আল কুরআন


সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 126)

সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 126)



হরকত ছাড়া:

وهذا صراط ربك مستقيما قد فصلنا الآيات لقوم يذكرون ﴿١٢٦﴾




হরকত সহ:

وَ هٰذَا صِرَاطُ رَبِّکَ مُسْتَقِیْمًا ؕ قَدْ فَصَّلْنَا الْاٰیٰتِ لِقَوْمٍ یَّذَّکَّرُوْنَ ﴿۱۲۶﴾




উচ্চারণ: ওয়া হা-যা-সিরা-তুরাব্বিকা মুছতাকীমান কাদ ফাসসালনাল আ-য়া-তি লিকাওমিইঁ ইয়াযযাক্কারূন।




আল বায়ান: আর এ হচ্ছে তোমার রবের সরল পথ। আমি তো বিস্তারিতভাবে আয়াতসমূহ বর্ণনা করেছি এমন কওমের জন্য, যারা উপদেশ গ্রহণ করে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১২৬. আর এটাই আপনার রব নির্দেশিত সরল পথ(১)। যারা উপদেশ গ্রহণ করে আমরা তাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করেছি(২)।




তাইসীরুল ক্বুরআন: অথচ (ইসলামের) এ পথই তোমার প্রতিপালকের সরল-সঠিক পথ, যারা নাসীহাত গ্রহণ করে আমি তাদের জন্য নিদর্শনাবলী বিশদভাবে বিবৃত করে দিয়েছি।




আহসানুল বায়ান: (১২৬) আর এটিই তোমার প্রতিপালক-নির্দেশিত সরল পথ। যারা উপদেশ গ্রহণ করে, তাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করেছি।



মুজিবুর রহমান: আর এটাই হচ্ছে তোমার রবের সহজ সরল পথ, আমি উপদেশ গ্রহণকারী লোকদের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি।



ফযলুর রহমান: এই হল তোমার প্রভুর (নির্দেশিত) সঠিক পথ। আমি উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।



মুহিউদ্দিন খান: আর এটাই আপনার পালনকর্তার সরল পথ। আমি উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্যে আয়াতসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ননা করেছি।



জহুরুল হক: আর এই হচ্ছে তোমার প্রভুর পথ -- সহজ-সঠিক। আমরা নিশ্চয় নির্দেশসমূহ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছি তেমন লোকের জন্য যারা মনোনিবেশ করে।



Sahih International: And this is the path of your Lord, [leading] straight. We have detailed the verses for a people who remember.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১২৬. আর এটাই আপনার রব নির্দেশিত সরল পথ(১)। যারা উপদেশ গ্রহণ করে আমরা তাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করেছি(২)।


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছেঃ এটা আপনার পালনকর্তার সরল পথ। এখানে هَٰذَا (এটা) শব্দ দ্বারা ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মতে কুরআনের দিকে এবং ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মতে ইসলামের দিকে ইশারা করা হয়েছে। অথবা পূর্বে বর্ণিত বিষয়াদি যা দ্বীন হিসেবে পরিগণিত। [বাগভী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] উদ্দেশ্য এই যে, আপনাকে প্রদত্ত কুরআন কিংবা ইসলাম আপনার রব-এর পথ। অর্থাৎ এমন পথ, যা আপনার পালনকর্তা স্বীয় প্রজ্ঞার মাধ্যমে স্থির করেছেন এবং মনোনীত করেছেন। এখানে পথকে রব-এর দিকে সম্পৃক্ত করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, কুরআন ও ইসলামের যে কৰ্মব্যবস্থা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেয়া হয়েছে, তা পালন করা আল্লাহ্ তা'আলার উপকারের জন্য নয়, বরং পালনকারীদের উপকারের জন্য পালনকর্তার দাবীর ভিত্তিতে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মানুষকে এমন শিক্ষাই দান করা উদ্দেশ্য যা তাদের চিরস্থায়ী সাফল্য ও কল্যাণের নিশ্চয়তা বিধান করে।


(২) এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়ঃ (এক) رب শব্দকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে সম্বোধন করে তার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ ও কৃপা প্রকাশ করা হয়েছে। [আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] কেননা, পালনকর্তা ও উপাস্যের দিকে কোন বান্দাকে সামান্যতম সম্বন্ধ করা বান্দার জন্য পরম গৌরবের বিষয়। তদুপরি যদি পরম পালনকর্তা নিজেকে বান্দার দিকে সম্বন্ধ করে বলেন যে, “এটা আপনার প্রভূর রাস্তা” তখন তার সৌভাগ্যের সীমা-পরিসীমা থাকে না। বান্দার মনে তখন সদা জাগরুক থাকে যে, এটা আল্লাহর দেয়া পথ। (দুই) مُسْتَقِيمًا শব্দ দ্বারা বর্ণিত হয়েছে যে, কুরআনের এ পথই হলো সরল পথ। এখানেও مُسْتَقِيمًا কে صِرَاط এ এর বিশেষণ হিসেবে উল্লেখ না করে অবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। [ইবন কাসীর; আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর]

এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, বিশ্ব পালকের স্থিরীকৃত পথ মুস্তাকীম বা সরল হওয়া ছাড়া আর কোন সম্ভাবনাই নাই। এ পথে চলে ভ্ৰষ্ট হওয়ার কোন সুযোগ নেই। এতে বাড়াবাড়ি বা ছাড় প্রবণতা নেই। আঁকাবাকা পথে নয় বরং স্বাভাবিক পথের দিকেই এটি মানুষকে ধাবিত করে। [বাগভী; মানার] (তিন) আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে যে, “আমরা উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য আয়াতসমূহকে পরিস্কারভাবে বর্ণনা করেছি” এখানে فَصَّلْنَا শব্দটি تفضيل থেকে উদ্ভুত। এর অর্থ কোন বিষয়বস্তুকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে এক এক অধ্যায়কে পৃথক পৃথক করে বিশদভাবে বর্ণনা করা। এভাবে গোটা বিষয়বস্তু হৃদয়ঙ্গম হয়ে যায়।

অতএব, تفضيل এর সারমর্ম হচ্ছে বিস্তারিত ও বিশদভাবে বর্ণনা করা। উদ্দেশ্য এই যে, আমি মৌলিক বিষয়গুলোকে পরিস্কার ও বিশদভাবে বর্ণনা করেছি, এতে কোন সংক্ষিপ্ততা বা অস্পষ্টতা রাখিনি। [আইসারুত তাফসীর] (চার) এতে ৫ (لِقَوْمٍ يَذَّكَّرُونَ) বলে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, কুরআনের বক্তব্য পুরোপুরি সুস্পষ্ট ও পরিস্কার হলেও, তা দ্বারা একমাত্র তারাই উপকৃত হয়েছে, যারা উপদেশ গ্রহণের অভিপ্ৰায়ে কুরআনের উপর চিন্তা-ভাবনা করে; জিদ, হঠকারিতা এবং পৈতৃক প্রথার নিশ্চল অনুসরণের প্রাচীর যাদের সামনে অন্তরায় সৃষ্টি করে না। [তাবারী; সা’দী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১২৬) আর এটিই তোমার প্রতিপালক-নির্দেশিত সরল পথ। যারা উপদেশ গ্রহণ করে, তাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করেছি।


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১২৫-১২৭ নং আয়াতের তাফসীর:



সঠিক পথের হিদায়াতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তিনি যাকে হিদায়াত দেয়ার ইচ্ছা করেন তার বক্ষকে তিনি ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(أَفَمَنْ شَرَحَ اللّٰهُ صَدْرَه۫ لِلْإِسْلَامِ فَهُوَ عَلٰي نُوْرٍ مِّنْ رَّبِّه۪ ط فَوَيْلٌ لِّلْقٰسِيَةِ قُلُوْبُهُمْ مِّنْ ذِكْرِ اللّٰهِ ط أُولٰ۬ئِكَ فِيْ ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ )‏



“আল্লাহ যার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করেছেন, সে তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত আলোয় রয়েছে, (সে কি তার সমান যে এরূপ নয়?) দুর্ভোগ তাদের জন্য যাদের কঠোর হৃদয় আল্লাহর স্মরণ হতে বিমুখ। তারা রয়েছে প্রকাশ্য গুমরাহীতে।”(সূরা যুমার ৩৯:২২)



ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: এর অর্থ হল তাওহীদ ও তার প্রতি ঈমান আনার জন্য অন্তরকে প্রশস্তকরণ। (ইবনে কাসীর, ৩/৩৭৫)



নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিভাবে আল্লাহ তা‘আলা অন্তরকে প্রশস্ত করে দেন? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: একটি আলো অন্তরে দিয়ে দেয়া হয়। ফলে অন্তর খুলে যায় ও (ইসলাম গ্রহণের জন্য) প্রশস্ত হয়ে পড়ে।



পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হল, এর কি কোন আলামত আছে যে তা বুঝা যাবে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: সে পরকালের প্রতি ঝুঁকে পড়বে, দুনিয়ার প্রতি তার অনাসক্তি থাকবে এবং মৃত্যু আসার পূর্বেই তার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকবে। (আযউয়াউল বায়ান, ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা যে ব্যক্তির কল্যাণ চান তাকে দীনের জ্ঞান অর্জন করার তৌফিক দান করেন। (সহীহ বুখারী হা: ৭১, সহীহ মুসলিম হা: ১০৩৭)



এর প্রমাণ দুনিয়াতে অনেক রয়েছে। কত বড় বড় ইসলামের দুশমন ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাই সাহাবীদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَاعْلَمُوْٓا اَنَّ فِیْکُمْ رَسُوْلَ اللہِﺚ لَوْ یُطِیْعُکُمْ فِیْ کَثِیْرٍ مِّنَ الْاَمْرِ لَعَنِتُّمْ وَلٰکِنَّ اللہَ حَبَّبَ اِلَیْکُمُ الْاِیْمَانَ وَزَیَّنَھ۫ فِیْ قُلُوْبِکُمْ وَکَرَّھَ اِلَیْکُمُ الْکُفْرَ وَالْفُسُوْقَ وَالْعِصْیَانَﺚ اُولٰ۬ئِکَ ھُمُ الرّٰشِدُوْنَﭖﺫ)



“জেনে রেখ! তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল বিদ্যমান আছেন। যদি তিনি বেশির ভাগ বিষয়ে তোমাদের কথা মেনে নেন, তাহলে তোমরা নিজেরাই মুশকিলে পড়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহ তোমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের জন্য হৃদয়গ্রাহীও করেছেন। আর কুফরী, ফাসেকী ও নাফরমানীর প্রতি তোমাদের অন্তরে ঘৃণা সৃষ্টি করেছেন। এরাই সৎ পথপ্রাপ্ত।”(সূরা হুজুরাত ৪৯:৭)



পক্ষান্তরে যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা পথভ্রষ্ট করতে চান তার অন্তরকে ইসলামের জন্য সংকীর্ণ করে দেন। ইসলামের প্রতি তার খারাপ মনোভাব চলে আসে। আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে তারই উদাহরণ তুলে ধরেছেন।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা পথভ্রষ্টদের তরীকা উল্লেখ করার পর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর যা অবতীর্ণ করেছেন সে ব্যাপারে সতর্ক করছেন যে, এটাই সঠিক দীন, সঠিক পথ।



যারা এ সঠিক পথের অনুসারী হবে তাদের জন্য রয়েছে “দারুস সালাম” নামক জান্নাত। এটা তাদের কর্মের ফলাফল। তাই আমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে হিদায়াত কামনা করব। তিনি হিদায়াত দিলে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. إرادة الله বা “আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা করা” এ গুণ আল্লাহ তা‘আলার রয়েছে বলে প্রমাণিত হল।

২. হিদায়াত দেয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ তা‘আলা, দ্বিতীয় কেউ নয়।

৩. সঠিক পথের অনুসারীদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১২৬-১২৭ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাআলা পথভ্রষ্টদের বর্ণনা দেয়ার পর এখন দ্বীন ও হিদায়াতের মর্যাদার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ তোমাদের প্রতিপালকের এটাই সরল সহজ পথ। (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর ভিত্তিতে হয়েছে। অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এই দ্বীন, যা আমি তোমাকে প্রদান করেছি, সেই অহীর মাধ্যমে, যাকে কুরআন বলে, এটাই হচ্ছে সরল সঠিক পথ। যেমন হযরত আলী (রাঃ) কুরআনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন যে, ওটা হচ্ছে সিরাতে মুসতাকীম, আল্লাহর দৃঢ় রঞ্জু এবং বিজ্ঞানময় বর্ণনা।

(আরবী) অর্থাৎ আমি কুরআনের আয়াতগুলোকে বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি। এর দ্বারা ঐ লোকেরাই উপকৃত হবে যাদের জ্ঞান ও বিবেক রয়েছে। যারা আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথাগুলোকে গভীর মনোযোগের সাথে চিন্তা করে দেখে এবং ওগুলো বুঝবার চেষ্টা করে, তাদের জন্যে কিয়ামতের দিন জান্নাত ও শান্তির ঘর রয়েছে। জান্নাতকে দারুস সালাম বা শান্তির ঘর বলার কারণ এই যে, যেমন তারা দুনিয়ায় শান্তির পথে চলছে, তেমনই কিয়ামতের দিনেও তারা শান্তির ঘর লাভ করবে। আল্লাহ তাদের রক্ষক, সাহয্যকারী ও শক্তিদানকারী। কেননা, তারা ভাল আমল করে থাকে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।