আল কুরআন


সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 52)

সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 52)



হরকত ছাড়া:

فترى الذين في قلوبهم مرض يسارعون فيهم يقولون نخشى أن تصيبنا دائرة فعسى الله أن يأتي بالفتح أو أمر من عنده فيصبحوا على ما أسروا في أنفسهم نادمين ﴿٥٢﴾




হরকত সহ:

فَتَرَی الَّذِیْنَ فِیْ قُلُوْبِهِمْ مَّرَضٌ یُّسَارِعُوْنَ فِیْهِمْ یَقُوْلُوْنَ نَخْشٰۤی اَنْ تُصِیْبَنَا دَآئِرَۃٌ ؕ فَعَسَی اللّٰهُ اَنْ یَّاْتِیَ بِالْفَتْحِ اَوْ اَمْرٍ مِّنْ عِنْدِهٖ فَیُصْبِحُوْا عَلٰی مَاۤ اَسَرُّوْا فِیْۤ اَنْفُسِهِمْ نٰدِمِیْنَ ﴿ؕ۵۲﴾




উচ্চারণ: ফাতারাল্লাযীনা ফী কুলূবিহিম মারাদুইঁ ইউছা-রি‘ঊনা ফীহিম ইয়াকূলূনা নাখশাআন তুসীবানা-দাইরাতুন ফা‘আছাল্লা-হু আইঁ ইয়া‘তিয়া বিল ফাতহিআও আমরিম মিন ‘ইনদিহী ফাইউসবিহু‘আলা-মাআছাররূফীআনফুছিহিম না-দিমীন।




আল বায়ান: সুতরাং তুমি দেখতে পাবে, যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তারা কাফিরদের মধ্যে (বন্ধুত্বের জন্য) ছুটছে। তারা বলে, ‘আমরা আশঙ্কা করছি যে, কোন বিপদ আমাদেরকে আক্রান্ত করবে’। অতঃপর হতে পারে আল্লাহ দান করবেন বিজয় কিংবা তাঁর পক্ষ থেকে এমন কিছু, যার ফলে তারা তাদের অন্তরে যা লুকিয়ে রেখেছে, তাতে লজ্জিত হবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫২. সুতরাং যাদের অন্তরে অসুখ রয়েছে আপনি তাদেরকে খুব তাড়াতাড়ি ওদের সাথে মিলিত হতে দেখবেন এ বলে, আমরা আশংকা করছি যে, কোন বিপদ আমাদের আক্রান্ত করবে।(১) অতঃপর হয়ত আল্লাহ বিজয় বা তার কাছ থেকে এমন কিছু দেবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল সে জন্য লজ্জিত হবে।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তুমি তাদেরকে দেখবে তারা তাদের (অর্থাৎ ইয়াহূদী, নাসারা মুশরিকদের) দৌড়ে গিয়ে বলবে, আমাদের ভয় হয় আমরা বিপদের চক্করে পড়ে না যাই। হয়তো আল্লাহ বিজয় দান করবেন কিংবা নিজের পক্ষ হতে এমন কিছু দিবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা লুকিয়ে রেখেছিল তার কারণে লজ্জিত হবে।




আহসানুল বায়ান: (৫২) যাদের অন্তঃকরণে ব্যাধি রয়েছে[1] তুমি তাদেরকে সত্বর এ বলে তাদের সাথে মিলিত হতে দেখবে যে, আমাদের আশংকা হয় আমাদের ভাগ্য-বিপর্যয় ঘটবে।[2] হয়তো আল্লাহ বিজয়[3] অথবা তাঁর নিকট হতে এমন কিছু দেবেন[4] যাতে তারা তাদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল তার জন্য অনুতপ্ত হবে।



মুজিবুর রহমান: এ কারণেই যাদের অন্তরে পীড়া রয়েছে তাদেরকে তোমরা দেখেছ যে, তারা দৌড়ে দৌড়ে তাদের (কাফিরদের) মধ্যে প্রবেশ করছে, এবং তারা বলেঃ আমাদের ভয় হচ্ছে যে, আমাদের উপর কোন বিপদ এসে পড়ে না কি! অতএব আশা করা যায় যে, অচিরেই আল্লাহ (মুসলিমদের) পূর্ণ বিজয় দান করবেন অথবা অন্য কোন বিষয় বিশেষভাবে নিজ পক্ষ হতে (প্রকাশ করবেন), অনন্তর তারা নিজেদের অন্তরে লুকায়িত মনোভাবের কারণে লজ্জিত হবে।



ফযলুর রহমান: এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তুমি তাদেরকে ওদের মাঝে ছুটে যেতে দেখবে। তারা বলে, “আমাদের ভয় হয়, না জানি আমাদের ওপর কোন বিপদ এসে পড়ে।” তবে শিগগিরই আল্লাহ বিজয় অথবা তাঁর পক্ষ থেকে কোন নির্দেশ দেবেন; তখন তারা তাদের মনে যা লুকিয়ে রাখত সেজন্য অনুতপ্ত হবে।



মুহিউদ্দিন খান: বস্তুতঃ যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলেঃ আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোন দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দুরে নয়, যেদিন আল্লাহ তা’আলা বিজয় প্রকাশ করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোন নির্দেশ দেবেন-ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্যে অনুতপ্ত হবে।



জহুরুল হক: কাজেই যাদের অন্তরে ব্যারাম রয়েছে তাদের তুমি দেখতে পাবে তাদের দিকে ছুটে যেতে এই বলে -- "আমরা আশঙ্কা করছি কোনো দুর্যোগ আমাদের উপরে ঘটে যায়।" কিন্তু হতে পারে যে আল্লাহ্ এনে দেবেন বিজয় অথবা তাঁর কাছ থেকে চুড়ান্ত নিস্পত্তি, তাই তাদের অন্তরে তারা যা পোষণ করছিল তার জন্য পরমুহূর্তেই তারা হলো অনুতাপী।



Sahih International: So you see those in whose hearts is disease hastening into [association with] them, saying, "We are afraid a misfortune may strike us." But perhaps Allah will bring conquest or a decision from Him, and they will become, over what they have been concealing within themselves, regretful.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫২. সুতরাং যাদের অন্তরে অসুখ রয়েছে আপনি তাদেরকে খুব তাড়াতাড়ি ওদের সাথে মিলিত হতে দেখবেন এ বলে, আমরা আশংকা করছি যে, কোন বিপদ আমাদের আক্রান্ত করবে।(১) অতঃপর হয়ত আল্লাহ বিজয় বা তার কাছ থেকে এমন কিছু দেবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল সে জন্য লজ্জিত হবে।(২)


তাফসীর:

(১) মুজাহিদ বলেন, এখানে যাদের অন্তরে অসুখ রয়েছে বলে মুনাফিকদের বুঝানো হয়েছে। তারা ইয়াহুদীদের সাথে গোপন শলা-পরামর্শ ও তাদের খাতির করে কথা বলতে সাচ্ছন্দ বোধ করে। অনুরূপভাবে তারা তাদের সন্তানদের দুধ পান করাতেও অভ্যস্ত। এমতাবস্থায় তাদের আন্তরিক সম্পর্ক ইয়াহুদীদের সাথেই থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাই তারা সবসময় ভাবে যে, ইয়াহুদীদেরই বিজয় হবে। আর তখন তাদের কাছ থেকে তারা বাড়তি সুবিধা পাবে। [তাবারী]


(২) মুসলিমরা সে বিজয় দেখেছিল। সুদ্দী বলেন, সে বিজয় হচ্ছে, মক্কা বিজয়। [তাবারী] কাতাদা বলেন, এখানে বিজয় বলে আল্লাহর ফয়সালা বুঝানো হয়েছে। [তাবারী] কাতাদা আরও বলেন, মুনাফিকরা তখন ইয়াহুদীদের সাথে তাদের যে গোপন আতাত, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও তাদের বিরুদ্ধাচারণ ও এতদসংক্রান্ত যাবতীয় কার্যকলাপের জন্য লজ্জিত হবে। [তাবারী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫২) যাদের অন্তঃকরণে ব্যাধি রয়েছে[1] তুমি তাদেরকে সত্বর এ বলে তাদের সাথে মিলিত হতে দেখবে যে, আমাদের আশংকা হয় আমাদের ভাগ্য-বিপর্যয় ঘটবে।[2] হয়তো আল্লাহ বিজয়[3] অথবা তাঁর নিকট হতে এমন কিছু দেবেন[4] যাতে তারা তাদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল তার জন্য অনুতপ্ত হবে।


তাফসীর:

[1] উদ্দেশ্য মুনাফেকী বা কপটতা রয়েছে। অর্থাৎ মুনাফিকরা ইয়াহুদীদের সাথে ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব করার ব্যাপারে তড়িঘড়ি করে।

[2] অর্থাৎ, মুসলিমরা পরাজিত হলে তার ফলে হয়তো আমাদেরকেও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু যদি ইয়াহুদীদের সাথে মিত্রতা-বন্ধুত্ব থাকে, তাহলে সেই সময়ে আমাদের বড়ই উপকার হবে।

[3] অর্থাৎ, মুসলমানদেরকে।

[4] ইয়াহুদ ও নাসারাদের উপর জিযিয়া-কর নির্ধারণ করবেন। এ আয়াত বানু কুরাইযাকে হত্যা ও তাদের সন্তানদেরকে বন্দী এবং বানু নাযীরকে নির্বাসিত করার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে; যা তা অদূর ভবিষ্যতেই সংঘটিত হয়েছিল।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর:



৫১ নং আয়াতের শানে নুযূল:



উবাদাহ বিন সামেত (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: যখন বানু কাইনুকা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে তখন আব্দুল্লাহ বিন উবাই তাদের সাথে সম্পৃক্ত থাকে এবং তাদের সহযোগিতা করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। উবাদাহ বিন সামেত (রাঃ) তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে চলে আসেন। জাহেলি যুগ থেকেই আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও উবাদাহ বিন সামেত (রাঃ) দু’জনের ইয়াহূদীদের সাথে মৈত্রীচুক্তি ছিল। উবাদাহ বিন সামেত (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে এসেছি এবং আল্লাহ, রাসূল ও মু’মিনদের সাথে সম্পর্ক গড়ে নিয়েছি। কিন্তু আবদুল্লাহ বিন উবাই তাদের সাথে সম্পর্ক বহাল রাখে এবং তাদের রক্ষা করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর তাবারী হা: ১২১৫৮, ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহূদ ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন; কারণ তারা ইসলাম ও মুসলিমদের চরম শত্র“ এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরস্পর সহযোগিতা করে।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِّلَّذِيْنَ اٰمَنُوا الْيَهُوْدَ وَالَّذِيْنَ أَشْرَكُوْا)



“অবশ্যই মু’মিনদের প্রতি শত্র“তায় মানুষের মধ্যে ইয়াহূদী ও মুশরিকদেরকেই তুমি সর্বাধিক উগ্র দেখবে।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৮২)



এ সম্পর্কে সূরা আলি-ইমরানের ২৮ ও ১১৮ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



(وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَإِنَّه۫ مِنْهُمْ)



“তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে সে তাদেরই একজন গণ্য হবে” অর্থাৎ কোন মুসলিম ব্যক্তি জেনে-শুনে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখলে সে তাদের মত হয়ে যাবে, মুসলিম থাকবে না। মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করা যে কুফরী কাজ তার বিশেষ দলীল হলো অত্র আয়াত।



অর্থ হলো: মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সাহায্য করা এমনভাবে যে, কোথাও মুসলিম ও কাফিরদের মাঝে যুদ্ধ হচ্ছে সেখানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদেরকে যেকোনভাবে সহযোগিতা করা। হতে পারে সম্পদ দ্বারা, অস্ত্র দ্বারা অথবা সমর্থন দ্বারা। এভাবে যদি কেউ মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাহায্য করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে; কেননা সে মুসলিদের ওপর মুশরিকদেরকে প্রাধান্য দিয়েছে। এরূপ প্রাধান্য দেয়া প্রমাণ করে, সে ইসলামকে অপছন্দ করে, আল্লাহ ও রাসূলকে অপছন্দ করে। এরূপ করা কুফরী ও ধর্মহীনতা।



যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলাকে অপছন্দ করবে, অথবা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলকে অপছন্দ করবে অথবা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা নিয়ে এসেছেন তার কোন কিছু অপছন্দ করবে সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوْا مَآ أَنْزَلَ اللّٰهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ)‏



“কারণ, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা তারা অপছন্দ করছে; তাই আল্লাহ তাদের আমল বরবাদ করে দিয়েছেন।” (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৯)



مرض (ব্যাধি) এখানে ব্যাধি অর্থ হল সংশয় ও সন্দেহ।



অর্থাৎ দীন ইসলামের ব্যাপারে যাদের সন্দেহ ও কপটতা রয়েছে তারা ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের সাথে বন্ধুত্ব করতে তড়িঘড়ি করে।



دائرة ‘মুসিবত’অর্থাৎ তারা বলে আমরা ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের সাথে বন্ধুত্ব রাখি এ আশংকায় যে, ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানগণ মুসলিমদের ওপর জয়ী হলে তখন আমাদের খুব কাজে আসবে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তিনি অচিরেই ইসলাম ও মুসলিমদেরকে মক্কা বিজয় দেবেন। তখন মুনাফিকরা তাদের কৃতকর্মের জন্য আফসোস করবে, কিন্তু কোন কাজ হবে না।



‘শ্রীঘ্রই আল্লাহ বিজয় দেবেন’ এখানে বিজয় দ্বারা উদ্দেশ্য হল মক্কা বিজয়। (তাফসীর মুয়াসসার - ১১৭)

অতএব যে ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানেরা ইসলাম ও মুসিলমদের চরম শত্র“, পদে পদে মুসলিমদের ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র করে তাদের লেবাস-পোষাক, আচার-আচরণ, কাজ-কর্ম পছন্দ করত তাদেরকে যারা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে তাদের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. অমুসলিমদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা ধর্মহীনতা ও হারাম।

২. কেবল মুনাফিকরাই কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে পারে।

৩. মু’মিনদের উপেক্ষা করে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করা ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার শামিল।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর:

এখানে আল্লাহ তাআলা ইসলামের শত্রু ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে মুমিনদেরকে নিষেধ করছেন। তিনি বলছেন- তারা কখনও তোমাদের বন্ধু হতে পারে না। কেননা, তোমাদের ধর্মের প্রতি তাদের হিংসা ও শক্রতা রয়েছে। হ্যাঁ, তারা নিজেরা একে অপরের বন্ধু বটে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব কায়েম করবে তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবু মূসা (রাঃ)-কে এ ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন করেছিলেন এবং এ আয়াতটি পড়ে শুনিয়েছিলেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবা বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা এ থেকে বেঁচে থাকো যে, তোমরা নিজেরা জানতেই পারবে না, অথচ আল্লাহর কাছে ইয়াহুদী ও নাসারা বলে পরিগণিত হয়ে যাবে।` বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বুঝে গেলাম যে, এ আয়াতের ভাবার্থই তার উদ্দেশ্য।

যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা গোপনীয়ভাবে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে যোগাযোগ ও ভালবাসা স্থাপন করে থাকে এবং অজুহাত পেশ করে বলে-এরা যদি মুসলমানদের উপর জয়যুক্ত হয়ে যায় তবে না জানি আমরা বিপদে পড়ে যাই। এ জন্যই তাদের সাথে মিল রাখছি। কারও মন চটিয়ে আমাদের লাভ কি? আল্লাহ পাক বলেন-খুব সম্ভব, আল্লাহ মুসলমানদেরকে স্পষ্ট বিজয় দান করবেন। মক্কাও তাদের হাতে বিজিত হবে এবং শাসনকর্তা তারাই হবে। আল্লাহ তাদেরই পায়ের নীচে হুকুমত নিক্ষেপ করবেন অথবা ইয়াহূদী নাসারাদেরকে পরাজিত করে তাদেরকে লাঞ্ছিত করতঃ তাদের নিকট থেকে জিযিয়া কর আদায় করার নির্দেশ তিনি মুসলমানদেরকে প্রদান করবেন। সুতরাং আজ যেসব মুনাফিক গোপনীয়ভাবে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে সংযোগ স্থাপন করছে এবং নেচে কুদে বেড়াচ্ছে, সেদিন এ চালাকির জন্যে তাদেরকে রক্তাশ্রু বহাতে হবে। তাদের পর্দা সেদিন খুলে যাবে। ঐ সময় মুসলমানরা তাদের এ চক্রান্তের উপর বিস্ময়বোধ করবে এবং বলবেঃ আরে! এরা কি ওরাই, যারা আমাদেরকে শপথ করে করে বলতো যে, তারা অমাদের সাথেই আছে! তারা যা কিছু করেছিল সব বিনষ্ট হয়ে গেল। (আরবী) তো হচ্ছে জমহরের কিরআত। (আরবী) ছাড়াও একটি কিরআত রয়েছে। মদীনাবাসীর কিরআত এটাই। ইয়াকুলু হচ্ছে মুবতাদা এবং এর অন্য কিরআত ইয়াকুলা আছে। তাহলে এটা ফাআসা এর উপর আতফ হবে। এটা যেন ওয়া আঁইয়াকুলা ছিল। মদীনাবাসীর মতে এই আয়াতগুলোর শানে নকূল এই যে, উহুদ যুদ্ধের পর একটি লোক বলে- “আমি এ ইয়াহূদীর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছি, যাতে সুযোগ আসলে আমি এর দ্বারা উপকৃত হতে পারি।” অপর একটি লোক বললোঃ “আমি অমুক খ্রীষ্টানের নিকট গমনাগমন করে থাকি এবং তার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে আমি তাকে সাহায্য করবো।” তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।

ইকরামা (রঃ) বলেন যে, লুবাবাহ ইবনে মুনযিরের ব্যাপারে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। যখন নবী (সঃ) তাঁকে বানু কুরাইযার নিকট প্রেরণ করেন তখন তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করবেন? তখন তিনি স্বীয় গলদেশের প্রতি ইঙ্গিত করেন অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিতে বলেনঃ “তিনি তোমাদের সকলকে হত্যা করবেন।”

একটি বর্ণনায় আছে যে, এ আয়াতগুলো আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত উবাদাহ্ ইবনে সামিত (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ বহু ইয়াহদীর সাথে আমার বন্ধুত্ব আছে, কিন্তু তাদের সবারই বন্ধুত্ব ভেঙ্গে দিলাম। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বন্ধুত্বই আমার জন্যে যথেষ্ট। তখন ঐ মুনাফিক (আবদুল্লাহ ইবনে উবাই) বললোঃ আগা-পিছা চিন্তা করা আমার অভ্যাস। আমার দ্বারা এটা হতে পারে না। বলা যায় না কোন সময় কি হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবদুল্লাহ! তুমি উবাদা। (রাঃ) হতে খুবই নিম্নস্তরে নেমে গেছ।” ঐ সময় এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।

আর একটি বর্ণনায় আছে যে, বদর যুদ্ধে যখন মুশকিরদের পরাজয় ঘটে তখন কতক মুসলমান তাদের সাথে বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ ইয়াহূদীদেরকে বললেনঃ “তোমাদের পরিণামও এরূপই হবে। সুতরাং এর পূর্বেই তোমরা সত্য ধর্ম (ইসলাম) কবুল করে নাও।” উত্তরে তারা বললোঃ “যুদ্ধবিদ্যায় অনভিজ্ঞ কতক কুরাইশের উপর জয়লাভ করে অহংকারে মেতে ওঠো না। যদি আমাদের সাথে যুদ্ধের পালা পড়ে তবে যুদ্ধ কাকে বলে তা জেনে নেবে। সেই সময় হযরত উবাদা (রাঃ) ও আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর মধ্যে ঐ কথোপকথন হয় যা উপরে বর্ণিত হলো।

যখন ইয়াহুদীদের এ গোত্রের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ বাঁধে এবং আল্লাহ পাকের অনুগ্রহে মুসলমানরা জয়।ভ করেন তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে থাকেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বন্ধুদের ব্যাপারে আমার উপর অনুগ্রহ করুন। এ লোকগুলো খাযরা গোত্রের সঙ্গী ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার বললো। তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সে তখন তাঁর অঞ্চল ধরে লটকে গেল। তিনি রাগতঃ স্বরে বললেনঃ “ছেড়ে দাও।` সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! না, আমি ছাড়বো না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। তাদের দল খুবই বড় এবং আজ পর্যন্ত তারা আমার পক্ষ অবলম্বন করে আসছে। আর একদিনেই তারা ধ্বংসের ঘাটে অবতরণ করছে! আমার তো খুব ভয় হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে হয় তো আমাদেরকে কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।” অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যাও, ঐ সব কিছু তোমারই জন্যে অবধারিত।” অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন বান্ কাইনুকার ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে যুদ্ধ করে এবং আল্লাহ তাদেরকে পরাজয়ের গ্লানি ভোগ করান, তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। কিন্তু হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) তাদের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও তাদের পক্ষে সুপারিশ করতে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন। তখন ‘হুমুল গালেবুনা পর্যন্ত আয়াতগুলো। অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে দেখতে যান এবং বলেনঃ “আমি তো তোমাকে বারবার ঐ ইয়াহূদীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে নিষেধ করেছিলাম। তখন সে বললোঃ “সা’দ ইবনে যারারা’ (রাঃ) তো তাদের সাথে শত্রুতা করতেন, তথাপি তিনি তো মারা গেছেন।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।