সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 151)
হরকত ছাড়া:
قل تعالوا أتل ما حرم ربكم عليكم ألا تشركوا به شيئا وبالوالدين إحسانا ولا تقتلوا أولادكم من إملاق نحن نرزقكم وإياهم ولا تقربوا الفواحش ما ظهر منها وما بطن ولا تقتلوا النفس التي حرم الله إلا بالحق ذلكم وصاكم به لعلكم تعقلون ﴿١٥١﴾
হরকত সহ:
قُلْ تَعَالَوْا اَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّکُمْ عَلَیْکُمْ اَلَّا تُشْرِکُوْا بِهٖ شَیْئًا وَّ بِالْوَالِدَیْنِ اِحْسَانًا ۚ وَ لَا تَقْتُلُوْۤا اَوْلَادَکُمْ مِّنْ اِمْلَاقٍ ؕ نَحْنُ نَرْزُقُکُمْ وَ اِیَّاهُمْ ۚ وَ لَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَ مَا بَطَنَ ۚ وَ لَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِیْ حَرَّمَ اللّٰهُ اِلَّا بِالْحَقِّ ؕ ذٰلِکُمْ وَصّٰکُمْ بِهٖ لَعَلَّکُمْ تَعْقِلُوْنَ ﴿۱۵۱﴾
উচ্চারণ: কুল তা‘আ-লাও আতলুমা-হাররামা রাব্বুকুম ‘আলাইকুম আল্লা-তুশরিকূবিহী শাইআওঁ ওয়া বিলওয়া-লিদাইনি ইহছা-নাওঁ ওয়ালা-তাকতুলূআওলা-দাকুম মিন ইমলা-কিন নাহনুনারযুকুকুম ওয়া ইয়্যা-হুম ওয়ালা-তাকরাবুল ফাওয়া-হিশা মা-জাহারা মিনহা-ওয়ামা-বাতানা ওয়ালা-তাকতুলুন্নাফছাল্লাতী হাররামালা-হু ইল্লা-বিলহাক্কি যা-লিকুম ওয়াসসা-কুম বিহী লা‘আল্লাকুম তা‘কিলূন।
আল বায়ান: বল, ‘এসো, তোমাদের উপর তোমাদের রব যা হারাম করেছেন, তা তিলাওয়াত করি যে, তোমরা তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না এবং মা-বাবার প্রতি ইহসান করবে আর দারিদ্রের কারণে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। আমিই তোমাদেরকে রিয্ক দেই এবং তাদেরকেও। আর অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হবে না- তা থেকে যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে। আর বৈধ কারণ ছাড়া তোমরা সেই প্রাণকে হত্যা করো না, আল্লাহ যা হারাম করেছেন। এগুলো আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৫১. বলুন(১), এস(২), তোমাদের রব তোমাদের উপর যা হারাম করেছেন তোমাদেরকে তা তিলাওয়াত করি, তা হচ্ছে, তোমরা তাঁর সাথে কোন শরীক করবে না(৩) পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে(৪), দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, আমরাই তোমাদেরকে ও তাদেরকে রিযক দিয়ে থাকি(৫)। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল কাজের ধারে কাছেও যাবে না(৬)। আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা তাকে হত্যা করবে না(৭)। তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা বুঝতে পার।
তাইসীরুল ক্বুরআন: বল, ‘এসো, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ করেছেন তা পড়ে শোনাই, তা এই যে, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর, দরিদ্রতার ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না, আমিই তোমাদেরকে আর তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি, প্রকাশ্য বা গোপন কোন অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না, আল্লাহ যে প্রাণ হরণ করা হারাম করেছেন তা ন্যায় সঙ্গত কারণ ছাড়া হত্যা করো না। এ সম্পর্কে তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা চিন্তা- ভাবনা করে কাজ কর।
আহসানুল বায়ান: (১৫১) বল, এসো, তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালক যা নিষিদ্ধ করেছেন তা তোমাদেরকে পড়ে শোনাই।[1] তা এইঃ তোমরা কোন কিছুকে তাঁর অংশী করবে না,[2] মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে,[3] দারিদ্রে্র কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না।[4] আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল আচরণের নিকটবর্তীও হয়ো না এবং আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত[5] তাকে হত্যা করো না। তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা অনুধাবন কর।
মুজিবুর রহমান: লোকদেরকে বলঃ তোমরা এসো! তোমাদের রাব্ব তোমাদের প্রতি কি কি বিধি-নিষেধ আরোপ করেছেন তা আমি তোমাদেরকে পাঠ করে শোনাই; তা এই যে, তোমরা তাঁর সাথে কেহকেই শরীক করবেনা, মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্রতার ভয়ে নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করবেনা। কেননা আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দিই; আর অশ্লীল কাজ ও কথার নিকটেও যেওনা, তা প্রকাশ্যই হোক কিংবা গোপনীয়ই হোক, আর আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন - যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করনা। এসব বিষয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা অনুধাবন করতে পার।
ফযলুর রহমান: বল, “এদিকে এসো, তোমাদের প্রভু তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ করেছেন আমি তা পড়ে শোনাই। তা এই যে, তোমরা তার সাথে কোনকিছু শরীক করবে না। এছাড়া পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। দারিদ্রের ভয়ে নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না।” তোমাদেরকে ও তাদেরকে আমিই জীবিকা দান করি। “প্রকাশ্য হোক কিংবা গোপন হোক অশ্লীল কাজের কাছেও যাবে না। ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া মানুষ হত্যা করবে না, যা আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি তোমাদেরকে এই আদেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার।”
মুহিউদ্দিন খান: আপনি বলুনঃ এস, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পাঠ করে শুনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তাএই যে, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না, পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার করো স্বীয় সন্তানদেরকে দারিদ্রে?480; কারণে হত্যা করো না, আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার দেই, নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না, প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য, যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; কিন্তু ন্যায়ভাবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা বুঝ।
জহুরুল হক: বলো -- "এসো আমি বাতলে দিই তোমাদের প্রভু তোমাদের জন্য কি নিষেধ করেছেন, -- তোমরা তাঁর সঙ্গে অন্য কিছু শরিক করো না, আর পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, আর তোমাদের সন্তানদের তোমরা হত্যা করো না দারিদ্রের কারণে," -- আমারাই জীবিকা দিই তোমাদের ও তাদেরও, -- "আর অশ্লিলতার ধারে-কাছেও যেও না তার যা প্রকাশ পায় ও যা গোপন থাকে, আর তেমন কোনো লোককে হত্যা করো না যাকে আল্লাহ্ নিষেধ করেছেন, -- যথাযথ কারণ ব্যতীত। এইসব দিয়ে তিনি তোমাদের আদেশ জারি করেছেন, যেন তোমরা বুঝতে পারো।
Sahih International: Say, "Come, I will recite what your Lord has prohibited to you. [He commands] that you not associate anything with Him, and to parents, good treatment, and do not kill your children out of poverty; We will provide for you and them. And do not approach immoralities - what is apparent of them and what is concealed. And do not kill the soul which Allah has forbidden [to be killed] except by [legal] right. This has He instructed you that you may use reason."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৫১. বলুন(১), এস(২), তোমাদের রব তোমাদের উপর যা হারাম করেছেন তোমাদেরকে তা তিলাওয়াত করি, তা হচ্ছে, তোমরা তাঁর সাথে কোন শরীক করবে না(৩) পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে(৪), দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, আমরাই তোমাদেরকে ও তাদেরকে রিযক দিয়ে থাকি(৫)। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল কাজের ধারে কাছেও যাবে না(৬)। আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা তাকে হত্যা করবে না(৭)। তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা বুঝতে পার।
তাফসীর:
(১) আগত আয়াতসমূহে সেসব বস্তু সম্পর্কে বলা হয়েছে, যেগুলোকে আল্লাহ্ তাআলা হারাম করেছেন। বিশদ বর্ণনায় নয়টি বস্তুর উল্লেখ হয়েছে। এরপর দশম নির্দেশ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “এ দ্বীনই হচ্ছে আমার সরল পথ। এ পথের অনুসরণ কর”। এতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দ্বীন যে বিষয়কে হালাল বলেছে, তাকে হালাল এবং যে বিষয়কে হারাম বলেছে, তাকে হারাম মনে করবে- নিজের পক্ষ থেকে হালাল-হারামের ফতোয়া জারি করবে না। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনীত পথকে অনুসরনের তাগিদ দেয়া হয়েছে। তাঁর পথ ব্যতীত আরও বহু পথ রয়েছে সেগুলো মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। সঠিক পথ একটি, আর বাতিল পথ অনেক। যারা আল্লাহর পথে চলবে আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। [সা’দী]
আগত আয়াতসমূহে যে দশটি বিষয় বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে, (১) আল্লাহ তা'আলার সাথে কাউকে ইবাদাত ও আনুগত্যে অংশীদার স্থির করা, (২) পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার না করা, (৩) দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা করা, (৪) অশ্লীল কাজ করা, (৫) কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা, (৬) ইয়াতীমের ধন-সম্পদ অবৈধভাবে আত্মসাৎ করা, (৭) ওজন ও মাপে কম দেয়া, (৮) সাক্ষ্য, ফয়সালা অথবা অন্যান্য কথাবার্তায় অবিচার করা, (৯) আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ না করা এবং (১০) আল্লাহ্ তা'আলার সোজা-সরল পথ ছেড়ে অন্য পথ অবলম্বন করা। মুফাসসির আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ সূরা আলে ইমরানের মুহকাম আয়াতের বর্ণনায় এ আয়াতগুলোকেই বোঝানো হয়েছে। আদম 'আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সমস্ত নবীগণের শরীআতই এসব আয়াত সম্পর্কে একমত। কোন দ্বীন বা শরীআতে এগুলোর কোনটিই মনসুখ বা রহিত হয়নি। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৩১৭] আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যে কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ যে বিষয়ের উপর ছিলেন সেটা জানতে চায় সে যেন সূরা আল-আন’আমের এ আয়াতগুলো পড়ে নেয়। [ইবন কাসীর]
(২) আয়াতগুলোর প্রথমেই বলা হয়েছে تَعَالَوْا যার অর্থঃ ‘এস’। মূলতঃ উচ্চস্থানে দণ্ডায়মান হয়ে নিম্নের লোকদেরকে নিজের কাছে ডাকা অর্থে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। [কাশ্শাফ; কুরতুবী] এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, এ দাওয়াত কবুল করার মধ্যেই তাদের জন্য শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য বিদ্যমান। এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, আপনি তাদেরকে বলুন, এস, যাতে আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পাঠ করে শোনাতে পারি যেগুলো আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের জন্য হারাম করেছেন। এটা প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত বার্তা। এতে কারো কল্পনা, আন্দাজ ও অনুমানের কোন প্রভাব নেই [বাগভী] যাতে তোমরা এসব বিষয় থেকে আত্মরক্ষা করতে যত্নবান হও এবং অনর্থক নিজের পক্ষ থেকে আল্লাহর হালালকৃত বিষয়সমূহকে হারাম না কর। এ আয়াতে যদিও সরাসরি মক্কার মুশরিকদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, কিন্তু বিষয়টি ব্যাপক হওয়ার কারণে সমগ্র মানব জাতিই এর আওতাধীন- মুমিন হোক কিংবা কাফের, আরব হোক কিংবা অনারব, উপস্থিত লোকজন হোক কিংবা অনাগত বংশধর। [দেখুন, তাফসীর আল-মানার]
(৩) সর্বপ্রথম মহাপাপ শির্ক, যা হারাম করা হয়েছেঃ সযত্ন সম্বোধনের পর হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহের তালিকায় সর্বপ্রথম বলা হয়েছেঃ আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক বা অংশীদার করো না। আরবের মুশরিকদের মত দেব-দেবীদেরকে বা মূর্তিকে ইলাহ বা উপাস্য মনে করো না। ইয়াহুদী ও নাসারাদের মত নবীগণকে আল্লাহ কিংবা আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করো না। অন্যদের মত ফিরিশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে আখ্যা দিও না। মূৰ্খ জনগণের মত নবী ও ওলীগণকে জ্ঞান ও শক্তি-সামর্থ্যে আল্লাহর সমতুল্য সাব্যস্ত করো না। আল্লাহর জন্য যে সমস্ত ইবাদাত করা হয়, তা অপর কাউকে দিও না; যেমন, দোআ, যবেহ, মানত ইত্যাদি।
এখানে شَيْئًا এর অর্থ এরূপ হতে পারে যে, ‘জলী’ অর্থাৎ প্রকাশ্য শির্ক ও ‘খফী’ অর্থাৎ প্রচ্ছন্ন শির্ক- এ প্রকারদ্বয়ের মধ্য থেকে কোনটিতেই লিপ্ত হয়ো না। প্রকাশ্য শির্কের অর্থ সবাই জানে যে, ইবাদাত-আনুগত্য অথবা অন্য বিশেষ গুণে অন্যকে আল্লাহ তা'আলার সমতুল্য অথবা তার অংশীদার সাব্যস্ত করা। প্রচ্ছন্ন শির্ক এই যে, নিজ কাজ-কর্মে দ্বীনী ও পার্থিব উদ্দেশ্যসমূহে এবং লাভ-লোকসানে আল্লাহ তা'আলাকে কার্যনির্বাহী বলে বিশ্বাস করেও কার্যতঃ অন্যান্যকে কার্যনির্বাহী মনে করা এবং যাবতীয় প্রচেষ্টা অন্যদের সাথেই জড়িত রাখা। এছাড়া লোক দেখানো ইবাদত করা, অন্যদেরকে দেখানোর জন্য সালাত ইত্যাদি ঠিকমত আদায় করা, নাম-যশ লাভের উদ্দেশ্যে দান-সদকা করা অথবা কার্যতঃ লাভ-লোকসানের মালিক আল্লাহ ছাড়া অন্যকে সাব্যস্ত করা ইত্যাদিও প্রচ্ছন্ন শির্কের অন্তর্ভুক্ত। [দেখুন, আল-মানার; সা’দী; আশ-শির্ক ফীল কাদীম ওয়াল হাদীস, ১৬৮-১৮০; ১২৯৫-১৩১০]
(৪) দ্বিতীয় গোনাহ পিতা-মাতার সাথে অসদ্ব্যবহারঃ আয়াতে বলা হয়েছেঃ “পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা”। উদ্দেশ্য এই যে, পিতা-মাতার অবাধ্য হয়ো না। তাদেরকে কষ্ট দিও না; কিন্তু বিজ্ঞজনোচিত ভঙ্গিতে বলা হয়েছে যে, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। অন্য আয়াতে তাদের আনুগত্য ও সুখবিধানকে আল্লাহ তা'আলার ইবাদাতের সাথে সংযুক্ত করে বলা হয়েছে, “আপনার রব নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে”। [সূরা আল-ইসরা: ২৩] অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, “আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং পিতা-মাতার। তারপর আমার দিকেই প্রত্যাবর্তন”। [সূরা লুকমান: ১৪] অর্থাৎ বিপরীত করলে শাস্তি পাবে।
তাছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “সর্বোত্তম কাজ কোনটি? তিনি উত্তরে বললেনঃ সঠিক ওয়াক্তে সালাত আদায় করা, তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ ‘এরপর কোনটি? উত্তর হলঃ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার। আবার প্রশ্ন করলেনঃ ‘এরপর কোনটি? উত্তর হলঃ 'আল্লাহর পথে জিহাদ'। [বুখারীঃ ৫২৭, মুসলিমঃ ৮৫]
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার বললেন, লাঞ্ছিত হয়েছে, লাঞ্ছিত হয়েছে, লাঞ্ছিত হয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! কে লাঞ্ছিত হয়েছে? তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তি পিতা-মাতাকে বার্ধক্য অবস্থায় পেয়েও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে নি’। [মুসলিমঃ ২৫৫১]
(৫) তৃতীয় হারাম সন্তান হত্যাঃ আয়াতে বর্ণিত তৃতীয় হারাম বিষয় হচ্ছে সন্তান হত্যা। এখানে পূর্বাপর সম্পর্ক এই যে, ইতোপূর্বে পিতা-মাতার হক বর্ণিত হয়েছে, যা সন্তানের কর্তব্য। এখন সন্তানের হক বর্ণিত হচ্ছে, যা পিতা-মাতার কর্তব্য। জাহেলিয়াত যুগে সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা কিংবা হত্যা করার ব্যাপারটি ছিল সন্তানের সাথে অসদ্ব্যবহারের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। আয়াতে তা নিষিদ্ধ করে বলা হয়েছেঃ “দারিদ্র্যের কারণে স্বীয় সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমরা তোমাদেরকে এবং তাদেরকে- উভয়কেই জীবিকা দান করব।” জাহেলিয়াত যুগে এ নিকৃষ্টতম নির্দয়-পাষণ্ড প্রথা প্রচলিত ছিল যে, কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করলে কাউকে জামাতা করার লজ্জা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো। মাঝে মাঝে জীবিকা নির্বাহ কঠিন হবে মনে করে পাষণ্ডরা নিজ হাতে সন্তানদেরকে হত্যা করত। কুরআনুল কারীম এ কু-প্রথা রহিত করে দিয়েছে। [ইবন কাসীর]
(৬) চতুর্থ হারাম নির্লজ্জ কাজঃ আয়াতে বর্ণিত চতুর্থ হারাম বিষয় হচ্ছে নির্লজ্জ কাজ। এ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “প্রকাশ্য হোক কিংবা গোপন, যে কোন রকম অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না”। فواحش শব্দের সাধারণ অর্থঃ অশ্লীলতা ও নির্লজ্জ কাজ। যাবতীয় বড় গোনাহ فحش ও فحشاء এর অর্থের অন্তর্ভুক্ত। মোটকথা, এ আয়াত নির্লজ্জতার প্রকৃত অর্থের দিক দিয়ে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সমস্ত গোনাহকে এবং সাধারণের মধ্যে প্রসিদ্ধ অর্থের দিক দিয়ে ব্যভিচারের প্রকাশ্য ও গোপন সকল পন্থাকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এ সম্পর্কে নির্দেশ এই যে, এগুলোর কাছেও যেও না। কাছে যাওয়ার অর্থ এরূপ মজলিশ ও স্থান থেকে বেঁচে থাকা যেখানে গেলে গোনাহে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং এরূপ কাজ থেকেও বেঁচে থাক, যা দ্বারা এসব গোনাহর পথ খুলে যায়। কারণ, যে লোক নিষিদ্ধ জায়গার আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, সে তাতে প্রবেশ করার কাছাকাছি হয়ে যায়। [সা’দী]
অন্য আয়াতেও বলা হয়েছে, “বলুন, নিশ্চয় আমার রব হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা [সূরা আল-আরাফ: ৩৩] অনুরূপভাবে অন্যত্র এসেছে, “আর তোমরা প্রকাশ্য এবং প্রচ্ছন্ন পাপ বর্জন কর। [সূরা আল-আনআমঃ ১২০] এ সব আয়াত একই অর্থবোধক। এসব আয়াতেই অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা পরিত্যাগ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর চেয়ে বেশী আত্মাভিমানী কেউই নেই, সেজন্য তিনি প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য যাবতীয় অশ্লীলতা হারাম ঘোষণা করেছেন। [বুখারী ৪৬৩৪; মুসলিম: ২৭৬০]
(৭) পঞ্চম হারাম বিষয় অন্যায় হত্যাঃ এ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “আল্লাহ্ তাআলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না, তবে ন্যায়ভাবে”। এ ন্যায়ভাবের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ তিনটি কারণ ছাড়া কোন মুসলিমের খুন হালাল নয়। (এক) বিবাহিত হওয়া সত্বেও ব্যভিচারে লিপ্ত হলে, (দুই) অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করলে তার কেসাস হিসাবে তাকে হত্যা করা যাবে এবং (তিন) সত্যদ্বীন ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে মুসলিমদের জামা'আত থেকে পৃথক হয়ে গেলে। [বুখারীঃ ৬৮৭৮, মুসলিমঃ ১৬৭৬]
বিনা কারণে মুসলিমকে হত্যা করা যেমন হারাম, তেমনিভাবে এমন কোন অমুসলিমকে হত্যা করাও হারাম, যে কোন ইসলামী দেশের প্রচলিত আইন মান্য করে বসবাস করে কিংবা যার সাথে মুসলিমের চুক্তি থাকে। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন যিম্মী অমুসলিমকে হত্যা করে, সে আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। যে আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধী সত্তর বছরের দূরত্ব হতে পাওয়া যায়। [ইবন মাজাহ: ২৬৮৭]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৫১) বল, এসো, তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালক যা নিষিদ্ধ করেছেন তা তোমাদেরকে পড়ে শোনাই।[1] তা এইঃ তোমরা কোন কিছুকে তাঁর অংশী করবে না,[2] মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে,[3] দারিদ্রে্র কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না।[4] আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল আচরণের নিকটবর্তীও হয়ো না এবং আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত[5] তাকে হত্যা করো না। তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা অনুধাবন কর।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, সেগুলো নয়, যেগুলো তোমরা আল্লাহর অবতীর্ণকৃত কোন দলীল ছাড়া কেবল নিজেদের ভ্রান্ত খেয়াল এবং অমূলক ধারণার ভিত্তিতে হারাম গণ্য করেছ। বরং হারাম হল সেই জিনিসগুলো, যেগুলোকে তোমাদের প্রতিপালক হারাম ঘোষণা করেছেন। কারণ, তোমাদের স্রষ্টা এবং আহারদাতা তিনিই এবং প্রতিটি জিনিসের জ্ঞানও তাঁরই কাছে। কাজেই এ অধিকারও তাঁরই যে, তিনি যে জিনিসটা চান হালাল এবং যে জিনিসটা চান হারাম করেন। সুতরাং আমি তোমাদেরকে এই জিনিসগুলোর বিশদ বিবরণ দিচ্ছি, যার তাকীদ তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে এসেছে।
[2] أَلاَّ تُشْرِكُوْا এর পূর্বে أَوْصَاكُمْ ঊহ্য আছে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাঁর সাথে তোমরা অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করো না। শিরক হল সব চেয়ে বড় পাপ। (তওবা ছাড়া) এ পাপের কোন ক্ষমা নেই। মুশরিকের উপর জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম ওয়াজিব। কুরআন মাজীদে এ বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে বারবার বর্ণনা করা হয়েছে এবং নবী করীম (সাঃ)ও বহু হাদীসে এর বিশ্লেষণ সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তা সত্ত্বেও বাস্তব এটাই যে, মানুষ শয়তানের চক্রান্তে পড়ে ব্যাপকহারে শিরকী কাজ সম্পাদন করে চলেছে।
[3] অর্থাৎ, মাতা-পিতার সাথে অসদ্ব্যবহার করবে না। মহান আল্লাহর তাওহীদ (একত্বতা) এবং তাঁর আনুগত্যের পর এখানেও (এবং কুরআনের অন্য অনেক স্থানেও) পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এ থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, প্রতিপালকের আনুগত্যের পর পিতা-মাতার আনুগত্য করার গুরুত্ব অপরিসীম। যদি কেউ এই ‘রুবূবিয়্যাতে সুগরা’ (পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের) দাবীসমূহ পূরণ না করে, তবে সে ‘রুবূবিয়্যাতে কুবরা’ (আল্লাহর আনুগত্যের) দাবীসমূহ পূরণ করতেও অসফল হবে।
[4] জাহেলী যুগের এই জঘন্য কাজ বর্তমানে জন্ম-নিয়ন্ত্রণের নামে সারা পৃথিবীতে অতি ধুমধামের সাথে চলছে। আল্লাহ এ থেকে আমাদেরকে হিফাযত করুন!
[5] অর্থাৎ, খুনের বদলে খুন। আর তা কেবল বৈধই নয়, বরং নিহতের উত্তরাধিকারী যদি মাফ করে না দেয়, তবে এ হত্যা অতি জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ} ‘‘ক্বিসাসে রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন।’’ (সূরা বাক্বারাহ ১৭৯)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৫১-১৫৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আলোচ্য তিনটি আয়াত কুরআনুল কারীমের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। আয়াতগুলোতে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি হারাম বিধানের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে-
( وَأَنَّ هٰذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيْمًا فَاتَّبِعُوْهُ)
অর্থাৎ এ বিধানই হচ্ছে আমার সরল পথ, সুতরাং তোমরা এ পথেরই অনুসরণ কর। তাই ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শেষ অসীয়তের প্রতি লক্ষ করতে চায় সে যেন উল্লিখিত আয়াতগুলো তেলাওয়াত করে। (হাকিম ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৭৭, সহীহ)
ইবনু মাউসদ (রাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার চেয়ে অধিক আত্মমর্যাদাশীল আর কেউ নেই। তাই তিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল খারাপ কাজ হারাম করেছেন। প্রশংসা করার চেয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে অধিক প্রিয় বস্তু আর কিছুই নেই। তাই তিনি নিজের প্রশংসা নিজেই করেছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৩৪, সহীহ মুসলিম হা: ২৭৬০)
আয়াতগুলোর সূচনা করা হয়েছে এভাবে যে,
(قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ)
অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলার দেয়া হালালকে হালাল ও হারামকে হারাম হিসেবে মেনে নিয়েছ অথবা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে যা ইচ্ছা হালাল ও হারাম করে নিয়েছ সবাই এসো তোমাদেরকে পাঠ করে শুনাই যা আল্লাহ তা‘আলা হারাম করে দিয়েছেন। আয়াতে সকল মানবজাতি শামিল।
সর্বপ্রথম মহাপাপ যা হারাম করা হয়েছে তা হল:
(أَلَّا تُشْرِكُوْا بِه۪ شَيْئًا)
‘আল্লাহ তা‘আলার সাথে কোন কিছু শরীক করো না।’সকল ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যই সম্পাদন করবে। মক্কার মুশরিকদের মত আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতে কাউকে ওসীলা বানাবে না, ইয়াহূদী খ্রিস্টানদের মত নাবীদেরকে আল্লাহ তা‘আলার পুত্র বানাবে না। অন্যদের মত ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার কন্যা মনে করবে না। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার রুবুবিয়্যাহ, উলুহিয়্যাহ ও আসমায়ি ওয়াস সিফাত সকল ক্ষেত্রে তাঁর তাওহীদ বহাল রাখবে। কেননা শির্ক সবচেয়ে বড় জুলুম। আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
اَكْبَرُ الْكَبَائِرِ الثَّلَاثَةُ مِنْهَا اَلْاِشْرَاكُ بِاللّٰهِ
কবীরা গুনাহর মধ্যে সবচেয়ে বড় তিনটি তার মধ্যে প্রধান হল আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক করা।
আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতে দিবেন। কিন্তু তিনি শির্কের গুনাহ ক্ষমা করবেন না।
দু’টি অপরাধ রয়েছে যা দুনিয়াতেও ক্ষতি করে, আখিরাতেও ক্ষতি করে।
প্রথম: শির্ক, যা মানুষের অতীত আমলকে বরবাদ করে জাহান্নামে নিয়ে যায় এবং আল্লাহ তা‘আলাকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।
দ্বিতীয়: বিদআত, যা করলে মানুষের সে আমল কবূল হয় না এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।
দ্বিতীয়ত যে মহাপাপ হারাম করা হয়েছে তা হল: পিতা-মাতার সাথে অসদাচরণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَّبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا)
‘পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে’অর্থাৎ কথায়, কাজে ও আচরণে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করা ওয়াজিব। অসদাচরণ করা হারাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَقَضٰي رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوْآ إِلَّآ إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا)
“তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারও ‘ইবাদত কর না ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর।”(সূরা ইসরা ১৭:২৩)
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলেন: সর্বোত্তম কাজ কোন্টি? তিনি বললেন: যথাসময়ে সালাত আদায় করা। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন: এরপর কোন্টি? তিনি বললেন: পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করা। প্রশ্ন করলেন: তারপর কোন্টি? তিনি বললেন: আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করা। (সহীহ বুখারী হা: ৫২৭)
এমনকি পিতা-মাতা মুশরিক হলেও সদাচরণ করতে হবে। কিন্তু শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ করতে বললে তা করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِنْ جَاهَدٰكَ عَلٰٓي أَنْ تُشْرِكَ بِيْ مَا لَيْسَ لَكَ بِه۪ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوْفًا)
“আর যদি তোমার পিতা-মাতা তোমাকে চাপ দেয় যে, তুমি আমার সাথে এমন কিছু শির্ক কর, যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তখন তুমি তাদের কথা মানবে না কিন্তু দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর।” (সূরা লুকমান ৩১:১৫)
পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের ব্যাপারে অনেক আয়াত ও সহীহ হাদীস রয়েছে। মোটকথা পিতা-মাতার প্রতি সদারচণ এমন ফরয যা পালন করলে সহজে জান্নাতে যাওয়া যায়, আবার তাদের সাথে অসদারচণ এমন হারাম কর্ম যা সহজে জাহান্নামে নিয়ে যায়।
লক্ষণীয় যে, কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা যেখানেই নিজের অধিকারের কথা বলেছেন সেখানেই পিতা-মাতার অধিকারের কথা বলেছেন। এতেই অনুধাবন করা যায় যে, পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের গুরুত্ব কতটুকু।
তৃতীয় হারাম:
(وَلَا تَقْتُلُوْآ أَوْلَادَكُمْ مِّنْ إِمْلَاقٍ)
‘দারিদ্রের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না’অর্থাৎ খাদ্য ঘাটতির ভয়ে সন্তান হত্যা করা হারাম।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قَدْ خَسِرَ الَّذِيْنَ قَتَلُوْآ أَوْلَادَهُمْ سَفَهًام بِغَيْرِ عِلْمٍ)
“যারা নির্বুদ্ধিতার দরুন ও অজ্ঞতাবশত নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত।”(সূরা আন্‘আম ৬:১৪০)
ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! কোন অপরাধ সবচেয়ে বড়? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: তুমি আল্লাহ তা‘আলার সাথে অংশী স্থাপন করলে অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, তারপর কোন্টি? তিনি বললেন: তোমার সাথে খাবে এ ভয়ে সন্তান হত্যা করলে। অতঃপর আমি বললাম: তারপর কোন্টি? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: তোমার প্রতিবেশির সাথে ব্যভিচার করলে। তারপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন:
(وَالَّذِيْنَ لَا يَدْعُوْنَ مَعَ اللّٰهِ إِلَهًا آخَر... )
(সহীহ বুখারী হা: ৬০০১)
এখানে সন্তান হত্যা বলতে সন্তান না নেয়ার সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অধিক সন্তান না নেয়া। পরিবার বড় হলে সন্তানদের খাদ্য, বাসস্থান ও খরচাদি ইত্যাদি বহন করা কষ্টকর হবে। এসব কারণে সন্তান না গ্রহণ করা হারাম। রিযিকের মালিক আল্লাহ, দুনিয়াতে এমন কোন প্রাণী পাঠান না যার রিযিকের দায়িত্ব তিনি নেন না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَي اللّٰهِ رِزْقُهَا)
“পৃথিবীতে যত প্রাণী রয়েছে, সব কিছুর রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর কাছে।”(সূরা হুদ ১১:৬)
তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে ও খাদ্যসহ ভরণপোষণের ভয়ে সন্তান হত্যা তথা বিনা কারণে সন্তান না নেয়া হারাম। তবে যদি মায়ের ও সন্তানের স্বাস্থের দিকে বিবেচনা করে প্রয়োজনে কিছু বিলম্ব করা হয় তাহলে তা দূষণীয় নয়।
চতুর্থ হারাম হল:
(وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ)
‘প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক অশ্লীল কাজের নিকটেও যাবে না।’খারাপ কাজ হল: প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যে সকল কাজ করা আল্লাহ তা‘আলা অপছন্দ করেন এবং সে কাজে লিপ্ত হবার জন্য জাহান্নাম বা কঠিন শাস্তির কথা বলেছেন। অর্থাৎ সকল কবীরা গুনাহ এর অন্তর্ভুক্ত।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّـيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوْا بِاللّٰهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِه۪ سُلْطٰنًا وَّأَنْ تَقُوْلُوْا عَلَي اللّٰهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ)
“বল: নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, আর পাপ ও অন্যায় বিরোধিতা এবং কোন কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক করা যার কোন প্রমাণ তিনি প্রেরণ করেননি, এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না।(সূরা আ‘রাফ ৭:৩৩)
পঞ্চম হারাম হল, অন্যায়ভাবে হত্যা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِيْ حَرَّمَ اللّٰهُ إِلَّا بِالْحَقِّ)
‘আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীরেকে তোমরা তাকে হত্যা করবে না।’অর্থাৎ অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা হারাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তিনটির কোন একটি কারণ ছাড়া কোন মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করা হারাম।
১. বিবাহিত ব্যভিচারী, তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হবে।
২. কিসাস হিসেবে প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ।
৩. যে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে অর্থাৎ মুরতাদ। (আবূ দাঊদ ৪৩৫৩, নাসাঈ হা: ৪০৫৯, সহীহ)
এছাড়াও বুখারী ও মুসলিমে এ ব্যাপারে অসংখ্য হাদীস রয়েছে।
এ আয়াতটিতে পাচঁটি হারাম বিষয়ের বর্ণনা দেয়ার পর বলা হয়েছে: ‘তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা অনুধাবন কর।’
ষষ্ঠ হারাম হল ইয়াতীমের সম্পদ অবৈধভাবে ভক্ষণ করা:
(وَلَا تَقْرَبُوْا مَالَ الْيَتِيْمِ)
‘ইয়াতীম বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তম পন্থা ব্যতীত তোমরা তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হবে না।’সকলের সম্পদ অন্যায়ভাবে খাওয়া হারাম। বিশেষ করে ইয়াতীমের সম্পদ আরও হারাম। এ সম্পর্কে সূরা নিসা-এর শুরুতে আলোচনা হয়েছে।
সপ্তম হারাম ওজনে ও মাপে করা: আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيْزَانَ بِالْقِسْطِ)
‘এবং পরিমাণ ও ওজন ন্যায্যভাবে পুরোপুরি দেবে।’অর্থাৎ ওজনে ও পরিমাণে ন্যায়ভাবে পুরোপুরি প্রদান করা কর্তব্য। ওজনে ও পরিমাণে কম দেয়া হারাম, বেশি নেয়াও হারাম।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِيْنَ - الَّذِيْنَ إِذَا اكْتَالُوْا عَلَي النَّاسِ يَسْتَوْفُوْنَ - وَإِذَا كَالُوْهُمْ أَوْ وَّزَنُوْهُمْ يُخْسِرُوْنَ)
“মন্দ পরিণাম তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট হতে নেয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে, এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।”(সূরা মুতাফফিফীন ৮৩:১-৩)
ওজনে ও পরিমাণে কম দেয়া শুয়াইব (আঃ)-এর জাতির বৈশিষ্ট্য ছিল। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।
অষ্টম নির্দেশ: ন্যায় ও সুবিচারের বিপরীত কাজ করা হারাম: আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
(وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوْا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبٰي)
‘যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায্য বলবে, স্বজনের সম্পর্কে হলেও’এখানে বিশেষ কোন কথার উল্লেখ করা হয়নি। তাই সকল কথা এতে শামিল, তা কোন সাক্ষ্যের ব্যাপারে হোক, কোন বিচার ফায়সালার ক্ষেত্রে হোক, কিংবা কোন লেনদেনের ব্যাপারে হোক। আল্লাহ তা‘আলা সকল ক্ষেত্রে এমনকি নিজের আত্মীয়-স্বজনের ক্ষেত্রে ন্যায় সাক্ষ্য আর সত্য কথা বলার নির্দেশ দিচ্ছেন। সুতরাং স্বজন-প্রীতি করা, পক্ষপাতিত্ব করা ও অন্যায়ভাবে কারো পক্ষে ফায়সালা দেয়া সম্পূর্ণ হারাম।
নবম নির্দেশ: আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করা: বলা হয়েছে-
(وَبِعَهْدِ اللّٰهِ أَوْفُوْا)
‘এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করবে’এ অঙ্গীকার বলতে হতে পারে সে অঙ্গীকার যা রূহ জগতে প্রত্যেক আত্মা থেকে আল্লাহ তা‘আলা নিয়েছিলেন যে,
(أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ)
আমি কি তোমাদের রব নই? তখন সবাই বলেছিল: بَلَي شَهِدْنَا হ্যাঁ, অবশ্যই আপনি আমাদের রব। এ অঙ্গীকারের দাবী হল যে, পালনকর্তা হিসেবে আল্লাহ তা‘আলাকে মানতে হবে এবং সকল ইবাদত তাঁর জন্যই সম্পাদন করতে হবে।
অথবা আল্লাহ তা‘আলা ও বান্দার মাঝে এবং মানুষের পরস্পর সকল প্রকার অঙ্গীকার হতে পারে, যেমন সূরা মায়িদাহ’র শুরুতে তুলে ধরা হয়েছে।
দশম নির্দেশ:
(وَأَنَّ هٰذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيْمًا فَاتَّبِعُوْهُ)
‘আর নিশ্চয়ই এ পথই আমার সহজ-সরল পথ। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করবে’এ সঠিক পথ বলতে ইসলামকে বুঝানো হয়েছে। এ পথেরই অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তা‘আলা। এ পথ ছাড়া অন্য কোন পথের অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। অন্যপথে চললে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। এসব বিধি-বিধান আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করে দিয়েছেন যেন মানুষ মুত্তাকী হতে পারে।
একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর হাত দিয়ে একটি লম্বা রেখা টানলেন এবং বললেন, এটা হল আল্লাহ তা‘আলার সরল পথ। আরো কিছু রেখা তার ডান ও বাম পাশে টানলেন এবং বললেন, এগুলো হল অন্য কিছু পথ যার ওপর শয়তান বসে আছে এবং সে এ পথগুলোর দিকে মানুষকে আহ্বান করে। তারপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এ
(وَأَنَّ هٰذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيْمًا)
আয়াত তিলাওয়াত করলেন। (মুসনাদ আহমাদ হা: ৪১৪২, সহীহ) এ সিরাতে মুসতাকীম হল, মুসলিম উম্মাহর মূল ভিত্তি। এ সরল পথ থেকে দূরে সরে পড়ার কারণে উম্মত বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
অতএব সেই সরল পথে ফিরে আসতে হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ মত সকল পথ ও মত বর্জন করে কুরআন ও সহীহ হাদীসের মাধ্যমে ইসলাম মেনে চলতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
আমি তোমাদের মাঝে দু’টি বিষয় রেখে যাচ্ছি, যতদিন তা আঁকড়ে ধরে থাকবে ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না। সে দু’টি বিষয় হল আল্লাহ তা‘আলার কিতাব কুরআন ও তাঁর নাবীর সুন্নাত হাদীস। (মুয়াত্তা মালিক হা: ৩৩৩৮)
অতএব উপরোক্ত হারাম বিষয়গুলো হতে বেঁচে থেকে কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুযায়ী সিরাতে মুসতাকীমে প্রতিষ্ঠিত থাকা প্রতিটি মু’মিন-মুসলিমের একান্ত কর্তব্য।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. গুরুত্বপূর্ণ দশটি হারাম বিধান জানতে পারলাম।
২. পিতা-মাতার অধিকারের গুরুত্ব জানতে পারলাম।
৩. আল্লাহ তা‘আলা কারো সাধ্যাতীত বিধান প্রদান করেন না।
৪. নাজাত কেবল কুরআন ও সহীহ হাদীসের পথেই রয়েছে, অন্য কোন পথে নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শেষ অসিয়তের প্রতি লক্ষ্য করতে চায় সে যেন উল্লিখিত আয়াতগুলো পাঠ করে । হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সূরায়ে আন'আমে কতগুলো আয়াত রয়েছে স্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট এবং ঐগুলোই হচ্ছে কিতাবের মূল। অতঃপর তিনি (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে আমাদের কাছে তিনটি কাজের দীক্ষা গ্রহণ করবে?' অতঃপর তিনি উক্ত আয়াত পাঠ করলেন। পাঠ শেষ করে তিনি বললেনঃ “যে ব্যক্তি এই কথাগুলো যথাযথভাবে পালন করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে রয়েছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এগুলো পালনে অবহেলা করবে, খুব সম্ভব আল্লাহ তাকে দুনিয়াতেই শাস্তি প্রদান করবেন। আর যদি তিনি শাস্তিটাকে পরকাল পর্যন্ত উঠিয়ে রাখেন তবে তখন তাঁর মর্জির উপর নির্ভর করবে। ইচ্ছা করলে তিনি তাকে শাস্তি দিবেন, অথবা ক্ষমা করে দিবেন।” এর তাফসীর নিম্নরূপঃ আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেছেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ) ! এই মুশরিকদেরকে বলে দাও, যারা গায়রুল্লাহর উপাসনা করছে এবং আল্লাহর হালাল জিনিসকে হারাম করে নিচ্ছে, আর নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করছে। তাদেরকে শয়তান বিভ্রান্ত করেছে এবং তারা মনগড়া কথা বলছে, (তাদেরকে বলঃ) এসো, আমি তোমাদেরকে বলে দেই যে, আল্লাহ কোন্ জিনিসগুলোকে হারাম করেছেন। আমি এসব কথা ধারণা ও অনুমান করে বলছি না, বরং আল্লাহ আমার কাছে যে অহী করেছেন সেই অনুযায়ীই বলছি যে, তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক বানিয়ে নিও না। আয়াতের ভাষার ধরনে বুঝা যাচ্ছে যে, এখানে (আরবী) শব্দটি উহ্য রয়েছে, অর্থাৎ (আরবী) এইরূপ রয়েছে। এজন্যেই আয়াতের শেষে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ এসব বিষয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা অনুধাবন করতে পার।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে এসে এ সংবাদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি শিরক না করা অবস্থায় মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” আমি বললামঃ যদিও সে ব্যভিচার করে অথবা চুরি করে তবুও কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ 'হ্যা, যদিও সে ব্যভিচার করে অথবা চুরি করে। আমি তিনবার এই প্রশ্ন করি। প্রতিবারেই তিনি এই উত্তরই দেন এবং তৃতীয়বারে বলেনঃ “যদিও সে ব্যভিচার করে, অথবা চুরি করে এবং মদ্যপান করে (তবুও সে জান্নাতে প্রবেশ করবে)। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তিনবার প্রশ্নকারী ছিলেন স্বয়ং হযরত আবু যার (রাঃ)।
তৃতীয়বারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু যার (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হ্যাঁ, আবু যার (রাঃ)-এর নাক ধূলায় ধূসরিত হাক, যদিও সে ব্যভিচার করে থাকে বা চুরি করে থাকে (তবুও জান্নাতে যাবে)।” হযরত আবু যার (রাঃ) যখনই এ হাদীসটি শুনাতেন তখনই হাদীসটি পূর্ণরূপে বর্ণনা করার পর “আবু যার (রাঃ)-এর নাক ধূলায় ধূসরিত হাক” এ কথাটিও অবশ্যই বলতেন।
হযরত আবু যার (রাঃ) হতে আরও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন- “হে আদম সন্তান! যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমার কাছে দুআ করবে এবং আমার কাছে আশা করতে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাকে ক্ষমা করতে থাকবো যা কিছু গুনাহ তোমার দ্বারা হবে। আর আমি তোমার পাপরাশিকে মোটেই গ্রাহ্য করবো না। তুমি যদি আমার কাছে পৃথিবীপূর্ণ পাপরাশি নিয়ে আসো তবে আমি তোমাকে পৃথিবীপূর্ণ ক্ষমা প্রদান করবো, যদি তুমি আমার সাথে কাউকেও শরীক না করে থাক। যদি তোমার পাপরাশি আকাশ ভর্তিও হয় এবং তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর তবে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো।”
কুরআন কারীমে এর সাক্ষ্য মিলে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ শিবৃকের পাপ ক্ষমা করবেন না, অন্যসব পাপ তিনি ইচ্ছা করলে ক্ষমা করবেন।” সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকেও শরীক না করে মারা গেল সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ সম্পৰ্কীয় কুরআনের আয়াত এবং হাদীস বহু রয়েছে। হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “তোমরা শিরক করো না যদিও তোমাদেরকে কেটে টুকরো টুকরো করা হয় বা শূলে চড়ানো হয় অথবা আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়।” হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে সাতটি খাসলাতের বা অভ্যাসের অসিয়ত করেছিলেন। (তন্মধ্যে একটি এই যে,) তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকেও শরীক করবে না, যদিও তোমাদেরকে জ্বালিয়ে দেয়া হয়, কেটে টুকরো টুকরো করে দেয়া হয় এবং শূলে চড়ানো হয়।” (হাদীসটি ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। ভাবার্থ হচ্ছে-আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা তোমাদের পিতা-মাতার সাথে সৎ ও উত্তম ব্যবহার করবে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রভু তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সাথে ভাল ব্যবহার করবে।” (১৭:২৩) আল্লাহ পাক সাধারণ ভাবে নিজের আনুগত্যের সাথে সাথে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করাকে মিলিয়ে দিয়েছেন। যেমন বলেছেনঃ “আমার এবং স্বীয় পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তোমাদেরকে আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে। আর যদি তারা উভয়ে তোমাকে এ কথার চাপ দেয় যে, তুমি আমার সাথে কোন বস্তুকে শরীক সাব্যস্ত কর, যার (উপাস্য হওয়ার) পক্ষে তোমার কাছে কোন প্রমাণ নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং পার্থিব বিষয়ে সদ্ভাবে সাহচর্য করে যাবে, আর ঐ ব্যক্তির পথে চলবে যেই ব্যক্তি আমার দিকে রুজু হয় (ফিরে আসে), অনন্তর আমার দিকে তোমাদের ফিরে আসতে হবে । অতঃপর পিতা-মাতার মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের অবস্থা হিসেবে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ আল্লাহ প্রদান করলেন। আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ “আমি বানী ইসরাঈলের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম-তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।” এ বিষয় সম্পৰ্কীয় বহু আয়াত রয়েছে।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, ইবনে মাসউদ (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন আমলটি উত্তম?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “নামায সময় মত আদায় করা।” ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা।” আমি বললাম, তারপর কোন্টি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি যদি প্রশ্ন আরও বাড়াতাম তবে তিনি উত্তরও বাড়িয়ে দিতেন। হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে ইবনে সামিত (রাঃ)! তুমি তোমার পিতা-মাতার অনুগত হয়ে যাও। যদি তারা আমাদেরকে সারা দুনিয়া দিয়ে দাও’ একথাও বলে তবে সেটাও পালন কর।” এ হাদীসটির ইসনাদ দুর্বল। আল্লাহ তা'আলা সবচেয়ে ভাল জানেন।
(আরবী) দারিদ্রতার ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না, কেননা আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার্য দান করে থাকি।
পিতা-মাতাকে নির্দেশ দিচ্ছেন-তোমরা দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের ছেলে মেয়েদেরকে হত্যা করো না। শয়তানরা মুশরিকদেরকে বিভ্রান্ত করেছিল বলে তারা নিজেদের সন্তানদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করতো। তারা লজ্জার ভয়ে কন্যা সন্তানদেরকে জীবন্ত গেড়ে ফেলতো। আবার দারিদ্রতার ভয়ে কোন কোন পুত্র সন্তানকেও হত্যা করতো। এ জন্যেই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন পাপটি সবচেয়ে বড়?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তা হচ্ছে এই যে, তুমি আল্লাহর জন্যে শরীক স্থাপন করবে, অথচ তিনিই তোমাকে (এবং ঐ শরীককে) সৃষ্টি করেছেন!` ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বলেনঃ “তুমি তোমার সন্তানকে হত্যা করবে এই ভয়ে যে, সে তোমার সাথে আহার করবে।” আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ “তা এই যে, তুমি তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়বে। অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন মা'বুদের উপাসনা করে না এবং আল্লাহ যাকে (হত্যা করা) হারাম করে দিয়েছেন, তাকে হত্যা করে না শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত, এবং ব্যভিচার করে না।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন) (২৫:৬৮)
উপরে বর্ণিত ‘ফাকর' বা দারিদ্রকে ‘ইমলোক’ বলা হয়। এ জন্যেই আল্লাহ পাক সূরায়ে বানী ইসরাঈলে বলেনঃ “জীবিকা তো আমিই তাদেরকে এবং তোমাদেরকে দিয়ে থাকি।” ওখানে জীবিকার শুরুতে শিশুদের নাম নেয়া হয়েছে। কেননা, সেখানে ব্যবস্থাপনায় তারাই উদ্দেশ্য ছিল অর্থাৎ তাদেরকে জীবিকা পৌছানোর কারণে তোমরা দরিদ্র হয়ে যাবে এই ভয়ে তাদেরকে হত্যা করো না। কারণ সকলেরই জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর উপর রয়েছে। কিন্তু এখানে যেহেতু দারিদ্র বিদ্যমান রয়েছে এ জন্যে এখানে বলেছেন, আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দান করে থাকি। কারণ, এখানে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে তোমাদেরকে জীবিকা আমিই দান করেছি, সুতরাং নিজেদের জীবিকার ভয় করো না।
আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা অশ্লীল কাজ ও কথার নিকটেও যেয়ো না, তা প্রকাশ্যেই হাক বা গোপনীয়ই থাক। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “হে নবী (সঃ) ! তুমি বলে দাও-আমার প্রতিপালক প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত অশ্লীলতাই নিষিদ্ধ। করেছেন, আর তোমরা অন্যায়, পাপ ও বিদ্রোহ থেকে বেঁচে থাক। আর বিরত থাক শিরক থেকে যার কোন সনদ নেই এবং এমন কিছু আল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করা থেকে দূরে থাক যা তোমরা জান না।” এর তাফসীর আল্লাহ পাকের (আরবী) -এই উক্তির মধ্যে করা হয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ অপেক্ষা লজ্জাশীল আর কেউ হতে পারে না। এ জন্যেই তিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত নির্লজ্জতাকে হারাম করে দিয়েছেন।” (ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, হযরত সা'দ ইবনে উবাদা (রাঃ) বলেছেনঃ “আমি যদি আমার স্ত্রীর। সাথে কোন পর পুরুষকে (ব্যভিচারে লিপ্ত) দেখতে পাই তবে অবশ্যই তাকে তরবারী দ্বারা হত্যা করে ফেলবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে এ সংবাদ পৌছলে তিনি বলেন, তোমরা কি সা’দ (রাঃ)-এর লজ্জাশীলতায় বিস্ময় বোধ করছো! আল্লাহর শপথ! আমি সা’দ (রাঃ) অপেক্ষা অধিক লজ্জাশীল এবং আল্লাহ আমার চেয়ে বেশী লজ্জাশীল। এ জন্যেই তিনি সমস্ত নির্লজ্জতাকে হারাম করে দিয়েছেন।
(আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না। গুরুত্ব বুঝাবার জন্যেই আল্লাহ তাআলা পৃথকভাবে এর নিষেধাজ্ঞা আনয়ন করেছেন। নতুবা এটা প্রকাশ্য ও গোপনীয় নির্লজ্জতার নিষিদ্ধতারই অন্তর্ভুক্ত। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন মুসলমানের রক্ত হালাল নয় যে সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। তবে তিনটির যে কোন একটি কারণে হত্যা করা যায়। (১) বিবাহিত ব্যভিচারী, (২) প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ (অর্থাৎ হত্যার বিনিময়ে হত্যা) এবং (৩) দ্বীন পরিত্যাগকারী ও দলের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনয়নকারী।” সহীহ মুসলিমের শব্দ নিম্নরূপ রয়েছে “যিনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই তাঁর শপথ! কোন মুসলমান ব্যক্তির রক্ত হালাল নয়” পরবর্তী ভাষা একইরূপ। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শব্দের মধ্যে পার্থক্য এই যে, সহীহ বুখারীতে রয়েছেঃ (আরবী) সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ (আরবী) পরবর্তী কথাগুলো একইরূপ) আর ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন মুসলমান লোকের রক্ত হালাল নয় তিনটির কোন একটি কারণ ছাড়া। (১) যদি কোন বিবাহিত পুরুষ বা স্ত্রী) লোক ব্যভিচার করে তবে তাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা হবে। (২) যদি কোন লোক কোন লোককে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে তবে সেই হত্যার বিনিময়ে তাকে হত্যা করা হবে। (৩) যদি কোন লোক ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায় এবং আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ) -এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তবে তাকে হত্যা করা হবে অথবা শূলী দেয়া হবে কিংবা দেশান্তর করা হবে।”
আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) যখন বিদ্রোহীগণ কর্তৃক পরিবেষ্টিত হন তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনটির কোন একটি কারণ ছাড়া কোন মুসলমান লোকের রক্ত হালাল নয়। (১) যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের পর পুনরায় কাফির হয়ে গেল, (২) যে ব্যক্তি বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়লো এবং (৩) যে ব্যক্তি কাউকে অন্যায় ভাবে হত্যা করলো। তাহলে আল্লাহর শপথ! আমি কখনও ব্যভিচার করিনি, অজ্ঞতার যুগেও না এবং ইসলামের যুগেও না। আমি কখনও এ ইচ্ছা পোষণ করিনি যে, ইসলাম গ্রহণের পর এ দ্বীনের পরিবর্তে অন্য দ্বীন গ্রহণ করবো। আর আমি কখনও কাউকে হত্যাও করিনি। সুতরাং তোমরা আমাকে কিসের উপর ভিত্তি করে হত্যা করতে চাচ্ছ ?” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমীযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমীযী (রঃ) বলেন যে, হাদীসটি হাসান) যে অমুসলিমের সাথে চুক্তি হয়ে যাবে এবং যে হারবীকে (অমুসলিম দেশের অমুসলিম) ইসলামী রাষ্ট্রে বাস করার জন্যে নিরাপত্তা দেয়া হবে, তাদেরকে হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এমন কি এ ব্যাপারে ধমক ও ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি চুক্তিকৃত কোন লোককে হত্যা করবে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, অথচ জান্নাতের সুগন্ধ চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি এমন কোন চুক্তিকৃত ব্যক্তিকে হত্যা করবে যার নিরাপত্তার যিম্মাদার স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল হয়ে গেছেন, সে ব্যক্তি জান্নাতের খোশবু পর্যন্ত পাবে না। (হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ও ইমাম তিরমীযী বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমীযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন) (আরবী) অর্থাৎ এসব বিষয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা অনুধাবন করতে পার।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।