরা জাহান্নামেই যাবে। তোমাদের দুষ্কর্ম ও অন্যায় কার্যকলাপের শাস্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট তৈরী রয়েছে। পাপীরা তাঁর দৃষ্টির অন্তরালে নেই। যারা কিয়ামতকে বিশ্বাস করে না, তাঁর নবী (সঃ)-কে মানে না এবং তাঁর ওহীকে অবিশ্বাস করে, তারা কিয়ামতের দিন কঠিন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের জন্যে বড়ই দুর্ভোগ! যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “অল্প কিছুদিন আমি তাদেরকে সুখ ভোগ করতে দিবো, অতঃপর তাদেরকে আমি কঠিন শাস্তির দিকে আসতে বাধ্য করবো” (৩১:২৪) অন্য এক জায়গায় আল্লাহ্ পাক বলেনঃ (আরবী)
অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে তারা সফলকাম হয়। দুনিয়ায় তারা সামান্য কয়েক দিন সুখ ভোগ করবে মাত্র, অতঃপর আমার নিকটই তাদের প্রত্যাবর্তন স্থল। তাদের কুফরীর কারণে আমি তাদেরকে কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।” (১০:৬৯-৭০)
এরপর মহা মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই অজ্ঞ অস্বীকারকারীদেরকে যখন বলা হয়ঃ তোমরা আল্লাহর সামনে নত হয়ে যাও, জামাআতের সাথে নামায আদায় কর, তখন তা হতেও তারা বিমুখ হয়ে যায় এবং ওটাকে ঘৃণার চক্ষে দেখে ও অহংকারের সাথে অস্বীকার করে বসে। এই মিথ্যা আরোপকারীদের জন্যে কিয়ামতের দিন বড়ই দুর্ভোগ ও বিপদ রয়েছে।
এরপর মহান আল্লাহ্ বলেনঃ এ লোকগুলো যখন এই পাক কালামের উপর ঈমান আনয়ন করছে না তখন আর কোন্ কালামের উপর তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে! যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ তারা আল্লাহর উপর ও তার আয়াতসমূহের উপর যখন ঈমান আনছে তখন আর কোন্ কালামের উপর তারা ঈমান আনয়ন করবে!” (৪৫:৬)
মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি (আরবি) সূরাটি পাঠ করবে এবং (আরবি)-এ আয়াতটিও পড়বে তখন সে যেন বলেঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি আল্লাহর উপর এবং তিনি যা অবতীর্ণ করেছেন তার উপর ঈমান এনেছি”। এ হাদীসটি সূরা কিয়ামাহর তাফসীরে গত হয়েছে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।