সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 96)
হরকত ছাড়া:
فالق الإصباح وجعل الليل سكنا والشمس والقمر حسبانا ذلك تقدير العزيز العليم ﴿٩٦﴾
হরকত সহ:
فَالِقُ الْاِصْبَاحِ ۚ وَ جَعَلَ الَّیْلَ سَکَنًا وَّ الشَّمْسَ وَ الْقَمَرَ حُسْبَانًا ؕ ذٰلِکَ تَقْدِیْرُ الْعَزِیْزِ الْعَلِیْمِ ﴿۹۶﴾
উচ্চারণ: ফা-লিকুল ইসবা-হি ওয়া জ‘আলাল লাইলা ছাকানাওঁ ওয়াশশামছা ওয়াল কামারা হুছবা-নান যা-লিকা তাকদীরুল ‘আযীযুল ‘আলীম।
আল বায়ান: (তিনি) প্রভাত উদ্ভাসক। তিনি বানিয়েছেন রাতকে প্রশান্তি এবং সূর্য ও চন্দ্রকে সময় নিরূপক। এটা সর্বজ্ঞ পরাক্রমশালীর নির্ধারণ।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯৬. তিনি প্রভাত উদ্ভাসকৎ(১) আর তিনি রাতকে প্রশান্তি এবং সূর্য ও চাঁদকে সময়ের নিরুপক করেছেন(২); এটা পরাক্রমশালী মহাজ্ঞানী আল্লাহ্র নির্ধারণ।(৩)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তিনি ঊষার উন্মেষ ঘটান, তিনি রাত সৃষ্টি করেছেন শান্তি ও আরামের জন্য, সূর্য ও চন্দ্র বানিয়েছেন গণনার জন্য। এসব মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞাতা কর্তৃক নির্ধারিত।
আহসানুল বায়ান: (৯৬) তিনিই ঊষার উন্মেষ ঘটান,[1] আর তিনিই বিশ্রামের জন্য রাত[2] এবং গণনার জন্য চন্দ্র ও সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন,[3] এ সব পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ কর্তৃক সুবিন্যস্ত।
মুজিবুর রহমান: তিনিই রাতের আবরণ বিদীর্ণ করে রঙ্গিন প্রভাতের উন্মেষকারী, তিনিই রাতকে বিশ্রামকাল এবং সূর্য ও চাঁদকে সময়ের নিরূপক করে দিয়েছেন; এটা হচ্ছে সেই পরম পরাক্রান্ত ও সর্ব পরিজ্ঞাতার (আল্লাহর) নির্ধারণ।
ফযলুর রহমান: তিনি প্রভাত উন্মেষকারী। তিনি রাতকে বিশ্রামের জন্য এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের জন্য নির্ধারণ করেছেন। এটা মহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানীর নির্ধারণ।
মুহিউদ্দিন খান: তিনি প্রভাত রশ্মির উন্মেষক। তিনি রাত্রিকে আরামদায়ক করেছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসেবের জন্য রেখেছেন। এটি পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানীর নির্ধারণ।
জহুরুল হক: তিনিই উষার ঊন্মেষকারী, আর তিনি রাত্রিকে সৃষ্টি করেছেন বিশ্রামের জন্য, আর সূর্যকে এবং চন্দ্রকে হিসাবের জন্য। এই-ই মহাশক্তিশালী সর্বজ্ঞাতার বিধান।
Sahih International: [He is] the cleaver of daybreak and has made the night for rest and the sun and moon for calculation. That is the determination of the Exalted in Might, the Knowing.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯৬. তিনি প্রভাত উদ্ভাসকৎ(১) আর তিনি রাতকে প্রশান্তি এবং সূর্য ও চাঁদকে সময়ের নিরুপক করেছেন(২); এটা পরাক্রমশালী মহাজ্ঞানী আল্লাহ্–র নির্ধারণ।(৩)
তাফসীর:
(১) فَالِقُ শব্দের অর্থ ফাঁককারী এবং إصباح শব্দের অর্থ এখানে প্রভাতকাল। (فَالِقُ الْإِصْبَاحِ) এর অর্থ প্রভাতের ফাঁককারী; অর্থাৎ গভীর অন্ধকারের চাদর ফাঁক করে প্রভাতের উন্মেষকারী। [জালালাইন] এটিও এমন একটি কাজ, যাতে জ্বিন, মানব ও সমগ্র সৃষ্ট জীবের শক্তিই ব্যর্থ। প্রতিটি চক্ষুষ্মান ব্যক্তি এ কথা বুঝতে বাধ্য যে, রাত্রির অন্ধকারের পর প্রভাতরশ্মির উদ্ভাবক জ্বিন, মানব, ফিরিশতা অথবা অন্য কোন সৃষ্টজীব হতে পারে না, বরং এটি বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ্ তা'আলারই কাজ। তিনি ধীরে ধীরে অন্ধকার চিরে আলোর উন্মেষ ঘটান। সে আলোতে মানুষ তাদের জীবিকার জন্যে বের হতে পারে। [সা’দী]
(২) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা সূর্য ও চন্দ্রের উদয়-অস্ত এবং এদের গতিকে একটি বিশেষ হিসাবের অধীনে রেখেছেন। এর ফলে মানুষ বৎসর, মাস, দিন, ঘন্টা এমনকি মিনিট ও সেকেণ্ডের হিসাবও অতি সহজে করতে পারে। আল্লাহ্ তা'আলার অপার শক্তিই এসব উজ্জ্বল বিশাল গোলক ও এদের গতি-বিধিকে অটল ও অনড় নিয়মের অধীন করে দিয়েছে। হাজার হাজার বছরেও এদের গতি-বিধিতে এক মিনিট বা এক সেকেণ্ডের পার্থক্য হয় না। এ উজ্জ্বল গোলকদ্বয় নিজ নিজ কক্ষপথে নির্দিষ্ট গতিতে বিচরণ করছে। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাদের নাগাল পাওয়া এবং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিনকে অতিক্রমকারী হওয়া। আর প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সাতার কাটে।” [সূরা ইয়াসীন: ৪০]
পরিতাপের বিষয়, প্রকৃতির এ অটল ও অপরিবর্তনীয় ব্যবস্থা থেকেই মানুষ প্রতারিত হয়েছে। তারা এগুলোকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ বরং উপাস্য ও উদ্দিষ্ট মনে করে বসেছে। যদি এ ব্যবস্থা মাঝে মাঝে অচল হয়ে যেত এবং কলকজা মেরামতের জন্য কয়েকদিন বা কয়েক ঘন্টার বিরতি দেখা দিত, তবে মানুষ বুঝতে পারত যে, এসব মেশিন আপনা আপনিই চলে না, বরং এগুলোর পরিচালক ও নির্মাতা আছে। আসমানী কিতাব, নবী ও রাসূলগণ এ সত্য উদঘাটন করার জন্যই প্রেরিত হন। কুরআনুল কারীমের এ বাক্য আরো ইঙ্গিত করেছে যে, বছর ও মাসের সৌর ও চান্দ্র উভয় প্রকার হিসাবই হতে পারে এবং উভয়টিই আল্লাহ্ তা'আলার নেয়ামত। এর মাধ্যমেই সময় ও কাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এতে এক দিকে যেমন ইবাদতের সময় নির্ধারণ করা যায়, অপরদিকে এর মাধ্যমে লেন-দেনের সময়ও ঠিক রাখা যায়। তাছাড়া কতটুকু সময় পার হয়েছে আর কতটুকু বাকী রয়েছে সেটা জানাও এ দুটোর কারণেই হয়ে থাকে। যদি এগুলো না থাকত, তবে এ সময় নির্ধারণের ব্যাপারটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকত না। এর জন্য বিশেষ শ্রেণীর প্রয়োজন পড়ত। যাতে দ্বীন ও দুনিয়ার অনেক স্বার্থ হানি ঘটত। [সা'দী]
(৩) অর্থাৎ এ বিস্ময়কর অটল ব্যবস্থা- যাতে কখনো এক মিনিট ও এক সেকেণ্ড এদিক-ওদিক হয় না- এটি একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই দুটি মহান গুণ অপরিসীম শক্তি ও অপার জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ। [মানার] এজন্যেই বাক্যের শেষে আল্লাহর দুটি গুণ বাচক নাম পরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী’ উল্লেখ করা হয়েছে। তার অপার শক্তির কারণে সমস্ত কিছু তার অনুগত বাধ্য হয়েছে। আর তার পরিপূর্ণ জ্ঞানের কারণে কোন গোপন বা প্রকাশ্য সবকিছু তার আয়ত্বাধীন রয়েছে। [সা'দী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯৬) তিনিই ঊষার উন্মেষ ঘটান,[1] আর তিনিই বিশ্রামের জন্য রাত[2] এবং গণনার জন্য চন্দ্র ও সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন,[3] এ সব পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ কর্তৃক সুবিন্যস্ত।
তাফসীর:
[1] অন্ধকার ও আলোর স্রষ্টাও তিনিই। তিনি রাতের অন্ধকার থেকে উজ্জ্বল প্রভাত সৃষ্টি করেন। ফলে প্রতিটি জিনিসই আলোকিত হয়ে যায়।
[2] অর্থাৎ, রাতকে অন্ধকার দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন, যাতে মানুষ উজ্জ্বলতার সমস্ত ব্যস্ততাকে দূর করে বিশ্রাম নিতে পারে।
[3] (অথবা হিসাবমত সূর্য ও চন্দ্রকে সৃষ্টি করেছেন।) অর্থাৎ, উভয়ের জন্য একটি হিসাব বাঁধা আছে, যাতে কোন পরিবর্তন ও অনিয়ম ঘটতে পারে না। বরং উভয়ের রয়েছে নিজ নিজ কক্ষপথ, যাতে তারা শীত-গ্রীষ্মে ধাবমান থাকে। আর এরই ভিত্তিতে শীতের সময় দিন ছোট এবং রাত বড় হয়, আর গ্রীষ্ম এর বিপরীত; অর্থাৎ, দিন বড় এবং রাত ছোট হয়। এর বিস্তারিত আলোচনা সূরা ইউনুসের ৫নং আয়াতে, সূরা ইয়াসীনের ৪০নং আয়াতে এবং সূরা আ’রাফের ৫৪ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৯৫-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলার রুবুবিয়্যাহ (স্রষ্টা ও প্রতিপালক) সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
الْحَبُّ হল বীজ, وَالنَّوٰي হল খেজুরের আঁটি। এসব প্রাণহীন বীজ ও আঁটি বিদীর্ণ করে আল্লাহ তা‘আলা জীবিত শস্য উৎপন্ন করেন। মৃত্যু থেকে জীবিত করা, জীবিত বস্তুকে মৃত্যুদান করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاٰيَةٌ لَّهُمُ الْأَرْضُ الْمَيْتَةُ أَحْيَيْنٰهَا وَأَخْرَجْنَا مِنْهَا حَبًّا فَمِنْهُ يَأْكُلُوْنَ)
“আর তাদের জন্য একটি নিদর্শন মৃত জমিন। আমি তাকে সজীব করি এবং তা থেকে উৎপন্ন করি শস্য, ফলে তা থেকে তারা খেয়ে থাকে।”(সূরা ইয়াসীন ৩৬:৩৩)
এ ছাড়াও আল্লাহ তা‘আলা দিন-রাত, চন্দ্র-সূর্য সব কিছু সৃষ্টি করেছেন মানুষের কল্যাণে। আর তারকা সৃষ্টি করেছেন তিনটি উদ্দেশ্যে:
১. পৃথিবীর আকাশ সৌন্দর্য্য মণ্ডিত করার জন্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَا۬ءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيْحَ)
“আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা (তারকারাজী) দ্বারা”(সূরা মুলক ৬৭:৩)
২. শয়তানের জন্য ক্ষেপণাস্ত্রস্বরূপ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَجَعَلْنٰهَا رُجُوْمًا لِّلشَّيٰطِيْنِ)
“আর ওগুলোকে শয়তানদের প্রহার করার উপকরণ করেছি”(সূরা মুলক ৬৭:৩)
৩. অন্ধকার রাতে পথ প্রদর্শনের জন্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَهُوَ الَّذِيْ جَعَلَ لَكُمُ النُّجُوْمَ لِتَهْتَدُوْا بِهَا فِيْ ظُلُمٰتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ط قَدْ فَصَّلْنَا الْاٰيٰتِ لِقَوْمٍ يَّعْلَمُوْنَ)
“তিনিই তোমাদের জন্য নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন যেন তার দ্বারা স্থলের ও সমুদ্রের অন্ধকারে তোমরা পথ পাও। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আমি তো নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেছি।”(সূরা আন্‘আম ৬:৯৭)
এ তিনটি কাজ ছাড়া যদি মনে করা হয় বৃষ্টি বর্ষণ বা পার্থিব কর্মকাণ্ডে এ তারকারাজির প্রভাব রয়েছে তাহলে তা শির্ক বলে গণ্য হবে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. তাওহীদে রুবুবিয়্যার প্রমাণ পেলাম।
২. আল্লাহ তা‘আলা সব কিছু সৃষ্টি করেছেন মানুষের উপকারের জন্য।
৩. তারকা সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানতে পারলাম।
৪. তারকা দ্বারা বৃষ্টি প্রার্থনা করা, বৃষ্টি প্রদানকারী মনে করা বা পার্থিব কর্মকাণ্ডে এ তারকারাজির প্রভাব রয়েছে- এ জাতীয় বিশ্বাস করা শির্ক।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯৫-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ পাক সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি যমীনের বপনকৃত দানাকে উপরে এনে চৌচির করে দেন এবং তার থেকে বিভিন্ন প্রকারের সজি ও বর্ধনশীল উদ্ভিদ পয়দা করেন। ওগুলোর রং পৃথক, আকৃতি এবং ডাটা পৃথক। (আরবী)-এর তাফসীরে বলা হয়েছে যে, তিনি একটা প্রাণহীন জিনিসের মধ্য থেকে একটা প্রাণযুক্ত জিনিস অর্থাৎ উদ্ভিদ সৃষ্টি করে থাকেন এবং জীবন্ত জিনিস থেকে নির্জীব জিনিস পয়দা করেন। যেমন বীজ ও দানা যা হচ্ছে নির্জীব জিনিস, এটা তিনি জীবন্ত উদ্ভিদ থেকে পয়দা করে থাকেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে নির্জীব যমীন, আমি ওকে সঞ্জীবিত করেছি এবং তা থেকে শস্য উৎপন্ন করেছি, ফলে তারা তা থেকে আহার করে থাকে।” (৩৬৪ ৩৩)।
(আরবী) -এটা -এর উপর সংযুক্ত। তারপর এর তাফসীর করা হয়েছে। অতঃপর (আরবী)-কে এর উপর সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এই সবগুলোরই অর্থ প্রায় একই। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা প্রাণহীন ডিম হতে জীবন্ত মুরগী পয়দা করা বুঝানো হয়েছে। কিংবা এর বিপরীত। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে পাপাচারের ঔরষে সৎ সন্তানের জন্মলাভ এবং সৎ ব্যক্তির ঔরষে পাপাচার ছেলের জন্মলাভ। কেননা, সৎ ব্যক্তি জীবিতের সাথে তুলনীয় এবং পাপী লোক মৃতের সাথে তুলনীয়। এ ছাড়া আরও বহু অর্থ হতে পারে।
আল্লাহ পাক বলেনঃ এ সবকিছু আল্লাহই করে থাকেন যিনি হচ্ছেন এক, যার কোন অংশীদার নেই। তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হয়ে কোন দিকে যাচ্ছ? সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ কেন? আল্লাহ ছাড়া তোমাদের অন্য কারও ইবাদত করার কারণ কি? আলো ও অন্ধকারের সৃষ্টিকর্তা তো তিনিই। যেমন তিনি অত্র সূরার শুরুতেই বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই অন্ধকার ও আললা বানিয়েছেন।” (৬:১) অর্থাৎ তিনি দিনের আলোকের মধ্য থেকে রাতের অন্ধকারকেও বের করেছেন, আবার তিনি রাতের মধ্য থেকে দিনের আলোকে বের করেছেন যা সারা প্রান্তকে উজ্জ্বলময় করে দিয়েছে। রাত্রি শেষে অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং উজ্জ্বল দিন প্রকাশিত হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাত্রি দিনকে ঢেকে ফেলে।” (৭:৫৪) এইভাবে মহান আল্লাহ পরস্পর বিপরীতমুখী জিনিসগুলো সৃষ্টি করে স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। এজন্যেই তিনি বলেন যে, তিনি রাতের মধ্য থেকে দিনকে ফেড়ে বের করে থাকেন। রাতকে তিনি বিশ্রামকাল করেছেন যেন সমুদয় জিনিস অতে শান্তি ও আরাম লাভ করতে পারে। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কসম দিনের আলোকের এবং রাত্রির, বন তা প্রশান্ত হয়।” (৯৩:১-২) তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবী)
অর্থাৎ “শপথ রাত্রির যখন ওটা (সূর্যকে) আচ্ছন্ন করে ফেলে, আর দিবসের যখন ওটা আলোকিত হয়ে পড়ে।” (৯২:১-২) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘কসম দিবসের যখন ওটা ওকে ভালরূপে আলোকিত করে এবং কসম রাত্রির যখন ওটা ওকে সমাচ্ছন্ন করে।` (৯১:৩-৪)।
হযরত সুহাইব রূমী (রাঃ)-এর স্ত্রী তাঁর অধিক রাত্রি জাগরণের অভিযোগ করে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সবারই জন্যে রাত্রিকে বিশ্রামকাল ও আরামের সময় বানিয়েছেন বটে, কিন্তু সুহাইব (রাঃ)-এর জন্যে নয়। কেননা, যখন তার জান্নাতের কথা স্মরণ হয় তখন তিনি ওর আগ্রহাতিশয্যে সারা রাত শয়নই করেন না। বরং সারা রাত্রি ধরে ইবাদতে মগ্ন থাকেন। আবার যখন তার জাহান্নামের কথা স্মরণ হয় তখন তার দ্রিাই উড়ে যায়।” (এই হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ বলেনঃ “সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ রীতিনীতি ও নিয়ম শৃংখলার উপর চলতে রয়েছে। ওদের গতির নিয়মের মধ্যে অণু পরিমাণও পরিবর্তন ঘটে না, ওগুলো এদিক ওদিক চলে যায় না, বরং প্রত্যেকটির কক্ষপথ নির্ধারিত রয়েছে। গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে ওরা নিজ নিজ কক্ষপথে চলতে রয়েছে। এই শৃংখলিত নিয়মের ফলেই দিন রাত্রি কমতে ও বাড়তে রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তিনিই সেই আল্লাহ যিনি সূর্যকে দীপ্তিময় বানিয়েছেন এবং চন্দ্রকে কোমল আলো দান করেছেন এবং হ্রাস বৃদ্ধির মনযিল নির্ধারণ করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “সূর্যের সাধ্য নেই যে চন্দ্রকে ধরে নিবে, আর না রাত্রি দিবসের পূর্বে আসতে পারবে এবং প্রত্যেকেই এক একটি চক্রের মধ্যে সন্তরণ করতে রয়েছে। তিনি আরও বলেনঃ “সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি তাঁর আদেশ পালনে সদা নিয়োজিত রয়েছে। আল্লাহ পাক আরও বলেছেনঃ “এটা তারই নির্ধারিত পরিমাণ, যিনি মহা পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়। কেউ তার বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে না। কেউই তাঁর অগোচরে থাকতে সক্ষম নয়, সেটা যমীন আসমানের অণু পরিমাণই জিনিস হোক না কেন।
আল্লাহ তা'আলা যেখানেই রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রের সৃষ্টির কথা বর্ণনা করেছেন সেখানেই তিনি বাক্যকে (আরবী) শব্দ দ্বারাই শেষ করেছেন। যেমন এখানেও ঐ নিয়মের ব্যক্তিক্রম ঘটেনি।
মহান আল্লাহ বলেনঃ “তাদের জানবার পক্ষে রাত্রিও একটা নিদর্শন যে, ওর মধ্য থেকে আমি দিনকে অপসারণ করি, তৎক্ষণাৎ তারা অন্ধকারের মধ্যে থেকে যায়। আর সূর্যও স্বীয় গতিপথে চলতে রয়েছে এবং স্বীয় নির্ধারিত কক্ষের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটা সেই মহা পরাক্রান্ত ও জ্ঞানময়েরই নির্ধারিত পরিমাপ এবং মাপকাঠি।” মহান আল্লাহ (আরবী) সূরার প্রথমভাগে যমীন, আসমান এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী বস্তুসমূহের সৃষ্টি সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি এই নিকটবর্তী আসমানকে নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং ওকে সুরক্ষিত করেছি, এটা মহাপরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানীর নিয়ন্ত্রণ।” (৪১৪১২)।
আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তিনি তোমাদের জন্যে নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন-যেন তোমরা ওগুলোর সাহায্যে অন্ধকারে পথের সন্ধান পেতে পার, স্থলভাগেও এবং সমুদ্রেও।
আল্লাহ তাআলা বলেন যে, এই তারকাগুলো এক তো হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্য, দ্বিতীয়তঃ এগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে প্রহার করা হয় এবং তৃতীয়তঃ এগুলোর মাধ্যমে স্থলভাগ ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ চেনা যায়। পূর্ববর্তী গুরুজনদের কেউ কেউ বলেছেন যে, তারকারাজি সৃষ্টির মধ্যে শুধুমাত্র তিনটি উদ্দেশ্যই নিহিত রয়েছে। এছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। যদি কেউ মনে করেন যে, এই তিনটি উদ্দেশ্য ছাড়া আরো উদ্দেশ্য রয়েছে তবে তিনি ভুল বুঝেছেন এবং কুরআনের আয়াতের উপর বাড়াবাড়ি করেছেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি প্রমাণসমূহ খুব বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি, যাতে লোকেরা কিছু জ্ঞান লাভ করতে পারে এবং সত্য ও ন্যায়কে চিনে নিয়ে অসত্য ও অন্যায়কে পরিহার করে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।