আল কুরআন


সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 142)

সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 142)



হরকত ছাড়া:

ومن الأنعام حمولة وفرشا كلوا مما رزقكم الله ولا تتبعوا خطوات الشيطان إنه لكم عدو مبين ﴿١٤٢﴾




হরকত সহ:

وَ مِنَ الْاَنْعَامِ حَمُوْلَۃً وَّ فَرْشًا ؕ کُلُوْا مِمَّا رَزَقَکُمُ اللّٰهُ وَ لَا تَتَّبِعُوْا خُطُوٰتِ الشَّیْطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَکُمْ عَدُوٌّ مُّبِیْنٌ ﴿۱۴۲﴾ۙ




উচ্চারণ: ওয়া মিনাল আন‘আ-মি হামূলাতাওঁ ওয়া ফারশান কূলূমিম্মা-রাযাকাকুমুল্লা-হু ওয়ালাতাত্তাবি‘ঊ খুতুওয়া-তিশশাইতা-নি ইন্নাহূলাকুম ‘আদুওউম মুবীন।




আল বায়ান: আর চতুষ্পদ জন্তু থেকে (কিছুকে সৃষ্টি করেছেন) বোঝা বহনকারী ও ক্ষুদ্রাকৃতির। তোমরা আহার কর তা থেকে, যা আল্লাহ তোমাদেরকে রিয্ক দিয়েছেন এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৪২. আর গবাদি পশুর মধ্যে কিছু সংখ্যক ভারবাহী ও কিছু সংখ্যক ক্ষুদ্রাকার পশু সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ যা রিযিকরূপে তোমাদেরকে দিয়েছেন তা থেকে খাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না; সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শক্র;




তাইসীরুল ক্বুরআন: গবাদি পশুর মধ্যে কতক আছে ভারবাহী আর কতক আছে গোশত ও আচ্ছাদনের সামগ্রী দানকারী, আল্লাহ তোমাদেরকে যে রিয্ক্ব দিয়েছেন তাত্থেকে ভক্ষণ কর আর শায়ত্বনের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, সে তোমাদের খোলাখুলি দুশমন।




আহসানুল বায়ান: (১৪২) আর (সৃষ্টি করেছেন) গবাদি পশুর মধ্যে কিছু ভারবাহী ও কিছু ক্ষুদ্রাকার পশু।[1] আল্লাহ যা জীবিকারূপে তোমাদেরকে দান করেছেন, তা আহার কর[2] এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।[3] নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।



মুজিবুর রহমান: আর চতুস্পদ জন্তুগুলির মধ্যে কতকগুলি (উঁচু আকৃতির) ভারবাহী রয়েছে; আর কতকগুলি রয়েছে ছোট আকৃতির, গোশত খাওয়ার ও চামড়া দ্বারা বিছানা বানানোর যোগ্য। আল্লাহ যা কিছু দান করেছেন তোমরা তা আহার কর, আর শাইতানের পদাঙ্ক অনুসরণ করনা, নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।



ফযলুর রহমান: আর গবাদিপশুর মধ্যে (কতক) ভারবাহী ও (কতক) ছোট আকৃতির (সৃষ্টি করেছেন)। আল্লাহ তোমাদেরকে যে জীবিকা দান করেছেন তা থেকে খাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; (কারণ) সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।



মুহিউদ্দিন খান: তিনি সৃষ্টি করেছেন চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে বোঝা বহনকারীকে এবং খর্বাকৃতিকে। আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন, তা থেকে খাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।



জহুরুল হক: আর গবাদি-পশুদের মধ্যে কতকগুলো ভার বহনের জন্য আর কিছু ক্ষুদ্রাকার। আল্লাহ্ তোমাদের যা খাদ্যবস্তু দিয়েছেন সে- সব থেকে আহার করো, আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিঃসন্দেহ তোমাদের জন্য সে হচ্ছে প্রকাশ্য শত্রু ।



Sahih International: And of the grazing livestock are carriers [of burdens] and those [too] small. Eat of what Allah has provided for you and do not follow the footsteps of Satan. Indeed, he is to you a clear enemy.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৪২. আর গবাদি পশুর মধ্যে কিছু সংখ্যক ভারবাহী ও কিছু সংখ্যক ক্ষুদ্রাকার পশু সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ যা রিযিকরূপে তোমাদেরকে দিয়েছেন তা থেকে খাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না; সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শক্র;


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৪২) আর (সৃষ্টি করেছেন) গবাদি পশুর মধ্যে কিছু ভারবাহী ও কিছু ক্ষুদ্রাকার পশু।[1] আল্লাহ যা জীবিকারূপে তোমাদেরকে দান করেছেন, তা আহার কর[2] এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।[3] নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।


তাফসীর:

[1] حُمُوْلَةٌ (ভারবাহী, বোঝা বহনকারী) বলতে উট, বলদ এবং গাধা ও খচ্চর ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে। যা বাহন ও বোঝা বহনের কাজে আসে। আর فَرْشًا খর্বাকৃতির জীব-জন্তু। যেমন, ছাগল-ভেড়া ইত্যাদি। যার দুধ তোমরা পান কর এবং তার গোশত খাও।

[2] অর্থাৎ, ফল, ফসলাদি এবং চতুষ্পদ জীব-জন্তুর মধ্য থেকে। এগুলোকে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য সেগুলোকে আহার্য বানিয়েছেন।

[3] যেভাবে মুশরিকরা তার (শয়তানের) অনুসরণ করেছিল এবং হালাল পশুগুলোকেও নিজেদের উপর হারাম করে নিয়েছিল। অর্থাৎ, আল্লাহর হালাল করা জিনিসকে হারাম করা এবং তাঁর হারাম করা জিনিসকে হালাল করা, আসলে শয়তানের আনুগত্য করা।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৪১-১৪২ নং আয়াতের তাফসীর:



সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা- এ আয়াত তার প্রমাণ বহন করছে।



প্রাণী, শস্য ও ফলমূলসহ পৃথিবীতে যা কিছু দেখতে পাই সবই আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি। তিনি এসব সৃষ্টি করেছেন মানুষের কল্যাণের জন্য। আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদত করার জন্য।



مَّعْرُوْشٰتٍ এর মূল ধাতু হল عرش অর্থ উঁচু করা ও উঠানো। আর معروشات থেকে বুঝানো হয়েছে কোন কোন গাছের লতাপাতাগুলো যা মাচার উপরে চড়ানো হয়। যেমন আঙ্গুর ও শাক-সবজির মাচা ইত্যাদি।



(وَّغَيْرَ مَعْرُوْشٰتٍ)



‘মাচা অবলম্বী নয়’বলতে যা মাচার ওপর চড়ানো হয় না। বরং জমির উপরেই বাড়তে থাকে যেমন তরমুজ, শস্য ইত্যাদি।



(وَاٰتُوْا حَقَّه يَوْمَ حَصَادِه)



‘আর ফসল তোলার দিনে তার হক প্রদান করবে’এ আয়াত বলবত আছে, না কি রহিত হয়ে গেছে? হক বলতে ফরয যাকাত, না নফল যাকাত? এ নিয়ে অনেক মতামত পাওয়া যায়।



আল্লামা শানক্বিতী (রহঃ) এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। (আযওয়াউল বায়ান, ২/১৪১)



তবে সঠিক কথা হল, আয়াত রহিত নয়। আর حق (হ্ক) বলতে ফরয যাকাত যা ফসল মাড়ানোর দিনে দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ উশর বা দশভাগের একভাগ যদি সেচ দিয়ে উৎপন্ন করতে না হয়। আর সেচ দিয়ে উৎপন্ন করা হলে বিশভাগের একভাগ দিতে হবে। (তাফসীর মুয়াসসার, পৃঃ ১৪৫)



(وَلَا تُسْرِفُوْا ط إِنَّه لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِيْنَ)



‘এবং অপচয় করবে না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।’অর্থাৎ প্রয়োজন মত খাও, ব্যয় কর, কিন্তু অপচয় করো না। কারণ অপচয়কারীকে আল্লাহ তা‘আলা ভালবাসেন না। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّ الْمُبَذِّرِيْنَ كَانُوْآ إِخْوَانَ الشَّيَاطِيْنِ)



“যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই।”(সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:২৭)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



كُلُوا وَاشْرَبُوا وَالبَسُوا وَتَصَدَّقُوا، فِي غَيْرِ إِسْرَافٍ وَلَا مَخِيلَةٍ



তোমরা পান কর, পরিধান কর, সদাকা দাও; অপচয় ও কৃপণতা কর না। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল লিবাস এর শুরু)



(حَمُوْلَةً وَّفَرْشًا)



‘কতক ভারবাহী ও কতক ক্ষুদ্রাকার পশু’অর্থাৎ চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে এমন কিছু প্রাণী সৃষ্টি করেছেন যার ওপর বোঝা বহন করা হয়। যেমন উট, ঘোড়া আর কতকগুলো আছে ছোট যেমন ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি। তবে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: حَمُوْلَةً (যার ওপর বোঝা বহন করানো হয় যেমন উট আর وَّفَرْشًا হল ছোট উট। (হাকিম ২/৩১৭, সহীহ)



এ সম্পর্কে কুরআনে অসংখ্য আয়াত বিদ্যমান। যেমন সূরা ইয়াসীনের ১৭-৭২ নং, নাহালের ৬৬-৮০ নং, ফাতিরের ৭৯-৮১ নং আয়াত।



সবশেষে আল্লাহ তা‘আলা শয়তানের অনুসরণ থেকে নিষেধ করেছেন। কেননা সে আমাদের প্রকাশ্য শত্র“। অতএব তাকে শত্র“ হিসেবেই গ্রহণ করা দরকার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوْهُ عَدُوًّا ط إِنَّمَا يَدْعُوْا حِزْبَه۫ لِيَكُوْنُوْا مِنْ أَصْحٰبِ السَّعِيْرِ )‏



“নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্র“, সুতরাং তাকে তোমরা শত্র“রূপেই গ্রহণ কর। সে তার দলবলকে শুধু এজন্যই আহ্বান করে, যেন তারা (পথভ্রষ্ট হয়ে) জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।”(সূরা মু’মিনূন ৪০:৬)



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা আমাদের এত নেয়ামত দান করেছেন, কিভাবে আমরা তাঁর অবাধ্য হব এবং তাঁর নাফরমানী করব? বরং আমাদের উচিত তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা ও একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা এবং সকল শয়তানী কর্মের অনুসরণ বর্জন করা।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা এবং এসব সৃষ্টি করার লক্ষ উদ্দেশ্য একমাত্র তাঁরই আনুগত্য ও দাসত্ব করা।

২. ফসলের হক হল ওশর বা যাকাত আদায় করা।

৩. আল্লাহ তা‘আলা অপচয়কারীকে ভালবাসেন না।

৪. আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার সবকিছু মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন।

৫. শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্র“। অতএব তাকে শত্র“ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৪১-১৪২ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জিনিসেরই সৃষ্টিকর্তা। শস্য, ফল-ফলাদি এবং চতুষ্পদ জন্ত, যেগুলো মুশরিকরা ব্যবহার করতো এবং বিকৃতভাবে ওগুলো বন্টন করতঃ কোনটাকে হালাল, আর কোনটাকে হারাম বানিয়ে নিতো। এ সবই আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন। এসব ফলের কতগুলো স্বীয় কাণ্ডের উপর সন্নিবিষ্ট হয় এবং কতগুলো কাণ্ডের উপর সন্নিবিষ্ট হয় না, এ সবগুলোরই তিনি সৃষ্টিকর্তা। (আরবী) হচ্ছে ঐসব গুল্মলতা যেগুলো পর্দার উপর চড়ানো অবস্থায় থাকে, যেমন আঙ্গুর ইত্যাদি। আর (আরবী) ঐ সব ফলদার বৃক্ষ যেগুলো জংগলে ও পাহাড়ে জন্মে। ওগুলো এক রকমও এবং বিভিন্ন রকমও হয়। অর্থাৎ দেখতে একরূপ কিন্তু স্বাদে পৃথক। আল্লাহ পাক বলেনঃ যখন গাছগুলোতে ফল ধরে তখন তোমরা সেই ফলগুলো ভক্ষণ কর । আর ফসল কাটার সময় গরীব মিসকীনদেরকে দেয়ার যে হক আছে তা আদায় কর। কেউ কেউ এর দ্বারা ফরয। যাকাত অর্থ নিয়েছেন। যখন সেই উৎপাদিত শস্য বা ফল ওযন বা পরিমাপ করা হবে সেই দিনই এই হক আদায় করতে হবে। পূর্বে লোকেরা এটা প্রদান করতো না। অতঃপর শরীয়ত এক দশমাংশ নির্ধারণ করে। আর যেটা শীষ বা গুচ্ছ থেকে খসে পড়বে সেটাও মিসকীনদের হক।

হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন-যার (উৎপাদিত) খেজুরের পরিমাণ দশ ওয়াসাকের (ষাট সা’-এ এক ওয়াসাক। আর এক সা’-এ হয় পাকি দু’সের এগারো ছটাক বা মতান্তরে তিন সের ছ ছটাক) বেশী হবে সে যেন একটা গুচ্ছ মিসকীনদের জন্যে মসজিদে লটকিয়ে দেয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ উত্তম ও মজবুত)

হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে শস্য বা ফলের সদকাহ অথবা যাকাত। আর যাকাত ছাড়াও গরীবদের জন্যে অতিরিক্ত হক রয়েছে। শস্য কাটার সময় যাকাত ছাড়াও এই অতিরিক্ত হক প্রদান করা হতো। সেই দিন যদি মিসকীন এসে যায় তবে অবশ্য অবশ্যই তাকে কিছু না কিছু দিতে হবে। তিনি বলেন যে, কমপক্ষে এক মুষ্টি করে দেয়া উচিত। আর যা শীষ থেকে বা গুচ্ছ থেকে পড়ে যাবে সেটাও মিসকীনেরই হক। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে যাকাত ফরয হওয়ার পূর্বের হুকুম যে, মিসকীনদের জন্যে ছিল এক মুষ্টি পরিমাণ এবং জীব-জন্তুর জন্যে ছিল চারা-ভুষি, আর পতিতগুলোও ছিল মিসকীনদের হক। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বলেন যে, এগুলো ওয়াজিব ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এটা মানসূখ করে দেন এবং ওশর বা অর্ধ এশরকে ওর স্থানে নির্ধারণ করেন। ইবনে জারীর (রঃ)-ও এটাকেই পছন্দ করেছেন। আমি বলি যে, এটাকে মানসূখ বলা চিন্তা ভাবনার বিষয়ই বটে। কেননা, এটা এমনই একটা জিনিস যা মূলেই ওয়াজিব ছিল। তারপর বিস্তারিতভাবে ওর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আর কত দিতে হবে সেই পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, এই যাকাত হিজরী দ্বিতীয় সনে ফরয হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদের নিন্দে করেছেন যারা ফসল কাটতে কিন্তু তা থেকে গরীব মিসকীনদেরকে কিছুই দান করতো না। যেমন ‘সূরায়ে নূন' -এ এক বাগানের মালিকের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন তারা শপথ করলো যে, নিশ্চয়ই প্রত্যষেই ওর ফল পেড়ে নেবে। কিন্তু ইনশাআল্লাহ (আল্লাহ যদি চান) বললো না। অতএব, তোমার প্রভুর পক্ষ হতে এক পরিভ্রমণকারী (আপদ) ওতে বয়ে গেল, আর তারা ঘুমন্ত ছিল। অতঃপর প্রভাতে বাগানটি এমন হয়ে রইলো, যেমন শস্য কাটা ক্ষেত। অনন্তর প্রাতে একে অন্যকে ডাকতে লাগলো । নিজ নিজ ক্ষেতের দিকে প্রত্যুষেই চল, যদি ফল পাড়তে হয়। অনন্তর চুপি চুপি বলতে বলতে চলল, আজ কোন দরিদ্র তোমাদের কাছে আসতে পারবে না এবং নিজেদেরকে ওটা না দিতে সক্ষম মনে করে চললো। অতঃপর যখন বাগান দেখলো তখন তারা বলতে লাগলো-নিশ্চয়ই আমরা পথ ভুলে গেছি। বরং আমাদের ভাগ্যই বিরূপ হয়ে গেছে। তাদের মধ্যকার ভাল লোকটি বললো, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি? এখন কেন। (তাওবা ও) তাসবীহ্ (পাঠ) করছো না? সবাই বললো, আমাদের প্রভু পবিত্র, নিশ্চয়ই আমরা অপরাধী। অতঃপর একে অপরকে সম্বোধন করে পরস্পর দোষারোপ করতে লাগলো। বলতে লাগলো, নিশ্চয়ই আমরা সীমালংঘনকারী ছিলাম। সম্ভবতঃ আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে প্রতিদানে এতদপেক্ষা উত্তম বাগান দান করতে পারেন, আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকে ফিরে যাচ্ছি এভাবেই শাস্তি হয়ে থাকে, আর পরকালের শাস্তি এটা অপেক্ষা গুরুতর, কি ভালো হতো, যদি তারা জানতো!”

আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ তোমরা অপব্যয় করে সীমালংঘন করো না, নিশ্চয়ই তিনি অধ্যয়কারী ও সীমালংঘনকারীকে ভালবাসেন না। অর্থাৎ দেয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত দিতে শুরু করো না। কোন কোন লোক ফসল কাটার সময় এতো বেশী দান করতো যে, সেটা অপব্যয়ের মধ্যে পড়ে যেতো। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ অপব্যয় করো না।

সাবিত ইবনে কায়েস স্বীয় খুরমা গাছের ফল পেড়ে ঘোষণা করে দেনঃ “আজ যে কেউই আমার কাছে আসবে আমি তাকেই প্রদান করবো। শেষ পর্যন্ত এতো বেশী লোক এসে নিয়ে গেল যে, একটা ফলও তাঁর কাছে অবশিষ্ট রইলো না। সেই সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয় যে, আল্লাহ তা'আলা অপব্যয়কারী ও সীমালংঘনকারীকে ভালবাসেন না। ইবনে জুরাইজ বলেন, এর ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক কাজেই অপব্যয় ও সীমালংঘন নিষিদ্ধ। আয়াস ইবনে মুয়াবিয়া (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার আদেশ পালনের ব্যাপারে সীমা ছাড়িয়ে গেলেই সেটা ইসরাফ’ হয়ে যাবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে-এতো বেশী দান করো না যে, নিজে সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়ে যাও এবং দরিদ্র হয়ে পড়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন, যাকাত দেয়া বন্ধ করো না, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে। সঠিক কথা এটাই যে, প্রত্যেক ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন দূষণীয়। তবে এখানে যে বাড়াবাড়ি না করার কথা বলা হয়েছে তা খাওয়ার দিকে প্রত্যাবর্তিত, যা আয়াতের ধরনে অনুমিত হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ যখন ফল পেকে যাবে তখন সেই ফল ভক্ষণ কর এবং ফসল কাটার সময় গরীবদেরকে তাদের হক প্রদান কর, আর সীমালংঘন করো না অর্থাৎ তোমরা খাওয়ার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। কেননা, খুব বেশী খাওয়া বুদ্ধি-বিবেক ও দেহের পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ “তোমরা খাও,পান কর, কিন্তু বাড়াবাড়ি করো না।” সহীহ বুখারীতে রয়েছে- “তোমরা বাড়াবাড়ি ও অহংকার প্রদর্শন বাদ দিয়ে খাও, পান কর এবং পরিধান কর।”

মহামহিমান্বিত আল্লাহর উক্তি (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যা তোমাদের বোঝা বহন ও সওয়ারীর কাজে লাগে, যেমন উট। (আরবী) দ্বারা ছোট ছোট গৃহপালিত জন্তু অথবা ছোট শ্রেণীর উট বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দ দ্বারা উট, ঘোড়া, খচ্চর, গাধা এবং সর্ব প্রকারের ভারবাহী পশু বুঝানোনা হয়েছে এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ছাগল। মুজাহিদও (রঃ) এরূপই বলেছেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন: “আমার মনে হয় (আরবী) বলার কারণ এই যে, ওটা নিম্ন দেহ বিশিষ্ট হওয়ার ফলে যেন যমীনের ‘ফারশ’ বা বিছানা হয়ে গেছে। যহহাক (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে উট এবং গরু, আর
(আরবী) হচ্ছে ছাগল। আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ (রঃ)-এর ধারণা এই যে, (আরবী) হচ্ছে সওয়ারীর জন্তু এবং (আরবী) হচ্ছে ঐ পশু যাকে যবাই করে গোশত ভক্ষণ করা হয় বা ওর দুধ পান করা হয়। ছাগল বোঝা বহন করে না, বরং ওর গোশত খাওয়া হয় এবং ওর পশম দিয়ে কম্বল ও বিছানা বানানো হয়। আব্দুর রহমান এই আয়াতের যে তাফসীর করেছেন সেটাই সঠিক বটে, আল্লাহ পাকের উক্তিও এর সাক্ষ্য বহন করে । তিনি বলেন- (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি লক্ষ্য করেনি যে, আমি তাদের জন্যে আমার (কুদরতের) হাতে বস্তুসমূহের মধ্যে চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তারাই এসবের মালিক হয়ে যাচ্ছে। আর আমি এই চতুষ্পদ জন্তুগুলোকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছি, অনন্তর ওর কতক তো তাদের বাহন এবং কতিপয়কে তারা ভক্ষণ করে থাকে।” (৩৬:৭১-৭২) আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “এই পশুগুলোর মধ্যে তোমাদের জন্যে বড়ই শিক্ষণীয় বিষয় ও উপদেশ রয়েছে। ওদের রক্ত দ্বারা তৈরীকৃত দুধ আমি তোমাদেরকে পান করিয়ে থাকি। এটা খাঁটি দুধ, পানকারীদের জন্যে এটা কতই না সুস্বাদু। ওদের লোম ও পশম তোমাদের জন্যে পোষাকের কাজ দেয় এবং তোমাদের অন্যান্য প্রয়োজনে তোমরা তা ব্যবহার করে থাক।” মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তুগুলো সৃষ্টি করেছেন যে তোমরা কতগুলোর উপর আরোহণ কর, কতগুলোর গোশত ভক্ষণ কর।” তোমাদের জন্যে অন্যান্য আরও উপকার রয়েছে। তোমরা ওদের দ্বারা তোমাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে থাক। তোমরা ওগুলোর উপর আরোহণ কর। আর তোমরা জাহাজে ও নৌকায় তোমাদের বোঝা চাপিয়ে থাক এবং সওয়ার হয়ে থাক। আল্লাহ তোমাদের কাছে নিজের কতই না নিদর্শন পেশ করছেন! তোমরা তাঁর কোন্ নিদর্শনকে অস্বীকার করবে?

আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে যে ফল ফলাদি, ফসল, চতুষ্পদ জন্তু ইত্যাদি প্রদান করেছেন সেগুলো তোমরা খাও, এগুলো আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জীবিকা বানিয়েছেন। তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না যেমন এই মুশরিকরা তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। তারা কোন কোন আহার্যকে নিজেদের উপর হারাম করে নিয়েছে। হে লোক সকল! শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। অর্থাৎ তোমরা একটু চিন্তা করলেই তার শত্রুতা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সুতরাং তোমরাও শয়তানকে নিজেদের শত্রু বানিয়ে নাও। সে নিজের শয়তানী সেনাবাহিনী নিয়ে তোমাদের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে, যেন তোমরা জাহান্নামের অধিবাসী হয়ে যাও। হে বানী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে ফিত্রায় না ফেলে, যেমন সে তোমাদের পিতা-মাতাকে (আদম ও হাওয়াকে) জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিল এবং তাদের দেহ থেকে পোশাক সরিয়ে দিয়েছিল। ফলে তারা উলঙ্গ হয়ে পড়েছিল। আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা কি আমাকে ছেড়ে শয়তানকে ও তার সন্তানদেরকে বন্ধু বানিয়ে নেবে? অথচ তারাতো তোমাদের শত্রু। অত্যাচারীদের জন্যে বড়ই জঘন্য বিনিময় রয়েছে।” কুরআন পাকে এই বিষয়ের বহু আয়াত রয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।