সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 58)
হরকত ছাড়া:
قل لو أن عندي ما تستعجلون به لقضي الأمر بيني وبينكم والله أعلم بالظالمين ﴿٥٨﴾
হরকত সহ:
قُلْ لَّوْ اَنَّ عِنْدِیْ مَا تَسْتَعْجِلُوْنَ بِهٖ لَقُضِیَ الْاَمْرُ بَیْنِیْ وَ بَیْنَکُمْ ؕ وَ اللّٰهُ اَعْلَمُ بِالظّٰلِمِیْنَ ﴿۵۸﴾
উচ্চারণ: কুল্লাও আন্না ‘ইনদী মা-তাছতা‘জিলূনা বিহী লাকুদিয়াল আমরু বাইনী ওয়া বাইনাকুম ওয়াল্লা-হু আ‘লামুবিজ্জা-লিমীন।
আল বায়ান: বল, ‘তোমরা যা নিয়ে তাড়াহুড়া করছ, তা যদি আমার কাছে থাকত, অবশ্যই আমার ও তোমাদের মাঝে বিষয়টির মীমাংসা হয়ে যেত। আর আল্লাহ যালিমদের ব্যাপারে অধিক জ্ঞাত’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৮. বলুন, তোমরা যা খুব তাড়াতাড়ি পেতে চাও তা যদি আমার কাছে থাকত, তবে আমার ও তোমাদের মধ্যে তো ফয়সালা হয়েই যেত। আর আল্লাহ যালিমদের ব্যাপারে অধিক অবগত।
তাইসীরুল ক্বুরআন: বল, তোমরা যা তাড়াতাড়ি চাচ্ছ তা যদি আমার কাছে থাকত তাহলে আমার আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যাপার তার ফায়সালা হয়ে যেত, অন্যায়কারীদের সম্পর্কে আল্লাহ খুবভাবেই অবহিত।
আহসানুল বায়ান: (৫৮) বল, ‘তোমরা যা সত্বর চাচ্ছ, তা যদি আমার নিকট থাকত, তাহলে আমার ও তোমাদের মধ্যেকার ব্যাপারে তো মীমাংসা হয়ে যেত।[1] আল্লাহ অনাচারীদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।’
মুজিবুর রহমান: তুমি বলঃ তোমরা যে বস্তুটি তাড়াতাড়ি পেতে চাও তা যদি আমার এখতিয়ারভুক্ত থাকতো তাহলেতো আমার ও তোমাদের মধ্যে চূড়ান্ত ফাইসালা অনেক আগেই হয়ে যেত, যালিমদেরকে আল্লাহ খুব ভাল করেই জানেন।
ফযলুর রহমান: বল, “তোমরা যা তাড়াতাড়ি পেতে চাও তা যদি আমার কাছে থাকতো তাহলে আমার ও তোমাদের মাঝে ব্যাপারটি তো মিটেই যেতো। আল্লাহ জালেমদের সম্পর্কে ভালভাবে অবহিত।”
মুহিউদ্দিন খান: আপনি বলে দিনঃ যদি আমার কাছে তা থাকত, যা তোমরা শীঘ্র দাবী করছ, তবে আমার ও তোমাদের পারস্পরিক বিবাদ কবেই চুকে যেত। আল্লাহ জালেমদের সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণে অবহিত।
জহুরুল হক: বলো -- "আমার কাছে যদি তা থাকতো যা তোমরা সত্বর ঘটাতে চাও তাহলে নিশ্চয়ই ব্যাপারটির মীমাংসা হয়ে যেতো আমার মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে। আর আল্লাহ্ ভালো জানেন অন্যায়কারীদের।"
Sahih International: Say, "If I had that for which you are impatient, the matter would have been decided between me and you, but Allah is most knowing of the wrongdoers."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫৮. বলুন, তোমরা যা খুব তাড়াতাড়ি পেতে চাও তা যদি আমার কাছে থাকত, তবে আমার ও তোমাদের মধ্যে তো ফয়সালা হয়েই যেত। আর আল্লাহ যালিমদের ব্যাপারে অধিক অবগত।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫৮) বল, ‘তোমরা যা সত্বর চাচ্ছ, তা যদি আমার নিকট থাকত, তাহলে আমার ও তোমাদের মধ্যেকার ব্যাপারে তো মীমাংসা হয়ে যেত।[1] আল্লাহ অনাচারীদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।’
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, আমার চাওয়ার কারণে যদি আল্লাহ তাআলা সত্বর আযাব প্রেরণ করতেন অথবা তিনি যদি এ জিনিসকে আমার এখতিয়ারাধীন করে দিতেন, তাহলে তোমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী আযাব প্রেরণ করে সত্বর ফায়সালা করে দেওয়া হত। কিন্তু এ ব্যাপারটা যেহেতু সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল, তাই তিনি না আমাকে এর এখতিয়ার দিয়েছেন, আর না এটা সম্ভব যে, তিনি আমার চাওয়া অনুযায়ী সত্বর আযাব প্রেরণ করবেন।
একটি জরুরী বিশ্লেষণঃ হাদীসে আছে যে, তায়েফবাসীর নিকটে নিপীড়িত হওয়ার পর পাহাড়ের ফিরিশতা আল্লাহর নির্দেশে নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন যে, আপনি নির্দেশ দিলে আমি সমস্ত জনপদকে উভয় পাহাড়ের মধ্যস্থলে পিষে দেব। তিনি (সাঃ) বললেন, না। বরং আমি আশা করি আল্লাহ তাআলা এদেরই বংশ থেকে আল্লাহর ইবাদতকারী সৃষ্টি করবেন; যারা তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।’’ (বুখারীঃ সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়, মুসলিমঃ জিহাদ অধ্যায়) এই হাদীস উল্লিখিত আয়াত ও তার ব্যাখ্যার প্রতিকূল নয়, যদিও বাহ্যতঃ তাই মনে হয়। কারণ, আয়াতে আযাব চাওয়া হলে আযাব দেওয়ার কথা প্রকাশ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে হাদীসে মুশরিকদের চাওয়া ছাড়াই কেবল তাদের কষ্ট দেওয়ার ফলে তাদের উপর আযাব প্রেরণ করার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করা হয়েছে; যা তিনি (সাঃ) পছন্দ করেননি।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৫৬-৫৯ নং আয়াতের তাফসীর:
يَقُصُّ শব্দটির قصص শব্দ থেকে উৎপত্তি। অর্থাৎ
يقص قصص الحق
(সত্য কথা বর্ণনা করেন অথবা বলেন) কিংবা قص أثره (কারো পেছনে অনুসরণ করা) থেকে গৃহীত। অর্থাৎ
يتبع الحق فيما يحكم به
(নিজের ফায়সালার ব্যাপারে তিনি সত্যের অনুসরণ করেন।) (ফাতহুল কাদীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলেন, যে সকল মুশরিক আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য মা‘বূদদের ডাকে তাদেরকে বলে দাও, আমাকে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করতে নিষেধ করা হয়েছে। যারা কোন প্রকার উপকার, ক্ষতি, জীবন-মরণের মালিক নয়। আর আমি তোমাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করি না। যদি করি তাহলে আমি পথভ্রষ্ট।
(إِنِّيْ عَلٰي بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّيْ)
‘অবশ্যই আমি আমার প্রতিপালকের স্পষ্ট প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত’অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা আমার কাছে যে শরীয়ত ওয়াহী করেছেন তার ব্যাপারে সুস্পষ্ট জ্ঞান ও প্রমাণের ওপর আছি। আর তোমরা একে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছ।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা দ্রুত আযাব কামনা করে তাদেরকে বলে দাও, তোমরা দ্রুত যে আযাব চাচ্ছ তা আমার ক্ষমতাধীন নয়। যদি থাকত তাহলে আমার ও তোমাদের মাঝে ইচ্ছা অনুযায়ী আযাব দ্বারা ফায়সালা হয়ে যেত। যেহেতু এটা আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছাধীন তাই তিনি যখন ইচ্ছা দেবেন। হাদীসে এসেছে: তায়েফবাসী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আহত হলে পাহাড় নিয়ন্ত্রণকারী ফিরিশতা আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন: আপনি নির্দেশ দিলে আমি তায়েফের জনপদকে উভয় পাহাড়ের মধ্যস্থলে পিষে দেব। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: না, বরং আমি আশা করি আল্লাহ তা‘আলা এদেরই বংশ থেকে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতকারী সৃষ্টি করবেন; যারা তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৩২৩১)
(وَعِنْدَه۫ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ)
“গায়েবের সকল চাবিকাঠি তাঁরই নিকট রয়েছে”রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: গায়েবের চাবিকাঠি পাচঁটি যা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জানেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّ اللّٰهَ عِنْدَه۫ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ ج وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِيْ نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِيْ نَفْسٌۭ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوْتُ إِنَّ اللّٰهَ عَلِيْمٌ خَبِيْرٌ)
“নিশ্চয় আল্লাহরই কাছে রয়েছে কিয়ামাত সম্পর্কে জ্ঞান এবং তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, আর তিনিই জানেন যা কিছু আছে গর্ভাধারে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী আয় করবে এবং কেউ জানে না কোন্ স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব খবর রাখেন।”(সূরা লুকমান ৩১:৩৪) সুতরাং আলেমুল গায়েব’ কেবল আল্লাহ তা‘আলা। (সহীহ বুখারী হা: ৮৬২৭)
(وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ)
‘স্থলে ও জলে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত’অর্থাৎ স্থলে ও জলে যত কিছুর অস্তিত্ব আছে সব কিছু আল্লাহ তা‘আলার জ্ঞানায়ত্বে কোন কিছু তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয় এবং কোন কিছু তাঁর কাছে অস্পষ্ট নয়। এমনকি গাছের একটি পাতা কখন পড়ে কিভাবে পড়ে তাও তিনি জানেন।
(كِتٰبٍ مُّبِيْنٍ)
সুস্পষ্ট কিতাব বলতে ‘লাওহে মাহফূয’-কে বুঝানো হয়েছে।
সুতরাং যে আল্লাহ তা‘আলা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, স্থল ও জলে যা কিছু আছে এবং হচ্ছে সব জানেন ও প্রত্যক্ষ করেন সে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করা উচিত। তাঁর দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে কোন কাজ করার সুযোগ নেই।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যারা প্রবৃত্তির অনুসারী হয় তারাই বিপদগামী হয়।
২. ইসলামী শরীয়ত সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
৩. গায়েবের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। কোন নাবী-রাসূলও নন। তবে ওয়াহীর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে যতটুকু জানান ততটুকু জানতে পারেন।
৪. আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু হয় সবই আল্লাহ তা‘আলা জানেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫৫-৫৯ নং আয়াতের তাফসীর:
ইরশাদ হচ্ছে- যেমন আমি পূর্ববর্তী বর্ণনায় দলীল প্রমাণাদির মাধ্যমে সাধুতা, হিদায়াত ইত্যাদিকে প্রকাশ করে দিয়েছি, তেমনই যে আয়াতগুলোর সম্বোধিত ব্যক্তি প্রকাশ্য বর্ণনার মুখাপেক্ষী তার কাছে আমি ঐ আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি। এর কারণ এটাও যে, যেন অপরাধীদের পথ সুস্পষ্ট হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেন, হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি কাফিরদেরকে বলে দাও-আল্লাহ তাআলা যে অহী আমার নিকট পাঠিয়েছেন আমি তা অন্তদৃষ্টি দিয়ে দেখে ওর উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছি। পক্ষান্তরে তোমরা সত্যকে মিথ্যা জেনেছো। তোমরা যে শাস্তির জন্য তাড়াহুড়া করছে তা আমার হাতে নেই। হুকুমের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ। যদি তিনি সত্বর তোমাদের উপর শাস্তি আনয়নের ইচ্ছে করেন তবে সেই শাস্তি সত্বরই তোমাদের উপর এসে পড়বে। আর যদি তিনি কোন মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শাস্তি প্রদানে বিলম্ব করেন এবং তোমাদেরকে অবকাশ দেন তবে ওটারও তার অধিকার রয়েছে। এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ তিনি সত্যপন্থা অবলম্বন করে থাকেন। এবং তিনি কোন নির্দেশ জারী ও বান্দাদের মধ্যে কোন হুকুম চালুর ব্যাপারে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন। হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বল-যদি তোমাদের উপর সত্বর শাস্তি আনয়ন আমার অধিকারভুক্ত হতো তবে তোমরা যে শাস্তির যোগ্য তা আমি সত্বরই তোমাদের উপর অবতীর্ণ করতাম। আর আল্লাহ তো অত্যাচারীদেরকে ভালরূপেই জানেন। যদি প্রশ্ন করা হয় যে, এই আয়াত এবং সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীস পরস্পর বিরোধী, তাহলে উভয়ের মধ্যে আনুকূল্য আনয়নের উপায় কি? হাদীসটি নিম্নে বর্ণিত হলোঃ
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে। জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! উহুদের দিবস অপেক্ষা কঠিনতর কোন দিন কি আপনার জীবনে এসেছিল? তিনি উত্তরে বলেনঃ হে আয়েশা (রাঃ)! তোমার কওমের পক্ষ থেকে যে ভীষণতম কষ্ট আমার উপর পৌঁছেছিল তা হচ্ছে আকাবা দিবসের কষ্ট। যখন আমি ইবনে আবদি ইয়ালীল ইবনে আবদি কিলালের উপর নিজেকে পেশ করি তখন সে আমার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে। আমি তখন অত্যন্ত দুঃখিত মনে সেখান থেকে ফিরে যাই। কারণে সাআ’লিব নামক স্থানে পৌঁছে আমার জ্ঞান ফিরে আসে। আমি মাথা উঠিয়ে দেখি যে, আমার উপরে এক খণ্ড মেঘ ছেয়ে আছে। আমি ওর মধ্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে দেখতে পাই। তিনি আমাকে বলেন, হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনার কওমের লোকেরা আপনাকে যা বলছে তা আল্লাহ শুনেছেন। তিনি আপনার সাহয্যার্থে পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন যাতে আপনি যা চান তাকে তাই নির্দেশ দেন! পাহাড়ের ফেরেশতাও সাড়া দিলেন এবং তাঁকে সালাম জানালেন। অতঃপর বললেন, আল্লাহ আমাকে আপনার সাহায্যার্থে পাঠিয়েছেন। সুতরাং যদি আপনি আমাকে হুকুম করেন তবে আমি এই পাহাড় দু'টি আপনার কওমের উপর নিক্ষেপ করি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, আমি আশা রাখছি যে, আল্লাহ এই কাফিরদের বংশ হতে এমন লোকও বের করবেন যারা মুমিন হবে এবং আল্লাহর সাথে আর কাউকেও শরীক করবে না।
সহীহ মুসলিমে নিম্নরূপ শব্দ রয়েছে। তাদের উপর ফেরেশতা শাস্তি পেশ করলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে অবকাশ দিতে বললেন এবং শাস্তি প্রদানে বিলম্ব করণের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, যাতে তাদের বংশ থেকে মুমিনদের জন্মলাভ হতে পারে। তাহলে এখন সমস্যা দেখা দিচ্ছে যে, আল্লাহর উল্লিখিত উক্তি এবং এই হাদীসের মধ্যে আনুকূল্যের উপায় কি? পূর্ববর্তী উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে বলা হচ্ছে- তোমরা যে শাস্তি চাচ্ছ তা যদি আমার অধিকারে থাকতো তাহলে তো এখনই আমার ও তোমাদের মধ্যে ফায়সালা হয়েই যেতো এক এখনই আমি তোমাদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করতাম। আর এখানে শাস্তি প্রদানের অধিকার লাভ সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করছে না! এই সমস্যার সমাধান এইভাবে হতে পারেঃ পবিত্র আয়াত দ্বারা এটাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, যে শাস্তি তারা চাচ্ছে তা তাদের চাওয়ার কারণেই তাদের উপর পতিত হতো। আর উক্ত হাদীসে এটা উল্লেখ নেই যে, তারা শাস্তি চেয়েছিল। বরং ফেরেশতা তাদের উপর শাস্তি পেশ করতে চেয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যদি আপনি চান তবে আমি এই ‘আখশাবাইন’ পাহাড় দু'টিকে তাদের উপর নিক্ষেপ করে দেই, যে পাহাড় দুটি মক্কায় অবস্থিত এবং মক্কাকে উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে ঘিরে রয়েছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) নমনীয়তা প্রদর্শন করতঃ বিলম্বের সাথে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
ইরশাদ হচ্ছে- অদৃশ্যের কথা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “গায়েবের বিষয় হচ্ছে পাঁচটি। (১) কিয়ামতের সময়ের কথা আল্লাহ ছাড়া আর কারও জানা নেই। (২) বৃষ্টি বর্ষণ করা। (৩) গর্ভবতীর গর্ভে পুত্র সন্তান আছে কি কন্যা সন্তান আছে। (৪) কোন লোক আগামীকল্য কি উপার্জন করবে। (৫) কোন লোকই এটা জানে না যে, কোন ভূমিতে সে মৃত্যুবরণ করবে। একমাত্র আল্লাহই এসব বিষয়ের খবর রাখেন।” হযরত উমার (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, এক সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) একজন গ্রাম্য লোকের রূপ ধারণ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং ঈমান, ইসলাম ও ইহসান সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন উত্তর দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে বলেনঃ “পাঁচটি বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারও নেই।” অতঃপর তিনি (আরবী) (৩১:৩৪) -এই আয়াতটি পাঠ করেন। আর আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) -এর ভাবার্থ এই যে, জলভাগে ও স্থলভাগে যত কিছু অজৈব বস্তু বিদ্যমান রয়েছে, আল্লাহ পাকের জ্ঞান সেই সব কিছুকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছে। যমীন ও আসমানের অণু পরিমাণ জিনিসও তার থেকে গোপন নেই। কবি সারসারী কতই সুন্দর কথা বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ থেকে কোন অণু পরিমান জিনিসও গোপন থাকতে পরে না, দর্শকের সামনে তা প্রকাশিতই হাক বা গোপনীয়ই থাক না কেন।”
(আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তির তাৎপর্য এই যে, তিনি যখন অজৈব বস্তুর গতিরও খবর রাখেন তখন তিনি প্রাণীসমূহ, বিশেষ করে দানব ও মানবের গতি ও আমলের খবর কেন রাখবেন না? কেননা, তাদের উপর তো ইবাদত বন্দেগীর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। যেমন এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি চক্ষুসমূহের অবিশ্বস্ততা ও অন্তরের গোপন কথাও জানেন।” (৪০:১৯) স্থলভাগ ও জলভাগের প্রত্যেক বৃক্ষের উপরও একজন করে নিযুক্ত রয়েছেন, যিনি পাতাসমূহের পতনের শব্দ পর্যন্ত গণে রাখেন। লাওহে মাহফুযে প্রত্যেক আদ্র-শুষ্ক, প্রত্যেক সরল-বক্র এবং ভূ-পৃষ্ঠের অন্ধকারের মধ্যকার এক একটি অণু পরিমাণ বস্তুও লিখিত রয়েছে। প্রত্যেক গাছ এমন কি সঁচের ছিদ্রের উপরও ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছেন। তিনি গাছ সম্পর্কে লিখতে রয়েছেন যে, কখন সেটা সজীব হলো এবং কখন শুকিয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা দোয়াত ও লিপি সৃষ্টি করেন এবং দুনিয়ায় যত কিছু হবে, সবই লিপিবদ্ধ করেন। অর্থাৎ কিরূপ মাখলুক সৃষ্টি করা হবে, তার জীবিকা হালাল হবে কি হারাম হবে, তার আমল ভাল হবে কি মন্দ হবে ইত্যাদি সব কিছুই লিপিবদ্ধ করেন। হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তৃতীয় যমীনের নীচের এবং চতুর্থ যমীনের উপরের জ্বিনেরা তাদের নূর বা আলো প্রকাশ করতে চাইলো, কিন্তু কোন কোণ থেকেই তাদের নূর বা আলো প্রকাশ করতে পারলো না। এ হচ্ছে আল্লাহ তাআলার মহরসমূহ। প্রত্যেক মহরের উপর একজন ফেরেশতা রয়েছেন। আল্লাহ পাক প্রত্যহ একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দিয়ে বলেনঃ “যে মহরের দায়িত্ব তোমার উপর রয়েছে, তুমি তার হিফাযত করবে।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।