সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 88)
হরকত ছাড়া:
وكلوا مما رزقكم الله حلالا طيبا واتقوا الله الذي أنتم به مؤمنون ﴿٨٨﴾
হরকত সহ:
وَ کُلُوْا مِمَّا رَزَقَکُمُ اللّٰهُ حَلٰلًا طَیِّبًا ۪ وَّ اتَّقُوا اللّٰهَ الَّذِیْۤ اَنْتُمْ بِهٖ مُؤْمِنُوْنَ ﴿۸۸﴾
উচ্চারণ: ওয়াকুলূমিম্মা- রাযাকাকুমুল্লা-হু হালা-লান তাইয়িবাওঁ ওয়াত্তাকুল্লা-হাল্লাযীআনতুম বিহী মু’মিনূন।
আল বায়ান: আর আহার কর আল্লাহ যা তোমাদের রিয্ক দিয়েছেন তা থেকে হালাল, পবিত্র বস্তু। আর তাকওয়া অবলম্বন কর আল্লাহর যার প্রতি তোমরা মুমিন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৮. আর আল্লাহ তোমাদেরকে যে হালাল ও উৎকৃষ্ট জীবিকা দিয়েছেন তা থেকে খাও এবং আল্লাহ্র তাকওয়া অবলম্বন কর, যাঁর প্রতি তোমরা মুমিন।
তাইসীরুল ক্বুরআন: যে সমস্ত হালাল ও পবিত্র জীবিকা আল্লাহ তোমাদেরকে দিয়েছেন সেগুলো ভক্ষণ কর, যে আল্লাহর প্রতি তোমরা ঈমান এনেছ তাঁকে ভয় কর।
আহসানুল বায়ান: (৮৮) আল্লাহ তোমাদেরকে যে জীবিকা দান করেছেন তা হতে বৈধ ও উৎকৃষ্ট বস্তু ভক্ষণ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর প্রতি তোমরা সকলে বিশ্বাসী।
মুজিবুর রহমান: আর আল্লাহ তোমাদেরকে যা দান করেছেন তন্মধ্য হতে হালাল ও পবিত্র বস্তুগুলি আহার কর, এবং আল্লাহকে ভয় কর - যাঁর প্রতি তোমরা বিশ্বাসী।
ফযলুর রহমান: তোমরা আল্লাহর দেওয়া হালাল ও পবিত্র জিনিস খাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাকে তোমরা বিশ্বাস কর।
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ তা’য়ালা যেসব বস্তু তোমাদেরকে দিয়েছেন, তন্মধ্য থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু খাও এবং আল্লাহকে ভয় কর, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী।
জহুরুল হক: আর আল্লাহ্ তোমাদের যা হালাল ও ভালো রিযেক দিয়েছেন তা থেকে ভোগ করো আর আল্লাহ্কে ভয়-শ্রদ্ধা করো, -- যাঁর প্রতি তোমরা মুমিন হয়েছ।
Sahih International: And eat of what Allah has provided for you [which is] lawful and good. And fear Allah, in whom you are believers.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮৮. আর আল্লাহ তোমাদেরকে যে হালাল ও উৎকৃষ্ট জীবিকা দিয়েছেন তা থেকে খাও এবং আল্লাহ্–র তাকওয়া অবলম্বন কর, যাঁর প্রতি তোমরা মুমিন।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৮৮) আল্লাহ তোমাদেরকে যে জীবিকা দান করেছেন তা হতে বৈধ ও উৎকৃষ্ট বস্তু ভক্ষণ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর প্রতি তোমরা সকলে বিশ্বাসী।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮৭-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর:
শানে নুযূল:
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করল। অতঃপর বলল: হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি যখনই গোশত জাতীয় খাবার গ্রহণ করি তখনই আমি কামোত্তেজনা অনুভব করি। তাই গোশত খাওয়া নিজের জন্য হারাম করে নিয়েছি। তখন
(أَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تُحَرِّمُوْ طَيِّبٰتِ...)
আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (সহীহ তিরযিমী হা: ৩০৫৪)
কোন ব্যক্তি কোন সমস্যার কারণে হালাল বস্তু খেতে না পারলে তা বর্জন করে চলবে বটে তবে নিজের ওপর হারাম মনে করবে না। কারণ বর্জন করা আর হারাম করা এক নয়। যেমন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যব নামক প্রাণী খেতে পারতেন না। ফলে তিনি নিজের জন্য হারাম করে নেননি বরং কেউ খেলে নিষেধও করতেন না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে দস্তরখানা সামনে নিয়ে বসেছিলেন সে দস্তরখানা থেকে খালিদ বিন ওয়ালিদ যব প্রাণী খাচ্ছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন যে, আমরা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে যুদ্ধে বের হতাম, তখন আমাদের সঙ্গে স্ত্রীগণ থাকত না, তাই আমরা বলতাম, আমরা কি খাসি হয়ে যাব না? তিনি আমাদেরকে এ থেকে নিষেধ করলেন এবং কাপড়ের বিনিময়ে হলেও মহিলাদেরকে সাময়িক সময়ের জন্য বিয়ে করার অর্থাৎ নিকাহে মুতার অনুমতি দিলেন এবং আয়াতটি পাঠ করলেন।
(প্রকাশ থাকে যে, মুতা বিবাহ হচ্ছে সাময়িক বা কন্ট্রাক্ট বিবাহ। অর্থাৎ নির্দিষ্ট অর্থ-সম্পদের বিনিময়ে নির্ধারিত মেয়াদে বিয়ে। মেয়াদ শেষ হলে বিবাহ ভেঙ্গে যাবে। এ জাতীয় বিয়ে ইসলামের প্রথম দিকে জায়েয ছিল। পরবর্তীতে খায়বারের যুদ্ধের সময় তা চিরতরে হারাম ঘোষণা করা হয়)। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬১৫, সহীহ মুসলিম হা: ১৪০৪)
কোন ব্যক্তি নিজের জন্য হালাল বস্তু কসম ছাড়া (অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার কসম এমনটি না বলে) হারাম করে নিলে হারাম বলে গণ্য হবে না। কেবল স্ত্রী ব্যতীত। এ ব্যাপারে ওলামাদের এটাই অভিমত। আর কসম করলে (অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার কসম এটা আমার ওপর হারাম এমন বললে) ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন, তাকে কসমের কাফফারা দিতে হবে।
আল্লামা শাওকানী (রহঃ) বলেন, সহীহ হাদীস এটাই প্রমাণ করে যে, তাকে কাফফারা দিতে হবে না। এটাই অধিকাংশ আলেমের অভিমত।
এ আয়াত দ্বারা অধিকাংশ আলেম বলেন: এ আয়াত প্রতিবাদ করছে ঐ সকল ব্যক্তিদের যারা বৈরাগ্যবাদে অতিরঞ্জিত করে। সুতরাং কোন মুসলিম ব্যক্তির জন্য উচিত হবে না, আল্লাহ তা‘আলা যেসকল খাবার, পোশাক ও বিবাহ বৈধ করে দিয়েছেন তা হারাম করে নেয়া। তিনজন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাড়িতে এসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার পর একজন বলল: আমি যতদিন জীবিত থাকব ততদিন সওম রাখব কখনো সওম ছাড়ব না। আরেক জন বলল: আমি রাতে ঘুমাব না, সারা রাত ইবাদত করব, আরেকজন বলল: আমি জীবনে বিবাহ করব না। তাদের কথা জানার পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: জেন রেখ! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহ তা‘আলাকে বেশি ভয় করি, আমি দিনের বেলা সওম রাখি আবার সওম ছাড়ি, রাতে সালাত পড়ি আবার ঘুমাই, আমি বিবাহও করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত বর্জন করবে সে আমাদের অন্তুর্ভুক্ত নয়। (সহীহ বুখারী হা: ৫০৬৩) তাই ইসলামে নিজের চিন্তামত কিছু করার সুযোগ নেই।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলা যা হালাল করেছেন তা হারাম করে নেয়া হারাম।
২. হালাল রুজি খাওয়া ওয়াজিব এবং হারাম বর্জন করাও ওয়াজিব।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৮৭-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর:
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতটি নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের একটি দলের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা বলেছিলেন‘আমরা আমাদের পুংলিঙ্গ কর্তন করবো এবং দুনিয়ার কাম, লোভ-লালসা পরিত্যাগ করবো।' নবী (সঃ)-এর কাছে এ সংবাদ পৌছলে তিনি তাদেরকে ডেকে পাঠান এবং তাদেরকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তারা বলেনঃ হ্যা, আমরা এরূপই সংকল্প করেছি।' তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “কিন্তু জেনে রেখো যে, আমি তো রোযাও রাখি এবং (কোন কোন সময়) নাও রাখি, রাত্রে নামাযও পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আমি স্ত্রীদের সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধও হই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার নীতি গ্রহণ করে সে আমারই অন্তর্ভুক্ত এবং যে ব্যক্তি আমার নীতি গ্রহণ করে না সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে মিরদুওয়াইও বর্ণনা করেছেন)
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কয়েকজন সাহাবী তার পত্নীদেরকে তার গোপনীয় আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন! তখন (সম্ভবতঃ তার রাত দিনের আমল সম্পর্কে অবহিত হয়ে) তাঁদের মধ্যে কোন একজন বলেনঃ “আমি এখন থেকে আর কখনও গোশত খাবো না। আর একজন বলেনঃ “আমি কখনও স্ত্রীলোকদের সাথে বিবাহিত হবো না।' অন্য একজন বললেনঃ আমি কখনও বিছানায় শয়ন করবো। না (বরং মাটিতে শয়ন করববা)।” এসব কথা নবী (সঃ)-এর কানে পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “ঐ লোকদের কি হয়েছে যে, তাদের কেউ একথা বলে এবং ও কথা বলে? কিন্তু আমি তো রোযাও রাখি এবং কোন কোন সময় নাও রাখি, আমি নিদ্রাও যাই এবং নামাযও পড়ি, আমি গোশতও খাই এবং নারীদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার নীতি থেকে সরে পড়ে সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।”
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি যখন গোশত ভক্ষণ করি তখন স্ত্রীলোকদের প্রতি আমার কামভাব খুবই বৃদ্ধি পায়। এ জন্যে আমি নিজের উপর গোশত হারাম করে ফেলেছি। তখন ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্যে যে পবিত্র জিনিসগুলো হালাল করেছেন সেগুলো তোমরা নিজেদের জন্যে হারাম করো না' -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ আমরা এক যুদ্ধে দীর্ঘদিন পর্যন্ত নবী (সঃ)-এর সাথে অবস্থান করি এবং সে সময় আমাদের সাথে স্ত্রীলোক ছিল না। তখন আমরা তাকে জিজ্ঞেস করিঃ আমরা কি খাসী হবো না (অর্থাৎ আমাদের অণ্ডকোষ কর্তন করবো না)? তিনি তখন আমাদেরকে এটা করতে নিষেধ করেন এবং আম নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে কাপড়ের বিনিময়ে কোন স্ত্রীলোককে বিয়ে করার অনুমতি প্রদান করেন। অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। কিন্তু এটা নিকাহে মুআ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
হযরত মাসরূক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা (একদা) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট হাযির ছিলাম, এমন সময় (রান্নাকৃত) পশুর স্তনের গোশত নিয়ে আসা হলো। তখন (আমরা সবাই তা খেতে শুরু করলাম, কিন্তু একটি লোক মজলিস থেকে সরে পড়লো। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ কাছে এসো (এবং খাওয়াতে অংশগ্রহণ কর)। সে তখন বললোঃ “আমি তো এটা না খাওয়ার শপথ গ্রহণ করেছি। তখন তিনি বললেনঃ তুমি এসে এটা খেয়ে নাও এবং শপথ ভেঙ্গে দেয়ার কাফফারা আদায় কর। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করলেন।
ইমাম শাফিঈ (রঃ) প্রমুখ আলেমদের মাযহাব এই যে, যে ব্যক্তি নিজের উপর কোন খাদ্য অথবা স্ত্রীদের ছাড়া অন্য কোন জিনিস হারাম করে নেয় তা তার উপর হারাম হয়ে যায় না এবং তার উপর কোন কাফফারাও নেই। কেননা, আল্লাহ পাক বলেছেন- হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের উপর পবিত্র জিনিসগুলো হারাম করো না, যেগুলো তিনি তোমাদের জন্যে হালাল করেছেন। এ কারণেই যে ব্যক্তি নিজের উপর গোশত ভক্ষণ হারাম করে নিয়েছিল তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেননি। কিন্তু আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) প্রমুখ ইমামগণ বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের উপর কোন খাদ্য বা পোশাক অথবা অন্য কোন জিনিস হারাম করে নেয়, তার উপর সেই কসম ভঙ্গের কাফফারা ওয়াজিব। কেননা, যখন কোন লোক নিজের উপর কোন জিনিস পরিত্যাগ করা অপরিহার্য করে নেয়, তখন কসমের কাফফারার মতই নিজের উপর শুধু হারাম করে নেয়ার ফলে ও অপরিহার্য না হওয়া জিনিসকে অপরিহার্য করে নেয়ার প্রতিশোধ হিসেবে তাকে জবাবদিহি করা উচিত এবং এটা কাফফারার মাধ্যমেই সম্ভব। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এরূপ ফতওয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহ পাকের কালাম দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হচ্ছে। ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেস, আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে খুশী করার জন্যে তা নিজের জন্যে হারাম করছেন কেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়। (৬৬:১) এখানে আল্লাহ তা'আলা উল্লিখিত আয়াত বর্ণনা করার পর কসমের কাফফারার বর্ণনা দিলেন। এর দ্বারা এটা সাব্যস্ত হচ্ছে যে, কসমের উল্লেখ না থাকলেও যদি কেউ নিজের উপর কোন জিনিস হারাম করে নেয় তবে কসমের কাফফারার মতই তার উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, কয়েকজন সাহাবী, যেমন হযরত উসমান ইবনে মাউন (রাঃ) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) দুনিয়া পরিত্যাগ করা, পুংলিঙ্গ কর্তন করা এবং চট পরিধান করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইবনে জুরাইহ্ ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ), আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ), ইবনে মাসউদ (রাঃ), মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ), আবু হুযাইফা (রাঃ)-এর ক্রীতদাস সালিম (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণ সংসার ত্যাগের ইচ্ছে করে বাড়ীর মধ্যে বসে পড়লেন, স্ত্রীদের সংসর্গ ত্যাগ করলেন, চট পরিধান করলেন এবং ভাল ভাল খাদ্য ও পোশাক নিজেদের উপর হারাম করে দিলেন। তারা বানী ইসরাঈলের সন্ন্যাসীদের মত জীবন যাপন করতে শুরু করলেন এবং খাসী হয়ে যাওয়ার সংকল্প করলেন। এ ঐক্যমতে তারা পৌঁছলেন যে, পর্যায়ক্রমে সারারাত সালাত আদায় করবেন এবং সারাদিন রোযা রাখবেন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল এবং তাদেরকে বলা হল ও আল্লাহর পবিত্র ও হালাল বস্তুগুলোকে নিজেদের উপর হারাম করে নিয়ো না ও সীমা অতিক্রম করনা, আমি এসব লোককে কখনই পছন্দ করি না। এগুলো মুসলিমদের নীতি নয় যে, তোমরা স্ত্রীদের থেকে পৃথক থাকবে, ভাল খাবার, পানীয় ও পোশাক পরিত্যাগ করবে, সদা সারারাত ধরে সালাত আদায় করবে ও সারাদিন রোযা রাখবে এবং খাসী হয়ে যাবে, অর্থাৎ পুংলিঙ্গ কর্তন করবে। এসব নীতি সম্পূর্ণ ভুল। অতঃপর যখন তাদের ব্যাপারে এ আয়াত অবতীর্ণ হল তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের কাছে লোক পাঠিয়ে তাদেরকে জানিয়ে দিলেন“তোমাদের উপর তোমাদের নফসের হক রয়েছে এবং তোমাদের চক্ষুর হক রয়েছে। তোমরা রোযা রাখবে ও (মাঝে মাঝে) রোযা ছেড়েও দিবে, (রাতে নফল) সালাত আদায় করবে এবং নিদ্রাও যাবে। আর জেনে রাখবে যে, যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত পরিত্যাগ করবে সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।” তখন তারা বললেন :হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এ সংকল্প হতে রক্ষা করুন এবং আপনার অবতারিত অহী অনুযায়ী চলার তাওফীক দিন।
(আরবী) -এর অর্থ এটাও হতে পারে-তোমরা হালাল বস্তুকে নিজেদের উপর হারাম করে দিয়ে নফসের উপর সংকীর্ণতা আনয়ন করো না। আবার এও অর্থ হতে পারে-তোমরা হালালকে হারাম বানিয়ে নিয়ে না এবং হালাল দ্বারা উপকার লাভ করতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করো না। হালালকেও প্রয়োজন পরিমাণই গ্রহণ কর, প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ করো না। (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা খাও, পান কর, কিন্তু অপব্যয় করো না।”(৭:৩১) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “মুমিন ওরাই যে, যখন তারা খরচ করে তখন তারা অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না, বরং তাদের খরচ করণ এর মাঝামাঝি পন্থায় হয়ে থাকে।” আল্লাহ তা'আলা না ‘ইফরাত’ বা বাহুল্যের অনুমতি দিয়েছেন, না তাফরীত বা অত্যল্পতার অনুমতি দিয়েছেন। এ জন্যেই তিনি বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ তোমরা সীমা অতিক্রম করো না।
এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা সর্বাবস্থায় হালাল ও পবিত্র জিনিস ভক্ষণ কর এবং সর্বকাজে আল্লাহকেই ভয় কর। তাঁর মর্জির অনুসরণ কর এবং বিরোধিতা ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাক।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।