সূরা আল-জ্বিন (আয়াত: 26)
হরকত ছাড়া:
عالم الغيب فلا يظهر على غيبه أحدا ﴿٢٦﴾
হরকত সহ:
عٰلِمُ الْغَیْبِ فَلَا یُظْهِرُ عَلٰی غَیْبِهٖۤ اَحَدًا ﴿ۙ۲۶﴾
উচ্চারণ: ‘আ-লিমুলগাইবি ফালা-ইউজহিরু ‘আলা- গাইবিহীআহাদা-।
আল বায়ান: তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী, আর তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৬. তিনিই গায়েবী বিষয়ের জ্ঞানী, তিনি তাঁর গায়েবের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না(১),
তাইসীরুল ক্বুরআন: একমাত্র তিনিই অদৃশ্যের জ্ঞানী, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না।
আহসানুল বায়ান: (২৬) তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না।
মুজিবুর রহমান: তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারও নিকট প্রকাশ করেননা –
ফযলুর রহমান: তিনি গায়েব (অদৃশ্যের খবর) জানেন এবং স্বীয় গায়েবের খবর কারো কাছে প্রকাশ করেন না,
মুহিউদ্দিন খান: তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী। পরন্ত তিনি অদৃশ্য বিষয় কারও কাছে প্রকাশ করেন না।
জহুরুল হক: তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তাই কারো কাছে তিনি তাঁর রহস্য প্রকাশ করেন না, --
Sahih International: [He is] Knower of the unseen, and He does not disclose His [knowledge of the] unseen to anyone
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৬. তিনিই গায়েবী বিষয়ের জ্ঞানী, তিনি তাঁর গায়েবের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না(১),
তাফসীর:
(১) এখানে আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলকে আদেশ করেছেন যে, যেসব অবিশ্বাসী আপনাকে কেয়ামতের নির্দিষ্ট দিন তারিখ বলে দেয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে তাদেরকে বলে দিন, কেয়ামতের আগমন ও হিসাব নিকাশ নিশ্চিত; কিন্তু তার নির্দিষ্ট দিন তারিখ আল্লাহ্ তা'আলা কাউকে বলেন নি। তাই আমি জানি না কেয়ামতের দিন আসন্ন, না আমার রব এর জন্যে দীর্ঘ মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দিবেন। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৬) তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৫-২৮ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন- বলে দাও, তোমাদের ওপর যে শাস্তি আপতিত হওয়ার বা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার প্রতিশ্র“তি দেওয়া হয়েছে তা কি অচিরেই আসবে না বিলম্ব হবে, তা আমি জানি না। এ জ্ঞান আল্লাহ তা‘আলার কাছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময়কাল সম্পর্কে জিবরীল (আঃ) জিজ্ঞাসা করলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন :
مَا المَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ
এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে বেশি জানে না। (সহীহ বুখারী হা. ৫০, সহীহ মুসলিম হা. ৮)
অন্যত্র তিনি বলেন : হে আদম সন্তান! যদি তোমরা বুদ্ধিমান হও তাহলে নিজেদেরকে মৃতদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য কর। ঐ সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ তোমাদের যে প্রতিশ্র“তি দেওয়া হয়েছে তা অবশ্যই আসবে। (সিলসিলা যঈফাহ হা. ৪৯৭৭, যঈফ)
(إِلَّا مَنِ ارْتَضٰي مِنْ رَّسُوْلٍ)
অর্থাৎ গায়েবের খবর আল্লাহ তা‘আলা মনোনীত রাসূল ছাড়া অন্য কাউকে জানান না। রাসূলদেরকে যতটুকু জানান তারা কেবল ততটুকুই জানতে পারেন, এর বেশি না। তবে যখন গায়েবের খবর তাদের কাছে প্রদান করেন তখন সামনে পেছনে অনেক ফেরেশতা প্রহরী নিযুক্ত থাকে যাতে কোন জিন শয়তান তা না জানতে পারে।
لِّيَعْلَمَ এর সর্বনাম কার দিকে ফিরে গেছে তা নিয়ে মুফাসসিরগণের মাঝে মতামত রয়েছে : কেউ বলেছেন, রাসূলের দিকে। অর্থাৎ যাতে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জেনে যান যে, পূর্বের নাবীগণও আল্লাহ তা‘আলার পয়গাম তাঁর মত পৌঁছে দিয়েছেন। অথবা ফেরেশতা, অর্থাৎ যাতে ফেরেশতারা জেনে নেন যে, তারা রাসূলদের নিকট আল্লাহ তা‘আলার বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। কেউ বেলেছেন : এর সর্বনাম আল্লাহ তা‘আলার দিকে গেছে। অর্থ হল : আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁর নাবীদের হেফাযত করেন, যাতে তারা নবুওয়াতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। এছাড়া নাবীদের প্রতি নাযিলকৃত
ওয়াহীও হেফাযত করেন যাতে তিনি জেনে নেন যে, নাবীরা তাঁর পয়গাম মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন।
(وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ)
অর্থাৎ ফেরেশতা বা নাবীদের নিকট যা আছে (তথা ওয়াহীর যে জ্ঞান দান করেছেন) সব আল্লাহ তা‘আলার জ্ঞানায়ত্ত। তিনি সব কিছু হিসাব করে রাখেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. গায়েবের খবর একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জানেন। কোন নৈকট্যশীল ফেরেশতা বা নাবী রাসূলগণও জানেন না, পীর-গাউছ-কুতুব তো দূরের কথা। তবে আল্লাহ তা‘আলা নাবী-রাসূলদের যতটুকু জানান তাঁরা কেবল ততটুকুই জানতে পারে।
২. আল্লাহ তা‘আলা তাঁর জ্ঞান দ্বারা সব কিছু বেষ্টন করে আছেন, কোন কিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৫-২৮ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি জনগণকে বলে দাওঃ কিয়ামত কখন হবে এ জ্ঞান আমার নেই। এমন কি ওর সময় নিকটবর্তী কি দূরবর্তী এটাও আমার জানা নেই। অধিকাংশ মূখ ও অজ্ঞ লোকের মধ্যে যে এটা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যমীনের ভিতরের জিনিসেরও খবর রাখেন, এটা যে সম্পূর্ণ ভুল কথা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হলো এই আয়াতে কারীমাটি। এই রিওয়াইয়াতের কোন মূল ভিত্তিই নেই। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথা। আমরা এটা কোন কিতাবে পাইনি। হ্যাঁ, এর বিপরীতটা পরিষ্কারভাবে সাব্যস্ত আছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে যখন জিজ্ঞেস করা হতো তখন তিনি তার না জানার কথা প্রকাশ করতেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) গ্রাম্য লোকের রূপ ধরে তার নিকট এসে তাঁকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি তাঁকে পরিষ্কারভাবে উত্তর দিয়েছিলেন যে, এর জ্ঞান যেমন জিজ্ঞেসকারীর নেই তেমনই জিজ্ঞাসিত ব্যক্তিরও নেই।
অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, একজন গ্রাম্য লোক উচ্চস্বরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামত কখন হবে?` উত্তরে তিনি বলেনঃ “কিয়ামত তো অবশ্যই হবে, এখন তুমি এর জন্যে কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তা বল দেখি?” লোকটি বললোঃ “আমার কাছে রোযা নামাযের আধিক্য নেই, তবে এটা সত্য যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে ভালবাসী।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি যাকে ভালবাস তার সাথেই তুমি থাকবে।` হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, মুসলমানরা এ হাদীস শুনে যতো বেশী খুশী হয়েছিল অন্য হাদীস শুনে ততো বেশী খুশী হয়নি। এ হাদীস দ্বারাও জানা গেল যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জানা ছিল না।
মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, এই উম্মতকে আল্লাহ অর্ধদিন পর্যন্ত অবকাশ দিবেন।` অন্য একটি রিওয়াইয়াতে এটুকু বেশী রয়েছে যে, হযরত সা'দ (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়ঃ “অর্ধদিন দ্বারা উদ্দেশ্য কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পাঁচশ বছর।
এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহ অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না, তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। যেমন আল্লাহ তা’আলার উক্তিঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যা তিনি ইচ্ছা করেন তদ্ব্যতীত তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত্ব করতে পারে না।”(২:২৫৫) মানুষের মধ্য থেকেই হোক বা দানবের মধ্য থেকেই হোক, যাকে আল্লাহ যেটুকু চান অবহিত করে থাকেন। আবার এর আরো বিশেষত্ব এই যে, তার হিফাজত এবং সাথে সাথে এই ইলমের প্রসারের জন্যে যা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন, তার আশেপাশে সদা রক্ষক ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন।
(আরবি) বা (আরবি) সর্বনামটি কারো কারো মতে নবী (সঃ)-এর দিকে ফিরেছে। অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর সামনে ও পিছনে চারজন ফেরেশতা থাকতেন, যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, তারা তাদের প্রতিপালকের পয়গাম সঠিকভাবে তার নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। আবার কারো কারো মতে, এর (আরবি) টি আহলে শিরকের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ পালাক্রমে আগমনকারী ফেরেশতারা আল্লাহর নবী (সঃ)-কে শয়তান হতে ও তাঁর অনিষ্ঠ হতে রক্ষা করেন, যাতে আহলে শিরক জানতে পারে যে, রাসূলগণ আল্লাহর রিসালাত আদায় করেছেন। অর্থাৎ রাসূলদেরকে অবিশ্বাসকারীরাও যেন তাদের রিসালাতকে জেনে নেয়। কিন্তু এতে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। ইয়াকূব (রঃ)-এর কিরআত পেশের সাথে রয়েছে। অর্থাৎ জনগণ যেন জেনে নেয় যে, রাসূলগণ তাবলীগ করেছেন। আর সম্ভবতঃ ভাবার্থ এও হবে যে, যেন আল্লাহ জেনে নেন। অর্থাৎ তিনি তাঁর ফেরেশতাদেরকে পাঠিয়ে তাঁর রাসূলদের হিফাযত করে থাকেন, যেন তারা রিসালাত আদায় করতে পারেন ও ওহীর হিফাজত করতে পারেন। আর যেন আল্লাহ তা'আলা জেনে নেন যে, তাঁরা রিসালাত আদায় করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তুমি এ যাবৎ যে কিবলা অনুসরণ করছিলে ওকে আমি এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যাতে জানতে পারি কে রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণ করে এবং কে ফিরে যায়?` (২:১৪৩) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন ঈমানদারদেরকে এবং মুনাফিকদেরকে।”(২৯:১১) এই ধরনের আরো আয়াতসমূহ রয়েছে। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তো প্রথম হতেই জানেন, কিন্তু তা তিনি প্রকাশ করেও জেনে নেন। এই জন্যেই এখানে এর পরেই বলেন যে, তিনি সবকিছুরই বিস্তারিত হিসাব রাখেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।