সূরা আত-তাহরীম (আয়াত: 12)
হরকত ছাড়া:
ومريم ابنت عمران التي أحصنت فرجها فنفخنا فيه من روحنا وصدقت بكلمات ربها وكتبه وكانت من القانتين ﴿١٢﴾
হরকত সহ:
وَ مَرْیَمَ ابْنَتَ عِمْرٰنَ الَّتِیْۤ اَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِیْهِ مِنْ رُّوْحِنَا وَ صَدَّقَتْ بِکَلِمٰتِ رَبِّهَا وَ کُتُبِهٖ وَ کَانَتْ مِنَ الْقٰنِتِیْنَ ﴿۱۲﴾
উচ্চারণ: ওয়া মারইয়ামাবনাতা ‘ইমরা-নাল্লাতীআহসানাত ফারজাহা-ফানাফাখনা-ফীহি মিররূহিনাওয়া সাদ্দাকাত বিকালিমা-তি রাব্বিহা-ওয়া কুতুবিহী ওয়া কা-নাত মিনাল কা-নিতীন।
আল বায়ান: (আল্লাহ আরো উদাহরণ পেশ করেন) ইমরান কন্যা মারয়াম-এর, যে নিজের সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তাতে আমার রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছিলাম। আর সে তার রবের বাণীসমূহ ও তাঁর কিতাবসমূহের সত্যতা স্বীকার করেছিল এবং সে ছিল অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১২. আরও দৃষ্টান্ত পেশ করেন ইমরান-কন্যা মারইয়ামের—যে তার লজ্জাস্থানের পবিত্ৰতা রক্ষা করেছিল, ফলে আমরা তার মধ্যে ফুঁকে দিয়েছিলাম আমাদের রূহ হতে। আর সে তার রবের বাণী ও তার কিতাবসমূহ সত্য বলে গ্রহন করেছিল এবং সে ছিল অনুগতদের অন্যতম।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর (দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন) ‘ইমরান-কন্যা মারইয়ামের যে তার লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করেছিল, ফলে আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম। সে তার প্রতিপালকের বাণী ও তাঁর কিতাবসমূহে (তাওরাত, যবূর ও ইঞ্জীলে) বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। সে ছিল অনুগত ও বিনতদের অন্তর্ভুক্ত।
আহসানুল বায়ান: (১২) আর (তিনি আরো দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন) ইমরান তনয়া মারয়্যাম,[1] যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তার মধ্যে আমার রূহ হতে ফুঁকে দিয়েছিলাম। সে তার প্রতিপালকের বাণী[2] ও তাঁর কিতাবসমূহ সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল; আর সে ছিল অনুগতদের একজন। [3]
মুজিবুর রহমান: আরও দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন ইমরান তনয়া মারইয়ামের, যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং সে তার রবের বাণী ও তাঁর কিতাবসমূহ সত্য বলে গ্রহণ করেছিল; সে ছিল অনুগতদের একজন।
ফযলুর রহমান: (তিনি) ইমরানের কন্যা মরিয়মেরও (উদাহরণ দিচ্ছেন), যে তার লজ্জাস্থান সুরক্ষিত রেখেছিল (সতীত্ব রক্ষা করেছিল)। অতঃপর আমি তাতে আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম। সে তার প্রভুর বাণী ও কিতাবসমূহকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল। আর সে ছিল অনুগত বান্দাদের একজন।
মুহিউদ্দিন খান: আর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন এমরান-তনয়া মরিয়মের, যে তার সতীত্ব বজায় রেখেছিল। অতঃপর আমি তার মধ্যে আমার পক্ষ থেকে জীবন ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং সে তার পালনকর্তার বানী ও কিতাবকে সত্যে পরিণত করেছিল। সে ছিল বিনয় প্রকাশকারীনীদের একজন।
জহুরুল হক: আর ইমরানের কন্যা মরিয়ম, যে তার আঙ্গিক কর্তব্যাবলী রক্ষা করেছিল, ফলে আমরা তার মধ্যে আমাদের রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছিলাম, আর সে তার প্রভুর বাণীকে ও তাঁর গ্রন্থগুলোকে সত্য জেনেছিল, আর সে ছিল বিনয়াবনতদের মধ্যেকার।
Sahih International: And [the example of] Mary, the daughter of 'Imran, who guarded her chastity, so We blew into [her garment] through Our angel, and she believed in the words of her Lord and His scriptures and was of the devoutly obedient.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১২. আরও দৃষ্টান্ত পেশ করেন ইমরান-কন্যা মারইয়ামের—যে তার লজ্জাস্থানের পবিত্ৰতা রক্ষা করেছিল, ফলে আমরা তার মধ্যে ফুঁকে দিয়েছিলাম আমাদের রূহ হতে। আর সে তার রবের বাণী ও তার কিতাবসমূহ সত্য বলে গ্রহন করেছিল এবং সে ছিল অনুগতদের অন্যতম।(১)
তাফসীর:
(১) এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “পুরুষদের মধ্যে অনেকেই কামেল বা পরিপূর্ণ হয়েছেন, কিন্তু নারীদের মধ্যে কেবল ফিরআউন-পত্নী আসিয়া ও ইমরান তনয়া মারইয়াম পরিপূর্নতা লাভ করেছেন।” [বুখারী: ৩৪১১, মুসলিম: ২৪৩১]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১২) আর (তিনি আরো দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন) ইমরান তনয়া মারয়্যাম,[1] যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তার মধ্যে আমার রূহ হতে ফুঁকে দিয়েছিলাম। সে তার প্রতিপালকের বাণী[2] ও তাঁর কিতাবসমূহ সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল; আর সে ছিল অনুগতদের একজন। [3]
তাফসীর:
[1] মারয়্যাম (আলাইহাস্ সালাম)-কে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল, এ কথা বর্ণনা করা যে, তিনি ভ্রষ্ট এক জাতির মধ্যে থাকতেন, তা সত্ত্বেও আল্লাহ তাঁকে দুনিয়া ও আখেরাতে মর্যাদা ও সম্মান দানে ধন্য করেন এবং বিশ্বের সমস্ত নারীদের উপর তাঁকে বিশেষ মর্যাদা দান করেন।
[2] ‘প্রতিপালকের বাণী’ বলতে আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধানকে বুঝানো হয়েছে।
[3] অর্থাৎ, তিনি এমন লোকদের অথবা এমন গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা আনুগত্যে, ইবাদতে এবং নেকীর কাজে শ্রেষ্ঠত্বের দাবী রাখত। হাদীসে বর্ণিত যে, ‘‘জান্নাতী মহিলাদের মধ্যে সব থেকে উত্তম হলেন খাদীজা, ফাতেমা, মারয়্যাম এবং ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া।’’ (রায্বিয়াল্লাহু আনহুন্না।) (আহমাদ ১/২৯৩, মাজমাউয্ যাওয়ায়েদ ৯/২২৩, আস্স্বাহীহাহ ১৫০৮নং) অপর এক হাদীসে এসেছে, ‘‘পুরুষদের মধ্যে পূর্ণতা তো অনেকেই অর্জন করেছে। কিন্তু মহিলাদের মধ্যে পূর্ণতার অধিকারিণী হয়েছে কেবল, ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া, মারয়্যাম বিনতে ইমরান এবং খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ।’’ (রায্বিয়াল্লাহু আনহুন্না।) আর সমস্ত মহিলাদের মধ্যে আয়েশা (রায্বিয়াল্লাহু আনহুর)র মর্যাদা ঐরূপ, যেমন সমস্ত খাদ্যের মধ্যে ‘সারীদ’ (গোশত মিশ্রিত রুটির পলান্ন) সর্বাধিক বৈশিষ্ট্যের দাবী রাখে।’’ (বুখারীঃ সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়, মুসলিমঃ ফাযায়েল অধ্যায়, খাদিজা (রাঃ)র ফযীলত পরিচ্ছেদ)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৯-১২ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও কঠোরতা অবলম্বন করার নির্দেশ প্রদান করছেন। এতে দাওয়াত, উত্তম উপদেশ, তাদের ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডন করা ও সশস্ত্র জিহাদ সব কিছু শামিল। (তাফসীর সা‘দী)।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা কাফির ও মু’মিনদের জন্য দুটি উদারহণ পেশ করছেন। প্রথমেই আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের জন্য উদাহরণ পেশ করছেন দুজন প্রসিদ্ধ খ্যাতনামা দুজন নাবীর স্ত্রীদের দ্বারা। তারা বড় বড় দুজন নাবীর স্ত্রী, কিন্তু তা সত্ত্বেও ঈমান না থাকার কারণে জাহান্নাম থেকে রেহাই পাবে না। আল্লাহ তা‘আলা এর দ্বারা কাফির সম্প্রদায়কে বুঝাতে চাচ্ছেন যে, তোমরা নিজেদেরকে যত বড় দাবী কর আর যত বড় নেক লোকদের নেতৃত্বাধীন থাকো না কেন ঈমান না আনলে কোন বাহাদুরী কাজে আসবে না।
فَخٰنَتٰهُمَا এখানে খেয়ানত দ্বারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে তা নয়। কারণ নাবীদের স্ত্রী ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া থেকে মুক্ত। এটা রাসূলদের সম্মানার্থে। বরং তাদের খেয়ানত ছিল দীনের ব্যাপারে। নূহ (আঃ)-এর স্ত্রী লোকদের বলে বেড়াতো যে, সে (আমার স্বামী নূহ) একজন পাগল। আর লূত (আঃ)-এর স্ত্রী নিজ বাড়িতে আগত মেহমানদের ব্যাপারে জাতিকে অবগত করিয়ে দিত যাতে তারা তাদের সাথে খারাপ কাজে লিপ্ত হয়। (ইবনু কাসীর)
কেউ বলেছেন : এরা উভয়েই তাদের জাতির লোকদের মাঝে নিজ নিজ স্বামীর চুগলি করে বেড়াত। তারপর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের জন্য উদাহরণ পেশ করছেন ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া ও মারইয়াম (আঃ) দ্বারা। ফির‘আউন ছিল তৎকালীন একজন ক্ষমতাধর কাফির বাদশা। এতদসত্ত্বেও আসিয়া আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য স্বীকার করেছে এবং শরয়ী বিধি বিধান যথাযথ পালন করেছে, যার কারণে তার স্বামীর কুফরী তার ঈমানকে বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি।
অনুরূপভাবে মারইয়াম (আঃ) নিজের সতীত্ব হেফাযত করেছিলেন আর আল্লাহ তা‘আলা চাচ্ছিলেন তার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। ফলে তাকে বিনা স্বামীতে সন্তান দিয়ে পরীক্ষা করলেন। তিনি সে পরীক্ষায় ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এর দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন নর ও নারীদের বুঝাতে চাচ্ছেন যে, প্রতিকুল পরিবেশেও যারা ঈমানের ওপর অটল থাকে তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জমিনে চারটি দাগ টানলেন এবং বললেন : তোমরা কি জান এটা কী? সাহাবীগণ বললেন : আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাল জানেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : জান্নাতীদের শ্রেষ্ঠ মহিলা হলেন খাদিজা বিনতু খুওয়াইলিদ, ফাতিমা বিনতু মুহাম্মাদ, মারইয়াম বিনতু ইমরান ও আসিয়া (ফির‘আউনের স্ত্রী)। (আহমাদ হা. ২৬৬৮, সনদ সহীহ)।
এরূপ তাদের ফযীলতের আরেকটি সহীহ হাদীস রয়েছে যার আলোচনা সূরা আলি ইমরানের ৪২ নম্বর আয়াতে করা হয়েছে।
সুতরাং কাফির নারীদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত তাদের পক্ষে স্বামীদের আনুগত্য না করে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য করা উচিত এবং মু’মিন নারীদের উচিত স্বামী যতই আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য কাজে জড়িত করার চেষ্টা করুক তারা তাতে লিপ্ত না হয়ে আল্লাহ তা‘আলার ভয়কে সর্বদা প্রাধান্য দেবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ওয়াজিব। তবে স্থান ও কাল ভেদে এ বিধান ভিন্ন হয়।
২. ঈমান ছাড়া আল্লাহ তা‘আলার কাছে কোন সদামল গ্রহণযোগ্য হবে না, সে যে কেউ হোক না কেন।
৩. প্রতিকুল পরিবেশে ঈমান ধরে রাখার ফযীলত জানলাম।
৪. চারজন মহিলার ফযীলত জানতে পারলাম।
৫. মারইয়াম (আঃ)-এর সতিত্ব সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি নিজের সতীত্ব সংরক্ষণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে বিনা স্বামীতে ঈসা (আঃ)-কে সন্তান হিসাবে দান করেছেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১১-১২ নং আয়াতের তাফসীর
এখানে আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদের জন্যে দৃষ্টান্ত পেশ করে বলেনঃ যদি মুসলমানরা প্রয়োজনবোধে কাফিরদের সাথে মিলে মিশে থাকে তবে তাদের কোন অপরাধ হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “মুমিনগণ যেন মুমিনগণ ব্যতীত কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম যদি তোমরা তাদের নিকট হতে আত্মরক্ষার জন্যে সতর্কতা অবলম্বন কর।” (৩:২৮)
হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, সারা জগতের লোকের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উদ্ধত লোক ছিল ফিরাউন। কিন্তু তার কুফরীও তার স্ত্রীর কোন ক্ষতি করতে পারেনি। কেননা, তার স্ত্রী তাঁর যবরদস্ত ঈমানের উপর পূর্ণমাত্রায় কায়েম ছিলেন। আল্লাহ তা'আলা ন্যায় বিচারক ও হাকিম। তিনি একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করেন না।
হযরত সালমান (রঃ) বলেন যে, ফিরাউন ঐ সতী-সাধ্বী নারীর উপর সর্বপ্রকারের নির্যাতন করতো। কঠিন গরমের সময় তাকে রৌদ্রে দাঁড় করিয়ে দিতো। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ ফেরেশতাদের পরের দ্বারা তাঁকে ছায়া করতেন এবং তাঁকে গরমের কষ্ট হতে রক্ষা করতেন। এমন কি তিনি তাকে তার জান্নাতী ঘর দেখিয়ে দিতেন। ফলে তাঁর রূহ তাযা হয়ে উঠতে এবং ঈমান বৃদ্ধি পেতো। তিনি ফিরাউন ও হযরত মূসা (আঃ)-এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকতেন যে, জয়লাভ কে করলো? সব সময় তিনি শুনতে পেতেন যে, হযরত মূসাই (আঃ) জয়লাভ করেছেন। তখন ওটাই তাঁর ঈমান আনয়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তিনি ঘোষণা করেনঃ ‘আমি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ)-এর প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনলাম।”
ফিরাউন এ খবর জানতে পেরে তার লোকজনকে বললোঃ সবচেয়ে বড় পাথর তোমরা খোঁজ করে নিয়ে এসো। অতঃপর তাকে চিত করে শুইয়ে দাও এবং তাকে বললোঃ “তুমি তোমার এই আকীদা হতে বিরত থাকো। যদি বিরত থাকে তবে ভাল কথা, সে আমার স্ত্রী। তাকে মর্যাদা সহকারে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে। আর যদি না মানে তবে ঐ পাথর তার উপর নিক্ষেপ করবে এবং তার মাংস টুকরো টুকরো করে ফেলবে। অতঃপর তার লোকেরা পাথর নিয়ে আসলো এবং তাঁকে নিয়ে গেল ও চিত করে শুইয়ে দিলো এবং তাঁর উপর ঐ পাথর নিক্ষেপ করার জন্যে উঠালো। ঐ সময় তিনি আকাশের দিকে তার চক্ষু উঠালেন। মহান আল্লাহ পর্দা সরিয়ে দিলেন এবং তিনি জান্নাত এবং সেখানে তাঁর জন্যে যে ঘর তৈরী করা হয়েছে তা স্বচক্ষে দেখে নিলেন। ওতেই তাঁর রূহ বেরিয়ে পড়লো। যখন পাথর তার উপর নিক্ষেপ করা হয় তখন তার মধ্যে রূহ ছিলই না। তিনি শাহাদাতের সময় দু'আ করেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক। 'আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন। তাঁর দু'আর সূক্ষ্মতার প্রতি লক্ষ্য করা যাক, প্রথমে তিনি আল্লাহর সন্নিধান কামনা করছেন, তারপর ঘরের প্রার্থনা করছেন। এই ঘটনার বর্ণনায় মারফূ’ হাদীসও এসেছে। তারপর তিনি দুআ করছেনঃ “আমাকে উদ্ধার করুন ফিরাউন ও তার দুষ্কৃতি হতে এবং আমাকে উদ্ধার করুন যালিম সম্প্রদায় হতে।”
ঐ পুণ্যবতী মহিলার নাম ছিল, আসিয়া বিনতু মাযাহিম (রাঃ)। তার ঈমান আনয়নের ঘটনাটি হযরত আবূল আলিয়া নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃ
ফিরাউনের দারোগার স্ত্রীর ঈমান ছিল হযরত আসিয়ার (রাঃ) ঈমান আনয়নের কারণ। দারোগার স্ত্রী একদা ফিরাউনের কন্যার মাথার চুলে চিরুণী করে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ করে চিরুণী তার হাত হতে পড়ে যায়। তখন তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়ঃ “কাফিররা ধ্বংস হোক।” ফিরাউনের কন্যা তার মুখে একথা শুনে বললোঃ “তুমি কি আমার পিতা ছাড়া অন্য কাউকে প্রতিপালক বলে স্বীকার কর?` মহিলাটি উত্তরে বলল “আমার, তোমার পিতার এবং অন্যান্য সবারই প্রতিপালক হলেন আল্লাহ।` সে তখন ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে মহিলাটিকে খুবই মারপিট করলো। অতঃপর তার পিতাকে এ খবর দিয়ে দিলো। ফিরাউন মহিলাটিকে ডেকে নিয়ে নিজেই জিজ্ঞেস করলোঃ “তুমি কি আমার ছাড়া আর কারো ইবাদত কর?” মহিলাটি জবাবে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমার, তোমার এবং সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রতিপালক হলেন, আল্লাহ। আমি তাঁরই ইবাদত করি।” একথা শুনে ফিরাউন তার লোকদেরকে হুকুম করলোঃ “মহিলাটিকে চিৎ করে শুইয়ে দাও। তার হাতে পায়ে পেরেক মেরে দাও আর সাপ ছেড়ে দাও যে তাকে কামড়াতে থাকবে।” মহিলাটি এই অবস্থাতেই থাকেন। আবার একদিন ফিরাউন তার কাছে এসে বললোঃ “এখনো কি তোমার চিন্তার পরিবর্তন হয়নি। পুনরায় তিনি জবাব দিলেনঃ “তোমার আমার এবং সব জিনিসের প্রতিপালক হলেন একমাত্র আল্লাহ।” ফিরাউন বললোঃ “আচ্ছা, এখন আমি তোমার চোখের সামনে তোমার ছেলেকে টুকরো টুকরো করে ফেলছি। সুতরাং এখনো তোমাকে বলছিঃ আমার কথা মেনে নাও এবং তোমার এই দ্বীন হতে ফিরে এসো।” মহিলাটি উত্তর দিলেনঃ “তোমার যা ইচ্ছা হয় তাই কর।” ঐ অত্যাচারী তখন তাঁর পুত্রকে ধরে আনতে বললো এবং তার সামনে মেরে ফেললো। ছেলেটির রূহ যখন বের হয় তখন সে বললোঃ “মা! তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আল্লাহ তোমার জন্যে বড় বড় পুণ্য রেখেছেন এবং তুমি অমুক অমুক নিয়ামত লাভ করবে।” মহিলাটি তাঁর ছেলের রূহ এভাবে বের হতে স্বচক্ষে দেখলেন। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করলেন এবং আল্লাহ পাকের ফায়সালাকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিলেন। ফিরাউন আবার তাঁকে বেধে ফেলে রাখলো এবং সাপ ছেড়ে দিলো। পুনরায় একদিন এসে নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করলো। মহিলাটি এবারও অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে একই জবাব দিলেন। ফিরাউন তাকে আবার ঐ হুমুকই দিলো এবং তাঁর আরেকটি ছেলে ধরে এনে তার চোখের সামনে মেরে ফেললো। ছেলেটির রূহ অনুরূপভাবেই তার মাতাকে সুসংবাদ দিলো এবং তাকে ধৈর্যধারণে উৎসাহিত করলো।
ফিরাউনের স্ত্রী এই মহিলাটির বড় ছেলের রূহের সুসংবাদ শুনেছিলেন। এই ছোট ছেলেটিরও সুসংবাদ শুনলেন। সুতরাং তিনিও ঈমান আনয়ন করলেন। ওদিকে ঐ মহিলাটির রূহ আল্লাহ তা'আলা কবয করে নিলেন এবং তাঁর মনযিল ও মরতবা যা আল্লাহ তা’আলার নিকট ছিল তা পর্দা সরিয়ে ফিরাউনের স্ত্রীকে দেখিয়ে দেয়া হলো। সুতরাং তার ঈমান বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ফিরাউনের কানেও তাঁর ঈমানের কথা পৌঁছে গেল। সে একদা তার সভাষদবর্গকে বললোঃ “তোমরা আমার স্ত্রীর কোন খবর রাখো কি? তোমরা তাকে কিরূপ মনে কর?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে সবাই তাঁর খুব প্রশংসা করলো এবং তার গুণাবলীর বর্ণনা দিলো। ফিরাউন তখন তাদেরকে বললোঃ “না, না, তোমরা তার খবর রাখে না। সে আমি ছাড়া অন্যকে উপাস্যরূপে মেনে থাকে।” তারপর তাদের মধ্যে পরামর্শ হলো যে, তাঁকে হত্যা করে ফেলা হবে। অতঃপর তাঁর হাতে পায়ে পেরেক মেরে শুইয়ে দেয়া হলো। ঐ সময় তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর দুআ কবুল করেন এবং পর্দা সরিয়ে দিয়ে তাকে তার জান্নাতী ঘর দেখিয়ে দেন। তা দেখে তিনি হেসে ওঠেন। ঠিক ঐ সময়েই তাঁর কাছে ফিরাউন এসে পড়ে এবং তাঁকে হাসির অবস্থায় দেখতে পায়। তখন সে তার লোকজনকে বলেঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা কি বিস্ময়বোধ করছে না যে, এরূপ কঠিন শাস্তির অবস্থাতেও এ মহিলা হাসতে রয়েছে? নিশ্চয়ই এর মাথা খারাপ হয়েছে।” মোটকথা ঐ শাস্তিতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন। তা হলো হযরত মরিয়ম বিনতে ইমরানের (আঃ) দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতী-সাধ্বী রমণী। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আমার ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম।
আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরাঈলকে মানুষের রূপ দিয়ে হযরত মরিয়ম (আঃ)-এর নিকট প্রেরণ করেন এবং তাঁকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন তার মুখ দিয়ে মরিয়ম (আঃ)-এর জামার ফাঁকে ফুঁকে দেন। তাতেই তিনি গর্ভবতী হয়ে যান এবং হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি তাঁর মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম।
এরপর মহান আল্লাহ হযরত মরিয়ম (আঃ)-এর আরো প্রশংসা করে বলেনঃ সে তাঁর প্রতিপালকের বাণী ও তাঁর কিতাব সত্যি বলে গ্রহণ করেছিল, সে ছিল অনুগতদের একজন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাটিতে চারটি রেখা টানেন এবং সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এগুলো কি তা তোমরা জান কি?” তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই ভাল জানেন।” তিনি তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, জান্নাতী রমণীদের মধ্যে চারজন হলো সর্বোত্তম। তাঁরা হলো খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদ (রাঃ), ফাতেমা বিনতু মুহাম্মাদ (সঃ) (রাঃ), মরিয়ম বিনতু ইমরান (আঃ) এবং ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতু মাযাহিম (রাঃ)।” (এ হাদসীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “পুরুষ লোকদের মধ্যে তো পূর্ণতাপ্রাপ্ত লোক বহু রয়েছে। কিন্তু রমণীদের মধ্যে পূর্ণতাপ্রাপ্তা রমণী রয়েছে শুধুমাত্র ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ), মরিয়ম বিন্তু ইমরান (আঃ) ও খাদীজা বিন্তু খুওয়াইলিদ (রাঃ)। আর সমস্ত রমণীর মতো আয়েশা (রাঃ)-এর ফযীলত এমনই যেমন সমস্ত খাদ্যের মধ্যে সারীদ মাদক খাদ্যের ফযীলত।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)
আমরা আমাদের কিতাব আল বিদাইয়াহ্ ওয়ান নিহাইয়াহ এর মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনায় এই হাদীসের সনদ ও শব্দসমূহ বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আর আল্লাহ তা'আলার ফযল ও করমে এই সূরারই আয়াতের শব্দ (আরবি)-এর তাফসীরের মধ্যে ঐ হাদীসটির বর্ণনা করে দিয়েছি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে হযরত আসিয়া বিন্তু মাযাহিম (রাঃ)-ও একজন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।