সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 38)
হরকত ছাড়া:
وما من دابة في الأرض ولا طائر يطير بجناحيه إلا أمم أمثالكم ما فرطنا في الكتاب من شيء ثم إلى ربهم يحشرون ﴿٣٨﴾
হরকত সহ:
وَ مَا مِنْ دَآبَّۃٍ فِی الْاَرْضِ وَ لَا طٰٓئِرٍ یَّطِیْرُ بِجَنَاحَیْهِ اِلَّاۤ اُمَمٌ اَمْثَالُکُمْ ؕ مَا فَرَّطْنَا فِی الْکِتٰبِ مِنْ شَیْءٍ ثُمَّ اِلٰی رَبِّهِمْ یُحْشَرُوْنَ ﴿۳۸﴾
উচ্চারণ: ওয়া মা-মিন দাব্বাতিন ফিল আরদিওয়ালা-তাইরিইঁ ইয়াতীরু বিজানা-হাইহি ইল্লাউমামুন আমছা-লুকুম মা-ফাররাতনা-ফিল কিতা-বি মিন শাইয়িন ছু ম্মা ইলারাব্বিহিম ইউহশারূন।
আল বায়ান: আর যমীনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণী এবং দু’ডানা দিয়ে উড়ে এমন প্রতিটি পাখি, তোমাদের মত এক একটি উম্মত। আমি কিতাবে কোন ত্রুটি করিনি। অতঃপর তাদেরকে তাদের রবের কাছে সমবেত করা হবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৮. আর যমীনে বিচরণশীল প্রতিটি জীব বা দু’ডানা দিয়ে উড়ে এমন প্রতিটি পাখি, তোমাদের মত এক একটি উম্মত। এ কিতাবে(১) আমরা কোন কিছুই বাদ দেইনি; তারপর তাদেরকে তাদের রব-এর দিকে একত্র করা হবে।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: ভূপৃষ্টে বিচরণশীল এমন কোন জীব নেই, আর দু’ডানা সহযোগে উড্ডয়নশীল এমন কোন পাখি নেই যারা তোমাদের মত একটি উম্মাত নয়। (লাওহে মাহ্ফুয অথবা আল-কুরআন) কিতাবে আমি কোন কিছুই বাদ দেইনি। অতঃপর তাদের প্রতিপালকের কাছে তাদেরকে একত্রিত করা হবে।
আহসানুল বায়ান: (৩৮) ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল প্রত্যেকটি জীব এবং (বায়ুমন্ডলে) নিজ ডানার সাহায্যে উড়ন্ত প্রত্যেকটি পাখী তোমাদের মতই এক একটি জাতি।[1] কিতাবে কোন কিছু লিপিবদ্ধ করতে ত্রুটি করিনি।[2] অতঃপর তাদের সকলকে স্বীয় প্রতিপালকের কাছে সমবেত করা হবে। [3]
মুজিবুর রহমান: ভূ-পৃষ্ঠে চলাচলকারী প্রতিটি জীব এবং বায়ুমন্ডলে ডানার সাহায্যে উড়ন্ত প্রতিটি পাখীই তোমাদের ন্যায় এক একটি জাতি, আমি কিতাবে কোন বিষয়ই লিপিবদ্ধ করতে বাদ রাখিনি। অতঃপর তাদের সকলকে তাদের রবের কাছে সমবেত করা হবে।
ফযলুর রহমান: পৃথিবীতে চলমান প্রতিটি প্রাণী এবং নিজের দুই ডানা দিয়ে উড্ডয়মান প্রতিটি পাখি তোমাদের মতই এক একটি জাতি। আমি কিতাবে কোন কিছুই (উল্লেখ করতে) অবহেলা করিনি। পরে সকলকে তাদের প্রভুর কাছে একত্র করা হবে।
মুহিউদ্দিন খান: আর যত প্রকার প্রাণী পৃথিবীতে বিচরণশীল রয়েছে এবং যত প্রকার পাখী দু’ ডানাযোগে উড়ে বেড়ায় তারা সবাই তোমাদের মতই একেকটি শ্রেণী। আমি কোন কিছু লিখতে ছাড়িনি। অতঃপর সবাই স্বীয় প্রতিপালকের কাছে সমবেত হবে।
জহুরুল হক: আর এমন কোনো পার্থিব জীব নেই এই পৃথিবীতে আর না আছে কোন উড়ন্ত প্রাণী যে উড়ে তার দুই ডানার সাহায্যে, যারা তোমাদের মতো এক সম্প্রদায়ের নয়। আমরা এই কিতাবে কোনো কিছুই ফেলে রাখি নি। অতঃপর তাদের প্রভুর দিকে তাদের একত্রিত করা হবে।
Sahih International: And there is no creature on [or within] the earth or bird that flies with its wings except [that they are] communities like you. We have not neglected in the Register a thing. Then unto their Lord they will be gathered.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৮. আর যমীনে বিচরণশীল প্রতিটি জীব বা দু’ডানা দিয়ে উড়ে এমন প্রতিটি পাখি, তোমাদের মত এক একটি উম্মত। এ কিতাবে(১) আমরা কোন কিছুই বাদ দেইনি; তারপর তাদেরকে তাদের রব-এর দিকে একত্র করা হবে।(২)
তাফসীর:
(১) এখানে কিতাব বলে, লাওহে মাহফুজের লেখা বোঝানো হয়েছে। তাতে সবকিছুই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। [তাবারী]
(২) এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, কেয়ামতের দিন মানুষের সাথে সর্বপ্রকার জানোয়ারকেও জীবিত করা হবে। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ কেয়ামতের দিন তোমরা সব হক আদায় করবে, এমনকি (আল্লাহ্ তা'আলা এমন সুবিচার করবেন যে,) কোন শিং বিশিষ্ট জন্তু কোন শিংবিহীন জন্তুকে দুনিয়াতে আঘাত করে থাকলে এ দিনে তার প্রতিশোধ তার কাছ থেকে নেয়া হবে। [মুসনাদে আহমাদঃ ২/৩৬২] এমনিভাবে অন্যান্য জন্তুর পারস্পরিক নির্যাতনের প্রতিশোধও নেয়া হবে। [মুসনাদে আহমাদঃ ২/৩৬২]
অন্য হাদীসে এসেছে, যখন তাদের পারস্পরিক অধিকার ও নির্যাতনের প্রতিশোধ নেয়া সমাপ্ত হবে, তখন আদেশ হবেঃ তোমরা সব মাটি হয়ে যাও। সব পক্ষীকুল ও জন্তু-জানোয়ার তৎক্ষণাৎ মাটির স্তুপে পরিণত হবে। এ সময়ই কাফেররা আক্ষেপ করে বলবেঃ (يَا لَيْتَنِي كُنْتُ تُرَابًا) অর্থাৎ “আফসোস আমিও যদি মাটি হয়ে যেতাম” এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে বেঁচে যেতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ (কেয়ামতের দিন) সব পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ করা হবে, এমনকি, শিংবিহীন ছাগলের প্রতিশোধ শিংবিশিষ্ট ছাগলের কাছ থেকে নেয়া হবে। [মুসনাদে আহমাদঃ ২/৩৬৩, ৫/১৭২-১৭৩; মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৩৪৫; ৪/৬১৯]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৮) ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল প্রত্যেকটি জীব এবং (বায়ুমন্ডলে) নিজ ডানার সাহায্যে উড়ন্ত প্রত্যেকটি পাখী তোমাদের মতই এক একটি জাতি।[1] কিতাবে কোন কিছু লিপিবদ্ধ করতে ত্রুটি করিনি।[2] অতঃপর তাদের সকলকে স্বীয় প্রতিপালকের কাছে সমবেত করা হবে। [3]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, এদেরকেও মহান আল্লাহ ঐভাবেই সৃষ্টি করেছেন, যেভাবে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। অনুরূপ তাদেরকেও তিনি রুযী দেন, যেরূপ তোমাদেরকে রুযী দেন এবং তোমাদের মত তারাও তাঁর শক্তি ও জ্ঞানের আওতাভুক্ত।
[2] ‘কিতাব’ বলতে ‘লাওহে মাহফূয’। অর্থাৎ, তাতে প্রতিটি জিনিসই লিপিবদ্ধ আছে। অথবা ‘কিতাব’ অর্থ কুরআন। যাতে সার-সংক্ষেপে কিংবা বিস্তারিতভাবে দ্বীনের প্রতিটি বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। যেমন, অন্যত্র বলেন, {وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ} ‘‘আমি তোমার উপর এমন বিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে রয়েছে প্রতিটি জিনিসের বর্ণনা।’’ (সূরা নাহল ৮৯) এখানে আলোচ্য বিষয়ের দিক দিয়ে প্রথম অর্থই (সঠিকতার) নিকটতর।
[3] অর্থাৎ, উল্লিখিত সমস্ত জাতিকেই কিয়ামতে একত্রিত করা হবে। এই দলীলের ভিত্তিতেই উলামাগণের একটি দল মনে করেন যে, যেভাবে সমস্ত মানুষকে জীবিত করে তাদের হিসাব নেওয়া হবে, অনুরূপ জীব-জন্তু এবং অন্যান্য সকল সৃষ্ট জীবকে জীবিত করে তাদেরও হিসাব নেওয়া হবে। (মহান আল্লাহ বলেছেন, যখন বন্য পশুগুলিকে একত্রিত করা হবে। সূরা তাকবীর ৫) আর এই ধরনের কথা একটি হাদীসেও নবী করীম (সাঃ) বলেছেন। ‘‘শিংবিশিষ্ট কোন ছাগল যদি শিংহীন কোন ছাগলের উপর যুলুম করে থাকে, তাহলে কিয়ামতের দিন শিংবিশিষ্ট ছাগলের কাছে থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে।’’ (মুসলিম ১৯৯৭নং) কোন কোন আলেম ‘হাশর’ (সমবেত) বলতে কেবল মৃত্যু মনে করেছেন। অর্থাৎ, সবাইকে মরতে হবে। আবার কোন কোন আলেম বলেছেন, এখানে ‘হাশর’ বলতে কাফেরদের হাশর এবং মধ্যে যেসব অন্যান্য কথা এসেছে তা বিচ্ছিন্ন ভিন্ন বিষয়। আর উল্লিখিত হাদীস (যাতে ছাগলের আপোসে প্রতিশোধ গ্রহণ করার কথা এসেছে) কেবল উদাহরণ পেশ করার জন্য এসেছে। এর উদ্দেশ্য কিয়ামতের হিসাব-নিকাশের গুরুত্বকে স্পষ্ট করা। অথবা জীব-জন্তুর মধ্যে কেবল অত্যাচারী ও অত্যাচারিতকে জীবিত করে অত্যাচারিতকে অত্যাচারীর নিকট থেকে বদলা নিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর উভয়ের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। (ফাতহুল ক্বাদীর ইত্যাদি) আর এর সমর্থন কোন কোন হাদীস থেকেও হয়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৭-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর:
কাফির মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সমস্যায় ফেলার জন্য বলে: কেন তার প্রতি কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না?
আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জবাব শিখিয়ে দিচ্ছেন যে, আল্লাহ তা‘আলা নিদর্শন প্রেরণে সক্ষম কিন্তু চাওয়ার সাথে সাথে তিনি তা দেন না কারণ চাওয়ার সাথে সাথে দেয়ার পর ঈমান না আনলে আল্লাহ তা‘আলা তৎক্ষণাৎ শাস্তি প্রদান করবেন যেমন পূর্ববর্তী উম্মাতের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَا مَنَعَنَآ أَنْ نُّرْسِلَ بِالْاٰيٰتِ إِلَّآ أَنْ كَذَّبَ بِهَا الْأَوَّلُوْنَ ط وَاٰتَيْنَا ثَمُوْدَ النَّاقَةَ مُبْصِرَةً فَظَلَمُوْا بِهَا وَمَا نُرْسِلُ بِالْاٰياتِ إِلَّا تَخْوِيْفًا)
“পূর্ববর্তীগণের নিদর্শন অস্বীকার করাই আমাকে নিদর্শন প্রেরণ করা হতে বিরত রাখে। আমি নিদর্শনস্বরূপ সামূদ জাতিকে উষ্ট্রী দিয়েছিলাম, অতঃপর তারা তার প্রতি জুলুম করেছিল। আমি কেবল ভীতি প্রদর্শনের জন্যই নিদর্শন প্রেরণ করি।”(সূরা ইসরা ১৭:৫৯)
(اُمَمٌ اَمْثَالُکُمْ)
‘তোমাদের মত একটি জাতি’- বিশিষ্ট তাবেয়ী মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: এসব জীবজন্তু ও পাখির কতকগুলো প্রকার রয়েছে যেগুলোর নাম জানা যায়। কাতাদাহ (রহঃ) বলেন: পাখি একটি জাতি, মানুষ একটি জাতি, জীন একটি জাতি।
সুদ্দী (রহঃ) বলেন:
(أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ)
অর্থাৎ তোমাদের মত সৃষ্টি জীব। (ইবনে কাসীর, ৩/২৮৭, ইবনু জারীর. ১১/১৩-১৪)
(مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتٰبِ مِنْ شَيْءٍ)
‘কিতাবে (লাওহে মাহফূজে) কোন কিছুই আমি বাদ দেইনি।’অর্থাৎ কিতাবে আমি কোন জিনিস উল্লেখ করতে ছাড়িনি- এখানে কিতাব দ্বারা উদ্দেশ্য লাওহে মাহফূজ। (তাফসীর মুয়াসসার, পৃ. ১৩২)
ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা সমস্ত সৃষ্টি জীবের খবর রাখেন। কাউকে আহার দান করতে এবং পরিচর্যা করতে তিনি ভুলে যান না, জলচর হোক বা স্থলচর হোক।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَا مِنْ دَا۬بَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَي اللّٰهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا ط كُلٌّ فِيْ كِتٰبٍ مُّبِيْنٍ)
“ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারী সকলের জীবিকার দায়িত্ব একমাত্র আল্লাহরই। তিনি তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত; সুস্পষ্ট কিতাবে (লাওহে মাহফূজ) সব কিছুই আছে।”(সূরা হূদ ১১:৬)
অতঃপর সব মাখলুক কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার কাছে উপস্থিত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِذَا الْوُحُوْشُ حُشِرَتْ)
“যখন বন্য পশুগুলোকে একত্রিত করা হবে।”(সূরা তাকবীর ৮১:৫)
নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: শিংবিশিষ্ট কোন ছাগল যদি শিংহীন কোন ছাগলের ওপর জুলুম করে তাহলে কিয়ামতের দিন শিংবিহীন ছাগল শিংবিশিষ্ট ছাগল থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। (সহীহ মুসলিম হা: ১৯৯৭)
(صُمُّ وَبُكْمٌ) ‘বধির ও বোবা’এ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার ১৮ নং আয়াতে অলোচনা হয়েছে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার কাছে কোন নিদর্শন চাওয়া হলে তা বিলম্ব করে দেয়ার পিছনে হিকমত রয়েছে।
২. জমিনে অসংখ্য উম্মাত বা জাতি রয়েছে।
৩. আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। আবার যাকে ইচ্ছা গুমরাহ করেন। তবে হিদায়াত পেতে হলে আল্লাহ তা‘আলার কাছে হিদায়াত চাইতে হবে এবং সেই পথে চলতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৭-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর:
মুশরিকদের ব্যাপারে ইরশাদ হচ্ছে- তারা বলেঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমাদের চাহিদা অনুযায়ী কোন নিদর্শন বা অলৌকিক জিনিস আল্লাহ আপনার উপর অবতীর্ণ করেন না কেন? যেমন যমীনে ঝরণা প্রবাহিত হওয়া ইত্যাদি। তাই ইরশাদ হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি বলে দাও যে, আল্লাহ তো এই কাজের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। কিন্তু এর বিলম্বে দূরদর্শিতা রয়েছে। তা এই যে, যদি তাদের চাহিদা অনুযায়ী মহান আল্লাহ কোন নিদর্শন অবতীর্ণ করে দেন এবং এর পরেও তারা ঈমান না আনে তবে তৎক্ষণাৎ তাদের উপর তার শাস্তি নেমে আসবে, মৃত্যু পর্যন্ত তাদেরকে অবসর দেয়া হবে না। যেমন পূর্ববর্তী উম্মতদের সাথে এরূপ ব্যবহারই করা হয়েছিল। আহলে সামূদের দৃষ্টান্ত তো তোমাদের সামনেই বিদ্যমান রয়েছে। আমি ইচ্ছে করলে নিদর্শনও দেখাতে পারি।
আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে মুশরিকদের দল! ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারী জীব-জন্তু এবং আকাশে উড়ডীয়মান পাখিও তোমাদের মতই বিভিন্ন প্রকারের রয়েছে।
মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এইসব জীব-জন্তু ও পাখির কতগুলো প্রকার রয়েছে যেগুলোর নাম প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, পাখিও একটি উম্মত এবং মানব-দানবও এক একটি উম্মত। এইসব উম্মতও তোমাদের মতই আল্লাহর সৃষ্টজীব।
অর্থাৎ সমস্ত জীবেরই আল্লাহ খবর রাখেন। কাউকেও আহার্য দান করতে তিনি ভুলে যান না। জলচরই হাক বা স্থলচরই হাক। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারী প্রত্যেক প্রাণীরই জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর উপর রয়েছে। (১১:৬) অর্থাৎ তিনি ঐ সব প্রাণীর সংখ্যা, বাসস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। এমন কি ওগুলোর অঙ্গভঙ্গি সম্পর্কেও তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। আর এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “এমন বহু প্রাণী রয়েছে যেগুলোর জীবিকার দায়িত্ব তোমার উপর নেই, আল্লাহই তাদেরকে এবং তোমাদেরকে জীবিকা দান করছেন, তিনি শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।` (২৯:৬০) হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে এক বছর ফড়িং অদৃশ্য হয়ে যায়। তিনি লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোন সন্ধান পেলেন না। ফলে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অতঃপর তিনি ইরাক, সিরিয়া প্রভৃতি দেশে লোক পাঠিয়ে সংবাদ নিলেন যে, কোন ফড়িং দেখা যায় কি-না। তখন ইয়ামান হতে আগত লোক কতগুলো ফড়িং তার সামনে এনে হাযির করে। তা দেখে তিনি তিনবার ‘আল্লাহু আকবার পাঠ করেন এবং বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেন, “আল্লাহ তা'আলা এক হাজার মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন, ছয়শ’ জলচর এবং চারশ’ স্থলচর। সর্ব প্রথম আল্লাহ পাক ফড়িংকে ধ্বংস করবেন। তারপর ক্রমান্বয়ে অন্যান্য সৃষ্টজীবকে ধ্বংস করতে থাকবেন, যেমনভাবে তাসবীহর দানা ঝরতে থাকে।”
(আরবী) অতঃপর তাদেরকে তাদের প্রভুর নিকট সমবেত করা হবে। অর্থাৎ এই সমুদয় উম্মতেরই মৃত্যু সংঘটিত হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, চতুষ্পদ জন্তুর মৃত্যুই ওদের হাশর হওয়া। এই সম্পর্কে অন্য একটি উক্তি এই রয়েছে যে, এই চতুষ্পদ জন্তুগুলোকেও কিয়ামতের দিন পুনরায় উঠানো হবে। যেহেতু আল্লাহ পাক বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ ‘এবং যখন চতুষ্পদ জন্তুগুলোকে একত্রিত করা হবে।' (৮১:৫) হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুটি ছাগলকে দেখলেন যারা একে অপরকে শিং দ্বারা মারছিল। তখন বললেনঃ হে আবু যার (রাঃ)! এরা কিভাবে লড়াই করছে তা কি তুমি জান? তিনি উত্তরে বললেনঃ জ্বীনা।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) তখন বললেনঃ ‘আল্লাহ কিন্তু অত্যাচারীকে জানেন এবং কিয়ামতের দিন এদেরও তিনি বিচার করবেন। আর যার (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে উড়ন্ত পাখী সম্পর্কেও জ্ঞান দান করেছেন। তিনি বলেন যে, শিং বিশিষ্ট বকরী হতে শিং বিহীন বকরী কিয়ামতের দিন প্রতিশোধ নিয়ে নেবে। (আরবী) সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ চতুষ্পদ জন্তু, ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী প্রাণী এবং পাখীসমূহকেও সৃষ্টি করবেন। প্রত্যেকেই অপর হতে নিজ নিজ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওগুলোকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “তোমরা সব মাটি হয়ে যাও! সেই সময় কাফিররাও আফসোস করে বলবেঃ হায়! আমরাও যদি মাটি হয়ে যেতাম!'
(আরবী) অর্থাৎ, যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তারা তাদের মূখতা ও নির্বুদ্ধিতার কারণে বধির ও মূকদের মত আর তারা অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে। তারা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। এমতাবস্থায় এই লোকগুলো সঠিক ও সোজা রাস্তার উপর কিরূপে চলতে পারে? তাদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত, যে আগুন জ্বালিয়েছে। ফলে ওর আশে-পাশের স্থান আলোকিত হয়েছে। হঠাৎ ঐ আগুন নিভে গেছে। কাজেই সে অন্ধকারের মধ্যে পড়ে গেছে। কিছুই সে দেখতে পায় না। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেছেন-(আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান সোজা সরল পথের উপর পরিচালিত করেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।