আল কুরআন


সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 63)

সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 63)



হরকত ছাড়া:

لولا ينهاهم الربانيون والأحبار عن قولهم الإثم وأكلهم السحت لبئس ما كانوا يصنعون ﴿٦٣﴾




হরকত সহ:

لَوْ لَا یَنْهٰهُمُ الرَّبّٰنِیُّوْنَ وَ الْاَحْبَارُ عَنْ قَوْلِهِمُ الْاِثْمَ وَ اَکْلِهِمُ السُّحْتَ ؕ لَبِئْسَ مَا کَانُوْا یَصْنَعُوْنَ ﴿۶۳﴾




উচ্চারণ: লাওলা-ইয়ানহা-হুমুর রাব্বা-নিইয়ূনা ওয়াল আহবা-রু ‘আন কাওলিহিমুল ইছমা ওয়া আকলিহিমুছছুহতা লাবি’ছা মা-কা-নূইয়াসনা‘ঊন।




আল বায়ান: কেন তাদেরকে রব্বানী ও ধর্মবিদগণ তাদের পাপের কথা ও হারাম ভক্ষণ থেকে নিষেধ করে না? তারা যা করছে, নিশ্চয় তা কতইনা মন্দ!




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৩. রাব্বানীগণ ও পণ্ডিতগণ(১) কেন তাদেরকে পাপ কথা বলা ও অবৈধ খাওয়া থেকে নিষেধ করে না? এরা যা করছে নিশ্চয়ই তা কতই না নিকৃষ্ট।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: দরবেশ ও পুরোহিতগণ তাদেরকে পাপের কথা বলা হতে এবং হারাম ভক্ষণ থেকে নিষেধ করে না কেন? তারা যা করে তা কতই না নিকৃষ্ট!




আহসানুল বায়ান: (৬৩) রাব্বানী (আল্লাহ-ভক্ত)গণ ও পন্ডিতগণ কেন তাদেরকে পাপ-কথা বলতে ও অবৈধ ভক্ষণ করতে নিষেধ করে না? এরা যা করে নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট! [1]



মুজিবুর রহমান: তাদেরকে আল্লাহওয়ালা এবং আলিমগণ পাপের বাক্য হতে এবং হারাম মাল ভক্ষণ করা হতে কেন নিষেধ করছেনা? তাদের এ অভ্যাস নিন্দনীয়।



ফযলুর রহমান: (তাদের) ধার্মিক ব্যক্তিরা ও যাজকেরা কেন তাদেরকে পাপের কথা বলতে ও হারাম খেতে নিষেধ করে না? তারা যা করছে আসলে তা খুবই খারাপ।



মুহিউদ্দিন খান: দরবেশ ও আলেমরা কেন তাদেরকে পাপ কথা বলতে এবং হারাম ভক্ষণ করতে নিষেধ করে না? তারা খুবই মন্দ কাজ করছে।



জহুরুল হক: রব্বিগণ ও পুরোহিতরা কেন তাদের নিষেধ করে না তাদের পাপপূর্ণ কথাবার্তা বলাতে আর তাদের গ্রাস-করণে অবৈধভাবে লব্ধ বস্তু। অবশ্যই গর্হিত যা তারা করে যাচ্ছে।



Sahih International: Why do the rabbis and religious scholars not forbid them from saying what is sinful and devouring what is unlawful? How wretched is what they have been practicing.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৬৩. রাব্বানীগণ ও পণ্ডিতগণ(১) কেন তাদেরকে পাপ কথা বলা ও অবৈধ খাওয়া থেকে নিষেধ করে না? এরা যা করছে নিশ্চয়ই তা কতই না নিকৃষ্ট।(২)


তাফসীর:

(১) কোন কোন মুফাসসির বলেন, রব্বানী বলে নাসারাদের আলেম সম্প্রদায়, আর আহবার বলে ইয়াহুদীদের আলেমদের উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। অপর মুফাসসিরগণ মনে করেন, এখানে শুধু ইয়াহুদীদের আলেমদেরকেই বোঝানো হয়েছে। কারণ, এর পূর্বেকার আলোচনা তাদের সম্পর্কেই চলছিল। [ফাতহুল কাদীর] এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত বর্ণনা এ সূরার ৪৪ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় এসেছে।


(২) আয়াতের শেষভাগে বলা হয়েছেঃ “সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ” করার কর্তব্যটি ত্যাগ করে ইয়াহুদীদের এসব মাশায়েখ ও আলেম অত্যন্ত বদভ্যাসে লিপ্ত হয়েছে। জাতিকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যেতে দেখেও তারা বাধা দিচ্ছে না। লক্ষণীয় যে, পূর্বোক্ত আয়াতে সর্বসাধারণের দুষ্কর্ম বর্ণিত হয়েছিল। তাই এর শেষে (لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ) বলা হয়েছে, কিন্তু এ আয়াতে ইয়াহুদী মাশায়েখ ও আলেমদের ভ্রান্তি প্রকাশ করা হয়েছে। তাই এর শেষে (لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ) বলা হয়েছে। কারণ, আরবী অভিধানের দিক দিয়ে ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত সব কাজকেই فعل বলা হয়। عمل শব্দটি ঐ কাজকে বুঝাবার জন্য ব্যবহৃত হয়, যা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয় এবং صنع ও صنعت শব্দ ঐ কাজের বেলায় প্রয়োগ করা হয়, যা ইচ্ছার সাথে সাথে বারবার অভ্যাস ও লক্ষ্য হিসাবে ঠিক করে করা হয়। তাই সর্বসাধারণের কুকর্মের পরিণতির ক্ষেত্রে শুধু عمل শব্দ ব্যবহার করে বলা হয়েছে (لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ) আর বিশিষ্ট মাশায়েখ ও আলেমদের ভ্রান্ত কাজের জন্য صنع শব্দ প্রয়োগে (لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَصْنَعُونَ) বলা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, মাশায়েখ ও আলেমদের জন্য সমগ্র কুরআনে এ আয়াতের চাইতে কঠোর হুশিয়ারী আর কোথাও নাই। তাফসীরবিদ যাহহাক বলেন, আমার মতে মাশায়েখ ও আলেমদের জন্য এ আয়াত সর্বাধিক ভয়াবহ। [তাবারী]

এ কারণেই জাতির সামগ্রিক সংশোধনের জন্যে কুরআন ও হাদীসে ‘সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ’ এর প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। কুরআন এ কর্তব্যটিকে উম্মতে মুহাম্মদীর বৈশিষ্ট্য আখ্যা দিয়েছে এবং এর বিরুদ্ধাচরণ করাকে কঠোর পাপ ও শাস্তির কারণ বলে সাব্যস্ত করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কোন জাতির মধ্যে যখন কোন পাপ কাজ করা হয় অথচ কোন লোক তা নিষেধ করে না, তখন তাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব প্রেরণের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে যায়। [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/৩৬৩]

মালেক ইবন দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহ তা'আলা এক জায়গায় ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, অমুক বস্তি ধ্বংস করে দাও। ফেরেশতারা বললেন, এ বস্তিতে আপনার অমুক ইবাদতকারী বান্দাও রয়েছে। নির্দেশ এল, তাকেও আযাবের স্বাদ গ্রহণ করাও- আমার অবাধ্যতা ও পাপাচার দেখেও তার চেহারা কখনও ক্রোধে বিবর্ণ হয়নি। [কুরতুবী, বাহরে মুহীত]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৬৩) রাব্বানী (আল্লাহ-ভক্ত)গণ ও পন্ডিতগণ কেন তাদেরকে পাপ-কথা বলতে ও অবৈধ ভক্ষণ করতে নিষেধ করে না? এরা যা করে নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট! [1]


তাফসীর:

[1] এখানে উলামা, মাশায়েখ, আবেদ ও ধর্মভীরু ব্যক্তিদেরকে ভৎর্সনা করা হয়েছে যে, সাধারণ মানুষদের বেশীর ভাগ লোক তোমাদের সামনে পাপাচার, অপকর্ম এবং হারামখোরীতে লিপ্ত; কিন্তু তোমরা তাদেরকে নিষেধ কর না। এই অবস্থায় তোমাদের নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা খুব বড় অপরাধ। এর দ্বারা পরিষ্কার হয় যে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা দান করার কত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা পরিত্যাগ করা কত ভয়ানক ও কঠিন শাস্তিযোগ্য। যেমন বহু হাদীসেও এ বিষয়টি বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর:



আহলে কিতাবদের যারা ইসলামকে নিয়ে ঠাট্টা করে তাদের মুসলিমদের সাথে শত্র“তা করার কারণ একটাই যে, মুসলিমরা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান রাখে এবং নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ও পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ কিতাবে ঈমান রাখে।



(وَإِذَا جَا۬ءُوْكُمْ)



‘‘তারা যখন তোমাদের নিকট আসে’এখানে মুনাফিকদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে যারা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করে কুফরী অবস্থায় আবার বের হয়ে যায় কুফরী অবস্থায়। কোন প্রকার ওয়াজ নসীহত তাদের কাজে আসে না।



(لَوْلَا يَنْهٰهُمُ الرَّبّٰنِيُّوْنَ وَالْأَحْبَارُ...)



‘কেন আল্লাহও ‘য়ালাগণ ও আলেমগণ তাদেরকে খারাপ কথা বলতে ও অবৈধ ভক্ষণে নিষেধ করে না?’ অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আলিম ওলামা ও ধর্ম যাজকদেরকে ভৎসনা করছেন এজন্য যে, সাধারণ মানুষের বেশির ভাগ লোক তাদের সামনে অন্যায় অশ্লীল কাজে লিপ্ত হয়, কিন্তু তারা প্রতিরোধ করার কোন ভূমিকা পালন করে না।



অথচ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা দেয়ার ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ হাদীসে অনেক তাকীদ দেয়া হয়েছে। আমাদের আলিম সমাজকে এসব বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত।



ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাদের সম্মুখে কোন খারাপ কাজ বহাল না রাখে। অন্যথায় ভাল-মন্দ সকলকে আযাব গ্রাস করে নেবে।



যয়নব বিনতু জাহাশ (রাঃ) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মাঝে সৎ লোক থাকা সত্ত্বেও কি আমাদের ধ্বংস করা হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: হ্যাঁ যখন খারাপ কাজ বেশি বৃদ্ধি পাবে। (সহীহ বুখারী হা: ৩৩৪৬)



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَاتَّقُوْا فِتْنَةً لَّا تُصِيْبَنَّ الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا مِنْكُمْ خَا۬صَّةً ج وَاعْلَمُوْآ أَنَّ اللّٰهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ)‏



“তোমরা এমন ফেতনা থেকে বেঁচে থাক যা বিশেষ করে তোমাদের মধ্যে যারা যালিম কেবল তাদেরকেই ধ্বংস করবে না এবং জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।”(সূরা আনফাল ৮:২০) সুতরাং অন্যায়কারীদের অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে অন্যায়ের শাস্তি সকলকে ভোগ করতে হবে।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মুসলিমদের সাথে ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের শত্র“তার কারণ মূলতঃ ইসলাম।

২. আল্লাহ তা‘আলার নিকট নিকৃষ্ট জাতি কারা তাদের পরিচয় জানলাম।

৩. মুনাফিকদের ওয়াজ নসীহত কোন কাজে আসে না।

৪. সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বাধা না দিলে সকলকেই শাস্তি পাকড়াও করবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর:

নির্দেশ হচ্ছে-হে মুমিনগণ! যেসব আহূলে কিতাব তোমাদের দ্বীনকে বিদ্রুপ ও উপহাস করছে তাদেরকে বল-তোমরা আমাদের প্রতি যে বৈরীভাব পোষণ করছে তার কারণ তো এটা ছাড়া আর কিছু নয় যে, আমরা আল্লাহর উপর এবং তার সমুদয় কিতাবের উপর ঈমান এনেছি। সুতরাং এটা কোন ঈর্ষার কারণ নয় এবং কোন নিন্দারও কারণ নয়। এটা (আরবী) হয়েছে। অন্য আয়াতের আছে (আরবী) অর্থাৎ তারা শুধু এ কারণে প্রতিশোধ নিয়েছে যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে মাল দিয়ে ধনী করে দিয়েছেন।” (৯:৭৪)

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে-“ইবনে জামীল ওরই বদলা নিচ্ছে যে, সে দরিদ্র ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাকে ধনী করে দিয়েছেন।'

তোমাদের অধিকাংশই ফাসিক, অর্থাৎ, সোজা-সরল পথ থেকে তোমরা সরে পড়েছে। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে যে, একদল ইয়াহুদী নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তাকে জিজ্ঞেস করে-আপনি কোন কোন রাসূলের উপর ঈমান এনেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ করা হয়েছিল ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর, ইসমাঈল (আঃ)-এর উপর, ইয়াকূব (আঃ)-এর উপর, তাঁর সন্তানদের উপর এবং যা দেয়া হয়েছিল, মূসা (আঃ)-কে ও ঈসা (আঃ)-কে এবং যা দেয়া হয়েছিল অন্যান্য নবীদেরকে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে।” যখন তিনি ঈসা (আঃ)-এর উল্লেখ করলেন তখন তারা নবুওয়াতকে অস্বীকার করলো এবং বললো :“আমরা ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনি না এবং যে তাঁর উপর ঈমান এনেছে তার উপরও না।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়) তোমরা আমাদের সম্পর্কে যে ধারণা করছো, তাহলে এসো, তোমাদেরকে বলি যে, আল্লাহর নিকট প্রতিফল প্রাপক হিসেবে কে অধিক নিকৃষ্ট! আর এরূপ তোমরাই বটে। কেননা, এরূপ অভ্যাস তোমাদের মধ্যেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদেরকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে নিক্ষেপ করেছেন, যাদের উপর তিনি এতো রাগান্বিত হয়েছেন যে, এরপর আর সন্তুষ্ট হওয়ার নয় এবং যাদের কোন কোন দলের আকার বিকৃত করতঃ তাদেরকে তিনি বানর ও শূকরে পরিণত করেছেন। তারা তো তোমরাই। সূরায়ে বাকারায় এর পূর্ণ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- এখন যেসব বানর ও শূকর রয়েছে এগুলো কি ওরাই? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “যে কওমের উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হয় তাদের বংশুধর কেউ থাকে না। (অর্থাৎ তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেন)। তাদের পূর্বেও শূকর ও বানর ছিল।” এ রিওয়ায়াতটি বিভিন্ন শব্দে সহীহ মুসলিম ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, জিনদের একটি কওমকে সর্প বানিয়ে দেয়া হয়েছিল, যেমন (ইয়াহূদীদের একটি কওমকে) বানর ও শূকর বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। তাদের মধ্য হতেই কোন কোন দলকে গায়রুল্লাহর পূজারী বানিয়ে দেয়া হয়। এক কিরআতে -এর সাথে তাগুতে যেরও রয়েছে। অর্থাৎ তাদেরকে প্রতিমার গোলাম বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। হযরত বুরাইদাহ আসলামী (রাঃ) এটাকে আবেদুত্ তাগুতে পড়তেন। আবূ জাফর কারী হতে আবেদাত্ ত্বাগুতু -এ পঠনও বর্ণিত আছে। এতে অর্থের দূরত্ব এসে যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দূরত্বও নয়। ভাবার্থ এই যে, তোমরা ওরাই যাদের মধ্যে তাগুতের পূজা করা হয়েছে। মোটকথা, আহলে কিতাবকে দোষারোপ করে বলা হচ্ছে- তোমরা তো আমাদেরকে দোষারূপ করছো, অথচ আমরা একতুবাদী। আমরা শুধু এক আল্লাহকে মেনে থাকি। আর তোমরা তো হচ্ছ ওরাই যে, তোমাদের মধ্যে সব কিছুই পাওয়া যায়। এ কারণেই শেষে বলা হয়েছে-এ লোকেরাই সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে খুবই নিকৃষ্ট পর্যায়ের। তারা সীরাতে মুসতাকীম থেকে বহুদূরে। তারা ভুল ও বিভ্রান্তির পথে রয়েছে। এখানে (আরবী) ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ এতো অধিক পথভ্রষ্ট আর কেউই হতে পারে না। যেমনঃ (আরবী) (২৫:২৪)-এ আয়াতে রয়েছে।

অতঃপর মুনাফিকদের একটি বদ অভ্যাসের কথা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে জানিয়ে দিয়ে বলেছেনঃ বাহ্যিকভাবে তো মুমিনদের সামনে তারা ঈমান প্রকাশ করে থাকে, কিন্তু তাদের ভেতর কুফরীতে পরিপূর্ণ। তারা তোমার কাছে কুফরীর অবস্থাতেই আগমন করে এবং যখন ফিরে যায় তখন কুফরীর অবস্থাতেই ফিরে যায়। তোমার কথা ও উপদেশ তাদের উপর মোটেই ক্রিয়াশীল হয় না। ভেতরের এ কলুষতা দ্বারা কি উপকার তারা লাভ করবে? যার কাছে তাদের কাজ, তিনি আলেমুল গায়েব। অদৃশ্যের সমস্ত খবরই তো তিনি জানেন। তাদের অন্তরের গোপন কথা তার কাছে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সেখানে গিয়ে তাদেরকে এর পূর্ণ ফল ভোগ করতে হবে।

হে নবী (সঃ)! তুমি তো স্বচক্ষে দেখছো যে, তারা দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে কিভাবে পাপ, যুলুম ও হারাম ভক্ষণে নিপতিত হচ্ছে! তাদের কৃতকর্মগুলো অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। তাদের অলী উল্লাহরা অর্থাৎ আবেদ ও আলেমরা তাদেরকে এসব কাজ থেকে বিরত রাখছে না কেন? প্রকৃতপক্ষে ঐসব আলেম ও পীরের কাজগুলোও খারাপ হয়ে গেছে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আলেম ও ফকীর দরবেশদের ধমকের জন্যে এর চেয়ে বেশী কঠিন আয়াত কুরআন কারীমে আর একটিও নেই। হযরত যহহাক (রঃ) হতেও এরকমই বর্ণিত আছে। একদা হযরত আলী (রাঃ) এক খুৎবায় আল্লাহ পাকের হামদ ও সানা বর্ণনা করার পর বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তারা অসৎ কাজে লিপ্ত থাকতো এবং তাদের আলেমরা ও আল্লাহওয়ালারা সম্পূর্ণরূপে নীরব থাকতো। যখন এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হলো তখন আল্লাহ তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি অবতীর্ণ করলেন। সুতরাং তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যে শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল সেই শাস্তিই তোমাদের উপর অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তোমাদের উচিত মানুষকে ভাল কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। বিশ্বাস রেখো যে, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা প্রদান না তোমাদের রিস্ক বা খাদ্য কমাবে, না তোমাদের মৃত্যু নিকটবর্তী করবে। সুনানে আবি দাউদে হযরত জাবীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-“যে কওমের মধ্যে কোন লোক অবাধ্যতার কাজ করে এবং ঐ কওমের লোকগুলো বাধা দেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে ঐ কাজ থেকে বিরত রাখে না, তাহলে আল্লাহ সবারই উপর তাদের মৃত্যুর পূর্বেই স্বীয় শাস্তি নাযিল করবেন।” সুনানে ইবনে মাজাতেও এ বর্ণনাটি রয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।