সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 73)
হরকত ছাড়া:
لقد كفر الذين قالوا إن الله ثالث ثلاثة وما من إله إلا إله واحد وإن لم ينتهوا عما يقولون ليمسن الذين كفروا منهم عذاب أليم ﴿٧٣﴾
হরকত সহ:
لَقَدْ کَفَرَ الَّذِیْنَ قَالُوْۤا اِنَّ اللّٰهَ ثَالِثُ ثَلٰثَۃٍ ۘ وَ مَا مِنْ اِلٰهٍ اِلَّاۤ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ ؕ وَ اِنْ لَّمْ یَنْتَهُوْا عَمَّا یَقُوْلُوْنَ لَیَمَسَّنَّ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا مِنْهُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ ﴿۷۳﴾
উচ্চারণ: লাকাদ কাফারাল্লাযীনা কা-লূইন্নাল্লা-হা ছা-লিছু ছালা-ছাহ । ওয়ামা-মিন ইলাহিন ইল্লাইলা-হুওঁ ওয়া-হিদুওঁ ওয়া ইল্লাম ইয়ানতাহূ‘আম্মা-ইয়াকূ লূনা লাইয়ামাছছান্নাল্লাযীনা কাফারূমিনহুম ‘আযা-বুন আলীম।
আল বায়ান: অবশ্যই তারা কুফরী করেছে, যারা বলে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তিন জনের তৃতীয়জন’। যদিও এক ইলাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। আর যদি তারা যা বলছে, তা থেকে বিরত না হয়, তবে অবশ্যই তাদের মধ্য থেকে কাফিরদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব স্পর্শ করবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৩. তারা অবশ্যই কুফরী করেছে- যারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে তৃতীয়(১), অথচ এক ইলাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আর তারা যা বলে তা থেকে বিরত না হলে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে, তাদের উপর অবশ্যই কষ্টদায়ক শাস্তি আপতিত হবে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা অবশ্যই কুফরী করেছে যারা বলে আল্লাহ তিন জনের মধ্যে একজন, কারণ এক ইলাহ ছাড়া আর কোন সত্যিকার ইলাহ নেই। তারা যা বলছে তা থেকে তারা যদি নিবৃত্ত না হয়, তাহলে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব গ্রাস করবেই।
আহসানুল বায়ান: (৭৩) তারা নিশ্চয় অবিশ্বাসী (কাফের), যারা বলে, ‘আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন।’[1] অথচ এক উপাস্য ভিন্ন অন্য কোন উপাস্য নেই। তারা যা বলে তা হতে নিবৃত্ত না হলে তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছে, তাদের উপর অবশ্যই মর্মন্তুদ শাস্তি আপতিত হবে।
মুজিবুর রহমান: নিঃসন্দেহে তারাও কাফির যারা বলেঃ ‘আল্লাহ তিনের (অর্থাৎ তিন মা‘বূদের) এক’, অথচ ইবাদাত পাবার যোগ্য এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহই নেই; আর যদি তারা স্বীয় উক্তিসমূহ হতে নিবৃত্ত না হয় তাহলে তাদের মধ্যে যারা কুফরীতে অটল থাকবে তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পতিত হবে।
ফযলুর রহমান: যারা বলে, “আল্লাহ হলেন তিনজনের তৃতীয়জন” তারা নিশ্চয়ই কাফের হয়ে গিয়েছে। অথচ এক উপাস্য ছাড়া (অন্য) কোন উপাস্য নেই। তারা যদি তাদের এ ধরনের কথা বন্ধ না করে তাহলে তাদের কাফেরদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আসবেই।
মুহিউদ্দিন খান: নিশ্চয় তারা কাফের, যারা বলেঃ আল্লাহ তিনের এক; অথচ এক উপাস্য ছাড়া কোন উপাস্য নেই। যদি তারা স্বীয় উক্তি থেকে নিবৃত্ত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরে অটল থাকবে, তাদের উপর যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি পতিত হবে।
জহুরুল হক: তারা নিশ্চয়ই অবিশ্বাস পোষণ করে যারা বলে -- "নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ হচ্ছেন তিনজনের তৃতীয়জন।" বস্তুতঃ একক খোদা ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। আর যা তারা বলছে তা থেকে যদি তারা না থামে, তবে তাদের মধ্যের যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তাদের পাকড়াবে ব্যথাদায়ক শাস্তি।
Sahih International: They have certainly disbelieved who say, "Allah is the third of three." And there is no god except one God. And if they do not desist from what they are saying, there will surely afflict the disbelievers among them a painful punishment.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭৩. তারা অবশ্যই কুফরী করেছে- যারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে তৃতীয়(১), অথচ এক ইলাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আর তারা যা বলে তা থেকে বিরত না হলে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে, তাদের উপর অবশ্যই কষ্টদায়ক শাস্তি আপতিত হবে।
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ ঈসা মসীহ আলাইহিস সালাম, রূহুল কুদ্স ও আল্লাহ, কিংবা মসীহ, মারইয়াম ও আল্লাহ -সবাই আল্লাহ। তাদের মধ্যে একজন অংশীদার হলেন আল্লাহ। এরপর তারা তিনজনই এক এবং একজনই তিন। এ হচ্ছে নাসারাদের সাধারণ বিশ্বাস। নাসারাদের মালেকিয়া, ইয়াকুবিয়্যা ও নাসতুরিয়্যা এ তিনটি দলই উপরোক্ত বিশ্বাস পোষণ করে। [ইবন কাসীর] এ যুক্তিবিরোধী ধর্মবিশ্বাসকে তারা জটিল ও দ্ব্যর্থবোধক ভাষায় ব্যক্ত করে। অতঃপর বিষয়টি যখন কারো বোধগম্য হয় না, তখন একে ‘বুদ্ধি বহির্ভূত সত্য বলে আখ্যা দিয়ে ক্ষান্ত হয়। সুদ্দি বলেন, এখানে তিনের এক ইলাহ বলা হয়েছে। তিনজন বলতে, ঈসা, তার মা মারইয়াম এবং আল্লাহকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, অন্য আয়াতে কোন কোন নাসারাদের দ্বারা ঈসা ও তার মাকে ইলাহ হিসেবে গণ্য করার কথা উল্লেখ করে তা খণ্ডন করা হয়েছে। [আল-মায়েদাহ: ১১৬] ইবন কাসীর বলেন, এ মতটি অধিক প্রাধান্যপ্রাপ্ত। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭৩) তারা নিশ্চয় অবিশ্বাসী (কাফের), যারা বলে, ‘আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন।’[1] অথচ এক উপাস্য ভিন্ন অন্য কোন উপাস্য নেই। তারা যা বলে তা হতে নিবৃত্ত না হলে তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছে, তাদের উপর অবশ্যই মর্মন্তুদ শাস্তি আপতিত হবে।
তাফসীর:
[1] এ হল খ্রিষ্টানদের দ্বিতীয় ফির্কা, যারা তিন ঈশ্বরের দাবীদার ছিল। যেটাকে তারা (One God in Three Person) বলে। আর এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে যদিও খোদ তাদের মধ্যেই মতবিরোধ বিদ্যমান, তবুও সঠিক কথা এই যে, তারা ঈসা (আঃ) ও তাঁর মা মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)-কেও আল্লাহর সাথে (সমকক্ষ ভেবে) মাবূদ বা উপাস্যরূপে গণ্য করতো; যেরূপ কুরআন সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। আল্লাহ কিয়ামতের দিন ঈসা (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করবেন, {أأنتَ قُلتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِن دُونِ اللّه} অর্থাৎ, তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার আম্মাকে মা’বূদ (উপাস্য) বানিয়ে নাও? (সূরা মাইদাহ ১১৬) এখান থেকে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, খ্রিষ্টানরা ঈসা (আঃ) ও তাঁর মাতা মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)-কে উপাস্য হিসাবে গণ্য করে। আর আল্লাহ তৃতীয় উপাস্য বা মা’বুদ। যাকে তারা ‘তিনের তৃতীয়’ বলে আখ্যায়ন করে। তাদের প্রথম বিশ্বাসের মতই আল্লাহ এ বিশ্বাসকেও কুফরী বলে মন্তব্য করেছেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭২-৭৫ নং আয়াতের তাফসীর:
যারা বলে, “ঈসা হলেন আল্লাহ”এবং যারা বলে, “আল্লাহ তিনজনের একজন” (আল্লাহ, ঈসা ও মারইয়াম) তারা কাফির। এ সম্পর্কে এ সূরার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে খ্রিস্টানদের ভ্রষ্টতার বিবরণ পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে। ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার দাস বলে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেননি। তিনি যখন দুগ্ধপোষ্য শিশু তখন তিনি আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে সর্বপ্রথম নিজের মুখে আল্লাহ তা‘আলার দাসত্বের কথা প্রকাশ করেছিলেন, যখন সাধারণত শিশুরা কথা বলতে পারে না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ঈসা (আঃ) বলেছিল,
(قَالَ إِنِّيْ عَبْدُ اللّٰهِ اٰتٰنِيَ الْكِتٰبَ وَجَعَلَنِيْ نَبِيًّا)
“সে বলল: ‘আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নাবী করেছেন, (সূরা মারইয়াম ১৯:৩০)
ঈসা (আঃ) এ কথা বলেননি যে, “আমিই আল্লাহ অথবা আল্লাহর পুত্র।”বরং তিনি বলেছেন “আমি আল্লাহর দাস” এবং তিনি পরিণত বয়সে উপনীত হয়ে এ দাওয়াতই দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
(إِنَّ اللّٰهَ رَبِّيْ وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوْهُ ط هٰذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيْمٌ)
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার এবং তোমাদের রব। অতএব তোমরা তাঁরই ইবাদত কর। এটাই সঠিক পথ।”(সূরা আলি-ইমরান ৩:৫১)
এ সেই শব্দাবলী যা তিনি মায়ের কোলেও বলেছিলেন। (সূরা মারইয়াম ১৯:৩৬) অনুরূপ কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তিনি আসমান হতে অবতরণ করবেন, তিনি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুসারী হয়ে আসবেন, আল্লাহ তা‘আলার এককত্ব ও তাঁর আনুগত্যের দিকে আহ্বান করবেন। নিজের ইবাদতের দিকে নয়।
(فَقَدْ حَرَّمَ اللّٰهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ)
“আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করবেন”যারা শির্কে আকবার তথা বড় শির্কে লিপ্ত হয়। তাদের পরিণতি হল:
(১) তাদের সকল আমল বাতিল হয়ে যাবে। (২) তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে।
(৩) তাদের জন্য জান্নাত হারাম। (৪) জাহান্নাম তাদের ঠিকানা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَنَادٰٓي أَصْحٰبُ النَّارِ أَصْحٰبَ الْجَنَّةِ أَنْ أَفِيْضُوْا عَلَيْنَا مِنَ الْمَا۬ءِ أَوْ مِمَّا رَزَقَكُمُ اللّٰهُ ط قَالُوْآ إِنَّ اللّٰهَ حَرَّمَهُمَا عَلَي الْكٰفِرِيْنَ)
“জাহান্নামীরা জান্নাতবাসীদেরকে সম্বোধন করে বলবে, ‘আমাদের ওপর কিছু পানি ঢেলে দাও, অথবা ‘আল্লাহ জীবিকাস্বরূপ তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে কিছু দাও।’তারা বলবে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফিরদের জন্য এ দু’টি হারাম করেছেন।”(সূরা আ‘রাফ ৭:৫০)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلَّا نَفْسٌ مُّسْلِمَةٌ
মু’মিন আত্মা ছাড়া কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না। (সহীহ বুখারী হা: ২৮৯৭)
(وَأُمُّه۫ صِدِّيْقَةٌ)
‘তার মা পরম সত্যনিষ্ঠা ছিলেন।’অর্থাৎ ঈসা (আঃ)-এর মা ছিলেন সত্যবাদী যাদের মযার্দা নাবীদের পরে। তিনি ঈসা (আঃ)-এর ওপর ঈমান এনেছিলেন। অর্থাৎ তিনি নাবী ছিলেন না। যেমন অনেকে ধারণা করে থাকে মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর সাথে ফেরেশতা কথা বলেছিলেন, তাঁর ওপর ওয়াহী হয়েছিল তাই তিনিও নাবী।
আল্লাহ তা‘আলা নারীদের থেকে কাউকে নাবী হিসেবে প্রেরণ করেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَآ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُّوْحِيْٓ إِلَيْهِمْ مِّنْ أَهْلِ الْقُرٰي)
“তোমার পূর্বেও জনপদবাসীদের মধ্য হতে পুরুষগণকেই প্রেরণ করেছিলাম, যাদের নিকট ওয়াহী পাঠাতাম।”(সূরা ইউসূফ ১২:১০৯)
(كَانَا يَأْكُلٰنِ الطَّعَامَ)
‘তারা উভয়ে খাবার খেত।’মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) ও ঈসা (আঃ) উভয়ে খাবার খেতেন। এ আয়াতের এ অংশ প্রমাণ করছে যে, তারা কেউ মা‘বূদ ছিলেন না। যদি মা‘বূদই হতেন তাহলে খাবারের প্রয়োজন হত না এবং তারা ফেরেশতাও ছিলেন না। কেননা ফেরেশতাগণ খাবার ও অন্যান্য জিনিসের প্রতি মুখাপেক্ষী নয় যা মানুষের প্রয়োজন। এসব আল্লাহ তা‘আলা বিস্তারিত বর্ণনা করে দিয়েছেন, এরপরেও যে সকল মানুষ সত্য বিমুখ তারাই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
সুতরাং যারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী তারা কাফির, ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে যারা বাড়াবাড়ি করেছে তাদের থেকে তিনি মুক্ত, তিনি এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছেন।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার একজন বান্দা ও রাসূল ছিলেন। তিনি নিজে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতেন এবং মানুষকে সেদিকে আহ্বান করতেন।
২. শির্কে আকবারে লিপ্ত ব্যক্তি তাওবাহ করে ফিরে না আসলে তার ঠিকানা জাহান্নাম।
৩. ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস ভ্রান্ত বিশ্বাস।
৪. বানী ইসরাঈলের জন্যও তাওবার দরজা খোলা ছিল।
৫. পৃথিবীর সকল নাবীই ছিলেন পুরুষ, নারীদের মধ্য হতে কোন নাবী আগমন করেননি।
৬. ঈসা (আঃ) ও তাঁর মা ছিলেন সাধারণ মানুষের মত যারা পানাহার করতেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭২-৭৫ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে খ্রীষ্টানদের দলগুলোর অর্থাৎ মালেকিয়্যাহ, ইয়াকুবিয়্যাহ এবং নাসতুরিয়্যাহদের কুফরের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা মাসীহকেই (আঃ) প্রভু বলে মেনে থাকে। আল্লাহ তাদের এ উক্তি থেকে সম্পূর্ণরূপে পাক ও পবিত্র। মাসীহ (আঃ) তো আল্লাহর গোলাম ছিলেন। পার্থিব জগতে পা রেখে দোলনাতেই তাঁর মুখের প্রথম কথা ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর গোলাম বা দাস। (১৯:৩০) “আমি আল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র”-এ কথা তো তিনি বলেননি! বরং তিনি স্বীয় দাসত্বের কথা অকপটে স্বীকার করেছিলেন। সাথে সাথে তিনি বলেছিলেনঃ “আমার এবং তোমাদের সকলের প্রভু একমাত্র আল্লাহ। তাঁরই ইবাদত কর। সরল ও সঠিক পথ এটাই।' যৌবনের পরবর্তী বয়সেও বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর। যারা তাঁর সাথে অন্য কারও ইবাদত করে তাদের জন্যে জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম ওয়াজিব।” যেমন কুরআন পাকের অন্য আয়াতে রয়েছে- “আল্লাহ শিরকের গুনাহ কখনও মাফ করেন না।” জাহান্নামবাসীরা যখন জান্নাতবাসীদের কাছে খাদ্য ও পানি চাইবে তখন তারা এ উত্তরই দেবে যে, এ দুটি জিনিস আল্লাহ কাফিরদের উপর হারাম করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষকদের দ্বারা মুসলমানদের মধ্যে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, শুধু মুমিন ও মুসলমানরাই জান্নাতে যাবে। সূরায়ে নিসার (আরবী) (৪:১১৬)-এ আয়াতের তাফসীরে এ হাদীসটিও বর্ণনা করা হয়েছে যাতে রয়েছে যে, পাপের তিনটি শ্রেণী রয়েছে। এ তিন শ্রেণীর মধ্যে এক শ্রেণী হচ্ছে ওটা যা আল্লাহ তা'আলা কখনও ক্ষমা করবেন না। সেই পাপটি হচ্ছে আল্লাহর সাথে শিরক করা! হযরত মাসীহ্ (আঃ) স্বীয় কওমের মধ্যে এ ওয়ায করেছিলেন যে, এরূপ অন্যায়কারী মুশরিকদের কোন সাহায্যাকারী হবে না।
এখন ঐ লোকদের কুফরীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা আল্লাহকে তিন মা'বুদের মধ্যে এক মা’রূদ মনে করতো। ইয়াহুদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-কে এবং খ্রীষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলতো। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) এবং আল্লাহকে তিন মা’ৰূদে মধ্যে এক মা'বুদ মনে করতো। কিন্তু এ আয়াতটি শুধু খ্রীষ্টানদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। তারা পিতা, পুত্র এবং তাঁর। সেই কালিমাকে মা'বুদ মানতো যা পিতার পক্ষ থেকে পুত্রের দিকে ছিল। অতঃপর এ তিনকে নির্ধারিত করার ব্যাপারেও খুব বড় রকমের মতানৈক্য ছিল এবং প্রত্যেক দল একে অপরকে কাফির বলতো। সত্য কথা এই যে, তারা সবাই কাফির ছিল। তারা হযরত মাসীহ (আঃ)-কে, তার মাকে এবং আল্লাহকে মিলিয়ে দিয়ে আল্লাহ মানতো। এ সূরার শেষে এরই ব কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলবেনতুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে-তোমরা আল্লাহকে ছাড়াও আমাকে ও আমার মাকে আল্লাহ বলে স্বীকার কর?' তিনি তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করবেন এবং নিজের না জানার কথা ও নিরপরাধ হওয়ার কথা প্রকাশ করবেন। সবচেয়ে বেশী প্রকাশ্য উক্তি হচ্ছে এটাই। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
প্রকৃতপক্ষে ইবাদতের যোগ্য মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউই নয়। সমস্ত সৃষ্টিজগতের প্রকৃত মা'বূদ তিনিই। যদি এরা কুফরীপূর্ণ উক্তি থেকে বিরত না থাকে তবে নিশ্চিতরূপে এরা ধ্বংসাত্মক শাস্তির শিকারে পরিণত হবে।
অতঃপর আল্লাহ স্বীয় দয়া, অনুকম্পা, স্নেহ ও ভালবাসার বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাদের এতো কঠিন অপরাধ ও এতো ভীষণ নির্লজ্জতা ও মিথ্যারোপ সত্ত্বেও তাদেরকে স্বীয় রহমতের দাওয়াত দিচ্ছেন এবং বলছেনঃ এখনও যদি তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হও তবে তোমাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেবো। এবং তোমাদেরকে আমার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেবো।
হযরত মাসীহ (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূলই ছিলেন। তাঁর মত রাসূল তাঁর পূর্বেও অতীত হয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ সে একজন, গোলামই ছিল। (৪৩:৫৯) তবে তিনি তাঁর উপর স্বীয় রহমত নাযিল করেছিলেন এবং বানী ইসরাঈলের জন্যে তাঁর একটি নির্দেশ বানিয়েছিলেন। তাঁর মা মুমিন ও সত্যবাদিনী ছিলেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তিনি নবী ছিলেন না। কেননা, এটা হচ্ছে বিশেষণ বা গুণ বর্ণনার স্থান। সুতরাং তিনি যে গুণের অধিকারিণী ছিলেন তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যদি তিনি নবুওয়াতের অধিকারিণী হতেন তবে এ স্থলে ওটার বর্ণনা দেয়া খুবই জরুরী ছিল। ইবনে হাম (রঃ) প্রমুখ মনীষীর ধারণা এই যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর মা হযরত মূসা (আঃ)-এর মা এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর মা নবী ছিলেন এবং তারা এর দলীল দিতে গিয়ে বলেন, ফেরেশতাগণ হযরত সারা (আঃ) এবং হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে সম্বোধন করেন এবং তাদের সাথে কথা বলেছেন। আর হযরত মূসা (আঃ)-এর মাতী সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন- (আরবী) অর্থাৎ “আমি মূসার মায়ের কাছে অহী পাঠিয়েছিলাম-তুমি তাকে দুধ পান করাও। (২৮:৭) কিন্তু জমহুরের মাযহাব এর উল্টো। তারা বলেন যে, নবুওয়াত পুরুষ লোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যেমন কুরআন পাকে আছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমার পূর্বে আমি গ্রামবাসীদের মধ্য হতে পুরুষ লোকদেরকেই রিসালাত দান করেছিলাম।'(২১:৭) আবুল হাসান আশআরী (রঃ) তো এর উপর ইজমা হওয়ার কথা নকল করেছেন।
এরপর ইরশাদ হচ্ছে-মাতা ও পুত্র উভয়ে পানাহারের মুখাপেক্ষী ছিল। আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, যা ভেতরে যাবে তা বেরিয়ে আসবে। অর্থাৎ তাদের প্রস্রাব পায়খানাও হতো। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, তাঁরা অন্যদের মত বান্দাই ছিলেন। খোদায়ী গুণ তাদের মধ্যে ছিল না। দেখো তো! আমি কিভাবে খোলাখুলি তাদের সামনে আমার দলীল প্রমাণাদি পেশ করছি! আবার লক্ষ্য কর যে, এতো দলীল প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিভাবে তারা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক ওদিক ফিরছে! কেমন ভ্রষ্ট মাযহাবের উপর তারা রয়েছে! কেমন জঘন্য ও দলীল প্রমাণহীন উক্তি তারা করছে!
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।