আল কুরআন


সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 93)

সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 93)



হরকত ছাড়া:

ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا أو قال أوحي إلي ولم يوح إليه شيء ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله ولو ترى إذ الظالمون في غمرات الموت والملائكة باسطو أيديهم أخرجوا أنفسكم اليوم تجزون عذاب الهون بما كنتم تقولون على الله غير الحق وكنتم عن آياته تستكبرون ﴿٩٣﴾




হরকত সহ:

وَ مَنْ اَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرٰی عَلَی اللّٰهِ کَذِبًا اَوْ قَالَ اُوْحِیَ اِلَیَّ وَ لَمْ یُوْحَ اِلَیْهِ شَیْءٌ وَّ مَنْ قَالَ سَاُنْزِلُ مِثْلَ مَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ ؕ وَ لَوْ تَرٰۤی اِذِ الظّٰلِمُوْنَ فِیْ غَمَرٰتِ الْمَوْتِ وَ الْمَلٰٓئِکَۃُ بَاسِطُوْۤا اَیْدِیْهِمْ ۚ اَخْرِجُوْۤا اَنْفُسَکُمْ ؕ اَلْیَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُوْنِ بِمَا کُنْتُمْ تَقُوْلُوْنَ عَلَی اللّٰهِ غَیْرَ الْحَقِّ وَ کُنْتُمْ عَنْ اٰیٰتِهٖ تَسْتَکْبِرُوْنَ ﴿۹۳﴾




উচ্চারণ: ওয়া মান আজলামু মিমমানিফ তারা-‘আলাল্লা-হিল কাযিবান আও কা-লা ঊহিয়া ইলাইইয়া ওয়া লাম ইঊহা ইলাইহি শাইয়ুওঁ ওয়া মান কা-লা ছাউনযিলুমিছলা মাআনযালাল্লা-হু ওয়া লাও তারাইযিজ্জা-লিমূনা ফী গামারা-তিল মাওতি ওয়াল মালাইকাতুবা-ছিতূআইদীহিম আখরিজূআনফুছাকুম আলইয়াওমা তুজযাওনা ‘আযা-বাল হূনি বিমা-কুনতুম তাকূলূনা ‘আলাল্লা-হি গাইরাল হাক্কিওয়া কুনতুম ‘আন আয়া-তিহী তাছতাকবিরূন।




আল বায়ান: আর তার চেয়ে বড় যালিম কে, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করে, অথবা বলে, ‘আমার উপর ওহী প্রেরণ করা হয়েছে’, অথচ তার প্রতি কোন কিছুই প্রেরণ করা হয়নি? এবং যে বলে ‘আমি অচিরেই নাযিল করব, যেরূপ আল্লাহ নাযিল করেছেন’। আর যদি তুমি দেখতে, যখন যালিমরা মৃত্যু কষ্টে থাকে, এমতাবস্থায় ফেরেশতারা তাদের হাত প্রসারিত করে আছে (তারা বলে), ‘তোমাদের জান বের কর। আজ তোমাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে লাঞ্ছনার আযাব, কারণ তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তোমরা তার আয়াতসমূহ সম্পর্কে অহঙ্কার করতে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯৩. আর তার চেয়ে বড় যালিম আর কে যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রটনা করে, কিংবা বলে, আমার কাছে ওহী হয়, অথচ তার প্রতি কিছুই ওহী করা হয় না এবং যে বলে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন আমিও তার মত নাযিল করব? আর যদি আপনি দেখতে পেতেন, যখন যালিমরা মৃত্যু যন্ত্রনায় থাকবে এবং ফিরিশতাগণ হাত বাড়িয়ে বলবে, তোমাদের প্রাণ বের কর। আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দেয়া হবে, কারণ তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তার আয়াতসমূহ সম্পর্কে অহংকার করতে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তার থেকে বড় যালিম আর কে যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যে কথা রচনা করে অথবা বলে, আমার প্রতি ওয়াহী নাযিল হয়; যদিও তার কাছে কিছুই অবতীর্ণ হয় না। আর যে বলে : আল্লাহ যা নাযিল করেন আমি শীঘ্রই তার অনুরূপ নাযিল করব। হায়! যদি তুমি ঐ যালিমদেরকে দেখতে পেতে যখন তারা মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকবে, আর ফেরেশতারা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলবে, তোমাদের জানগুলোকে বের করে দাও, আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর আযাব দেয়া হবে যেহেতু তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলতে যা প্রকৃত সত্য নয় আর তাঁর নিদর্শনগুলোর ব্যাপারে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতে।




আহসানুল বায়ান: (৯৩) আর যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে কিংবা বলে, ‘আমার নিকট প্রত্যাদেশ (অহী) হয়’, যদিও তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় না এবং যে বলে, ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও ওর অনুরূপ অবতীর্ণ করব’, তার চেয়ে বড় যালেম আর কে? যদি তুমি দেখতে পেতে (তখনকার অবস্থা), যখন (ঐ) যালেমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকবে, আর ফিরিশতাগণ হাত বাড়িয়ে বলবে, ‘তোমাদের প্রাণ বের কর। আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দান করা হবে;[1] কারণ তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে অন্যায় বলতে ও তাঁর আয়াত গ্রহণে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে।’[2]



মুজিবুর রহমান: আর ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক অত্যাচারী কে হতে পারে যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে? অথবা এরূপ বলেঃ আমার উপর অহী নাযিল করা হয়েছে, অথচ তার উপর প্রকৃত পক্ষে কোন অহী নাযিল করা হয়নি এবং যে ব্যক্তি এও বলেঃ যেরূপ কালাম আল্লাহ নাযিল করেছেন, তদ্রুপ আমিও আনয়ন করছি। আর তুমি যদি দেখতে পেতে (ঐ সময়ের অবস্থা) যে সময় যালিমরা হবে মৃত্যু সংকটে (পরিবেষ্টিত); আর মালাইকা/ফেরেশতারা হাত বাড়িয়ে বলবেঃ নিজেদের প্রাণগুলি বের কর, আজ তোমাদেরকে সেই সব অপরাধের শাস্তি হিসাবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি দেয়া হবে যা তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যা দোষারোপ করে অকারণ প্রলাপ বকেছিলে এবং তাঁর আয়াতসমূহ কবূল করা হতে অহংকার করেছিলে।



ফযলুর রহমান: আল্লাহর বিরুদ্ধে যে মিথ্যা আরোপ করে অথবা বলে, “আমার কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে” অথচ তার কাছে কিছুই পাঠানো হয়নি; এবং যে বলে, “আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার মত আমিও শিগগিরই কিছু একটা নাযিল করব” তার চেয়ে বড় জালেম কে হতে পারে? তুমি যদি দেখতে পেতে, যখন জালেমদের মৃত্যু-যন্ত্রণা হয় এবং (মৃত্যুর) ফেরেশতারা তাদের হাত প্রসারিত করে বলে, “তোমাদের প্রাণগুলো বের করে দাও; আজ তোমাদেরকে লাঞ্ছনাকর শাস্তি দেওয়া হবে, কারণ তোমরা আল্লাহর বিরুদ্ধে অসত্য বলতে এবং তাঁর নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে।”



মুহিউদ্দিন খান: ঐ ব্যক্তির চাইতে বড় জালেম কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা বলেঃ আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ তার প্রতি কোন ওহী আসেনি এবং যে দাবী করে যে, আমিও নাযিল করে দেখাচ্ছি যেমন আল্লাহ নাযিল করেছেন। যদি আপনি দেখেন যখন জালেমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকে এবং ফেরেশতারা স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের কর স্বীয় আত্মা! অদ্য তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি প্রদান করা হবে। কারণ, তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াত সমূহ থেকে অহংকার করতে।



জহুরুল হক: আর কে তার চাইতে বেশি অন্যায়কারী যে আল্লাহ্ সন্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে, অথবা বলে -- 'আমার কাছে প্রত্যাদেশ এসেছে’, অথচ তার কাছে কোনো-প্রকার প্রত্যাদেশ আসে নি, আর যে বলে -- 'আমি অবতারণ করতে পারি যা আল্লাহ্ অবতারণ করেছেন তার মতো জিনিস’? আর তুমি যদি দেখতে পেতে যখন অন্যায়কারীরা মৃত্যু-যন্ত্রণায় থাকবে আর ফিরিশ্‌তারা তাদের হাত বাড়াবে -- "বের করো তোমাদের অন্তরা‌ত্মা! আর তোমাদের দেয়া হবে লাঞ্ছনাপূর্ণ শাস্তি যেহেতু তোমরা আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে বলে চলেছিলে সততার সীমা ছাড়িয়ে, আর তোমরা তাঁর আয়াতসমূহে অহংকার পোষণ করতে।"



Sahih International: And who is more unjust than one who invents a lie about Allah or says, "It has been inspired to me," while nothing has been inspired to him, and one who says, "I will reveal [something] like what Allah revealed." And if you could but see when the wrongdoers are in the overwhelming pangs of death while the angels extend their hands, [saying], "Discharge your souls! Today you will be awarded the punishment of [extreme] humiliation for what you used to say against Allah other than the truth and [that] you were, toward His verses, being arrogant."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৯৩. আর তার চেয়ে বড় যালিম আর কে যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রটনা করে, কিংবা বলে, আমার কাছে ওহী হয়, অথচ তার প্রতি কিছুই ওহী করা হয় না এবং যে বলে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন আমিও তার মত নাযিল করব? আর যদি আপনি দেখতে পেতেন, যখন যালিমরা মৃত্যু যন্ত্রনায় থাকবে এবং ফিরিশতাগণ হাত বাড়িয়ে বলবে, তোমাদের প্রাণ বের কর। আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দেয়া হবে, কারণ তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তার আয়াতসমূহ সম্পর্কে অহংকার করতে।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৯৩) আর যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে কিংবা বলে, ‘আমার নিকট প্রত্যাদেশ (অহী) হয়’, যদিও তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় না এবং যে বলে, ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও ওর অনুরূপ অবতীর্ণ করব’, তার চেয়ে বড় যালেম আর কে? যদি তুমি দেখতে পেতে (তখনকার অবস্থা), যখন (ঐ) যালেমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকবে, আর ফিরিশতাগণ হাত বাড়িয়ে বলবে, ‘তোমাদের প্রাণ বের কর। আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দান করা হবে;[1] কারণ তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে অন্যায় বলতে ও তাঁর আয়াত গ্রহণে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে।’[2]


তাফসীর:

[1] ‘যালেম’ বলতে প্রত্যেক যালেমকে বুঝানো হয়েছে এবং এর মধ্যে আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকারকারী ও নবুঅতের মিথ্যা দাবীদারগণ সর্বপ্রথম শামিল থাকবে। غَمَرَاتٌ থেকে মৃত্যু-যন্ত্রণাকে বুঝানো হয়েছে। ‘ফিরিশতাগণ হাত বাড়িয়ে’ অর্থাৎ, জান কবয করার জন্য। اليَوْمَ (আজ) অর্থাৎ, জান কবয করার দিন। আর এই দিন হল আযাব শুরু হওয়ার সময়; যার প্রথম স্থান হল কবর। আর এ থেকে এ কথাও সুসাব্যস্ত হয়ে যায় যে, কবরের আযাব সত্য। তা না হলে হাত বাড়ানো এবং প্রাণ বের করে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার সাথে এ কথা বলার কোন অর্থ থাকে না যে, আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দেওয়া হবে। স্মরণ থাকে যে, কবর বলতে উদ্দেশ্য বারযাখী জীবন। অর্থাৎ, ইহজগতের জীবনের পর এবং পরজগতের জীবনের (কিয়ামত ঘটার) পূর্বে এটা একটি মধ্যজগতের জীবন। যার সময়কাল হল, মানুষের মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত। এটাকে বলা হয় বারযাখী জীবন। চাহে তাকে কোন হিংস্র পশু খেয়ে নিক অথবা তার লাশ সামুদ্রিক তরঙ্গ-কবলিত হোক কিংবা জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়া হোক বা কবরে দাফন করা হোক। মরণের পর এ হল বারযাখী জীবন, যেখানে আযাব দেওয়ার শক্তি মহান আল্লাহর আছে।

[2] আল্লাহ সম্বন্ধে অন্যায় বা অসত্য বলার মধ্যে কিতাব অবতীর্ণ হওয়া ও রসূল প্রেরণের কথা অস্বীকার এবং নবী হওয়ার মিথ্যা দাবী করার কথাও শামিল আছে। নবুঅত ও রিসালাতের অস্বীকার এবং তা মেনে নেওয়ার ব্যাপারে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করার ব্যাপারটাও অনুরূপ। এই উভয় কারণের ভিত্তিতে তাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দেওয়া হবে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৯৩-৯৪ নং আয়াতের তাফসীর:



যারা আল্লাহ তা‘আলার ওপর মিথ্যারোপ করে তারা দাবী করে আল্লাহ তা‘আলা কোন মানুষকে রাসূল হিসেবে পাঠাননি অথবা দাবী করে যে আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি ওয়াহী নাযিল করেছেন অথচ কিছুই নাযিল করা হয়নি।



কাতাদাহ ও ইকরিমা (রহঃ) বলেন: এ অংশটুকু মুসায়লামাতুল কাযযাব-এর ব্যাপারে নাযিল হয়।



অথবা তার ব্যাপারে যে দাবী করে যে, আল্লাহ তা‘আলা যে কুরআন নাযিল করেছেন অনুরূপ কুরআন আনতে সে সক্ষম। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِذَا تُتْلٰي عَلَيْهِمْ اٰيٰتُنَا قَالُوْا قَدْ سَمِعْنَا لَوْ نَشَا۬ءُ لَقُلْنَا مِثْلَ هٰذَآ لا إِنْ هٰذَآ إِلَّآ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ)



“যখন তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা বলে, ‘আমরা তো শ্রবণ করলাম, ইচ্ছা করলে আমরাও অনুরূপ বলতে পারি; এগুলো, সেকালের লোকেদের উপকথা ছাড়া কিছুই নয়।’(সূরা আনফাল ৮:৩১) এদের চেয়ে বড় জালিম দুনিয়াতে আর নেই।



তারপর আল্লাহ তা‘আলা এসব জালিমদের মৃত্যুকালীণ যন্ত্রণা ও কিয়ামতের যে অবমাননাকর শাস্তি দেয়া হবে সে সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন।



(وَلَقَدْ جِئْتُمُوْنَا فُرَادٰي)



‘তোমরা অবশ্যই আমার নিকট নিঃসঙ্গ অবস্থায় এসেছ’অর্থাৎ কিয়ামতের দিন পৃথক পৃথকভাবে একজন একজনকে আল্লাহ তা‘আলার সামনে ডেকে আনা হবে। সেদিন সাথে কোন সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও বাতিল মা‘বূদ থাকবে না, যাদেরকে সাহায্যকারী হিসেবে আহ্বান করত। আল্লাহ তা‘আলা সেদিন তাদেরকে ভর্ৎসনা করে এ কথা বলবেন।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِيْنَ اتُّبِعُوْا مِنَ الَّذِيْنَ اتَّبَعُوْا وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ)‏



“(কি করুণ অবস্থা হবে তখন) যখন অনুসরণীয় নেতারা অনুসারীদেরকে প্রত্যাখ্যান করবে তখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে ও তাদের সকল সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।”(বাক্বারাহ ২:১৬৬)



সুতরাং কিয়ামতের সেই কঠিন মুহূর্তের আগেই আমাদের সাবধান হওয়া উচিত। সেদিন কেউ কারো কোন উপকারে আসবে না। উপকারে আসবে শুধু ঈমান ও আমল।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলার ওপর মিথ্যারোপ করা সবচেয়ে বড় জুলুম।

২. কাফিরদের যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর প্রমাণ পেলাম।

৩. অহংকারের পরিণতি ভয়াবহ।

৩. কিয়ামতের দিন সকল বাতিল মা‘বূদ পলায়ন করবে, তারা কারো কোন উপকারে আসবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৯৩-৯৪ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপকারীদের চেয়ে বড় অত্যাচারী আর কে আছে? সে তাঁর শরীক স্থাপন করছে বা বলছে যে, তাঁর সন্তান রয়েছে, কিংবা দাবী করছে যে, আল্লাহ তাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, অথচ তাকে পাঠানো হয়নি। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন, সে বলছে যে, তার কাছেও অহী পাঠানো হয়েছে, অথচ তার কাছে তা পাঠানো হয়নি। ইকরামা ও কাতাদা বলেন যে, এই আয়াতটি মুসাইলামা কাযযাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়।

আর তার চেয়ে বড় যালিম আর কে আছে যে বলে, আল্লাহ যেমন কুরআন অবতীর্ণ করেছেন আমিও দ্রুপ অবতীর্ণ করতে পারি। অর্থাৎ সে দাবী করছে যে, আল্লাহর মত অহী সেও অবতীর্ণ করতে পারে। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে- ইবনে জারীর হতে তাখরীজ করা হয়েছে যে, (আরবী) -এই আয়াতটি মুসাইলামার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। আর (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় আব্দুল্লাহ ইবনে সা'দের ব্যাপারে। সুদ্দী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে সা’দ বলতোযদি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে অহী করা হয়ে থাকে তবে আমার কাছেও অহী করা হয়ে থাকে। আর যদি আল্লাহ তাঁর কাছে (কুরআন) অবতীর্ণ করে থাকেন তবে আমিও তদ্রুপ অবতীর্ণ করতে পারি। মুহাম্মাদ (সঃ) বলেনঃ (আরবী) আর আমি (আরবী) বলি) যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা বলে- আমরা শুনলাম এবং ইচ্ছা করলে আমরাও এরূপ বলতে পারি।” (৮:৩১)

(আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! যদি তুমি ঐ সময়ের অবস্থা দেখতে, যে সময় যালিমেরা মৃত্যু যন্ত্রণায় পরিবেষ্টিত হবে! (আরবী) অর্থাৎ ফেরেশতারা মারবার জন্যে হাত উঠাবে। যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে কাবীল। আমাকে হত্যা করার জন্যে) যদি তুমি আমার দিকে হাত উঠাও। (৫:২৮) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ) তারা তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে ও ভালমন্দ বলার জন্যে তোমার দিকে হাত ও জিহ্বা প্রসারিত করে।” (৬০:২) যহ্হাক (রঃ) ও আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এখানে ভাবার্থ হচ্ছে শাস্তির জন্যে হাত উঠানো। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! যদি তুমি দেখতে যখন মৃত্যুমুখী কাফিরদেরকে ফেরেশতারা তাদের চেহারায় ও পিঠে মারতে রয়েছে!` এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ঐ ফেরেশতারা তাদের দেহ থেকে প্রাণ বের করার জন্যে তাদের দিকে তাদের হস্ত প্রসারিত করবেন। তারা তাদেরকে বলবেন, তোমরা তোমাদের প্রাণগুলো বের করে দাও। যখন কাফিরদের মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হবে তখন ফেরেশতারা তাদেরকে শাস্তি, শৃংখল, জাহান্নাম, গরম পানি এবং আল্লাহর গযবের সংবাদ প্রদান করবেন। তখন তাদের আত্মাগুলো বেরিয়ে আসতে অস্বীকার করবে এবং তাদের দেহের মধ্যে ফিরতে থাকবে। সেই সময় ফেরেশতারা তাদেরকে প্রহার করতে থাকবেন যে পর্যন্ত না তাদের আত্মাগুলো বেরিয়ে আসে। আর তারা বলবেন, নিজেদের প্রাণগুলো বের করে দাও। তোমরা যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতে তারই শাস্তি স্বরূপ আজকে তোমাদেরকে অপমানজনক আযাব প্রদান করা হবে। মুমিন ও কাফিরদের মৃত্যু সম্পকীয় বহু হাদীস এসেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “মুমিনদেরকে আল্লাহ পার্থিব জগতে ও পরকালে সঠিক কথার উপর অটল রাখবেন।” ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) এখানে গারীব সনদে একটি সুদীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে বলে কথিত আছে। ইরশাদ হচ্ছে - (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আমার কাছে এককভাবে এসেছো, যেভাবে আমি প্রথমবার তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলাম।” একথা তাদেরকে কিয়ামতের দিন বলা হবে। যেমন আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তাদেরকে তোমার প্রভুর সামনে সারিবদ্ধভাবে পেশ করা হবে, (তাদেরকে আল্লাহ বলবেন) তোমরা আমার কাছে এককভাবে এসেছো, যেভাবে আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম। আর তোমরা এটা অস্বীকার করতে এবং এই কিয়ামতের দিনকে বহু দূরের ব্যাপার মনে করতে। এটাই হচ্ছে পুনরুত্থানের দিন।” (১৮:৪৮) তিনি আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে দুনিয়ায় যে নিয়ামত ও মালধন দান করেছিলাম তা তোমরা শুধু জমা করেই রেখেছিলে, ওগুলো দুনিয়ায় তোমাদের পিছনে ছেড়ে এসেছো।` সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইবনে আদম (আদম সন্তান) বলে- আমার মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল তো এতটুকুই যা তুমি খেয়ে শেষ করছো, যা পরিধান করে পুরানা করেছে এবং যা দান-খয়রাত করে বাকী রেখেছো, এ ছাড়া তোমার সমস্ত সম্পদ অন্যের জন্যে। (তুমি রেখে গেলে)।”

আল্লাহ পাক আদম সন্তানকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তুমি যা জমা করেছিলে তা আজ কোথায়? সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রভু! আমি দুনিয়াতে জমা করেছিলাম, বাড়িয়ে ছিলাম এবং তা সেখানেই ছেড়ে এসেছি।” অতঃপর তিনি বলবেনঃ “তোমরা যাদেরকে আমার শরীক মনে করতে তোমাদের সেই সব সুপারিশকারী কোথায়? এখন তারা সুপারিশ করছে না কেন?” এর দ্বারা তাদেরকে ভৎসনা ও তিরস্কার করা হচ্ছে। কেননা, তারা দুনিয়ায় মূর্তির পূজা করতো এবং মনে করতো যে, ওগুলো পার্থিব জীবনে ও পারলৌকিক জীবনে তাদের জন্যে উপকারী হবে। কিন্তু কিয়ামতের দিন সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। পথভ্রষ্টতা শেষ হয়ে যাবে, মূর্তিগুলোর রাজত্বের অবসান ঘটবে এবং আল্লাহ পাক লোকদেরকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “যেসব মূর্তিকে তোমরা আমার শরীক মনে করতে সেগুলো আজ কোথায়?” তাদেরকে আরও বলা হবে- “এখন তোমাদের মিথ্যা মা'বুদগুলো কোথায়? তারা কি এখন তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারবে, বা তোমরাই তাদেরকে কোন সাহায্য করতে পারবে কি?” এজন্যেই তিনি বলেনঃ “আমি তো তোমাদের সাথে তোমাদের সেই সুপারিশকারীদেরকে দেখছি না যাদের সম্বন্ধে তোমরা দাবী করতে যে, তারা তোমাদের কাজেকর্মে আমার শরীক। বাস্তবিকই তোমাদের পরস্পরের সম্পর্ক তো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে!` বায়নাকুম শব্দটিকে যদি (আরবী) দিয়ে অর্থাৎ বায়নুকুম পড়া যায় তবে অর্থ হবে- তোমাদের দলগুলো ভেঙ্গে দেয়া হবে। আর যদি (আরবী) দিয়ে পড়া হয় তবে ভাবার্থ হবে- তোমাদের পরস্পরের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে এবং মূর্তিগুলোর নিকট থেকে তোমরা যা কিছু পাওয়ার আশা করতে সে আশা গুড়ে বালি।

যেমন তিনি বলেনঃ “যখন মাতব্বরগণ তাবেদারগণ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যাবে এবং সবাই শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে, আর তাদের যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর এই তাবেদারগণ বলবে-যদি আমরা একটু (দুনিয়ায়) ফিরে যেতে পারতাম, তবে আমরাও তাদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হতাম যেমন (আজ) তারা আমাদের থেকে পরিষ্কারভাবে পৃথক হয়ে পড়েছে। আল্লাহ এরূপই তাদেরকে তাদের কুকর্মগুলো নিষ্ফল আকাংখারূপে দেখিয়ে দিবেন, আর তাদের জাহান্নাম থেকে বের হওয়া কখনও নসীবে ঘটবে না।” মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ “যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন তাদের পারস্পরিক বংশ সম্পর্ক কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না এবং তারা একে অপরের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদও করবে না। তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ “তোমরা দুনিয়ায় যে তাদের পূজা-অর্চনা করতে তা শুধুমাত্র পাথিব জীবনে মহব্বত ও ভালবাসার খাতিরে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করে বসবে এবং একে অপরকে তিরস্কার করতে থাকবে, সেদিন তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কেউ সাহায্যকারী হবে না।” আর এক স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “তাদেরকে বলা হবে-তোমাদের শরীকদেরকে (যাদেরকে তোমরা আল্লাহর সাথে শরীক বানিয়ে নিয়েছিলে তাদেরকে) ডাক, তারা তখন তাদেরকে ডাকতে থাকবে, কিন্তু তারা তাদেরকে কোন উত্তর দেবে না।” কুরআন কারীমে এ সম্পর্কীয় বহু সংখ্যক আয়াত বিদ্যমান রয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।