সূরা নূহ (আয়াত: 3)
হরকত ছাড়া:
أن اعبدوا الله واتقوه وأطيعون ﴿٣﴾
হরকত সহ:
اَنِ اعْبُدُوا اللّٰهَ وَ اتَّقُوْهُ وَ اَطِیْعُوْنِ ۙ﴿۳﴾
উচ্চারণ: আনি‘বুদুল্লা-হা ওয়াত্তাকূহু ওয়া আতী‘ঊন।
আল বায়ান: যে, তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর, তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. এ বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাঁর তাকওয়া অবলম্বন কর, আর আমার আনুগত্য কর(১);
তাইসীরুল ক্বুরআন: এ বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর, তাঁকেই ভয় কর, আর আমার কথা মান্য কর।
আহসানুল বায়ান: (৩) (এই বিষয়ে যে,) তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর[1] ও তাঁকে ভয় কর[2] এবং আমার আনুগত্য কর;[3]
মুজিবুর রহমান: এ বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।
ফযলুর রহমান: তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো;
মুহিউদ্দিন খান: এ বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহ তা’আলার এবাদত কর, তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।
জহুরুল হক: "এ বিষয়ে যে তোমরা আল্লাহ্র উপাসনা করো ও তাঁকে ভয়-ভক্তি করো, আর আমাকে মেনে চলো।
Sahih International: [Saying], 'Worship Allah, fear Him and obey me.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩. এ বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাঁর তাকওয়া অবলম্বন কর, আর আমার আনুগত্য কর(১);
তাফসীর:
(১) নূহ আলাইহিস সালাম তার রিসালাতের দায়িত্ব পালনের শুরুতেই তার জাতির সামনে তিনটি বিষয় পেশ করেছিলেন। এক, আল্লাহর দাসত্ব, দুই, তাকওয়া বা আল্লাহভীতি এবং তিন, রাসূলের আনুগত্য। প্রথমেই ছিল আল্লাহর অবাধ্যতা না করার আহবান, কারণ তাঁর অবাধ্য হলে আযাব অনিবাৰ্য। তারপর তাকওয়ার আহবান। যার মাধ্যমে রাসূলকে মেনে নিয়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করার আহবান রয়েছে। তারপর রয়েছে রাসূলের আনুগত্যের আহবান। তিনি যা করতে আদেশ করেন তাই করা যাবে আর যা করতে নিষেধ করেন তা-ই ত্যাগ করতে হবে। [মুয়াস্সার]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩) (এই বিষয়ে যে,) তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর[1] ও তাঁকে ভয় কর[2] এবং আমার আনুগত্য কর;[3]
তাফসীর:
[1] এবং তোমরা শিরক ত্যাগ কর। কেবলমাত্র এক আল্লাহরই ইবাদত কর।
[2] আল্লাহর অবাধ্যতা করা হতে দূরে থাক। কারণ এই অবাধ্যতার জন্য তোমরা আল্লাহর শাস্তিযোগ্য বিবেচিত হতে পার।
[3] অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে যে কথার আদেশ করব, তাতে তোমরা আমার আনুগত্য কর। কেননা, আমি আল্লাহর পক্ষ হতে রসূল ও তাঁর বার্তাবাহক হয়ে তোমাদের কাছে প্রেরিত হয়েছি।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: সূরার নামকরণ ও নূহ (আঃ)-এর পরিচয় :
(نوح) নূহ (আঃ) উলূল আযম নাবীদের অন্যতম। আদম (আঃ) ও নূহ (আঃ)-এর মাঝে দশ শতাব্দীর ব্যবধান ছিল। তিনি আদম (আঃ)-এর দশম বা অষ্টম অধঃস্তন পুরুষ। তিনি ‘আবুল বাশার সানী’ (ابو البشر الثاني) বা ‘মানব জাতির দ্বিতীয় পিতা’ বলে খ্যাত। তাঁর দাওয়াতে ঈমান আনয়নকারী মু’মিন নর-নারী সবাই প্লাবনের সময় নৌকারোহণের মাধ্যমে নাজাত পায়। নাজাত পাওয়া মু’মিন নর-নারীর মাধ্যমে পৃথিবীতে নতুনভাবে আবাদ শুরু হয় এবং তিনি তাদেরকে সত্যের পথে পরিচালিত করেন। এজন্য তাঁকে ‘মানব জাতির দ্বিতীয় পিতা’ বলা হয়।
তাঁর বংশনামা হল নূহ বিন লামেক বিন মুতাওয়াসসিলাক বিন আখনূন (ইদরীস (আঃ)) বিন ইয়ারিদ বিন মাহলাইক বিন আনূশ বিন কাইনান বিন শীশ বিন আদম (আঃ)। ওহাব বিন মুনাব্বাহ বলেন : এরা সকলেই মু’মিন ছিলেন। পৃথিবীর বুকে তিনিই সর্বপ্রথম রাসূল, তাঁকে সমগ্র পৃথিবীবাসীর জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। এজন্য যখন মানুষ তার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছে তখন আল্লাহ তা‘আলা সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন (কুরতুবী)। তিনি ৯৫০ বছর ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেছেন। তাঁর চারজন পুত্রের (যথা- সাম, হাম, ইয়াফিস ও ইয়াম অথবা কেন‘আন) মধ্যে কেন‘আন ব্যতীত সবাই ঈমান আনে। নূহ (আঃ)-এর নাম এ সূরার প্রথম আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখান থেকেই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। তাছাড়া সম্পূর্ণ সূরায় কেবল নূহ (আঃ) ও তাঁর জাতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আলোচ্য সূরায় আদ্যপান্ত নূহ (আঃ)-এর কিসসা ও তাঁর জাতির করূন অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। পৃথিবীর বুকে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতে গিয়ে কত ধরনের অভিজ্ঞতা একজন মানুষের হতে পারে তার বাস্তব চিত্র সূরার মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে। এরপর বিশেষ একটি সময়ের অবস্থাকে তুলে ধরে স্থায়ীভাবে জাহিলিয়াতরূপী কঠিন রোগটির চিকিৎসা সম্পর্কেও এখানে জানানো হয়েছে। এ বর্ণনার মধ্য দিয়ে এটাও জানানো হয়েছে যে, ভাল-মন্দের মধ্যে সংঘর্ষ এক চিরন্তন ব্যাপার।
নূহ (আঃ)-এর যুগে সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা :
আদম (আঃ)-এর সময়ে ঈমানের সাথে শির্ক ও কুফরের মোকাবেলা ছিল না। তখন তারা সবাই তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। (সূরা বাকারাহ ২ : ২১৩) নূহ (আঃ)-এর জাতিই পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম শির্কে লিপ্ত হয়। তাও ছিল তাদের মধ্যে সৎ ব্যক্তিদেরকে কেন্দ্র করে। এ সূরার ২৩ নম্বর আয়াতে পাঁচজন সৎ ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে। যথা- ওয়াদ, সুওয়াআ, ইয়াগূজ, ইয়াউক ও নাসার। এরা সবাই সৎব্যক্তি ছিলেন, তাদের মৃত্যুর পর শয়তানের প্ররোচনায় ও শেষ পর্যায়ে নিজেদের অজ্ঞতায় পরবর্তী লোকেরা এদেরকে মা‘বূদ বানিয়ে আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে ইবাদত শুরু করে। যেমন আমাদের সমাজে শুধু সৎব্যক্তি নয় অসৎ ব্যক্তিদেরকে কেন্দ্র করেও কবরপূজা, মাযার পূজা, মূর্তিপূজা, মিনার ও ভাষ্কর্য পূজায় রূপ নিয়েছে।
১-৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আল্লাহ তা‘আলা নূহ (আঃ) সম্পর্কে বলছেন : তিনি তাঁকে স্বজাতির কাছে প্রেরণ করেছেন যেন তাদের ওপর আযাব আসার পূর্বেই তাদেরকে সতর্ক করেন। যদি তারা তাওবা করতঃ আল্লাহ তা‘আলার দীনে ফিরে আসে তাহলে আল্লাহ তা‘আলা আযাব তুলে নেবেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা রাসূল প্রেরণ করে সতর্ক না করে কোন জাতিকে শাস্তি দেন না, যাতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার বিরুদ্ধে কেউ কোন অভিযোগ করতে না পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَمَا کُنَّا مُعَذِّبِیْنَ حَتّٰی نَبْعَثَ رَسُوْلًا)
“আমি রাসূল না পাঠান পর্যন্ত কাউকেও শাস্তি দেই না।” (সূরা ইসরা ১৭ : ১৫) নূহ (আঃ) আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক নির্দেশ পালনার্থে স্বজাতিকে বলছেন : হে আমার জাতি! আমি তোমাদেরকে সতর্ক করছি যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত কর তাঁকে ভয় কর আর আমার আনুগত্য কর। যদি এসব কাজ কর তাহলে ফলাফল হল- আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন এবং আয়ু বৃদ্ধি করে দেবেন। প্রত্যেক মানুষের নির্দিষ্ট আয়ু রয়েছে। কিন্তু সৎ আমলের মাধ্যমে আয়ু বৃদ্ধি পায়। যেমন হাদীসে এসেছে
صلة الرحم تزيد في العمر
আত্মীয় সম্পর্ক বজায় রাখলে আয়ু বৃদ্ধি পায়। (সিলসিলা সহীহাহ ৪/৫৩৭) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : তাদের আয়ু বৃদ্ধি করে দেবেন এর অর্থ হল : আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টির পূর্বেই ফায়সালা করে রেখেছেন যে, তারা ঈমান আনলে তাদের আয়ুতে বরকত দান করবেন। আর ঈমান না আনলে তাড়াতাড়ি শাস্তি দেওয়া হবে (কুরতুবী)।
(أَنْ يَّأْتِيَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ)
“তাদের প্রতি আযাব আসার পূর্বে” ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : অর্থাৎ আখিরাতে জাহান্নামের শাস্তি আসার পূর্বে। কালবী বলেন : তা হল তাদের ওপর যে তুফান এসেছিল তা। মোটকথা তারা ঈমান না আনলে তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ভীতি প্রদর্শন কর (কুরতুবী)।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. নূহ (আঃ) পৃথিবীর সর্বপ্রথম রাসূল যিনি ৯৫০ বছর দাওয়াতী কাজ করেছেন।
২. এক আল্লাহর ইবাদত ও রাসূলের আনুগত্য করলে গুনাহ ক্ষমা করার সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করে দেন, কারণ রাসূলের আনুগত্য মানেই আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য।
৩. নূহ (আঃ)-এর দাওয়াতী কাজে আল্লাহ তা‘আলার পথে আহ্বানকারীর জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, তিনি হযরত নূহ (আঃ)-কে স্বীয় রাসূল রূপে তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেন এবং তাঁকে নির্দেশ দেন যে, শাস্তি আসার পূর্বেই তিনি যেন তাঁর কওমকে এই বলে সতর্ক করে দেন যে, যদি তারা তাওবা করে ও আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে তবে আল্লাহ তাদের উপর হতে আযাব উঠিয়ে নিবেন। হযরত নূহ (আঃ) তখন তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট আল্লাহর এই পয়গাম পৌঁছিয়ে দিলেন। তিনি তাদেরকে স্পষ্টভাবে বলে দিলেনঃ জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করছি। আমি তোমাদেরকে পরিষ্কারভাবে বলছি যে, তোমাদের অবশ্যকরণীয় কাজ হলো আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁকে ভয় করে চলা এবং আমার আনুগত্য করা। আর যে কাজ তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে অবৈধ করেছেন সে কাজ থেকে তোমাদেরকে বিরত থাকতে হবে। পাপের কাজ হতে তোমরা দূরে থাকবে। যে কাজ আমি তোমাদেরকে করতে বলবো তা করবে এবং যে কাজ হতে আমি বিরত থাকতে বলবো তা হতে অবশ্যই বিরত থাকবে। আর তোমরা আমার রিসালাতের সত্যতা স্বীকার করে নিবে। এসব কাজ যদি তোমরা কর তবে মহান আল্লাহ তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন।
(আরবি) এর মধ্যে (আরবি) অতিরিক্ত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ইতিবাচকের ক্ষেত্রেও কখনো কখনো (আরবি) অতিরিক্ত রূপে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন আরবদের (আরবি) এই উক্তির মধ্যে (আরবি) অতিরিক্ত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আবার এও হতে পারে যে, এটা (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। এ উক্তিও রয়েছে যে, (আরবি) এখানে (আরবি) বা ‘কতক’ বুঝাবার জন্যে এসেছে। অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের কতক গুনাহ মাফ করে দিবেন। অর্থাৎ ঐ গুনাহ যার উপর শাস্তির ওয়াদা করা হয়েছে। যদি তোমরা এ তিনটি কাজ কর তবে মহান আল্লাহ তোমাদের এসব বড় গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং তোমাদের যেসব পাপের কারণে তিনি তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিতেন ঐ ধ্বংসাত্মক শাস্তি তিনি সরিয়ে দিবেন। আর তিনি তোমাদের আয়ু বৃদ্ধি করবেন। এই আয়াত দ্বারা এই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে যে, আল্লাহর আনুগত্য, সদাচরণ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখার কারণে প্রকৃতভাবে আয়ু বৃদ্ধি হয়ে থাকে। যেমন হাদীসে এসেছেঃ “আত্মীয়তার সম্পর্ক মিলিতকরণ আয়ু বৃদ্ধি করে থাকে।”
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা ভাল কাজ কর আল্লাহর আযাব এসে যাওয়ার পূর্বেই। কেননা, আযাব এসে পড়লে কেউ তা সরাতে পারবে না এবং স্থগিত রাখতেও পারবে না। ঐ মহান এবং শ্রেষ্ঠ আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব সবকিছুকেই অধীনস্থ করে রেখেছে। তাঁর ইযযত ও মর্যাদার সামনে সমস্ত সৃষ্টজীব অতি তুচ্ছ ও নগণ্য।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।