সূরা আল-মুলক (আয়াত: 16)
হরকত ছাড়া:
أأمنتم من في السماء أن يخسف بكم الأرض فإذا هي تمور ﴿١٦﴾
হরকত সহ:
ءَاَمِنْتُمْ مَّنْ فِی السَّمَآءِ اَنْ یَّخْسِفَ بِکُمُ الْاَرْضَ فَاِذَا هِیَ تَمُوْرُ ﴿ۙ۱۶﴾
উচ্চারণ: আ আমিনতুম মান ফিছছামাই আইঁ ইয়াখছিফা বিকুমুল আরদা ফাইযা- হিয়া তামূর।
আল বায়ান: যিনি আসমানে আছেন,* তিনি তোমাদের সহ যমীন ধসিয়ে দেয়া থেকে কি তোমরা নিরাপদ হয়ে গেছ, অতঃপর আকস্মিকভাবে তা থর থর করে কাঁপতে থাকবে?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬. তোমরা কি এ থেকে নিৰ্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানে রয়েছেন(১) তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দেবেন, অতঃপর তা হঠাৎ করেই থর থর করে কাপতে থাকবে?
তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমরা কি তোমাদেরকে নিরাপদ মনে করে নিয়েছ যে, যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদেরকে যমীনে বিধ্বস্ত করে দিবেন না যখন তা হঠাৎ থর থর করে কাঁপতে থাকবে?
আহসানুল বায়ান: (১৬) তোমরা কি নিশ্চিত আছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে সহ ভূমিকে ধসিয়ে দেবেন না? আর ওটা আকস্মিকভাবে কেঁপে উঠবে। [1]
মুজিবুর রহমান: তোমরা কি নিশ্চিত আছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদেরকেসহ ভূমিকে ধ্বসিয়ে দিবেননা, আর ওটা আকস্মিকভাবে থর থর করে কাঁপতে থাকবে?
ফযলুর রহমান: যিনি আসমানে আছেন (অর্থাৎ আল্লাহ), তাঁর এমন শাস্তি থেকে কি তোমরা নিরাপদ যে, তিনি তোমাদেরকে নিয়ে জমিন দাবিয়ে দেবেন এবং জমিন তখন কাঁপতে থাকবে?
মুহিউদ্দিন খান: তোমরা কি ভাবনামুক্ত হয়ে গেছ যে, আকাশে যিনি আছেন তিনি তোমাদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করে দেবেন, অতঃপর তা কাঁপতে থাকবে।
জহুরুল হক: কী! যিনি উর্ধ্বলোকে রয়েছেন তাঁর কাছ থেকে কি তোমরা নিরাপত্তা গ্রহণ করেছ যে তিনি পৃথিবীকে দিয়ে তোমাদের গ্রাস করাবেন না, যখন আলবৎ তা আন্দোলিত হবে?
Sahih International: Do you feel secure that He who [holds authority] in the heaven would not cause the earth to swallow you and suddenly it would sway?
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৬. তোমরা কি এ থেকে নিৰ্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানে রয়েছেন(১) তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দেবেন, অতঃপর তা হঠাৎ করেই থর থর করে কাপতে থাকবে?
তাফসীর:
(১) এর দ্বারা একথা বুঝায় যে, আল্লাহ উপরে থাকেন। এর সপক্ষে হাজারেরও বেশী দলীল-প্রমাণাদি রয়েছে। মু'আবিয়া ইবন হাকাম আস-সুলামী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এক দাসীকে খুব জোরে চড় মেরেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাজটাকে নেহায়েত বড় অন্যায় হয়েছে বলে প্ৰকাশ করলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তাকে স্বাধীন করে দেব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এস। আমি দাসীটিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে আসলে তিনি দাসীকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আসমানে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? সে বলল, আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, একে মুক্ত করে দাও, এ ঈমানদার। [আবু দাউদ: ৩২৮২]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৬) তোমরা কি নিশ্চিত আছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে সহ ভূমিকে ধসিয়ে দেবেন না? আর ওটা আকস্মিকভাবে কেঁপে উঠবে। [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ যিনি আসমান অর্থাৎ, আরশের উপর সমাসীন। এখানে কাফেরদেরকে ভয় দেখানো হচ্ছে যে, আসমানের সেই সত্তা যখন ইচ্ছা তখনই তোমাদেরকে যমীনে ধসিয়ে দিতে পারেন। অর্থাৎ, যে যমীন তোমাদের বাসস্থান এবং তোমাদের রুযীর উৎস ও ভান্ডার, সেই শান্ত ও স্থির যমীনের মধ্যে মহান আল্লাহ কম্পন সৃষ্টি করে তা তোমাদের ধ্বংসের কারণ বানাতে পারেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৬-১৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
যারা সবর্দা কুফরী ও অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকে তাদেরকে এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ধমক ও সতর্কবার্তা যে, তোমরা কি আকাশে যিনি আছেন তাঁর ব্যাপারে নিশ্চিন্ত যে, তিনি তোমাদেরকে জমিনসহ ধসিয়ে দেবেন না; যার কারণে তোমরা অন্যায় কাজে সর্বদা ব্যস্ত থেকেই যাবে? প্রকৃতপক্ষে যেমনটি তোমরা মনে করছো বিষয়টি তেমন নয়। আল্লাহ তা‘আলা এতে সক্ষম, তারপরেও তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি দুনিয়াতে তা করবেন না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللّٰهُ النَّاسَ بِمَا كَسَبُوْا مَا تَرَكَ عَلٰي ظَهْرِهَا مِنْ دَآبَّةٍ وَّلٰكِنْ يُّؤَخِّرُهُمْ إِلٰٓي أَجَلٍ مُّسَمًّي فَإِذَا جَا۬ءَ أَجَلُهُمْ فَإِنَّ اللّٰهَ كَانَ بِعِبَادِه۪ بَصِيْرًا )
“আর যদি আল্লাহ মানুষকে তাদের কাজ-কর্মের দরুণ পাকড়াও করতেন তবে দুনিয়ার বুকে একটি প্রাণীকেও রেহাই দিতেন না। কিন্তু তিনি তাদেরকে এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্তঅবকাশ দেন। অতঃপর যখন এসে পড়বে তাদের সেই নির্র্দিষ্ট সময়, (তখন তিনি তাদের কর্মের প্রতিফল দেবেন) আল্লাহ তো তাঁর বান্দাদের (বিষয়ে) সর্বদ্রষ্টা।” ( সূরা ফাতির ৩৫ : ৪৫)
(أَنْ يُّرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا)
‘অথবা তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদের ওপর পাথর বর্ষণকারী বাতাস প্রেরণ করবেন না?’
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন :
(أَفَأَمِنْتُمْ أَنْ يَّخْسِفَ بِكُمْ جَانِبَ الْبَرِّ أَوْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا ثُمَّ لَا تَجِدُوْا لَكُمْ وَكِيْلًا)
“তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ যে, তিনি তোমাদেরকেসহ কোন অঞ্চল ধসিয়ে দেবেন না অথবা তোমাদের ওপর শিলা বর্ষণকারী মেঘ প্রেরণ করবেন না? তখন তোমরা তোমাদের কোন কর্মবিধায়ক পাবে না।” (সূরা ইসরা ১৭ : ৬৮)
তারপর আল্লাহ তা‘আলা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন পূর্ববর্তী জাতির কথা। যেমন লূত (আঃ)-এর অবাধ্য জাতিকে তিনি অবাধ্যতার কারণে জমিনে ধসিয়ে দিয়েছিলেন, হস্তীবাহিনীকে পাথরের বৃষ্টি দ্বারা ধ্বংস করেছেন। অতএব তোমাদের ওপরও আল্লাহ তা‘আলা আযাব দিতে সক্ষম। তাই একজন মু’মিন কখনো আল্লাহ তা‘আলার পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। বরং তার বিশ্বাস থাকবে এমন যে, যে- কোন সময় আল্লাহ তা‘আলা পাকড়াও করতে পারেন। হাদীসে এসেছে, নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : কবীরাহ গুনাহ হল আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করা, আল্লাহ তা‘আলার পাকড়াও থেকে নিরাপদ মনে করা এবং আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে নিরাশ হওয়া। (মুু‘জামুল কাবীর, ইমাম তাবরানী হা. ৮৭৮৩)
(صٰٓفّٰتٍ وَّيَقْبِضْنَ)
অর্থাৎ পাখিরা যখন হাওয়াতে উড়তে থাকে, তখন তারা পাখা মেলে দেয়। কখনো উড়ন্ত অবস্থায় পাখা গুটিয়ে নেয়। এ পাখা মেলাকে فص-আর গুটিয়ে নেওয়াকে قبض বলে। আকাশে কে পাখিকে স্থির রাখেন? একমাত্র দয়াময় আল্লাহ তা‘আলা। আল্লাহ তা‘আলা কত ক্ষমতাবান। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে চলা উচিত, আল্লাহ তা‘আলার রহমতকে স্মরণ করা উচিত।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. আল্লাহ তা‘আলার পাকড়াও থেকে মুক্ত মনে করা কবীরা গুনাহ।
২. পূর্ববর্তী জাতিদের বিবরণ তুলে ধরার প্রধান কারণ হচ্ছে, তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
৩. আল্লাহ তা‘আলার অশেষ ক্ষমতার কথা জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৬-১৯ নং আয়াতের তাফসীর
এই আয়াতগুলোতেও আল্লাহ তা’আলা স্বীয় স্নেহ-মমতা ও করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, মানুষের কুফরী ও শিরকের ভিত্তিতে তিনি নানা প্রকারের পার্থিব শাস্তির উপরও পূর্ণ ক্ষমতাবান, কিন্তু এতদসত্ত্বেও এটা তাঁর সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতারই পরিচায়ক যে, তিনি শাস্তি দেন না। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যদি আল্লাহ মানুষকে তাদের কৃত পাপের কারণে পাকড়াও করতেন তবে ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারীদের কাউকেও তিনি ছাড়তেন না, কিন্তু এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তিনি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন, অতঃপর যখনই ঐ নির্দিষ্ট সময় এসে পড়বে তখন তিনি তাঁর বান্দাদেরকে দেখে নিবেন।” (৩৫:৪৫)
আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা কি নিশ্চিত আছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে সহ ভূমিকে ধ্বসিয়ে দিবেন না আর ওটা আকস্মিকভাবে কাঁপতে থাকবে? অথবা তোমরা কি নিশ্চিত রয়েছে যে, আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদের উপর কংকরবর্ষী ঝঞা প্রেরণ করবেন না? যেমন মহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তোমরা কি নিশ্চিত আছ যে, তিনি তোমাদেরকে স্থলে কোথাও ভূগর্ভস্থ করবেন না অথবা তোমাদের উপর কংকর বর্ষণ করবেন না? তখন তোমরা তোমাদের কোন কর্মবিধায়ক পাবে না।” (১৭:৬৮)
অনুরূপভাবে এখানেও মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ ধমকের সুরে ও ভীতি প্রদর্শন রূপে বলেনঃ তখন তোমরা জানতে পারবে কিরূপ ছিল আমার সতর্কবাণী! তোমরা দেখে নাও যে, যারা আমার সতর্কবাণীতে কর্ণপাত করে না তাদের পরিণতি কি হয়ে থাকে! তোমরা জেনে রেখো যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও আরোপ করেছিল এবং আমাকে অবিশ্বাস করেছিল, ফলে তাদেরকে শিক্ষামূলক শাস্তি দেয়া হয়েছিল।
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ তারা কি তাদের ঊর্ধদেশে পক্ষীকুলের প্রতি লক্ষ্য করে না, যারা পক্ষ বিস্তার করে ও সংকুচিত করে? করুণাময় আল্লাহই তাদেরকে স্থির রাখেন। এটা তাঁর করুণা যে, তিনি বায়ুকে ওদের অধীন করে দিয়েছেন। সৃষ্টজীবের প্রয়োজন সমূহ পূর্ণকারী এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণকারী একমাত্র আল্লাহ। তিনিই তাদের সবকিছুর দায়িত্ব গ্রহণকারী। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তারা কি ঐ পক্ষীকুলের প্রতি লক্ষ্য করে না যেগুলো আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে স্থির রয়েছে? আল্লাহই ওদেরকে স্থির রাখেন, নিশ্চয়ই এতে মুমিন সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” (১৬:৭৯)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।