আল কুরআন


সূরা আস-সাফ (আয়াত: 10)

সূরা আস-সাফ (আয়াত: 10)



হরকত ছাড়া:

يا أيها الذين آمنوا هل أدلكم على تجارة تنجيكم من عذاب أليم ﴿١٠﴾




হরকত সহ:

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا هَلْ اَدُلُّکُمْ عَلٰی تِجَارَۃٍ تُنْجِیْکُمْ مِّنْ عَذَابٍ اَلِیْمٍ ﴿۱۰﴾




উচ্চারণ: ইয়া-আইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূহাল আদুল্লুকুমআলা-তিজা-রাতিন তুনজীকুমমিন‘আযা-বিন আলীম।




আল বায়ান: হে ঈমানদারগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০. হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসার সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে রক্ষা করবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে?




তাইসীরুল ক্বুরআন: হে মু’মিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব যা তোমাদেরকে মর্মান্তিক ‘আযাব থেকে রক্ষা করবে?




আহসানুল বায়ান: (১০) হে বিশ্বাসীগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান বলে দেব না, [1] যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করবে?



মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! আমি কি তোমাদের এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দিব যা তোমাদের রক্ষা করবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে?



ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের পথ বলে দেব, যা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করবে?



মুহিউদ্দিন খান: মুমিনগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বানিজ্যের সন্ধান দিব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে?



জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! আমি কি তোমাদের সন্ধান দেব এমন এক পণ্যদ্রব্যের যা তোমাদের উদ্ধার করবে মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে?



Sahih International: O you who have believed, shall I guide you to a transaction that will save you from a painful punishment?



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১০. হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসার সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে রক্ষা করবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে?


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১০) হে বিশ্বাসীগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান বলে দেব না, [1] যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করবে?


তাফসীর:

[1] এই আমল (অর্থাৎ, ঈমান ও জিহাদ)-কে বাণিজ্য বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কারণ এতেও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের মত লাভ হবে। আর সে লাভ কি? জান্নাতে প্রবেশ এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভ। এ থেকে বড় লাভ আর কি হতে পারে? এই লাভকে আল্লাহ অন্যত্র এইভাবে বর্ণনা করেছেন, إِنَّ اللهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ‘‘অবশ্যই আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মু’মিনদের নিকট থেকে তাদের জান ও মালকে জান্নাতের বিনিময়ে।’’ (সূরা তাওবাহঃ ১১১)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৭-১৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



(وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرٰي.... وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِیْنَﭜ)



অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ দেয় যেমন বলে : আল্লাহ তা‘আলা সন্তান গ্রহণ করেছেন, আল্লাহ তা‘আলার স্ত্রী আছে ইত্যাদি; তাদের চেয়ে বড় যালেম আর কেউ নেই। অথচ তাকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করা হয়।



(نُوْرَ اللّٰهِ) আল্লাহ তা‘আলার নূর অর্থ : কুরআন, ইসলাম, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিংবা দলীল প্রমাণাদি। মুখ দিয়ে নিভিয়ে দেওয়ার অর্থ হল : তাদের সে সব কটুক্তি ও নিন্দনীয় কথাবার্তা যা তাদের মুখ থেকে বের হয় তা দিয়ে তারা ঐ জ্যোতিকে প্রতিহত করতে চায়।



(وَاللّٰهُ مُتِمُّ نُوْرِه)



অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা সারা জাহানে তার প্রসার ঘটাবেন এবং অন্য সমস্ত ধর্মের ওপর তাকে জয়যুক্ত করবেন।



(هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلٰي تِجَارَةٍ)



এখানে আমল (ঈমান ও জিহাদ)-কে বাণিজ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ এতেও ব্যবসা-বাণিজ্যের মত লাভ রয়েছে। সে লাভের কথা পরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করেছেন।



আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন :



(إِنَّ اللّٰهَ اشْتَرٰي مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ط يُقَاتِلُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ فَيَقْتُلُوْنَ وَيُقْتَلُوْنَ)



“নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের নিকট হতে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে তার বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে স্বসস্ত্র যুদ্ধ করে, হত্যা করে ও নিহত হয়।” (সূরা তাওবা ৯ : ১১১)



এটা হল আখেরাতের লাভ। আর দুনিয়াবী লাভ হল আল্লাহ তা‘আলা যুদ্ধক্ষেত্রসহ সর্বত্র সহযোগিতা করবেন এবং বিজয় দান করবেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(يٰٓأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ إِنْ تَنْصُرُوا اللهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ) ‏



“ওহে, যারা ঈমান এনেছে! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের কদমকে মযবুত করে দেবেন।” (সূরা মুহাম্মদ ৪৭ : ৭)



আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার বিজয়সমূহ নিকটতম তাই তাকে (فَتْحٌ قَرِيْبٌ) বলা হয়েছে।



(یٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا....)



আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন বান্দাদেরকে সর্বাবস্থায় কথায়, কাজে ও জান-মাল দ্বারা তাঁর সাহায্যকারী হওয়ার নির্দেশ প্রদান করছেন যেমন ঈসা (আঃ)-এর অনুসারীরা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার পথে সাহায্য করেছিল।



حَوَارِيْ শব্দটি حَوَرٌ ধাতু থেকে উৎপত্তি। অর্থ দেওয়ালে চুনকাম করার জন্য ধবধবে সাদা চুন। পারিভাষিক অর্থে ঈসা (আঃ)-এর খাঁটি অনুসারী শীর্ষস্থানীয় ভক্ত ও সাহায্যকারী ব্যক্তিগণকে ‘হাওয়ারী’ বলা হত। কোন কোন তাফসীরবিদ বলেছেন তাদের সংখ্যা ছিল ১২জন। ঈসা (আঃ)্-এর অনুসারী ও সাহায্যকারীকে, সহচরদেরকে ‘হাওয়ারী’ বলা হয়। নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুসারী ও সহচরদেরকে ‘সাহাবী’ বলা হয়। নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : প্রত্যেক নাবীর একজন বিশেষ সাহায্যকারী (হাওয়ারী) ছিল। আমার বিশেষ সাহায্যকারী হল যুবাইর (রাঃ)। (সহীহ বুখারী হা. ২৮৪৭, সহীহ মুসলিম হা. ২৪১৫)



ইমাম বাগাভী অত্র আয়াতের তাফসীরে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, ঈসা (আঃ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের পর খ্রিস্টান জাতি তিন দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল তাকে ‘আল্লাহ তা‘আলা’ বলে। একদল তাকে ‘আল্লাহ তা‘আলার পুত্র’ বলে এবং একদল তাকে ‘আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল’ বলে। প্রত্যেক দলের অনুসারী দল ছিল। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কলহ বাড়তে থাকে। অতঃপর শেষনাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগমন ঘটে এবং তিনি মু’মিনদের দলকে সমর্থন দেন। ফলে তারাই দলীলের ভিত্তিতে জয়লাভ করে। এ সকল ঈসায়ীগণ সবাই ইসলাম কবূল করে।



(فَاٰمَنَتْ طَّآئِفَةٌ)



অর্থাৎ ঈসা (আঃ)-এর দাওয়াতে একদল লোক তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিল। আর একদল তাঁর দাওয়াত বর্জন করে কুফরী করল। এটা ছিল সেসব ইয়াহূদী যারা ঈসা (আঃ)-এর মায়ের প্রতি অপবাদ দিয়েছিল।



(فَأَيَّدْنَا الَّذِيْنَ)



অর্থাৎ নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রেরণ করে আল্লাহ তা‘আলা ঈসা (আঃ)-এর ওপর ঈমান আনয়নকারী দলকে অন্যান্য ভ্রষ্ট দলের ওপর শক্তিশালী করেছেন। তাই সঠিক আক্বীদার অধিকারী এ দলটি নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপরও ঈমান আনল। আর এভাবে তিনি দলীল-প্রমাণের দিক দিয়েও সমস্ত কাফিরদের ওপর এদেরকে জয়যুক্ত করেছেন। এ জয়ের সর্বশেষ বিকাশ ঘটবে তখন যখন কিয়ামতের পূর্বকালে ঈসা (আঃ) পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ করবেন।



মু’মিনরা এভাবেই কিয়ামত অবধি কাফিরদের ওপর বিজয়ী থাকবে তবে শর্ত হল : তাদেরকে সঠিক ঈমান ও আমলের ওপর থাকতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সঠিক ঈমান ও আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন!



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. আল্লাহ তা‘আলার ওপর মিথ্যারোপ করা সবচেয়ে বড় জুলুম।

২. আল্লাহ তা‘আলা ইসলামকে সারা জাহানে বিজয়ী করবেন, যতই কাফির-মুশরিকরা প্রতিহত করার চেষ্টা করুক।

৩. জিহাদ করার ফযীলত জানলাম।

৪. আখেরাতের বিজয় সবচেয়ে বড় বিজয়।

৫. আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় সহযোগিতা করা মু’মিনের বৈশিষ্ট্য।

৬. আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে সহযোগিতা করেন।

৭. হকপন্থীরা সবর্দা জয়ী থাকবে, ইনশাআল্লাহ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১০-১৩ নং আয়াতের তাফসীর:

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বর্ণিত হাদীস পূর্বে গত হয়েছে যে, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন আমল আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয়?” তাঁদের এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তা'আলা এই সূরাটি অবতীর্ণ করেন। এতে তিনি বলেনঃ এসো, আমি তোমাদেরকে এমন এক লাভজনক ব্যবসার কথা বলে দিই যাতে ক্ষতির কোনই সম্ভাবনা নেই। এতে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে এবং ভয়ের কোন কারণ থাকবে না। তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহর একত্বে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর রিসালাতে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এই ব্যবসা দুনিয়ার ব্যবসা হতে বহুগুণে উত্তম। যদি তোমরা এই ব্যবসায়ে হাত দাও তবে তোমাদের পদস্খলন ও পাপ-অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিবো। আর তোমাদেরকে দাখিল করবে এমন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং তোমাদেরকে প্রবিষ্ট করবে স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। বিশ্বাস রেখো যে, মহাসাফল্য এটাই।

আরো জেনে রেখো যে, তোমরা সদা তোমাদের শত্রুদের সাথে মুকাবিলা করে থাকো, এই মুকাবিলার সময় আমি তোমাদেরকে সাহায্য করতে থাকবো এবং তোমাদের ঈপ্সিত বিজয় দান করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)

অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পাগুলো স্থির রাখবেন।” (৪৭:৭) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)

অর্থাৎ “অবশ্যই আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন যে তাঁকে সাহায্য করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমতাবান, মহাপরাক্রমশালী।” (২২:৪০) দুনিয়ার এই সাহায্য ও বিজয় এবং আখিরাতের ঐ জান্নাত ও নিয়ামত ঐ লোকদের জন্যে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের কাজে সদা লেগে থাকে এবং জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর দ্বীনের খিদমত করে। তাই তো তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি আমার পক্ষ হতে মুমিনদেরকে এর সুসংবদি দাও।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।