সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 101)
হরকত ছাড়া:
بديع السموات والأرض أنى يكون له ولد ولم تكن له صاحبة وخلق كل شيء وهو بكل شيء عليم ﴿١٠١﴾
হরকত সহ:
بَدِیْعُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ؕ اَنّٰی یَکُوْنُ لَهٗ وَلَدٌ وَّ لَمْ تَکُنْ لَّهٗ صَاحِبَۃٌ ؕ وَ خَلَقَ کُلَّ شَیْءٍ ۚ وَ هُوَ بِکُلِّ شَیْءٍ عَلِیْمٌ ﴿۱۰۱﴾
উচ্চারণ: বাদী‘উছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদি আন্না-ইয়াকূনুলাহূওয়ালাদুওঁ ওয়া লাম তাকুল্লাহূ সা-হিবাতুওঁ ওয়া খালাকা কুল্লা শাইয়িওঁ ওয়া হুওয়া বিকুল্লি শাইয়িন ‘আলীম।
আল বায়ান: তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। কিভাবে তার সন্তান হবে অথচ তার কোন সঙ্গিনী নেই! আর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রতিটি জিনিসের ব্যাপারে সর্বজ্ঞ।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০১. তিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, তার সন্তান হবে কিভাবে? তার তো কোন সঙ্গিনী নেই। আর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেক বস্তু সম্বন্ধে তিনি সবিশেষ অবগত।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তিনি আকাশমন্ডলী ও যমীনের উদ্ভাবক, কীভাবে তাঁর সন্তান হতে পারে যেহেতু তাঁর কোন সঙ্গীণীই নেই, সব কিছু তো তিনিই সৃষ্টি করেছেন, আর প্রতিটি জিনিস সম্পর্কে তিনি পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।
আহসানুল বায়ান: (১০১) তিনি আকাশমন্ডলী ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবনকর্তা, তাঁর সন্তান হবে কিরূপে? তাঁর তো কোন স্ত্রী নেই, তিনিই তো সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন[1] এবং প্রত্যেক বস্তু সম্বন্ধে তিনিই সবিশেষ অবহিত।
মুজিবুর রহমান: তিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা; তাঁর সন্তান হবে কি করে? অথচ তাঁর জীবন সঙ্গিনীই কেহ নেই। তিনিই প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন, প্রত্যেকটি জিনিস সম্পর্কে তাঁর ভাল রুপে জ্ঞান রয়েছে।
ফযলুর রহমান: তিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা। তাঁর সন্তান হবে কি করে? তাঁর তো কোন সঙ্গিনী (স্ত্রী) নেই। আর তিনিই তো সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং সবকিছু সম্বন্ধে তিনি সুবিজ্ঞ।
মুহিউদ্দিন খান: তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের আদি স্রষ্টা। কিরূপে আল্লাহর পুত্র হতে পারে, অথচ তাঁর কোন সঙ্গী নেই ? তিনি যাবতীয় কিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি সব বস্তু সম্পর্কে সুবিজ্ঞ।
জহুরুল হক: মহাকাশমন্ডল ও পৃথিবীর আদিস্রষ্টা! কোথা থেকে তাঁর সন্তান হবে যখন তাঁর জন্য কোনো সহচরী নেই। আর তিনিই সব- কিছু সৃষ্টি করেছেন, আর তিনিই তো সব-কিছু সন্বন্ধে সর্বজ্ঞাতা।
Sahih International: [He is] Originator of the heavens and the earth. How could He have a son when He does not have a companion and He created all things? And He is, of all things, Knowing.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১০১. তিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, তার সন্তান হবে কিভাবে? তার তো কোন সঙ্গিনী নেই। আর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেক বস্তু সম্বন্ধে তিনি সবিশেষ অবগত।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১০১) তিনি আকাশমন্ডলী ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবনকর্তা, তাঁর সন্তান হবে কিরূপে? তাঁর তো কোন স্ত্রী নেই, তিনিই তো সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন[1] এবং প্রত্যেক বস্তু সম্বন্ধে তিনিই সবিশেষ অবহিত।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, যেমন আল্লাহ তাআলা এই সমস্ত জিনিসকে সৃষ্টি করার ব্যাপারে এক ও একক, তাঁর কোন শরীক নেই, অনুরূপ তিনিই এই যোগ্যতার দাবী রাখেন যে, একমাত্র কেবল তাঁরই ইবাদত করা হোক। তাঁর ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক স্থির করা না হোক। কিন্তু মানুষ এই একক সত্তাকে বাদ দিয়ে জ্বিনদেরকে তাঁর শরীক বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তারাও আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট। মুশরিকরা তো মূর্তির অথবা কবরে সমাধিস্থ ব্যক্তিবর্গের পূজা করত। কিন্তু এখানে বলা হয়েছে যে, তারা জ্বিনদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে রেখেছে। আসলে ব্যাপার হল, এখানে জ্বিনদের বলতে শয়তানদেরকে বুঝানো হয়েছে এবং শয়তানদের কথা অনুযায়ীই শিরক করা হয়, তাই প্রকৃতপক্ষে পূজা ও উপাসনা শয়তানেরই করা হয়। এই বিষয়টাকে কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, সূরা নিসার ১১৭নং, সূরা মারয়্যামের ৪৪ নং, সূরা ইয়াসীনের ৬০ নং এবং সূরা সাবা’র ৪১ নং আয়াতে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০০-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, মক্কা ও অন্যান্য এলাকার মুশরিকগণ জিন ও ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার অংশীদার বানিয়ে তাদের ইবাদত করে, তাদেরকে ডাকে অথচ তারা আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্ট জীব, তাদের মধ্যে স্রষ্টা হওয়ার ও ইবাদত পাওয়ার কোন বৈশিষ্ট্যই নেই।
প্রশ্ন হতে পারে- মুশরিকগণ তো মূর্তি পূজা করে; তাহলে কিভাবে তারা জিনদের ইবাদত করল? উত্তর হচ্ছে, তারা জিনদের নির্দেশে মূর্তি পূজা করে আর প্রতিটি মূর্তির সাথে জিন থাকে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنْ يَّدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِه۪ٓ إِلَّآ إِنٰثًاﺆ وَإِنْ يَّدْعُوْنَ إِلَّا شَيْطٰنًا مَّرِيْدًا)
“তাঁর পরিবর্তে তারা দেবীরই পূজা করে এবং বিদ্রোহী শয়তানেরই পূজা করে”(সূরা নিসা ৪:১১৭)
ইবরাহীম (আঃ) তার পিতাকে বলেছেন:
(يٰٓأَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطٰنَ ﺚإِنَّ الشَّيْطٰنَ كَانَ لِلرَّحْمٰنِ عَصِيًّا)
“হে আমার পিতা! শয়তানের ইবাদত কর না, নিশ্চয়ই শয়তান দয়ালু আল্লাহর অবাধ্য। (সূরা মারইয়াম ১৯:৪৪)
আমরা জানি, ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা মূর্তি পূজা করতেন। অথচ এখানে শয়তানের ইবাদত থেকে নিষেধ করা হচ্ছে। এর মানে হল প্রত্যেক মূতির সাথে জিন শয়তান বিদ্যমান।
এ সকল মুশরিকগণ আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে অপবাদ দিয়ে বলে, আল্লাহ তা‘আলার নাকি সন্তান রয়েছে। যেমন বলে, ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার ছেলে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তা‘আলার মেয়ে ইত্যাদি।
আল্লাহ তা‘আলা এসব থেকে ঊর্ধ্বে। তিনি বলেন:
(وَّأَنَّه۫ تَعَالٰي جَدُّ رَبِّنَا مَا اتَّخَذَ صَاحِبَةً وَّلَا وَلَدًا)
“এবং নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালকের মর্যাদা অতি উচ্চ; তিনি কোন স্ত্রী এবং কোন সন্তান গ্রহণ করেননি।” (সূরা জিন ৭২:৩)
(أَنّٰي يَكُوْنُ لَه وَلَد)
‘তাঁর সন্তান হবে কিরূপে?’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার কিভাবে সন্তান হবে তাঁর তো কোন স্ত্রী নেই। যার স্ত্রী নেই তার সন্তান হবার কোন প্রশ্নই আসে না।
আল্লাহ তা‘আলা মানুষ সৃষ্টি করেছেন তিনটি পদ্ধতিতে: ১. পিতা-মাতা ছাড়াই; যেমন আদম (আঃ)। ২. পিতা-মাতার মাধ্যমে; যেমন আমরা। ৩. পিতা ছাড়া, মাতার দ্বারা; যেমন: ঈসা (আঃ)।
অতএব সন্তান হবার মাধ্যম দু’টি: ১. স্বামী-স্ত্রীর মিলন ২. আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিতে মায়ের গর্ভে স্বামী ছাড়া। তাই স্ত্রী ছাড়া সন্তান জন্ম নিতে পারে না।
অতএব আল্লাহ তা‘আলা একক, তাঁর কোন স্ত্রী-সন্তান নেই। তিনি বাদে যা কিছু আছে সবই তাঁর সৃষ্টি, সবকিছু তার মুখাপেক্ষী। কেবল তিনিই অমুখাপেক্ষী। অতএব তিনিই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য, সুতরাং কেবল তাঁরই ইবাদত করতে হবে।
(لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ)
“কোন দৃষ্টি তাঁকে বেষ্টন করতে পারবে না”এ ব্যাপারে সালাফদের কয়েকটি উক্তি রয়েছে।
১. দুনিয়াতে চর্মচোখে আল্লাহ তা‘আলাকে কেউ দেখতে পারে না। আখিরাতে শুধু মু’মিনরা দেখতে পাবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وُجُوْهٌ يَّوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ إِلٰي رَبِّهَا نَاظِرَةٌ)
“কোন কোন মুখমণ্ডল সেদিন উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।”(সূরা কিয়ামাহ ৭৫:২২-২৩)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(لِلَّذِيْنَ أَحْسَنُوا الْحُسْنٰي وَزِيَادَةٌ)
“যারা কল্যাণকর কাজ করে তাদের জন্য আছে কল্যাণ এবং আরও অধিক।”(সূরা ইউনুস ১০:২৬)
زِيَادَةٌ অর্থ হল আল্লাহ তা‘আলার দর্শন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে তেমনিভাবে দেখতে পাবে যেমনিভাবে পূর্ণিমার রাতে চাঁদকে দেখতে পাও। যা দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হয় না। (তিরমিযী হা: ২৫৫৪, সহীহ) এটাই সঠিক মত। এটাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আক্বীদাহ। যদিও মু‘তাজিলারা বলে: দুনিয়া ও আখিরাতে কখনো আল্লাহ তা‘আলাকে দেখা সম্ভব নয়- এ কথা বাতিল। কারণ তা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর বিপরীত।
(وَھُوَ یُدْرِکُ الْاَبْصَارَ)
‘তিনি সকল দৃষ্টিসমূহকে বেষ্টন করে আছেন’ অর্থাৎ
يحيط بها و يعلمها علي ماهي عليه
প্রত্যেক বস্তুকে তার স্বঅবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় দৃষ্টি ও জ্ঞান দ্বারা বেষ্টন করে আছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ ط وَهُوَ اللَّطِيْفُ الْخَبِيْرُ)
“যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত।”(সূরা মূলক ৬৭:১৪)
সুতরাং পরকালে মু’মিনরা আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাবে। পরকালে মু’মিনদের যা কিছু দেয়া হবে তন্মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার দর্শন হবে সবচেয়ে বড় নেয়ামত।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. এক শ্রেণির মানুষ রয়েছে যারা জিনের ইবাদত করে।
২. মূর্তি পূজা করা শয়তানের ইবাদতের নামান্তর।
৩. আল্লাহ তা‘আলা সকল অংশীস্থাপনকারীর অংশী থেকে ঊর্ধ্বে।
৪. দুনিয়াতে চর্মচোখে আল্লাহ তা‘আলাকে দেখা সম্ভব নয়, তবে পরকালে আল্লাহ তা‘আলাকে মু’মিনরা অবশ্যই দেখতে পাবে।
৫. আল্লাহ তা‘আলা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সবকিছু দেখেন এবং খবর রাখেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তাআলাই হচ্ছেন আসমান ও যমীনের উদ্ভাবক ও সৃষ্টিকর্তা। এ দু’টো সৃষ্টি করার সময় কোন নমুনা তাঁর সামনে ছিল না। বিদ্আতকে বিদ্আত বলার কারণ এই যে, প্রাচীন যুগে এর কোন নবীর থাকে না। মানুষ কোন আমলকে নিজের পক্ষ থেকে আবিষ্কার করে নিয়ে ওকে পুণ্যের কাজ মনে করে থাকে।
আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহর সন্তান হবে কিরূপে? তার তো জীবন সঙ্গিনী নেই। সন্তান তো দু'টি অনুরূপ জিনিসের মাধ্যমে জন্মলাভ করে থাকে। আর আল্লাহর অনুরূপ তো কেউই নেই। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, রহমান (আল্লাহ) সন্তান বানিয়ে নিয়েছেন, এটা তোমরা বড়ই মিথ্যা কথা বলছো!” (১৯:৮৮-৮৯)।
তিনিই তো সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। অতএব, তাঁরই সৃষ্ট কিরূপে তাঁর স্ত্রী হতে পারে? তার কোন নযীর নেই। এতদসত্ত্বেও তার নীর হয়ে সন্তান কিরূপে আসতে পারে? আল্লাহর সত্তা এসব থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।