সূরা নূহ (আয়াত: 28)
হরকত ছাড়া:
رب اغفر لي ولوالدي ولمن دخل بيتي مؤمنا وللمؤمنين والمؤمنات ولا تزد الظالمين إلا تبارا ﴿٢٨﴾
হরকত সহ:
رَبِّ اغْفِرْ لِیْ وَ لِوَالِدَیَّ وَ لِمَنْ دَخَلَ بَیْتِیَ مُؤْمِنًا وَّ لِلْمُؤْمِنِیْنَ وَ الْمُؤْمِنٰتِ ؕ وَ لَا تَزِدِ الظّٰلِمِیْنَ اِلَّا تَبَارًا ﴿۲۸﴾
উচ্চারণ: রাব্বিগফিরলী ওয়ালিওয়া-লিদাইইয়া ওয়া লিমান দাখালা বাইতিয়া মু’মিনাওঁ ওয়া লিলমু’মিনীনা ওয়াল মু’মিনা-তি ওয়ালা- তাযিদিজ্জা-লিমীনা ইল্লা-তাবা-রা-।
আল বায়ান: ‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন এবং ধ্বংস ছাড়া আপনি যালিমদের আর কিছুই বাড়িয়ে দেবেন না।’
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৮. হে আমার রব! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে। আমার পিতামাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে; আর যালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি করুন।
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে আমার রব্ব! তুমি ক্ষমা কর আমাকে, আমার পিতামাতাকে যারা আমার গৃহে মু’মিন হয়ে প্রবেশ করে তাদেরকে আর মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীদেরকে; আর যালিমদের জন্য ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করো না।’
আহসানুল বায়ান: (২৮) হে আমার প্রতিপালক! তুমি ক্ষমা কর আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং যারা বিশ্বাসী হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করেছে তাদেরকে এবং বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারীদেরকে।[1] আর অনাচারীদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি কর।’ [2]
মুজিবুর রহমান: হে আমার রাব্ব! তুমি ক্ষমা কর আমাকে, আমার মাতা-পিতাকে এবং যারা মু’মিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মু’মিন পুরুষ ও মু’মিনা নারীদেরকে; আর যালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি কর।
ফযলুর রহমান: “হে আমার প্রভু! আমাকে, আমার পিতামাতাকে, আমার ঘরে ঈমানের সাথে যে প্রবেশ করে তাকে এবং সব ঈমানদার পুরুষ ও নারীকে ক্ষমা করো; আর জালেমদের শুধু ধ্বংসই বাড়িয়ে দাও।”
মুহিউদ্দিন খান: হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করে-তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে ক্ষমা করুন এবং যালেমদের কেবল ধ্বংসই বৃদ্ধি করুন।
জহুরুল হক: আমার প্রভূ! আমাকে পরিত্রাণ করো, আর আমার পিতামাতাকে, আর যে কেউ আমার ঘরে বিশ্বাসী হয়ে প্রবেশ করে তাকে, আর বিশ্বাসীপুরুষদের ও বিশ্বাসিনীদের। আর অন্যায়াচারীদের আর কিছু বাড়িয়ো না নিপাত হওয়া ব্যতীত।
Sahih International: My Lord, forgive me and my parents and whoever enters my house a believer and the believing men and believing women. And do not increase the wrongdoers except in destruction."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৮. হে আমার রব! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে। আমার পিতামাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে; আর যালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি করুন।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৮) হে আমার প্রতিপালক! তুমি ক্ষমা কর আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং যারা বিশ্বাসী হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করেছে তাদেরকে এবং বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারীদেরকে।[1] আর অনাচারীদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি কর।” [2]
তাফসীর:
[1] কাফেরদের জন্য বদ্দুআ করার পর তিনি নিজের জন্য এবং মু’মিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
[2] এই বদ্দুআ হল কিয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত যালেমদের জন্য। যেমন উল্লিখিত দু’আ সমস্ত মু’মিন পুরুষ এবং সমস্ত মু’মিন মহিলাদের জন্য।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৫-২৮ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
নূহ (আঃ) যখন বুঝতে পারলেন- এরা আর ঈমান আনবে না, তখন তিনি অবাধ্য জাতির ওপর বদ্দুআ করলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَأُوْحِيَ إِلٰي نُوْحٍ أَنَّه۫ لَنْ يُّؤْمِنَ مِنْ قَوْمِكَ إِلَّا مَنْ قَدْ اٰمَنَ فَلَا تَبْتَئِسْ بِمَا كَانُوْا يَفْعَلُوْنَ)
“নূহের প্রতি ওয়াহী করা হয়েছিল, ‘যারা ঈমান এনেছে তারা ব্যতীত তোমার সম্প্রদায়ের অন্য কেউ কখনও ঈমান আনবে না। সুতরাং তারা যা করে তজ্জন্য তুমি দুঃখিত হয়ো না।” (সূরা হূদ ১১ : ৩৬)
ফলে তাদের কৃত অপরাধের দরুন আল্লাহ তা‘আলা মহাপ্লাবন দিয়ে ডুবিয়ে মারলেন এবং এর মাধ্যমে তাদের জাহান্নামে দিলেন। প্লাবনের বিবরণ সূরা হূদের ৩৭-৪৮ নম্বর আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ রয়েছে।
دَيَّارً অর্থ : গৃহবাসী। অর্থাৎ কোন গৃহবাসী কাফিরকে দুনিয়াতে বাঁচিয়ে রেখো না। কারণ এরা বেঁচে থাকলে মানুষকে পথহারা করবে এবং যে সকল সন্তান জন্ম দেবে সে সব সন্তান কাফিরই হবে। সর্বশেষে নূহ (আঃ) নিজের জন্য, পিতা মাতার জন্য এবং যারা মু’মিন হয়ে তার গৃহে প্রবেশ করবে তাদের সকলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। কারণ নূহ (আঃ)-এর পূর্ব দশ পুরুষ সবাই মু’মিন ছিলেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : নূহ (আঃ)-এর পিতার পূর্বের কেউ কুফরী করেনি। (কুরতুবী) আর কাফির জালিমদের প্রতি বদ্দুআ কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে।
تَبَارًا অর্থ : ধ্বংস, ক্ষতি ইত্যাদি।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে তার খারাপ কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দেওয়া হবে।
২. জালিম ও কাফিরদের জন্য বদ্দুআ করা শরীয়তসিদ্ধ।
৩. মু’মিন নর-নারীর জন্য অন্য মুমিনের দু‘আ করা উচিত।
৪. দু‘আকারী প্রথমে নিজের জন্য দু‘আ শুরু করা মুস্তাহাব।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৫-২৮ নং আয়াতের তাফসীর
(আরবি) এর অন্য কিরআত (আরবি) ও রয়েছে। মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ পাপের আধিক্যের কারণে হযরত নূহ (আঃ)-এর কওমকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। তাদের ঔদ্ধত্য, হঠকারিতা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাদেরকে পানিতে নিমজ্জিত করা হয়েছিল এবং সেখান থেকে আগুনের গর্তে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তাদেরকে আল্লাহর এই আযাব হতে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কেউ এগিয়ে আসেনি এবং তারা তাদের জন্যে কোন সাহায্যকারীও পায়নি। যেমন আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ (আঃ)-এর ঐ উক্তি উদ্ধৃত করেন যে উক্তি তিনি তাঁর পুত্রের প্রতি করেছিলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আজ আল্লাহর বিধান হতে রক্ষা করবার কেউ নেই, যাকে আল্লাহ দয়া করবেন সে ব্যতীত।”(১১:৪৩)
হযরত নূহ (আঃ) স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতাবান ও মহামহিমান্বিত আল্লাহর দরবারে ঐ হতভাগ্যদের বিরুদ্ধে বদ দু'আ করেনঃ হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিবেন না। হলো তাই, সবাই পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেল। এমনকি হযরত নূহ (আঃ)-এর নিজের পুত্র, যে তার থেকে পৃথক ছিল, সেও রক্ষা পায়নি। হযরত নূহ (আঃ) তাঁর ঐ পুত্রকে অনেক কিছু বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কোনই ফল হয়নি। সে মনে করেছিল যে, পানি তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না, সে কোন এক উঁচু পাহাড়ের উপর উঠে গিয়ে আত্মরক্ষা করবে। কিন্তু ওটা ছিল আল্লাহর আযাব ও গযব এবং হযরত নূহ (আঃ)-এর বদ দু'আর ফল। কাজেই তা হতে রক্ষা করতে পারবে কে? পানি তাকে ওখানেই ধরে ফেলছে এবং সে তার পিতার চোখের সামনে কথা বলতে বলতে ডুবে মরছে।
মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি হযরত নূহ এর তুফানের সময় আল্লাহ তা’আলা কারো প্রতি দয়া করতেন তবে তিনি ঐ মহিলাটির উপর দয়া করতেন যে উনানে পানি উথলিয়ে উঠতে দেখে নিজের শিশু সন্তানকে নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে গিয়েছিল। পানি যখন ওখানেও উঠে গেল তখন সে তার শিশুটিকে কাঁধের উপর উঠিয়ে নিলো। পানি যখন তার কাঁধ পর্যন্তও উঠে গেল তখন শিশুটিকে সে তার মাথার উপর বসিয়ে নিলো। মাথার উপরেও যখন পানি উঠে গেল তখন সে ছেলেকে হাতে উঠিয়ে নিয়ে মাথার ঊর্ধ্বে উঠালো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পানি সেখানেও পৌঁছে গেল এবং মাতা ও সন্তান উভয়েই পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেল। সুতরাং ঐদিন যদি আল্লাহ তা'আলা ভূ-পৃষ্ঠের কাফিরদের মধ্য হতে কারো প্রতি দয়া করতেন তবে অবশ্যই ঐ মহিলাটির উপর দয়া করতেন।” (এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল কিন্তু এর বর্ণনাকারী সবাই নির্ভরযোগ্য) মোটকথা যমীনের সমস্ত কাফিরদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। শুধু ঐ ঈমানদার লোকদেরকে রক্ষা করা হয় যারা হযরত নূহ (আঃ)-এর সাথে তার নৌকায় ছিলেন এবং আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত নূহ (আঃ) যাদেরকে তার নৌকায় উঠিয়ে নিয়েছিলেন। হযরত নূহ (আঃ) অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন যে, তাঁর কওমের লোকেরা তাঁর উপর ঈমান আনবে না, তাই তিনি নৈরাশ্য প্রকাশ করে বলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার চাহিদা এই যে, সমস্ত কাফিরকে ধ্বংস করে দেয়া হোক। যদি আপনি তাদের মধ্য হতে কাউকেও অব্যাহতি দেন তবে তারা আপনার বান্দাদেরকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে এবং জন্ম। দিতে থাকবে শুধু দুষ্কৃতিকারী ও কাফিরদের। তাদের পরবর্তী বংশধরগণ তাদের মতই বদকার ও কাফির হবে। সাথে সাথে তিনি নিজের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং বলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করবে তাদেরকে।
ঘর দ্বারা এখানে মসজিদকেও বুঝানো হয়েছে। তবে সাধারণ অর্থ ঘরই বটে।
মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তুমি মুমিন ছাড়া কারো সঙ্গী হয়ো না এবং আল্লাহভীরু ছাড়া কেউ যেন তোমার খাদ্য না খায়।” (এ হাদীসটি সুনানে আবু দাউদ ও জামে তিরমিযীতেও বর্ণিত হয়েছ এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন, শুধু এই সনদে এ হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে)
এরপর হযরত নূহ (আঃ) তাঁর দু'আকে সাধারণ করেন এবং বলেনঃ হে আল্লাহ! সমস্ত ঈমানদার নারী পুরুষকেও আপনি ক্ষমা করে দিন, জীবিতই হোক বা মৃতই হোক। এ জন্যেই মুস্তাহাব এটাই যে, প্রত্যেক মানুষ তার দু'আতে অন্য মু'মিনকেও অন্তর্ভুক্ত করবে। তাহলে হযরত নূহ (আঃ)-এর অনুসরণও করা হবে। এবং সাথে সাথে এ সম্পর্কে উল্লিখিত হাদীসগুলোর উপর আমলও করা হবে।
এরপর দু'আর শেষে হযরত নূহ (আঃ) বলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকেও ক্ষমা করে দিন এবং যালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি করুন!
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।