আল কুরআন


সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 23)

সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 23)



হরকত ছাড়া:

ثم لم تكن فتنتهم إلا أن قالوا والله ربنا ما كنا مشركين ﴿٢٣﴾




হরকত সহ:

ثُمَّ لَمْ تَکُنْ فِتْنَتُهُمْ اِلَّاۤ اَنْ قَالُوْا وَ اللّٰهِ رَبِّنَا مَا کُنَّا مُشْرِکِیْنَ ﴿۲۳﴾




উচ্চারণ: ছু ম্মা লাম তাকুন ফিতনাতুহুম ইল্লাআন কা-লূওয়াল্লা-হি রাব্বিনা-মা-কুন্না-মুশরিকীন।




আল বায়ান: অতঃপর তাদের পরীক্ষার জবাব শুধু এ হবে যে, তারপর তারা বলবে, ‘আমাদের রব আল্লাহর কসম! আমরা মুশরিক ছিলাম না’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৩. তারপর তাদের এ ছাড়া বলার অন্য কোন অজুহাত থাকবে না, আমাদের রব আল্লাহর শপথ! আমরা তো মুশরিকই ছিলাম না।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তখন তারা এ কথা বলা ছাড়া আর কোন ফিতনা সৃষ্টি করতে পারবে না যে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর কসম! আমরা মুশরিক ছিলাম না।




আহসানুল বায়ান: (২৩) অতঃপর তাদের এ কথা বলা ভিন্ন অন্য কোন ওজুহাত থাকবে না যে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর শপথ! আমরা তো অংশীবাদী ছিলাম না।’ [1]



মুজিবুর রহমান: তখন তাদের এ কথা বলা ব্যতীত আর কোন কথা বলার থাকবেনা, তারা বলবেঃ আল্লাহর শপথ, হে আমাদের রাব্ব! আমরা মুশরিক ছিলামনা।



ফযলুর রহমান: তখন তাদের কোন অজুহাত থাকবে না; শুধু বলবে, “আমাদের প্রভু আল্লাহর কসম! আমরা মুশরিক ছিলাম না।”



মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর তাদের কোন অপরিচ্ছন্নতা থাকবে না; তবে এটুকুই যে তারা বলবে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর কসম, আমরা মুশরিক ছিলাম না।



জহুরুল হক: তখন তাদের আর কিছু অজুহাত থাকবে না এই বলা ছাড়া -- "আমাদের প্রভু আল্লাহ্‌র কসম, আমরা বহুখোদাবাদী ছিলাম না।"



Sahih International: Then there will be no [excuse upon] examination except they will say, "By Allah, our Lord, we were not those who associated."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৩. তারপর তাদের এ ছাড়া বলার অন্য কোন অজুহাত থাকবে না, আমাদের রব আল্লাহর শপথ! আমরা তো মুশরিকই ছিলাম না।(১)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে তাদের উত্তরকে فِتْنَةُ শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। এ শব্দটি কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। পরীক্ষার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তখন আয়াতের অর্থ হবে, তাদের পরীক্ষায় তারা উপরোক্ত উত্তর দিবে। এ অর্থে তাদের পরীক্ষার উত্তরকেই পরীক্ষা বলা হয়েছে। আবার শব্দটির অন্য অর্থ হতে পারে, তাদের ফিতনার শাস্তি। তখন ফিতনা অর্থ কুফর ও শির্ক। অর্থাৎ তাদের কুফর ও শির্কের শাস্তি তাই হবে যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। কাতাদা বলেন, এখানে ফিতনা বলে তাদের ওযর আপত্তি পেশ করাকে বোঝানো হয়েছে। [কুরতুবী]

তাছাড়া ফিতনা শব্দটি কারো প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এ অর্থের উদ্দেশ্য এই যে, এরা পৃথিবীতে এসব মূর্তি ও স্বহস্ত নির্মিত উপাস্যদের প্রতি আসক্ত ছিল, স্বীয় অর্থ-সম্পদ এদের জন্যই উৎসর্গ করত। কিন্তু আজ সব ভালবাসা ও আসক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে এবং এ ছাড়া তাদের মুখে কোন উত্তর যোগাচ্ছে না। কাজেই তাদের থেকে নির্লিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হওয়ারই দাবী করে বসল। [বাগভী]

তাদের উত্তরে একটি বিস্ময়কর বিষয় এই যে, কেয়ামতের ভয়াবহ ও লোমহর্ষক দৃশ্যাবলী এবং রাব্বুল আলামীন-এর শক্তি-সামর্থ্যের অভাবনীয় ঘটনাবলী দেখার পর তারা কোন সাহসে রাব্বুল আলামীন-এর সামনে দাঁড়িয়ে এমন নির্জলা মিথ্যা বলবে! তাও এমন বলিষ্ঠ চিত্তে যে, আল্লাহর মহান সত্তার কসম খেয়ে বলবে যে, আমরা মুশরিক ছিলাম না। অধিকাংশ মুফাসসিরগণ এর উত্তরে বলেনঃ তাদের এ উক্তি বিবেক-বুদ্ধি ও পরিণামদৰ্শিতার উপর ভিত্তিশীল নয়, বরং ভয়ের আতিশয্যে হতবুদ্ধিতার আবেশে মুখে যা এসেছে, তাই বলেছে।

কিন্তু হাশরের সাধারণ ঘটনাবলী ও অবস্থা চিন্তা করলে এ কথাও বলা যায় যে, আল্লাহ্ তাআলা তাদের পূর্ণ অবস্থা দৃষ্টির সামনে আনার জন্য এ শক্তিও দিয়েছেন যে, তারা পৃথিবীর মত অবাধ ও মুক্ত পরিবেশে যা ইচ্ছা বলুক- যাতে কুফর ও শির্কের সাথে সাথে তাদের এ দোষটিও হাশরবাসীদের জানা হয়ে যায় যে, তারা মিথ্যা ভাষণে অদ্বিতীয় পটু, এহেন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও তারা মিথ্যা বলতে দ্বিধা করে না। কুরআনুল কারীমের অপর এক আয়াতে বলা হয়েছে যে, কাফিররা হাশরের মাঠে “আল্লাহর সাথে শপথ করে মিথ্যা বলবে, যেমন আজ মুসলিমদের সামনে মিথ্যা শপথ করে থাকে।” [দেখুন, সূরা আল-মুজাদালাহ ১৮]

সুতরাং বোঝা গেল যে, তারা স্বয়ং রাব্বুল আলামীন-এর সামনেও মিথ্যা কসম খেতে দ্বিধা করবে না। হাশরের ময়দানে যখন তারা কসম খেয়ে নিজ নিজ শির্ক ও কুফরী অস্বীকার করবে, তখন সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তা'আলা তাদের মুখে মোহর এঁটে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও হস্ত-পদকে নির্দেশ দিবেন যে, তোমরা সাক্ষ্য দাও, তারা কি করত। তখন প্রমাণিত হবে যে, আমাদের হস্ত-পদ, চক্ষু-কর্ণ -এরা সবাই ছিল আল্লাহ্ তা'আলার গুপ্ত পুলিশ। তারা সব কাজকর্ম একটি একটি করে সামনে তুলে ধরবে। এ সম্পর্কেই সূরা ইয়াসীনে বলা হয়েছেঃ “আমি আজ এদের মুখে মোহর মেরে দেব, এদের হাত কথা বলবে আমার সাথে এবং এদের পা সাক্ষ্য দেবে এদের কৃতকর্মের।” [ইয়াসীনঃ ৬৫]

এহেন ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করার পর আর কেউ কোন তথ্য গোপনে ও মিথ্যা ভাষণে দুঃসাহসী হবে না। অন্য আয়াতে বলা হয়েছেঃ (وَلَا يَكْتُمُونَ اللَّهَ حَدِيثًا) অর্থাৎ “আর তারা আল্লাহ হতে কোন কথাই গোপন করতে পারবে না।” [সূরা আন-নিসাঃ ৪২] আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর মতে এর অর্থ এই যে, প্রথমে তারা খুব মিথ্যা বলবে এবং মিথ্যা শপথ করবে, কিন্তু স্বয়ং তাদের হস্ত-পদ যখন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে, তখন কেউ ভুল কথা বলতে সাহসী হবে না। মহা বিচারপতির আদালতে সম্পূর্ণ মুক্ত পরিবেশে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দেয়া হবে। পৃথিবীতে যেভাবে সে মিথ্যা বলত, তখনো তার মিথ্যা বলার এ ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়া হবে না। কেননা, সর্বশক্তিমান আল্লাহ তার মিথ্যার আবরণ স্বয়ং তার হস্তপদের সাক্ষ্য দ্বারা উন্মোচিত করে দেবেন। ফলে তারা কোন কিছুই গোপন করতে সমর্থ হবে না। [তাবারী; কুরতুবী; ইবন কাসীর]

মৃত্যুর পর কবরে মুনকীর-নকীর ফিরিশতাদ্বয়ের সামনে প্রথম পরীক্ষা হবে। এ পরীক্ষা সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছেঃ মুনকীর-নকীর যখন কাফেরকে জিজ্ঞেস করবে, مَنْ رَبُّكَ، وَمَا دِينُكَ، وَمَنْ نَبِيُّكَ অর্থাৎ তোমার রব কে, তোমার দ্বীন কি? তোমার নবী কে? কাফের বলবেঃ هٰاهْ هٰاهْ لاٰ أدرِي অর্থাৎ হায়! হায়!! আমি কিছুই জানি না! এর বিপরীতে মুমিন বলবে, আমার রব আল্লাহ, আমার দ্বীন ইসলাম এবং আমার নবী মুহাম্মাদ। [আবু দাউদ: ৪৭৫৩] এতে বুঝা যায় যে, এ পরীক্ষায় কেউ মিথ্যা বলার ধৃষ্টতা দেখাতে পারবে না। নতুবা কাফেরও মুমিনের ন্যায় উত্তর দিতে পারতো।

কারণ এই যে, এখানে পরীক্ষক হচ্ছেন ফিরিশতা। তারা অদৃশ্য বিষয় জ্ঞাত নয় এবং তারা হস্তপদের সাক্ষ্যও গ্রহণ করতে অক্ষম। এখানে মিথ্যা বলার ক্ষমতা মানুষকে দেয়া হলে ফিরিশতা তার উত্তর অনুযায়ীই কাজ করত, ফলে পরীক্ষার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যেত। হাশরের পরীক্ষা এরূপ নয়। সেখানে প্রশ্ন ও উত্তর সরাসরি সর্বজ্ঞ, সর্বজ্ঞাত ও সর্বশক্তিমানের সাথে হবে। সেখানে কেউ মিথ্যা বললেও তা কার্যকরী হবে না। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা বান্দার সাথে হাশরের মাঠের সাক্ষাতে বলবেন, হে অমুক! আমি কি তোমাকে সম্মানিত করিনি?

তোমাকে নেতা বানাইনি? তোমাকে বিয়ে-শাদী দেইনি? তোমার জন্য ঘোড়া উট করায়ত্ত্ব করে দেইনি? তোমাকে নেতৃত্ব দিতে ও আরামে ঘুরতে ফিরতে দেইনি। তখন সে বলবে, হ্যাঁ, তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি কি বিশ্বাস করতে যে, আমার সাথে তোমার সাক্ষাত হবে? সে বলবে, না। তখন তিনি বলবেন, আজ আমি তোমাকে ছেড়ে যাব যেমন তুমি আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলে।

তারপর দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে অনুরূপ করবেন, সেও তা বলবে আর আল্লাহ্ তা'আলাও তদ্রুপ উত্তর করবেন। তারপর তৃতীয় ব্যক্তিকে অনুরূপ বলবেন, সে বলবে, হে রব! আমি আপনার উপর, আপনার কিতাবের উপর ও আপনার রাসূলের উপর ঈমান এনেছিলাম, সালাত ও রোযা আদায় করেছিলাম, দান করেছিলাম এবং যত পারে প্রশংসা করবে। তখন তাকে বলা হবে এখানে তাহলে (অপেক্ষা কর)। তারপর তাকে বলা হবে, এখন তোমার উপর সাক্ষ্য উত্থাপন করা হবে। সে তখন তার মনে চিন্তা করবে, সেটা আবার কে যে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে? তখন তার মুখে মোহর মেরে দেয়া হবে, আর তার উরু, মাংস ও অস্থিকে কথা বলতে নির্দেশ দেয়া হবে, ফলে তার উরু, মাংস ও অস্থি তার আমল সম্পর্কে বলবে ... [মুসলিম: ২৯৬৮]

কোন কোন মুফাসসিরের মতে, যারা মিথ্যা কসম খেয়ে মিথ্যা শির্ককে অস্বীকার করবে, তারা হলো সেসব লোক, যারা কোন সৃষ্টজীবকে খোলাখুলি আল্লাহ কিংবা আল্লাহর প্রতিনিধি না বলেও আল্লাহর সব ক্ষমতা সৃষ্টজীবে বন্টন করে দিয়েছিল। তারা নিজেদেরকে মুশরিক মনে করতো না। তাই হাশরের ময়দানেও কসম খেয়ে বলবে যে, তারা মুশরিক ছিল না। [ফাতহুল কাদীর] কিন্তু কসম খাওয়া সত্বেও আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৩) অতঃপর তাদের এ কথা বলা ভিন্ন অন্য কোন ওজুহাত থাকবে না যে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর শপথ! আমরা তো অংশীবাদী ছিলাম না।’ [1]


তাফসীর:

[1] فتنة এর একটি অর্থ ‘হুজ্জত’ এবং আর একটি অর্থ ‘ওজুহাত’ করা হয়েছে। পরিশেষে এরা হুজ্জত অথবা ওজুহাত পেশ করে নিষ্কৃতি লাভের প্রচেষ্টা চালিয়ে বলবে যে, ‘আমরা তো মুশরিকই ছিলাম না।’ ইমাম ইবনে জারীর এর অর্থ করেছেন, ‘যখন আমি তাদেরকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবো, তখন দুনিয়াতে যে শিরক তারা করেছে তার স্বপক্ষে ওজুহাত পেশ করার জন্য এ কথা বলা ছাড়া তাদের আর অন্য কোন উপায় থাকবে না যে, আমরা তো মুশরিকই ছিলাম না।’ এখানে এই জটিলতা সৃষ্টি যেন না হয় যে, ওখানে (আখেরাতে) তো মানুষের হাত-পা সাক্ষী দিবে এবং জিহ্বার উপর তালা-মোহর লেগে যাবে, অতএব এই অস্বীকার করা কিভাবে সম্ভব হবে? এর উত্তর ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই দিয়েছেন যে, যখন মুশরিকরা দেখবে যে, তাওহীদবাদী মুসলিমরা জান্নাতে যাচ্ছে, তখন এরা আপোসে পরামর্শ করে নিজেদের শিরক করার কথাকে অস্বীকার করে দেবে। তখন মহান আল্লাহ তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দেবেন এবং তাদের হাত-পা তাদের যাবতীয় কৃতকর্মের সাক্ষী দেবে। ফলে তারা আল্লাহর নিকটে কোন জিনিস গোপন করার সামর্থ্য রাখবে না। (ইবনে কাসীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২২-২৬ নং আয়াতের তাফসীর:



যারা মুশরিক অবস্থায় মারা গেছে কিয়ামতের দিন তাদের কী করূণ অবস্থা হবে সে অবস্থার কথা এ আয়াতগুলোতে তুলে ধরা হয়েছে।



সে দিন মুশরিকদেরকে আল্লাহ তা‘আলা জিজ্ঞেস করবেন: আমার সাথে যাদেরকে শরীক মনে করে ডাকতে, যাতে আমার কাছে সুপারিশ করতে পারে, যাদের কাছে সন্তান চাইতে, বিপদে আপদে তাদের পায়ে সিজদাহ করতে তারা আজ কোথায়?



যখন সেসব মুশরিকরা এ প্রশ্নের সম্মুখীন হবে তখন আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করে বলবে: কখনো আমরা মুশরিক ছিলাম না।



আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(وَيَوْمَ يُنَادِيْهِمْ فَيَقُوْلُ أَيْنَ شُرَكَآئِيَ الَّذِيْنَ كُنْتُمْ تَزْعُمُوْنَ)‏



“এবং সেদিন তিনি তাদেরকে আহ্বান করে বলবেন: ‘তোমরা যাদেরকে আমার শরীক গণ্য করতে, তারা কোথায়?’ (সূরা কাসাস ২৮:৬২)



আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলেন: দেখ, কিভাবে তারা নিজেদের ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলে। অথচ তারা যাদেরকে ডাকত তারা আজ উধাও। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(ثُمَّ قِيْلَ لَهُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ تُشْرِكُوْنَ)‏



“পরে তাদেরকে বলা হবেঃ কোথায় তারা যাদেরকে তোমরা (আল্লাহর) শরীক করতে।”(সূরা মু’মিন ৪০:৭৩)



অতএব যারা আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে অন্যকে ডাকে, অন্যের নামে মানত করে, অন্যকে সিজদাহ করে, অন্যের কাছে চায় ইত্যাদি শির্কী কর্মে লিপ্ত তাদের সতর্ক হওয়া উচিত।



তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, মুশরিকরা তোমার কাছে এসে কান পেতে কুরআন শুনে কিন্তু হিদায়াতের উদ্দেশ্যে নয়, তাই আমি তাদের অন্তরে আবরণ ফেলে দিয়েছি। আর বধির করে দিয়েছি ফলে কুরআন শুনে তাদের কোন উপকার হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَثَلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا كَمَثَلِ الَّذِيْ يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَا۬ٓءً وَّنِدَا۬ٓءً ط صُمّۭ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُوْنَ)



“আর যারা কুফরী করেছে তাদের দৃষ্টান্ত ওদের ন্যায় যাদেরকে কেউ আহ্বান করলে শুধু চিৎকার ও শব্দ ব্যতীত আর কিছুই শুনে না। তারা বধির, মূক, অন্ধ। কাজেই তারা বুঝতে পারে না।”(সূরা বাক্বারাহ ২:১৭১)



(وَيَنْهَوْنَ عَنْهُ)



‘তারা অন্যকে তা শ্রবণে বিরত রাখে’অর্থাৎ সাধারণ মানুষদেরকে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও কুরআন থেকে বাধা দেয় এবং নিজেরাও তার অনুসরণ থেকে দূরে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তারা কেবল নিজেদেরকেই ধ্বংস করছে।



সুতরাং কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউ কারো কোন উপকার করতে পারবে না। সে দিন মুশরিকরা আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে যাদেরকে ডাকতো তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। অতএব তাদেরকে বর্জন করে আল্লাহ তা‘আলার পথে ফিরে আসা উচিত।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আহলে কিতাবদেরকে কেবল পার্থিব লালসাই ইসলাম গ্রহণে বাধা দিয়েছে।

২. মুশরিকগণ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার প্রশ্নের জবাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাবে।

৩. ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে ঠাট্টা ও হেয় প্রতিপন্ন করা মুনাফিক ও অমুসলিমদের কাজ। আর তারাই বলে- এসব আগের দিনের কাহিনী বা এমন বিধি-বিধান যা বর্তমানে অকেজো।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২২-২৬ নং আয়াতের তাফসীর:

এখানে আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন- আমি যখন কিয়ামতের দিন তাদেরকে একত্রিত করবো তখন তাদেরকে ঐসব প্রতিমা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করবো আল্লাহকে ছেড়ে তারা যেগুলোর উপাসনা করতো। তিনি বলবেন, আল্লাহ তাআলার সাথে তোমরা যেসব প্রতিমাকে শরীক করতে সেগুলো আজ কোথায়? আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ, তাদের ওযর-আপত্তি ও দলীল শুধুমাত্র এতটুকুই হবে যে, তারা বলবে-আল্লাহর কসম! আমরা মুশরিক ছিলাম না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁর কাছে একটি লোক এসে বললো, হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! আপনি তো শুনেছেন যে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-(আরবী) অর্থাৎ, আল্লাহর কসম! আমরা মুশরিক ছিলাম না। কিন্তু এটা কিভাবে হবে? তখন তিনি বললেন, যখন মুশরিকরা দেখবে যে, নামাযী ছাড়া আর কেউ জান্নাতে প্রবেশ করছে না তখন তারা পরস্পর বলাবলি করবে- এসো আমরা শিরক করাকে অস্বীকার করি।' একথা বলে তারা নিজেদের মুশরিক হওয়াকে অস্বীকার করে বসবে। তখন আল্লাহ পাক তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দিবেন। অতঃপর তাদের হাত পা তাদের মুশরিক হওয়ার সাক্ষ্য দিতে থাকবে, ফলে তারা কোন কথাই আর গোপন করতে পারবে না। হে প্রশ্নকারী! সুতরাং এখন তো তোমার মনে কোন সন্দেহ রইলো না যে, কুরআন কারীমে এমন কোন কথা। অবশিষ্ট নেই যা খুলে খুলে বলার অপেক্ষা রাখে। কিন্তু তুমি বুঝতে পার না এবং ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতেও সক্ষম নও। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু এখানে সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে যে, এই আয়াতটি তো মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল, আর মক্কায় আবার মুনাফিক ছিল কোথায়? মদীনায় ইসলাম সাধারণভাবে গৃহীত হওয়ার পরে তো তাদের দল সৃষ্টি হয়। মুনাফিকদের ব্যাপারে যে আয়াত অবতীর্ণ হয় তা হচ্ছে আয়াতে মুজাদালাহ। তা হচ্ছে-(আরবী) অর্থাৎ “যেই দিন আল্লাহ তাদেরকে একত্রিত করবেন (অর্থাৎ কিয়ামতের দিন), সেই দিন তারা আল্লাহর নামে কসম খেয়ে খেয়ে বর্ণনা করতে থাকবে।” (৫৮:১৮) অনুরূপভাবে আল্লাহ পাক এখানে ঐ লোকদের সম্পর্কে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ লক্ষ্য কর, তারা নিজেদের সম্পর্কে কিরূপ মিথ্যা বলছে! তখন যাদেরকে তারা মিথ্যা মা’দ মনোনীত করেছিল, তারা সবাই নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে।

ইরশাদ হচ্ছে-তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা মনোযোগ সহকারে কান লাগিয়ে তোমার (মুহাম্মাদ সঃ) কথা শুনে থাকে, কিন্তু তাদের দুষ্কর্মের কারণে যাতে তারা তোমার কথা ভালরূপে বুঝতে না পারে সে জন্যে আমি তাদের অন্তরের উপর আবরণ রেখে দিয়েছি এবং তাদের কানে বধিরতা রেখেছি, যাতে তারা শুনতে না পায়, তারা যদি সমস্ত আয়াত ও প্রমাণাদিও অবলোকন করে তথাপি তারা ঈমান আনবে না। তারা অহী শুনবার জন্যে এসে থাকে, কিন্তু এই শ্রবণে তাদের কোনই উপকার হয় না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অপর এক জায়গায় বলেছেন, তাদের দৃষ্টান্ত সেই চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় যে তার রাখালের শব্দ ও ডাক শুনে বটে, কিন্তু অর্থ কিছুই বুঝে না। অতঃপর মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা দলীল প্রমাণাদি অবলোকন করে থাকে বটে, কিন্তু তাদের না আছে কোন বিবেক বুদ্ধি এবং না তারা ন্যায়পরায়ণতার সাথে কাজ করে থাকে, সুতরাং তারা ঈমান আনবে কিরূপে? এরপর আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ যদি তাদের মধ্যে কল্যাণ লাভের সামর্থ্য থাকতো তবে আল্লাহ তাদেরকে শুনার তাওফীক দিতেন। আর যখন তারা তোমার কাছে আসে তখন তর্ক বিতর্কে লিপ্ত হয়ে যায় এবং বাতিল ও অযৌক্তিক কথা পেশ করতঃ সত্যকে লোপ করে দেয়ার চেষ্টা করে। তারা বলে- হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যেসব কথা আপনি অহীর নাম দিয়ে পেশ করছেন ওগুলো তো পূর্ববর্তী লোকদের কাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা জনগণকে নবী (সঃ)-এর সাথে যোগাযোগ করতে বাধা প্রদান করে এবং তারা নিজেরাও দূরে সরে থাকে।

(আরবী) -এর তাফসীরে দু'টি উক্তি রয়েছে। একটি হচ্ছে যে, তারা জনগণকে সত্যের অনুসরণ, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যতা স্বীকারকরণ এবং কুরআন কারীমের অনুসরণ হতে বিরত রাখে এবং নিজেরাও এগুলো থেকে দুরে সরে থাকে। তারা যেন দু'টি খারাপ করে থাকে। তা হল এই যে, তারা না নিজেরা উপকৃত হয়, না অন্যদেরকে উপকার লাভ করতে দেয়। দ্বিতীয় উক্তি হল এই যে, (আরবী) -এর ভাবার্থ হল-জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কষ্ট দেয়ার চেষ্টা করলে আবু তালিব তাদেরকে বাধা দিতেন। সেই সম্পর্কেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। সাঈদ ইবনে আবূ হিলাল বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দশজন চাচা সম্পর্কে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। তারা সবাই লোকদেরকে তাঁকে হত্যা করা থেকে বাধা প্রদান করতো বটে, কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় এই যে, তারা নিজেরা ঈমানের বরকত লাভ থেকে বঞ্চিত থাকতেন। সুতরাং তাঁরা ছিলেন বাহ্যতঃ তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল, কিন্তু ভিতরে ছিলেন তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারী। এর পর ইরশাদ হচ্ছে যে, তারা নির্বুদ্ধিতা বশতঃ নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তারা এ কথাটা মোটেই বুঝছে না যে, তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি ও ধ্বংস টেনে আনছে!





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।