সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 41)
হরকত ছাড়া:
يا أيها الرسول لا يحزنك الذين يسارعون في الكفر من الذين قالوا آمنا بأفواههم ولم تؤمن قلوبهم ومن الذين هادوا سماعون للكذب سماعون لقوم آخرين لم يأتوك يحرفون الكلم من بعد مواضعه يقولون إن أوتيتم هذا فخذوه وإن لم تؤتوه فاحذروا ومن يرد الله فتنته فلن تملك له من الله شيئا أولئك الذين لم يرد الله أن يطهر قلوبهم لهم في الدنيا خزي ولهم في الآخرة عذاب عظيم ﴿٤١﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا الرَّسُوْلُ لَا یَحْزُنْکَ الَّذِیْنَ یُسَارِعُوْنَ فِی الْکُفْرِ مِنَ الَّذِیْنَ قَالُوْۤا اٰمَنَّا بِاَفْوَاهِهِمْ وَ لَمْ تُؤْمِنْ قُلُوْبُهُمْ ۚۛ وَ مِنَ الَّذِیْنَ هَادُوْا ۚۛ سَمّٰعُوْنَ لِلْکَذِبِ سَمّٰعُوْنَ لِقَوْمٍ اٰخَرِیْنَ ۙ لَمْ یَاْتُوْکَ ؕ یُحَرِّفُوْنَ الْکَلِمَ مِنْۢ بَعْدِ مَوَاضِعِهٖ ۚ یَقُوْلُوْنَ اِنْ اُوْتِیْتُمْ هٰذَا فَخُذُوْهُ وَ اِنْ لَّمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوْا ؕ وَ مَنْ یُّرِدِ اللّٰهُ فِتْنَتَهٗ فَلَنْ تَمْلِکَ لَهٗ مِنَ اللّٰهِ شَیْئًا ؕ اُولٰٓئِکَ الَّذِیْنَ لَمْ یُرِدِ اللّٰهُ اَنْ یُّطَهِّرَ قُلُوْبَهُمْ ؕ لَهُمْ فِی الدُّنْیَا خِزْیٌ ۚۖ وَّ لَهُمْ فِی الْاٰخِرَۃِ عَذَابٌ عَظِیْمٌ ﴿۴۱﴾
উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহাররাছূলুলা-ইয়াহযুনকাল্লাযীনা ইউছা-রি‘ঊনা ফিল কুফরি মিনাল্লাযীনা কালূ আ-মান্না-বিআফওয়া-হিহিম ওয়া লাম তু’মিন কুলূবুহুম ওয়া মিনাল্লাযীনা হা-দু ছাম্মা-‘ঊনা লিলকাযিবি ছাম্মা-‘ঊনা লিকাওমিন আ-খারীনা লাম ইয়া’তূকা ইউহাররিফূনাল কালিমা মিম বা‘দি মাওয়া-দি‘ইহী ইয়াকূলূনা ইন ঊতীতুম হা-যাফাখুযূহু ওয়া ইল্লাম তু’তাওহু ফাহযারূ ওয়া মাইঁ ইউরিদিল্লা-হু ফিতনাতাহূফালান তামলিকা লাহূমিনাল্লা-হি শাইআন উলাইকাল্লাযীনা লাম ইউরিদিল্লা-হু আইঁ ইউতাহহিরা কুলূবাহুম লাহুম ফিদ দুনইয়া-খিযইউওঁ ওয়া লাহুম ফিল আ-খিরাতি ‘আযা-বুন আজীম।
আল বায়ান: হে রাসূল, তোমাকে যেন তারা চিন্তিত না করে, যারা কুফরে দ্রুত ছুটছে- তাদের থেকে, যারা তাদের মুখে বলে ‘ঈমান এনেছি’ কিন্তু তাদের অন্তর ঈমান আনেনি। আর যারা ইয়াহূদী তারা মিথ্যা অধিক শ্রবণকারী, অন্যান্য কওমের প্রতি, যারা তোমার নিকট আসেনি তাদের পক্ষে তারা কান পেতে থাকে। তারা শব্দগুলোকে যথাযথ সুবিন্যস্ত থাকার পরও আপন স্থান থেকে বিকৃত করে। তারা বলে, ‘যদি তোমাদেরকে এটি প্রদান করা হয়, তবে গ্রহণ কর। আর যদি তা তোমাদেরকে প্রদান না করা হয়, তাহলে বর্জন কর’; আর আল্লাহ যাকে ফিতনায় ফেলতে চান, তুমি তার পক্ষে আল্লাহর বিরুদ্ধে কিছুরই ক্ষমতা রাখ না। এরাই হচ্ছে তারা, যাদের অন্তরসমূহকে আল্লাহ পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪১. হে রাসূল! আপনাকে যেন তারা চিন্তিত না করে যারা কুফরীর দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়---যারা মুখে বলে, ‘ঈমান এনেছি’ অথচ তাদের অন্তর ঈমান আনেনি(১)-এবং যারা ইয়াহুদী(২) তারা (সকলেই) মিথ্যা শুনতে অধিক তৎপর(৩), আপনার কাছে আসে নি এমন এক ভিন্ন দলের পক্ষে যারা কান পেতে থাকে(৪)। শব্দগুলো যথাযথ সুবিন্যস্ত থাকার পরও তারা সেগুলোর অর্থ বিকৃত করে।(৫) তারা বলে, এরূপ বিধান দিলে গ্রহণ করো এবং সেরূপ না দিলে বর্জন করো।(৬) আর আল্লাহ যাকে ফিতনায় ফেলতে চান তার জন্য আল্লাহর কাছে আপনার কিছুই করার নেই। এরাই হচ্ছে তারা যাদের হৃদয়কে আল্লাহ বিশুদ্ধ করতে চান না; তাদের জন্য আছে দুনিয়ায় লাঞ্ছনা, আর তাদের জন্য রয়েছে আখেরাতে মহাশাস্তি।
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে রসূল! কুফরীর ব্যাপারে তাদের প্রতিযোগিতা যেন তোমাকে দুঃখ না দেয়, যারা মুখে বলে ঈমান এনেছি কিন্তু তাদের অন্তর ঈমান আনেনি। আর যারা ইয়াহূদী, তারা মিথ্যা কথা শুনতে বিশেষ পারদর্শী, তারা তোমার কথাগুলো অন্য সম্প্রদায়ের স্বার্থে কান পেতে শোনে যারা তোমার নিকট (কখনো) আসেনি, এরা আল্লাহর কিতাবের শব্দগুলোকে প্রকৃত অর্থ হতে বিকৃত করে। তারা বলে, তোমরা এ রকম নির্দেশপ্রাপ্ত হলে মানবে, আর তা না হলে বর্জন করবে। বস্তুত আল্লাহই যাকে ফিতনায় ফেলতে চান, তার জন্য আল্লাহর কাছে তোমার কিছুই করার নেই। ওরা হল সেই লোক, যাদের অন্তরাত্মাকে আল্লাহ পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্য দুনিয়াতে আছে লাঞ্ছনা, আর তাদের জন্য আখেরাতে আছে মহা শাস্তি।
আহসানুল বায়ান: (৪১) হে রসূল! যারা মুখে বলে, ‘বিশ্বাস করেছি’ কিন্তু অন্তরে বিশ্বাসী নয় ও যারা ইয়াহুদী হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসে তৎপর, তাদের আচরণ যেন তোমাকে দুঃখ না দেয়।[1] ওরা মিথ্যা শ্রবণে (ও অনুসরণে) অত্যন্ত আগ্রহশীল, যে সম্প্রদায় তোমার নিকট আসেনি, ওরা তাদের জন্য (তোমার কথায়) কান পেতে (গোয়েন্দাগিরি করে) থাকে। (তাওরাতের) বাক্যগুলিকে ওর স্বস্থান হতে পরিবর্তন করে। তারা বলে, ‘এ প্রকার (বিকৃত বিধান) দিলে গ্রহণ কর এবং এ (বিকৃত বিধান) না দিলে বর্জন কর।’[2] আর আল্লাহ যার পথচ্যুতি চান, তার জন্য আল্লাহর নিকট তোমার কিছুই করার নেই। ঐ সকল লোকের হৃদয়কে আল্লাহ বিশুদ্ধ করতে চান না। তাদের জন্য আছে ইহকালে লাঞ্ছনা ও পরকালে মহাশাস্তি।
মুজিবুর রহমান: হে রাসূল! যারা দৌড়ে দৌড়ে কুফরীতে পতিত হয় তাদের এই কাজ যেন তোমাকে চিন্তিত না করে, তারা ঐ সব লোকের মধ্য থেকেই হোক যারা নিজেদের মুখেতো (মিছামিছি) বলেঃ আমরা ঈমান এনেছি; অথচ তাদের অন্তর বিশ্বাস করেনি, অথবা তারা সেই সব ইয়াহুদী যারা মিথ্যা কথা শুনতে অভ্যস্ত, তারা তোমার কথাগুলি অন্য সম্প্রদায়ের জন্য কান পেতে শোনে; সেই সম্প্রদায়ের অবস্থা এরূপ যে, তারা তোমার নিকট আসেনি (বরং অন্যকে পাঠিয়েছে); তারা কালামকে ওর স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে থাকে। তারা বলেঃ যদি তোমরা (সেখানে গিয়ে) এই (বিকৃত) বিধান পাও তাহলে তা কবূল করবে, আর যদি এই (বিকৃত) বিধান না পাও তাহলে বিরত থাকবে। আল্লাহ যাকে পরীক্ষায় ফেলার ইচ্ছা করেন তুমি তার জন্য আল্লাহর সাথে কোন কিছুই করার অধিকারী নও; তারা এরূপ যে, তাদের অন্তরগুলি পবিত্র করা আল্লাহর অভিপ্রায় নয়; তাদের জন্য দুনিয়ায় রয়েছে অপমান এবং আখিরাতেও তাদের জন্য রয়েছে ভীষণ শাস্তি।
ফযলুর রহমান: হে রসূল! যারা কুফরির দিকে ধাবিত হয় তাদের আচরণে তুমি যেন দুঃখ না পাও। এদের মধ্যে একদল আছে যারা মুখে বলে, “আমরা ঈমান এনেছি” অথচ তাদের অন্তরে ঈমান নেই। আবার ইহুদিদের মধ্যে একদল আছে যারা মিথ্যা শুনতে আগ্রহী, তারা অন্য একদল লোকের কথাও শুনছে যারা তোমার কাছে আসেনি। ওরা শব্দসমূহের সঠিক অর্থ বিকৃত করে। ওরা (ওদের চরদের) বলে, “তোমাদেরকে যদি এটা দেওয়া হয় তাহলে তা নেবে আর যদি তা না দেওয়া হয় তাহলে দূরে থাকবে।” আসলে আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট রাখতে চান তার জন্য তুমি আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না। ওরা হল সেইসব লোক যাদের অন্তর আল্লাহ বিশুদ্ধ করতে চান না। তাদের জন্য পৃথিবীতে আছে লাঞ্ছনা আর পরকালে রয়েছে ভয়ানক শাস্তি।
মুহিউদ্দিন খান: হে রসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলেঃ আমরা মুসলমান, অথচ তাদের অন্তর মুসলমান নয় এবং যারা ইহুদী; মিথ্যাবলার জন্যে তারা গুপ্তচর বৃত্তি করে। তারা অন্যদলের গুপ্তচর, যারা আপনার কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে। তারা বলেঃ যদি তোমরা এ নির্দেশ পাও, তবে কবুল করে নিও এবং যদি এ নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেকো। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার জন্যে আল্লাহর কাছে আপনি কিছু করতে পারবেন না। এরা এমনিই যে, আল্লাহ এদের অন্তরকে পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্যে রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং পরকালে বিরাট শাস্তি।
জহুরুল হক: হে প্রিয় রসূল! যারা অবিশ্বাসের অভিমুখে ধাওয়া করেছে তারা যেন তোমাকে দুঃখিত না করে, যারা তাদের মুখে বলে -- 'আমরা ঈমান এনেছি’, কিন্তু তাদের হৃদয় ঈমান আনে নি, আর যারা ইহুদীয় মত পোষণ করে, -- মিথ্যার জন্যে শ্রবণকারী, শ্রবণকারী অন্য লোকদের জন্যে যারা তোমার কাছে আসে না। তারা কথাগুলো সরিয়ে দেয় সেগুলোকে যথাস্থানে স্থাপনের পরে, তারা বলে -- "তোমাদের যদি এই দেওয়া হয় তবে তা গ্রহণ করো, আর যদি তোমাদের এই দেয়া না হয় তবে সাবধান হও।" আর যাকে তার প্রলোভনের মধ্যে আল্লাহ্ চান, তার জন্য আল্লাহ্র কাছ থেকে কিছু করার ক্ষমতা তোমার নেই। এরাই তারা যাদের সন্বন্ধে আল্লাহ্ চান না যে তাদের হৃদয় বিশুদ্ধ হোক। এদের জন্য এই দুনিয়াতে রয়েছে দুর্গতি, আর পরকালে এদের জন্য কঠোর শাস্তি।
Sahih International: O Messenger, let them not grieve you who hasten into disbelief of those who say, "We believe" with their mouths, but their hearts believe not, and from among the Jews. [They are] avid listeners to falsehood, listening to another people who have not come to you. They distort words beyond their [proper] usages, saying "If you are given this, take it; but if you are not given it, then beware." But he for whom Allah intends fitnah - never will you possess [power to do] for him a thing against Allah. Those are the ones for whom Allah does not intend to purify their hearts. For them in this world is disgrace, and for them in the Hereafter is a great punishment.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪১. হে রাসূল! আপনাকে যেন তারা চিন্তিত না করে যারা কুফরীর দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়---যারা মুখে বলে, ‘ঈমান এনেছি’ অথচ তাদের অন্তর ঈমান আনেনি(১)-এবং যারা ইয়াহুদী(২) তারা (সকলেই) মিথ্যা শুনতে অধিক তৎপর(৩), আপনার কাছে আসে নি এমন এক ভিন্ন দলের পক্ষে যারা কান পেতে থাকে(৪)। শব্দগুলো যথাযথ সুবিন্যস্ত থাকার পরও তারা সেগুলোর অর্থ বিকৃত করে।(৫) তারা বলে, এরূপ বিধান দিলে গ্রহণ করো এবং সেরূপ না দিলে বর্জন করো।(৬) আর আল্লাহ যাকে ফিতনায় ফেলতে চান তার জন্য আল্লাহর কাছে আপনার কিছুই করার নেই। এরাই হচ্ছে তারা যাদের হৃদয়কে আল্লাহ বিশুদ্ধ করতে চান না; তাদের জন্য আছে দুনিয়ায় লাঞ্ছনা, আর তাদের জন্য রয়েছে আখেরাতে মহাশাস্তি।
তাফসীর:
(১) এরা হচ্ছে মুনাফিক। তারা মুখে ঈমানের কথা বললেও অন্তরে ঈমানের কোন অস্তিত্ব নেই। তারা মিথ্যা শুনতে অভ্যস্ত। [ইবন কাসীর]
(২) প্রাচীন কাল থেকেই ইয়াহুদীরা কখনো স্বজন-প্রীতির বশবর্তী হয়ে এবং কখনো নাম-যশ ও অর্থের লোভে ফতোয়াপ্রার্থীদের মনমত ফতোয়া তৈরী করে দিত। বিশেষতঃ অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে এটিই ছিল তাদের সাধারণ প্রচলিত পদ্ধতি। কোন ধনী ব্যক্তি অপরাধ করলে তারা তাওরাতের গুরুতর শাস্তিকে লঘু শাস্তিতে পরিবর্তন করে দিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করলেন এবং ইসলামের অভূতপূর্ব সুন্দর ব্যবস্থা ইয়াহুদীদের সামনে এল, তখন তারা একে একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইল।
যেসব ইয়াহুদী তাওরাতের কঠোর শাস্তিসমূহকে পরিবর্তন করে সহজ করে নিত, তারা এ জাতীয় মোকাদ্দমায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিচারক নিযুক্ত করতে প্রয়াস পেত- যাতে একদিকে ইসলামের সহজ ও নরম বিধি-বিধান দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং অন্য দিকে তাওরাত পরিবর্তন করার অপরাধ থেকেও অব্যাহতি পাওয়া যায়। কিন্তু এ ব্যাপারেও তারা একটি দুস্কৃতির আশ্রয় নিত। নিয়মিত বিচারক নিযুক্ত করার পূর্বে কোন না কোন পস্থায় মোকাদ্দমার রায় ফতোয়া হিসাবে জেনে নিতে চাইত। উদ্দেশ্য এ রায় তাদের আকাঙ্খিত রায়ের অনুরূপ হলে বিচারক নিযুক্ত করবে, অন্যথায় নয়। এসব কিছুই তাদের অন্তরের কলুষতা প্রমাণ করত। [দেখুন, তাফসীর সা’দী]
বারা ইবন আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশ দিয়ে এক ইয়াহুদীকে মুখ কালো ও বেত্ৰাঘাত করা অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তিনি তাদেরকে ডেকে বললেন, তোমরা কি ব্যভিচারের শাস্তি এরকমই তোমাদের কিতাবে পাও? তারা বললঃ হ্যাঁ। তখন তিনি তাদের আলেমদের একজনকে ডেকে বললেন, “যে আল্লাহ মূসার উপর তাওরাত নাযিল এটাই ব্যভিচারের শাস্তি? সে বলল, না। তবে যদি আপনি আমাকে এর দোহাই দিয়ে জিজ্ঞেস না করতেন, তাহলে আমি কখনই তা বলতাম না। আমাদের কিতাবে আমরা এর শাস্তি হিসেবে ‘প্রস্তারাঘাতকেই দেখতে পাই। কিন্তু এটা আমাদের সমাজের উঁচু শ্রেণীর মধ্যে বৃদ্ধি পায়।
ফলে আমাদের উঁচু শ্রেণীর কেউ সেটা করলে তাকে ছেড়ে দিতাম। আর নিম্নশ্রেণীর কেউ তা করলে তার উপর শরীআত নির্ধারিত হদ (তথা রজমের শাস্তি) প্রয়োগ করতাম। তারপর আমরা বললাম, আমরা এ ব্যাপারে এমন একটি বিষয়ে একমত হই যা আমাদের উঁচু-নীচু সকল শ্রেণীর উপর সমভাবে প্রয়োগ করতে পারি। তা থেকেই আমরা রজম বা প্রস্তারাঘাতের পরিবর্তে মুখ কালো ও চাবুক মারা নির্ধারণ করি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি প্রথম আপনার সেই মৃত নির্দেশকে বাস্তবায়ন করব, যখন তারা তা নিঃশেষ করে দিয়েছে। তখন তাকে রজম করার নির্দেশ দেয়া হল এবং তা বাস্তবায়িত হলো। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করলেন। [মুসলিম: ১৭০০]
(৩) অনুরূপভাবে ইয়াহুদীদেরও একটি বদভ্যাস হলো যে, তারা মিথ্যা ও ভ্রান্ত কথাবার্তা শোনাতে অভ্যস্ত। [ইবন কাসীর] এসব ইয়াহুদী তাদের ধর্মীয় আলেমদের দ্বারা তাওরাতের নির্দেশাবলীর প্রকাশ্য বিরুদ্ধাচরণ দেখা সত্বেও তারা তাদেরই অনুসরণ এবং তাদের বর্ণিত মিথ্যা ও অমূলক কিসসা-কাহিনীই শুনতে থাকত। দ্বীনে তাদের মজবুতির অভাবে যে কোন মিথ্যা বলার জন্য বলা হলে, তারা তাতে অগ্রণী হয়ে যেত। [সা’দী]
(৪) এখানেও ইয়াহুদী ও মুনাফিকদের দ্বিতীয় একটি বদঅভ্যাস বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এরা বাহ্যতঃ আপনার কাছে একটি দ্বীনী বিষয় জিজ্ঞেস করতে এসেছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ধর্ম তাদের উদ্দেশ্য নয় এবং ধর্মীয় বিষয় জানার জন্যেও আসে নি। বরং তারা এমন একটি ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের গুপ্তচর, যারা অহংকারবশতঃ আপনার কাছে আসেনি। তাদের বাসনা অনুযায়ী আপনার মত জেনে এরা তাদেরকে বলে দিতে চায়। এরপর মানা না মানা সম্পর্কে তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। [ইবন কাসীর]
(৫) ইয়াহুদীদের তৃতীয় একটি বদ অভ্যাস হচ্ছে, তারা আল্লাহর কালামকে যথার্থ পরিবেশ থেকে সরিয়ে তার ভুল অর্থ করত এবং আল্লাহর নির্দেশকে বিকৃত করত। এ বিকৃতি ছিল দ্বিবিধঃ তাওরাতের ভাষায় কিছু হেরফের করা এবং ভাষা ঠিক রেখে তদস্থলে অযৌক্তিক ব্যাখ্যা ও পরিবর্তন করা। ইয়াহুদীরা উভয় প্রকার বিকৃতিতেই অভ্যস্ত ছিল। [ইবন কাসীর]
(৬) অর্থাৎ ইয়াহুদীরা তাদের লোকদেরকে নবীজীর কাছে পাঠানোর সময় বলে দিত, যদি তোমাদেরকে ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে মুখ কালো ও চাবুক মারার কথা বলে তবে তোমরা গ্রহণ করো, আর যদি তোমাদেরকে রজম তথা পাথর মেরে হত্যার কথা বলে তবে সাবধান হয়ে যাবে, অর্থাৎ তা গ্রহণ করো না। [মুসলিম: ১৭০০]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪১) হে রসূল! যারা মুখে বলে, ‘বিশ্বাস করেছি’ কিন্তু অন্তরে বিশ্বাসী নয় ও যারা ইয়াহুদী হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসে তৎপর, তাদের আচরণ যেন তোমাকে দুঃখ না দেয়।[1] ওরা মিথ্যা শ্রবণে (ও অনুসরণে) অত্যন্ত আগ্রহশীল, যে সম্প্রদায় তোমার নিকট আসেনি, ওরা তাদের জন্য (তোমার কথায়) কান পেতে (গোয়েন্দাগিরি করে) থাকে। (তাওরাতের) বাক্যগুলিকে ওর স্বস্থান হতে পরিবর্তন করে। তারা বলে, ‘এ প্রকার (বিকৃত বিধান) দিলে গ্রহণ কর এবং এ (বিকৃত বিধান) না দিলে বর্জন কর।’[2] আর আল্লাহ যার পথচ্যুতি চান, তার জন্য আল্লাহর নিকট তোমার কিছুই করার নেই। ঐ সকল লোকের হৃদয়কে আল্লাহ বিশুদ্ধ করতে চান না। তাদের জন্য আছে ইহকালে লাঞ্ছনা ও পরকালে মহাশাস্তি।
তাফসীর:
[1] কাফের ও মুশরিকদের ঈমান গ্রহণ না করা এবং সঠিক পথ অবলম্বন না করার ফলে নবী (সাঃ) যে অস্থিরতা ও আক্ষেপের শিকার হয়েছিলেন, তার জন্য আল্লাহ নিজ নবীকে অধিক চিন্তা না করার নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে এ ব্যাপারে তিনি সান্ত্বনা পান যে এই লোকদের ব্যাপারে তিনি আল্লাহর নিকট জিজ্ঞাসিত হবেন না।
[2] ৪১ থেকে ৪৪নং আয়াতগুলির অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে দু’টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়; (ক) বিবাহিত ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী ইয়াহুদীর ঘটনা। এমনিতে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতের মধ্যে বহু পরিবর্তন সাধন করেছিল, তার উপর তার অনেক বিধান অনুযায়ী আমল করত না। তার মধ্যে (একটি বিধান) রজম বা পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার দন্ডবিধান; যা তাদের গ্রন্থে বিবাহিত ব্যভিচারী নারী-পুরুষের জন্য বিদ্যমান ছিল এবং যা আজও বিদ্যমান আছে। সুতরাং যেহেতু তারা এই শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে চাচ্ছিল, সেহেতু তারা আপোসে সিদ্ধান্ত নিয়ে বলল যে, ‘চল, আমরা মুহাম্মাদের নিকট যাই। তিনি যদি আমাদের মনগড়া শাস্তি দানের মতই চাবুক মেরে লাঞ্ছিত করার শাস্তির নির্দেশ দেন, তাহলে আমরা তা মান্য করে নেব। অন্যথা তিনি যদি রজম বা পাথর মেরে হত্যা করার নির্দেশ দেন, তাহলে আমরা তা মান্য করব না।’ আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেন; ইয়াহুদীগণ রসূল (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হল। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের তাওরাতে রজমের ব্যাপারে কি নির্দেশ রয়েছে?’ তারা বলল, ‘তাওরাতে ব্যভিচারের শাস্তি হিসাবে তাকে চাবুক মারা ও লাঞ্ছিত করার কথা উল্লেখ আছে।’ (এ কথা শুনে) আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) বললেন, ‘তোমরা মিথ্যা বলছ। তাওরাতে পাথর ছুঁড়ে হত্যার নির্দেশ রয়েছে। যাও, তাওরাত নিয়ে এসো দেখি!’ তারা তাওরাত নিয়ে এসে পড়তে শুরু করল বটে; কিন্তু রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়ে পূর্বাপর সমস্ত পড়ে শুনালো। আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) বললেন, ‘হাত সরিয়ে নাও!’ হাত সরালে দেখা গেল যে, সেখানে রজমের আয়াত বিদ্যমান রয়েছে। তখন তাদেরকেও স্বীকার করতেই হল যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) সত্যই বলছেন, তাওরাতে রজমের আয়াত আছে।(অতঃপর রসূল (সাঃ)-এর নির্দেশক্রমে) ব্যভিচারীদ্বয়কে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করে দেওয়া হল। (বুখারী ও মুসলিম এবং অন্যান্য হাদীসগ্রন্থ দ্রষ্টব্য)
(খ) একটি অন্য ঘটনাও বর্ণনা করা হয় যে, ইয়াহুদীদের একটি গোত্র অন্য গোত্র অপেক্ষা বেশী সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাসম্পন্ন মনে করত। আর এই কারণেই নিজেদের লোক খুন হলে অপর গোত্রের নিকট হতে একশ’ অসাক রক্তপণ দাবী করত। পক্ষান্তরে অন্য গোত্রের কেউ খুন হলে পঞ্চাশ অসাক রক্তপণ নির্ধারিত করত। যখন নবী (সাঃ) মদীনায় আগমন করলেন, তখন ইয়াহুদীদের দ্বিতীয় দল যাদের রক্তপণ অর্ধেক ছিল তারা উৎসাহ পেল। (অর্থাৎ তারা ভাবল যে, এবার আমরা ন্যায় বিচার পাব।) এবং তারা একশ’ অসাক রক্তপণ দিতে অস্বীকার করল। আর এ নিয়ে তাদের মধ্যে লড়াই শুরু হওয়ার উপক্রম ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে কয়েকজন বুদ্ধিমান লোক রসূল (সাঃ)-এর নিকট বিচার প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলে ঐ সময় এই আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়। যার মধ্যে একটি আয়াতে রক্তপণের বিধান সকলের জন্য সমান বলা হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ ১/২৪৬, আহমাদ শাকের হাদীসটির সূত্রকে সহীহ বলেছেন।) ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, সম্ভবতঃ উভয় ঘটনাই একই সময়ের এবং উক্ত সকল কারণের জন্যই আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়েছে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর:
শানে নুযূল:
৪১-৪৪ নং আয়াত পর্যন্ত অবতীর্ণ হবার কারণ হিসেবে দুটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়:
(১) বিবাহিত ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী ইয়াহূদীর ঘটনা। একদিকে তারা ধর্মগ্রন্থের মধ্যে বহু পরিবর্তন সাধন করেছিল। অন্যদিকে অনেক বিধান অমান্য করে চলত। তার অন্যতম একটি হল রজমের বিধান। তাদের মধ্যে বিবাহিত নারী পুরুষ ব্যভিচার করলে মনগড়া বিধান দিয়ে ফায়সালা দিত। রজম করত না। তারা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করত, উদ্দেশ্য ছিল যদি তাদের মনপুত মত ফায়সালা হয় তাহলে মানবে অন্যথায় মানবে না।
আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: ইয়াহূদীগণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করল। তারা তাদের দু’জন ব্যভিচারীর কথা উল্লেখ করল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তোমরা তাওরাতে রজমের বিষয়ে কিছু পেয়েছ? তারা বলল: ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে চাবুক মারা ও লাঞ্ছিত করার কথা আছে। (এ কথা শুনে) আবদুল্লাহ বিন সালাম বললেন, তোমরা মিথ্যা বলছ। তাওরাতে রজমের কথা আছে। তারা তাওরাত নিয়ে আসল এবং খুলে পাঠ করতে লাগল। তাদের একজন রজমের আয়াতের ওপর হাত রাখল, আর পূর্বাপর অংশ পাঠ করল। আবদুল্লাহ বিন সালাম বললেন, তোমার হাত উঠাও, তার হাত উঠাল। দেখা গেল সেখানে রজমের আয়াত রয়েছে। তারা বলল: সত্য বলেছেন হে মুহাম্মাদ! সেখানে রজমের আয়াত রয়েছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে রজম করার (পাথর মেরে হত্যার) নির্দেশ দিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩৬৩৫)
(২) ইয়াহূদীদের এক গোত্র অপর গোত্র অপেক্ষা বেশি মর্যাদাসম্পন্ন মনে করত। আর এ কারণেই এক গোত্রের লোক খুন হলে অপর গোত্রের নিকট একশত ওসাক রক্তপণ দাবী করত। আর অন্য গোত্রের কেউ খুন হলে পঞ্চাশ ওসাক রক্তপণ নির্ধারণ করত। যখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় আগমন করলেন, তখন যাদের পঞ্চাশ ওসাক রক্তপণ নির্ধারণ করা হত তারা খুশি হল যে, এবার তাদেরও একশত ওসাক রক্তপণ নির্ধারণ করা হবে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে লড়াই শুরু হবার উপক্রম হল। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ আহমাদ১/২৪৬,সহীহ) প্রথমটিই বেশি প্রাধান্যযোগ্য।
কাফির ও মুশরিকদের ঈমান গ্রহণ না করা এবং সঠিক পথ অবলম্বন না করার ফলে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুবই অস্থিরতা ও আক্ষেপের শিকার হয়েছিলেন, সে জন্য আল্লাহ তা‘আলা নিজে নাবীকে সান্ত্বনা দিয়ে অধিক চিন্তা না করার নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হন যে, এ লোকেদের ব্যাপারে তিনি আল্লাহ তা‘আলার কাছে জিজ্ঞাসিত হবেন না।
سَمَّاعُوْنَ
শব্দের অর্থ হল: অধিক শ্রবণকারী। এর দুটি অর্থ হতে পারে:
১. গুপ্তচর হিসেবে শ্রবণ করা।
২. অন্যের কথা মান্য ও গ্রহণ করার জন্য শ্রবণ করা।
কেউ প্রথমটি আবার কেউ দ্বিতীয় অর্থটি গ্রহণ করেছেন।
أسلموا ক্রিয়াপদটি نبيين (নাবীগণ) এর বিশেষণ। সকল নাবীগণই ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিলেন, যার দিকে নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাওয়াত দিয়েছেন। অর্থাৎ সকল নাবীদের ধর্ম এক ও অভিন্ন। আর ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি হল তাওহীদ। প্রত্যেক নাবী স্বজাতিকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَآ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا نُوْحِيْٓ إِلَيْهِ أَنَّه۫ لَآ إِلٰهَ إِلَّآ أَنَا فَاعْبُدُوْنِ)
“আমি তোমার পূর্বে যখন কোন রাসূল প্রেরণ করেছি তার প্রতি এ ওয়াহী করেছি, ‘আমি ব্যতীত অন্য কোন সত্যিকার মা‘বূদ নেই; সুতরাং আমারই ইবাদত কর।’ (সূরা আম্বিয়াহ ২১:২৫)
(اَلَّذَيْنَ هَادُوْا)
আয়াতের এ অংশের সম্পর্ক يحكم (ফায়সালা দেবেন) ক্রিয়ার সাথে। অর্থাৎ যারা ইয়াহূদী তাদের ব্যাপারেও ফায়সালা দিতেন।
(وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ ....هُمُ الْكَافِرُوْنَ)
‘যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুসারে মীমাংসা করে না তারাই কাফির’এ আয়াতের ব্যাপারে মুফাসসিদের বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। এ বিধান কি মুসলিমদের ব্যাপারে না কাফিরদের ব্যাপারে? তাবেয়ী শা‘বী (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: এ বিধান মুসলিমদের ব্যাপারে। তাওস থেকেও এরূপ বর্ণনা রয়েছে।
কিন্তু কুফরী দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এমন কুফরী যা ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। শা‘বী (রহঃ) থেকে অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়, এ বিধান ইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন:
ليس الكفر الذي تذهبون إليه
এ কুফরীর দ্বারা সে কুফরী না যা তোমরা মনে কর। (ইবনু আবী হাতিম বর্ণনা করেছেন, ইমাম হাকিম বলেছেন: বর্ণনাটি বুখারী, মুসলিমের শর্তানুপাতে)
কোন কোন আলেম বলেছেন: কুরআন প্রমাণ করে এ আয়াত ইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। কেননা পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহূদীদের কথা উল্লেখ করেছেন যারা আল্লাহ তা‘আলার কালাম বিকৃত করেছে। আবার পরের আয়াতে তাদের কথাই উল্লেখ রয়েছে। এ মত পোষণ করেছেন বারা বিন আযেব, হুযাইফা বিন ইয়ামান, ইবনু আব্বাস (রাঃ), ইকরিমা ও হাসান বসরী (রহঃ)-সহ অনেকে।
ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন:
(وَمَنْ لَّمْ یَحْکُمْ بِمَآ اَنْزَلَ اللہُ فَاُولٰ۬ئِکَ ھُمُ الْکٰفِرُوْنَ ، الظَالِمُوْنَ وَ الفَاسِقُون)
কাফিরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। সহীহ মুসলিমে বারা বিন আযেব থেকে প্রমাণ রয়েছে। এ হিসেবে কোন মুসলিম কাবীরা গুনাহর কারণে কাফির হয় না।
আবার কেউ বলেছেন: এখানে কিছু কথা উহ্য রয়েছে যার অর্থ হল: যদি কেউ কুরআনকে প্রত্যাখ্যান ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণীকে অস্বীকার করতঃ আল্লাহ তা‘আলার নাযিলকৃত বিধান দ্বারা ফায়সালা না করে তাহলে সে কাফির। এ কথা ইবনু আব্বাস ও মুজাহিদও বলেছেন।
ইবনু মাসউদ (রাঃ) ও হাসান বসরী (রহঃ) বলেছেন: আয়াতটি মুসলিম, ইয়াহূদ ও কাফির সকলের জন্য ব্যাপক। যারাই আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত বিধান ছাড়া অন্য বিধান দ্বারা ফায়সালা করা বৈধ মনে করবে এবং সে অনুপাতে বিশ্বাস রাখবে তারাই কাফির।
এসব আলোচনার পর ইমাম শানক্বিতী (রহঃ) বলেন: জেনে রাখুন, এ আলোচ্য বিষয়ে সঠিক কথা হল- কুফর, জুলুম ও ফিসক (পাপাচার) প্রত্যেকটি শব্দ শরীয়তে অবাধ্য কাজ করা অর্থে ব্যবহার হয়, আবার ইসলাম থেকে বের করে দেয় এমন কুফরী কাজ করার অর্থেও ব্যবহার হয়। যদি এমন বিধান দ্বারা ফায়সালা করে যা রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ ও আল্লাহ তা‘আলার বিধানকে বাতিল করে দেয় তাহলে কুফর, জুলুম ও ফিসক (পাপাচার) প্রত্যেকটি ইসলাম থেকে বের করে দেয় এমন গুনাহর অর্থে ব্যবহার হবে। আর যদি তার বিশ্বাস থাকে সে হারাম কাজে লিপ্ত এবং অন্যায় করছে তাহলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে না, শুধু অপরাধী বলে গণ্য হবে। (তাফসীর আযওয়াউল বায়ান ২/৭১)
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. চিন্তা আসতে পারে এমন কর্ম থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে চিন্তা মুক্ত থাকা মুস্তাহাব।
২. মিথ্যা বলা ও শ্রবণ করা হারাম।
৩. আল্লাহ কথা বিকৃত করা এবং ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য অন্য কিছুর সাথে সাদৃশ্য দেয়া হারাম।
৪. মুসলিম বিচারকগণ কর্তৃক আহলে কিতাবদের বিবাদের বিচার করা ইচ্ছাধীন।
৫. ন্যায় বিচার করা ওয়াজিব। যদিও অমুসলিমদের মাঝে হয়।
৬. আল্লাহ তা‘আলার বিধান অস্বীকার করতঃ বা হেয় প্রতিপন্ন করতঃ অথবা তার সমপর্যায় মনে করে মানব রচিত বিধান দ্বারা ফায়সালা করা কুফরী কাজ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতসমূহে ঐ লোকদের নিন্দে করা হচ্ছে যারা স্বীয় অভিমত, কিয়াস এবং প্রবৃত্তিকে আল্লাহর শরীয়তের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য পরিত্যাগ করে কুফরীর দিকে দৌড়ে যায়। তারা মুখে শুধু ঈমানের দাবী করে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর ঈমান শূন্য। মুনাফিকদের অবস্থা তো এটাই যে, তারা মুখে খুব সাধুতা প্রকাশ করে, কিন্তু অন্তর তাদের সম্পূর্ণ কপট।
ইয়াহূদীদের স্বভাবও তদ্রুপ। তারা ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু। তারা মিথ্যা ও বাজে কথা খুব মজা করে শুনে তাকে এবং অন্তরের সাথে ককূল করে থাকে। পক্ষান্তরে সত্য কথা থেকে তারা দূরে সরে থাকে, এমনকি ঘুণাও করে। তারা নবী (সঃ)-এর মজলিসে উপস্থিত হয় বটে, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য থাকে মুসলমানদের গোপনীয় কথা নিজেদের মধ্যে নিয়ে যাওয়া, তাদের পক্ষ থেকে তারা গুপ্তচরের কাজ করে। সবচেয়ে বড় দুষ্টুমি তাদের এই যে, তারা কথাকে বদলিয়ে দেয়। ভাবার্থ হবে একরূপ, কিন্তু তারা অন্য অর্থ করে জনগণের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেয়। উদ্দেশ্য এই যে, সেটা যদি তাদের মর্জি মোতাবেক হয় তবে তো মানবে, আর উল্টো হলে তা থেকে দূরে থাকবে। কথিত আছে যে, এ আয়াত ঐ সব ইয়াহূদীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা একে অপরকে হত্যা করেছিল। অতঃপর তারা পরস্পর বলাবলি করে-“চল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি। যদি তিনি রক্তপণ ও জরিমানার নির্দেশ দেন তবে তো মনে নেবো। আর যদি কিসাস বা হত্যার বদলে হত্যার নির্দেশ দেন তবে মানবো না।” কিন্তু সর্বাধিক সঠিক কথা এই যে, তারা এক ব্যভিচারিণী মহিলাকে নিয়ে এসেছিল। তাদের কিতাব তাওরাতে তো এ হুকুমই ছিল যে, ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিণী বিবাহিত বা বিবাহিতা হলে তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করে দিতে হবে। কিন্তু তারা এটাকে বদলিয়ে দিয়েছিল এবং একশ চাবুক মেরে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং গাধায় উল্টো করে সওয়ার করিয়ে লাঞ্ছিত করতো। আর এরূপ শাস্তি দিয়েই ছেড়ে দিতে। নবী (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের পর তাদের কোন একজন ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী হয়ে গ্রেফতার হয়। তখন তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “চল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করি। যদি তিনি আমাদের শাস্তি দানের মতই শাস্তির নির্দেশ দেন তবে আমরা তা মেনে নেবো এবং আল্লাহর কাছেও এটা আমাদের জন্যে সনদ হয়ে যাবে। আর যদি রজম বা পাথর নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ দেন তবে তা মানবো না।” সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে বললোঃ “আমাদের এক মহিলা ব্যভিচার করেছে। তার ব্যাপারে আপনি কি নির্দেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেনঃ ‘তোমাদের তাওরাতে কি নির্দেশ রয়েছে? তারা বললোঃ “আমরা তাকে লাঞ্ছিত করি এবং চাবুক মেরে ছেড়ে দেই।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “তোমরা মিথ্যা কথা বলছে। তাওরাতে পাথর নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ রয়েছে, তাওরাত নিয়ে এসে দেখি।” তারা তাওরাত খুলে দিল বটে, কিন্তু রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়ে পূর্বাপর সমস্ত পড়ে শুনালো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) সব কিছু বুঝে ফেললেন এবং তাদেরকে বললেন, হাত সরিয়ে নাও। হাত সরালে দেখা গেল যে, সেখানে রজমের আয়াত বিদ্যমান রয়েছে। তখন তাদেরকেও স্বীকার করতে হলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে ব্যভিচারীদ্বয়কে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করে দেয়া হলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আমি দেখলাম যে, ব্যভিচারী পুরুষ লোকটি ব্যভিচারিণী মহিলাটিকে পাথর থেকে বাঁচাবার জন্যে আড়াল হয়ে দাড়িয়েছিল।
অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা বলেছিল, আমরা তো তাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং কিছু মারপিট করে ছেড়ে দেই।' অতঃপর রজমের আয়াত প্রকাশ হওয়ার পর তারা বলে, রয়েছে তো এ হুকুমই কিন্তু আমরা তা গোপন করে রেখেছিলাম।' যে পাঠ করেছিল সে-ই রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়েছিল। যখন তার হাত সরিয়ে ফেলা হলো তখন রজমের আয়াত প্রকাশ হয়ে পড়লো। এ দু’জনকে রজমকারীদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমারও (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ইয়াহূদীরা লোক পাঠিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ডেকে নিয়েছিল। তারা তাকে তাদের শিক্ষাগারে গদির উপর বসিয়েছিল। তাদের যে লোকটি তাওরাত পাঠ করেছিল সে তাওরাতের বড় পণ্ডিত ছিল। আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কসম দিয়ে বলেছিলেনঃ ‘তোমরা তাওরাতে বিবাহিত ব্যভিচারীর কি শাস্তি দেখেছ?' তারা উপরোক্ত উত্তরই দিয়েছিল। কিন্তু একটি যুবক কিছুই না বলে নীরবে দাঁড়িয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করে পুনরায় কসম দিয়ে তাকে প্রশ্ন করলেন এবং উত্তর চাইলেন। সে বললো, “আপনি যখন এমন কসমই দিলেন তখন আমি মিথ্যা কথা বলবো না। বাস্তবিক তাওরাতে এ প্রকারের অপরাধীর শাস্তি প্রস্তরাঘাতে হত্যাই রয়েছে।” তিনি বললেনঃ “আচ্ছা তাহলে এটাও সত্যি করে বল যে, তোমরা সর্বপ্রথম এ রজমকে কার উপর থেকে উঠিয়ে দিয়েছ?” সে উত্তরে বললো, জনাব! আমাদের বাদশাহর কোন এক সম্ভ্রান্ত্র বংশীয় আত্মীয় ব্যভিচার করে। তার পদমর্যাদা এবং বাদশাহী প্রভাবের ফলে তাকে রজম করা হয়নি। তারপর এক সাধারণ লোক ব্যভিচার করে। তাকে রজম করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তার গোত্রের সমস্ত লোক প্রতিবাদ করে বলে, পূর্ববর্তী লোকটিকেও রজম করতে হবে, না হলে একেও ছেড়ে দিতে হবে। তখন আমরা সবাই মিলে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, এ ধরনের কোন শাস্তি নির্ধারণ করা হোক। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাওরাতের হুকুমকেই জারী করেন। এ ব্যাপারেই (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ আহকাম জারীকারীদের অন্তর্ভুক্ত। (মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে আবি দাউদ)
মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, ইয়াহূদীরা একটি লোককে চুনকালি মাখাবার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিল এবং তারা তাকে চাবুকও মারছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। তারা উত্তরে বলে, “এ লোকটি ব্যভিচার করেছে।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন-“তোমাদের বিধানে কি ব্যভিচারের শাস্তি এটাই?` তারা উত্তর দিলো, হ্যা। তিনি তখন তাদের এক আলেমকে ডাকলেন এবং তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তখন সে বললো, “আপনি যদি আমাকে এরূপ কসম না দিতেন তবে আমি কখনও বলতাম না। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমাদের বিধানে বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি প্রস্তরাঘাতে হত্যাই বটে। কিন্তু আমীরুল উমারা ও সম্ভ্রান্ত লোকদের মধ্যে এ পাপকার্য খুব বেশী ছড়িয়ে পড়লে তাদেরকে এ ধরনের শাস্তি দেয়া আমরা সমীচীন মনে করলাম না। তাই তাদেরকে তো ছেড়ে দিতাম। আর আল্লাহর নির্দেশও যাতে বৃথা না যায় তজ্জন্য দরিদ ও কম মর্যাদা সম্পন লোকদেরকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করে দিতাম। তারপর আমরা পরামর্শ করলাম যে, এমন এক শাস্তি নির্ধারণ করা যাক যা ধনী-গরীব, ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সকলের উপর সমানভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। অবশেষে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে চাবুক মারা হবে।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দিয়ে বলেনঃ “তাদের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা করে ফেল।' সুতরাং তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করে ফেলা হয়। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি প্রথম ঐ ব্যক্তি যে আপনার একটি মৃত হুকুমকে জীবিত করলো।” তখন (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ ইয়াহূদীদেরই সম্পর্কে অন্য আয়াতে রয়েছে- ‘আল্লাহর নাযিলকৃত হুকুম অনুযায়ী যারা মীমাংসা করে না তারা অত্যাচারী।' অন্য আয়াতে ফাসিক শব্দ রয়েছে। (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি) অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ব্যভিচারের ঘটনাটি ফিদকে ঘটেছিল। সেখানকার ইয়াহূদীরা মদীনার ইয়াহূদীদের নিকট একজন আলেমকে পাঠিয়ে ব্যভিচারের শাস্তি জানতে চেয়েছিল। তথাকার যে আলেমটি মদীনায় এসেছিল তার নাম ছিল ইবনে সূরিয়া। তার চক্ষু টেরা ছিল। তার সাথে আর একজন আলেমও ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কসম দিলে তারা দুজনই তা কবূল করেছিল। তিনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহর কসম দিচ্ছি যিনি বানী ইসরাঈলের জন্যে পানিতে রাস্তা করে দিয়েছিলেন, তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া। করেছিলেন, তাদেরকে ফিরাউন থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং তাদের উপর মান’ ও সালওয়া’ অবতীর্ণ করেছিলেন।” এ কসমে তারা চমকে ওঠে এবং পরস্পর বলাবলি করে, এটাতো বড়ই কঠিন কসম। এরূপ স্থলে মিথ্যে বলা মোটেই ঠিক হবে না। তাই তারা বললো, জনাব! তাওরাতে রয়েছে যে, খারাপ নযরে দেখাও যেনাতুল্য, গলায় গলায় মিলনও যেনার মত এবং চুম্বন দেয়াও যেনাতুল্য। যদি এর উপর চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেয় যে, তারা পুংঙ্গিলকে স্ত্রীলিঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করতে ও বের হতে দেখেছে, যেমন শলাকা সুরমাদানীর ভেতর যাতায়াত করে, তবে রজম বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা ওয়াজিব হয়ে যাবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ মাসআলা তো এটাই। অতঃপর তিনি উক্ত যেনাকার পুরুষ ও নারীকে রজম করে দেয়ার নির্দেশ দেন। সেই সময় (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদি) আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, যে দু’জন আলেমকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে আনয়ন করা হয়েছিল, তারা ছিল সূরিয়ার দুইপুত্র। এ বর্ণনায় ইয়াহুদীদের হদ পরিত্যাগ করার কারণ তাদের পক্ষ থেকে নিম্নরূপ বর্ণনা করা হয়েছে- আমাদের মধ্যে যখন সালতানাত বা রাজত্ব রইলো না তখন আমরা আমাদের লোকদেরকে হত্যা করা সমীচীন মনে করলাম না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাক্ষীদেরকে ডাকিয়ে নিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তারা বলে, আমরা তাদের দু'জনকে এ কু-কাজ করতে স্পষ্টভাবে দেখেছি, যেমনভাবে শলাকা সুরমাদানীর ভেতর প্রবেশ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তাওরাত ইত্যাদি চেয়ে পাঠানো এবং তাদের আলেমদেরকে ডেকে পাঠাননা তাদেরকে দোষারোপ করার উদ্দেশ্যে ছিল না এবং উদ্দেশ্য এটাও ছিল না যে, তারা ওটা মানবার মুকাল্লাফই নয়, বরং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশই অবশ্য পালনীয়। এটা দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল প্রথমতঃ তাঁর সত্যতা প্রকাশ। তা এই যে, তাওরাতেও যে এ নির্দেশই রয়েছে তা তিনি অহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন। আর প্রকাশ পেলও তা-ই। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে লজ্জিত করা যে, তারা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে তাদেরকে স্বীকার করতেই হলো এবং দুনিয়ায় এটা প্রকাশ পেয়ে গেলো যে, তারা আল্লাহর বিধানকে গোপনকারী এবং নিজেদের মত ও কিয়াসের উপর আমলকারী। তাছাড়া উদ্দেশ্য এও ছিল যে, ঐ ইয়াহূদীরা সরল মনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসেনি যে, তাঁর নির্দেশ মোতাবেক কাজ করবে। বরং তাদের আগমনের উদ্দেশ্য শুধু এই ছিল যে, যদি তিনিও তাদের ইজমা’ মোতাবেক নির্দেশ দেন তবে তারা মেনে নেবে, নচেৎ কিছুতেই মানবে না। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান তার সুপথ প্রাপ্তি কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তাদের অপবিত্র অন্তরকে পবিত্র করার আল্লাহর ইচ্ছাই নেই। তারা দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে ভীষণ শাস্তি।
বলা হচ্ছে-তারা মিথ্যা কথা কান লাগিয়ে শুনতে এবং হারাম বস্তু অর্থাৎ সুদ খেতে অভ্যস্ত। সুতরাং কিরূপে তাদের অপবিত্র অন্তর পবিত্র হবে? আর তাদের দুআই বা আল্লাহ কি করে শুনবেন? হে নবী (সঃ)! যদি তারা তোমার কাছে মীমাংসার জন্যে আসে তবে তাদের ফায়সালা করা না করার তোমার অধিকার রয়েছে। তুমি যদি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তথাপি তারা তোমার কোনই ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। কেননা, তাদের উদ্দেশ্য সত্যের অনুসরণ নয়, বরং নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ। কোন গুরুজন বলেন যে, এ আয়াতটি (আরবী) (৫:৪৯)-এ আয়াতটি দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! যদি তুমি তাদের মধ্যে মীমাংসা কর তবে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করো, যদিও এরা নিজেরা অত্যাচারী এবং আদল ও ইনসাফ থেকে বহু দূরে রয়েছে। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা ন্যায় বিচারকদেরকে ভালবাসেন।
অতঃপর ইয়াহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা, অন্তরের কলুষতা এবং বিরুদ্ধাচরণের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, একদিকে তো তারা আল্লাহ পাকের এ কিতাবকে ছেড়ে দিয়েছে যার আনুগত্য স্বীকার ও সত্যতার কথা তারা নিজেরাও স্বীকার করেছে। দ্বিতীয়তঃ তারা ঐ দিকে ঝুঁকে পড়েছে যাকে তারা নিজেরাও মানে না এবং ওটাকে মিথ্যা বলে ছড়িয়ে দিয়েছে। আবার সেখানেও তাদের নিয়ত ভাল নয়। কারণ তাদের উদ্দেশ্য এই যে, যদি সেখানে গিয়ে তাদের ইচ্ছা মোতাবেক হুকুম পায় তবে তো তা মেনে নেবে, নতুবা ছেড়ে দেবে। তাই, আল্লাহ তা'আলা নবী (সঃ)-কে বলেনঃ তারা কি করে তোমার হুকুম মানতে পারে? তারা তো তাওরাতকেও ছেড়ে দিয়েছে। তাতে আল্লাহর হুকুম রয়েছে, এটা তো তারাও স্বীকার করেছে, অথচ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
তারপর এ তাওরাতের প্রশংসা করা হচ্ছে যা তিনি স্বীয় মনোনীত রাসূল হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছিলেন। এর মধ্যে হিদায়াত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর হুকুমবাহী নবীগণ ওর মাধ্যমেই ফায়সালা করে থাকেন এবং ইয়াহূদীদের মধ্যে ওরই আহকাম জারী করেন। তারা ওর পরিবর্তন ও পরিবর্ধন থেকে বেঁচে থাকেন এবং আল্লাহওয়ালা লোকেরাও এ নীতির উপর থাকেন। কেননা, এ পবিত্র গ্রন্থ তাঁদেরকে সমর্পণ করা হয়েছিল এবং ওটা প্রকাশ করে দেয়া ও ওর উপর আমল করার তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তারা ওর উপর সাক্ষী ছিলেন।
ঘঘাষিত হচ্ছে-এখন তোমাদের উচিত যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় করবে না। তোমরা প্রতি মূহূর্তে এবং পদে পদে আল্লাহকে ভয় করতে থাকবে এবং তাঁর আয়াতগুলোকে সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করবে না। জেনে রেখো যে, আল্লাহর নাযিলকৃত অহী মোতাবেক যারা ফায়সালা করে না তারা কাফির। এতে দু'টি উক্তি রয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণিত হচ্ছে। এ আয়াতগুলোর আরও একটি শানে নমূল নিম্নরূপঃ
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতে এ লোকদেরকে কাফির, দ্বিতীয় আয়াতে যালিম এবং তৃতীয় আয়াতে ফাসিক বলা হয়েছে। ব্যাপার এই যে, ইয়াহূদীদের দু'টি দল ছিল। একটি বানূ নাযীর এবং অপরটি বানূ কুরাইযা। প্রথমটি ছিল সবল এবং দ্বিতীটি ছিল দুর্বল। তাদের পরস্পরের মধ্যে এ কথার উপর সন্ধি হয়েছিল যে, সবল দলটির কোন লোক যদি দুর্বল দলটির কোন লোককে হত্যা করে তবে তাকে পঞ্চাশ ওয়াসাক রক্তপণ দিতে হবে। পক্ষান্তরে যদি দুর্বল দলটির কোন লোক সবল দলটির কোন লোককে হত্যা করে তবে তাকে একশ ওয়াসাক রক্তপণ আদায় করতে হবে। এ প্রথাই তাদের মধ্যে চলে আসছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় আগমনের পর এরূপ এক ঘটনা ঘটে যে, দুর্বল ইয়াহূদীদের এক ব্যক্তি সবল ইয়াহুদীদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। তখন এদের পক্ষ থেকে এক লোক ওদের কাছে গিয়ে বলে, এখন একশ’ ওয়াসাক আদায় কর।' তারা উত্তরে বলে, “এটা তো প্রকাশ্যভাবে অন্যায় আচরণ। আমরা তো সবাই একই গোত্রের, একই ধর্মের, একই বংশের এবং একই শহরের লোক। অথচ আমরা রক্তপণ পাবো কম আর তোমরা পাবে বেশী! এতদিন পর্যন্ত তোমরা আমাদেরকে দাবিয়ে রেখেছিলে। আমরা বাধ্য ও অপরাগ হয়ে তোমাদের এ অন্যায় সহ্য করে আসছিলাম। কিন্তু এখন যেহেতু এখানে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ন্যায় একজন ন্যায়পরায়ণ লোক এসে গেছেন সেহেতু আমরা তোমাদেরকে সেই পরিমাণ রক্তপণই প্রদান করবো। যে পরিমাণ তোমরা আমাদেকে প্রদান করে থাক।” এ নিয়ে চতুর্দিকে গোলমান শুরু হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর মীমাংসাকারী নিযুক্ত করা হোক। কিন্তু সবল লোকেরা যখন নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলো তখন তাদের কয়েকজন বুদ্ধিমান লোক তাদেরকে বললো, তোমরা এ আশা করো না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অন্যায়ের আদেশ প্রদান করবেন। এটাতো স্পষ্ট বাড়াবাড়ি যে, আমরা দেবো অর্ধেক এবং নেবো পুরোপুরি! আর বাস্তবিকই এ লোকগুলো অপারগ হয়েই এটা মেনে নিয়েছিল। এক্ষণে যখন তোমরা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে মীমাংসাকারী নির্বাচন করলে তখন অবশ্যই তোমাদের হক মারা যাবে। কেউ কেউ পরামর্শ দিলো, গোপনে কোন লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দাও। তিনি কি ফায়সালার করবেন তা সে জেনে আসুক। সেটা যদি আমাদের অনুকূলে হয় তবে তো ভাল কথা। আমরা তাদের নিকট থেকে আমাদের হক আদায় করে নেবো। আর যদি ওটা আমাদের প্রতিকূলে হয় তবে আমাদের পৃথক থাকাই বাঞ্ছণীয় হবে। এ পরামর্শ অনুযায়ী তারা মদীনার কয়েকজন মুনাফিককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করলো। তারা তাঁর নিকট পৌছার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করে স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে তাদের কু-মতলব সম্পর্কে অবহিত করলেন। (সুনানে আবি দাউদ)
আর একটি বর্ণনায় আছে যে, বানূ নাযীর গোত্র পুরোপুরি রক্তপণ গ্রহণ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উভয় গোত্রকে রক্তপণ সমান সমান দেয়ার ফায়সালা করলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বানু কুরাইযার কোন লোক বানু নাযীরের কোন লোককে হত্যা করলে তার কিসাস নেয়া হতো। পক্ষান্তরে বান্ নাযীরের কোন লোক বানূ কুরাইযার কোন লোককে হত্যা করলে কিসাসের কোন ব্যবস্থাই ছিল না, বরং রক্তপণ ছিল একশ ওয়াসাক। এটা খুবই সম্ভব যে, এদিকে এ ঘটনা ঘটে এবং ঐদিকে ব্যভিচারের ঘটনা ঘটে যায়। আর দু'টো ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হ্যাঁ, তবে আরও একটি কথা রয়েছে, যদ্দ্বারা এ দ্বিতীয় শানে নফুলটির প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এরপরেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
(আরবী) (অর্থাৎ আর আমি তাদের প্রতি তাতে (তাওরাতে) এটা ফরয করেছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিমযে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাতের বিনিময়ে দাঁত এবং (জ্রপ অন্যান্য) বিশেষ যখমেরও বিনিময় রয়েছে; অনন্তর যে ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে দেয় তবে এটা তার জন্যে (পাপের) কাফফারা হয়ে যাবে; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবতারিত বিধান অনুযায়ী হুকুম না করে তবে তো এমন ব্যক্তি পূর্ণ যালিম।) আল্লাহ পাকই সবচেয়ে বেশী জানেন।
অতঃপর যারা আল্লাহর শরীয়ত এবং তাঁর অবতারিত অহী অনুযায়ী ফায়সালা করে না তাদেরকে কাফির বলা হয়েছে। এ আয়াতটি মুফাসসিরদের উক্তি অনুযায়ী শানে নকূল হিসেবে আহলে কিতাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও হুকুমের দিক দিয়ে এটা সমস্ত লোকের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। এটা বানূ ইসরাঈলের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল বটে; কিন্তু এ উম্মতেরও এটাই হুকুম। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ঘুষ খেয়ে কোন শরঈ মাসআলার ব্যাপারে উল্টো ফতওয়া দেয়া কুফরী। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যদি ইচ্ছাপূর্বক আল্লাহর অহীর বিপরীত ফতওয়া দেয়, জানা সত্ত্বেও তার উল্টো করে তবে সে কাফির। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ফরমানকে অস্বীকার করবে তার হুকুম এটাই। আর যে ব্যক্তি অস্বীকার করলো না বটে, কিন্তু তা মোতাবেক বললো না, সে যালিম ও ফাসিক। সে আহলে কিতাবই হোক বা আর কেউ হোক। শাবী (রঃ) বলেন যে, মুসলমানদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের বিপরীত ফতওয়া দেবে সে কাফির, ইয়াহূদীদের মধ্যে দেবে সে যালিম এবং খ্রীষ্টানদের মধ্যে দেবে সে ফাসিক। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তার কুফরী হচ্ছে এ আয়াতের সঙ্গে। তাউস (রাঃ) বলেন যে, তার কুফরী ঐ ব্যক্তির কুফরীর মত নয় যে আল্লাহ, রাসূল (সঃ), কুরআন এবং ফেরেশতাদেরকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। আতা’ (রঃ) বলেন যে, কুফরীর মধ্যে যেমন কম বেশী আছে তেমনই যুলম ও ফিসকের মধ্যেও কম বেশী আছে। এ কুফরীর কারণে সে মিল্লাতে ইসলাম হতে বের হয়ে যাবে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা যে দিকে যাচ্ছ এর দ্বারা ঐ কুফরী উদ্দেশ্য নয়।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।