সূরা আত-ত্বলাক্ব (আয়াত: 3)
হরকত ছাড়া:
ويرزقه من حيث لا يحتسب ومن يتوكل على الله فهو حسبه إن الله بالغ أمره قد جعل الله لكل شيء قدرا ﴿٣﴾
হরকত সহ:
وَّ یَرْزُقْهُ مِنْ حَیْثُ لَا یَحْتَسِبُ ؕ وَ مَنْ یَّتَوَکَّلْ عَلَی اللّٰهِ فَهُوَ حَسْبُهٗ ؕ اِنَّ اللّٰهَ بَالِغُ اَمْرِهٖ ؕ قَدْ جَعَلَ اللّٰهُ لِکُلِّ شَیْءٍ قَدْرًا ﴿۳﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইয়ারযুকহু মিন হাইছুলা-ইয়াহতাছিবু ওয়া মাইঁ ইয়াতাওয়াক্কাল ‘আলাল্লা-হি ফাহুওয়া হাছবুহূ ইন্নাল্লা-হা বা-লিগু আমরিহী কাদ জা‘আলাল্লা-হু লিকুল্লি শাইয়িন কাদরা-।
আল বায়ান: এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. এবং তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন রিযিাক। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।(১) আল্লাহ তার ইচ্ছে পূরণ করবেনই; অবশ্যই আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন সুনির্দিষ্ট মাত্ৰা।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর তাকে রিযক দিবেন (এমন উৎস) থেকে যা সে ধারণাও করতে পারে না। যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ নিজের কাজ সম্পূর্ণ করবেনই। আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য করেছেন একটা সুনির্দিষ্ট মাত্রা।
আহসানুল বায়ান: (৩) এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রুযী দান করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করবে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট হবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করবেনই।[1] আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা। [2]
মুজিবুর রহমান: আর তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে দান করবেন রিয্ক; যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করবেনই, আল্লাহ সব কিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা।
ফযলুর রহমান: আর তাকে এমন জায়গা থেকে জীবিকার ব্যবস্থা করবেন যা সে ধারণাও করে না। যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ নিশ্চয়ই তার উদ্দেশ্য পূরণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্য একটি মাত্রা ঠিক করেছেন।
মুহিউদ্দিন খান: এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্যে একটি পরিমাণ স্থির করে রেখেছেন।
জহুরুল হক: আর তিনি তাকে জীবনোপকরণ প্রদান করেন এমন দিক থেকে যা সে ধারণাও করে নি। আর যে আল্লাহ্র উপরে নির্ভর করে -- তার জন্য তবে তিনিই যথেষ্ট। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ তাঁর উদ্দেশ্য পরিপূর্ণকারী। আল্লাহ্ নিশ্চয়ই সব-কিছুর জন্য এক পরিমাপ ধার্য করে রেখেছেন।
Sahih International: And will provide for him from where he does not expect. And whoever relies upon Allah - then He is sufficient for him. Indeed, Allah will accomplish His purpose. Allah has already set for everything a [decreed] extent.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩. এবং তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন রিযিাক। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।(১) আল্লাহ তার ইচ্ছে পূরণ করবেনই; অবশ্যই আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন সুনির্দিষ্ট মাত্ৰা।
তাফসীর:
(১) তিরমিযী ও ইবনে মাজায় বর্ণিত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যদি তোমরা আল্লাহর ওপর যথাযথ ভরসা করতে, তবে আল্লাহ্ তোমাদেরকে পাখির ন্যায় রিযিক দান করতেন। পাখি সকাল বেলায় ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাসা থেকে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যায় উদরপূর্তি করে ফিরে আসে।” [মুসনাদে আহমাদ: ১/৩০, তিরমিযী: ২৩৪৪, ইবনে মাজাহঃ ৪১৬৪]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেনঃ আমার উম্মত থেকে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্ৰবেশ করবে। তাদের অন্যতম গুণ এই যে, তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। [বুখারী: ৫৭০৫, মুসলিম: ২১৮, মুসনাদে আহমাদ: ১/৪০১]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩) এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রুযী দান করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করবে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট হবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করবেনই।[1] আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা। [2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, তিনি যা করতে চান, তা থেকে তাঁকে কেউ বাধা দিতে পারে না।
[2] কষ্টসাধ্য ও সহজসাধ্য সকল কর্মের জন্যই। নির্ধারিত সময়েই উভয় (সহজ ও কঠিন) জিনিসেরই পরিসমাপ্তি ঘটে। কেউ কেউ এর অর্থ নিয়েছেন, মাসিক ও ইদ্দত।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২-৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
স্ত্রীর ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বমুহূর্তে স্বামীর কর্তব্য কী তা এখানে বলা হয়েছে। স্ত্রীর ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে স্বামী ইচ্ছা করলে ফিরিয়ে নিতে পারে, আর যদি ফিরিয়ে না নেয় তাহলে ন্যায় সঙ্গত ভাবে তাকে ছেড়ে দেবে। সহবাসকৃত ত্বালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দত হল তিন ঋতু/মাসিক পর্যন্ত (তিন মাস) আর গর্ভবতী ত্বালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দত হল গর্ভ প্রসব হওয়া পর্যন্ত। ফিরিয়ে নেয়ার ইচ্ছা থাকলে এর মধ্যেই ফিরিয়ে নিতে হবে।
(وَّأَشْهِدُوْا ذَوَيْ عَدْلٍ مِّنْكُمْ)
‘তোমাদের মধ্য হতে দুই জন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখ’ অর্থাৎ ত্বালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে বা ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে দ’ুজন মুসলিম ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখ। এ নির্দেশ ওয়াজিব নয়, বরং মুস্তাহাব। সাক্ষী রাখার উপকারীতা হল কেউ কাউকে অস্বীকার করতে পারবে না যে, স্বামী আমাকে ত্বালাক দেয়নি বা স্ত্রী দাবী করছে যে, আমাকে ত্বালাক দিয়েছে আর স্বামী অস্বীকার করছে। আর বিবাহ বন্ধন অক্ষুণœ রয়েছে বলে কেউ কাউকে অপবাদ দিতে না পারে এবং একজন মারা গেলে অপরজন ওয়ারিশ দাবী করতে না পারে।
(يَجْعَلْ لَّه مَخْرَجًا)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিপদ আপদ থেকে নিষ্কৃতির পথ বের করে দেবেন এবং এমনভাবে রিযিক দেবেন যে, সে বুঝতেও পারবে না তা কোথা থেকে এসেছে। ইবনু আব্বাস প্রমুখ বলেন : এটা ত্বালাকের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সুযোগ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশানুপাতে ত্বালাক দেবে ইদ্দতের মাঝে ফিরিয়ে নেয়ার একটি সুযোগ আল্লাহ তা‘আলা করে দেবেন। তিনি আরো বলেন : দুনিয়া ও আখেরাতের প্রত্যেক বিপদ থেকে মুক্তি দেবেন (কুরতুবী)।
(وَمَنْ يَّتَوَكَّلْ عَلَي اللّٰهِ فَهُوَ حَسْبُه۫)
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট’ ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : একদা তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পেছনে আরোহী ছিলেন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : হে বৎস! আমি তোমাকে কয়েকটি বাক্য শিক্ষা দেব। তুমি আল্লাহ তা‘আলাকে হেফাযত কর আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে হেফাযত করবেন, তুমি আল্লাহ তা‘আলাকে হেফাযত কর সর্বত্র আল্লাহ তা‘আলাকে পাবে। যখন তুমি কিছু চাইবে তখন আল্লাহ তা‘আলার কাছেই চাইবে, যখন সাহায্য চাইবে তখন আল্লাহ তা‘আলার কাছেই সাহায্য চাইবে। জেনে রেখ! সমস্ত মানুষ যদি একত্রিত হয় তোমার কোন উপকার করার জন্য তারা তোমার কোন উপকার করতে পারবে না তবে আল্লাহ তা‘আলা যেটুকু তাকদীরে লিখে রেখেছেন। আর যদি সবাই একত্রিত হয় তোমার কোন ক্ষতি করার জন্য তাহলে তারা তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না তবে আল্লাহ তা‘আলা তোমার জন্য যেটুকু ক্ষতি তাকদীরে লিখে রেখেছেন। (তিরমিযী হা. ২৫১৬, সহীহ)
সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের উচিত হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছে চাওয়া, আল্লাহ তা‘আলার কাছেই সাহায্য চাওয়া।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার স্বামীর রয়েছে।
২. সম্পর্ক ছিন্ন বা বহাল রাখার ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখা মুস্তাহাব॥
৩. তাক্বওয়ার ফযীলত জানলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২-৩ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ইদ্দত বিশিষ্টা নারীদের ইদ্দতের সময়কাল যখন পূর্ণ হওয়ার নিকটবর্তী হবে তখন তাদের স্বামীদের দুটো পন্থার যে কোন একটি গ্রহণ করা উচিত। হয় তাদেরকে যথাবিধি স্ত্রীরূপেই রেখে দিবে, অর্থাৎ যে তালাক তাদেরকে দিয়েছিল তা হতে রাজআত করে তাদেরকে যথা নিয়মে তাদের বিবাহ বন্ধনে রেখে দিয়ে তাদের সাথে স্ত্রীরূপে বসবাস করবে, না হয় তাদেরকে তালাক দিয়ে দিবে। কিন্তু তাদেরকে গাল মন্দ দিবে না, শাসন গর্জন করবে না, বরং ভালভাবে তাদেরকে পরিত্যাগ করবে।
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যদি তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে রাজআত করে নাও তবে তোমাদের মধ্য হতে অর্থাৎ মুসলমানদের মধ্য হতে দুইজন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে। যেমন সুনানে আবি দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “একটি লোক তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে, অতঃপর তার সাথে সহবাস করেছে। অথচ না সে তালাকের উপর সাক্ষী রেখেছে, না রাজআতের উপর সাক্ষী রেখেছে। এর হুকুম কি হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “সে সুন্নাতের বিপরীত তালাক দিয়েছে এবং সুন্নাতের বিপরীত রাজআত করেছে। তার উচিত ছিল তালাকের উপরও সাক্ষী রাখা এবং রাজআতের উপরও সাক্ষী রাখা। সে ভবিষ্যতে আর যেন এর পুনরাবৃত্তি না করে।” হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, বিবাহ, তালাক এবং রাজআত দুই জন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া জায়েয নয়। যেমন আল্লাহ পাকের নির্দেশ রয়েছে। তবে নিরুপায়ভাবে হয়ে গেলে সেটা অন্য কথা।
মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ সাক্ষী নির্ধারণ করার ও সত্য সাক্ষ্য দেয়ার নির্দেশ তাদেরকে দেয়া হচ্ছে যারা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে। যারা শরীয়তের পাবন্দ ও আখিরাতের শাস্তিকে ভয়কারী।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর একটি উক্তি এই যে, রাজআতের উপর সাক্ষী রাখা ওয়াজিব। অনুরূপভাবে তাঁর মতে বিবাহেও সাক্ষী রাখা ওয়াজিব। অন্য একটি জামাআতেরও এটাই উক্তি। এই মাসআলাকে স্বীকারকারী উলামায়ে কিরামের এ দলটি একথাও বলেন যে, মুখে উচ্চারণ করা ছাড়া রাজআত সাব্যস্ত হয় না। কেননা, সাক্ষী রাখা জরুরী। আর যে পর্যন্ত রাজআতের কথা মুখে উচ্চারণ না করবে সে পর্যন্ত কিভাবে সাক্ষী নির্ধারণ করা যাবে?
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ করে দিবেন। অর্থাৎ যে ব্যক্তি শরীয়তের আহকাম পালন করবে, আল্লাহর হারামকৃত জিনিস হতে দূরে থাকবে, তিনি তার মুক্তির পথ বের করে দিবেন। আর তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন।
হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ………… (আরবি)-এই আয়াত দু’টি পাঠ করতে শুরু করেন। পাঠ শেষে তিনি বলেনঃ “হে আবূ যার (রাঃ)! যদি সমস্ত মানুষ শুধু এটা হতেই গ্রহণ করে তবে তাদের জন্যে যথেষ্ট হয়ে যাবে।” অতঃপর বারবার তিনি এগুলো পড়তে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত আমার তন্দ্রা আসতে লাগলো। তারপর তিনি বললেনঃ “হে আবূ যার (রাঃ)! যখন তোমাকে মদীনা হতে বের করে দেয়া হবে তখন তুমি কি করবে?” আমি জবাবে বললামঃ আমি আরো বেশী প্রশস্ততা ও রহমতের দিকে চলে যাবো। অর্থাৎ মক্কা শরীফে চলে যাবো এবং আমি মক্কার কবুতররূপে থাকবো। তিনি আবার জিজেস করলেনঃ “তোমাকে যখন মক্কা হতেও বের করে দেয়া হবে তখন তুমি কি করবে?” আমি উত্তর দিলামঃ তখন আমি সিরিয়ার পবিত্র ভূমিতে চলে যাবো। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “তোমাকে যখন সিরিয়া হতেও বের করে দেয়া হবে তখন তুমি কি করবে?” আমি উত্তরে বললামঃ যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমি তখন আমার তরবারী কাঁধে রেখে মুকাবিলায় নেমে পড়বো। তিনি বললেনঃ “আমি তোমাকে এরচেয়ে উত্তম পন্থা বলে দিবো কি?” আমি বললামঃ অবশ্যই বলে দিন। তিনি বললেনঃ “তুমি শুনবে, মানবে, যদিও হাবশী গোলামও (নেতা) হয়।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)
মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক আয়াত হলো (আরবি)- (১৬:৯০)-এই আয়াতটি এবং প্রশস্ততম ওয়াদার আয়াত হলো (আরবি)-এই আয়াতটি।
মসনাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি খুব বেশী ইসতিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে তাকে আল্লাহ সর্বপ্রকারের চিন্তা ও দুঃখ হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং সর্বপ্রকারের সংকীর্ণতা হতে প্রশস্ততা দান করেন, আর তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রিয্ক দান করে থাকেন।”
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ও চিন্তা হতে মুক্তি দান করবেন। হযরত রাবী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ মানুষের উপর যে কাজ কঠিন হয়, আল্লাহ তা সহজ করে দেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তার স্ত্রীকে তালাক দিবে, আল্লাহ তাকে মুক্তি দান করবেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেনঃ সে জানে যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে দিবেন এবং ইচ্ছা করলে দিবেন না। আর তিনি এমন জায়গা হতে দিবেন যা সে জানে না। হযরত কাতাদা বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আল্লাহ তাকে সন্দেহযুক্ত বিষয় ও মৃত্যুর সময়ের কষ্ট হতে রক্ষা করবেন। আর তাকে এমন জায়গা হতে রিয্ক দান করবেন যা তার কল্পনাতীত।
হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এখানে আল্লাহ হতে ভয় করার অর্থ হলো সুন্নাত অনুযায়ী তালাক দেয়া ও সুন্নাত অনুযায়ী রাজআত করা।
বর্ণিত আছে যে, হযরত আউফ ইবনে মালিক আশযায়ী (রাঃ) নামক রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর একজন সাহাবীর এক ছেলেকে কাফিররা গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং জেলখানায় বন্দী করে দেয়। এরপর হযরত আউফ ইবনে মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আসতেন এবং তাঁর পুত্রের অবস্থা, প্রয়োজন এবং বিপদ আপদ ও কষ্টের কথা বর্ণনা করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দিতেন এবং বলতেনঃ “সত্বরই আল্লাহ তা’আলা তার মুক্তির পথ বের করে দিবেন।” অল্পদিন মাত্র অতিবাহিত হয়েছে, ইতিমধ্যে তাঁর পুত্র শক্রদের মধ্য হতে পলায়ন করেন। পথে তিনি শক্রদের ছাগলের পাল পেয়ে যান। ছাগলগুলো তিনি হাঁকিয়ে নিয়ে পিতার নিকট হাযির হন। ঐ সময় (আরবি) –এই আয়াত নাযিল হয়।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই বান্দা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে রিয্ক হতে বঞ্চিত হয়, দু'আ ছাড়া অন্য কিছু তকদীর ফিরায় না এবং নেক কাজ ও সদ্ব্যবহার ছাড়া অন্য কিছু হায়াত বৃদ্ধি করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মালিক আশায়ীর (রাঃ) পুত্র হযরত আউফ (রাঃ) যখন কাফিরদের হাতে বন্দী ছিলেন তখন তিনি (হযরত মালিক আশযায়ী রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট আসেন (এবং তাঁকে এটা অবহিত করেন)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তুমি তাকে বলে পাঠাও যে সে যেন খুব বেশী বেশী (আরবি) পাঠ করতে থাকে।” কাফিররা হযরত আউফ (রাঃ)-কে বেঁধে রেখেছিল। একদা হঠাৎ করে তার বন্ধন খুলে যায় এবং তিনি সেখান হতে পালাতে শুরু করেন। বাইরে এসে তিনি তাদের একটি উষ্ট্রী দেখতে পান এবং ওর উপর সওয়ার হয়ে বাড়ী অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যান। পথে তিনি কাফিরদের উটের পাল দেখে সবগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে যান। কাফিররা তাঁর পশ্চাদ্বাবন করে। কিন্তু তখন তিনি তাদের নাগালের বাইরে। অবশেষে তিনি তাঁর বাড়ীর দূরযার উপর এসে ডাক দেন। ডাক শুনে তাঁর পিতা বলেনঃ “কা’বার প্রতিপালকের শপথ! এটা তো আউফ (রাঃ)-এর কণ্ঠ।” এ কথা শুনে তাঁর মা বলেনঃ “হায় কপাল! এটা আউফ (রাঃ)-এর কণ্ঠ কি করে হতে পারে? সে তো কাফিরদের হাতে বন্দী! অতঃপর পিতা, মাতা এবং খাদেম বাইরে এসে দেখেন যে, সত্যিই তিনি আউফ (রাঃ)। গোটা প্রাঙ্গন উটে ভর্তি হয়ে যায়। পিতা তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ উটগুলো কেমন?” উত্তরে তিনি ঘটনাটি বর্ণনা করেন। পিতা বলেনঃ “আচ্ছা, থামো। আমি এটা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে আসি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “এগুলো সবই তোমার মাল। তোমার মনে যা চায় তাই করতে পার।” ঐ সময় (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সব দিকের সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহর হয়ে যায়, আল্লাহ তার সব কাঠিন্যে তার জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান এবং তার ধারণাতীত উৎস হতে তাকে রিযিক দান করে থাকেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ হতে সরে গিয়ে দুনিয়ার হয়ে যায়, আল্লাহ তাকে দুনিয়ার হাতেই সঁপে দেন।” (এটাও ইমাম ইবনে আবি হাতিমই (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সওয়ারীতে তার পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে বালক! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি। তুমি আল্লাহকে স্মরণ করবে, তাহলে আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন। তুমি আল্লাহর হুকুমের হিফাযত করবে, তাহলে তুমি আল্লাহকে তোমার পাশে এমনকি তোমার সামনে পাবে। কিছু চাইতে হলে আল্লাহর কাছেই চাবে। সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে তাঁর কাছেই করবে। সমস্ত উম্মত মিলিত হয়ে যদি তোমার উপকার করতে চায় এবং তা যদি আল্লাহ না চান তবে তারা তোমার সামান্যতম উপকারও করতে পারবে না। অনুরূপভাবে সবাই মিলিত হয়ে যদি তোমার ক্ষতি করতে চায় তবে তারা তোমার ক্ষতি করতে পারবে না, তোমার ভাগ্যে আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া। কলম উঠে গেছে এবং কাগজ শুকিয়ে গেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামে তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন প্রয়োজনে পড়ে এবং সে তা জনগণের সামনে তুলে ধরে, খুব সম্ভব সে কঠিন অবস্থায় পড়ে যাবে, তার কাজ হালকা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার প্রয়োজন আল্লাহর নিকট নিয়ে যায়, আল্লাহ অবশ্য অবশ্যই তার প্রয়োজন পুরো করে থাকেন এবং তার উদ্দেশ্য সফল করেন। হয়তো তাড়াতাড়ি এই দুনিয়াতেই পুরো করেন, না হয় মৃত্যুর পর আখিরাতে পুরো করবেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)
মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করবেনই। অর্থাৎ তিনি স্বীয় আহকাম যেমনভাবে চান তাঁর মাখলূকের মধ্যে পুরো করে থাকেন।
আল্লাহ সব কিছুর জন্যে স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তাঁর বিধানে প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ রয়েছে।”(১৩:৮)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।